১৯ এপ্রিল ২০২৬
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
অলাত এহ্‌সান
কথাসাহিত্যিক
259

অলাত এহ্‌সান
কথাসাহিত্যিক

259

কবিতাগুচ্ছ

ডুবে গেলে মাছ ভেসে ওঠে জীবন

জলের ধর্ম

নেমে আসো, কত উপরে গিয়েছিলে
তার হৃদয়ের চৌহদ্দি-বারান্দায়
নেমে এসো ধাপে ধাপে সিঁড়ির পিচ্ছিলে
ডুবে যাও পুকুরের মতো জলের কান্নায়।

সাজানো আঙিনার প্রাচীর ঘেরা প্রশাসন
স্মৃতির-প্রাসাদে শ্বাস ফেলে শাসক
বিছানো ইটের সবটা জুড়ে শ্যাওলার আস্তরণ
পেরিয়ে যাও রাস্তার মতো দীর্ঘায়িত শোক।

কিছুই আনা হয়নি, তবু ফেরানোর দায় বলে
পার করে দাও নিকটতম সুদূরের সেতু
নিরুদ্দেশ যাত্রার হুইসেল বাজে রেলে
নিরন্তর ছুটে চলার সমান্তরাল হেতু।

খুব প্রকাশেই খুলে গেছে হৃদয়ের অন্তঃ তার
শুধুই জলের রং বদল, শুধু তরল অঙ্গীকার।

১৯ এপ্রিল ’১৮

 

ডুবে গেলে মাছ ভেসে ওঠে জীবন

বিভুরঞ্জন একটি মাছ, মেঘনায় ভেসে ওঠা
যে নদীতে এখন আর পানি-পোক্ও হাঁটে না
সেখানেই কাটিয়ে দিলেন অনেকটা কাল
বিভুরঞ্জন ডুবে গেলে ভেসে ওঠে নিরোগ দেহ,
আগের চেয়েও সারবান

বিভুরঞ্জনের লেখারা মাছের মতো রঙ্গরঙিন
মানুষের মতো ডুব দিয়ে থাকা একটা ‘খোলা চিঠি’
মৃত‍্যু না হলে যার হদিস মিলে না কোনো দিন
ভেসে উঠলে এক খোলা চিঠি হয়ে যায় মাপকাঠি!
সব মুখ বন্ধ করে দেয়া খোলা চিঠিটাই ছিল ঠিকানাহীন,
এ দেশে কীসেরই বা ঠিকানা আছে—
হেঁটে যাওয়া যাবে যার খোঁজে

একবার ঘাই মেরে ডুবে যেতে পারলেই আসল মাছ
ডুবে গিয়ে কখনো না উঠলে মানুষের জীবন
পচা জলে কতক্ষণই ডুবে থাকা! সাঁতার কাটা-ই দায়
নিথর ভেসে উঠলে স্বচ্ছ হয়ে যায় পানি, যেন আয়না
দেহ তুলে নিতে নিতে দেখা যায় সবার মুখ!

বিভুরঞ্জন একটা বৃদ্ধ মাছ,
সাঁতারের চেয়ে যার অভিমান বেশি
আকূল ভেসে থাকতে থাকতেই তিনি পরবাসী!

একটা সিদেল পড়া মাছ বিভুরঞ্জন
চৌবাচ্চায় আটকে যাওয়া ভ‍্যাদার মতো
তুমুল বৃষ্টির দিনে সঙ্গী মাছেরা যখন কাঁতরে কাঁতরে
পৌঁছে গেছে অদূরের নতুন ডোবায়
তিনি সেখানেই আটকে থাকেন জল-শ‍্যাওলায়
সুদিনের আশায়।
সুদিন! সে তো সুদূর পরাহত
তাই যখন সামনে এসে যায় অচল মেঘনা
নদীর ইতিহাস মনে করে নেমে যান বিভুরঞ্জন মাছ
অথচ ভেসে ওঠেন সেই চৌবাচ্চায়
অভুক্ত নাগরিকেরা দেখে—
এমন একটা মাছ এত দিন ঘাপটি মেরে
টিকে ছিল কাছের চৌবাচ্চায়!
চাইলেই ঢিল দিয়ে মেরে খাওয়া যেত আমোদে
এবার স্বোৎসাহে ঢিল ছুড়ে তাঁর কাঁটা খসায়
অথচ বিভুরঞ্জন আসলেই একটা মাছ
ডুবে যায়ও মাছ, ভেসে উঠেছে তাঁর জীবন।

২২ আগস্ট ’২৫, ঢাকা

 

ভয়ের দিনে ভালোবাসা

‘প্রিয়তমা—
তোমার ভালোবাসা সরকারি প্রেস নোটের মতো মিথ্যে,’
তোমার কথাগু‌লো সরকারের সংবাদ সম্মেলন মনে হয়,
দয়া করে গোপন বা‌হিনীর চাপে পড়ার মতো
প‌রিবারের কথায় তুমি কিছু বলো না
তু‌মি তো শিরদাঁড়াওয়ালা, প্র‌তিবাদ স্পৃহ জনগ‌ণ ছিলে

এই হুজুগের দিনে, এই ভয়ের দিনে
গড্ডলিকা প্রবাহে সবাই সরকারদলীয় হ‌য়ে যাক,
তু‌মি অন্তত সরকার হ‌ইয়ো না।

৫ আগস্ট ’১৮

 

সীমান্ত

যত বেশি সীমান্তের কাছাকাছি যাই
ততই দূরত্ব অনুভব করি
যত বেশি দেশের ভেতরে আসি
সীমান্তে বাড়ে দেয়াল, কাঁটাতারের ছড়াছড়ি
তাহলে উদয় হয় বোঝার উপযোগ—
রাষ্ট্র মানেই তো রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ।

১৪ অক্টোবর ’১৬

 

অপস্রিয়মাণ আলো, অপস্রিয়মাণ ছায়া

অপস্রিয়মাণ আলোয়
কখনো তার মুখ দেখা যায়, কখনো বা শরীর
কখন তাকে দেখা যাবে, আমি দাঁড়িয়ে থাকি ধীর-স্থির।
বিস্রস্ত মাটিতে গোপন বীজের কথা, সবুজ ঘাসের আস্তরণ
দূরে, সমুদ্র পারে, আছড়ে পড়ে ঢেউ, চরাচরে তারই অনুরণ।

বাতাস কুণ্ডলি পাকিয়ে ওঠে, ধুলোময়, ব্যাহত বিশ্বাসে
মাটি চাপড়ে বলি থেকো, বিশ্বাস রেখো পাখি আর ঘাসে

মাটি থেকে সৌম্য আসে, বিষাদের পরাভব;
জল থেকে আসে পেঁজা পেঁজা মায়া
নৈর্ব্যক্তিকের মতো ঝুলে থাকে সব—
অপস্রিয়মাণ আলো, অপস্রিয়মাণ ছায়া।

১০ এপ্রিল ’১৫

 

খাঁচা

হাতের ডগায় একটা পাখি বসিয়ে ফেরার পথে
এপাশে-ওপাশের অনেক খাঁচা দেখলাম,
অথচ একটা খাঁচা নিয়ে এত-অত ঘুরলাম
কোথাও একটা পাখি দেখলাম না;
যেভাবে এই বিরান শহরে একটা চারা গাছ
পুতে দেয়ার জায়গাটুকুও পাইনি কোনো দিন।

৫ জানুয়ারি ১৯

 

ধুলো জীবন

পথের ধুলো আকাশে উড়ে গেলে মেঘের মতো লাগে
নীহারিকায় ধুলিপুঞ্জ জমে, সন্ধ্যা করে আসে
আমিও ভাবি, পায়ে পায়ে আকাশে উড়ে যাব
কত কাল আর এভাবে পড়ে থাকা,
লোকে বলে, চেষ্টা করেও তোমার মূল্য না বাড়লে জায়গা বদল করো
মাছির মতো বাটখাড়া ছেড়ে সোনার পাল্লায় বসো
আমি কূল থেকে জলে নামি, জল থেকে বাষ্প হয়ে যাই
কোথায় আমার স্থান, কি মূল্য, কে বুঝিয়ে দিবে!
ধুলো মেঘের আকাশই বা কোথায়? কত ওপরে?

১ মার্চ ’২৬

10 Comments. Leave new

  • Chader Pahar Book Cafe
    20 April 2026 6:49 pm

    গল্পকারের কবিতায় দম আছে। শুভ কামনা 🌿

    Reply
  • আহসানুল করিম
    20 April 2026 9:43 pm

    গল্পকার বলেন কবিতা তাঁর গোপন মুদ্রাদোষ, একান্তে চর্চার শিল্প। কিন্তু পড়ে মনে হলো, মাঝে মাঝে এদেরকে প্রকাশের আলোয় আনা খুব প্রয়োজন। কেননা কবিতায় তিনি ব্যক্তিগত অনুভূতি আর বৃহত্তর বাস্তবতার মাঝে যেভাবে আসা যাওয়া করেন, তা আমরা পাঠকরা এক্সপেরিয়েন্স করতে চাই।

    যদিও কবিতাগুলো নানান সময়ে লেখা (আমরা সময়কাল দেখে বুঝতে পারি সমকালীন ঘটোনাপ্রবাহ দিয়ে কতটা তাড়িত হয়ে ‘ডুবে গেলে মাছ ভেসে ওঠে জীবন’ বা ‘ভয়ের দিনে ভালোবাসা’ লেখা হয়েছে), তারপরও কিছু কিছু মোটিফ ফিরে ফিরে এসে কবিতাগুলোকে যেন এক সুতোয় বেঁধেছে।

    Reply
  • Mostaque Ahmed
    20 April 2026 11:47 pm

    বিভুরঞ্জন মাছটি অমর হয়ে থাকলেন।

    Reply
  • প্রিয় কবি! প্রেমেরও যে বিদ্রোহী কবিতা হয় তা তোমার কবিতা না পড়লে বোঝাই হতো না।

    Reply
  • Fahad Wayne
    21 April 2026 1:07 am

    খাঁচা কবিতাটা পড়ে দম আটকে গেল। সহজ ভাষায় কী লিখলেন এটা? আসলেই তো!

    Reply
  • বিন্দু আহমেদ
    21 April 2026 2:23 am

    আপনার লেখা আমার সবসময় ভালো লাগে আর কবিতাতো অনন্য উপস্থাপন আপনার
    শেয়ার করার জন্যে অনেক ধন্যবাদ
    ভীষণ ভালো পড়লাম

    Reply
  • Mohammad Ashrafull
    21 April 2026 12:27 pm

    দারুণ!

    Reply
  • আলী আফজাল খান
    21 April 2026 11:55 pm

    ভালো লাগছে অলাত

    Reply
  • খালেদ চৌধুরী
    23 April 2026 1:07 pm

    কবিতা ভালো লাগছে। আরও আরও কবিতা হোক।

    Reply
  • এ দেশে কীসেরই বা ঠিকানা আছে—
    হেঁটে যাওয়া যাবে যার খোঁজে

    Reply

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত