১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
Projapoti and other Poems by Nirzhar Noishabdya-Meghchil
শিল্পকর্ম :
নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
কবি ও চিত্রশিল্পী
227

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
কবি ও চিত্রশিল্পী

227

রক্তজবা ও কতিপয় কবিতা

প্রতারক পথ

পথ কুড়িয়ে এনে ঘরে রেখে দিই। ধূলি ঝাড়ি। দুয়েকটা পথ বারান্দায় বিছিয়ে দিই আড়া-আড়ি করে। সাড়ে তিন হাত বারান্দা দীর্ঘ হয়ে দিগন্তের দিকে চলে যায়, ভাবি। দিগন্তেই সব আছে জেনে আমি গভীর মন খারাপ করে হাঁটি। রাত ভেঙে, ভোর ভেঙে হাঁটি আর হাঁটি। শহর ফেলে, মাঠ, ঝিলিমিল ঝিলপাড়ের সূর্যচ্ছায়া, হাঁসপাখিদের গ্রামের স্মৃতি, পুকুর আর পাকুড়ের গন্ধ চিরে যাই বনে, নিমফুলের দিকে।

নিমফুল ছুঁতে গিয়ে দেখি, এই ফুল আমার ঘরের দেওয়ালে ছবি হয়ে ঝুলে আছে। কবে কোন সুতীব্র একলা রাতের রং গুলে এই ছবি এঁকে রেখেছি! মনে নেই। আমার চোখ ফুল থেকে প্রতারক পথের পায়ে নামে। দেখি, বাহিরের রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে যেই পথ ঘরে বিছিয়েছি, সেই পথ বৃত্ত হয়ে আছে।

২১-১১-২৫

 

বনে

আমি জানি, পাতা ঝরার দিন এলে সে এসে আবারও আমাকে বনে নিয়ে যাবে। সে কে তা অবশ্য জানি না কিছুই। তবু এইসব ভাবতে ভালো লাগে। হাতের আঙুলের ভাঁজে আঙুল ডুবিয়ে পাশাপাশি বসে থাকি শাদা সন্ধ্যার অপেক্ষায়। বনের মাঝে একটা ছাইরং পথ পাহাড়ের দিকে উঠে যায় পাহাড়ের এক চিলতে চাতালে। ওইখানে একা এক ঘাসফড়িং পরি হয়ে ফুল হয়ে পাতা হয়ে নৃত্য হয়ে গান হয়ে চক্রমন শেষ করে থির হয়ে আছে, শাদা হয়ে আছে, কাদা হয়ে আছে।

সে আর আমি একটা পাতার পুকুরে চোখ রেখে নিজেদের বুকের ভেতর রাস্তা ভেঙে কৈশোরে ফিরে যাচ্ছি একটা টকটকে লাল খাতা হাতে। আমাদের হাত হয়ে উঠে বাদামি ঝরাপাতার ভাই, ঝরাপাতার টলটলে চোখে আমাদের হাত ডুবে যায়, আমাদের পা ডুবে যায়। আর সন্ধ্যা আসে। সন্ধ্যার গায়ে কুয়াশার শাদা শাড়ি। আমরা সন্ধ্যার শাড়ি গায়ে জড়িয়ে ভাবি দিঘল এক ধানখেত, ধানখেতে বাতাস।

সে কে তা জানি না। তবু এইসব ভাবতে ভালো লাগে, পাতা ঝরার দিন এলে সে এসে আবারও আমাকে নিয়ে যাবে বনে, তেমনই সঙ্গোপনে।

১৩-১১-২৫

 

ঘ্রাণের খঞ্জর

আমি যেখানে থাকি, তার পরের গলিতেই একটা ছাতিমগাছ। এই সময় কী ভয়ানক আর নিষ্ঠুরভাবেই না দাঁড়িয়ে থাকে! দাঁড়িয়ে থাকে ফুল আর ঘ্রাণের খঞ্জর নিয়ে। আমি তাকে এড়াই কেমন করে?

গাছটার কিছু একটা সমাধান নিশ্চিত করে যেতে পারত সে! ছেড়ে গেছে, ফেলে গেছে ঘ্রাণ। এমন নিষ্ঠুর কেমন করে হতে পারে আকাশের গান?

২১-১০-২৫

 

জাদুকরের বিশ্বাস

কত জাদু যে দেখতে হয় প্রতিনিয়ত! দেখে দেখে মনে হয়, কী ক্লিশে! মনে মনে হাসি। আর তোমাকে মনে পড়ে।

পৃথিবীর সবথেকে বড়ো বড়ো জাদুকরকেও দেখেছি আমি কেমন করে তাদের হাতের তালু দীর্ণ করে গজিয়ে উঠছে মধুমঞ্জুরি। এমন সব ইন্দ্রজাল দেখেও আমার তুচ্ছই মনে হয়েছে কেন কেবল তুমিই জানো। একমাত্র তুমিই জানো যে, আমিই সেই জাদুকর, এমন জাদু আর কেউই পারে না।

মাঝে মাঝে এইসব দেখে নিজেকে প্রমাণ করতে মন করে। কিন্তু সাক্ষি যে কেবল তুমি! যে তুমি আমার সাক্ষি, তুমি তো প্রমাণ আর অপ্রমাণের উর্ধ্বে। অরূপ তুমি, আমার একমাত্র বিশ্বাসেই করো বসবাস।

১৬-১০-২৫

 

রক্তজবা

হাতে আঁকা রাতে একটা রক্তজবা এঁকে রাখি। এই ফুল কে ভালোবাসে তা আমিই জানি। রং চাপানোর আগে এই জবা শাদাই থাকে। কেউ ভালোবাসে বলে প্যালেটে রঙের বদলে রক্ত রাখি, বাম হাতের কবজি থেকে সবুজাভ একটা শিরা চিরে রক্তের রং নিই। তারপর আমার শাদাজবা হয়ে ওঠে নিদারুণ এক রক্তজবা।

সন্ধ্যায় একটা রাত্রি আঁকি। এঁকেই তার ভেতর ঢুকে পড়ি সন্ধ্যার সিড়ি ভেঙে। তারপর সেই হাতে আঁকা রাতের ভেতর বসে একটা বন আঁকি। বনকে ঘিরে আঁকি পাহাড়। বনপাহাড়ের ভাঁজে একফালি নির্ঝর, কারো চুলের ফিতে হয়ে ঝরে ঝরনার জল। ঝরনা নদী হয়ে উত্তরের দিকে ধায়। কেন ধায়? নদীকে যেতে দিয়ে আমি রক্তজবা আঁকি। তারপর এই নিত্যকুসুম যে ভালোবাসে, তার অপেক্ষায় থাকি, চিরদিন থাকি।

০৫-১১-২৫

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত