৭ মে ২০২৬
গ্রীষ্ম অবকাশের কবিতা
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
মোশতাক আহমদ
কবি ও কথক
22

মোশতাক আহমদ
কবি ও কথক

22

কমলা দাসের

গ্রীষ্ম অবকাশের কবিতা

কমলা দাস (১৯৩৪–২০০৯), একজন প্রখ্যাত ভারতীয় সাহিত্যিক। তিনি তাঁর সাহসী ও আত্মকথনধর্মী লেখনীর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত, যেখানে নারীর অনুভূতি, ভালোবাসা, যৌনতা এবং ব্যক্তিসত্তার বিষয়গুলো অত্যন্ত খোলামেলা ভাবে উঠে এসেছে। তাঁর জন্ম ভারতের ট্রিসুরে। তাঁর মা নালাপাত বালামানি আম্মা ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি, ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্যিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন।

খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি লেখা শুরু করেন এবং পরে ইংরেজি ও মালায়ালম উভয় ভাষায়ই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ইংরেজিতে তিনি প্রধানত কবিতা লিখতেন এবং মালায়ালম ভাষায় “মাধবীকুট্টি” ছদ্মনামে লিখতেন। তাঁর লেখায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে ভারতীয় নারীর সামাজিক ও মানসিক বাস্তবতা গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে কবিতা সংকলন Summer in Calcutta (১৯৬৫), The Descendants (১৯৬৭), এবং The Old Playhouse and Other Poems (১৯৭৩)। এছাড়া তিনি Alphabet of Lust (১৯৭৬) উপন্যাস এবং A Doll for the Child ProstitutePadmavati the Harlot গল্পের জন্যও পরিচিত। মালায়ালম ভাষায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে Thanuppu এবং স্মৃতিকথা Balyakalasmaranakal

তাঁর সবচেয়ে আলোচিত ও বিখ্যাত রচনা হলো আত্মজীবনী My Story (১৯৭৬), যা প্রথমে মালায়ালম ভাষায় Ente Katha নামে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থটি তার খোলামেলা ও ব্যক্তিগত বর্ণনার জন্য ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীতে একটি ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
১৯৯৯ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নাম পরিবর্তন করে কমলা সুরাইয়া রাখেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি বহু পুরস্কার অর্জন করেন, যার মধ্যে ১৯৮৫ সালের Asian World Prize for Literature উল্লেখযোগ্য।

কমলা দাস ভারতীয় সাহিত্যে এক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে স্মরণীয়, যিনি সামাজিক বিধিনিষেধ ভেঙে নারীর অন্তর্জগতকে সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।

• ভূমিকা ও অনুবাদ: মোশতাক আহমদ

Kamala Das
Kamala Das. Image source: facebook

দাদিমার বাড়ি
My Grandmother’s House

সে বাড়িটা আজ বহুদূরে, যেখানে একদিন
আমি পেয়েছিলাম অগাধ ভালোবাসা…
.               বুড়িটা মরে গেলে
গোটা বাড়ি স্তব্ধ, বইয়ের ভেতর
সাপের হিসহিস চলাচল। তখনো আমার
হয়নি বর্ণ পরিচয়, পড়তে শিখিনি,
.                     সেদিন আমার রক্ত
চাঁদের মতো হিম হয়ে গেল।
কতবার যে সেখানে ফিরতে চেয়েছি,
অন্ধ জানালায় উঁকি দিতে,
অথবা গুমোট বাতাসের শব্দ শুনতে,
কিংবা উন্মত্ত হতাশায় কোল-ভরা
.            অন্ধকার কুড়িয়ে এনে
আমার শোবার ঘরের দরজার পেছনে
.       একটা ভাবুক কুকুরের মতো
.                 শুইয়ে রাখতে চাইলাম…
তুমি তো বিশ্বাস করতেই পারবে না, প্রিয়,
পারবে কি!
.     বিশ্বাস করতে পারবে যে– আমি এরকম একটা বাড়িতে থাকতাম
তাই নিয়ে ছিল কত গর্ব, কত স্নেহে ভরা দিন…
সেই আমি, পথ হারিয়ে আজ
ভিখিরির মতো দাঁড়াই পরের দরোজায়
একটুখানি ভালোবাসার জন্য,
.            অন্তত কিছু খুচরো পয়সা হলেও চলবে।

 

আমার মায়ের ৬৬ বছর বয়সে
My Mother at Sixty-Six

গত শুক্রবার সকালে
মায়ের বাড়ি থেকে কোচিনে ফিরছিলাম গাড়ি চালিয়ে।
আমার পাশে বসে থাকা মাকে দেখলাম—
তন্দ্রায় ঢুলছেন মুখ হা করে,
মরা মানুষের মতো
.         ছাই রঙ ফ্যাকাসে তার মুখ।
বড় বেদনার সাথে বুঝে যাই –
.        তিনি সত্যি বুড়ো হয়ে গেছেন।
অচিরেই সেই ভাবনা ঝেড়ে
বাইরে তাকাই—
দেখি তরুণ গাছগুলো ছুটে যাচ্ছে,
হাসিখুশি শিশুরা
ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে উচ্ছ্বল।
এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি শেষ করে
আবারও মায়ের দিকে তাকালাম
কয়েক গজ দূর থেকে –
তিনি নিস্তেজ, বিবর্ণ,
.         শীতের শেষ চাঁদের মতো কুয়াশা ঢাকা।
কিন্তু দেখতে পেলাম সেই পুরাতন চিরচেনা অবয়ব—
শৈশবে যাকে কত না সমীহ করতাম।
মুখে শুধু বললাম,
“শিগগিরই দেখা হবে, মা,”
আর বারবার হেসে গেলাম, হেসে গেলাম,
.          বারবার হেসে গেলাম…

 

বনপোড়া আগুন
Forest Fire

ইদানীং আমার ভেতর এক ধরনের ক্ষুধা জন্মেছে—
বনের আগুনের মতো সব পুড়িয়ে
গ্রাস করতে লোভ হয়,
আর প্রতিটি ধ্বংসের সঙ্গে যেরকম আরও বুনো
.      আরও দীপ্ত হয়ে ওঠে সে আগুন, তেমন করে
আমিও সবকিছু খাবো– আমার পথে যা আসে— সব।
খোলা প্যারামবুলেটরে বসে থাকা ন্যাড়া মাথা শিশুটি,
.         তুমি ভাবো আমি শুধু তাকিয়ে আছি;
আর তোমরা— গাছের আড়ালে দাঁড়ানো সরু-দেহ প্রেমিকযুগল;
আর তুমি— চুলে রোদের ঝিলিক মেখে
.          খবরের কাগজ হাতে বসে থাকা বৃদ্ধ,
আমার চোখ আগুনের জিভের মতো চেটে যায় তোমাদের,
আমার স্নায়ু তোমাদের গ্রাস করে;
আর যখন শেষ করি— প্যারামবুলেটরের পাশে,
গাছের নিচে, পার্কের বেঞ্চে—
আমি কেবল ছোট ছোট ছাইয়ের স্তূপ ফেলে রাখি ,
.           আর কিছু নয়।
কিন্তু আমার ভেতরে
সব দৃশ্য, সব গন্ধ, সব শব্দ
বেঁচে থাকে, বংশবৃদ্ধি করে, চলতে থাকে,
.         চলতেই থাকে, চলতেই থাকে।
আমার ভেতরে ঘুমায় সেই শিশু
যে একদা প্যারামবুলেটরে বসতো— ঘুমাতো, জেগে উঠে
.               দাঁতহীন মুখে হাসতো।
আমার ভেতরে হাত ধরাধরি করে হাঁটে
.               সেই প্রেমিকযুগল;
আমার ভেতরে বসে থেকে (কোথায় বা যাবে আর) সেই বৃদ্ধ
.               রোদ পোহায়।
আমার ভেতরে
রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে ওঠে,
ক্যাবারে মেয়েরা হুলস্থুল নাচে,
বিয়ের ঢাকের শব্দ ওঠে,
হিজড়াদের রঙিন ঘাঘরা ঘুরে ওঠে,
আর ভালোবাসার বিষাদ ভরা গান শোনা যায়।
আহতরা গোঙায়;
আর আমার ভেতরেই—
মরণাপন্ন মা বড় আশা নিয়ে খোঁজে
তার সন্তানকে— যে বড় হয়ে
অন্য শহরে, অন্য বাহুডোরে হারিয়ে গেছে।

 

কলকাতায় গরমকালে
Summer in Calcutta

এ কী পানীয় না অন্যকিছু!
এ তো এপ্রিলের রোদ, আমার গ্লাসে
কমলার কোয়া থেকে চিপে নেওয়া!
আমি চুমুক দিই এই আগুনে,
পান করতে করতে
.       মাতাল হয়ে যাই একদম—
হ্যাঁ, এই মাতলামি
.       সূর্যের সোনালি রোদে।
কী মহতী নীল বিষ
.     বইছে আমার শিরায়,
মন ভরে ওঠে
প্রশান্তির হাসিতে,
.      ঘুমিয়ে পড়ে দুশ্চিন্তা।
খুদে বুদবুদগুলো
গ্লাসের কিনারে বেজে বেজে
নববধূর বিচলিত হাসির মতো
কখন এসে ছুঁয়ে যায় ঠোঁট।
প্রিয়, ক্ষমা করো
এই ক্ষণিকের না চাওয়াগুলো,
এই ঝাপসা স্মৃতিকে ক্ষমা করো।
গ্লাস হাতে নিলে
তোমার রাজত্বের প্রতি
কত পলকা আমার নিবেদন,
যখন আমি হাতে গ্লাস নিয়ে পান করি
বারবার পান করি
এই এপ্রিলের সূর্যরস।

 

মালাবারের উষ্ণ দুপুরে
A Hot Noon in Malabar

এ এমন এক দুপুর —
ভিখারিদের কাঁদুনে স্বরের দুপুর;
পাহাড় থেকে নেমে আসা সেইসব মানুষের দুপুর,
যাদের হাতে খাঁচাবন্দি তোতা
আর সময়ের তাপে হলদে হয়ে যাওয়া
.       ভাগ্য বাতলানো কার্ড।
এ দুপুর সেই বাদামি কুরাভা মেয়েদের,
যারা পুরনো চোখে, পুরনো কোনো সুর ভাজতে ভাজতে
.           মেলে দেওয়া হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলে;
চুড়িওয়ালাদের দুপুর – যারা
রাস্তার ধুলোয় মলিন হয়ে যাওয়া
.       লাল, সবুজ, নীল চুড়িগুলো সাজিয়ে রাখে—
.              শীতল কালো মেঝেতে।
মাইলের পর মাইল ঘুরে তাদের গোড়ালির চামড়া ফাটা –
যখন তারা আমাদের বারান্দায় উঠে আসে,
.    কানে বাজে তাদের কর্কশ, অচেনা কলকলানি।
এ দুপুর আগন্তুকদের,
যারা রোদে ভরা তপ্ত চোখে
.          জানালার পর্দা সরিয়ে উঁকি দেয়;
ঘরের অন্ধকার সয়ে না আসায়
.          কিছুই না দেখে ফিরে দাঁড়ায়,
আর তৃষা নিয়ে তাকায় ইট বাঁধানো কুয়ার দিকে।
এ দুপুরে আগন্তুকদের চোখে অবিশ্বাসের ছায়া,
ছায়া ঢাকা কম কথা বলা নীরব মানুষেরা –
কিন্তু যখন বলে, তাদের কণ্ঠ ছুটে যায় বুনো অরণ্যের মতো।
হ্যাঁ, এ এমন দুপুর—
.          বুনো মানুষের, বুনো চিন্তার, বুনো প্রেমের।
এখানে, এত দূরে থাকা—
.        বড় যন্ত্রণার।
আমার মালাবারের বাড়িতে এই প্রচণ্ড দুপুরে
.      বুনো পাগুলো ধুলো উড়াচ্ছে –
.                আর আমি, কত দূরে আছি…

 

হেরে যাওয়া যুদ্ধ
A Losing Battle

কীভাবে আমার ভালোবাসা তাকে ধরে রাখবে
যখন অন্য নারী
চটকদার কামনা নিয়ে দাঁড়ায়
এক সিংহীর মতো সমর্পিতা হয়
.          পশুটার কাছে?
পুরুষেরা অপদার্থ—
তাদের ফাঁদে ফেলতে হলে
সবচেয়ে সস্তা টোপটা ফেললেই চলে,
ভালোবাসার দরকারই পড়ে না – যাকে নারী চেনে
চোখের জলে
আর রক্তের ভেতরের
.           শব্দহীনতায়।

 

শব্দেরা
Words

আমার চারপাশে শুধু শব্দ—
.       শব্দ আর শব্দ:
শুকনো পাতার মতো ঝরে পড়ছে
ওরা আমাকে পাতার পাহাড় দিয়ে ঢেকে ফেলে—
কখনোই থামতে জানে না ।
ঝরা পাতার পাহাড় ঠেলে উঠতে উঠতে
তবু আমি নিজেকে বলি—
শব্দ মানেই ঝামেলাবাজ, ওদের থেকে সাবধান হও—
ওদের হাজার রকম ছলনা—
কখনো এক গভীর খাড়ি—
.          যেখানে থামাতেই হয় দৌড়বাজ পা;
কখনো এক সমুদ্র—
.        অবশ করে দেওয়া ঢেউ;
কিংবা এক তপ্ত হাওয়ার ঝলক—
অথবা এমন এক ধারালো ছুরি—
.        গলাও কেটে দিতে পারে প্রিয় বন্ধুর,
শব্দ মানেই ঝামেলার একশেষ—
তবু তারা আমাকে আচ্ছাদিত করতেই থাকে
.        ঝরা পাতার মতো –
এক গভীর নীরবতার কেন্দ্রে
.        ওরা আসছেই —
কোনো এক গহীন থেকে
.        ওরা আসছেই।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত