চাকা নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে এক কিশোর। বাঁ পা মাটি ছুঁয়ে আছে। ডান হাতের কাঠি এগিয়ে নিচ্ছে চাকাটি। উদোম শরীরে হাফপ্যান্ট পরা এই কিশোর ছিল অনেক শিশুর কাছে বিস্ময়। ‘দুরন্ত’ ছিল রাজধানীর শিশু একাডেমির প্রবেশমুখে। ঢাকা শহরকে চেনানোর যেসব বিষয় আছে এর মধ্যে দুরন্তও ছিল। অনেকবার দুরন্তকে দেখেছেন আপনারা টেলিভিশনে বা ক্যালেন্ডারের পাতায়।
হামলা-ভাঙচুরের খবর পেয়ে ২০২৪-এর ৮ আগস্ট বিকেলে শিশু একাডেমিতে গিয়ে দেখি দুরন্তর হাত পা কেটে ফেলা হয়েছে। আগুনে পোড়া বুক আর মুখটুকু নিয়ে মাটিতে গড়াচ্ছে ও। তখনো সরিয়ে নেওয়া হয়নি অবশিষ্টাংশ। এখানে গত ৩৮ বছর ধরে স্থাপিত ছিল দুরন্ত। দুরন্তর পাশে তখন মাটিতে লুটাচ্ছে শিশুদের দুটি খাতা। সেই খাতার প্রচ্ছদটিও ছিল দুরন্তর ছবি দিয়ে। আমাকে গালি দেন আর যাই দেন অনেক কিছুর ব্যাপারে নির্মোহ থাকার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এই দুরন্তর ব্যাপারে পারিনি। পুড়ে যাওয়া দুরন্তর দিকে তাকিয়ে আমার ভয়াবহ কিছু মনে হয়েছে, ব্যাখ্যাতীত কিছু। এত স্পষ্ট ছিল ওর মুখ।
ঠিক এক বছর পর ২০২৫ সালের আগস্টে আবার গেলাম শিশু একাডেমিতে। নাহ দুরন্তকে আর ফেরানো হয়নি। যে ক্ষোভ-ক্রোধ একটি শিশুর ভাস্কর্যকে ভয় পায় আমি তাকে ঘৃণা করি।
আমি দুরন্তকে লালন করেছি। দুরন্তর কথা আমারই বলা দরকার। যদি হঠাৎ মরে যাই!
যা হোক সেই ভাঙচুরের পর আমি ধানমন্ডি-৩২, পলাশীর মোড়-এর মতো শিশু একাডেমিতে গিয়ে দেখেছিলাম দুরন্তকে।

দুরন্ত প্রথম তৈরি হয়েছিল রাজধানীর হাটখোলা রোডে ‘তারা কুটির’ নামের এক বাড়িতে। সে আমার চেয়ে বয়সে আসলে বড়। প্রায় দুই বছর সে ছিল শিল্পী সুলতানুল ইসলামের কাছেই। ১৯৮২ সালে শিশু একাডেমিতে প্রথমবারের মতো স্থাপন করা হয় কংক্রিটের দুরন্তকে। তবে তখনো ওর নামকরণ হয়নি। নামকরণের আগেই একবার ভাঙা হয়েছে এ ভাস্কর্য।
যোগাযোগ করলাম শিল্পী সুলতানুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানালেন এই বাংলাদেশের মানুষের রাগ-ক্ষোভ আর ঘৃণা কীভাবে কতবার সয়েছে এই ছোট্ট দুরন্ত। বললেন ‘১৯৮২ সালের শেষ বা ১৯৮৩ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত একটি বইয়ে মহানবীর (স.) জন্ম তারিখ ভুল হয়েছিল এমন একটি প্রসঙ্গ ধরে একদল মানুষ হামলা করে। শিশু একাডেমিতে ভাঙচুর চালায়। তখন রেহাই পায়নি ভাস্কর্যটিও। এই শুরু হলো দুরন্তর ওপর হামলার ঘটনা।’
এ ঘটনার পর ভাস্কর্যটিকে আবার নতুন করে বানিয়েছিলেন শিল্পী। তবে স্থানান্তর করে বসানো হয়েছিল শাহবাগে অবস্থিত তৎকালীন শিশুপার্কে। সুলতানুল ইসলাম বললেন, ‘তখন এটি বানাতে খরচ হয়েছিল ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার মতো। তখন সিটি করপোরেশন মেয়র ছিলেন মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেছিলেন শিশুপার্কে বসাতে। স্থাপনের পর উদ্বোধন নিয়ে শুরু হয় ঝামেলা। রাতের অন্ধকারে আবারও ভাঙা হয় দুরন্তকে। এরপর নতুন করে আবার বানাই। ১৯৮৬ সালে বসানো হয় আবার শিশু একাডেমিতে।’
পরে এটিকে তামায় মুড়িয়ে দেওয়া হয়। শিল্পী জানান তখনো নামকরণ হয়নি। শিশু একাডেমির তৎকালীন পরিচালক জোবেদা খানম শিশুদের দুরন্তপনার কথা মাথায় রেখে ওর নাম দিয়েছিলেন ‘দুরন্ত’। তিনিই শিল্পী সুলতানুল ইসলামের বাড়ি থেকে দুরন্তকে শিশু একাডেমিতে এনে স্থাপনের ব্যবস্থা করেছিলেন।

হাফ-প্যান্ট পরে উদোম শরীরে দৌড়াতে থাকা ভাস্কর্য দুরন্তটি এমনভাবে বানানো হয়েছিল, দেখলে মনে হতো ওর মনোযোগ চাকার দিকে। যেন দৃষ্টি সরিয়ে নিলেই পড়ে যেতে পারে গতিশীল বস্তুটি। এই গতিকে তুলনা করা হতো এই নগরের গতিময়তার সঙ্গে। চার দশকের বেশি বয়সী কিশোর দুরন্তর নির্মাতা শিল্পী সুলতানুল ইসলাম আক্ষেপ করে বললেন, দুরন্তর মতো নিরপেক্ষ একটা ভাস্কর্যের ওপরও মানুষ রাগ করতে পারে! ছোট্ট দুরন্ত বারবার ক্ষোভের শিকার হয়েছে। অথচ দুরন্ত কখনোই রাজনৈতিক ছিল না। দুরন্তকে আবার বানাতে তিনি অনেক জায়গায় চিঠি দিয়ে সাড়া পাননি।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট যখন আমি পুড়ে যাওয়া এই দুরন্তকে দেখছি তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের চেয়ারম্যান নাসিমুল খবির। তিনি বললেন, দেশের কম ভাস্কর্যই আছে যেগুলো ঐতিহাসিক, নান্দনিক বা সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক মূল্যের নিরিখে খুব ভালো। এর মধ্যে দুরন্ত ভাস্কর্যটি নান্দনিক বা সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক মূল্যে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্পী আবার নতুন করে তৈরি করতে চাইছেন দুরন্তকে। তবে তিনি আশঙ্কা করছেন দুরন্ত হয়তো আর ফিরবে না। শিল্পী সুলতানুল ইসলামের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে গত বছর। আমি রোজ মেট্রো দিয়ে যখন শিশু একাডেমি অতিক্রম করে অফিসে আসি, তখন দাঁড়িয়ে থাকি শুধু দুরন্তর জায়গাটা দেখার জন্য। দুরন্ত এবার আর ফেরেনি।
●





























































































































