৩ জুন ২০২৬
বেলায়েতের ঈদ, গাদীর খুম
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
সৈয়দ তারিক
কবি, ভাবুক
42

সৈয়দ তারিক
কবি, ভাবুক

42

ভাবের দেশ

বেলায়েতের ঈদ

‘জরুরি কথাটি বলি আমি, শোনো,’
নবিজি থামেন গাদিরে খুম;
মাওলা আলির অভিষেক আজ,
প্রেমিকের প্রাণে লেগেছে ধুম।

এত ঈদের খুশির কারণটা কী? কী ঘটেছিল গাদিরে খুমে? বিষয়টা নিয়ে আলাপ করা যাক।

গাদিরে খুমের ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম এক সন্ধিক্ষণ। বিদায় হজের ফিরতি পথে ১০ হিজরির ১৮ জিলহজ (৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ) মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী এক মরূদ্যান ‘গাদিরে খুম’-এ এই ঘটনা ঘটেছিল।

​​১০ হিজরির জিলহজ মাসে আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর জীবনের শেষ হজ—বিদায় হজ সম্পন্ন করেন। এই হজে প্রায় এক লক্ষাধিক সাহাবি তাঁর সাথে শরিক হয়েছিলেন। হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আল্লাহর রাসূল (সা.) মদিনার উদ্দেশে রওনা হন।

যাত্রাপথে মক্কা থেকে আনুমানিক ১৮০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ‘খুম’ নামক স্থানে কাফেলা পৌঁছায়। এটি ছিল এমন একটি মোড় বা জংশন, যেখান থেকে বিভিন্ন অঞ্চল—যেমন মদিনা, মিশর, সিরিয়া ও ইরাক-এর হাজিরা নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে আলাদা হয়ে যেতেন। স্থানটিতে একটি ‘গাদির’ বা পানির পুকুর ছিল, তাই একে ‘গাদিরে খুম’ বলা হয়।

তখন ছিল প্রচণ্ড গরম। মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে পা রাখা যাচ্ছিল না। জিলহজ মাসের ১৮ তারিখ দুপুরের দিকে যখন কাফেলা এই স্থানে পৌঁছায়, তখন আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ওপর একটি বিশেষ আয়াত নাজিল হয় (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৬৭):

“হে রাসুল! আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে তা প্রচার করুন। যদি আপনি তা না করেন, তবে তো আপনি তাঁর বার্তা প্রচার করলেন না…”

​এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) কাফেলা থামানোর নির্দেশ দেন। যারা সামনে এগিয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের ডেকে ফিরিয়ে আনা হয়, আর যারা পেছনে ছিলেন তাঁদের জন্য অপেক্ষা করা হয়।

উটের জিন বা বসার আসনগুলো একের ওপর এক সাজিয়ে একটি উঁচু মিম্বর তৈরি করা হয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) সেই মিম্বরে আরোহণ করেন। তিনি তাঁর পাশে হযরত আলি (রা.)-কে দাঁড় করান।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে এক দীর্ঘ ও আবেগঘন ভাষণ দেন। তিনি প্রথমে উপস্থিত জনতাকে জিজ্ঞেস করেন, “আমি কি তোমাদের জানের চেয়েও তোমাদের ওপর অধিক কর্তৃত্বের অধিকারী নই?” উপস্থিত সকলে সমস্বরে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল!”

এরপর তিনি হযরত আলির হাত উঁচুতে তুলে ধরেন, যাতে উপস্থিত সমস্ত মানুষ তাঁকে দেখতে পায়। আলির হাত ধরে তিনি সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি দেন: “মান কুনতু মাওলাহু ফাহাযা ‘আলিইউন মাওলাহু।” এর অর্থ: “আমি যার মাওলা (অভিভাবক/নেতা/বন্ধু), এই আলিও তার মাওলা।”

এরপর তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলেন: “হে আল্লাহ! যে আলিকে ভালোবাসে, তুমি তাকে ভালোবাসো; যে আলির সাথে শত্রুতা করে, তুমি তার সাথে শত্রুতা করো; যে আলিকে সাহায্য করে, তুমি তাকে সাহায্য করো।”

ভাষণ শেষ হওয়ার পর, নবিজি (সা.)-এর নির্দেশে সাহাবিগণ একে একে এসে হযরত আলি (রা.)-কে মোবারকবাদ বা অভিনন্দন জানাতে শুরু করেন। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সবার আগে এসে আলিকে জড়িয়ে ধরে বলেন: “হে আলি মাওলা! আপনাকে অভিনন্দন। আপনি আজ থেকে আমার এবং জগতের সকল মুমিনের মাওলা হয়ে গেলেন।”

এই ঐতিহাসিক ঘোষণার পরপরই, কাফেলা স্থান ত্যাগ করার পূর্বেই সুরা মায়েদার ৩ নম্বর আয়াতের অংশবিশেষ নাজিল হয়:

“…আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”

গাদিরে খুমের এই ঘটনাটি ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম সর্বাধিক বর্ণিত ও সমর্থিত (মুতাওয়াতির) ঘটনা। শিয়া ও সুন্নি—উভয় ধারার হাদিস ও ইতিহাসের কিতাবে এটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সনদে সংকলিত হয়েছে।

​সহিহ মুসলিম:

জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী খুম নামক পানির স্থানে দাঁড়িয়ে আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করার পর বলেন, “আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী জিনিস রেখে যাচ্ছি। প্রথমটি আল্লাহর কিতাব (কুরআন)… এবং দ্বিতীয়টি আমার আহলে বাইত (পরিবার)…” (হাদিস নম্বর: ২৪০৮)

​সুনানে তিরমিজি:

হযরত জাবের ও অন্যান্য সাহাবিদের সূত্রে “আমি যার মাওলা, আলিও তার মাওলা”—এই অংশটি স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিজি একে ‘হাসান সহিহ’ বলেছেন।

মুসনাদে আহমাদ:

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল তাঁর মুসনাদে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ একাধিক সাহাবির সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

গাদিরে খুমের আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই, তবে এর ‘মাওলা’ শব্দের ব্যাখ্যা নিয়ে দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।

পৃথিবীর অধিকাংশ প্রধান সুফি সিলসিলা মাওলা আলির মাধ্যমেই নবিজি পর্যন্ত পৌঁছেছে। সুফিদের মতে, গাদিরে খুমে নবিজি যে ‘ফয়েজ’ বা নুরানি শক্তি মাওলা আলিকে দান করেছিলেন, সেটিই পরবর্তী ওলি-আউলিয়াদের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়েছে

সুন্নি ও সুফি দৃষ্টিভঙ্গিতে এখানে ‘মাওলা’ শব্দের অর্থ গভীর আত্মিক ভালোবাসা, বন্ধুত্ব এবং আধ্যাত্মিক অভিভাবকত্ব (বেলায়েত)। নবিজি (সা.) আলির উচ্চ আধ্যাত্মিক মর্যাদা ঘোষণা করেছিলেন, যা সুফি সিলসিলার মূল ভিত্তি।

​শিয়া মতে, এই ঘোষণার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর নির্দেশে হযরত আলি (রা.)-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত বা উম্মতের প্রথম রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা (ইমাম / খলিফা) হিসেবে সরাসরি মনোনীত করে গিয়েছিলেন।

ব্যাখ্যার এই ভিন্নতা সত্ত্বেও, গাদিরে খুমের দিনটি ইসলামের ইতিহাসে বিশ্বস্ততা, ভালোবাসা এবং নবি পরিবারের প্রতি আনুগত্যের এক চিরন্তন প্রতীক হয়ে আছে।

সুফি ভাবধারা তথা ইসলামি আধ্যাত্মিক দর্শনে গাদিরে খুম-এর ঘটনাটি কেবল একটি ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক ঘটনা নয়; বরং এটি বেলায়েত বা আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের মূল উৎস।

​গাদিরে খুমে নবিজির ঘোষণা— “আমি যার মাওলা, আলিও তার মাওলা”—সুফিদের কাছে নবুয়ত থেকে বেলায়েতের দিকে স্থানান্তরের একটি ঘোষণা। নবুয়তের দরজা বন্ধ হওয়ার পর উম্মতের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শনের যে ধারা কেয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে, মাওলা আলি হলেন সেই ধারার প্রথম পুরুষ বা উৎস।

​সুফিরা ‘মাওলা’ বলতে ‘আধ্যাত্মিক অভিভাবক’ বা ‘আত্মার বন্ধু’ বোঝেন। নবিজি এখানে মাওলা আলিকে কেবল বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেননি, বরং মুমিনদের আত্মার ওপর যে কর্তৃত্ব নবির ছিল, সেই একই আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বের দায়িত্ব আলিকে অর্পণ করেছেন।

​পৃথিবীর অধিকাংশ প্রধান সুফি সিলসিলা মাওলা আলির মাধ্যমেই নবিজি পর্যন্ত পৌঁছেছে। সুফিদের মতে, গাদিরে খুমে নবিজি যে ‘ফয়েজ’ বা নুরানি শক্তি মাওলা আলিকে দান করেছিলেন, সেটিই পরবর্তী ওলি-আউলিয়াদের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়েছে।

এই ঘটনার কারণেই আমির খসরু তাঁর বিখ্যাত কাওল ‘মান কুনতু মাওলা’ রচনা করেছিলেন, যা আজও আধ্যাত্মিক মজলিসগুলোর প্রাণ।

​গাদিরে খুমের ঘোষণার মাধ্যমেই নবিজি আনুষ্ঠানিকভাবে মাওলা আলিকে তাঁর ইলমের বা আধ্যাত্মিক রহস্যের ভাণ্ডারের চাবিকাঠি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। নবির রুহানি নুর গ্রহণ করতে হলে মাওলা আলির বেলায়েতের পথ অতিক্রম করতে হবে।

​গাদিরে খুম হলো মুমিনের জন্য একটি ‘ইশক’ বা প্রেমের পরীক্ষা। যে ব্যক্তি মাওলা আলিকে নিজের হৃদয়ের মাওলা বা মালিক হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না, তার পক্ষে নবিজির প্রকৃত ভালোবাসা পাওয়া কঠিন। এটি এমন একটি আধ্যাত্মিক বন্ধন যা কেবল যুক্তিতে নয়, বরং হৃদয়ের সমর্পণের মাধ্যমে বোঝা সম্ভব।

গাদিরে খুমের দিন আল্লাহ তাআলা দ্বীনকে পূর্ণতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই পূর্ণতা কেবল বাহ্যিক আহকামে নয়, বরং মাওলা আলির বেলায়েতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার যে শিখর উন্মোচিত হয়েছে, তারই পূর্ণতা।

সুতরাং ​গাদিরে খুম হলো সেই আধ্যাত্মিক মাহফিল, যেখানে নবিজি মাওলা আলিকে ‘শাহ-এ-বেলায়েত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সুফিদের কাছে এটি একটি চিরন্তন আধ্যাত্মিক আলোকবর্তিকা, যা আজও সাধকদের গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ দেখায়।

Bhaber Desh-Special Sufi Series by Poet Syed Tarik-Meghchil

গা দি রে  খু ম  বি ষ য় ক  ক বি তা

গাদিরে খুমের ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক ঘটনাটি নিয়ে যুগে যুগে আরবি, ফার্সি ও অন্যান্য ভাষায় অনেক বিখ্যাত কবি কালজয়ী কবিতা রচনা করেছেন। এইসব কবিতাগুলোর মূল সুর হলো: গাদিরে খুম কোনো সাধারণ ঘোষণার জায়গা ছিল না, এটি ছিল হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের এবং নফসের (জীবাত্মা) সাথে রুহের (পরমাত্মা) এক শাশ্বত চুক্তি। কবিদের চোখে মাওলা আলি কেবল একজন বীর নন, বরং তিনি হলেন আল্লাহর প্রেমের সেই আলো, যা অন্ধকার হৃদয়কে উদ্ভাসিত করে। সুফি সাধক ও কবিদের কাছে গাদিরে খুম কোনো সাময়িক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল মানুষের আত্মাকে নফসের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে খোদায়ী প্রেমের সাথে জুড়ে দেওয়ার এক শাশ্বত আধ্যাত্মিক উৎসব (ঈদ-এ-বেলায়েত), যার আলো আজও সাধকদের অন্তরকে পথ দেখিয়ে চলেছে। এরকম কিছু কবিতার অংশবিশেষের সাবলীল বাংলায় ভাবানুবাদ আমরা পড়তে পারি।

১.
জালালুদ্দিন রুমি

​যিনি আত্মার জগতকে মুক্ত করেন,
যিনি হৃদয়ের বন্ধন ছিঁড়ে ফেলেন,
গাদিরে খুমের সেই শাহেনশাহ
আলির দিকে তাকাও।
নবিজি বলেছিলেন,
‘আলি কেবল মাটির মানুষ নয়,
সে আত্মার মাওলা।’
মাওলা শব্দের অর্থ কী?
মাওলা হলেন তিনি, যিনি তোমাকে তোমার
নফসের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন।
মাওলা হলেন সেই সত্তা, যাঁর ছোঁয়ায়
অন্তরের হিংসা-বিদ্বেষের শিকল
গলে জল হয়ে যায়।
যে ব্যক্তি খুমের সেই
আধ্যাত্মিক সুধা পান করেছে,
সে দুনিয়ার সব বাদশাহি তুচ্ছ মনে করে।
হে রুমি, যদি তুমি নবিজির
প্রেমের সাগরে ডুব দিতে চাও,
তবে আলির বেলায়েতের তরণীতে চড়ে বসো,
যা তোমাকে সরাসরি
আল্লাহর আরশে নিয়ে যাবে।

​২.
কুনওয়াত বিন খালিদ আল-আওদি

​গাদিরে খুমের সেই উত্তপ্ত সূর্য সাক্ষী,
যেদিন আলোর ঝরনাধারা নেমেছিল,
নবি মুহাম্মদ তাঁর হাত দিয়ে আলির হাত আকাশের দিকে তুলে ধরেছিলেন।
সেই হাত ছিল হেদায়েতের হাত,
যা আঁধারে নিমজ্জিত পৃথিবীকে আলো দেখায়।
রাসুল বললেন, ‘হে মানবজাতি,
এই আলিই আমার ইলম আর রহস্যের দরজা,
যে আমাকে ভালোবাসে, সে যেন আলির বেলায়েতের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়।’
ওগো খুমের প্রান্তর! তোমার ধূলিকণা ধন্য, কারণ তুমি সেই পবিত্র বাণী শুনেছ,
যা মুমিনদের হৃদয়ে
ঈমানের পূর্ণতা এনে দিয়েছিল।
আলি হলেন সেই সূর্য,
যার বেলায়েতের আলো কখনো অস্ত যায় না।​

৩.
আল-শরিফ আল-রাজি

গাদিরে খুমের সেই দিনটির কথা মনে হলে আমার হৃদয় প্রেমের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে,
যেদিন মরুভূমির তপ্ত বাতাসও
নবিজির বাণীর সুবাসে শীতল হয়ে গিয়েছিল।
আল্লাহর রাসুল সেদিন আলির হাত ধরে মানবজাতিকে সত্যের চূড়ান্ত ঠিকানা দেখিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন:
‘আজ আমি তোমাদের জন্য
এক আধ্যাত্মিক আশ্রয় রেখে যাচ্ছি,
যে ব্যক্তি এই আশ্রয়ে থাকবে,
সে কখনো পথভ্রষ্টতার অন্ধকারে হারাবে না।’
ওগো খুমের প্রান্তর,
তুমি কোনো সাধারণ মরুভূমি নও,
তুমি হলে সেই পবিত্র উদ্যান,
যেখানে বেলায়েতের প্রথম বীজ
রোপণ করা হয়েছিল।
আলির প্রেমই হলো সেই নুর,
যা আমাদের আত্মাকে
আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যায়।

​৪.
ইবনে আল-রুমি

নবিজি যখন খুমের মিম্বরে দাঁড়িয়ে
আলির হাত উঁচুতে তুলে ধরলেন,
তখন আকাশের ফেরেশতারাও
সেই দৃশ্য দেখে আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করছিল।
রাসুলের মুখ থেকে নিঃসৃত প্রতিটি শব্দ
যেন মুক্তোর মতো ঝরে পড়ছিল
মানুষের অন্তরে।
তিনি ঘোষণা করলেন:
‘আলি আমার থেকে এবং আমি আলি থেকে,
আমার পর সে-ই তোমাদের
আত্মার অভিভাবক
এবং হেদায়েতের আলোকবর্তিকা।’
যারা সেদিন উপস্থিত ছিল, তারা বাহ্যিক চোখে
কেবল দুজন মানুষকে দেখেছিল,
কিন্তু আরিফগণ দেখেছিলেন:
সেখানে নবুওয়াতের সূর্য থেকে
বেলায়েতের চাঁদের আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে।
আলির মাওলা হওয়া
কোনো পার্থিব সিংহাসনের বিষয় নয়,
এটি হলো হৃদয়ের ওপর
আল্লাহর দেওয়া এক খোদায়ী অধিকার।

​৫.
আবুল কাসেম আল-জাহিরি

​যুগে যুগে কত সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে গেল,
কত রাজা-বাদশাহ
ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেল,
কিন্তু গাদিরে খুমের সেই মিম্বর থেকে
ভেসে আসা বাণী আজও জীবন্ত ও অম্লান।
‘আমি যার মাওলা, আলিও তার মাওলা’—
এই একটি বাক্যই
মুমিনদের অন্তরের জন্য যথেষ্ট।
এটি কেবল একটি ঘোষণা ছিল না,
এটি ছিল তৃষ্ণার্ত আত্মার জন্য
এক রূহানি ঝরনাধারা।
যে ব্যক্তি আলির বেলায়েতকে
নিজের জীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে
গ্রহণ করেছে,
সে দুনিয়ার সব ভয় ও সংকীর্ণতা থেকে
মুক্তি পেয়েছে।
হে খুমের আলো!
তুমি আজ ওলি-আউলিয়াদের হৃদয়ে
জিকির হয়ে বেঁচে আছো,
এবং কিয়ামত পর্যন্ত তুমি
সাধকদের অন্তরে
প্রেমের আলো জ্বালিয়ে রাখবে।

​৬.
আল-মুতানাব্বি

​নবিজি জ্ঞানের শহর,
আলি হলেন সেই শহরের একমাত্র প্রবেশদ্বার।
আর গাদিরে খুম হলো সেই দিন,
যেদিন সেই দ্বারের চাবিকাঠি
উম্মতের সামনে উন্মোচিত হয়েছিল।
রাসুলের বাণী কোনো চাটুকারিতা ছিল না,
তা ছিল ওহির আলোয় উদ্ভাসিত
এক শাশ্বত সত্য।
তিনি বলেছিলেন:
‘যার হৃদয়ে আমার প্রতি ভালোবাসা আছে,
সে যেন আলির বেলায়েতের
ছায়াতলে আশ্রয় নেয়।’
আলির হাতটি যখন শূন্যে উঠেছিল,
তখন তা কেবল একটি মানুষের হাত ছিল না,
তা ছিল খোদায়ী রহমতের সেই দড়ি,
যা আঁকড়ে ধরে মানুষ আধ্যাত্মিকতার
সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে।
খুমের প্রান্তর ধন্য,
কারণ তা নবুওয়াত ও বেলায়েতের
সেই ঐতিহাসিক কোলাকুলি প্রত্যক্ষ করেছিল।

