একসাথে একাধিক ও ভিন্ন ধরণের বই পড়ার নতুন একটা অভ্যাস রপ্ত করতে হয়েছে। এই সমান্তরাল পাঠের সাথে অনভ্যাসের কারণে অলাত এহ্সানের ‘অনভ্যাসের দিনে’ পড়া শেষ করতে অস্বাভাবিক রকমের বেশি সময় লেগে গেল, আর সে কারণেই পাঠ প্রতিক্রিয়াটি হয়ে দাঁড়াচ্ছে অনেকটা বিভক্ত কিছু অনুভূতি জোড়া দেয়ার মতো।
অলাত এহ্সান পাঠকদেরকে বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতির গোলকধাঁধায় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বুঝিয়ে দেন, তাঁদের জন্যে একটি নিরাপদ, আনন্দঘন, আত্ম-উন্নতির বিশ্ব কেউ রচনা করে দেবে না, নিজের প্রাপ্য নিজেকেই আদায় করে নিতে হবে। এখানে অলাত এহ্সান, প্রথম গল্পগ্রন্থের গল্পকার হিসেবে, রাগী যুবকের মতোই কিছুটা ‘রাগী লেখক’ হিসেবে দেখা দিয়েছেন।
এই বইয়ের অনেকগুলো গল্পই জাদুবাস্তবতার বিভঙ্গে নিজেকে মেলে ধরেছে, ওই যে বললাম— দেশের বিভিন্ন ল্যাবিরিন্থের প্রেক্ষাপটে এটাই গল্পলেখকের উপযুক্ত ভাষা হয়ে উঠেছে সে-সকল গল্পে। অলাত এহ্সান গল্পের চরিত্রদের নিয়ে কৌতুকও করেননি তা নয়, কিন্তু সেসব দম ফাটিয়ে হাসার মতো নয়, কৌতুকটা মনে মনে উপভোগ ক’রে কৌতুকময় আবহের পিছু পিছু একটা অজানা আশঙ্কায় পরের অনুচ্ছেদে চোখ রাখতে ব্যস্ত হতে হয়। চরিত্রদের মনস্তত্ত্ব, যৌনতা, অবদমন, রুখে দাঁড়ানো, স্বরূপে আত্মপ্রকাশের প্রবণতা গল্পগুলোকে কত অভাবিত দিকে নিয়ে গেছে।
লেখকের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ইতোমধ্যে বেরিয়ে গেছে, যদিও আমার পড়ার সুযোগ হয়নি। অলাতের ভাষা গতিময়। প্রথম বইয়ের গল্পগুলোতে তিনি কিছু রূপক সৃষ্টি করতে চেয়েছেন, কিন্তু গল্পের ভাষার গতিশীলতাকে অনেকগুলো রূপকই বাধাগ্রস্ত করেছে বলে পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে। পাঠ থমকে গেছে কেননা মনে হয়েছে রূপকগুলো স্বতঃস্ফূর্ত বা প্রাসঙ্গিক হতে পারেনি সব সময়। কিছু মুদ্রণ প্রমাদ আছে। এছাড়া আমার যেটা চোখে লেগেছে—গল্পের বইটির ফ্ল্যাপে একটা বই পরিচিতি ছিল, তারপরেও একটি জ্ঞানগর্ভ ভূমিকা পড়ে আমি বরং বইটির প্রতি দূরত্বই অনুভব করেছিলাম। লেখাটি, লেখক চাইলে, বরং পরিশিষ্টে যেতে পারতো। লেখকের বক্তব্যটি যেতে পারত ‘ভূমিকা’য়। এমন একটা গল্পের বইয়ে ভূমিকা অপ্রয়োজনীয় বলেই আমার মনে হয়েছে। তবে পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ হেতু লেখকের কিছু কৈফিয়ত থাকে, সেটা সামনে দিলেই যথার্থ হতো। এই কয়টা অপছন্দের তালিকা আমার; এছাড়া গল্পকারের প্রথম বই হিসেবে অনভ্যাসের দিনে একটি প্রতিভাধর, সৃষ্টিময় ও প্রতিশ্রুতিময় সংকলন।

প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত, প্রথম প্রকাশ: ২০১৮ [প্রকৃতি]
নতুন সংস্করণ: ২০২৪, প্রকাশক: অর্জন প্রকাশন, মুদ্রণ মূল্য: ৩৫০ টাকা।
আলোকচিত্র: সৈয়দ আশরাফুল আলম
সংগ্রহের লিংক: www.rokomari.com/book/393339
ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের পাঠ অভ্যাস, রুচি, পছন্দ, বয়স কিংবা পাঠের ব্যাপ্তির কারণে একটা বই ভিন্ন ভিন্নভাবে পাঠকের কাছে অবমুক্ত হয়। যেমন, আমি যে কয়টি গল্প পড়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, অন্য পাঠকের পছন্দ হয়তো সেগুলো না হয়ে অন্যগুলো হতে পারে। ‘অন্ধ হয়ে যাওয়ার রাতটি’ কিংবা ‘ নীলগিরি পাহাড়ে সবুজের পুনরাবৃত্তি’ গল্পদুটোকে আমি সরলভাবে পছন্দের দিক দিয়ে এগিয়ে রাখলেও অনবদ্য অন্তর্বয়নের কাজ হিসেবে ‘কেউ দেখছে’ বা ‘গল্পটা আগেই লেখা হয়েছিল’ গল্পদুটিকে বেছে নেবো। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে গল্পের দোহাই দিয়ে ‘গল্পটা আগেই’ লেখা হয়েছে, অন্য এক গল্পকারের সেই গল্পটাও আমার পড়া বলে বেশি প্রীত হয়েছি! মহাদেব সাহার কবিতায় প্রেমিক যেমন বলেন, ‘বর্ণনা আলস্য লাগে’, অলাতের কলমে সেই আলস্য নেই, দৃশ্যকে ফুটিয়ে তুলতে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে লেগে থাকেন। গ্রামীণ ও স্থানীয় ডায়ালেক্ট ও প্রবাদ-প্রবচন ব্যবহার তার আরেকটা জোরালো দিক।
এই সংকলনের দীর্ঘতম গল্প ‘আশার বসতি’। এই গল্পে মনস্তাত্ত্বিক খেলার সাথে সাম্প্রতিক কালের নির্লজ্জ ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক খেলার দ্বন্দ্ব আছে, শুরুতেই যে গোলকধাঁধার কথা বলেছি। গল্পের বিদেশ প্রত্যাগতের প্রথম দিনের ঘটনাতেই শেষ পরিণতি কিছুটা অনুমেয় ছিল, কেননা অলাত এহ্সান দিনটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন কাহিনি-সিবন-প্রতিভার উৎকৃষ্ট সুতো দিয়ে। কিন্তু শেষ দু’ পৃষ্ঠায় যেভাবে বিনাইন (নির্দোষ) এক ল্যাবিরিন্থের মধ্যে তাকে দৌড় করিয়ে গল্পের মূল ম্যালিগন্যান্ট (বিধ্বংসী) ল্যাবিরিন্থের প্রতিধ্বনি করিয়ে একটা উপসংহারে নিয়ে এলেন, সেটা ছিল অবিশ্বাস্য মুন্সিয়ানার পরিচায়ক।
আমাদের সমাজ ভেতর থেকে, বাইরে থেকে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। কোনো ধরনের সংখ্যা লঘিষ্ঠ পরিচয় কিংবা দারিদ্রের কারণে মানুষের সেই সব অনাকাঙ্খিত পরিবর্তন মেনেও নিতে হচ্ছে বেঁচে থাকবার তাগিদে। চোখে দেখলেও আমরা কতকিছু এড়িয়ে যাই। নির্বিবাদ শিল্পসৃষ্টিতে মগ্ন হই। কিন্তু অলাত একজন সাহসী লেখক। সমাজকে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, লেখার ক্ষমতা, শিল্পিতভাবে প্রকাশের সাহস— এই তিনটি গুণের সমাপতন সব লেখকের মধ্যে নাই; অলাতের তিনটাই আছে। আমার মনে হয়েছে, অলাত এহ্সান এক-একটা গল্প লেখেন, আর নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে তাঁরই গল্পের চরিত্র কিশোর সুমনের মতো স্মার্টফোনের নীলাভ পর্দায় ‘ক্ল্যাশ অব ক্ল্যানস’ খেলতে থাকেন!












































