তিনি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, উপমহাদেশের রাজনীতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নীতিতে অটল-অবিচল থেকেই যে নেতৃত্ব দিতে হয়, তিনি তা আমাদের হাতে কলমে দেখিয়ে দিয়েছেন। রাজনীতি যে সর্বোচ্চ সৃজনশীল মানুষের চর্চার বিষয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবের আওতায় আমাদের সর্বক্ষণ যাপন তা তাঁর ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম পড়ে আরেকবার মালুম হল।
কোনো ঘটনাকে এর ভেতর থেকে দেখা, বাহির থেকে দেখা, আর উপরিতল থেকে দেখার মাঝে তারতম্য বিদ্যমান। আমরা যারা সচরাচর সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করি না, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময়ান্তে মতামত প্রদান করি মাত্র তারা রাজনীতিকে দেখি বাহির থেকে। ফলে, নীতি ও কৌশলের মাঝে ফারাক বুঝতে আমাদের প্রায়শই ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা হয়। নীতিতে অবিচল থাকলেও বাস্তবায়নের নিরিখে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৌশলের পরিবর্তন হয়—হতে পারে, রাজনীতিকে ভেতর ও বাহির থেকে পর্যবেক্ষণ করলে এ কথা দিবালোকের মতোই অক্ষিপুটে প্রস্ফুটিত হয়। আমাদের আলোচ্য গ্রন্থ ১৯২০ সন থেকে ভারত স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে ভারতীয় রাজনীতির অন্দর-বাহির পাঠকের সম্মুখে তুলে ধরে। কেননা, শ্রী শ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর সংস্পর্শে বিপ্লবী দলে যোগদান করার সময় তাঁর বয়স ছিল তুলনামূলক কম, তাছাড়া এই বয়সের সদ্য দলে যোগ দেয়া একজন নতুন বিপ্লবীর তৎকালীন রাজনীতির অন্দর-বাহির সম্পর্কে পরিণত মতামত তৈরি না-ই হবার কথা। তারপরও তিনি সেই সময়ের রাজনীতির যে চিত্র এঁকেছেন তাকেও মোটামুটি পরিণতই বলা যায়। তাছাড়া, কংগ্রেসে যোগদানের পূর্বে ‘আল হিলাল’ বা ‘আল বালাগ’ নামের পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে রাজনীতিকে তিনি দেখেছেন ইন্টেলেকচুয়ালের দৃষ্টিতে, বড়জোর ঘটনার উপরিতল থেকে।
১.
তিনি গান্ধিজি’র সংস্পর্শে কংগ্রেসে যোগদান করেন। জওহরলাল নেহেরু, সরদার প্যাটেল এঁদেরকে সহকর্মী হিসেবে পান। ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে নাগপুরের বর্ষিক অধিবেশনে মি. জিন্নাহ চূড়ান্তভাবে কংগ্রেস ত্যাগ করেন। ইতোমধ্যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে কংগ্রেস বড় প্রদেশগুলোর পাঁচটিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং চারটিতে একক বৃহত্তম পাটির মর্যাদা লাভ করে বিজয়ী হয়। নির্বাচিত প্রার্থীদের কার্যভার গ্রহণে মতভেদ দেখা দেয়। তাঁর ভাষায়—
অতীত স্মরণ করলে আমি না ভেবে পারি না যে কংগ্রেস তার প্রতিশ্রুত আদর্শ পুরোপুরি মেনে চলতে পারেনি। অনুতাপের সাথে স্বীকার করতে হবে যে কংগ্রেসের জাতীয়তাবোধ তখনও সাম্প্রদায়িক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে সংখ্যালঘুদের পরিবর্তে মেধার ভিত্তিতে নেতা নির্বাচন করার পর্যায়ে যেতে পারেনি।
[পৃ. ২০]
এই দ্বন্দ্বে কংগ্রেস ত্রিশের দশকে বামপন্থি ও ডানপন্থি দুটি গ্রুপে সুস্পষ্ট ভাগে ভাগ হয়েছিল।
[পৃ. ২৯]
তিনি ডানপন্থিদের আশংকাকে যথাযথ গুরুত্ব দিলেও সংস্কার প্রসঙ্গে তাঁর সহমর্মিতা ছিল বামপন্থিদের সঙ্গে।
ইউরোপে যুদ্ধের পদধ্বনির প্রেক্ষিতে ১৯৩৯ সালের মার্চে ত্রিপুরাতে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে তার অবস্থান জ্ঞাপন করে। ১৯৩৯ সনের ৩ সেপ্টেম্বর ইউরোপে যুদ্ধ শুরু হয়। গান্ধিজির পুনর্বার আহ্বানে তিনি কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হতে সম্মত হন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কোনো শান্তিবাদী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং স্বাধীনতা অর্জনের অস্ত্রস্বরূপ (পৃ. ৩৬)।’ অর্থাৎ তার কাছে অহিংসা কোনো নীতি নয় বরং কৌশল, অপর দিকে গান্ধিজির কাছে তা ছিল নীতি। তিনি ভারতের স্বাধীনতার বিনিময়ে মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণে নীতিগতভাবে সম্মত ছিলেন। A CHINESE INTERLUDE শিরোনামের অধীনে তিনি আমাদের জানাচ্ছেন, ১৯৪২-এর ফেব্রুয়ারিতে চিয়াং কাইশেকের ভারত ভ্রমণকালে তিনি তাঁকে বলেছিলেন, ব্রিটিশ সরকার যদি ভারতকে ডোমিনিয়ন মর্যাদার প্রস্তাব দেয় এবং যুদ্ধকালীন সময় ভারতীয় প্রতিনিধিবৃন্দকে স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধ-সহকারে কাজ করতে দিতে সম্মত হয় তাহলে কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে তিনি যুদ্ধকালে যুক্তরাজ্যের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে রাজি আছেন।
যুদ্ধের সংকট গভীরতর হলে, কিছুটা রুজভেল্টের চাপে, কিছুটা স্বেচ্ছায়, চার্চিল যুদ্ধপ্রচেষ্টায় ভারতের সহযোগিতা অর্জনকল্পে স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসকে ভারতে প্রেরণ করেন। ক্রিপস মিশন সফল হতে হতেও ব্যর্থতায় পর্যবশিত হয়। ফলে ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে কিছুটা অস্বস্তিকর বিরতি পরিলক্ষিত হয়। ঘটনার পরম্পরায় গান্ধিজি ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন শুরু করেন। সরকার গান্ধিসহ কংগ্রেস নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে জেলে প্রেরণ করে। মাওলানা আজাদ জওহরলাল নেহেরু, সর্দার প্যাটেল, আসফ আলী, শঙ্কর রাও দেও, গোবিন্দ বল্লভ পান্থ, ড. পট্টভী সীতারামাইয়া, ড. সৈয়দ মাহমুদ, আচার্য কৃপালিনী ও ড. প্রফুল্ল ঘোষ-সহ আহমেদনগর দুর্গ কারাগারে প্রেরিত হন। আজাদ-এর কারান্তরে থাকা অবস্থাতেই গান্ধিজি মুক্তি পান এবং তিনি নতুন বিবৃতি দেন, ‘ভারতকে যদি স্বাধীন ঘোষণা করা হয় তবে সে স্বেচ্ছায় ব্রিটিশের পক্ষ নেবে এবং যুদ্ধ প্রচেষ্টায় তাকে পূর্ণ সমর্থন দেবে’ (পৃ. ১০৯)—যা তাঁর অহিংস নীতির বিপরীত। পাশাপাশি তিনি মুসলিম লীগের সাথে সমঝোতায় আসার জন্য মি. জিন্নার সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে তা ছিল মারাত্মক রাজনৈতিক ভ্রান্তি।

অনুবাদ: আসমা চৌধুরী ও লিয়াকত আলি, প্রচ্ছদ: সৈয়দ ইকবাল
স্বপ্নিল প্রকাশনী, ঢাকা—মার্চ ১৯৮৯
জেল থেকে মুক্তির এক দিন পর, ২৫ জুন, ১৯৪৫-এ আজাদ সিমলায় অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকের আমন্ত্রণ পান। যদিও ওয়াভেলের প্রস্তাব ক্রিপসের থেকে ভিন্ন কিছু নয় কিন্তু ইউরোপে যেহেতু যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে এবং জাপানও বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে এরকম মনে না হওয়ায় ২৪ তারিখে সর্দার হরিনাম সিং-এর বাড়িতে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, একবার যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে যুক্তরাজ্যেরও সাহায্য চাওয়ার কোনো কারণ থাকবে না অতএব ওয়াভেলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা ভারতের জন্য মঙ্গলজনক নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই ‘প্রথমবারের মতো ভারত এবং ব্রিটেনের মধ্যে মৌল রাজনৈতিক ইস্যুতে নয়, বরং ভারতের বিভিন্ন দলের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ইস্যুতে মতপার্থক্যের কারণে আপোস আলোচনা ব্যর্থ হল’ (পৃ. ১৩৩)। অনুমিতভাবেই যুদ্ধে মিত্রপক্ষ জয়লাভ করে, বিশেষত আনবিক বোমা নিক্ষেপে যুদ্ধ প্রত্যাশিত সময়ের পূর্বেই শেষ হয়। পাশাপাশি ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে শ্রমিকদল বিপুল বিজয় অর্জন করে। এইরকম প্রেক্ষাপটে ভাইসরয় ভারতে নির্বাচন আহ্বান করেন। নির্বাচনে কংগ্রেস বাংলা, পাঞ্জাব ও সিন্ধু ছাড়া অন্য সকল প্রদেশে আশাতীত বিজয় লাভ করে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটেনের শ্রমিক সরকার ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে স্বাধীনতার প্রশ্নটি আলোচনা করার জন্য পেথিক লরেন্সের নেতৃত্বে একটি মন্ত্রী মিশন প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন।
ফলে, মাওলানা আজাদের স্বপ্ন, ‘যখন ভারতবর্ষ তার উদ্দেশ্যে পৌঁছবে, সাম্প্রদায়িক সন্দেহ এবং দ্বন্দ্বের এই অধ্যায়টি সে পুরোপুরি ভুলে যাবে এবং আধুনিক দৃষ্টিকোণ হতে আধুনিক জীবনের সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হবে। পার্থক্য থাকবে তাতে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু তা হবে অর্থনৈতিক, সাম্প্রদায়িক নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতা চলতে থাকবে, কিন্তু তা অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ইস্যুর উপর ভিত্তিশীল, ধর্মের উপর নয়। ভবিষ্যতের রূপরেখার ভিত্তি হবে শ্রেণি-সম্প্রদায় নয় এবং সে অনুসারে পলিসি তৈরী হবে’ (পৃ. ১৭৫)—মাঠে মারা গেল। উপরন্তু, রাষ্ট্র দুটি জন্মের পরপরই উভয় রাষ্ট্রে প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। এর অপনোদনে, বিশেষত ভারতে, গান্ধিজি অনশন শুরু করলে জনগণের মাঝে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা হয়ে ক্রমশ তা স্তিমিত হয়ে আসে । কিন্তু এতে কিছু সাম্প্রদায়িক উগ্র হিন্দু গান্ধিজির ওপর রুষ্ট হয়ে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮ সনে বিড়লা হাউসের প্রার্থনাসভায় গান্ধিজিকে গডসে গুলি করে হত্যা করে।
সিমলা সম্মেলনের সময়ই দৃশ্যমান হয়েছিল, ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে এ পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়, ভারত ব্রিটেনের মধ্যকার কোনো মৌল রাজনৈতিক ইস্যু নয় বরং ভারতের সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন। সম্প্রদায় হিসেবে মুসলমানগণ তাদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিল। প্রাদেশিক পর্যায়ে বিশেষত যেখানে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল সেখানে তাদের কোনো ভয় ছিল না কিন্তু সমগ্র ভারতবর্ষের দিক দিয়ে তারা ছিল সংখ্যালঘু। স্বাধীন ভারতবর্ষে তাদের অবস্থান এবং মর্যাদা সংরক্ষিত না-ও হতে পারে এই ভয় সবসময় তাদের তাড়িত করত। প্রথম দিকে মুসলিম লীগ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন চাইত। পরবর্তীতে তা স্বাধীন পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে পর্যবসিত হয়। মন্ত্রীমিশন এই সকল বিষয়কে আমলে এনে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগকে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে বাধ্যতামূলক রেখে দেশকে এ বি ও সি—এই তিনটি এলাকায় ভাগ করেছিলেন। মুসলিম লীগ কাউন্সিল বিষয়টি নিয়ে তিন দিন ধরে আলোচনা করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না । ‘শেষ দিন মি. জিন্নাহকে স্বীকার করতেই হল যে মন্ত্রী মিশন যে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে তার চেয়ে ন্যায্যতার কোনো সমাধান সংখ্যালঘুদের জন্য নেই।’ (পৃ. ১৮১)
কিন্তু ঘটনা এখানেই থেমে থাকল না, মাওলানা আজাদ উচ্চভিলাষের বশবর্তী হয়ে গান্ধীজির অবর্তমানে নিজেকে সেখানে প্রতিস্থাপনের জন্যে কংগ্রেসর সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করে জওহরলাল নেহেরুকে তাঁর স্থলাভিসিক্ত করলেন। অতঃপর মন্ত্রীমিশন পরিকল্পনাটি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিতে উপস্থাপন করলেন এবং তা ৬ জুলাই অনুমোদিত হল। বিস্ময়করভাবে কংগ্রেসের নতুন সভাপতি ১০ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করলেন: গণপরিষদে কংগ্রেস প্রবেশ করবে যে কোন চুক্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত অবস্থায় এবং উদ্ভূত যে কোনো পরিস্থিতিকে প্রয়োজন মত মোকাবেলা করার স্বাধীনতা নিয়ে (পৃ. ১৮৭)। উপরন্তু তিনি আরো বললেন: কংগ্রেস কেবলমাত্র গণপরিষদে অংশগ্রহণ করতে সম্মত হয়েছে এবং মন্ত্রীমিশন পরিকল্পনাকে যেভাবে পরিবর্তন বা সংশোধন করলে উত্তম হবে সেভাবে পরিবর্তন করার স্বাধীনতা নিয়ে (পৃ. ১৮৭)। মি. জিন্নাহ এই পরিস্থিতির সুযোগ সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করে, এর বিরোধিতায় লিপ্ত হয়ে মন্ত্রীমিশন পরিকল্পনা অনেকাংশেই ভণ্ডুল করে দিলেন এবং বললেন: জওহরলালের ঘোষণার অর্থ হল, কংগ্রেস মন্ত্রীমিশন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সে অনুসারে ভাইসরয়ের উচিত মুসলিম লীগকে (যে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে) সরকার গঠনে আহ্বান জানানো (পৃ. ১৮৮)।
বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরার মধ্য দিয়ে ভাইসরয় কংগ্রেস সভাপতিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। কংগ্রেস সভাপতি এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে জিন্নাহর সহযোগিতা কামনা করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এক পর্যায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার জন্য জিন্নাহ কয়েকজন প্রার্থীকে মনোনীত করেন; এমনকি কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভ্রান্তির জন্য অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হন। বলাবাহুল্য, তিনি এর পুরো রাজনৈতিক ফায়দাও হাসিল করেন। এদিকে কাজের কাজ তেমন কিছু হচ্ছিল না; সাম্প্রদায়িকতা নিরসনের প্রশ্নে তেমন কোনো উন্নতি হচ্ছিল না। ব্রিটিশ সরকার তাদের নিজস্ব বিবেচনায় চাইছিল একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মাঝে রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর করতে। ফলে, এ সমস্যা সমাধানের জন্য একটি চূড়ান্ত ও চরম সিদ্ধান্তমূলক প্রচেষ্টা হিসেবে মাউন্টব্যাটেন মিশন গঠিত হয়। মাউন্টব্যাটেন ‘কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়কেই পাকিস্তানের অনিবার্যতার বিষয়টি অনুধাবন করার জন্য’ সচেষ্ট হন। অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে এই কাজে তিনি প্রথমে সরদার প্যাটেলকে রাজি করাতে সক্ষম হন (পৃ. ২২৪)। আজাদ বলতে চান ‘প্যাটেল ভারত বিভাগের স্থপতি’ (পৃ. ২২৫)। তাঁর মতে ‘জিন্নাহর জন্য পাকিস্তান ছিল একটি দরকষাকষির কাউন্টার। কিন্তু পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম চালাতে গিয়ে তিনি নিজের প্রত্যাশা ও ক্ষমতার অধিক কিছু লাভ করে ফেলেন’ (পৃ. ২২৪)। পর্যায়ক্রমে তিনি জওহরলালকে তো বটেই এমনকি গান্ধিজিকে পর্যন্ত এই অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। মাওলানা আজাদের ভাষায়—
তিনি প্রকাশ্যে দেশবিভাগের পক্ষে ছিলেন না, কিন্তু তার বিরুদ্ধে আর সেরকম প্রচণ্ডভাবে কথা বলছিলেন না।
[পৃ. ২৩২]
অবশ্য পৃষ্ঠা ২৪০-এ আমরা দেখছি, তিনি বলেছেন, ওয়ার্কিং কমিটিতে গান্ধিজি দেশবিভাগের পক্ষে কথাবার্তা বলছেন। এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান ও ভারত নামের দুটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
মাওলানা আজাদের উপস্থাপিত বক্তব্যের সঙ্গে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক-বিশ্লেষকেরা মোটা দাগে সহমত পোষণ করেন। এমনকি অনুপুঙ্খভাবে দেখলে, ভিন্ন মতের সুযোগ থাকলেও তা আছে সামান্য। কিন্তু গ্রন্থকার আমাদের এটা কোনোমতেই জানাচ্ছেন না, ব্রিটিশের করতলস্থ হওয়ার সময় ভারতবর্ষ কি একতাবদ্ধ ছিল, না ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি একটি করে স্বাধীন রাষ্ট্রকে কুক্ষিগত করেছিল?
২.
স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী (আমৃত্যু এই পদে তিনি বহাল ছিলেন) মাওলানা আজাদ প্রথাগত অ্যাকাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। তিনি স্বগৃহে পিতা ও গৃহশিক্ষকের কাছ থেকে—দর্শন, জ্যামিতি, অঙ্ক ও বীজগণিত—শিক্ষালাভ করেন। প্রথাগত মুসলিম শিক্ষা পদ্ধতিতে ‘ছাত্ররা কুড়ি থেকে পঁচিশ বছর বয়সের মধ্যে পড়াশোনা শেষ করত’। কিন্তু আজাদ ষোল বছর বয়সে ওই পাঠ্যক্রম সমাপ্ত করেন। তাঁর মতে, ‘বিজ্ঞান, দর্শন এবং সাহিত্য অধ্যয়ন ব্যতীত কোনো মানুষই আজকের বিশ্বে সত্যিকারভাবে শিক্ষিত হতে পারে না’। তিনি আরবি, উর্দু, ইংরেজি ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। তবে মজার ব্যাপার হল তিনি আলাদা আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন ছাত্রাবস্থায় তাঁর অঙ্ক ও বীজগণিত পাঠের কথা। বীজগণিত কি অঙ্ক থেকে পৃথক? সম্ভবত এটা তখনকার মুসলিম মাইন্ডসেট, যা অনেকটা অগোচরেই তাঁর ভেতর প্রবেশ করেছে। তাছাড়া বক্তব্য উপস্থাপনেও তিনি দু-এক জায়গায় অতিসরলীকরণের আশ্রয় নিয়েছেন। যেমন: ভারতভাগ মেনে নেওয়া হয়েছে বলে যখন মনে হল, তখন তাঁর মত ছিল, দক্ষ মুসলিম অফিসার ভারত সরকারে থেকে গেলে মুসলিমরা বেশি সুবিধা পাবে যেহেতু মুসলিমরাই পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ (পৃ. ২৫৫)। কিন্তু তিনি এ কথা মোটেই আমলে নেননি যে, পাকিস্তান সরকারকে পরিচালনার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে দক্ষ অফিসার সেখানে আছে কি না কিংবা ওই বাস্তবতায় মুসলিম অফিসাররা ভারত সরকারে কতটুকু কার্যকর অবদান রাখতে পারত। বিদ্যমান বাস্তবতায় যে যুক্তির ওপর তিনি সদ্য স্বাধীনতা পেতে যাওয়া ভারতের কমনওয়েলথে অংশগ্রহণ নিশ্চিত বলে ভেবেছিলেন সেখানেও অতিসরলীকরণ ছিল।
রাজনীতি যে সর্বোচ্চ সৃজনশীল মানুষের চর্চার বিষয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবের আওতায় আমাদের সর্বক্ষণ যাপন তা তাঁর ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম পড়ে আরেকবার মালুম হল
তবে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের রাজনীতি করলেও তিনি স্পষ্টভাবে একাধিকবার উচ্চারণ করেছেন, ‘গান্ধীজির প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রশংসায় আমি তাদের (সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতাদের—লেখক) কারও চেয়ে পেছনে ছিলাম না, এখনও নেই, কিন্তু তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করার কথা আমি মুহূর্তের জন্য মেনে নিতে পারিনি’ (প. ১১২)। এজন্যই তিনি গান্ধিজির রাজনৈতিক ভ্রান্তি (তাঁর মতে) সম্পর্কে অবলীলায় মন্তব্য করেছেন; সি আর দাস, জওহরলাল নেহেরু, সরদার প্যাটেল-সহ তাঁর বিভিন্ন সহকর্মীর সঙ্গে মতপার্থক্যকে পাঠকের জন্য তুলে ধরেছেন। এমনকি গান্ধিজির উপলব্ধি (Perception) নিয়েও সাহসী মন্তব্য করেছেন (পৃ. ১০৮)। ‘ক্রিপস মিশন’ ব্যর্থ হওয়ার পরে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে মধ্যবর্তী অস্বস্তিকর সময়ে তাদের মতপার্থক্য এতই তুঙ্গে উঠেছিল যে, গান্ধিজি পত্র মারফত তাঁকে জানিয়েছিলেন কংগ্রেস যদি আন্দোলনে নেতৃত্বদানের জন্য গান্ধিজিকে চায় তাহলে তাকে কংগ্রেসের সভাপতি পদ ও ওয়ার্কিং কমিটি থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিতে হবে।
কংগ্রেসে কাজ শুরু করার প্রথম থেকেই তিনি আর জওহরলাল ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। প্রথমদিকে তিনি জওহরলাল-কে ভাইয়ের ছেলের মতো দেখতেন আর জওহরলাল তাঁকে দেখতেন বাবার বন্ধুর মতো। তাঁরা সবসময় একদৃষ্টি দিয়ে সবকিছু দেখেছেন এবং সমর্থনের জন্য একে অপরের ওপর নির্ভর করেছেন (পৃ. ১৫৬)। সেই জওহরলালের গুণাবলিকে তিনি দেখেছেন বেশ নির্মোহভাবে। তাঁর মতে জওহরলাল সকল প্রশ্নকে দেখতেন জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে (পৃ. ৭৫)। ‘কিন্তু তাঁর প্রকৃতি এমন ছিল যে, তিনি প্রায়শই তাড়নার বশবর্তী হয়ে কাজ করে বসতেন। সাধারণত তাঁকে বোঝালে তিনি বুঝতেন’ (পৃ. ২০৫)।
এই জওহরলাল নেহেরু যখন ঘোষণা করলেন ‘মন্ত্রী মিশন পরিকল্পনাকে কংগ্রেস ইচ্ছামতো সংশোধন করতে পারবে’ (পৃ. ১৯৪) ফলে ‘রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক মীমাংসার পুরো প্রশ্নটি আবার নাড়াচাড়া শুরু হল’ (পৃ. ১৯৪) তখন তিনি মুহূর্তের জন্যও তা মেনে নেননি। এমনকি তাঁকে (জওহরলাল) কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করাকে তিনি মনে করেছেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। ঘটনা পরম্পরায় জওহরলাল ভারত বিভাগকে মেনে নিলে তাঁর সম্পর্কে এতদূর পর্যন্ত বলেছেন, ‘তিনি ছিলেন একজন নীতিবান মানুষ, কিন্তু তিনি আবেগপ্রবণও ছিলেন—ব্যক্তিগত প্রভাবের দ্বারা ভীষণ প্রভাবিত হতেন। আমার মনে হয় এ পরিবর্তনের অন্যতম কারণ ছিল লেডী মাউন্টব্যাটেনের ব্যক্তিত্ব। তিনি যে শুধু বুদ্ধিমতি ছিলেন তা-ই নয়, এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের অধিকারিণী ছিলেন। তিনি তাঁর স্বামীর খুব গুণমুগ্ধ ছিলেন এবং অনেকক্ষেত্রেই তাঁর সাথে যারা একমত হতেন না তাদের উপর স্বামীর চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠিত করতে চাইতেন’ (পৃ. ২২৬)। জওহরলালের মত পরিবর্তনের জন্য তিনি কৃষ্ণমেনন নামে একজন ভক্তের ওপরও কিছুটা দায় চাপিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা সবাই ভক্তদের পছন্দ করি কিন্তু জওহরলাল বোধ হয় অন্যদের চাইতে একটু বেশিই তাদের পছন্দ করতেন’ (পৃ. ২২৬)। তিনি সরদার প্যাটেলের ভূমিকাকে কংগ্রেসের আদর্শের সঙ্গে সবসময় সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করতেন না। যখন কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে তাঁর উত্তরাধিকার নির্বাচনের প্রসঙ্গটি সামনে আসল তখন তিনি অবলীলায় জওহরলালকে বেছে নিয়েছিলেন। যদিও পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করেছেন এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল, যার জন্য ভারত বিভক্ত হয়েছে। তিনি এক পর্যায়ে বলেছেন ‘জিন্নাহ হয়তো দেশবিভাগের পতাকা তুলে ধরেছিল কিন্তু এখন আসল পতাকাবাহী হয়েছে প্যাটেল’ (পৃ. ২২৯)। তবে, কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন ও উপরিউক্ত রাজনৈতিক ঘটনার পরম্পরা পৃথক তিনি তা স্বীকার করেছেন। আর, কৃষ্ণমেননকে তিনি শুধু অপছন্দই করতেন না বরং মেননের প্রতি তাঁর অনেক অভিযোগ ছিল। তিনি চাইতেন মেননের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর তদন্ত হওয়া উচিত যাতে সে নির্দোষ না অপরাধী—প্রমাণিত হয়। এমনকি ১৯৫৪ সনে মেননের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি প্রসঙ্গে তিনি পদত্যাগ পর্যন্ত পেশ করেছিলেন। পরে নেহেরু বহু কষ্টে মেননকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে তাঁকে রাজি করিয়েছিলেন।
তাঁর মতে, রাজনৈতিক সংগ্রামে কংগ্রেস সবসময় ব্রিটিশদের বিরোধিতা করেছে আর মুসলিম লীগ সমর্থন যুগিয়েছে। তাই ব্রিটিশ কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ মোটা দাগে মুসলিম লীগের পক্ষ অবলম্বন করেছে। তাছাড়া তিনি জিন্নাহ, লিয়াকত আলী, খাজা নাজিমুদ্দিন ও নওয়াব ইসমাইল ছাড়া অন্য মুসলিম লীগ নেতাদের যোগ্যতায় তেমন আস্থাশীল ছিলেন না। উপরন্তু, জিন্নাহকে তিনি তেমন প্রত্যক্ষ তৎপরতার রাজনৈতিক নেতা মনে করতেন না বোধহয়।
তাঁর বর্ণনা থেকে বর্তমান রাজনীতির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তৎকালীন রাজনীতির কিছু মিল আমরা পাই। যেমন: নির্বাচন নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পারিক আস্থাহীনতা (পৃ. ২০৯, পূর্ণাঙ্গ সংস্করণে সংযোজিত অংশ) কিংবা, অনেক রাজনৈতিক নেতার গোপনে পুঁজিপতিদের প্রতি সহানভূতি প্রদর্শন (পৃ. ২১৬)। তাছাড়া, সরকার গঠনের সময় প্রভাবশালী নেতৃবর্গ তাদের আজ্ঞাবহ অযোগ্যদের স্থান করে দেওয়ায় যোগ্যদের বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি তো আছেই (পৃ. ১৯-২০)। ক্ষেত্রবিশেষে দলপ্রধানরা তাদের খেয়াল-খুশি-মতো কাউকে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কুশীলব করে তোলেন (পৃ. ২৬৮-২৬৯)। আর, কিছু কিছু রাজনীতিকের জনবিচ্ছিন্নতা, অর্থগৃধ্নতা, শঠতা, হীনম্মন্যতা ইত্যাদির কথা না হয় না-ই বললাম।
৩.
অনুবাদ প্রসঙ্গে কিছু বলতে হলে প্রথমেই বলতে হয়, কোন উৎস থেকে বঙ্গানুবাদ করা হয়েছে সে সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য গ্রন্থটিতে অনুপস্থিত। আমরা সাধারণভাবে জানি ওরিয়েন্ট লংম্যান থেকে গ্রন্থটির প্রাথমিক ও পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ প্রকাশিত হয়। পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ প্রকাশ উপলক্ষে গ্রন্থটির বিপুল চাহিদা দেশে-বিদেশে তৈরি হয়েছিল। সেই অবস্থায় এরকম অখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা কীভাবে এর অনুবাদ-স্বত্ব নিশ্চিত করেছিল তা একটা বিস্ময়! না-কি অনুবাদ-স্বত্ব আদৌ নিশ্চিত করা হয়নি?
গ্রন্থটি উপস্থাপনে প্রকাশনা সংস্থাটির পেশাগত অদক্ষতা বেশ ভালোভাবেই জারি রয়েছে। বিস্তর বানানভ্রান্তি বিদ্যমান। ক্ষেত্রবিশেষে এক শব্দের বর্ণ অন্য শব্দের সঙ্গে মিলিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। কোথাও কোথাও, গঠন অনুযায়ী, যে শব্দ নির্দিষ্ট শব্দের পূর্বে থাকলে তা সার্থক বাক্য গঠনে সমর্থ হত তা পরে উপস্থাপিত হয়েছে, আবার কোথাও পরের শব্দটি পূর্বে।
অনুবাদ প্রশ্নে অনুবাদকদ্বয় ও প্রকাশকের আরও অধিক দায় নেবার অবকাশ ছিল। অনুবাদকদ্বয় অ্যাকাডেমিক প্রমিত ধাঁচের হায়ারার্কি বজায় রেখে অনুবাদে সচেষ্ট হয়েছেন। কিন্তু এতে তাঁরা খুব একটা সফল এমনটা বলা যায় না। ক্ষেত্রবিশেষে তাঁরা কোথাও কোথাও আক্ষরিক অনুবাদ করেছেন। যেমন: চতুর্থ অধ্যায়ের শিরোনাম A CHINESE INTERLUDE-এর বঙ্গানুবাদ করেছেন ‘একটি চীনা বিরাম সংগীত’। একে ‘একটি চীনা গর্ভনাটিকা’ করলেই অধিক তাৎপর্যবহ হত। কিংবা ওয়ার্ডসওয়ার্থ’র দুটি কবিতার লাইন—
But she’s in her grave and oh
The difference to me’র বঙ্গানুবাদ করেছেন—
কিন্তু সে রয়েছে তার সমাধিতে, আর হায়,
তা কি যোজন যোজন দূর!
[পৃ. ১২১]
একে,
কিন্তু সে কবরে শুয়ে। হায়!
আর আমি রয়েছি কোথায়!
—করলেই কি অধিক ব্যঞ্জনাময় হত না?
কোথাও কোথাও তাঁরা ইংরেজি শব্দ ইংরেজিতে রেখে দিয়েছেন, আবার কোথাও লিখেছেন বাংলায়। কোথাও কোনো একটি পত্রিকার নাম বাংলায় লিখেছেন আবার কোথাও ইংরেজিতে। QUIT INDIA-র বঙ্গানুবাদ কোথাও করেছেন ‘ভারত ছাড়ো’ আবার কোথাও ‘ভারত ছাড়’। কোথাও কোথাও কিছু কিছু ইংরেজি শব্দের বাংলা পরিভাষা থাকার পরও তা ব্যবহার করেননি, আবার কোথাও কোথাও করেছেন।
WARIDHA-এর বঙ্গানুবাদ সব জায়গাতেই করেছেন ‘ভার্ধা’ কিন্তু সাধারণে একে আমরা ‘ওয়ার্ধা’ বলেই জানি। I have never seen him looking so dejected-এর বঙ্গানুবাদ করেছেন ‘কখনো আমি তাঁকে এত dejected দেখিনি’ (পৃ. ৯৬)। একে ‘আমি কখনোই তাঁকে এতটা মুষড়ে পড়তে পড়তে দেখিনি’-তো করাই যেত। অনুবাদকরা প্রয়োজন বোধ করলে সচরাচর কোনো শব্দের ভাবার্থকে পাঠকদের সম্মুখে উন্মোচনের প্রয়াস নেন। কিন্তু আমাদের আলোচ্য গ্রন্থের অনুবাদকদ্বয় এরকম কোনো প্রয়োজন-ই অনুভব করেননি। যদি তাঁরা D DAY-র (পৃ.১১২) দু-এক লাইনে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরতেন তাহলে মন্দ হত না। নিশ্চিভাবে এরকম আরও কিছু উদাহরণ দেওয়া যাবে তবে আমরা সময় ও স্থানাভাবে বিরত থাকলাম।
গ্রন্থটির সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে খোদ ওরিয়েন্ট লংম্যান থেকে, ১৯৮৯ সনে। আমরা যে অনুবাদকর্মটির নিরিখে আলোচনায় প্রয়াসী হলাম তার প্রকাশসন-ও ১৯৮৯। অনুবাদকর্ম দুটির মাঝে মিল বলতে ওটুকুই। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদ শুরু হয়েছে ‘মৌলানা আবুল কালাম আজাদ’ এই শব্দগুচ্ছ দিয়ে আর শেষ হয়েছে ‘বিভিন্ন স্পষ্টাস্পষ্টি মতামতের সঙ্গে অনেকেই আমরা একমত না হতে পারি তবে ভারতের এই মহান সন্তানের সততা ও সাহসকে নতুন করে প্রশংসা করতে বাধ্য হব।’— এই বাক্য দিয়ে। আর আমাদের আলোচনার ভিত্তি অনুবাদকর্মটি শুরু হয়েছে ‘মাওলানা আবুল কালাম আজাদ’ এই শব্দগুচ্ছ দিয়ে আর শেষ হয়েছে ‘আমরা অনেকেই হয়তো ওই সময় (১৯৩৫-৪৮)-এর মানুষ ও ঘটনাবলি সম্বন্ধে মাওলানা আজাদ-এর মূল্যায়নের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হব না, কিন্তু ভারতের এক মহান সন্তানের সততা ও সাহস সম্পর্কে আবার নতুন করে মুগ্ধতা ও শ্রদ্ধা প্রকাশে আমরা বাধ্য হব।’— এই বাক্যটি দিয়ে। শুরু এবং শেষের শব্দ দুটি প্রতীকীভাবে অনুবাদ দুটির সুর ও স্বরের প্রতিনিধিত্ব করে বৈকি।
দুই যুগেরও বেশি সময় আগের এই অনুবাদকর্ম নিশ্চিতভাবে অনুবাদকদ্বয়ের বর্তমান সামর্থ্য ও মননের প্রতিনিধিত্ব করে না। তাছাড়া, তাঁরা কেউ রাজনীতি-বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না। পরবর্তীকালে এই ধরনের কাজের ধারাবাহিকতাও বজায় রাখেননি। তাই অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তাঁরা অনেকটা অ্যাডভেঞ্চার ও কিছুটা অর্থনৈতিক সঙ্গতির জন্য এই কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন।
















































































































































5 Comments. Leave new
বেশ
অসামান্য লেখা, অনবদ্য!
অনুবাদকর্মের মূল্যায়নটা ভালো হয়েছে। আমি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদ পড়েছি। তাঁর অনুবাদ সাবলীল হলেও দুয়েকটা শব্দের ব্যাপারে আমার আপত্তি আছে। যেমন-আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পদ্ধতিকে মওলানা আজাদ defective বলেছেন। কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায় defective এর বাংলা করেছেন বিটকেল। মওলানা আজাদ তার স্ত্রীর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সুরা ফাতেহা পড়লেন। এই বিষয়টিকে লিখেছেন, “আমি ফাতেহা আওড়ালাম”। এরকম ছোটখাটো ত্রুটি ছাড়া অনুবাদটা ভালোই লেগেছিল। তবে যে অনুবাদকর্মের রিভিউ এখানে দেয়া হয়েছে সেটা আমি পড়িনি। এখন সংগ্রহ করে পড়ে দেখব।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের তরজমা থাকার পরও সে কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা খুব কাজের কিছু নয়। অবশ্য অকাজের আড়ালেও তো কত কীর্তি ঘটে গেছে পৃথিবীতে, আজও ঘটে যাচ্ছে।
আলোচনাটা সুন্দর, মনোগ্রাহী এবং বিশ্লেষণাত্বক। জওহরলাল নেহেরুর ওপর লেডী মাউন্টব্যাটেনের প্রভাবের উল্লেখ আগে পাওয়া গেলেও এমন নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র সেগুলো ছিল না।
ভারতীয় অখণ্ডতা লঙ্ঘনের জন্য জিন্নাহকে যত ভাবে দায়ী করা হয় অত দায় সম্ভবত তাঁর ছিল না।
বেশ ভালো