​৭.
হাকিম সানাই

​হে সাধক, যদি তুমি অন্ধকারের
গোলকধাঁধা থেকে বের হতে চাও,
তবে গাদিরে খুমের সেই ঘোষণার দিকে কান পাতো।
মোস্তফা সেদিন আলির মস্তককে
বেলায়েতের তাজ দিয়ে ভূষিত করেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন: ‘আমার পর
আলির কথাই হলো আত্মার প্রকৃত বাণী।’
শরিয়তের বাহ্যিক খোলস ছাড়িয়ে
যারা হাকিকতের মজ্জা খুঁজতে চায়,
তাদের জন্য আলির প্রেমই একমাত্র পথ।
‘মান কুনতু মাওলা’—
এই একটি জিকিরই আরিফদের হৃদয়ে তাজাল্লির আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
যে ব্যক্তি আলিকে
নিজের আত্মার মালিক বলে স্বীকার করেছে,
সে নিজের নফসকে জবাই করে
আল্লাহর দরবারে অমরত্ব লাভ করেছে।

​৮.
ফরিদউদ্দিন আত্তার

​গাদিরে খুমের সেই পবিত্র দিনে
জগতের সমস্ত রহস্যের পর্দা
উন্মোচিত হয়েছিল,
যখন আহমদ আল্লাহর নির্দেশে
হায়দার (আলি)-কে উম্মতের
আধ্যাত্মিক কাণ্ডারী হিসেবে ঘোষণা করলেন।
নবিজি বলেছিলেন: ‘হে মানবজাতি!
আলির সত্তা আমার সত্তা থেকে
আলাদা কিছু নয়,
আমার হৃদয়ের আয়নায়
যে খোদায়ী নুর প্রতিফালিত হয়,
আলির হৃদয়ও সেই একই নুরে উদ্ভাসিত।’
‘আমি যার মাওলা, আলিও তার মাওলা’—
এই বাণী কেবল সেই
মরুভূমির মানুষের জন্য ছিল না,
এটি ছিল সৃষ্টির শুরু থেকে
কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত তৃষ্ণার্ত আত্মার জন্য
এক চিরন্তন খোদায়ী ফরমান।
হে আত্তার, তুমি যদি
বেলায়েতের প্রকৃত স্বাদ পেতে চাও,
তবে আলির গোলামির চাদর
গায়ে জড়িয়ে নাও,
কারণ তাঁর প্রেম ছাড়া
আধ্যাত্মিকতার এই দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া
কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

​৯.
দায়াবল আল-খুজায়ি

​খুমের সেই প্রান্তরের কথা
আমি কীভাবে ভুলে যাই,
যেখানে সত্য তার পূর্ণ আলো নিয়ে
প্রকাশ পেয়েছিল?
যেদিন আল্লাহর রাসুল
উত্তপ্ত বালুর ওপর দাঁড়িয়ে মানবজাতিকে
এক মহান অভিভাবকের সাথে
পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
তিনি আলির হাত ধরে
আসমানের দিকে তুলে ধরেছিলেন,
যেন জগতের কোনো চোখ
এই সত্য দেখা থেকে বঞ্চিত না হয়।
রাসুল বললেন: ‘তিনিই তোমাদের মাওলা,
যাঁর জ্ঞান ও বিচারে কোনো ভুল নেই,
যাঁর বিনয় আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে।’
সেদিন যারা কপট অন্তরে
অভিনন্দন জানিয়েছিল,
তারা হয়তো এই বাণীকে
ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চেয়েছিল,
কিন্তু খুমের প্রতিটি ধূলিকণা
আর আকাশের ফেরেশতারা
আজও সেই ঐতিহাসিক বেলায়েতের
সাক্ষ্য দিচ্ছে।
আলির মহিমা
কোনো মানুষের প্রশংসার ওপর নির্ভর করে না, আল্লাহ নিজেই তাঁর বেলায়েতকে
দ্বীনের পূর্ণতা হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

​১০.
একটি কাওয়ালির বাণী

​গাদিরে খুমের সেই মিম্বর থেকে
যে সুর ভেসে এসেছিল,
তা আজও ওলি-আউলিয়াদের অন্তরে
জিকির হয়ে অনুরণিত হয়।
মোস্তফা যখন আলিকে
‘মাওলা’ বলে ডাকলেন,
তখন জগতের সমস্ত আধ্যাত্মিক সিলসিলার
ভিত্তি স্থাপিত হয়ে গেল।
সেই মরুভূমির তীব্র গরমেও
মুমিনদের অন্তরে
এক শীতল প্রশান্তি নেমে এসেছিল,
কারণ তারা জেনেছিল—
নবুওয়তের সূর্য অস্ত গেলেও
বেলায়েতের পূর্ণিমা রাতকে আলো দিয়ে যাবে।
‘মান কুনতু মাওলা’—
এই একটি মহাজাগতিক বাক্যই
আরিফদের জন্য মারেফাতের মহাসমুদ্র।
যে ব্যক্তি আলিকে
নিজের আত্মার মালিক বলে মেনে নিয়েছে,
তার আর কোনো দুনিয়াবি শাসকের
ভয় থাকে না।
হে সাধক, যদি তুমি খোদার নৈকট্য চাও,
তবে গাদিরে খুমের সেই আধ্যাত্মিক মদিরা
পান করো, যা মানুষকে অমরত্ব দান করে।

১১.
শাহ নিয়াজ আহমদ বেরেলভি

গাদিরে খুমের সেই পবিত্র প্রান্তর থেকে
যে প্রেমের মদিরা ঢেলে দেওয়া হয়েছিল,
তা আজও আরিফদের অন্তরে
তাজাল্লির আগুন জ্বালিয়ে রাখে।
আহমদ যখন আলির হাত ধরে
ঘোষণা করলেন: ‘আলিই তোমাদের মাওলা’,
তখন মূলত জগতের সমস্ত রুহের কাছে
প্রকৃত মারেফাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছিল।
এই ‘মাওলা’ শব্দ কোনো সাধারণ উপাধি নয়, এটি হলো আত্মার ওপর
আধ্যাত্মিক রাজত্বের এক খোদায়ী ফরমান।
নিয়াজ তখনই মুক্তির স্বাদ পেয়েছিল,
যখন সে খুমের সেই বাণীকে
নিজের জীবনের মূলমন্ত্র বানিয়েছিল।
যার অন্তরে আলির বেলায়েতের আলো
প্রবেশ করেছে, সে এই নশ্বর দুনিয়ার
সব বন্ধন থেকে চিরতরে মুক্ত হয়ে গেছে।

​১২.
আল-নাশি আল-আসগর

​খুমের সেই দিনের কথা স্মরণ করো,
যখন দুপুরের সূর্য মাথার ওপর
আগুনের ফুলকি ছড়াচ্ছিল,
অথচ আল্লাহর রাসুলের বাণী মুমিনদের হৃদয়ে জান্নাতের শীতল হাওয়া বইয়ে দিচ্ছিল।
তিনি উটের জিন দিয়ে তৈরি মিম্বরে দাঁড়িয়ে আলিকে নিজের পাশে টেনে নিলেন,
এবং তাঁর হাত এত উঁচুতে তুললেন যে,
সবার চোখের সামনে সত্যের আলো
উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
রাসুল বললেন: ‘আমি কি তোমাদের
নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় নই?’
সবাই বলল— ‘অবশ্যই, হে নবি!’
তখন তিনি ঘোষণা করলেন:
‘তবে জেনে রাখো, এই আলিই
তোমাদের সবার আধ্যাত্মিক অভিভাবক।’
ইতিহাস হয়তো অনেক কিছু
আড়াল করতে চায়, কিন্তু খুমের সেই
মরুভূমির পাথর আর বাতাস
আজও নবিজির সেই অমিয় বাণীর
প্রতিধ্বনি করে চলেছে।

১​৩.
ইবনে আল-আলাফ

​নবুওয়তের সূর্য যখন বিদায়ের
বেলাভূমিতে এসে দাঁড়িয়েছিল,
তখন আল্লাহ তাঁর রাসুলকে নির্দেশ দিলেন বেলায়েতের পূর্ণিমাকে
জগতের সামনে প্রকাশ করতে।
গাদিরে খুমের সেই মোড়ে দাঁড়িয়ে
আল্লাহর নবি আলির হাত উঁচুতে তুলে ধরলেন।
তিনি বললেন: ‘আলি আমার জ্ঞানের শহর, আলি আমার আধ্যাত্মিক রহস্যের ভাণ্ডার,
যে ব্যক্তি আমার রুহানি নুর পেতে চায়,
সে যেন আলির বিলায়াতের পথ ধরে হাঁটে।’
ওগো খুমের প্রান্তর! তোমার বুকে
সেদিন যে খোদায়ী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল,
তা দুনিয়ার কোনো তরবারি
বা ক্ষমতার মোহে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
আলির প্রেমই হলো সেই শাশ্বত আলো,
যা কিয়ামত পর্যন্ত
ওলি-আউলিয়াদের অন্তরকে পথ দেখাবে।

​১৪.
আল-মুফিদুল বাহরানি

​খুমের সেই জলাশয়ের পাশে
যখন কাফেলা থমকে দাঁড়াল,
তখন কেবল মরুভূমির পথই থামেনি,
বরং উম্মতের আধ্যাত্মিক গন্তব্যের
এক শাশ্বত মাইলফলক স্থাপিত হয়েছিল।
নবি মুহাম্মদ যখন
আলির হাতখানি নিজের হাতের সাথে জড়িয়ে আকাশের দিকে তুললেন,
তখন আসমানের ফেরেশতারাও
মর্ত্যের এই মহান আধ্যাত্মিক চুক্তি দেখে আনন্দধ্বনি করছিল।
রাসুল বলেছিলেন: ‘হে লোকসকল!
আলি আমার থেকে আলাদা নয়,
সে আমার রুহেরই এক অংশ;
যারা আমার নুরকে ভালোবাসে,
তারা যেন আলির বেলায়েতের
পতাকাতলে এসে দাঁড়ায়।’
খুমের সেই উত্তপ্ত বালি সাক্ষী,
সেদিন প্রেমের যে জোয়ার জেগেছিল,
তা আজও সাধকদের শুষ্ক হৃদয়ে
ইমানের সবুজ ফসল ফলিয়ে চলেছে।

মেঘচিল

মা ও লা  আ লি কে  নি য়ে  র চি ত  ক বি তা

গাদিরে খুমের প্রসঙ্গ ছাড়াও বেলায়েতের শাহানশাহ মাওলা আলির শান-মান-কৃতিত্ব-বীর্যবত্তা নিয়ে নানা ভাষায় অজস্র কবিতা ও গান রচিত হয়েছে। আমাদের কাজী নজরুল ইসলামের একটি গান উল্লেখ করি:

খয়বর-জয়ী আলী হায়দর,
জাগো জাগো আরবার!
দাও দুশমন-দুর্গ-বিদারী
দুধারী জুলফিকার।

এস শেরে-খোদা ফিরিয়া আরবে—
ডাকে মুসলিম ইয়া আলী রবে;
হায়দরি-হাকে তন্দ্রা-মগনে
করো করো হুঁশিয়ার।

আলবোর্জের চূড়া গুঁড়া-করা
গোর্জ আবার হানো;
বেহেশতি সাকি, মৃত এ জাতিরে
আবে-কওসর দানো।

আজি বিশ্ব-বিজয়ী জাতি যে বেহুঁশ,
দাও তারে নব কুয়ত ও জোশ;
এস নিরাশার মরু-ধূলি উড়ায়ে
দুলদুল-আসওয়ার।

আরবি-ফারসি-উর্দু-তুর্কি প্রভৃতি ভাষায় মাওলা আলিকে নিয়ে রচিত অজস্র কবিতাবলি হতে কিছু কবিতার সহজ বাংলা গদ্যে ভাবানুবাদ এখন আমরা পড়তে পারি।

​১.
জালালুদ্দিন রুমি

​হযরত আলির বীরত্ব কেবল তাঁর শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল না, বরং তাঁর মূল শক্তি ছিল আত্মার পবিত্রতা। যুদ্ধের ময়দানে যখন একজন শত্রু তাঁর মুখে থুতু নিক্ষেপ করে অপমান করেছিল, তখন তিনি তলোয়ার নামিয়ে রেখে তাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর যুদ্ধ যেন ব্যক্তিগত ক্রোধের বশবর্তী না হয়ে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি নিজের অহংকারের দাস নন, বরং মহান আল্লাহর একজন অনুগত সিপাহি মাত্র।

​২.
আল্লামা ইকবাল

​মাওলা আলি ছিলেন আধ্যাত্মিক জগতের সেই শক্তিশালী সিংহদ্বার, যাঁর হাতের ইশারায় খায়বারের মতো দুর্ভেদ্য দুর্গ জয় হয়েছিল। এই মাটির পৃথিবীতে বাস করলেও তাঁর চিন্তাধারা ও নুর ছিল আকাশছোঁয়া বা আসমানি। তাঁর গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে দেয়। একজন বিশ্বাসী মানুষের হৃদয়ে আলির প্রতি ভালোবাসা থাকা মানে এক অমূল্য সম্পদ লাভ করা; কারণ পরম সত্যের পথে তিনিই হলেন শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক।

​৩.
শেখ সাদি

​পুরো পৃথিবী যদি আমার বিপক্ষে চলে যায় এবং সমস্ত প্রতিকূলতা আমাকে ঘিরে ধরে, তবুও আমার মনে কোনো ভয় নেই। কারণ আমার পূর্ণ ভরসা আছে সেই মহাবীরের ওপর, যাকে স্বয়ং রাসুল জ্ঞানের নগরীর একমাত্র প্রবেশদ্বার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তাঁর ওপর আস্থা রাখলে কোনো বিপদই আমাকে বিচলিত করতে পারবে না।

