হাড়ে কয়লায় গহনা
আগুন খেতে যাচ্ছে ওরা আগুনে আশ্রয়,
জিহ্বাতে নেই জল পিপাসা পাঁজরে নেই ভয়!
মৃত্যু ওঠে মৃত্যু নামে দণ্ডিত সংসার,
কলসি গলায় নদীর পাড়ে কলসি গলার হার!
বেঁচে থাকার পুতুল নাচে কারখানা হুইসেল,
সলতে আছে অন্ধকারে প্রদীপে নেই তেল!
সেই ঘরেতে ব্যাঙের বিয়ে হাড়ির মধ্যে লাফ,
বাইরে আছে ফণা তুলে ক্ষুধার্ত এক সাপ!
সাপ ডিঙিয়ে বাপ ডিঙিয়ে মালিকে বন্দি,
উপর নিচে ঢেউ খেলে না এমনই ফন্দি!
মন পুড়ে যায় ঘর পুড়ে যায় ভাত পুড়ে যায় রোজ,
হাড়ের বাঁশি কয়লা হলে কেউ করে না খোঁজ!
আগুন খেয়ে বেঁচে আছে এখনো মজদুর,
বাকির খাতা ভস্মে ভরা স্লোগানে নেই সুর!
২৯ এপ্রিল ’২২
মাইক্রোফোনে বিপন্ন আমি
উপস্থিত ভাই ও বোনেরা আমার,
আপনাদেরকে আমি কি দেবো আশ্বাস?
আমি আপনাদের পাশে আছি, এইটুকু বলার ক্ষমতা আমার আছে!
এর বাইরে আমি জানি, বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলের সংখ্যা!
এর বাইরে আমি বলতে পারি বেকার হয়ে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা!
এর বাইরে আমি হিসেব কষে দেখিয়ে দিতে পারি বেরোজগেরে হয়ে যাওয়া পরিবারের সংখ্যা! অচল হয়ে যাওয়া চায়ের দোকান, মুদিখানা, ভাতের হোটেল, স্থায়ী শ্রমিক আর অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা আমি বলতে পারি! অংক করে দেখাতে পারি লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্রমিক সন্তানদের সংখ্যা এবং মোট বকেয়া টাকার পরিমাণ আমি মুখস্ত বলতে পারি!
কিন্তু ভাই ও বোনেরা আমার,
আমি বলতে পারি না এই মিলগুলোয় আবার হুইসেল ফেরাবার আশ্বাস!
কি করে ফেরাবো বলুন রাক্ষুসে মালিকের মুখ থেকে এমন শিকার?
আমি জানি আমার প্রস্তাব সরকার বা মালিকপক্ষ মেনে নেবেন না! ইনসাফকে চোখ বেঁধে বহুদিন আগে তুলে নিয়ে গেছে কালো রাত!
বরং এখন আমি বলতে চাই, মালিকের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনতে হবে, দখল করে নিতে হবে নিজের পাওনা অধিকার!
আমি হৃদয়কে সঙ্গে করে এনেছি আপনাদের বেদনার সমাবেশে,
আমার দুহাত আপনারা নিন,
আমার জবান আপনারা নিন, আপনাদের লড়াইয়ে;
ছিন্নভিন্ন করে ফেলুন ষড়যন্ত্রকারীদের চোয়াল–চিবুক!
পুলিশ পেটাতে এলে আমি বুক পেতে দিতে রাজি, চিৎকার দিয়ে বলতে রাজি,
‘দুনিয়ার মজদুর এক হও!’
কিন্তু ভাই ও বোনেরা আমার,
লড়াইটা আপনার, আপনাকেই লড়তে হবে! আপনার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকবো আমি! কিন্তু আপনার হাঁড়ির ভাত আপনাকেই ছিনিয়ে আনতে হবে! আমার পাঁজর আপনার জন্য গুলি খেতে প্রস্তুত, তবু আপনাকেই হতে হবে মালিকের মুখোমুখি হিংস্রতার সমান হিংস্র! জোট বেঁধে হতে হবে ভয়ানক যৌথ! নইলে মজদুরের হেরে যাওয়ার খেলায় আবার আপনারা হেরে যাবেন!
আমরা তো ভুলি নি, রানা প্লাজার দুঃসহ স্মৃতি, তাজরিনের কান্না, আদমজির দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া, খালিশপুরের হাহাকার! গণিকা খাতায় লেখা শ্রমিক কন্যাদের নাম! মে দিবসের ইতিহাস!
বেদনার শৃঙ্খল পরে, এই রাজপথে বারবার লাল সালাম দিই… রক্তের দাগ মুছে মুছে!
ভাই ও বোনেরা আমার,
শ্রমিকের ঘামের লড়াই শ্রমিককে লুটে নিতে হবে আজ!
মে দিবসের গানে কবিতায় শ্লোগানে আপনার মুক্তি আসবে না, আপনারা যদি একজোট হয়ে না থাকেন! আমি তো হৃদয় নিয়ে এসেছি কেবল আপনাদের মানুষ হয়ে, আপনাদের মুষ্টিবদ্ধ হাতের ভিতর আমার হাত, আপনাদের মিলিত শ্লোগানের মধ্যে আমার কণ্ঠ, আমার ধমনিতে আপনাদের কল্লোল! আপনারা যখন বলেন, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও!’ তখন আমার বুক আপনাদের পিছন পিছন হেঁটে যায়! তখন আমি দেখি, আপনারা আপনাদের পাওনা বুঝে নিচ্ছেন, আপনারা আপনাদের হক ছিনিয়ে নিচ্ছেন! এছাড়া আজ আর আপনাদের আমি কি বলতে পারি বলুন? আশ্বাস দেবার মতন একটি শ্লোগান শুধু আমি বলতে পারি, বিশ্বাস রাখার মতোন একটি উচ্চারণ শুধু আমি বলতে পারি,
‘দুনিয়ার মজদুর এক হও! লড়াই করো!
এক হও লড়াই করো, দুনিয়ার মজদুর!’
কেননা, লড়াই ছাড়া লুটেরার দুনিয়ায় শ্রমিকের আপাতত মুক্তির পথ খোলা নেই!
২৮ এপ্রিল ’২২
ব্যাঙের ছাতা
পিচ পোড়া দিন ঝলসানো রোদ
তুমুল হাহাকার,
ব্যাঙের মাথার শেষ ছাতাটা হয়েছে ছারখার।
রাস্তা জুড়ে বসে আছে হাজার খানেক মুখ;
মুখগুলোতে ভাতের চিন্তা রাক্ষুসে অসুখ!
কারখানাতে বন্ধ নোটিশ
পাওনা খাতায় তালা,
সর্বনাশের চুলোয় হাড়ি
বলির কাঠে মালা।
পেটের মধ্যে দৈত্য দানো
মানছে না আশ্বাস,
মিথ্যে কথার ষোলো গুটি
মিথ্যে রাজার তাস।
যার গোলাতে ধানের পাহাড়
তার ঘরেতে রাণী,
যার জোটে না ফুলের গন্ধ
তার চোখেতে ছানি!
যার ঘামে রোজ ঘোরে চাকা
তার কপালে ছাই!
মুচকি হেসে কাক উড়ে যায়
ভাতের দেখা নাই!
পিচ পোড়া দিন ঝলসানো রোদ
তুমুল হাহাকার,
শ্লোগান উঠছে শ্লোগান নামছে
হচ্ছে না ছারখার।
২৯ এপ্রিল ২৬





















































