আবু আল-আলা আল-মাররি (Abu al-Ala al-Ma’arri, ৯৭৩–১০৫৭ খ্রি.) ছিলেন মধ্যযুগের আরব বিশ্বের এক অসাধারণ কবি, দার্শনিক ও মুক্তচিন্তার প্রতিনিধি। তিনি সাধারণত আল-মাররি নামেই পরিচিত। সিরিয়ার মা’আররাত আল-নু’মান শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সেখানেই লোকান্তরিত হন। আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি এক ব্যতিক্রমী কণ্ঠ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিতর্কিত ও মৌলিক চিন্তাবিদ। ছিলেন প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত ও সাহসী একজন দার্শনিক ও কবি। তাঁর কবিতায় গভীর সংশয়বাদ, মানবিক বেদনা এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্নের উপস্থিতি দেখা যায়। অন্ধত্ব ও একাকীত্বের মধ্যেও তিনি যুক্তিবাদ ও নীতিবোধকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন।
তাঁর পরিবার ‘বনু সুলাইমান’ ছিল খুবই শিক্ষিত ও বিদগ্ধ। তাঁর বাবা নিজেও একজন কবি ছিলেন। তাঁর দাদা ছিলেন শহরের প্রধান কাজী তথা বিচারক। ফলে একটি উচ্চশিক্ষিত ও সাহিত্যমনস্ক পরিবেশে তিনি বড় হতে থাকেন।
মাত্র চার বছর বয়সে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। এই ভয়াবহ রোগে তিনি তাঁর বাম চোখের দৃষ্টি হারান এবং ডান চোখে সাদা ছানি পড়ে যায়। শৈশব থেকেই জগত তার কাছে ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিন্তু এই অন্ধত্বই যেন তাঁর অন্তরের চোখ খুলে দিয়েছিল।
দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও তিনি অসাধারণ স্মৃতি ও বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে জ্ঞানচর্চা চালিয়ে যান। শৈশবেই কবিতা রচনা শুরু করেন। তরুণ বয়সে তিনি আলেপ্পো, আন্তিওক ও ত্রিপোলিতে শিক্ষালাভ করেন। ১০০৪-১০০৫ সালে পিতার মৃত্যুতে তিনি শোককাব্য রচনা করেন।
৩০ বছর বয়সে তিনি বাগদাদ ভ্রমণে যান। তখন বাগদাদ ছিল আরব-ইসলামি বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রস্থল। সেখানে তিনি মাত্র ১৮ মাস ছিলেন, কিন্তু এই স্বল্প সময়ে তিনি তৎকালীন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত, ইহুদি, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও হিন্দু চিন্তাবিদদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হন। বাগদাদের বৈচিত্র্যময় পরিবেশ তাকে বুঝতে শিখিয়েছিল যে, সত্য কেবল একটি ধর্মের বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।
বাগদাদের সাহিত্য আসরগুলোতে তিনি সমাদৃত হলেও নিজের রচনা বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানান, ফলে আর্থিক সংকটে পড়েন। বাগদাদে অবস্থানকালে ১০১০ সালে তিনি খবর পান তাঁর মা অসুস্থ। তিনি দ্রুত বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন, কিন্তু পৌঁছানোর আগেই তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। এই ঘটনা তাকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেয়।
মায়ের মৃত্যুর পর তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ সমাজবিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর বাড়িকে একটি ব্যক্তিগত কারাগারে পরিণত করেন। নিজেকে তিনি বলতেন ‘রাহিন আল-মাহবিসাইন’ বা ‘দুই কারাগারের বন্দী’। প্রথম কারাগার তাঁর অন্ধত্ব; দ্বিতীয় কারাগার তাঁর নিজের ঘর, যা থেকে তিনি খুব কমই বের হতেন।
জীবনের শেষ ৪৫ বছর তিনি মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে মাছ-মাংস বর্জন করে নিরামিষ আহার এবং কৃচ্ছ্রসাধন করে অতিবাহিত করেন। খুব সাধারণ পোশাক পরিধান করতেন তিনি। একে তিনি বলতেন ‘পার্থিব লোভ থেকে মুক্তি’। তিনি বিয়ে করেননি। এই নিঃসঙ্গ জীবনেই তিনি তার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মগুলো রচনা করেন। ১০৫৭ খ্রিস্টাব্দে ৮৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
আল-মাররিকে বলা হতো ‘চলমান লাইব্রেরি’।
তিনি কোনো বই পড়তে পারতেন না, তাই কেউ তাকে পড়ে শোনালে তিনি তা একবারেই মুখস্থ করে ফেলতেন। শোনা যায়, তিনি বাগদাদের গ্রন্থাগারগুলোর হাজার হাজার পাণ্ডুলিপি স্মৃতিতে ধারণ করেছিলেন।
তিনি অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল ছিলেন। অনেক শাসক তাঁকে রাজকবি হওয়ার আমন্ত্রণ জানালেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তিনি কারো প্রশংসা করে কবিতা লিখে অর্থ উপার্জন করতে ঘৃণা করতেন।
কেন তিনি এতটা বিষণ্ণ ছিলেন? তাঁর দর্শনে যে গভীর হতাশা বা পেসিমিজম দেখা যায়, তাঁর পেছনে কিছু ঐতিহাসিক কারণ ছিল। তিনি এমন এক সময়ে জন্মেছিলেন যখন আব্বাসীয় খেলাফত দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সিরিয়া বিভিন্ন ছোট ছোট রাজবংশ যেমন: হামদানিদ, ফাতিমিদ এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য-এর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। তাঁর সময়ে সিরিয়া বারবার ধ্বংস হয়েছে, মানুষ মারা গেছে ক্ষমতার লোভে। এটি তাঁকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে পৃথিবী একটি যন্ত্রণার স্থান। তিনি দেখেছেন মানুষ ধর্মের নামে অধর্ম করছে। এই সামাজিক অবক্ষয়ই তাকে একজন কট্টর সংশয়বাদী ও যুক্তিবাদীতে পরিণত করেছিল।
আল-মাররির জীবনী পাঠ করলে মনে হয়, তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে থাকা একজন মানুষ। তাঁর দর্শন ও মরমিবাদ ছিল প্রথাগত সুফিবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর এক যাত্রা। যেখানে সাধারণ সুফি বা মরমিরা ‘প্রেম’ ও ‘আবেগের’ মাধ্যমে স্রষ্টাকে খুঁজতেন, আল-মাররি সেখানে ‘যুক্তি’ ও ‘অনাসক্তি’র মাধ্যমে মহাবিশ্বের পরম সত্যকে বোঝার চেষ্টা করেছেন।
তিনি ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, ইহুদি ধর্ম ও জরথুস্ট্রবাদ সবকিছুর সমালোচনা করেছেন। তিনি ধর্মীয় কুসংস্কার, অন্ধ আচার ও প্রথার বিরোধী ছিলেন। তিনি বলতেন, সব ধর্মই মানুষের তৈরি এবং সমানভাবে ভুলপথগামী। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “মানুষ দুই শ্রেণিতে বিভক্ত: বুদ্ধিমান অধার্মিক এবং ধার্মিক অবুদ্ধিমান।” তিনি সম্ভবত ডেইজম (deism)-এর কাছাকাছি ছিলেন—ঈশ্বর আছেন; কিন্তু ধর্মীয় প্রত্যাদেশ বা নবীদের বাণী মানতেন না।
আল-মাররি বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের বিবেক বা যুক্তিই হলো ঈশ্বরের দেওয়া একমাত্র ‘নুর’ বা আলো। তাঁর কাছে কোনো পীর বা ধর্মগুরু নয়, বরং নিজের ‘বুদ্ধি’ই হলো শ্রেষ্ঠ ইমাম। তিনি বলতেন, যুক্তিহীন আধ্যাত্মিকতা কেবল এক ধরণের উন্মাদনা। তাঁর মতে, জগত থেকে দূরে সরে যাওয়া বা সন্ন্যাস গ্রহণ করাটা কোনো ধর্মীয় পুরস্কারের আশায় নয়, বরং জাগতিক ঝুটো মায়া থেকে নিজের আত্মাকে স্বাধীন রাখার জন্য।
তাঁর দর্শন ও মরমিবাদ ছিল প্রথাগত সুফিবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর এক যাত্রা। যেখানে সাধারণ সুফি বা মরমিরা ‘প্রেম’ ও ‘আবেগের’ মাধ্যমে স্রষ্টাকে খুঁজতেন, আল-মাররি সেখানে ‘যুক্তি’ ও ‘অনাসক্তি’র মাধ্যমে মহাবিশ্বের পরম সত্যকে বোঝার চেষ্টা করেছেন
আল-মাররির দর্শনের সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং বিতর্কিত অংশ হলো তাঁর সন্তান জন্মদান বিরোধী অবস্থান। তিনি মনে করতেন জীবন হলো এক অন্তহীন যন্ত্রণার সাগর। তাই নতুন কোনো প্রাণকে এই পৃথিবীতে নিয়ে আসা মানে তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে কষ্টের মুখে ঠেলে দেওয়া। তাঁর দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ‘মরমি’ বা দয়ালু ব্যক্তি সে-ই, যে কোনো নতুন প্রাণ জন্ম দিয়ে তাকে এই পৃথিবীর মায়ায় বন্দী করে না। তাঁর নিজের কবরে লেখা বিখ্যাত উক্তিটি এর প্রমাণ: “পিতার অপরাধে আমি জন্মেছি, নিজে এই অপরাধ করিনি কারো প্রতি।”
তাঁর জীবন ছিল চরম কৃচ্ছ্রসাধনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি কেবল গৃহবন্দীই ছিলেন না, তার খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনধারাও ছিল মরমিসুলভ।
তিনি নিরামিষবাদী। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রতিটি প্রাণের ভেতর একই স্পন্দন কাজ করে। তাই কোনো পশুকে হত্যা করা বা তাদের সম্পদ (দুধ, মধু) কেড়ে নেওয়া আধ্যাত্মিক পবিত্রতার পরিপন্থী। তিনি কোনো রাজকীয় সাহায্য গ্রহণ করতেন না। সামান্য যবের রুটি খেয়ে তিনি জীবন কাটিয়ে দিতেন। তাঁর এই দারিদ্র্য ছিল স্ব-উদ্যোগে বরণ করা, যা তাঁকে শাসকদের রক্তচক্ষু থেকে স্বাধীন রেখেছিল।
আল-মাররিকে অনেক সময় ‘নাস্তিক’ বলে ভুল করা হয়, কিন্তু তাঁর দর্শন ছিল আসলে ‘সংশয়বাদী মরমিবাদ’। তিনি ধর্মের নামে চলা ব্যবসা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সমালোচনা করতেন। তাঁর মতে, সত্য কোনো নির্দিষ্ট কিতাবে বন্দী নয়, বরং তা ছড়িয়ে আছে প্রকৃতির প্রতিটি অঘোষিত নিয়মে। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষ প্রকৃতির এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। তাঁর মরমিবাদ মানুষকে শেখায় যে, মৃত্যুর পর আমরা আবার সেই অসীম মহাবিশ্বের অংশ হয়ে যাব—যেখানে কোনো স্বর্গ বা নরকের বিভাজন থাকবে না।
তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক মরমিবাদকে আমরা আর একটু খুঁটিয়ে দেখতে পারি। তাঁর দর্শন প্রথাগত সুফি বা ধর্মীয় মরমিবাদের চেয়ে একদম আলাদা। সাধারণত সুফিরা স্রষ্টার প্রেমে বিভোর হয়ে মিলনের পথ খুঁজতেন, সেখানে আল-মাররি যুক্তি ও ত্যাগের মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানের এক কঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন।
প্রথাগত মরমিবাদে ‘কলব’ বা হৃদয়ের শুদ্ধিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু আল-মাররির কাছে যুক্তি-বুদ্ধি হলো একমাত্র পথপ্রদর্শক। তিনি মনে করতেন মানুষ যখন অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কার থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে, তখনই তার সত্যিকারের ‘মরমি’ যাত্রা শুরু হয়। তিনি একে বলতেন মনের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা।
আল-মাররির মরমিবাদে একটি গভীর বিষণ্ণতা ও হতাশাবোধ তথা পেসিমিজম কাজ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন অস্তিত্ব নিজেই একটি কষ্ট। তিনি মৃত্যুকে ভয় পেতেন না, বরং একে দেখতেন দীর্ঘ বন্দীদশা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হিসেবে।
তাঁর ‘রিসালাত আল-গুফরান’ গ্রন্থটি বুদ্ধিবৃত্তিক মরমিবাদের এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এখানে তিনি এক কাল্পনিক যাত্রায় স্বর্গ ও নরক ভ্রমণ করেন। দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’র কয়েকশ বছর আগে আল-মাররি এটি লিখেছিলেন।‘রিসালাত আল-গুফরান’ (The Epistle of Forgiveness) কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক সৃষ্টি। ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে লেখা এই গ্রন্থে আল-মাররি কল্পনা, বিদ্রূপ ও দর্শনের এক অসাধারণ মিশেল ঘটিয়েছেন।
গ্রন্থটি মূলত একটি চিঠির উত্তর হিসেবে লেখা। আল-মাররির পরিচিত জনৈক পণ্ডিত ইবনে আল-কারিক তাঁকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে তিনি নিজের ধার্মিকতা জাহির করেছিলেন এবং অন্যদের ‘কাফের’ বা ‘পাপী’ বলে সমালোচনা করেছিলেন। এর উত্তরে আল-মাররি একটি কাল্পনিক রূপক তৈরি করেন, যেখানে ইবনে আল-কারিক নিজেই কেন্দ্রীয় চরিত্র।
গল্পটি শুরু হয় ইবনে আল-কারিকের মৃত্যুর পর তার হাশরের ময়দানে উপস্থিত হওয়ার মাধ্যমে। ইবনে আল-কারিক কোনোমতে ক্ষমা (গুফরান) পেয়ে স্বর্গে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে তিনি অবাক হয়ে দেখেন যে, ইসলামপূর্ব জাহেলিয়াত আমলের অনেক কবি, যাদেরকে তিনি ‘জাহান্নামি’ মনে করতেন, তারা দিব্যি স্বর্গে বিচরণ করছেন।
তিনি যখন সেসব কবিদের (যেমন: ইমরুল কায়েসের সমসাময়িক কবিগণ) জিজ্ঞেস করেন তারা কীভাবে স্বর্গে এলেন, তারা উত্তর দেয় যে—তাদের কাব্যিক প্রতিভা বা জীবনের শেষ মুহূর্তের কোনো একটি সৎ কাজের জন্য স্রষ্টা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। এটি ছিল আল-মাররির পক্ষ থেকে তৎকালীন সংকীর্ণমনা ধর্মতাত্ত্বিকদের প্রতি একটি সূক্ষ্ম চপেটাঘাত।
আল-মাররি জান্নাতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বর্ণনায় কিছুটা বিদ্রূপ মেশান। ইবনে আল-কারিক সেখানে কেবল খাওয়া-দাওয়া আর সুন্দরী হুরদের খোঁজ করেন না, বরং কবিদের সাথে ব্যাকরণ, ছন্দ আর সাহিত্য নিয়ে তর্কে মেতে ওঠেন। এমনকি তিনি সেখানে একটি ‘সাহিত্যের ভোজসভা’ আয়োজন করেন।
এক পর্যায়ে তিনি নরকের কিনারে যান এবং সেখানে বিখ্যাত সব পাপিষ্ঠ ও অবাধ্য ব্যক্তিদের দেখেন। আল-মাররি এখানে দেখিয়েছেন যে, অনেক তথাকথিত ‘ধার্মিক’ ব্যক্তি তাদের অহংকারের কারণে নরকে গিয়েছেন, আবার অনেক ‘মুক্তচিন্তক’ তাদের সততার কারণে মুক্তি পেয়েছেন।
আল-মাররি এই ভ্রমণের আড়ালে কিছু গভীর সত্য প্রকাশ করেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, স্রষ্টার ক্ষমা মানুষের তৈরি কোনো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা নয়। মানুষ যাকে পাপী ভাবছে, স্রষ্টা তাকেও ক্ষমা করতে পারেন। আল-মাররির কাছে সাহিত্য ও জ্ঞান এতটাই পবিত্র যে, তিনি স্বর্গের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে জ্ঞানচর্চাকেই দেখিয়েছেন। ইবনে আল-কারিকের চরিত্রের মাধ্যমে তিনি সেই সব মানুষদের ব্যঙ্গ করেছেন যারা নিজেদের জান্নাতের একচ্ছত্র মালিক মনে করে এবং অন্যদের তুচ্ছজ্ঞান করে।
অনেকেই মনে করেন দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ আল-মাররির এই গ্রন্থ থেকে অনুপ্রাণিত। গ্রন্থদুটোর মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। আল-মাররির এই গ্রন্থটি প্রমাণ করে যে, মরমিবাদ কেবল ব্যক্তিগত সাধনা নয়, এটি কল্পনার ডানায় ভর করে মহাবিশ্বের রহস্য এবং স্রষ্টার করুণাকে বোঝার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টাও বটে।
আল-মাররির কবিতার শৈলী এবং বিষয়বস্তু আরব্য সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য এবং দুর্ভেদ্য দুর্গ। তিনি শুধু একজন কবি ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন ‘দার্শনিক কবি’। তাঁর কবিতার প্রতিটি ছত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এবং অস্তিত্বের সংকট ফুটে ওঠে।
আল-মাররি কবিতার আঙ্গিক বা ফরমেট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভালোবাসতেন। তাঁর শৈলীর একটা বৈশিষ্ট্য হলো ‘লুজুম মা লা ইয়ালজাম’। এটি তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবিত একটি শৈলী। এর অর্থ হলো— ‘যা বাধ্যতামূলক নয়, তাকে বাধ্যতামূলক করা’। আরবি কবিতায় সাধারণত অন্ত্যমিলের জন্য একটি বর্ণ ব্যবহার করা হয়, কিন্তু আল-মাররি সেখানে নিজের ওপর কঠিন শর্ত আরোপ করে দুটি বা ততোধিক বর্ণের মিল ব্যবহার করতেন। এটি তার অসামান্য ভাষাগত দক্ষতা এবং শৃঙ্খলার পরিচয় দেয়।
তাঁর শব্দচয়ন ছিল অত্যন্ত গভীর এবং অনেক সময় কিছুটা দুর্বোধ্য। তিনি সাধারণ আবেগপ্রসূত শব্দের চেয়ে যুক্তিনির্ভর ও দার্শনিক গাম্ভীর্যপূর্ণ শব্দ বেশি পছন্দ করতেন। তিনি সমাজ এবং ধর্মের ভণ্ডামিকে সরাসরি আক্রমণ না করে সূক্ষ্ম রূপক এবং বিদ্রূপের মাধ্যমে তুলে ধরতেন। তাঁর কবিতায় প্রায়ই এক ধরণের আত্ম-উপহাস এবং জগতের প্রতি বিতৃষ্ণা ফুটে উঠত।
তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু কেবল প্রেম বা প্রকৃতির বন্দনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মানুষের অস্তিত্বের আদি ও অন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর কবিতার একটি বড় অংশ জুড়ে আছে মৃত্যু। তবে এই মৃত্যু ভয়ের নয়, বরং মুক্তির। “আমরা ধুলো থেকে আসি এবং ধুলোতেই ফিরে যাই; মাঝখানের সময়টুকু কেবল বাতাসের ওপর আঁকা কিছু রেখা মাত্র।”
তিনিই প্রথম কবি যিনি কবিতাকে প্রাণী অধিকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কবিতায় বারবার এসেছে যে, একটি ক্ষুদ্র পিঁপড়াও মানুষের মতো প্রাণের অধিকারী, তাই তাকে হত্যা করা মহাপাপ।
তিনি সময় বা কাল-কে একটি নিষ্ঠুর শক্তি হিসেবে দেখতেন, যা মানুষকে পেষণ করে। তাঁর কবিতায় ভাগ্যকে দেখা হয়েছে এক অন্ধ চক্র হিসেবে, যেখানে মানুষের কোনো হাত নেই।
তিনি প্রথাগত আচারের চেয়ে আধ্যাত্মিক সততাকে বড় করে দেখতেন। তাঁর অনেক কবিতায় তিনি প্রশ্ন তুলেছেন— যারা স্বর্গের লোভ দেখায়, তারা নিজেরাই কি সত্যকে জানে?
তাঁর দর্শন একাধারে নির্মোহ এবং বিষণ্ণ। তিনি পৃথিবীকে দেখেছেন এক জরাজীর্ণ সরাইখানা হিসেবে, যেখানে মানুষ কেবল কিছুক্ষণের মেহমান। তাঁর কবিতার মূল বক্তব্য হলো: ভোগ বিলাস ত্যাগ করো এবং নিজের বুদ্ধিকে শাণিত করো
তাঁর কবিতার বিবর্তন বুঝতে হলে দুটি গ্রন্থ সম্পর্কে জানা জরুরি: ‘সাকত আল-জান্দ’ এটি তার তরুণ বয়সের কাজ। এখানে প্রথাগত আরব্য বীরত্ব ও অলঙ্কারপূর্ণ শৈলী দেখা যায়। এটি তাকে দ্রুত খ্যাতি এনে দেয়।
‘লুজুমিয়াত’ এটি তাঁর পরিপক্ক জীবনের কাজ। এখানে তিনি ছন্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং তার চূড়ান্ত দার্শনিক ও মরমি চিন্তাগুলো তুলে ধরেছেন।
আল-মাররির কবিতার শৈলী আমাদের শেখায় যে, আধ্যাত্মিকতা কেবল সহজ ভাষায় নয়, বরং কঠিন শৃঙ্খলা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতার মাধ্যমেও প্রকাশ করা যায়। তাঁর কবিতা পড়ার জন্য কেবল হৃদয়ের আবেগ নয়, বরং মস্তিষ্কের তীক্ষ্ণতাও প্রয়োজন।
আল-মাররির জীবন ছিল এমন সব অদ্ভুত ও বিস্ময়কর ঘটনায় ঠাসা, যা তাঁর অসাধারণ মেধা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রমাণ দেয়। তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত কিছু বিখ্যাত অ্যানেকডোট বা জীবন-কাহিনি নিচে দেওয়া হলো।
- একবার আল-মাররি বাগদাদে থাকাকালীন একটি মজলিসে বসে ছিলেন। সেখানে দুই ব্যক্তি এক অজানা ভাষায় (সম্ভবত আজারবাইজানি বা কোনো পাহাড়ি উপভাষা) নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছিল। অনেক পরে যখন সেই দুই ব্যক্তি তাদের ঝগড়ার কথা অস্বীকার করে, তখন আল-মাররি সেই অজানা ভাষার পুরো কথোপকথনটি হুবহু আওড়ে শোনান। যদিও তিনি ওই ভাষার একটি শব্দও বুঝতেন না, কিন্তু একবার শুনেই তিনি তা স্মৃতিতে ধরে রেখেছিলেন। এটি দেখে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
- বাগদাদের এক বড় পণ্ডিতের সভায় আল-মাররি গিয়েছিলেন। অন্ধ হওয়ার কারণে তিনি চলার সময় ভুল করে একজনের গায়ে ধাক্কা দিয়ে বসেন। তখন সেই উদ্ধত পণ্ডিত বলে ওঠেন, “এই কুকুরটা কে?” আরবিতে ‘কুকুর’ গালি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আল-মাররি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিয়েছিলেন: “কুকুর তো সেই ব্যক্তি, যে কুকুরের জন্য ব্যবহৃত সত্তরটি প্রতিশব্দ জানে না।” এই ঘটনার পর তিনি বুঝতে পারেন যে বাগদাদের পণ্ডিতরা জ্ঞানের চেয়ে অহংকার নিয়ে বেশি ব্যস্ত।
- শোনা যায়, তাঁর যৌবনে তিনি যখন সিরিয়ার লাতাকিয়া শহর দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন একটি খ্রিস্টান মঠের সামনে বিশ্রাম নেন। সেখানে এক গ্রিক পণ্ডিতের সাথে তার দীর্ঘক্ষণ দর্শন ও যুক্তিশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা হয়। বলা হয়, সেই আলোচনার পরেই তার মনে প্রচলিত ধর্মের বাইরে এক ধরণের বিশ্বজনীন যুক্তিবাদ ও সংশয়বাদের জন্ম নেয়। তিনি বুঝতে পারেন যে সত্য কেবল বিশ্বাসের ওপর নয়, বরং গভীর পর্যবেক্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে।
- আল-মাররি যখন নিরামিষাশী হয়ে যান, তখন একবার এক ব্যক্তি তাকে পরীক্ষা করার জন্য একটি ভাজা পাখি উপহার পাঠান। আল-মাররি সেই পাখির দিকে হাত বাড়িয়ে সেটি স্পর্শ করেন এবং বিমর্ষ হয়ে বলেন: “হায়! তুমি তো দুর্বল ছিলে বলেই আজ মানুষের খাবারে পরিণত হয়েছ। তুমি যদি বাজের মতো শক্তিশালী হতে, তবে কেউ তোমার দিকে হাত বাড়াতে সাহস পেত না।” তিনি সেই খাবার স্পর্শ না করে ফিরিয়ে দেন এবং তাঁর এই অহিংস দর্শনের ওপর অটল থাকেন।
- আল-মাররি তাঁর মৃত্যুর আগে ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন যেন তার কবরে একটি বিশেষ পঙক্তি লিখে দেওয়া হয়। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের শেষ গন্তব্য যে মাটি, সেখানেও যেন তার দর্শনটি জীবন্ত থাকে। তার সেই কবরের ফলকে আজও লেখা আছে: “আমার প্রতি আমার পিতার করা অপরাধে আমার জন্ম, কিন্তু আমি কারো প্রতি এই অপরাধ করিনি।” এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, তাকে এই দুঃখময় পৃথিবীতে এনে তার বাবা ভুল করেছিলেন, কিন্তু তিনি কোনো সন্তান জন্ম না দিয়ে সেই ভুলের ধারা বন্ধ করে দিয়েছেন।
- বাগদাদের এক ধনী ব্যক্তি একবার আল-মাররিকে একটি অত্যন্ত দামী এবং উন্নতমানের পশমী চাদর উপহার দিয়েছিলেন। আল-মাররি সেটি গ্রহণ করেন এবং শরীরে জড়িয়ে রাখেন। কিছু সময় পর সেই ধনী ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হুজুর, কাপড়টি আপনার কেমন লাগছে?” আল-মাররি শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “এই চাদরটি আমাকে কেবল একটি জিনিসই শেখাচ্ছে— যে অন্ধকার আমি চারদিকে দেখছি, চাদরটি তার চেয়েও বেশি অন্ধকার হতে পারে না।” তাঁর এই উত্তর বুঝিয়ে দেয় যে, বাহ্যিক চাকচিক্য বা বিলাসিতা তার মনের চিরস্থায়ী নির্লিপ্ততাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারেনি।
- একবার তাঁর বাড়িতে একটি কবুতর বাসা বেঁধেছিল। আল-মাররির পরিচারক ভুল করে কবুতরটির ডিমগুলো সরিয়ে ফেলে। আল-মাররি যখন এটি জানতে পারলেন, তখন তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং টানা কয়েকদিন অনাহারে থাকেন। তিনি বলতেন, “যে ব্যক্তি একটি ক্ষুদ্র পাখির বাসা নষ্ট করার কষ্ট অনুভব করতে পারে না, সে কীভাবে স্রষ্টার নৈকট্য আশা করে?” তাঁর এই সংবেদনশীলতা কেবল মানুষের জন্য নয়, বরং প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রাণের জন্য ছিল সমভাবে বিস্তৃত।
- আরব বিশ্বের সেরা ব্যাকরণবিদরা একবার তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য এক জটিল শব্দের ওপর দীর্ঘ আলোচনা শুরু করেন। তারা ভেবেছিলেন অন্ধ কবি হয়তো ব্যাকরণের সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচ ধরতে পারবেন না। আল-মাররি কিছুক্ষণ তাদের কথা শুনে এমন এক বিশ্লেষণ দিলেন যে, উপস্থিত পণ্ডিতরা স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে তারা যা এতদিন ধরে পড়েছেন, আল-মাররি তার চেয়েও গভীরে যেতে পেরেছেন। তখন তিনি হাসিমুখে বলেছিলেন, “চোখ নেই বলে আমার জ্ঞানও নেই— এই ধারণাটি কেবল তাদেরই থাকতে পারে যারা নিজেদের মনের চোখেও অন্ধকার দেখে।”
- শোনা যায়, আলেপ্পোর তৎকালীন আমির আল-মাররির পাণ্ডিত্যের কথা শুনে তাঁকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা উপহার পাঠিয়েছিলেন যেন তিনি তার রাজসভায় একবার পদধূলি দেন। আল-মাররি সেই উপহার ফিরিয়ে দিয়ে বার্তা পাঠান: “আমি কোনো শাসক বা ধনাঢ্য ব্যক্তির মুখাপেক্ষী নই। যবের রুটি আর কুয়োর পানি আমার জন্য যথেষ্ট। যে ব্যক্তির কোনো পার্থিব আকাঙ্ক্ষা নেই, তাকে স্বর্ণ দিয়ে প্রলুব্ধ করা বাতুলতা মাত্র।”
- তাঁর মৃত্যুর সময় যখন চারদিকে মানুষ কান্নাকাটি করছিল, তখন তিনি খুব শান্ত ছিলেন। জনৈক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হুজুর, আপনি কি পরকাল নিয়ে ভীত নন?” আল-মাররি একটি রহস্যময় হাসি দিয়ে বলেছিলেন, “আমি কেবল একটি জিনিসই নিয়ে যেতে পারছি— আমার সেই নীরবতা, যা আমাকে সারাজীবন পৃথিবীর সব কোলাহল থেকে রক্ষা করেছে। বাকি সব তো ধুলোর পাওনা ধুলোকে দিয়ে যাচ্ছি।”
এই অ্যানেকডোটগুলো প্রমাণ করে যে আল-মাররি কেবল একজন তাত্ত্বিক দার্শনিক ছিলেন না, তিনি তাঁর দর্শনকে নিজের জীবনে কঠোরভাবে পালন করতেন।
আবু আল-আলা আল-মাররি এমন একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যাঁর প্রভাব কেবল তাঁর সমসাময়িককালেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা এক সহস্রাব্দ পেরিয়ে আজও বিশ্ব সাহিত্য এবং দর্শনের আঙিনায় প্রাসঙ্গিক। তাঁর উত্তরাধিকারকে প্রধানত তিনটি ধারায় ভাগ করা যায়: সাহিত্যিক প্রভাব, দার্শনিক উত্তরাধিকার এবং আধুনিক মুক্তচিন্তার ওপর তার ছায়া।
আল-মাররির সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক উত্তরাধিকার হলো তাঁর ‘রিসালাত আল-গুফরান’। অনেক গবেষক (যেমন স্প্যানিশ পণ্ডিত মিগুয়েল আসিন পালাসিওস) মনে করেন, দান্তের বিখ্যাত মহাকাব্য ‘ডিভাইন কমেডি’ আল-মাররির এই গ্রন্থ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। আল-মাররি দান্তের কয়েকশ বছর আগেই বর্ণনা করেছিলেন কীভাবে একজন কবি স্বর্গ ও নরক ভ্রমণ করেন এবং সেখানে অতীতের বিখ্যাত কবি ও ব্যক্তিদের সাথে আলাপ করেন। সাহিত্যে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ বা স্যাটায়ার ব্যবহারের মাধ্যমে ধর্মীয় ও সামাজিক গোঁড়ামিকে আক্রমণ করার যে ধারা, তার অন্যতম অগ্রপথিক ছিলেন আল-মাররি।
আরব বিশ্বের পরবর্তী কবি ও লেখকদের কাছে তিনি ছিলেন ‘কবিদের কবি’। তাঁর সরাসরি কোনো ছাত্র না থাকলেও, পরবর্তী যুগের বহু মুক্তমনা কবি তার ‘লুজুমিয়াত’ (Luzumiyyat) কাব্যগ্রন্থের ছক অনুসরণ করেছেন। বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত আরব কবি যেমন আদোনিস এবং মাহমুদ দারবিশ আল-মাররিকে তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক পিতা হিসেবে গণ্য করতেন। সিরীয় কবি আদোনিস তাঁকে “প্রথম আধুনিক কবি” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, কারণ আল-মাররিই প্রথম কবিতায় ব্যক্তিগত চিন্তা ও যুক্তিবাদকে প্রথাগত বন্দনার ওপরে স্থান দিয়েছিলেন।
আল-মাররি কেবল কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন চিন্তকও। তাঁর উত্তরাধিকার দর্শনের ক্ষেত্রগুলোতে আজও অম্লান। বর্তমান যুগের প্রাণী অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা আল-মাররিকে তাদের অন্যতম আদি অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন। হাজার বছর আগে তাঁর লেখা কবিতা—যেখানে তিনি পশুপাখির দুধ বা মধু গ্রহণকে ‘চুরি’ ও ‘অবিচার’ বলেছিলেন—তা আধুনিক ‘ভেগানিজম’-এর দর্শনের সাথে হুবহু মিলে যায়।
পৃথিবীতে সন্তান জন্ম না দেওয়ার যে দার্শনিক অবস্থান (Antinatalism), তার ইতিহাসে আল-মাররি এক অবিস্মরণীয় নাম। তাঁর কবরের সেই বিখ্যাত এপিটাফ আজও দার্শনিক মহলে আলোচিত।
আল-মাররিকে বলা হয় ‘প্রাচ্যের লুক্রেটিয়াস’ বা ‘আরবদের দান্তে’। যদিও তাঁর চিন্তাগুলো তৎকালীন সময়ে অনেকের কাছে আপত্তিকর মনে হতো, কিন্তু আধুনিক যুগে তাঁর মুক্তচিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে বিশ্বব্যাপী প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। আধ্যাত্মিক ও আবেগময় ধারার বিপরীতে আল-মাররি একটি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক মরমিবাদ’ উপস্থাপন করেন।
আল-মাররির উত্তরাধিকার কেবল প্রশংসার নয়, তা বিতর্কেরও। মধ্যযুগের অন্ধকার সময়েও তিনি যেভাবে ধর্মের নামে চলা ব্যবসা এবং অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন, তা তাঁকে আরব্য সাহিত্যের ‘ভলতেয়ার’ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। তাঁর প্রভাব এতটাই প্রবল যে, ২০১৩ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো তাঁর একটি ভাস্কর্য ভেঙে ফেলেছিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, মৃত্যুর ১০০০ বছর পরেও তাঁর মুক্তচিন্তা এবং যুক্তিবাদের শক্তি ধর্মান্ধদের কাছে ভয়ের কারণ।

আ ল – মা র রি র ক বি তা
আল-মাররির কবিতায় তাঁর দার্শনিক ভাবনা সম্যকরূপে প্রকাশিত। তাঁকে বলা যায় একজন আধ্যাত্মিক নাস্তিক, বা সংশয়বাদী মরমি, কিংবা যুক্তিবাদী সন্ন্যাসী। তাঁর মরমিবাদ তথা মিস্টিসিজম প্রেমাবেগমূলক নয়, বরং বিরাগমূলক। তিনি জগতকে ভালোবেসে নয়, বরং জগতকে চিনতে পেরে নির্লিপ্ত হয়েছেন। তাঁর দর্শন আমাদের শেখায় অন্ধ আনুগত্য বর্জন করতে, প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি দয়া করতে এবং নিজের বুদ্ধিকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিতে। তিনি স্রষ্টাকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু স্রষ্টার নামে চালানো মানুষের তৈরি নিয়মগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি স্রষ্টার প্রতি অনুরাগের চেয়ে সৃষ্টির প্রতি করুণা এবং নিজের অস্তিত্বের প্রতি একধরনের নির্মোহ বিদ্রূপকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর দর্শন একাধারে নির্মোহ এবং বিষণ্ণ। তিনি পৃথিবীকে দেখেছেন এক জরাজীর্ণ সরাইখানা হিসেবে, যেখানে মানুষ কেবল কিছুক্ষণের মেহমান। তাঁর কবিতার মূল বক্তব্য হলো: ভোগ বিলাস ত্যাগ করো এবং নিজের বুদ্ধিকে শাণিত করো। তাঁর কবিতাগুলো পড়লে বোঝা যায়, তিনি মনে করেন নির্লিপ্তি এবং অনাসক্তিই হলো প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা। আল-মাররির এই কবিতাগুলো আসলে কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং মানুষের অজ্ঞতা ও অহংকারের বিরুদ্ধে এক বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। তিনি এমন একজন মরমি, যিনি ঈশ্বরকে খুঁজেছেন দয়ায় এবং মুক্তির পথ খুঁজেছেন ত্যাগের মাঝে।
১.
জগতের মানুষ দুই দলে বিভক্ত—
একদল, যাদের মগজ আছে কিন্তু ধর্ম নেই,
অন্যদল, যাদের ধর্ম আছে কিন্তু মগজ নেই।
তুমি হদিস খোঁজো তোমার সেই বিবেকের,
যা তোমাকে সত্য আর মিথ্যার ফারাক শেখাবে;
কারণ মানুষের বানানো সব পথই আজ ধুলোয় ঢাকা,
কেবল যুক্তির আলোটুকুই চিরকাল অম্লান।
২.
অবিচার করো না সেই অবলা প্রাণীর প্রতি—
যার উদর চিরে তুমি খাদ্য খোঁজো,
কিংবা যার দুধ কেড়ে নাও তার সন্তানের মুখ থেকে।
যে মধু মৌমাছি তিলে তিলে জমায় ফুলের রেণু থেকে,
তা তোমার নয়; ওটা তাদেরই অর্জিত ধন।
মুক্ত করো সেই পাখিদের, যারা খাঁচায় বন্দী হয়ে গুমরে মরে;
মনে রেখো, তোমার মতো তাদেরও আছে এক আকাশ তৃষ্ণা।
৩.
আমি এক বন্দী, শিকল আমার দুই—
এক আমার চোখের অন্ধকার, অন্যটি গৃহের চার দেয়াল।
কিন্তু সত্য তো এই যে, এই দেহটাই এক বিশাল কারাগার!
আত্মা সেখানে ছটফট করে মুক্তির আশায়।
কেন তবে আমরা উৎসব করি শিশুর আগমনে?
সে তো কেবল নতুন এক বন্দীরই পদধ্বনি;
মরণই তো শ্রেষ্ঠ বন্ধু, যে এসে খুলে দেয় এই লোহার কপাট।
৪.
ধীরে হাঁটো মাটির ওপর দিয়ে, এই মাটি তোমাকেই ডাকছে;
মনে রেখো, এই ধুলোবালি এককালে ছিল কোনো মানুষের দেহ।
যে রাজার মুকুট আজ স্বর্ণের আলোয় ঝকঝক করে,
কাল সে-ও মিশে যাবে পথের এই ধূসর ধুলোয়।
আমরা সবাই তো এক অন্তহীন নাটকের কুশীলব মাত্র,
পর্দা নামলে যেখানে রাজা আর প্রজার কোনো তফাত থাকে না।
৫.
তুমি তোমার শরীরকে দামী পোশাকে ঢেকে রাখো,
কিন্তু তোমার আত্মা পড়ে আছে জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থায়।
কপালে সিজদার চিহ্ন আঁকলেই কি ধার্মিক হওয়া যায়,
যদি তোমার অন্তরে অন্যের প্রতি ঘৃণা আর লোভ জমা থাকে?
ঈশ্বরকে মন্দিরে বা মসজিদে খুঁজতে যেও না,
বরং খুঁজে দেখো সেই সত্যের মাঝে, যা তোমার বিবেক তোমাকে বলে।
কারণ সত্যই হলো আসল উপাসনা, আর মিথ্যা হলো নরকের আগুন।
৬.
দিনগুলো একের পর এক পার হয়ে যাচ্ছে,
যেন একদল পিপীলিকা তাদের গন্তব্যের দিকে ছুটছে।
আমরা হাসছি, খেলছি, অথচ প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের কবরের কাছে নিয়ে যাচ্ছে।
এই যে আকাশ, যা প্রতিদিন সূর্য আর চন্দ্রকে বয়ে আনে—
সে তো আমাদের পূর্বপুরুষদেরও দেখেছিল, যারা আজ মাটির নিচে নীরব।
সময় কাউকে ক্ষমা করে না, রাজা কিংবা ভিক্ষুক;
সবার শেষ ঠিকানা সেই একই মাটির বিছানা।
৭.
হে অভিলাষী মানুষ! তুমি কেন এই ধ্বংসশীল জগতের পেছনে ছুটছো?
যে সম্পদ আজ তোমার গর্ব, কাল তা অন্য কারো হাতে শোভা পাবে।
তুমি যা কিছুই অর্জন করো না কেন, বিদায়বেলায় তোমার হাত থাকবে খালি।
প্রকৃত সম্পদ তো সেটিই, যা চোর চুরি করতে পারে না—
অর্থাৎ তোমার অর্জিত জ্ঞান এবং তোমার হৃদয়ের প্রশান্তি।
মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে ফেলো, তবেই তুমি সত্যিকারের স্বাধীন মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারবে।
৮.
পূর্বপুরুষেরা যা করে গেছেন, তুমিও কি অন্ধের মতো তাই করবে?
তারা তো মানুষই ছিলেন, দেবতা ছিলেন না; তাদেরও ভুল ছিল।
প্রতিটি মানুষের উচিত নিজের প্রদীপ নিজে জ্বালানো,
অন্যের আলোয় পথ চলতে গেলে হোঁচট খাওয়ার ভয় থেকে যায়।
তোমার জ্ঞানই হোক তোমার পথপ্রদর্শক, আর তোমার অভিজ্ঞতা হোক তোমার শিক্ষক।
অন্ধ বিশ্বাসের চেয়ে শিক্ষিত সংশয় অনেক বেশি সম্মানের।
৯.
জন্মের আগে আমি কোথায় ছিলাম? মৃত্যুর পর আমি কোথায় যাবো?
এই অসীম প্রশ্নের উত্তর কোনো কিতাবে লেখা নেই।
আমরা এসেছি এক অজানা অন্ধকার থেকে, আবার ফিরে যাবো সেই নিস্তব্ধতায়।
মাঝখানের এই সময়টুকু কেবল এক ঝাপসা স্বপ্ন মাত্র।
তাই বিবাদ করো না, ঘৃণা ছড়িও না;
বরং এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে একে অপরের প্রতি দয়ালু হও,
কারণ আমরা সবাই একই ডুবন্ত নৌকার যাত্রী।
১০.
মাটির গভীরে যারা শুয়ে আছে, তাদের হাড়গুলো আজ মিশে একাকার হয়ে গেছে।
তুমি কি বলতে পারো, এর মধ্যে কোনটি রাজার হাড় আর কোনটি দাসের?
তারা সবাই একসময় পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়াতো,
অথচ আজ তাদের মাথার ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যায় নিঃশব্দে।
অহংকার করো না তোমার বংশ কিংবা ক্ষমতা নিয়ে,
কারণ ধুলোবালি কাউকেই আলাদা করে চেনে না।
১১.
ধর্মের নামে যারা মানুষকে ভয় দেখায়, তারা আসলে নিজেদের আখের গোছায়।
তারা স্বর্গের চাবি বিক্রি করে আর নরকের ভয় দেখিয়ে সম্পদ জমায়।
অথচ প্রকৃত ধর্ম তো লুকানো থাকে মানুষের সততার ভেতর।
উপাসনালয় পবিত্র হয় না দামী পাথরে, বরং তা পবিত্র হয় পবিত্র হৃদয়ে।
ওহে পথিক, মানুষের তৈরি এসব ধোঁকাবাজি থেকে দূরে থাকো,
তোমার নিজের বিবেকই হোক তোমার মন্দির।
১২.
আমি লজ্জিত বোধ করি যখন দেখি মানুষ নিজের জিহ্বার স্বাদের জন্য রক্ত ঝরায়।
একটি মাছ তার আপন জলাশয়ে সুখী ছিল, তুমি তাকে কেন কেড়ে নিলে?
একটি পাখি তার ডানায় ভর করে আকাশ ছুঁতে চেয়েছিল, তুমি কেন তাকে খাঁচায় পুড়লে?
মনে রেখো, প্রাণের স্পন্দন সবার ভেতরেই সমান;
তোমার রক্ত যেমন লাল, সেই ক্ষুদ্র পতঙ্গটির প্রাণও তেমনি মূল্যবান।
দয়া করো, যেন মৃত্যুর সময় তুমি লজ্জিত না হও।
১৩.
আমি যখন সত্য বলি, তখন চারপাশ জনশূন্য হয়ে যায়।
মানুষ মিথ্যাকে ভালোবাসে কারণ তা শুনতে আরামদায়ক।
জ্ঞান হলো এক ভারী পাথর, যা বহন করার ক্ষমতা সবার নেই।
আমি একা চলছি এই দীর্ঘ পথে, তাতে আমার কোনো আক্ষেপ নেই;
কারণ অন্ধের ভিড়ে একা চোখ মেলা মানুষটি সবসময়ই নিঃসঙ্গ হয়।
১৪.
তোমাদের পূর্বপুরুষেরা যা বলে গেছেন, তা-ই কি শেষ কথা?
সময়ের সাথে সাথে সব কিছুই তো পুরনো হয়, জীর্ণ হয়।
কেন তবে নতুন ভাবনাকে তোমরা পাপ বলো?
প্রতিটি যুগে সত্য নতুন পোশাকে আসে, তাকে চিনে নেওয়ার চোখ চাই।
পুরনো কিতাব কেবল কাগজের স্তূপ, যদি না তুমি সেখান থেকে জ্ঞানের আলো নিতে পারো।
নিজের বুদ্ধিকে বন্দি করো না কোনো প্রাচীন দেয়ালের মাঝে।
১৫.
তুমি যে মাটির ওপর দিয়ে দর্প ভরে হেঁটে চলেছ,
ভুলে যেও না—এই মাটি আসলে আমাদেরই পূর্বপুরুষদের দেহের ধূলিকণা।
যদি পারো তবে অতি সাবধানে পা ফেলো,
কারণ তুমি হয়তো কোনো এক সুন্দরীর কপাল কিংবা কোনো বীরের বুকের ওপর দিয়ে হাঁটছ।
এই বাতাস, যা আজ তোমার নিশ্বাসে মিশছে,
তা একদিন কারো দীর্ঘশ্বাস ছিল।
আমরা সবাই মাটির ঋণী, আর মাটি তার ঋণ শোধ করে নিতে জানে।
১৬.
আমি দেখলাম মানুষ দলে দলে বিভক্ত হয়ে একে অপরকে অভিশাপ দিচ্ছে।
অথচ সবার গন্তব্য তো সেই একই অন্ধকার কবর।
কেউ বলে সত্য অমুক কিতাবে, কেউ বলে অন্য কোথাও।
কিন্তু আমি বলি—সত্য কেবল তার কাছেই পরিষ্কার, যার মন কুসংস্কারের মরিচা থেকে মুক্ত।
ঈশ্বর কি কেবল একটি নির্দিষ্ট দলের জন্য?
না, তিনি যদি থাকেন, তবে তিনি সবার যুক্তির অতীত এক নৈঃশব্দ্য।
১৭.
বেশি কথা বলো না, কারণ শব্দ অনেক সময় সত্যকে আড়াল করে ফেলে।
নীরবতা হলো সেই আয়না, যেখানে আত্মা নিজেকে দেখতে পায়।
যারা সত্য খুঁজে পেয়েছে, তারা শান্ত হয়ে গেছে;
আর যারা কিছুই জানে না, তারাই চিৎকার করে জগত মাত করছে।
তোমার ভেতরে যে নিঃশব্দ জগত আছে, সেখানে ডুব দাও;
বাইরের এই কোলাহল কেবল মায়া ছাড়া আর কিছুই নয়।
১৮.
এই পৃথিবী এক জীর্ণ সরাইখানা, যেখানে আমরা কেবল এক রাতের অতিথি।
সকালেই আমাদের তল্পিতল্পা গুটিয়ে অজানা পথে বেরিয়ে পড়তে হবে।
তবে কেন এই কাড়াকাড়ি? কেন এই অপরের হক ছিনিয়ে নেওয়া?
তুমি যা কিছুই আঁকড়ে ধরো না কেন, তা এখানেই পড়ে থাকবে।
কেবল তোমার সুকর্ম আর কারো চোখের জল মোছার স্মৃতিটুকুই তোমার সাথে যাবে,
যদি আদৌ কিছু সাথে নেওয়ার থাকে।
১৯.
তুমি কি মনে করো তোমার পূর্বপুরুষরা যা বলে গেছেন তা-ই অভ্রান্ত সত্য?
সময় বদলে গেছে, জগত বদলে গেছে, কিন্তু তোমার বুদ্ধি কেন এখনো শিকলবন্দী?
জ্ঞান হলো এক বহমান নদী, একে কোনো একটি নির্দিষ্ট বাধে আটকে রাখা যায় না।
নিজের প্রদীপ নিজে জ্বালো, অন্যের ধার করা আলোয় পথ চলতে গেলে অন্ধকার তোমাকে গিলে খাবে।
বিদ্রোহী হও সেইসব মিথ্যার বিরুদ্ধে, যা ধর্মের নামে মানুষের আত্মাকে ছোট করে রাখে।
২০.
তুমি কি মনে করো এই নক্ষত্ররাজি তোমার ভাগ্যের কথা ভেবে ঘোরে?
না, তারা তাদের নিজস্ব পথে চলে, যেমনটা তারা চলেছিল তোমার জন্মের আগে।
এই নীল আকাশ আমাদের কান্না শোনে না, আমাদের প্রার্থনাতেও তার কিছু যায় আসে না।
আমরা যেন সমুদ্রের তীরের সেই বালুকণা, যা জোয়ারের তোড়ে ভেসে যায়;
মহাকাল কেবল তার আপন খেলায় মত্ত, সেখানে মানুষের হাহাকার বড়ই তুচ্ছ।
২১.
মরণ যখন আসবে, সে তোমার পদবী বা তোমার রেশমি পোশাক দেখবে না।
সে দেখবে না তুমি কোন ভাষায় প্রার্থনা করতে আর কোন উপাসনালয়ে যেতে।
কবরের মাটির কাছে সব ব্যবধানই ঘুচে যায়;
সেখানে ধার্মিকের হাড় আর পাপীর হাড়ের কোনো তফাত নেই।
আমরা সবাই তো সেই একই মাটির তৈরি পুতুল,
যাকে সময় একদিন ভেঙে আবার নতুন কিছু গড়বে।
২২.
হজ করতে কেন মরুভূমি চিরে দূর দেশে যাও?
যদি তোমার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে, তবে তোমার যাত্রা তো ব্যর্থ।
পাথরের তৈরি ঘরকে প্রণাম করার চেয়ে বড় কাজ হলো—
কোনো এক ভাঙা হৃদয়কে জোড়া লাগানো।
যদি স্রষ্টাকে খুঁজতেই হয়, তবে তাকে নিজের ভেতরে তাকাও;
কারণ করুণার মধ্যেই তিনি বাস করেন, কোনো রাজকীয় দালানে নয়।
২৩.
মানুষ কেবল অভ্যাসের দাস, তারা সত্যের দাস নয়।
শৈশবে তাদের যা শেখানো হয়, তারা বৃদ্ধকাল পর্যন্ত তাই আওড়ায়।
যদি তুমি তাদের প্রশ্ন করো—কেন তোমরা এটা করো?
তারা বলবে, ‘আমাদের পিতারাও এমনটা করতেন।’
হায়! তারা কি জানে না যে পিতারাও ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন না?
নিজের চোখ দিয়ে জগতকে দেখো, অন্যের চশমা খুলে ফেলো।
২৪.
সুখ যখন আসে, তাকে হাসিমুখে গ্রহণ করো কিন্তু আঁকড়ে ধরে থেকো না।
দুঃখ যখন আসে, তাকেও আসতে দাও কিন্তু ভেঙে পড়ো না।
কারণ কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়—না এই বসন্তের ফুল, না এই শীতের ঝরা পাতা।
যে জানে যে কিছুই তার নিজের নয়, সেই আসলে জগতের সবচেয়ে সুখী মানুষ।
শূন্য হাতে এসেছিলে, শূন্য হাতেই যাবে—মাঝখানের এই মায়া কেবল এক মুহূর্তের বিভ্রম।
২৫.
পৃথিবীটা এখন এমন এক বাজারে পরিণত হয়েছে, যেখানে মিথ্যার দাম সবচেয়ে বেশি।
মানুষ সেই বক্তাকেই পছন্দ করে, যে তাদের কানের কাছে মিষ্টি মিথ্যার গুঞ্জন করে।
তুমি যদি সত্য বলতে চাও, তবে একাকী থাকার প্রস্তুতি নাও;
কারণ সত্য তেতো ওষুধের মতো, যা সবাই গিলতে পারে না।
মানুষের হাততালি পাওয়ার নেশায় নিজের বিবেককে বিসর্জন দিও না,
মনে রেখো—বিবেকের আদালতই হলো পৃথিবীর সর্বোচ্চ আদালত।
২৬.
নদী বয়ে চলে তার নিজের খেয়ালে, পাহাড় দাঁড়িয়ে থাকে অনাদিকাল ধরে;
তারা জানে না তুমি কে, তারা পরোয়া করে না তোমার কত সম্পদ আছে।
তুমি আসার আগেও এই সূর্য উদিত হতো, তুমি চলে যাওয়ার পরও এই চাঁদ আলো দেবে।
তবে কেন এই বৃথা আস্ফালন? কেন এই অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার চেষ্টা?
প্রকৃতির এই বিশাল ক্যানভাসে তুমি কেবল একটি অদৃশ্য বিন্দু মাত্র;
বিন্দুর মতো শান্ত থাকো, তবেই মহাসমুদ্রের দেখা পাবে।
২৭.
প্রকৃত আজাদ বা মুক্ত মানুষ সেই, যে নিজের কুপ্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে।
তুমি যদি হাজারটা কিতাব পড়ে থাকো কিন্তু তোমার ভেতরে করুণা না জাগে,
তবে তুমি কেবল কাগজের বোঝা বহনকারী এক গাধা ছাড়া আর কিছুই নও।
জ্ঞান মানে তথ্য জমা করা নয়, জ্ঞান মানে নিজের ভেতরের অন্ধকারকে চেনা।
যেদিন তুমি নিজের ভুলগুলো দেখতে পাবে, জানবে সেই দিনই তোমার জ্ঞানের প্রথম পাঠ শুরু হয়েছে।
২৮.
আমরা এই পৃথিবীতে আসি আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, আবার চলেও যাই অনিচ্ছায়।
মাঝখানের এই সময়টুকুতে আমরা কেবল যন্ত্রণার ডালি সাজাই।
আমরা ঘর বাঁধি কিন্তু সেই ঘরে চিরকাল থাকতে পারি না;
আমরা ভালোবাসার মানুষ খুঁজি কিন্তু বিচ্ছেদের হাত থেকে বাঁচতে পারি না।
যদি পারো তবে এমনভাবে বাঁচো যেন তোমার অস্তিত্ব কারো কষ্টের কারণ না হয়,
আর মৃত্যুর সময় যেন তোমার কোনো অনুশোচনা না থাকে।
২৯.
শব্দ কেবল সীমানা তৈরি করে, নীরবতা সেই সীমানা ভেঙে দেয়।
তুমি যখন প্রার্থনা করো, তোমার ওষ্ঠ কাঁপানোর প্রয়োজন নেই;
যদি তোমার হৃদয়ে আকুতি থাকে, তবে সেই নিঃশব্দ প্রার্থনা আকাশ পর্যন্ত পৌঁছাবে।
যারা সত্যের গভীরে ডুবেছে, তারা বোবা হয়ে গেছে;
কারণ সেই বিশালতার কথা প্রকাশ করার মতো ভাষা কোনো অভিধানে নেই।
নীরব হও, শুনো তোমার ভেতরের সেই মহাসঙ্গীত—যা কেবল শূন্যতার মাঝে বাজে।
৩০.
দেহ হলো মাটির তৈরি একটি পাত্র, আর আত্মা হলো তাতে রাখা দুষ্প্রাপ্য সুরা।
পাত্রটি যখন ভেঙে যায়, সুরা মিশে যায় অসীমতায়।
তুমি কেন এই ভঙ্গুর পাত্রটির এত যত্ন করো?
কেন একে দামী বসনে সাজাও আর সুস্বাদু খাবারে পুষ্ট করো?
মনে রেখো, মাটির জিনিস মাটিতেই মিশবে,
কেবল আত্মার আলোটুকুই হবে তোমার চিরস্থায়ী পরিচয়—যদি তুমি তাকে কলুষমুক্ত রাখতে পারো।
৩১.
আমরা যেন দাবার ছকের একেকটি ঘুঁটি, যাকে এক অদৃশ্য হাত চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
আজ যে রাজা হয়ে বসে আছে, কাল সে-ই হয়তো পথের ধুলোয় গড়াগড়ি খাবে।
এই যে জগতের উত্থান-পতন, হার-জিত—সবই এক মহাজাগতিক পরিহাস।
তাই সফলতায় উদ্ধত হয়ো না, আর ব্যর্থতায় মুষড়ে পড়ো না।
কারণ এই নাটকের পর্দা যখন নামবে, তখন ঘুঁটিগুলো সব একই বাক্সে ফিরে যাবে।
৩২.
তুমি সারা রাত জেগে তসবিহ টিপলে আর কপালে সিজদার চিহ্ন বসালে—
কিন্তু দিনের আলোয় যখন বেরোলে, তখন মিথ্যা বললে আর অন্যের মনে কষ্ট দিলে।
তবে তোমার সেই দীর্ঘ প্রার্থনার মূল্য কী?
স্রষ্টা কি তোমার শব্দের কাঙাল?
না, তিনি তোমার কাজের সাক্ষী।
নিরপরাধ প্রাণীকে জীবন দান করা আর ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া—
হাজার বছরের নফল ইবাদতের চেয়েও আমার কাছে এটিই বড় ধর্ম।
৩৩.
জগতটা হলো এক তৃষ্ণার্ত হরিণের সামনে থাকা মরুভূমির মরিচিকা।
তুমি যত এর পেছনে ছুটবে, ততই তৃষ্ণা বাড়বে কিন্তু জল পাবে না।
এই যে সম্পদ, ক্ষমতা আর রূপের মোহে তুমি অন্ধ হয়ে আছ—
এগুলো হলো বরফের প্রাসাদের মতো, যা রোদের আলো লাগলেই গলে যাবে।
বুদ্ধিমান সেই, যে মায়ার জালে নিজেকে জড়ায় না,
বরং নির্লিপ্ত থেকে জীবনের রুক্ষ পথটুকু পার করে দেয়।
৩৪.
পুরো পৃথিবী যদি অন্ধকারের পক্ষে দাঁড়ায়, তবুও তুমি আলোর পক্ষে থেকো।
যদি হাজার জন মানুষ তোমাকে বলে: মিথ্যাই সত্য, তবুও তুমি নিজের বিবেকের কথা শুনো।
সংখ্যাধিক্য কখনো সত্যের মাপকাঠি হতে পারে না।
সত্য অনেক সময় একা থাকে, নিঃসঙ্গ থাকে—
কিন্তু সেই একলা চলাই হলো বীরের ধর্ম।
তোমার ভেতরে যে ছোট প্রদীপটি জ্বলছে, সেটিই তোমাকে অন্ধকার পার করে দেবে।
আল-মাররির জীবনদর্শন থেকে নেওয়া কিছু ‘মরমি সূত্র’:
ত্যাগই মুক্তি: কোনো কিছুর প্রতি আসক্তি না থাকাই হলো পরম শান্তি।
বিবেকই ঈশ্বর: মানুষের অন্তরের শুভবোধই হলো মহাজাগতিক সত্যের প্রতিফলন।
মৌনতাই শক্তি: কোলাহলে সত্য হারায়, নীরবতায় সত্য ধরা দেয়।
৩৫.
একদল মানুষ আছে যারা অন্ধবিশ্বাসে ডুবে থেকে মনে করে তারা আলোয় আছে,
আরেকদল মানুষ আছে যারা সত্য জেনেও ক্ষমতার লোভে অন্ধ সেজে থাকে।
এই জগতের তামাশা দেখো—
সত্য এখানে এক কোণায় পড়ে ডুকরে কাঁদে,
আর ভণ্ডামি রাজসিংহাসনে বসে অট্টহাসি হাসে।
তুমি যদি মুক্তি চাও, তবে এই দুই দল থেকেই নিজেকে দূরে সরিয়ে নাও।
৩৬.
পুরোহিতরা স্বর্গের বর্ণনা দেয় এমনভাবে, যেন তারা সেখান থেকে ঘুরে এসেছে,
আর পাপীদের নরকের ভয় দেখায় যেন তারা সেখানকার দ্বাররক্ষী।
কিন্তু সত্য হলো এই—কবর থেকে আজ পর্যন্ত কেউ ফিরে আসেনি খবর দিতে।
তাই কাল্পনিক স্বর্গের আশায় আজকের দিনটিকে বিষিয়ে দিও না;
যদি ভালো কিছু করতেই হয়, তবে তা করো স্রেফ মানুষের প্রতি দয়া থেকে, কোনো পুরস্কারের লোভে নয়।
৩৭.
হে মৃত্যু! তুমি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এক ঘুম, যা সব যন্ত্রণার অবসান ঘটায়।
এই দেহটা ছিল আমার আত্মার ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক ভারী বোঝা,
আর এই জগত ছিল এক সংকীর্ণ কারাগার।
লোকে মৃত্যুকে ভয় পায় কারণ তারা জানে না যে,
খাঁচা ভাঙলেই কেবল পাখি তার আসল আকাশের দেখা পায়।
আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন আমি মাটির সাথে মাটি হয়ে যাবো এবং সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে চলে যাবো।
৩৮.
তুমি যদি তোমার মন্দিরে বা মসজিদে কেবল কপাল ঠুকতে যাও, তবে তুমি বিফল।
যদি তোমার চিন্তার ভেতর অন্ধকার থাকে, তবে প্রদীপের আলো তোমার কোনো কাজে আসবে না।
তোমার বিবেকই হলো তোমার আসল কিবলা বা পবিত্র দিক।
যখনই তুমি কোনো অন্যায় করতে যাও, তোমার ভেতরের যে কণ্ঠস্বরটি তোমাকে বাধা দেয়—
জানবে সেটিই হলো পরম সত্যের বাণী, যা কোনো কিতাবে লেখা নেই।
৩৯.
তুমি কেন দূর-দূরান্তে ছুটে বেড়াও শান্তির খোঁজে?
পবিত্র ভূমি তোমার পায়ের নিচে নয়, বরং তোমার বুকের ভেতরে।
যদি তোমার অন্তর কলুষিত থাকে, তবে গঙ্গার জল বা কাবার পাথর তোমাকে পবিত্র করতে পারবে না।
যে ব্যক্তি নিজের অহংকারকে জয় করেছে, সেই আসলে সব তীর্থস্থান ভ্রমণ করেছে।
তোমার নিজের সত্তার গহীনে ডুব দাও, সেখানেই মিলবে সেই মণি—যা তুমি বাইরে খুঁজে মরছো।
৪০.
শব্দ হলো এক ধরণের দেয়াল, যা মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
আমরা যত বেশি কথা বলি, সত্য তত বেশি কুয়াশার আড়ালে ঢাকা পড়ে।
যারা সত্যকে জেনেছে, তারা বোবা হয়ে গেছে; কারণ পরম সত্যের কোনো ভাষা নেই।
বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে, নদীর কলতানে আর রাতের নিস্তব্ধতায় যে সুর বাজে—
সেটিই হলো ঈশ্বরের আসল জিকির।
চুপ থাকো, আর সেই অনন্ত নিস্তব্ধতাকে তোমার ভেতরে জায়গা দাও।”
৪১.
জীবন হলো আগুনের শিখার মতো, যা এক পলক জ্বলে আবার নিভে যায়।
আমরা আসার আগে জগত যেমন ছিল, আমাদের পরেও তেমনই থাকবে।
মাঝখানের এই সময়টুকুতে আমরা কেবল ছায়ার পেছনে ছুটে বেড়াই।
কেন এই হানাহানি? কেন এই শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই?
আমরা সবাই এক বিশাল সমুদ্রের ঢেউ—মুহূর্তের জন্য জেগে উঠি, আবার লীন হয়ে যাই।
এই লীন হয়ে যাওয়ার মাঝেই রয়েছে পরম মুক্তি।
৪২.
লোভ হলো সেই শিকল, যা তোমাকে এই জগতের দাসে পরিণত করেছে।
তুমি যদি এক টুকরো রুটি আর এক আঁজলা জলে সন্তুষ্ট থাকতে পারো,
তবে পৃথিবীর কোনো সম্রাটের সাধ্য নেই তোমাকে বন্দী করার।
প্রকৃত বাদশাহ তো সে-ই, যার হারানোর কিছু নেই এবং পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও নেই।
নির্লোভ হওয়ার অর্থই হলো ঈশ্বরের মতো অপরাজেয় হওয়া।
৪৩.
মৃত্যুকে শত্রু মনে করো না, সে তো এক পরম দয়ালু বন্ধু।
যে ক্লান্তি তুমি সারাজীবন বয়ে বেড়িয়েছ, মৃত্যু এসে সেই বোঝা নামিয়ে নেয়।
সে তোমাকে অন্ধকার দেয় না, বরং এই জগতের ঝুটো আলো থেকে মুক্তি দেয়।
যখন সময় আসবে, তাকে হাসিমুখে বরণ করে নিও—
যেমন এক ক্লান্ত পথিক তার ঘরের বিছানাকে বরণ করে নেয়।
মৃত্যু মানে শেষ নয়, মৃত্যু মানে হলো এক মহাজাগতিক অখণ্ডতায় ফিরে যাওয়া।
৪৪.
জীবন তো কেবল এক ক্ষণস্থায়ী দহন,
যেমন প্রদীপের শেষ শিখাটি নিভে যাওয়ার আগে একবার জ্বলে ওঠে।
তুমি যাকে তোমার ‘অস্তিত্ব’ বলে আঁকড়ে আছো,
তা আসলে মহাকালের বালুকাবেলায় ধুয়ে যাওয়া এক রেখা মাত্র।
কেন এই বৃথা শোক? কেন এই বিচ্ছেদের হাহাকার?
নদী যেমন সাগরে মিশে নিজের নাম হারায়,
আমরাও তেমনি একদিন মিশে যাবো সেই আদি ও অনন্ত নিস্তব্ধতায়।
সেখানে নেই কোনো রাজা, নেই কোনো ভিক্ষুক;
সেখানে নেই কোনো স্বর্গ, নেই কোনো নরকের বিভীষিকা।
যদি মুক্তি চাও, তবে এই মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে ফেলো—
তোমার না থাকাটাই হোক তোমার সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
ধুলো যেমন ধুলোর সাথে মিশে শান্ত হয়,
আমার আত্মাও তেমনি খুঁজে পাবে তার চিরন্তন বিশ্রাম।
আমার চলে যাওয়া কোনো বিয়োগান্তক নাটক নয়,
বরং এক বন্দীর তার অন্ধকার ঘর থেকে মুক্তির পরম আনন্দ।


























































































