​৪.
সুফি ঐতিহ্যের একটি ‘মানকাবাত’ বা প্রশস্তি

​তিনি পুরুষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং আল্লাহর এক অপরাজেয় সিংহ। তাঁর মাধ্যমেই পরম করুণাময় আল্লাহর অসীম ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। সমগ্র ইতিহাসে আলির মতো দ্বিতীয় কোনো বীর যেমন নেই, তেমনি তাঁর ‘জুলফিকার’ তলোয়ারের মতো শক্তিশালী আর কোনো অস্ত্রও নেই। তিনি অজেয় সাহস ও বীরত্বের এক অনন্য মাপকাঠি।

​৬.
জালালউদ্দিন রুমি

​হে আলি, আপনি তো কেবল একজন যোদ্ধা নন, আপনি হলেন পরম সত্যের একটি স্বচ্ছ আয়না। আমার হৃদয়ে যে আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা আছে, তা আপনার মাধ্যমেই শান্ত হয়। আপনি হলেন সেই চাঁদ, যা অন্ধকার রাতে পথ হারানো পথিককে আলোর পথ দেখায়। আপনার বীরত্বের কথা সবাই জানে, কিন্তু আপনার বিনয় আর আল্লাহর প্রতি সমর্পণই আপনাকে সবার উপরে স্থান দিয়েছে।

​৭.
হযরত আমির খসরু

​দুনিয়ার সব বিপদ আর দুশ্চিন্তা যখন আমাকে ঘিরে ধরে, তখন আমি কেবল আলির নাম স্মরণ করি। কারণ তিনি হলেন সেই সত্তা, যাকে আল্লাহ কঠিন সময়ে সাহায্যকারী হিসেবে পাঠিয়েছেন। তাঁর আধ্যাত্মিক দৃষ্টির এক ঝলকই পারে আমার জীবনের সব অন্ধকার ঘুচিয়ে দিতে। তিনি হলেন সাহসের সেই মহাসমুদ্র, যার তীরে দাঁড়ালে ভয় পালিয়ে যায়।

​৮.
আল্লামা ইকবাল

​মানুষের ইতিহাস আলির নাম ছাড়া অসম্পূর্ণ। তিনি যখন সিজদায় যেতেন, তখন তিনি কেবল একজন দাস; কিন্তু যখন তিনি যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়াতেন, তখন তিনি আল্লাহর তলোয়ার। তাঁর শক্তির উৎস কোনো পার্থিব অস্ত্র ছিল না, বরং তাঁর শক্তি আসত তাঁর গভীর ঈমান থেকে। যে ব্যক্তি নিজের নফসকে বা কুপ্রবৃত্তিকে জয় করতে চায়, তার জন্য আলির জীবনই হলো শ্রেষ্ঠ পাঠশালা।

​৯.
হাফিজ শিরাজি

​আমি সেই পথেরই ধুলো হতে চাই, যে পথে মাওলা আলি হেঁটে গেছেন। পৃথিবীর সব ধন-সম্পদ একদিকে, আর আলির প্রতি ভালোবাসা আমার কাছে অন্য দিকে। তিনি হলেন সেই পূর্ণিমার চাঁদ, যার আলোয় মদিনার অলিগলি ধন্য হয়েছে। তাঁর জ্ঞান হলো সেই ঝরনা, যেখান থেকে যুগের পর যুগ তৃষ্ণার্ত আত্মারা পানি পান করে আসছে।

​১০.
একটি জনপ্রিয় আরবি কাসিদা

​হে আলি! আপনি হলেন সেই সিংহ, যার গর্জনে অন্যায়ের ভিত্তি কেঁপে ওঠে। আবার আপনিই সেই দয়ালু মানুষ, যার কোল এতিম আর অসহায়দের জন্য সবসময় খোলা থাকে। আপনার হাতে থাকা জুলফিকার কেবল কাফেরদের বিরুদ্ধে চলেনি, বরং তা পৃথিবীর বুক থেকে জুলুম মেটানোর জন্য পরিচালিত হয়েছে। আপনি জ্ঞানের সেই শহর, যার দরজা দিয়ে প্রবেশ না করলে সত্যের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব।

​১১.
হাফিজ শিরাজি

​হে আলি, আপনার চরিত্র এক আশ্চর্য বিস্ময়! আপনি যখন মেহরাবে দাঁড়ান, তখন আপনার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে—যেন আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ। অথচ যখন আপনি যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হন, তখন আপনার হুঙ্কারে পাহাড়ও থরথর করে কাঁপে। খোদার কসম, বীরত্ব আর দয়ার এমন মিলন মেলা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায়নি।

১​২.
একটি উর্দু কবিতা

​আমি সেই আলির গোলাম, যিনি নিজের রুটিটুকুও অভাবীকে দিয়ে দিতেন এবং নিজে ক্ষুধার্ত থাকতেন। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা পরিমাপ করা মানুষের সাধ্যের বাইরে। তিনি যা জানতেন, তা জগতের আর কেউ জানত না। যারা বলে তারা সত্যের সন্ধানী, আলির দরজায় না এসে তাদের সেই সন্ধান কোনোদিন পূর্ণ হবে না। তিনি হলেন সেই আলো, যা সরাসরি নবীজির প্রদীপ থেকে জ্বলে উঠেছে।

১​৩.
বুল্লে শাহ

​তুমি যদি নিজের ভেতরের অন্ধকার দূর করতে চাও, তবে আলির প্রেমে ডুব দাও। কারণ আলি কেবল ইতিহাসের কোনো নাম নয়, তিনি হলেন সেই চাবিকাঠি যা দিয়ে হৃদয়ের বন্ধ দুয়ার খোলা যায়। জগতের সব জ্ঞান একদিকে, আর আলির দেওয়া প্রজ্ঞা অন্য দিকে। যার হৃদয়ে আলির নাম অঙ্কিত আছে, তার আর কোনো পার্থিব ভয়ের প্রয়োজন নেই।

​১৪.
শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার

হযরত আলি হলেন সেই সমুদ্র যার কোনো তীর নেই, আর তিনি হলেন এমন এক সূর্য যা কখনও অস্ত যায় না। আধ্যাত্মিক জগতের রহস্যগুলো তাঁর কাছে ঠিক তেমনই স্পষ্ট ছিল, যেমনটি আমাদের হাতের তালু। তিনি কেবল মূর্তিবিনাশী বীর ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন মানুষের মনের ভেতরের অহংকার ও অন্ধকার বিনাশকারী এক জ্যোতি। তাঁর পবিত্র সত্তা ছিল ঐশ্বরিক প্রেমের এক জীবন্ত মন্দির।

​১৫.
বেদিল দেহলভি

​মহাকাশ ও পৃথিবীর সব রহস্য আলির নখদর্পণে ছিল। তিনি ছিলেন সেই মহাপ্রাজ্ঞ, যিনি সিংহাসনে বসেও নিজেকে একজন সাধারণ দাসের চেয়ে বেশি কিছু মনে করতেন না। তাঁর প্রজ্ঞা কোনো বই থেকে আসা সাধারণ বিদ্যা ছিল না, বরং তা ছিল সরাসরি খোদাপ্রদত্ত এক ঐশ্বরিক দান। যারাই সত্যের সুধা পান করতে চেয়েছে, তারা সবাই আলির জ্ঞানের ঝরনা থেকেই তৃপ্তি খুঁজে পেয়েছে।

​১৬.
সুলতান বাহু

​যদি তুমি সারাদিন ইবাদত করো আর সারারাত জেগে প্রার্থনা করো, কিন্তু তোমার হৃদয়ে আলির প্রতি ভালোবাসা না থাকে, তবে সেই সব পরিশ্রম বৃথা। আলি হলেন সেই সুগন্ধি যা মুমিনের আত্মাকে সতেজ রাখে। তিনি সাহসের এমন এক মিনার যে, তাঁর নাম স্মরণ করলেই দুর্বল হৃদয়েও সিংহের শক্তি ফিরে আসে। তিনি যাকে নিজের বলে গ্রহণ করেন, খোদা তাকে কোনোদিন ত্যাগ করেন না।

​১৭.
একটি ফার্সি রুবাই

​তিনি দিনের বেলা রণক্ষেত্রে সিংহের মতো গর্জন করতেন, আর রাতের নিস্তব্ধতায় জায়নামাজে দাঁড়িয়ে শিশুর মতো কাঁদতেন। দুনিয়ার ধন-সম্পদ তাঁর পায়ের নিচে লুটিয়ে পড়ত, কিন্তু তিনি এক টুকরো শুকনো রুটি আর লবণেই তুষ্ট থাকতেন। তাঁর এই ফকিরি বা দুনিয়া-বিমুখতাই তাঁকে সম্রাটদের চেয়েও বড় সম্রাটে পরিণত করেছে। তিনি মাটির পৃথিবীতে থেকেও আরশের খবর রাখতেন।

​১৮.
একটি উর্দু কবিতা

​হে মানুষ, আজ যদি তুমি জুলুমের জাঁতাকলে পিষ্ট হও, তবে একবার আলির জীবনের দিকে তাকাও। তিনি শিখিয়েছেন যে, সংখ্যায় কম হয়েও কীভাবে পাহাড়ের মতো অবিচল থাকা যায়। তাঁর তলোয়ার ‘জুলফিকার’ কেবল যুদ্ধের অস্ত্র ছিল না, তা ছিল ন্যায়ের এক অমোঘ বাণী। আজ অন্ধকার সময়ে আমাদের প্রয়োজন সেই আলভী চেতনা, যা পুনরায় মিথ্যার দুর্গ চূর্ণ করে দেবে।

​১৯.
জালালুদ্দিন রুমি

​হে আলি, আপনি হলেন সেই আধ্যাত্মিক সুগন্ধি যা সৃষ্টির শুরু থেকে প্রবাহিত হচ্ছে। আপনার বীরত্ব কেবল তলোয়ারের আঘাতে নয়, বরং আপনার দৃষ্টির আলোতে। আপনি যখন মুচকি হাসেন, তখন হতাশাগ্রস্ত হৃদয়ে আশার ফুল ফোটে। আপনার অস্তিত্ব ছিল আল্লাহর প্রেমের এক গভীর সমুদ্র; যার ভেতরে ডুব না দিলে কেউ প্রকৃত সত্যের মুক্তো খুঁজে পায় না।

​২০.
একটি প্রাচীন তুর্কি কবিতা

​তিনি হলেন সেই পথিক, যিনি মরুভূমির উত্তাপেও আল্লাহর প্রেমে শীতল থাকতেন। তাঁর দুই হাত ছিল দানশীলতার দুটি প্রস্রবণ। তিনি যখন কথা বলতেন, মনে হতো যেন জ্ঞানের মুক্তো ঝরছে। আলি কেবল একজন মানুষ নন, তিনি হলেন একটি পথ—যে পথ সরাসরি নবির সান্নিধ্যে এবং খোদার সন্তুষ্টিতে নিয়ে যায়। তাঁকে চেনা মানেই হলো নিজের আত্মাকে চেনা।

​২১.
হাফিজ শিরাজি

​দুনিয়ার বাদশা হওয়ার চেয়ে আলির দরজায় একজন ভিখারি হওয়া অনেক বেশি সম্মানের। কারণ বাদশাহদের রাজত্ব শেষ হয়ে যায়, কিন্তু আলির দেওয়া আধ্যাত্মিক সম্পদ চিরকাল অক্ষয় থাকে। আমি যদি কোনোদিন পথ হারিয়ে ফেলি, তবে আমি কেবল আলির নাম স্মরণ করব; কারণ তাঁর প্রজ্ঞার আলো আমায় সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেবে।

​২২.
মরক্কোর এক মরমি কাসিদা

​হে আবু তুরাব! আপনি মাটির ওপর বসতেন বলেই মাটি আজ আসমানের চেয়েও বেশি গর্ব করে। আপনার ত্যাগ আমাদের শেখায় যে, নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়াই হলো প্রকৃত বীরত্ব। আপনি ক্ষুধার্তকে খাবার দিয়ে নিজে উপোস করেছেন, বস্ত্রহীনকে কাপড় দিয়ে নিজে তালি দেওয়া পোশাক পরেছেন। আপনার এই সাধারণ জীবনযাপনই আপনাকে অসাধারণের ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে।

​২৩.
হাকিম সানায়ি

​আলি ছিলেন সেই আধ্যাত্মিক সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী, যাকে কোনো পার্থিব মুকুট দিয়ে সাজানোর প্রয়োজন পড়েনি। তিনি যখন যুদ্ধের ময়দানে যেতেন, তখন আসমানের ফেরেশতারাও তাঁর সাহস দেখে বিস্মিত হতো। কিন্তু যখন তিনি নির্জনে প্রার্থনা করতেন, তখন তাঁর বিনয় দেখে মনে হতো তিনি যেন জগতের ক্ষুদ্রতম এক ধূলিকণা। শৌর্য আর বিনয়ের এমন বিস্ময়কর মিলন কেবল আলির মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছিল।

​২৪.
ইবনে আরাবি

​আলি হলেন সেই মহাজাগতিক সত্যের অনুবাদক, যা সাধারণ মানুষের বুদ্ধির অতীত। তিনি শুধু আরবের কোনো বীর ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য আত্মিক স্বাধীনতার পথপ্রদর্শক। তাঁর জ্ঞানের আলোয় স্নান করলে অন্তরের কলুষতা দূর হয়ে যায়। তিনি হলেন সেই পূর্ণতা, যার মধ্যে আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলি মানুষের রূপ ধরে প্রকাশিত হয়েছে।

​২৫.
খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি

​হে আলি, আপনি হলেন সেই সমুদ্র যার প্রতিটি ঢেউ থেকে আধ্যাত্মিক রহস্যের মুক্তো ঝরে পড়ে। আপনার হাতে তলোয়ার থাকা মানেই হলো সত্যের বিজয় নিশ্চিত হওয়া। আপনি আপনার জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, তরবারির চেয়েও বড় হলো মানুষের চরিত্র ও ঈমানি শক্তি। যার অন্তরে আপনার প্রতি ভালোবাসা আছে, খোদার আরশ তার জন্য আর দূরে নয়।

২৬.
শাহ আব্দুল লতিফ ভিটাই

​বিপদের দিনে মানুষ যখন দিশাহারা হয়ে পড়ে, তখন আলির নামই হয়ে ওঠে শক্তির পাহাড়। তিনি ছিলেন সেই মহাবীর, যিনি কেবল শত্রুকেই পরাজিত করেননি, বরং নিজের ভেতরের ‘আমি’ বা অহংকারকেও চূর্ণ করেছিলেন। তাঁর দানশীলতার কোনো সীমা নেই; তিনি সেই রাজা যিনি প্রজাদের ঘরে খাবার দিয়ে নিজে খেজুরের পাতায় ঘুমাতেন। আলির পথই হলো প্রকৃত মানবতার পথ।

​২৭.
একটি ফার্সি লোক-কবিতা

আলি সেই মহান সত্তা, যিনি ক্ষুধার্ত এতিমের জন্য জান্নাত থেকে খাবার নিয়ে আসার ক্ষমতা রাখতেন, অথচ নিজের ঘরের উনুনে আগুন জ্বলত না। তাঁর কাছে রাজ্য বা খিলাফতের চেয়ে মানুষের চোখের এক ফোঁটা পানি মোছানো ছিল বেশি দামী। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, প্রকৃত বীর সেই নয় যে অন্যকে আঘাত করে, বরং সেই—যে আঘাত পেয়েও ক্ষমা করতে জানে।

​২৮.
ফরিদ উদ্দিন আত্তার

​হযরত আলি ছিলেন সেই মহাসমুদ্র, যার গভীরে লুকিয়ে ছিল মহান আল্লাহর অফুরন্ত রহস্য। তিনি যখন কথা বলতেন, মনে হতো আসমান থেকে প্রজ্ঞার বৃষ্টি নামছে। তাঁর বীরত্ব কেবল কাফেরদের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং তা ছিল মানুষের ভেতরের পশুত্ব আর কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে এক নিরন্তর লড়াই। তিনি নিজের আত্মাকে এমনভাবে পবিত্র করেছিলেন যে, তাঁর প্রতিটি কাজই ইবাদতে পরিণত হয়েছিল।

​২৯.
একটি উর্দু কবিতা

​আলি হলেন সেই মহাপ্রাণ, যাঁর দরজায় পৃথিবীর বড় বড় সম্রাটরা মাথা নত করতে গর্ববোধ করেন। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা পরিমাপ করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি হলেন সেই আলো, যা সরাসরি নবুওয়তের প্রদীপ থেকে জ্বালানো হয়েছে। যে ব্যক্তি সত্যের সন্ধানে ব্যাকুল, আলির হাত না ধরলে তার সেই পথ চলা কোনোদিন পূর্ণতা পাবে না।

​৩০.
একটি তুর্কি কবিতা

​তিনি হলেন সেই পথিক, যিনি আল্লাহর প্রেমের নেশায় মত্ত হয়ে দুনিয়াকে ভুলে গিয়েছিলেন। তাঁর দুই হাত ছিল আসমানি বরকতের আধার। তিনি যখন জুলফিকার তলোয়ারটি ধরতেন, তখন অন্যায় ভয়ে কেঁপে উঠত; আর যখন তিনি এতিমের মাথায় হাত রাখতেন, তখন রহমতের নদী বইত। আলি হলেন সেই প্রেমিকের নাম, যাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাসে কেবল মাওলার জিকির ধ্বনিত হতো।

​৩১.
আমির খসরু

​যার হৃদয়ে মাওলা আলির প্রতি ভালোবাসা নেই, সে আধ্যাত্মিকতার স্বাদ থেকে বঞ্চিত। তিনি হলেন সেই জ্ঞানের সমুদ্র যার তীরে দাঁড়ালে মনের সব অস্থিরতা দূর হয়ে যায়। নবিজি যাকে নিজের ভাই হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং যাঁর হাত ধরে বেলায়াতের ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর চরণে আশ্রয় পাওয়াই হলো জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। তিনি হলেন সেই সাহসের প্রতিকৃতি যার তুলনা সারা বিশ্বে দ্বিতীয়টি নেই।

​৩২.
আল্লামা ইকবাল

​আলি হলেন সেই সম্রাট যিনি দারিদ্র্যের মধ্যে আভিজাত্য খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর চরিত্রের তেজ হিমালয়ের চেয়েও অনড় ছিল। তিনি শিখিয়েছেন যে, ঈমান যদি মজবুত থাকে তবে শূন্য হাতেও বিশ্ব জয় করা সম্ভব। যে ব্যক্তি নিজেকে চিনতে চায় এবং নিজের ‘খুদি’ বা আত্মাকে জাগ্রত করতে চায়, তার জন্য আলির জীবন হলো এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। তিনি মাটির দুনিয়ায় থেকেও আরশ বা মহান প্রভুর সিংহাসনের খুব কাছাকাছি বাস করতেন।

৩৩.
ফররুখ আহমদ

পাহাড়ে পাহাড়ে তার গর্জন, জাগে মরু-প্রান্তর!
আলী হায়দার! আলী হায়দার! আসে আলী হায়দার!
মরু-আফতাব উড়ে চলে তার ঘোড়ার খুরে,
তলোয়ার খাপে সূর্যের খাব পড়ছে ঝুরে,
চমকালো ঐ দিগন্তে ওকি বজ্র-নাদ,
অথবা আলীর শাণিত দু’ধারী জুলফিকার?
দিক-দিগন্তে ভরে গেছে চোখে যায় না দেখা
মেঘ-নির্ঘোষে জাগে আতশের শস্ত্র লেখা!

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত