৪ মার্চ ২০২৬
দুই শ বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মনীষীদের নির্বাচিত রচনা নিয়ে প্রকাশিত হলো ‘বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ’। বিপুল এই আয়োজন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের গত দুই যুগের প্রয়াসের ফল। ১৬টি বিষয়ে গ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে দুই শতাধিক খণ্ডে
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
আহমাদ মাযহার
প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অনুবাদক
18

আহমাদ মাযহার
প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অনুবাদক

18

এক অবস্তুগত লাভের কাহিনি

আমার নিয়তি এমনই যে, হয় আমি নিজের আগ্রহে যুক্ত হয়েছি কিংবা আহ্বান পেয়েছি এমন কাজে যেখানে আর্থিক প্রণোদনা কখনোই মুখ্য বিষয় নয়। দেখা গেছে সেসব কাজে পরিশ্রম করেছি বলে, প্রশংসিতও হয়েছি অনেকের দ্বারা; কিন্তু বস্তুগত লাভ হয়ইনি প্রায়। এমনি এক অবস্তুগত লাভজনক কাজ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ’ প্রকল্পের সঙ্গে আমার যুক্ততা! নিকটজনেরা জানেন প্রতিষ্ঠানটির গঠন যুগে দীর্ঘ ১৭ বছর যুক্ত ছিলাম। সে সময় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যেমন তেমনি আমিও নিজে নিদারুণ আর্থিক সংকটে দিন পার করেছি। কেন্দ্র যেমন তেমনি আমিও এগিয়েছি তিল তিল করে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি যাপনের মধ্য দিয়ে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বিচিত্র কাজের ক্ষেত্র ছিল আমার যাপিত জীবন বোঝার পাঠশালা। এক সময় জীবনের বাস্তব কুহকের নির্দেশনায় সে পাঠশালার সঙ্গেকার সরাসরি কর্মসম্পর্ক ছেড়ে যেতে হয় আমাকে। কিন্তু বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যে মর্মের সঙ্গে আমার যোগ তার থেকে তো আর দূরে থাকা যায় না। ২০০০ সালে সায়ীদ স্যার পরিকল্পনা করলেন, বাংলা ভাষার চিন্তামূলক রচনার একটি মহাসংকলন করবেন যাতে মানবিক বিদ্যার চিন্তামূলক যেসব রচনা খুঁজে বের করে পড়া অনেক সমস্যাজনক বা দুষ্প্রাপ্য সেসব রচনা যেন হয় সহজলভ্য। টানা বছর পাঁচেক চলেছিল পড়ে পড়ে সেসব রচনা খোঁজার কাজ। যতদূর মনে পড়ছে আমি নিয়মিত ছিলাম বছর তিনেক। কিন্তু কেবল পড়ে রচনা বের করাই তো যথেষ্ট নয়, প্রতিটি রচনার সারসংক্ষেপ লিখতে হয়েছে। সেগুলোকে গুছিয়ে পাণ্ডুলিপি করা এক ঝকমারি। কম্পোজ করতে হয়েছে সে পাণ্ডুলিপি থেকে, সম্পন্ন করতে হয়েছে প্রামাণ্যকরণ ও উৎসনির্দেশ। সমাধান করতে হয়েছে সম্পাদনার অজস্র জটিলতার। সব সেরে বই প্রকাশ করতে ২৫ বছর লেগে গেল!

আমি যা পড়েছিলাম তার মধ্য থেকে সমাজচিন্তামূলক রচনাগুলো একত্র করব এমন ভাবা হয়েছিল। পরে আরো নির্দিষ্ট করা হয়, আমি বাঙালি মুসলমান সমাজ বিষয়ের রচনাগুলো সংগ্রহ করলাম। আরো দুজন সমাজচিন্তার অন্য রচনা সংগ্রহ করেছেন। আমার নির্বাচিত বেশ কিছু রচনা বেশি প্রাসঙ্গিক হওয়ায় নারী, রাজনীতি কিংবা ইতিহাস বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সমাজচিন্তামূলক রচনার সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ১১ খণ্ডে। ১ম থেকে ৫ম খণ্ডের সম্পাদক শিপ্রা সরকার, ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম খণ্ড আমার সম্পাদিত ও পরের ৯ম থেকে ১১শ খণ্ডের সম্পাদক কুদরত-ই-হুদা।

বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ by বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
পুরো সেটটির মূল্য ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা। শুধু সমাজচিন্তার ১১খণ্ডও সংগ্রহ করা যাবে। এই ১১খণ্ডের মূল্য ১০, ১৯০ টাকা!
সংগ্রহের জন্য: https://bcrs.bskbd.org/book-purchase

১ম থেকে ৫ম খণ্ডে সংকলিত হয়েছে হিন্দুসমাজ সম্পর্কিত চিন্তা। এই ৫ খণ্ডের জন্য একটি সাধারণ দীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন যতীন সরকার। আলাদা আলাদা ভাবে এই ৫ খণ্ডের প্রতিখণ্ডের জন্য ছোট ভূমিকাও লিখেছেন যতীন সরকারই। ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম খণ্ডের দীর্ঘ সাধারণ ভূমিকাটি আমারই লেখা এবং প্রতি খণ্ডের সম্পাদকীয় ভূমিকাও তো লিখেছি আমিই। ৯ম থেকে ১১শ খণ্ডের দীর্ঘ সাধারণ ভূমিকা ও প্রতি খণ্ডের সম্পাদকীয় ভূমিকা লিখেছেন কুদরত-ই-হুদা। তাঁর খণ্ডের বিষয় বাঙালির নবজাগরণ চিন্তা।

আমার এই লেখা কেবল আমার সম্পাদিত খণ্ডগুলোর কথা বন্ধুদের জানানো নয়। মোট ২০৯ খণ্ডের বইগুলোর কথাও মনে করিয়ে দেয়া!
গত ২০০ বছরের বাঙালি চিন্তার এই অনন্য সংকলনের সম্পূর্ণ সেট, ২০৯ খণ্ড একত্রে অথবা বিষয় ভিত্তিক সেট সংগ্রহ করা যাবে। সংগ্রহের বিষয়গুলো হলো, অর্থনীতি, ইতিহাস, চলচ্চিত্র, দর্শন, ধর্ম, নারী, পরিবেশ, বিজ্ঞান, ভাষা, রাজনীতি, শিক্ষা, শিল্প, সংগীত, সংস্কৃতি, সমাজ ও সাহিত্য।

যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেটা দিয়ে শেষ করি। জীবনে কত কাজে আমাদের কেবল সময়ই ব্যয় হয়, অর্জন আর হয় না। এই কাজটির জন্য কয়েক হাজার পৃষ্ঠা আমাকে পড়তে হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে অন্য সম্পাদকদের সামনে তুলে ধরতে হয়েছে আমার পাঠের অভিজ্ঞতা। করতে হয়েছে প্রতিটি রচনার সারসংক্ষেপ। আমি মনে করি এসবই আমার জ্ঞানানুশীলন। এই দীর্ঘ অনুশীলন আমাকে কেবল সমৃদ্ধই করেছে।

সুতরাং অবস্তুগত লাভকে আমলে না নিয়ে আমি নিয়তিকে শুধু দোষারোপ করি কী করে!

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত