এখানে থেমো না: ক্যান্সার লড়াকুদের বয়ান

জীবনের জয়গান, চিকিৎসাব্যবস্থার ব্যবচ্ছেদ এবং আগামীর রূপরেখা

ক্যান্সার—শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথেই ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের ওপর নেমে আসে এক অবর্ণনীয় মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং গ্লোবোক্যান (Globocan)-এর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রায় লক্ষাধিক মানুষ এই রোগে মৃত্যুবরণ করছেন। এমন একটি ভয়াবহ জাতীয় এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন (সিসিসিএফ)-এর উদ্যোগে এবং ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) থেকে প্রকাশিত ‘এখানে থেমো না: ক্যান্সার লড়াকুদের বয়ান’ বইটি নিছক কোনো প্রবন্ধের সংকলন নয়; এটি বাংলাদেশের ভঙ্গুর চিকিৎসাব্যবস্থার একটি প্রামাণ্য দলিল এবং স্বাস্থ্য অধিকার আদায়ের ইশতেহার।

বইটিতে ৪২ জন ক্যান্সার লড়াকু, সারভাইভার, চিকিৎসাকর্মী এবং রোগীর স্বজনদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। যেখানে মৃত্যুভয়কে জয় করে জীবনের জয়গান গাওয়ার অদম্য বাসনা যেমন আছে, তেমনি আছে ভুল চিকিৎসা, চিকিৎসকদের অবহেলা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা।

আমাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ঘাটতিগুলোর একটি হলো ‘ডাক্তার-রোগী সম্পর্ক’ এবং রোগীকে তার রোগের বিষয়ে অবগত করার পদ্ধতি। রোকশানা আফরোজ তার ‘আমার ক্যান্সার কাউন্সিলর হয়ে ওঠার গল্প’ প্রবন্ধে লিখেছেন—

‘২৬ ফেব্রুয়ারি কোন ভূমিকা ছাড়াই আমাকে জানানো হলো, আমার ক্যান্সার ৪র্থ পর্যায়ে। ওভারিতে প্রথমে কেমো দেওয়া হবে, পরে সার্জারি করা হবে। আমি সুবোধ মেয়ের মতো মাথা নাড়লাম। কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে দেখি ভয়াবহ অবস্থা! আমার মাথার কাছে বসা ছিলেন আম্মা, মুহূর্তে অসুস্থ হয়ে গেলেন। মাথায় পানি দেওয়া, ডাক্তার ডাকা, দৌড়াদৌড়ি। আমার জীবন সাথী যাকে সবাই রোবট বলে, চোখের পানি ঢাকতে ছুটে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। কিছুদিন আগে দুইদিনের প্রশিক্ষণ সেশন করেছিলাম প্যালিয়েটিভ কেয়ারের উপর। সেখানে—Breaking the bad news বা দুঃসংবাদ দেওয়ার রীতি সম্পর্কে…’

বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি চরম অমানবিক দিককে উন্মোচিত করে এই কথাগুলো। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘ব্রেকিং ব্যাড নিউজ’ একটি সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রটোকল, যা উন্নত বিশ্বে কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। একজন রোগীকে যখন জানানো হয় যে তিনি টার্মিনাল বা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত, তখন সেই সংবাদটি কীভাবে দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর রোগীর ভবিষ্যৎ মানসিক শক্তি নির্ভর করে। রোকশানা আফরোজের ক্ষেত্রে আমরা দেখি, চিকিৎসক কোনো রকম মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি ছাড়াই একটি চরম সত্য ছুঁড়ে দিয়েছেন। এর ফলে শুধু রোগী নয়, পুরো পরিবার একটি মানসিক ট্রমার ভেতর দিয়ে গেছে। আমাদের দেশের মেডিকেল কারিকুলামে ‘ক্লিনিক্যাল কমিউনিকেশন স্কিলে’র অভাব যে কতটা প্রকট, এই ক্ষুদ্র অনুচ্ছেদটি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। চিকিৎসকরা অনেক ক্ষেত্রেই রোগীকে একটি ‘কেস’ হিসেবে দেখেন, রক্তমাংসের সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে নয়।

দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট কেন তৈরি হয়েছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ডা. সারওয়ার আলীর ‘ক্যান্সারে বসত’ প্রবন্ধে। তিনি একজন প্রথিতযশা চিকিৎসক হয়েও দেশের ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে লিখেছেন—

‘আমাদের দেশে চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগীর সেবা বিষয়ক পুরো ব্যাপারটিতে আরও উন্নতি করা প্রয়োজন। রোগীদের কথা শোনা এবং রোগীদের প্রতি মনোযোগ ও সময় দেয়া জরুরি। সেই সঙ্গে রোগীর সন্তুষ্টির বিষয়টি খেয়াল করাও জরুরি। আমি মনে করি, নানা ধরনের ক্যান্সার যেহেতু দিনকে দিন বেড়েই চলেছে; দেশে সব ধরনের ক্যান্সারের মানসম্মত পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের প্রয়োজন।’

একই সুর অনুরণিত হয়েছে আইনজীবী দেবাহুতি চক্রবর্তীর লেখায়। তিনি ক্যান্সারকে কেবল একটি জৈবিক রোগ নয়, বরং সমাজ ও পুঁজিবাদের উপজাত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন—

‘আমাদের খাদ্য, পরিবেশ, জল-হাওয়া, চিকিৎসার অভাব, আমাদের ওপর নিত্য মানসিক চাপ সব মিলিয়ে প্রতিদিনের নিঃশ্বাস জুড়ে রয়েছে কার্সিনোজেনের বিস্তারিত জাল। একটা সময় অবধি চারপাশের এই বিস্তৃতিকে সহনীয় করে নেয় আমাদের শরীর। একটা সময় প্রতিরোধ ক্ষমতাও হারিয়ে যায়। স্বাস্থ্য অধিকার যে আমাদের মৌলিক অধিকার সেটা শুধু কেতাবে লেখা। ক্যান্সার চিকিৎসার এই ব্যয়বহুলতার বড় কারণ আন্তর্জাতিক মুনাফাখোরদের ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি।’

ডা. সারওয়ার আলীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশে ক্যান্সারের সার্জারি, বিশেষ করে রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারির মতো উন্নত ও সূক্ষ্ম চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখনো ব্যাপক দক্ষতার অভাব রয়েছে। যার ফলে সামর্থ্যবান রোগীরা ভারত, সিঙ্গাপুর বা ব্যাংককের দিকে ছুটছেন। অন্যদিকে, দেবাহুতি চক্রবর্তীর বক্তব্যটি অত্যন্ত গভীর এবং সমাজতাত্ত্বিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ হলো পরিবেশগত দূষণ এবং খাদ্যে ভেজাল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে ঢাকা শহর বায়ুদূষণে প্রায়শই শীর্ষস্থানে থাকে এবং খাদ্যে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিকের ব্যবহার একটি সাধারণ ঘটনা, সেখানে ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। দেবাহুতি চক্রবর্তী অত্যন্ত সুনিপুণভাবে আঙুল তুলেছেন ‘ক্যান্সার ক্যাপিটালিজম’ বা ক্যান্সারের বাণিজ্যিকীকরণের দিকে। জীবনরক্ষাকারী ওষুধের আকাশচুম্বী দাম সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে। এটি কেবল একটি রোগ নয়, এটি একটি স্বাস্থ্য-রাজনীতি, যেখানে আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর মুনাফার জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে প্রান্তিক মানুষ।

‘এখানে থেমো না: ক্যান্সার লড়াকুদের বয়ান’ বইটি নিছক কোনো বই নয়; এটি একটি আন্দোলন। এটি সেইসব মানুষের সমবেত কণ্ঠস্বর যারা মৃত্যুর চোখের দিকে তাকিয়ে জীবনের জয়ধ্বনি করেছেন

বইটির একটি বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে ভুল রোগ নির্ণয় বা মিসডায়াগনোসিসের ভয়াবহ সব বর্ণনা। জাহান-ই-গুলশান শাপলা, অদিতি ফাল্গুনী থেকে শুরু করে জাহাঙ্গীর হোসেন—অনেকের জীবনেই ক্যান্সার শুরুর দিকে ধরা পড়েনি, বরং অন্য রোগের চিকিৎসা চলেছে দিনের পর দিন। জাহাঙ্গীর হোসেন তার ‘আমার ক্যান্সার জীবন’ প্রবন্ধে লিখেছেন—

“পাঁচজন ডাক্তার মিলে আমার নানাবিধ পরীক্ষা করান। এতে আমার দুই বছরে প্রায় দুই থেকে তিন লাখ টাকার মত খরচ হয়। কিন্তু সব রিপোর্ট স্বাভাবিক এলে ডাক্তারগণ আমার রোগকে ইরিটেবল বায়েল সিনড্রম (IBS), একজন আবার ‘মানসিক’ সমস্যা বলে উড়িয়ে দেন। সর্বশেষ পুরো পেটে সিটি স্ক্যানে কিছুটা অস্বাভাবিক দাগ খুঁজে পেলে ডাক্তার আমাকে তার পছন্দমত ক্লিনিকে ল্যাপারোস্কোপি (laparoscopy) করাতে বলেন… দ্বিতীবারের বায়োপসি পরীক্ষার ফলাফলেও ‘পজেটিভ’ আসে।”

ক্যান্সার চিকিৎসায় ‘আর্লি ডিটেকশন’ বা প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ই হলো জীবন বাঁচানোর মূল চাবিকাঠি। কিন্তু জাহাঙ্গীর হোসেনের এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং কিছু চিকিৎসকের রোগ নির্ণয় ক্ষমতা কতটা নাজুক। একজন রোগীকে দুই বছর ধরে আইবিএস বা মানসিক রোগী বলে ট্যাগ দেওয়া এবং পরবর্তীতে সেটি ক্যান্সার হিসেবে শনাক্ত হওয়া একটি চরম চিকিৎসা-অবহেলা। এ ধরনের ঘটনার কারণে ক্যান্সার যখন শনাক্ত হয়, তখন তা প্রায়শই তৃতীয় বা চতুর্থ ধাপে পৌঁছে যায়, যখন আর কিউরেটিভ (নিরাময়যোগ্য) চিকিৎসা সম্ভব হয় না, রোগীকে প্যালিয়েটিভ কেয়ারে পাঠাতে হয়।

বিদেশের হাসপাতালে চিকিৎসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখকগণ দেখিয়েছেন সেখানে কীভাবে রোগীর মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া হয়। সঞ্চিতা বর্মন সিডনিতে তার স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসার কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন—

‘আমার অনকোলজিস্ট আমাকে আরেকটি বাচ্চা হওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। যেহেতু আমার অল্প বয়সেই ক্যান্সার হয়েছে, তাই চিকিৎসার পরে যদি আমি আরেকটা বাচ্চা চাই তাহলে কি হবে? কারণ কেমোথেরাপির পর ৯৫% ক্ষেত্রে ইনফার্টিলিটির সম্ভাবনা থাকে। তাই তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, যদি আমি চাই তবে কেমো শুরু করার আগে আমার ডিমগুলিকে হিমায়িত করে রাখতে পারি… সেই সময় প্রতি কেমোর দিনে আমি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে একটি করে অধিবেশন করতাম। এটি ক্যান্সার চিকিৎসার একটি অংশ ছিল।’

এই অনুচ্ছেদটি একটি মানসম্মত বৈশ্বিক ক্যান্সার চিকিৎসা প্রটোকল এবং বাংলাদেশের ব্যবস্থার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য ফুটিয়ে তোলে। কেমোথেরাপি মানবদেহের প্রজনন ক্ষমতার ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। উন্নত বিশ্বে চিকিৎসা শুরুর আগেই ফার্টিলিটি প্রিজারভেশন যেমন—এগ ফ্রিজিং নিয়ে রোগীর সাথে আলোচনা করা হয়। বাংলাদেশে এই ধারণাটি এখনো ক্যান্সার চিকিৎসার মূলধারায় সংযুক্ত হয়নি। দ্বিতীয়ত, সঞ্চিতা বর্মন যে সাইকিয়াট্রিক কাউন্সেলিংয়ের কথা বলেছেন, তা ক্যান্সারের মতো দীর্ঘমেয়াদী ও যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসায় অপরিহার্য। কেমোথেরাপির শারীরিক কষ্টের চেয়ে চুল পড়ে যাওয়া, অঙ্গহানি এবং মৃত্যুভয়ের মানসিক কষ্ট অনেক বেশি। বাংলাদেশে হাতে গোনা কয়েকটি প্রাইভেট হাসপাতাল ছাড়া কোথাও সাইকো-অনকোলজিস্ট নেই।

ক্যান্সার শুধু একা রোগীর অসুখ নয়, এটি পুরো পরিবারের অসুখ। কেমোথেরাপির যন্ত্রণা, নির্ঘুম রাত এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে পরিবারগুলো কীভাবে টিকে থাকে, তার মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন ডা. শুভাগত চৌধুরী তার ‘ক্যান্সার নিয়ে পথচলা, সংকটের পর স্বস্তি’ প্রবন্ধে—

‘দিন থেকে দুঃসহ ছিলো রাতগুলো আর সে রাতগুলোতে একমাত্র সঙ্গী আমার স্ত্রী। সকালে পুজোআর্চা করে আসে হাসপাতালে এরপর থাকে আমার সঙ্গে। সারাক্ষণ। রাতেও ঘুমায় পাশের শয্যায়। কিন্তু খুব ঘুমায় না। আমি বুঝি। আমি উঠতে পারি না তখনও শয্যা থেকে জানালা দিয়ে দেখি রাতের আকাশ… আমি কি জীবন স্মৃতি লিখব? কি জানি। নিশ্চয় আমি মালটিপল মায়োলোমাতে মরব না। কি জানি। আমার ডাক্তাররা অনেক আশা দিয়েছেন, দেখি।’

ডা. শুভাগত চৌধুরীর এই আত্মকথন ক্যান্সার রোগীর চরম নিঃসঙ্গতা এবং একই সাথে তার কেয়ারগিভার বা পরিচর্যাকারীর নীরব আত্মত্যাগের চিত্র তুলে ধরে। রোগীর শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি কেয়ারগিভারদের যে মানসিক ও শারীরিক ধকল যায়—যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘কেয়ারগিভার বার্নআউট’ বলা হয়—তা আমাদের সমাজে প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। ডা. চৌধুরীর এই বর্ণনা প্রমাণ করে যে, চিকিৎসার যন্ত্রপাতির পাশাপাশি আপনজনের একটি স্পর্শ, একটি বিনিদ্র রজনীর প্রহর গোনা একজন রোগীকে কতটা মানসিক শক্তি যোগাতে পারে।

বইটি প্রতিটি সচেতন মানুষের, বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পড়া উচিত। কারণ বইটি শুধু ক্যান্সারের গল্প বলে না, এটি আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থাকে উন্মোচন করে এবং একই সাথে শেখায় কীভাবে সব হারিয়েও ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে উড়ে এসে বলতে হয়— ‘এখানে থেমো না’

বইটিতে শুধু হাহাকার নয়, আছে ঘুরে দাঁড়ানোর এবং সমাজ পরিবর্তনের প্রবল অঙ্গীকার। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ড. সেঁজুতি সাহা তার ‘ক্যান্সার মুক্তির এক যুগ’ প্রবন্ধে কানাডায় উন্নত চিকিৎসা পেয়ে বেঁচে ফেরার পর দেশের প্রতি তার দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন—

‘…কিন্তু মাঝে মাঝে যখন রাত জেগে কাজ করতাম, আমার হঠাৎ হঠাৎ মনে হতো, এটা কিভাবে সম্ভব? আমি কীভাবে এখনো বেঁচে আছি? শুধু বেঁচে থাকা নয়, এত সুস্থইবা কিভাবে আছি? ২০১১ সালে যদি আমি টরন্টোতে না থেকে ঢাকায় থাকতাম, তাহলে কি এটা সম্ভব হতো? আমি যেই সুবিধাগুলো পেয়েছি, বাংলাদেশের মানুষ কি সেগুলো পায়? আমার কি অধিকার আছে এই সুবিধাগুলো পাওয়ার বা সুস্থভাবে বেঁচে থাকার, যদি না আমার দেশের মানুষও একই সেবা ও চিকিৎসা পায়?’

ড. সেঁজুতি সাহার এই আত্মজিজ্ঞাসা একজন প্রকৃত বিজ্ঞানীর এবং দেশপ্রেমিকের জিজ্ঞাসা। তিনি উপলব্ধি করেছেন যে তার বেঁচে থাকাটা কেবল চিকিৎসার গুণ নয়, বরং একটি ‘ভৌগলিক প্রিভিলেজ’। বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসায় ‘হেলথ ইকুইটি’র চরম অভাব রয়েছে। দরিদ্র মানুষ যে চিকিৎসা পায় না, সামর্থ্যবানরা বিদেশে গিয়ে সেই চিকিৎসা পান। ড. সেঁজুতি এই বৈষম্য মেনে নিতে পারেননি বলেই দেশে ফিরে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেছেন। এটি ক্যান্সারের মতো একটি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া এক অসাধারণ ইতিবাচক রূপান্তর।

‘এখানে থেমো না’ বইটি সমাজ বাস্তবতার এক অনন্য দলিল হলেও, একটি বস্তুনিষ্ঠ আলোচনায় এর কিছু সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা উল্লেখ করা প্রয়োজন—

বইটির একটি প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো এতে মূলত সেই সমস্ত মানুষদের গল্পই উঠে এসেছে যারা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, আর্থিকভাবে কিছুটা হলেও সচ্ছল, যারা ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা যাদের বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য ছিল। বইটিতে প্রান্তিক কৃষক, পোশাক শ্রমিক, বা রিকশাচালকের ক্যান্সারের লড়াইয়ের কথা সেভাবে উঠে আসেনি, যারা টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যান অথবা যাদের গল্প বলার মতো কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। একে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সারভাইভারশিপ বায়াস’ বলা যেতে পারে। যারা বেঁচে ফিরেছেন বা লড়তে পারছেন, আমরা শুধু তাদের কথাই শুনছি। যারা একদমই সুবিধাবঞ্চিত, তাদের নীরবতা এই বইটিতে শূন্যস্থান হিসেবে রয়ে গেছে।

ভূমিকা অংশে সম্পাদক নিজেই স্বীকার করেছেন যে অনেক লেখাই গোছানো নয়। বইটিতে ব্যক্তিগত আবেগ ও বেদনার আধিক্য রয়েছে, যা স্বাভাবিক। তবে সাহিত্যিক মানদণ্ডে বিচার করলে কিছু কিছু প্রবন্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সম্পাদনার কাঁচি আরও শক্ত হাতে চালানো যেত। একই ধরনের চিকিৎসা-বিভ্রাটের কথা বারবার আসায় পাঠকের মনে একঘেয়েমি তৈরি হতে পারে।

যদিও এটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ান, তবুও প্রতিটি প্রবন্ধের শেষে বা বইয়ের পরিশিষ্টে সংশ্লিষ্ট ক্যান্সার (যেমন—ব্রেস্ট, ওভারিয়ান, মাল্টিপল মায়েলোমা, প্রোস্টেট ইত্যাদি) সম্পর্কে কিছু মৌলিক বৈজ্ঞানিক তথ্য, লক্ষণ এবং স্ক্রিনিং গাইডলাইন (যেমন—ম্যামোগ্রাম, প্যাপ স্মিয়ার, পিএসএ টেস্ট করার বয়স ও নিয়ম) যুক্ত করা হলে এটি সাধারণ পাঠকের জন্য একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মেডিকেল ম্যানুয়াল হিসেবে কাজ করতে পারত।

বইটির পরিশিষ্ট অংশে সিসিসিএফ যে দাবিগুলো উত্থাপন করেছে, তা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা হিসেবে গ্রহণ করার দাবি রাখে।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস-এর তথ্যমতে, দেশে চিকিৎসার জন্য নিজস্ব পকেট থেকে ব্যয় বা ‘আউট অফ পকেট এক্সপেন্ডিচার’ (OOP) প্রায় ৬৮ শতাংশেরও বেশি। ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর লাখ লাখ পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। ভিটেমাটি বিক্রি করে চিকিৎসা করানোর যে সংস্কৃতি, তা থেকে বের হতে হলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে একটি বৃহৎ ‘জাতীয় ক্যান্সার তহবিল’ এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা চালু করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

বাংলাদেশে ক্যান্সারের বেশিরভাগ উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্র রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতাল থেকে শুরু করে গুটিকয়েক বেসরকারি হাসপাতালেই রেডিয়েশন বা লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী আমাদের দেশে রেডিওথেরাপি মেশিনের যে বিশাল ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণ করতে হবে। ক্যান্সার চিকিৎসাকে বিভাগীয় এবং জেলা পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ না করলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে না।

সিসিসিএফ তরুণদের ‘পেশেন্ট নেভিগেটর’ হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। একজন রোগী যখন প্রথম ক্যান্সারের কথা জানতে পারেন, তখন তিনি কোথায় যাবেন, কোন ডাক্তারের কাছে যাবেন, কীভাবে সিরিয়াল পাবেন—এসব নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন। পেশেন্ট নেভিগেটররা এই পুরো যাত্রায় রোগীকে গাইড করতে পারেন, যা বিদেশে অত্যন্ত প্রচলিত একটি পেশা।

‘এখানে থেমো না: ক্যান্সার লড়াকুদের বয়ান’ বইটি নিছক কোনো বই নয়; এটি একটি আন্দোলন। এটি সেইসব মানুষের সমবেত কণ্ঠস্বর যারা মৃত্যুর চোখের দিকে তাকিয়ে জীবনের জয়ধ্বনি করেছেন। বইটির প্রতিটি পাতা যেন এক একটি যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে মানুষ লড়েছে কেবল নিজের শরীরের কোষের বিরুদ্ধে নয়; বরং লড়েছে একটি অমানবিক চিকিৎসাব্যবস্থা, সমাজের বাঁকা দৃষ্টি এবং প্রবল অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে।

বইটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ক্যান্সার হলে মানুষ শুধু শরীরবৃত্তীয় কারণেই মরে না, বরং সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব, ভুল ডায়াগনসিস, চিকিৎসকদের অবহেলা এবং টাকার অভাবেই অনেকে আগে মারা যান। সিসিসিএফ যে উদ্যোগটি নিয়েছে, তা রাষ্ট্রের করার কথা ছিল। কিন্তু নাগরিক সমাজ যখন নিজেরাই নিজেদের রক্ষায় এগিয়ে আসে, তখন তা সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী নিয়ামক হয়ে ওঠে।

বইটি প্রতিটি সচেতন মানুষের, বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পড়া উচিত। কারণ বইটি শুধু ক্যান্সারের গল্প বলে না, এটি আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থাকে উন্মোচন করে এবং একই সাথে শেখায় কীভাবে সব হারিয়েও ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে উড়ে এসে বলতে হয়— ‘এখানে থেমো না।’

১৬ মার্চ ২৬

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত