৮ মে ২০২৬
জীবন যখন শুকায়ে যায়
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
মুম রহমান
গল্পকার, অনুবাদক ও চলচ্চিত্র সমালোচক
8

মুম রহমান
গল্পকার, অনুবাদক ও চলচ্চিত্র সমালোচক

8

মুমের জার্নাল

জীবন যখন শুকায়ে যায়

২০২২ সালের কথা, বছর চারেক আগে। পশ্চিমবঙ্গের বরাহনগর গেছি। এক বন্ধুর রিসোর্টে ছিলাম। সারারাত আড্ডা, মাস্তি করে সবাই ঘুমাতে গেছে ভোরে। আমি গেট খুলে বেরিয়ে পড়লাম। নতুন কোথাও গেলে আমি পায়ে হেঁটে এলাকাটা ঘুরি। দেখলাম, এলাকাটা পুরনো মফস্বলের মতো। ভোরের ঘ্রাণ বুকে নিয়ে হাঁটছি একা। হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে কামিনী, হাসনাহেনার ঘ্রাণ পাচ্ছি। প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে বা পাশে ছোট্ট বাগান। জবা, তুলসি, রঙ্গন, কলাবতী ফুটে আছে। আর কোথাও থেকে আসছে কচি, অপরিণত কণ্ঠের বিমূর্ত সুর। সেই সঙ্গে বুলবুলি, শালিক, চড়ুই পাখিদের ডাক। আমার মনে পড়ে গেলো ছেলেবেলার ময়মনসিংহের পুরনো দিনের কথা। যেন গুলকিবাড়ি দিয়ে হাঁটছি। সারেগা, রেগামা, গামাপা শুনছি। কোন বাড়ির জানালা দিয়ে আসছে শুকনো পাতার নুপুর বাজে কিংবা আয় তবে সহচরী… সে এক সুরময় স্মৃতির দিন। কোন বাড়ি থেকে লণ্ঠন, কলাবতী, ছোট জবার রঙের উল্লাস, কোন বাড়ির সামনে একটা বেলি বা গন্ধরাজের ঘ্রাণ। সুর, রঙ, ঘ্রাণময় স্মৃতিরা জেগে উঠলো বরাহনগরের ভোরে।

আজ সে কথা মনে হলো। টানা বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাঙলো। বিছানায় হেলান দিয়ে বরাহনগর আর ময়মনসিংহের কথা মনে পড়লো। মনে প্রশ্ন জাগলো, এই ঢাকা শহরে কিংবা আমাদের জেলা, উপজেলায় কিংবা গ্রামে গঞ্জে কি ভোরবেলা কেউ রেওয়াজ করে? কারো বাড়ির দরজা জানালায় কি ভোরের রোদ লুটোপুটি খায় হারমোনিয়াম তবলায়? কারো বাড়ির সঙ্গে কি দুটো গোলাপ কি একটা গন্ধরাজ রঙ আর রূপ ছড়ায়?

এ বছরই আমি ঢাকার বাইরে দুজায়গায় গিয়েছিলাম, রংপুরে আর রাজবাড়ীতে। কই, কোথাও রেওয়াজ হচ্ছে শুনিনি। কোথাও ঘরোয়া বাগান দেখিনি। ভোর কিংবা সকালের নরম আলোতে সুর, ঘ্রাণ কিংবা রং দেখিনি। আমি থাকি বাসাবোতে। আমার সামনে, পাশে দশতলা সব ফ্লাটবাড়ি। কোন ফ্লাট থেকে ভোরে রেওয়াজ শুনিনি। শুনি না। তবে কি আমাদের সকাল থেকে, আমাদের জীবন থেকে সুর, ঘ্রাণ, রঙ হারিয়ে গেলো।

কেন হারালো?

বাগান চর্চা, সুর চর্চা বাড়িতে বাড়িতে নেই। এক চিলতে ফাঁকা জায়গাও কেউ রাখে না। বারবারা হেপওয়ার্থের ভাস্কর্যের মতো ফাঁকা জায়গা আমাদের স্থাপত্যে নেই। জায়গা জমির যে অনেক দাম! তাই মানুষ “বিনা যুদ্ধে নাহি দিবো সুচাগ্র মেদেনি” শর্তে বাঁচে। পাশের বাড়ির যে ধার্মিক বড় ভাই বিশাল পৈত্রিক বাড়িটা ভেঙে দশতলা করলো সে নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুফুট জায়গাও ছাড়েনি। আমার বাড়ির ওয়াল ঘেষে তার বাড়ি। নিত্য তাদের মশলার ঝাঁজ, ঝগড়ার আওয়াজ শোনা যায়। আর ভোরে, সন্ধ্যায় শুনতে পারি তার দ্রুত সুরা পাঠ। নামাজে দাঁড়িয়ে সে সুরা পড়ে, কখনো টেবিলে বসে আল কুরআন পাঠ করে জোরে কিন্তু এমন ভাবে পড়ে যেন একটা অটোরিক্সা খুব গতি পেয়ে চলে যাচ্ছে। আয়াতের পাঠে সুর নাই, স্থিরতা নাই। কেবলই ত্রস্ত, ব্যস্ত পাঠে আচার, কৃত্য শেষ করার দায়। চাকরিকে ভালোবাসে না লোকে, ধীরে, নিঁখুত করে কাজ করে না লোকে। কেবলই কাজ শেষ করা আর বেতন-বোনাসের তাড়াটাই আছে। জীবন যেন তাড়া দিচ্ছে সবাইকে। তাই ইবাদত নয়, নিষ্ঠা নয়, নামাজে, পবিত্র কোরান তেলওয়াতেও খুব তাড়া। কেউ কেউ রুকু, সেজদা দিচ্ছে ব্যায়ামের মতো করে! অতো তাড়া কিসের মানুষের?

মুমের জার্নাল

আমার তো মনে হয়, চোখের সামনে এই যে এতো এতো মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে গেলো তার কারণ উন্নতি আর প্রাপ্তির লোভ। একটু বাগান করার মতো স্থিরতা মানুষের নেই। একটু সুর, রঙ, রূপের সময় আমাদের নেই। সবাই ব্যস্ত – জায়গা, জমি বাড়াতে, সম্পদ বাড়াতে আর পূণ্যের খাতা ভারী করতে। জীবন যাপন যে স্বয়ং একটা সুকুমার শিল্প সেটা কেবা জানে, মানে!

সত্যি করে যদি বলি, আমার যে বন্ধুরা আমার সঙ্গে স্কুলে যেতো, তারা কি তাদের ছেলেমেয়েদের বুলবুল ললিতাকলায় পাঠায়? হয়তো দুচারজন পাঠায়। কিন্তু শহরে, উপশহরে, গ্রামে কমবেশি সবাই তার একটা ছেলেমেয়েকে অন্তত মাদ্রাসায়, নিদেন পক্ষে ধর্মীয় শিক্ষা দেয়। আমি হলফ করে বলতে পারি, এই ঢাকায় বেড়ে ওঠা বন্ধুবান্ধবীরা তাদের সন্তানদের, কেউ কেউ নাতিপুতিদের ইহকালে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ক্যাডার বানাতে চায়, গাড়ি বাড়ি ক্ষমতা চায় আর পরকালে বেহেস্ত চায়। প্রাপ্তির হিসাবে আটকে গেলো আমাদের জীবন। ইহকাল ও পরকালের ফায়দা নিয়ে ভাবছি কেবল। জীবন কি একটা ব্যবসা? লাভ লোকসানের হিসাব? সন্তানের কণ্ঠে গান নেই, বাগানে ফুল নেই, দেয়াল, গাছের ডালে, কার্নিশে পাখি নেই। আছে কেবল টাকা আর ধর্মের হিসাব!

অনেকের হিসেবেই ইহকালের উন্নতির পথে গান, বাজনা, কবিতা ফবিতার তেমন গুরুত্ব নেই, মানে নিজেদের এবং সন্তানদের এ সব চর্চা না করলেও চলে। মাঝে সাঝে নেটফ্লিক্স টিক্স দেখলেই হয়। শিল্প, সাহিত্য নয়, আমাদের চাই পদবী, পদক আর ক্ষমতার চাকরি। চারিদিকে দেয়াল ঘিরে সেন্ট্রাল এসি হলেই চলে আমাদের। পথ সরু হোক, ভাঙা হোক, গাড়িটি হতে হবে মসৃণ, চকচকে, দামী। আর পরকালের উন্নতির পথে গান বাজনা, ছবি আঁকা তো হারামই। অতএব জীবনের সিলেবাস থেকে সুরের, ছবি আঁকার, ফুল, পাখি, ঘ্রাণ, রঙের অনুভূতিগুলো বাদ। মূর্তি, ভাস্কর্য তো আরো দূর দ্বীপবাসিনী।

এখন এই যে লালনের গান, এই যে আউল বাউল, এদের সম্পর্কে জানার, বোঝার সুযোগ কই ফেসবুকের বাঘ বাঘিনীদের? আমরা তো এগুলো শুনে বড় হয়েছি, তারা বাড়ছে কি শুনে? কে-পপ কিংবা গেন্দাফুল, বড়জোর কোকস্টুডিওর ফোক! তারা হুট করে যেকোনো আলাপে একটা হালুম দিয়ে আরামসে ফায়দার হরিণের মাংস চিবাতে ব্যস্ত। মিটবক্সে ভরে গেছে পৃথিবী।

আমার মনে পড়ে গেলো ছেলেবেলার ময়মনসিংহের পুরনো দিনের কথা। যেন গুলকিবাড়ি দিয়ে হাঁটছি। সারেগা, রেগামা, গামাপা শুনছি। কোন বাড়ির জানালা দিয়ে আসছে শুকনো পাতার নুপুর বাজে কিংবা আয় তবে সহচরী… সে এক সুরময় স্মৃতির দিন

এখন কথায় কথায় যারা ধর্ম, অর্থ, বিত্ত, ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে মাপে তারা সুর, ছন্দ, রঙ, রূপের অনুভূতি দিয়ে জগতকে দেখতে শেখেনি। যারা লালনের নারী-পুরুষের সুন্নতের আলাপে অনুভূতিতে আঘাত পায় তারা তো মঙ্গলগ্রহ থেকে এ দেশে আসেনি। এরা পাকপরবর্তী ছককাটা প্রজন্মের বাই প্রোডাক্ট। কিসের এই ছক? ওইযে ছোটবাক্সে বন্দী জীবন। পিট সিগারের গানের লিটল বক্সের জীবন। ঘরগুলো ছোট বাক্সের মতো, অফিসের বাক্সের মতো কিউবিকলে বসে সিইও কেবল বলে যাচ্ছে, থিঙ্ক আউট অব দ্য বক্স। তো কিভাবে বক্সের বাইরে ভাববে? যার জীবনে আঙিনা নেই, উঠোন নেই, বাগান নেই, হারমোনিয়াম, তবলা যার বাড়িতে নেই সে কেমন করে হিসাব কিতাবের বাইরে যাবে! বরং মোবাইল বাক্সের টাচ স্ক্রিনেই অনুভূতি মাথা কুটে মরে!

শত শত বছর ধরে চলা একটা গান কিংবা সুর ঘরানার জন্য বাউলকে গ্রেফতার করা হয়। আমি নিশ্চিত নই, যে পুলিশ ভাই বাউলকে গ্রেফতার করেন তিনি আদৌ এ দেশের দেহতত্ত্ব, বাউল সাধনা, পীর পরম্পরার কথা জানেন কিনা? আমি নিশ্চিত নই, যে কিশোর তরুণ মাজার ভাঙে, গানের আসরে ভাঙচুর করে তার মা, খালা, বাবা, চাচারা তাকে কোনদিন একতারার একটি তারের বেদনা বুঝাতে চেয়েছে কিনা? আহা, একতারাটির একটি সুরে গানের বেদন বইতে না রে…

আগে পিছে না জেনে, একজন বা একদল লোক গিয়ে বললো, “দেখেন কি উসকানি, সুন্নত দিলে হয় মুসলমান, নারীর তবে কি হয় বিধান” এসব কথা লিখছে এক হিন্দু ব্যাটা! লালন কি জাত সংসারে! ব্যাস অমনি চেতনার চিলে ঢিল পড়লো। শুরু হলো চিলের পিছে ছোটাছুটি। চিলে সত্যি কান নিয়েছে কিনা তা আর পরখ করে দেখা হলো না।

“এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।”

ভবিষ্যত জ্ঞানী এই ভাইরাল জাতির জন্যই লিখলেন ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতাখানি! আজকের ভাইরাল পোস্ট কালকে ভুল বা এআই প্রমাণিত হলো। কিন্তু চিলের পিছে ছোটাছুটি করে পণ্ডশ্রম চলতে থাকলো।

কিন্তু কথাটি হলো, এগুলো বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। এমনটা হয়ে গেছে আমরা গান থেকে, ছবি থেকে, ফুল থেকে দূরে সরে গেছি বলেই। শিল্প আর প্রকৃতি হন্তারক জাতি আজ আর রবীঠাকুরকে, সাঁইজিকে কতদূর চিনবে?

কাজেই একটা পুরো প্রজন্ম যে গিরিশ ভাই কোরান অনুবাদ করেনি, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা চাননি এমন আলটপকা আলাপে শেয়ার কেয়ার দিতে কাতর হয় তাতে অবাক হওয়ার কী আছে? রিলস আর স্ক্রলিং, শেয়ার আর মনিটাইজেশন, ডলার আর লাইকে বন্দী ইহকাল। এখন যদি মহাত্মন হিরো আলম, জায়েদ খান, অনন্ত জলিলরা এদেশে রবীন্দ্র, লালনের ভাবধারায় উজ্জীবিত হোন তবেই কেবল রিল প্রজন্ম কিছুটা উদ্ধার পায়। কারণ এরাই আমাদের পপুলার পার্সন। আর আমাদের বইপত্র বলতে তো ফেসবুকই, অতএব সেইখানেই আসুন বুঝে না বুঝে সাঁই, ঠাকুরগণের বয়ান করি। নইলে হিন্দি গানের সুরে ওয়াজই আমাদের শেষ সাংগীতিক ভরসা।

নইলে ইহকাল হবে ঘ্রাণ, রঙ, সুরহীন আর পরকাল হবে অনুভূতিহীন। মানুষ মানুষকে ভালোবাসুক, প্রকৃতি ও প্রাণকে ভালোবাসুক। দালান কোঠা, চাকরি বাকরি, ধর্ম কর্মর চর্চা করতে গিয়ে জীবন তো শুকিয়ে যাবে!

জীবন যখন শুকায়ে যায়
করুণা ধারায় এসো…

এসো নীপবনে, ছায়াবীথি তলে
এসো করো স্নান নবধারা জলে…

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত