২১ এপ্রিল ২০২৬
অ্যালগরিদম প্রেম
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য

কবিতাগুচ্ছ

অ্যালগরিদম প্রেম

দ্বিধাহীন

পাখিদের গান শুনতে কি পাও
মরুর দেশের উপর?
শত শত পাখির গান শুনি
তোমার বুকের ভেতর।

এতো ডাকাডাকি নাম জপে না কি
নদীর জলের ঢেউ
ব্যথা সেতো পায় কূল-কিনারায়
সাত পাকে বাঁধা হৃদয়!

কারা যেন বলে দরবার ডাকে
মন-শুনানির রায় এলো—
কারো দুয়ারে যেন না যাই,
সতর্কতা জারি হলো।

এ কি তবে হায় অভিমানী দায়,
প্রেয়সীর সাথে জনম জনম?

তুমি তো জানো পথচারী কেমন,
দুনিয়ার ভেতর কত ঘটনাই
আসে আর যায়, ফিকে হয়ে যায়
উদ্বাস্তুদের মতো।

এও তো জানো আমি কেমন,
মাতাল আর মশগুল কার জন্য
সরলা মনের ভেতর তোমার জন্য
ইশারায় প্রেম জারি থাকে সর্বত্র।

 

অ্যালগরিদম প্রেম

যে শহরে তুমি থাকো,
আমার প্রবেশের পর—
তোমার আর আমার দেখা হতে পারতো।

আমাদের দেখা হতে পারতো ছায়ার দেহের ভেতর,
গাছালির রেখায় আলো ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্তে—
হাসির রেশে রশ্মি হয়ে।
হতে পারতো পাহাড়ি পথের শেষে,
অথবা পাসিং গাড়ির গতিপথ ধরে
হঠাৎ এক ঝলকে।

আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয়—
তোমার আর আমার প্রেম কি এক অ্যালগরিদম ক্লক?
টিক-টিক শব্দ হয়ে বাজে বুকের ভেতর,
যার ব্যাখ্যা আমি খুঁজতে চাই না,
শুধু জানতে ইচ্ছে হয়।

এই সময়ের ন্যূনতার ভেতর,
পকেটের পরিস্থিতি যাই হোক—
এখানে আর কোনো প্রেম অবশিষ্ট নেই।
সম্ভবত ভ্রান্তি আর মানসিক চাপের নিচে
কিছু ক্ষত জমে থাকে নিথর।

সেদিন, একা ক্যাফেতে বসে
জিও-ক্যাল প্রেম চর্চার নামে
দেখছিলাম অদ্ভুত সব কথন—
গ্যাজেট, ওয়ালেট আর ক্রেডিট কার্ড নির্ভর।
আনমনে চোখ মেলেছিলাম সামনের টেবিলে,
দেখলাম—যামিনীর চোখ ঢলঢল,
নেশার ঝোঁক, অপ্রস্তুত ঠোঁট।

প্রশ্ন করতেই পারো—
যামিনীর পাশের জনকে কেমন দেখলাম?
সে ঠিক যেন ক্লাইম্বিং রোজ—
সূর্যের কাছে জেগে ওঠে, দরকার দোআঁশ মাটি,
অথচ জড়িয়ে উঠতে পারে না কোথাও—
ব্যয়বহুল যাপনের স্থলনে থমকে।

এখনও মনে পড়ে—
আমার প্রেমে পড়ার পর তুমি বলেছিলে,
তোমার প্রতি যত্ন আর তন্ত্রের ভেতর—
আমি একরোখা, খেয়ালি।

অথচ আমি তো এমনই ছিলাম আজীবন—
সেই অজস্র তারা হয়ে আসা আলো,
যার যত্নে লুকিয়ে থাকে
কিছুটা মা, কিছুটা মায়াবতী।
তাই তো সহজেই বলে ফেলো—
আমি মায়ের মতোই ভালো।

শুদ্ধ প্রেম—
তোমার আর আমার, এক অ্যালগরিদম ক্লক।

 

অনির্বাণ বন্ধুতা

ছুটে গিয়ে আবিষ্কার করি এক তীব্র শীতলতার অবগাহন—নিকষ কালো গহ্বরের অন্তঃস্থলে দূরাগত জ্যোৎস্নার ক্ষীণ প্রতিবিম্ব। ছুমন্তর হয়ে যায় নিরেট যাতনার অভিঘাত, তবু বাতাস থরথর কাঁপে অদৃশ্য বেদনার কম্পনে। হলুদ বাড়ির স্বচ্ছ কাচে জমে ওঠা শিশিরবিন্দু সময়ের স্তব্ধ স্বাক্ষর হয়ে নিঃশব্দে লিখে যায় প্রতীক্ষার উপাখ্যান।

প্রশ্ন জাগে— সময় কি সত্যিই বদলে দেয় সব ব্যথা, নাকি বসন্তের কোমল আগমনে যন্ত্রণাও আরও গভীর হয়ে ওঠে? নাকি বসন্ত পেরিয়ে বৈশাখের উত্তাপ এসে দগ্ধ করে দেয় স্মৃতির অবশিষ্ট রেখা?

দু’টি সমান্তরাল সত্তা, বসন্তের ডাকেও যারা মিলতে পারে না, বৈশাখের তাপেও যারা পৌঁছাতে পারে না কোনো গন্তব্যে। তুমি তবে পরদেশি হয়ে থাকো— থোকা-থোকা পুষ্পে সজ্জিত বসন্তের অন্তরাল বাগানে, আমার প্রতীক্ষার অনির্বাণ প্রহর গুনে।

উত্তরণ

আমাকে থামিয়ে দেওয়ার পরই
জানলাম— তুমি ভালো আছো।
কতটা ভালো— সে প্রশ্ন আজও অনির্বচনীয়,
নাকি সে-ও কেবল এক সুসংগঠিত নীরব অভিনয়?

তোমার তো আমার অনুপস্থিতিতে ভেঙে পড়ার কথা ছিল—
অথচ তুমি গড়ে তুললে এক অচেনা স্বস্তির ভূগোল;
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম তার বাইরে,
অব্যাখ্যাত, অবান্তর।

এখানে বাতাস নামে ধীরে, শীতল, অনুচ্চারিত
শূন্যতার মতো এসে জড়িয়ে ধরে আমাকে।
তুমি আমাকে থামিয়ে দিলে—
যেন আমার নাম আর উচ্চারিত না হয় কোনো প্রান্তে।

আমি সরে গেলাম—আড়ালে, অদৃশ্যের ভেতর,
ফেরার পথগুলো নিজেই নিজেকে মুছে ফেলল
দূর থেকে একবার দেখার আকাঙ্ক্ষাটুকুও
শেষমেশ ক্লান্ত হয়ে নতজানু হলো।

প্রথম জন্মের মতো প্রেম সুন্দর
সেইদিন তোমার কণ্ঠে ছিল এক মৃদু স্নেহ,
তুমি আমাকে বলেছিলে—“শিশু”
সম্ভবত সেই একমাত্র সত্য উচ্চারণ।
পৃথিবীর কাছে প্রাজ্ঞ হতে হতে ক্লান্ত আমি,
শুধু তোমার কাছেই অবুঝ হয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম—
অবিকল্প, নির্ভার, অবলীলায়।

আগেও বলেছি—
আত্মার অন্তঃস্থলে আমি তোমারই ছিলাম।
কিন্তু বলো—আমারই বা কী করার ছিল?
ছাপা অক্ষরের নির্দয় সংবাদে
আমার কোনো স্পর্শ ছিল না;
অন্তর্জালের জটিল, অদৃশ্য বুননে
আমি হারিয়েছি নিজেরই প্রতিধ্বনি।

এবার আর ফেরার কোনো আয়োজন নেই—
কোথাও না।
মন এখন সুদূর—হিমালয়েরও অতীত কোনো নির্জনে,
তোমার থেকে বহু দূরে, অনাবিষ্কৃত।

আমাকে খুঁজো না—
কোনো প্রান্তে নয়, এমনকি সেই অন্তহীন জালে
গোলাপের কাঁটা ফুটে ওঠার আগে—
অহংকার ঝেড়ে ফেলে,
নিস্তেজ হয়ে হয়ে আসা প্রলাপের কাছে ফিরতে নেই।

 

বৃষ্টিহীন

সন্ধ্যার বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ
এলো বলে সে, বৃষ্টি নামায় না
মেঘেরা জানে নিজেরা আজ বন্দী
নিচু স্বরে নুয়ে আসা আকাশটা স্থির।

কথা না বলারও এক ভাষা আছে
সে ভাষায় ডুবে আছে দু’জন
পাশাপাশি বসেও দূরত্বের বিস্তার
হাওয়া যেন বহন করে অচেনা বৈরী!

জানার তেষ্টা জেগে থাকে অবিরাম
উত্তরগুলো হারায় শব্দের আগেই
তার উপস্থিতি নেই, অনুপস্থিতিও নেই
এক অদ্ভুত শূন্যতায় ঝুলে আছি আমি।

এমনও সময় ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়
কেউ তো রয়ে যায় শুধু ভাবনার ভেতর,
অহর্নিশ ভাঙা-গড়ার এই নীরব খেলায়
নিজেকেই চিনতে পারি না আর পুরোপুরি।

শেষ পর্যন্ত, বৃষ্টি নামে না
শুধু মেঘেরা ভিজে যায় নিজেদের ভেতরে
আর মানুষ,
সে তো বহু আগেই ডুবে গেছে অকথিত কথার অতল।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত