থাইউমানভার (Thayumanavar) — দক্ষিণ ভারতের একজন মহাসাধক, দার্শনিক ও কবি-সন্ত। তিনি তামিল শৈব-ভক্তি ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। তাঁর জীবন, কর্ম, দর্শন এবং কবিতা ভক্তিমূলক আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য সমন্বয়।
থাইউমানভারের জন্ম ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি, দক্ষিণ ভারতের তিরুচিরাপল্লী অঞ্চলে। থাইউমানভারের নামটি তিরুচিরাপল্লির রকফোর্ট মন্দিরের দেবতা থাইউমানস্বামীর নাম থেকে উদ্ভূত। তিনি শৈশবেই তামিল ও সংস্কৃত ভাষায় গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। যুবক বয়সে তিনি তিরুচিরাপল্লী-র রাজা বিজয় রঙ্গন চোক্কানাধার-এর রাজকোষের দায়িত্ব পালন করেন।
ধীরে ধীরে তাঁর মনে জন্ম নেয় গভীর আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা। পরে আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভের জন্য তিনি একজন গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এই গুরুর প্রভাবে তাঁর আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটে। তিনি সংসার, চাকরি, রাজদরবারের ঐশ্বর্য সব কিছু ছেড়ে দিয়ে তপস্যা ও সন্ন্যাসের জীবন বেছে নেন। শৈব সিদ্ধান্ত দর্শন প্রচার করতে করতে ভ্রমণ করেন। তিনি শিবের উপাসনা ও মন নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দেন। সাধনার বিভিন্ন স্তর, প্রবৃত্তি-মনের সংঘর্ষ, আত্মশুদ্ধি, ব্রহ্মজ্ঞান ও ঈশ্বর-প্রেম নিয়ে তিনি শিক্ষা দিতেন। যোগ-দর্শনের ব্যাখ্যাতা হিসাবে রাজযোগ, ভক্তি, জ্ঞান ও তন্ত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে সহজ-সরল ভাষায় কবিতা রচনা করেন। শৈব ধারার ভক্তি-যোগী প্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন তিনি।
তাঁর জীবন ছিল পার্থিব লোভ ও ক্ষমতা থেকে মুক্ত হয়ে পরম সত্যের সন্ধানে এক অসাধারণ যাত্রা। তাঁর জীবনের শেষ সময়টি তিনি তিরুচিরাপল্লীর মৌন গুরু মঠে অতিবাহিত করেন। সেখানে তিনি ধ্যান ও সাধনায় নিমগ্ন থাকেন। তাঁর জীবন ছিল জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ ও তপস্যার মিশ্রিত রূপ।
১৭৪৪ সালের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু মৃত্যুর পরও তাঁর কাব্য, গীত ও দর্শন দক্ষিণ ভারতের ভক্তি-সংস্কৃতির মর্মে গভীরভাবে বেঁচে আছে।
থাইউমানভারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো তার দার্শনিক কবিতা। তিনি ১,৪০০-এর বেশি আধ্যাত্মিক গান ও কবিতা রচনা করেন, যেগুলো আজও ভক্তিমূলক সঙ্গীত হিসেবে দক্ষিণ ভারতে গাওয়া হয়। তার সমস্ত কাজ একটি একক সংকলন হিসাবে পরিচিত, যার নাম “থাইউমানভার তিরুপাডাল” (Thayumanavar Thiruppadal)।
তাঁর দর্শন মূলত অদ্বৈত বেদান্ত এবং শৈব সিদ্ধান্ত-এর সমন্বয়। তিনি শৈব ধর্মের ভক্তি এবং অদ্বৈত বেদান্তের জ্ঞানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে চূড়ান্ত সত্য বা ব্রহ্ম হলো এক ও অভিন্ন। তিনি শিখিয়েছেন যে আত্মা আর পরম সত্তা (পরমাত্মা) মূলত এক। এই দ্বৈততার বিভ্রম দূর করে নিজের ভেতরের ব্রহ্মকে উপলব্ধি করাই জীবনের লক্ষ্য। কিন্তু এই উপলব্ধি লাভ করতে হলে মনকে পরিশুদ্ধ করতে হয়।
তাঁর মতে, ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি হলো জ্ঞান লাভের একটি পথ। শুধু ভক্তি যথেষ্ট নয়, আবার শুধু জ্ঞানও নয়। ভক্তির উষ্ণতা ও জ্ঞানের গভীরতা—দুটো মিলেই আত্মার মুক্তি সম্ভব।
তিনি মনকে ‘বাঘের মতো চঞ্চল’ বলে বর্ণনা করেছেন, আর তার নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ঈশ্বরলাভ অসম্ভব বলে মনে করেছেন। তাঁর কবিতায় বারবার এসেছে মৌন বা নীরবতার সাধনা। শব্দ ও চিন্তার বাইরে গিয়ে চিরন্তন অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত হওয়া তাঁর কাছে মুক্তির চাবিকাঠি। তিনি পৃথিবীর ঐশ্বর্য, দেহ, খ্যাতি—সবকিছুর অস্থায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেন এবং ঈশ্বরস্মরণে মন স্থাপন করার আহ্বান জানান।
তাঁর জীবন ছিল পার্থিব লোভ ও ক্ষমতা থেকে মুক্ত হয়ে পরম সত্যের সন্ধানে এক অসাধারণ যাত্রা। তাঁর জীবনের শেষ সময়টি তিনি তিরুচিরাপল্লীর মৌন গুরু মঠে অতিবাহিত করেন। সেখানে তিনি ধ্যান ও সাধনায় নিমগ্ন থাকেন। তাঁর জীবন ছিল জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ ও তপস্যার মিশ্রিত রূপ
তাঁর দর্শন সংকীর্ণ ধর্মীয় সীমানার ঊর্ধ্বে ছিল। তিনি মানুষকে প্রেম, করুণা এবং সকল জীবের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য উৎসাহিত করেছেন। তাঁর মতে, সত্য কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সকল ধর্ম এবং ঈশ্বরপ্রাপ্তির সকল পথের ঐক্যে বিশ্বাস করতেন।
তাঁর গান আজও তামিল সাধু-সংগীত হিসেবে গাওয়া হয়। দক্ষিণ ভারতের বহু সাধক, বিশেষ করে শৈব ও ভক্তি-ধারার অনুসারীরা তাঁকে গুরু রূপে মানেন। আধুনিক আধ্যাত্মিক আন্দোলন যেমন রমণ মহর্ষির ধ্যান-দর্শনেও থাইউমানভারের মৌন দর্শনের প্রভাব দেখা যায়। তিনি সাধনার অন্তর্লোকের সূক্ষ্ম অভিজ্ঞতা কবিতার ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন, যা তাঁকে তুলনাহীন করে তোলে।
থাইউমানভারের কবিতাগুলো তাঁর গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা ও দার্শনিক চিন্তাধারার প্রতিফলন। তাঁর কবিতায় অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় গভীর তত্ত্ব প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর কবিতায় সরাসরি আত্মকথন পাওয়া যায়। তিনি নিজের দুর্বলতা, সংশয়, ঈশ্বরপ্রেম, ব্যর্থতা সব অকপটে প্রকাশ করেন। ধ্যান ও ভক্তির মিশ্রণ রয়েছে তাঁর কবিতার বিষয়বস্তুতে। কোথাও গভীর যোগচিন্তা, কোথাও শিশুসুলভভাবে ঈশ্বরের কাছে নিবেদন পাওয়া যায়। তিনি ঈশ্বরকে পিতা, মাতা, বন্ধু এবং সর্বোপরি পরম সত্তা হিসাবে বর্ণনা করেছেন। মনের টানাপোড়েন ও ঈশ্বরের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ তাঁর কবিতার মূল থিম।
থাইউমানভার ছিলেন সেই বিরল সাধক-কবি, যিনি নিজের হৃদয়ের গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাকে এমন এক ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন, যা আজও সাধারণ মানুষকে আলোড়িত করে, ধ্যান ও ভক্তির পথ দেখায়।
তাঁর কবিতার মূল থিম হল পরমাত্মার সাথে আত্মার মিলনের আকাঙ্ক্ষা, মায়ার ভ্রম, মৌনতার গুরুত্ব এবং শিবের প্রতি ভক্তি।
তাঁর কবিতা পাঠককে নিজের মধ্যে সত্যকে খোঁজার জন্য অনুপ্রাণিত করে। তিনি বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক যাত্রাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর কবিতা সাধারণ মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানোর জন্য সহজ তামিল ভাষায় রচিত। এতে কোনো জটিল দার্শনিক পরিভাষা ব্যবহার করা হয়নি। থাইউমানভারের কবিতা শুধু আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেয় না, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শান্তি ও আনন্দ খুঁজে পাওয়ার পথ দেখায়। তাঁর রচনা আজও তামিল সাহিত্যে ও আধ্যাত্মিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

থা ই উ মা ন ভা রে র কি ছু ক বি তা
১.
হে প্রভু,
আমার মন
এক বুনো বানর,
এক উন্মত্ত হাতি,
এক লোভী বাঘ।
আমি একে বাঁধতে চাই,
কিন্তু সে ছিঁড়ে ফেলে সব শিকল।
তুমি ছাড়া আর কে পারে
আমার মনকে শান্ত করতে?
২.
শব্দের ওপারে,
চিন্তার ওপারে,
যেখানে নীরবতা নাচে
সেখানেই তুমি, হে প্রভু।
আমি কথা বলতে চাই না,
ভাবতেও চাই না,
শুধু তোমার উপস্থিতি হয়ে থাকতে চাই।
আমাকে সেই নীরবতায় ভরিয়ে দাও।
৩.
আজ আছি, কাল নেই,
এই দেহ ক্ষয়ে যাবে,
গর্ব মাটিতে মিশে যাবে।
ধন-সম্পদ, খ্যাতি
সবকিছু স্বপ্নের মতো উড়ে যাবে।
তবু তোমার নাম এক শাশ্বত আশ্রয়,
যা মৃত্যু পর্যন্ত মুছে দিতে পারে না।
৪.
হে করুণাময়,
তুমি জানো আমি কত দুর্বল।
কতবার তোমাকে ডাকতে গিয়ে
আমি পথ হারাই।
তবু যদি একবার
তোমার দৃষ্টি আমার দিকে ফেরে,
আমার অন্তরের অন্ধকার
সূর্যালোকে ভরে ওঠে।
৫.
আমার শক্তি নেই,
আমার জ্ঞান নেই,
আমার যোগ্যতা নেই।
আমি কেবল তোমার দয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।
যেমন সমুদ্র তার ঢেউকে ফিরিয়ে নেয়,
তেমনই আমাকেও ফিরিয়ে নাও তোমার বুকে।
৬.
শব্দের বাইরে, চিন্তার বাইরে,
যেখানে নীরবতা গভীর স্রোত হয়ে বয়ে চলে
সেখানেই তুমি, হে প্রভু।
আমি কথা বলি না,
আমি ভাবি না,
শুধু তোমার উপস্থিতির ছায়ায় থমকে থাকি।
মন আমার বন্য, অশান্ত, চঞ্চল
কিন্তু তোমার দয়ার স্পর্শে
সে শান্ত হয়ে যায়,
একই নদীর মতো, যা পাথরের ঘষে ঝরে।
আজ আমি যা জানি তা ক্ষুদ্র,
আজ আমি যা করতে পারি তা নগণ্য।
তবু তোমার দৃষ্টি যদি আমার দিকে পড়ে,
অন্তরের অন্ধকার আলোয় ভরে যায়,
আমি হারানো পথ খুঁজে পাই।
জীবন ক্ষণস্থায়ী, দেহ মাটিতে মিলিয়ে যায়,
ধন, খ্যাতি, গর্ব – সকলই বিভ্রম।
কিন্তু তোমার করুণা, তোমার প্রেম
শাশ্বত, অমোঘ, চিরন্তন।
হে প্রভু, আমি তোমার কাছে দাঁড়াই
শুধু সমর্পণ নিয়ে,
শুধু বিশ্বাস নিয়ে,
শুধু প্রেম নিয়ে।
আমি নিজেকে ভেঙে ফেলি,
যাতে তুমি আমাকে পূর্ণ করো।
৭.
যদি
হে প্রভু,
আমার মন ছুটে বেড়ায় সমস্ত দিকে,
তবু সে শান্ত হয় না।
তুমি যদি তাকে তোমার দিকে টানো,
সে আর কোথাও ছুটবে না।
আমি চাই শুধু তোমার চোখে তাকাতে,
শুধু তোমার নাম শুনতে,
শুধু তোমার ছায়ায় থাকতে।
৮.
যখন আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি,
হৃদয় আলোয় ভরে ওঠে।
যখন আমি তোমার ভাবনায় ডুবে যাই,
দুঃখ, ভয়, লোভ সব হারিয়ে যায়।
হে প্রভু,
তোমার উপস্থিতি আমার অন্তরকে
সমুদ্রের মতো প্রশান্ত করে তোলে।
৯.
আমি শক্তিহীন, আমি দুর্বল,
আমি শূন্য – তবু তোমার দয়া আমাকে রাখে।
আমি চাই না কিছু প্রাপ্তি,
আমি চাই না কিছু অর্জন।
শুধু তোমার করুণায় ভেসে থাকতে চাই,
শুধু তোমার ছায়ায় বিশ্রাম নিতে চাই।
১০.
শব্দের বাইরে, চিন্তার বাইরে,
যেখানে নীরবতা বয়ে চলে,
সেখানে তুমি আছো, হে প্রভু।
আমি কথা বলি না, আমি ভাবি না,
শুধু তোমার ছায়ায় থমকে থাকি।
তুমি আমাকে শেখাও,
মনকে শান্ত রাখতে,
আত্মাকে তোমার দিকে কেন্দ্রীভূত করতে।
১১.
আজ আমি আছি, কাল নেই,
আমার দেহ মাটিতে মিলিয়ে যাবে।
গর্ব, ধন, খ্যাতি – সবই ক্ষণস্থায়ী।
কিন্তু তোমার প্রেম, তোমার দয়া
চিরন্তন, অমোঘ, অনন্ত।
হে প্রভু, আমি নিজেকে তোমার হাতে সমর্পণ করি,
যাতে তুমি আমাকে পূর্ণ করো।
১২.
হে প্রভু, আমার মন বাঘের মতো দৌড়াচ্ছে,
তুমি ছাড়া কেউ তাকে বশে রাখতে পারে না।
আমার অন্তর তুমি ভরিয়ে দাও,
যাতে কেবল তোমার নামই সেখানে প্রতিধ্বনিত হয়।
১৩.
ও মন, তুমি অলঙ্কারের সোনার মতো,
সকল বস্তুর তুমিই ভিতরকার গঠন;
তুমি কি নিজে থেকে পরিপক্ক হয়ে
সমাধির ফল হয়ে উঠবে না?
তোমার সকল অপূর্ণতা থেকে মুক্ত হবে না?
কারণ তোমার মতো বন্ধু আমার আর কেউ নেই।
নিশ্চয়ই তুমি স্বয়ং দিব্য অনুগ্রহের মতো,
তুমিই সেই গুরু, সেই অবিচ্ছেদ্য বন্ধন।
কত দিন আমি তোমার সঙ্গে পরম আনন্দ পেয়েছি,
আর এখন যদি তুমি আমা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে
এক মৃত, নিশ্চল বস্তুর মতো পড়ে থাকো,
তবে সত্যিই আমি তোমার শুয়ে থাকার দিকটিকে প্রণাম করব।
তোমার মাধ্যমেই আমি দুঃখ থেকে মুক্ত হব,
এবং স্বাধীনতার আনন্দ লাভ করব।
১৪.
এসো আমরা ধ্যান করি
শাশ্বত, শুদ্ধ, ভিত্তিহীন, জন্ম-ও মৃত্যুমুক্ত
সর্বব্যাপী, সর্বদা অমলিন
দূরবর্তী, নিকটবর্তী, শূন্যতার দ্যুতিময় বিস্তৃতি,
সকলের আশ্রয়, পরমানন্দের পূর্ণতা।
যে সত্তা চিন্তা ও কথার বাইরে,
যা এইভাবে বিদ্যমান,
আনন্দের জন্মদাতা সেই বিশাল বিস্তৃত সত্তাকে
এসো আমরা ধ্যান করি।
যে কোনো চিন্তার পেছনে যে চিন্তা মন ভাবে,
তাতে অভিন্নভাবে সব কিছুকে পূর্ণ করে
সকলের জীবনের জীবন হয়ে;
সত্যিকারের ভক্তদের জন্য দিব্য আনন্দের অমৃত ধারা প্রবাহিত করে,
নিজে নিজে প্রকাশিত হয় নিরাকার ও গুণহীন রূপে,
সেই মহান শৈব সিদ্ধান্তের আলো,
সেই দয়ালু পরাপরকে
এসো আমরা ধ্যান করি।
বিশাল বিস্তৃত সত্তা হিসেবে,
পঞ্চভূতের উৎস হিসেবে,
সেই বিশাল নীরবতার উৎস হিসেবে,
যা মন এবং অন্যান্য বিষয়ের নাগালের বাইরে সেই আনন্দ হিসেবে,
যা যখন গুরুর কৃপায় প্রকাশিত হয়,
তখন তাদের বিশুদ্ধতায় আবৃত করে এবং তবুও তাদের থেকে দূরে সরে যায়,
যে সত্তা এইভাবে সকলের মধ্যে বিদ্যমান,
সেই পদার্থকে
এসো আমরা ধ্যান করি।
এই এবং ওই জগতের জীবনের জীবন;
‘আমি’ এবং ‘আমার’ বোধ হারিয়েছে যারা, তাদের আত্মীয়;
অনাসক্ত উপলব্ধি যা শাশ্বত নিখুঁত আনন্দ।
সেই জীবন যা শূন্য,
সেই পদার্থ যা হৃদয়ের ভেতরে প্রবাহিত হয়,
সেই সুস্বাদু ত্রিপুরফল,
মিষ্টি ক্যান্ডি,
দিব্য অমৃত।
এসো আমরা সেই পদার্থকে অনুসন্ধান করি
এবং চোখ থেকে মুক্তার মতো অশ্রু ঝরিয়ে
ও হাত জোড় করে সেই সত্তাকে
ধ্যান করি।
কোনো জাতি নেই, পরিবার নেই, জন্ম নেই, মৃত্যু নেই,
কোনো বন্ধন নেই, কোনো মুক্তি নেই,
কোনো রূপ নেই, নিরাকারও নয়,
কোনো নাম নেই —
তবুও এই সবকিছুর নাম দিয়ে,
যে আলো সবকিছুকে সব জায়গায় সঞ্চারিত করে,
যে সত্তা সর্বত্র বিদ্যমান এবং সর্বব্যাপী,
সেই শুদ্ধ বিশাল বিস্তৃতি,
সেই তুরীয় চৈতন্যে পরিপূর্ণ অনুভূতি,
চিন্তামুক্ত চেতনা,
সেই দয়ালু সত্তা যা সসীম পরম,
নিখাদ করুণায় পরিপূর্ণ,
এসো আমরা ধ্যান করি।
“এই জগৎ শুধুই এক ইন্দ্রজাল, এক স্বপ্ন, এক মরীচিকা।
এইভাবে উপলব্ধি করে,
তুমি সেই তৎপরার খুব কাছাকাছি অনন্তকাল বেঁচে থাকো,
যে চিৎপরা দ্বারা অভিভূত হয় না।
আনন্দের ধারা তোমার চিন্তাকে প্লাবিত করুক
প্রতিদিন অবিরাম।” —
এভাবেই সেই গুরু মৌনি আমাকে আশীর্বাদ করেছেন —
তার সেই পবিত্র চরণ, দিনরাত
এসো আমরা ধ্যান করি।
যে সব পদার্থ হিসেবে পরিচিত, তাদের আদি পদার্থ হিসেবে;
তাদের পেছনে থাকা চেতনা হিসেবে।
সেই সমৃদ্ধ অমৃত হিসেবে,
যা পান করলে সেই প্রেমময় ভক্তদের দুঃখ দূর হয় যারা স্বচ্ছ উপলব্ধি লাভ করে।
সেই নিখুঁত আনন্দ হিসেবে যা কোনো ভেদাভেদ করে না।
নিজের ভেতরে এবং বাইরে উভয় স্থানেই বিদ্যমান।
সেই পদার্থ হিসেবে যা সমস্ত অন্ধকার দূর করে উজ্জ্বল হয়;
সেই পদার্থকে,
এসো আমরা বিনীতভাবে পূজা করি।
বিরল বেদের মুকুটস্বরূপ অর্থ হিসেবে;
দেবতা, মহান মুনি, শুদ্ধ সিদ্ধ এবং অন্যদের উপলব্ধিরও অতীত সেই পূর্ণতা হিসেবে।
কারণকে ছাড়িয়ে যাওয়া সেই রত্ন হিসেবে;
ফুলে সুগন্ধ, তিলের বীজে তেল এবং প্রাণের মধ্যে জীবনের অন্তর্নিহিত শক্তি হিসেবে।
সেই মহান পদার্থ হিসেবে যা সর্বদা শুদ্ধ তুরীয় চেতনার কেন্দ্রে অবস্থান করে —
সেই পদার্থকে,
এসো আমরা পূজা করি।
সেই বিশাল শূন্য স্থান হিসেবে,
যার মধ্যে আকাশ এবং অন্যান্য পাঁচটি উপাদানকে ধারণ করে;
জ্ঞানীর দৃষ্টিতে সেই আনন্দের সাগর হিসেবে,
যিনি জ্ঞানের চোখে দেখেছেন,
যিনি করুণার বশে আমাকে তাঁর নিজের সত্তা করে নেন;
যাতে আমি অন্য কিছু নিয়ে না ভাবি,
সেই ঈশ্বরের জন্য,
যার দয়ালু করুণা হৃদয়ে ধারণ করে
এসো আমরা গভীর শ্রদ্ধায় হাত উত্তোলন করি।
সেই অসীম বিস্তৃতি যা আকাশকে পূর্ণ করেছে;
সেই সুস্বাদু অমৃত যা এক মুহূর্তে
আমার মনের বিস্তৃতি এবং জ্ঞানের বিস্তৃতিকে পূর্ণ করেছে;
ওহ! তুমি সেই মহান সত্তা যা শাশ্বত আনন্দ।
হৃদয় ভালোবাসায় প্লাবিত হয়ে এবং ভেতরে গলে গিয়ে;
আনন্দে বিভ্রান্তিতে কথা আটকে গিয়ে;
চোখ থেকে অশ্রু ঝরিয়ে
এবং বিনীতভাবে হাত জোড় করে,
এসো আমরা তোমার কৃপাকে ধ্যান করি।
আদি সত্তা যার কোনো শুরু বা শেষ নেই,
যে পালিকা মা অত্যধিক ভালোবাসায় আমাকে লালন-পালন করেছেন,
যে ধার্মিক গুরু আশীর্বাদ করেন,
চিন্তারও বাইরের সেই নিশ্চিত সত্য,
সেই নিরাকার শুদ্ধতা,
সেই পবিত্রতম পবিত্র,
বিভিন্ন বিবাদমান বিশ্বাসের নাগালের বাইরে যে বিষয়,
নীরবতার মুনিদের জন্য যে শূন্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই দ্যুতি,
আমার জীবনের প্রিয় আশ্রয় —
তাকেই আমি খুঁজি এবং পূজা করি,
অশ্রু ঝরিয়ে
এবং শ্রদ্ধায় হাত জোড় করে।
“অ” দিয়ে শুরু হওয়া সমস্ত বর্ণমালা হিসেবে,
এবং তাদের থেকে ভিন্নও,
(সবকিছুর যার রূপ আছে) বিশাল মহাবিশ্ব হিসেবে;
যে কোনো বর্ণনার যোগ্য সবকিছু হিসেবে,
এবং যা যোগ্য নয় তাও;
পরম হিসেবে (সর্বব্যাপী);
এবং কথারও অতীত হিসেবে;
সেই শুদ্ধ জ্ঞান হিসেবে, যা সন্দেহ ও পরিবর্তন দ্বারা অস্পৃষ্ট;
শুদ্ধতা হিসেবে:
সেই অতুলনীয় পশু-পতি হিসেবে —
সেই পদার্থকে আমরা খুঁজি।
আর অতিরিক্ত ভালোবাসায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে
আমরা ধ্যান করি।
১৫.
কী সে, যা
অসীম জ্যোতিঃপ্রভা,
পরম আনন্দ,
দিব্য-প্রেমে পূর্ণ?
কী সে, যা ইচ্ছা করেছিল
অগণিত বিশ্বকে ধারণ করতে
অসীম শূন্যতায়
এবং সেখানে বেঁচে আছে জীবন-জীবনের রূপে?
কী সে, যা দাঁড়িয়ে থাকে
ভাবনা আর বাক্যের অতীত?
কী সে, যা হয়ে থাকে
অসংখ্য ধর্মের বিতর্কিত বিষয়,
যারা দাবি করে:
“এই আমার ঈশ্বর,” “এই আমাদের ঈশ্বর”?
কী সে, যা বিরাজমান
সর্বত্র,
সর্বশক্তিমান,
প্রেমপূর্ণ
এবং অনন্ত?
কী সে, যা জানে না
দিন-রাত্রির সীমা?
এটাই আসল চিন্তার আনন্দ,
এটাই নিঃশব্দে ভরে থাকে সমগ্র মহাকাশ,
এটাই আমরা বিনয়ে পূজা করি।
অগণিত বাসস্থান,
অগণিত নাম,
অগণিত আত্মীয়স্বজন,
অগণিত দেহ কর্মফলে জন্মানো,
অগণিত কর্ম প্রতিদিন সম্পাদিত,
অগণিত চিন্তা মনের ভেতরে,
অগণিত খ্যাতি আর নাম,
অগণিত স্বর্গ-নরকের অভিজ্ঞতা,
অগণিত দেবতার পূজা,
অগণিত বিশ্বাসের অনুসরণ…
এই সবের মধ্যে, জ্ঞান ও করুণার দ্বারা উপলব্ধ হয়
আমাদের ঈশ্বর, তুরীয় রূপে,
সে দিব্য-মেঘ, যা ঝরায় সীমাহীন আনন্দের বৃষ্টি,
যা নামে স্বর্গগম্বুজ ভেদ করে,
আর ভক্তদের প্রেমভরা চোখ দিয়ে,
যারা জপে অগণিত নাম
যা অগণিত শাস্ত্রে গাওয়া আছে।
সে নিঃশব্দতার অপরিসীম ভাণ্ডার,
সে বর্ণনাতীত আনন্দ-জ্ঞান,
সে বিস্ময়কর মহত্ত্ব
আসুন আমরা সবিনয়ে তাঁকে পূজা করি।
যে একরূপ,
যে অনন্য বাক্যের আলো,
যাকে শাস্ত্রসমূহ জোরে ঘোষণা করে
জ্ঞানের জ্ঞান রূপে,
আনন্দের পূর্ণতা রূপে,
আদিপ্রাণ রূপে,
প্রাচীন তত্ত্বরূপে,
যাকে ধর্মেরা খুঁজে ফেরে,
যার ওপর সবাই ভরসা করতে চায়,
যে চিরন্তন,
যে পূর্ণতা,
যার কোনো ভিত্তি নেই,
তবু তিনিই আমাদের আশ্রয়,
যিনি শান্তি,
যিনি শূন্যতার অবস্থা,
যিনি নিত্য-পবিত্র,
যিনি বিশ্বপদার্থে স্পর্শহীন,
যিনি ঘটনাবলিতে প্রভাবিত হন না,
যিনি অপরিবর্তনীয়,
যিনি নির্লিপ্ত নিরপেক্ষতায় জ্যোতিষ্মান,
যিনি দোষহীন,
যিনি নিরাকার,
যিনি ভাবনায় থেকেও
ভাবনার ঊর্ধ্বে,
যিনি দিব্য আলোর মহিমা,
যিনি অজাত,
যিনি জ্ঞান-শূন্যতায় প্রস্ফুটিত,
তিনি সর্বোচ্চ ঈশ্বর
আসুন আমরা সবিনয়ে তাঁকে পূজা করি।
১৬.
যত প্রাণ দৃশ্যমান, দেহবস্ত্রে আচ্ছাদিত,
যত হামাগুড়ি দেয়, হাঁটে, ওড়ে কিংবা থাকে,
যতকিছু প্রকৃতি সৃষ্টির তাড়নায় জন্ম দিয়েছিল
সবই ক্ষয় হবে।
প্রকাণ্ড তত্ত্ব-উপাদানগুলোও
এক এক করে বিলীন হয়ে যাবে।
যা থেকে যাবে তা হলো
অসীম শূন্যতা,
ভরসাহীন, অবলম্বনহীন শূন্য-অবস্থা,
উপশান্তা – যে শান্তি বোধের অতীত,
বেদ-উপনিষদের জ্ঞান,
অম্লান সেই মহাজ্যোতি।
যারা তা গ্রহণ করে,
তারাই করুণায় ধন্য আত্মা।
অতীব মহৎ তারা,
আর জন্মাবে না কখনো,
মৃত্যুও হবে না তাদের,
শুধু নিঃশব্দতার সাগরে নিমগ্ন থাকবে।
এ কথাই তুমি, করুণায় ভরে,
আমাকে এসে জানিয়েছ।
এ কি নয় যে আমি প্রস্তুত হয়েছি এর জন্য?
হে তুমি, যিনি অখণ্ড ধারায়
ভরিয়ে রেখেছ দৃশ্যমান সব মহাকাশ!
তুমি পরিপূর্ণ আনন্দ,
পরম-পরিপূর্ণ পরিতৃপ্তি।
১৭.
যে অবস্থায় পৌঁছানো যায়,
যেখানে মনে হয়
“যারা আসবে, আসুক”
“যারা যাবে, যাক”
মন শুধু সাক্ষী হয়ে থাকে,
কোনো টানাপোড়েনে জড়ায় না
সেই অবস্থাই নিস্পৃহতা।
সত্যলাভের প্রেরণা পাওয়া,
বেদান্ত-সিদ্ধান্তের সমরসা (সমতার) পথে চলা,
দেহ যে নশ্বর তার জ্ঞান শেখা,
ভালোবাসায় গলে যাওয়া হৃদয় পাওয়া,
এবং জানার শক্তি পাওয়া যে মুক্তিই
আনন্দের একমাত্র স্থায়ী অবস্থা
এসবই তোমার করুণার দান।
হে প্রভু,
আমি যে তোমার আশ্রয়ে দাঁড়িয়েছি
তুমি যদি আরেকটু ভাবো আমাকে রক্ষা করার কথা,
তবে দাও সেই অটল নীরবতা,
যা পাঁচটি উপাদানও বুঝতে পারে না।
হে তুমি,
যিনি অবিচ্ছিন্ন ধারায় পূর্ণ করেছ দৃশ্যমান সব আকাশকে!
তুমি সেই পরিপূর্ণ আনন্দ,
সেই পরম-সম্পূর্ণ তৃপ্তি।








































































