কয়েদখানার অপর নাম লালঘর এবং যা শেষ পর্যন্ত এক একটি অচলায়তন

‘অচলায়তন’ এই শব্দটির সঙ্গে প্রথম পরিচিত হয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথ রচিত সমনামের একটি নাটকের সূত্রে। সেই নাটকের বিষয়বস্তু যাইই হোক না কেন, এই শব্দটি আমাকে ভাবিয়েছিল। মনে হয়েছিল ‘অচলয়াতন’ এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা প্রকৃত অর্থে প্রগতিবিরোধী এবং যার অভ্যন্তরে রয়েছে গোঁড়ামিতে ভরা অনড় অচল এক সমাজ ব্যবস্থা। এটি এমনই স্থির যে তা একান্তই অপরিবর্তনীয় এবং যাকে বলে সত্যিকারের এক রক্ষণশীল ব্যবস্থা। ইচক দুয়েন্দে রচিত ‘লালঘর’ নামের ছোট্ট বইটি পড়তে পড়তে এই কথাগুলো অবলীলায় মনে এসে গেল।

বইটির ব্লার্ব-এ লেখা কয়েকটি বাক্য এখানে উল্লেখ্য মনে করছি। এতে বিধৃত হয়েছে, “পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের অপরিহার্য একটি প্রতিষ্ঠান কারাগার। সুদূর অতীতের শাসকরা কারাগার চালু করেছিলেন, তাঁদের প্রতিপক্ষ ও শত্রুদের শায়েস্তা করার জন্য। আজকাল গণতন্ত্র সাম্যের যুগের শাসকরা কারাগার রেখেছেন অপরাধীদের শাস্তিদান ও সংশোধনের নামে। ‘লালঘর’-এর চরিত্রদের হাজতবাস মাত্র এক দিনের। তবে তারা ভাবুক প্রকৃতির মানুষ। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, আজকের এই গণতন্ত্র ও সাম্যের যুগে কারাগার কি আদৌ প্রসঙ্গিক?”

প্রশ্নটি বেশ ভাবিয়ে তোলার মতো একটা ব্যাপার। এর উত্তর দেবার দায় একা আমার নয়। তবে যখন এই ছোট্ট বইটি নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করছি তখন এই গূঢ় প্রশ্নের উত্তর খুঁজব নিশ্চয়ই। সেটি অবশ্য একান্তভাবে আমার নিজেরই ভাবনা ছাড়া কিছু নয়। তবে উত্তর যাই হোক না কেন, কোনও বিতর্কের সূত্রপাত করা কিন্তু আমার কাম্য নয়।

প্রথমেই জানাই, এই আখ্যানে ভাবুক প্রকৃতির অতি সাধারণ মানুষ যাকে ইংরেজিতে বলে ‘ইনোসেন্ট’ – এমন কয়েকজনকে একদিনের হাজতবাসের এই যে অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রকাঠামো তাঁদের দিলেন, তা সত্যিই অনাকাঙ্খিত। তবে দুঃখের বিষয় এই দেশে প্রতিনিয়ত এই অনাকাঙ্খিত ব্যাপারটিই অবলীলায় হয়ে চলেছে প্রতিদিন। যারা সত্যিকারের অপরাধী, তারা নানারকম কৃৎকৌশল খাটিয়ে প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে নিজেদের অপকর্মগুলো নিত্যদিন করে যাচ্ছে। অথচ ‘বলির পাঁঠা’ হচ্ছে একেবারেই অজ্ঞ কিছু মানুষজন যাঁরা সত্যি সত্যি আপন সৃজনকর্মে মেতে থাকতে চান অথবা অপরাধ জগতের সঙ্গে তাঁদের নেই কোনও বিন্দুমাত্র সংযোগ। অথচ পাকেচক্রে তাঁদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং তাঁদের মনোজগতের উপর নানাভাবে পীড়ন করে যাচ্ছেন রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্ষমতাধারী কিছু মানুষ। এই ‘লালঘর’ শিরোনামের বড়গল্পটিতে সেইরকম কিছু ভাবুক প্রকৃতির মানুষের উপর অত্যন্ত অন্যায়ভাবে একদিনের হাজত-বাসের ক্লিন্ন অভিজ্ঞতা উপহার দিলেন তথাকথিত ক্ষমতাধারী সেইসব সরকারি নিপীড়ক। এই আখ্যানে ছোট ছোট ১৮টি পর্বে লেখক তারই সরস বর্ণনা দিয়েছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিকারের অপরাধী যারা, যারা সত্যি রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটার পর একটা অপরাধ সংঘটিত করে সাধারণ মানুষের জীবনে নিয়ে আসছে নানারকম দুর্দশা, তাদের জন্যেই তো দরকার কারাগার। বিচার ব্যবস্থার সুসম প্রয়োগে তাদেরকে সেই অর্থে মানসিকভাবে সংশোধন করে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্যেই তো প্রয়োজন এই কারাগারের, যার অপর নাম এখন সংশোধনাগার। কিন্তু কার্যত কী হচ্ছে? বিচার ব্যবস্থার নানারকম ফাঁকফোকর বার করে দুঁদে উকিলরা প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে যাচ্ছেন সব সময়। অর্থাৎ এই সমাজব্যবস্থায় যার যত টাকার জোর, তার তত বুক ফুলিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। আদ্যন্ত ঘুণে ধরা এক বিচিত্র ব্যবস্থার মধ্যে চলেছে এই অনড় প্রক্রিয়া অনাদিকাল ধরে। অন্যদিকে শাসকের রোষানলের শিকার হচ্ছে তারাই, রাজনৈতিকভাবে যারা হলেন বিরোধী। অতএব যে বা যারা যখন শাসন ব্যবস্থায় আসছেন, তারাই ঠিক করছেন তাদের শত্রু এবং মিত্রকে। এবং সেইভাবেই চালনা করা হচ্ছে সমস্ত রাষ্ট্রিয় শাসন ব্যবস্থাকে, এবং সেই আলোকেই চলেছে শাসনের নামে শত্রুনিধন অথবা বিরোধী শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার অবিরত চেষ্টা। বস্তুত এরই সাফল্য এবং অসাফল্যের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে ক্ষমতার সমস্ত দম্ভ যা শেষ পর্যন্ত জন্ম দিচ্ছে এক একটি অচলায়তনের, যাকে ভেঙ্গে ফেলা মোটেই সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। তাই তথাকথিত গণতন্ত্র এবং সাম্যের (?) যুগে টিকে আছে কয়েদখানা যার অপর নাম কারাগার বা লেখকের ভাষায় ‘লালঘর’।

ইচক দুয়েন্দে বেশ সরস ভাষায় ১৮টি ছোট ছোট পর্বে এই বড়গল্পটি লিখেছেন। পাত্রপাত্রীর নামগুলো বেশ চমকপ্রদ, তাঁদের কেউ চিকচাক রুই, কেউবা ইন্টুম কাসকেট, কেউ তুনির চুমক আবার কেউ রজেট চিনচুই। নামগুলো নিঃসন্দেহে অভিনব। এই অভিনবত্ব নির্মাণ করা ছাড়া আর কোনও গূঢ় অভিপ্রায় লেখকের আছে কিনা, সেটা আমার অজানা। যা হোক, গল্পের প্রথম পর্বেই লেখক কারাগারের একটি ছোট্ট কুঠুরির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে পাঠককে খানিকটা হলেও সন্ত্রস্ত করে তোলেন, “আজ রাতে সে নিজের নরম বিছানায় নেই। মাথার তলে তার বালিশ নেই। সে দাঁড়িয়ে আছে। রুই দাঁড়িয়ে আছে একটা বর্গাকৃতি ঘরে। ৯ ফুট X ৯ ফুট। উচ্চতা প্রায় ১২ ফুট। ইটে তৈরি, ঢালাই ছাঁদ, পলেস্তরা লাগানো চুনকাম করা দেয়াল ও ছাঁদ। ফ্যান ঝোলাবার আঙটাটা কাটা। ঘরের এক কোণে একটা দরজা দিয়ে যাওয়া যায় একটি ছোট্ট ঘরে। ৩ ফুট X ৩ ফুট। প্রকৃতির ডাকে মানুষ সেখানে যেতে পারে। ঘুটঘুটে অন্ধকার সেটা, বাল্ব নেই। সামনে গরাদ। প্রায় ৩ ফুট চওড়া এক পাল্লা দরজার মতো গরাদটা খোলা বা বন্ধ করা যায়। এটাই এই ঘরটিতে ঢুকবার বা বেরুবার একমাত্র পথ।” এই বর্ণনা যে কোনও সংবেদনশীল পাঠককে বিচলিত করবেই। যা হোক, এই ছোট্ট ঘরটিতে এগারোজন একেবারে নির্দোষ মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে। রাত তখন তিনটে। একজন মানুষ যার নাম চিকচাক রুই, সে কেবল দাঁড়িয়ে আছে আর অন্য দশজন ওই ছোট্ট ঘরের মেঝেতে গাদাগাদি করে শুয়ে। একটা কম্বল বিছানো সেই ভূমিশয্যার দৃশ্যটা কল্পনা করলেই শিহরণ জাগে। লেখক এই পর্বগুলোয় অত্যন্ত মুনশিয়ানার সঙ্গে ওই এগারোজন নিরপরাধ মানুষের একদিনের হাজত বা জেলবাসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। নানারকম অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ওরা একসময় বাইরে আসে, কিন্তু একটি জটিল প্রশ্নচিহ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়।

এই ছোট্ট বইটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর আঠেরোতম বা শেষ অধ্যায়টি। যে জটিল প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে পাঠকদের, তারই কিছু সুচয়িত বিন্যাস রচিত হয়েছে এখানে। একদিনের জেলবাসের শেষে চিকচাক রুই ভাবতে থাকে এইভাবে, “পৃথিবীতে যে কারাগার নামে একটা জিনিস আছে, এ আমার জানাই ছিল না।” তাঁর জিজ্ঞাসা, “সাম্য, মৈত্রী, গণতন্ত্রে পরিচালিত একটি রাষ্ট্র কী করে তার নাগরিকদের শাস্তি দেবার জন্য কারাগার রাখে?” সে আরও ভাবে, “সুস্থ, সুখী মানুষেরা কখনো অপরাধ করে না। অপরাধ করে যারা অসুস্থ ও অসুখী। সেই তথাকথিত অপরাধীদের দরকার সুচিকিৎসা, শাস্তি নয়।” এরপর আরও কিছু মারাত্মক নিদান দিয়েছেন লেখক। যেমন,

“বর্বর দেশগুলির একশভাগ লোকই জেলখানায় কাটায় কারণ তারা তো হয়ে থাকে সভ্য দেশগুলির কয়েদখানা।”
“আমাদের এই প্রিয় গ্রহ পৃথিবীটাই তো শূন্যে ভাসমান এক বিশাল কারাগার।”
“দেশ রাষ্ট্র পাসপোর্ট ভিসা। বড় বড় কারাগার।”
“কবর, আরেক কারাগার।”
“অদৃশ্য মৃতলোক, সবচেয়ে বড় কারাগার।”

সবশেষে লেখক শ্লোগানের মতো তীব্রস্বরে উচ্চারণ করেছেন, “লালঘর নিপাত যাক।”

লালঘর, ইচক দুয়েন্দের বড়গল্প • প্রচ্ছদ: শিবু কুমার শীল, প্রকাশক: পেঁচা, রাজশাহী—১৪২৯ বঙ্গাব্দ
লালঘর, ইচক দুয়েন্দের বড়গল্প • প্রচ্ছদ: শিবু কুমার শীল, প্রকাশক: পেঁচা, রাজশাহী—১৪২৯ বঙ্গাব্দ

লালঘর কোনওদিন উঠে যাবে কিনা জানি না। তবে আমরা জানি পৃথিবীর কোথাও কোথাও মুক্ত কারাগার তৈরি হয়েছে। ইয়োরোপের হল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডের মতো দেশে অপরাধীদের জন্যে তুলনামূলকভাবে অনেক উদার ব্যবস্থা রয়েছে। সেই দেশে জেলখানার সংখ্যা ক্রমশ কমিয়ে আনা হচ্ছে। ব্রাজিলের মতো দেশে ইটুয়ানা কারাগারে কোনও রক্ষী নেই। এটি পরিচালনা করে একটি সংস্থা যা বন্দিদের সহায়তা করে। এছাড়া আয়রল্যান্ড, পিলিপাইন, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি জায়গায় এবং জার্মানিতেও মুক্ত কারাগার আছে। তবে একেক দেশে একেক নিয়মের নিগড়ে বাঁধা।

২০১৭ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত বাংলাদেশের ‘প্রথম আলো’ দৈনিকের পাতায় এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদন  প্রকাশিত হয়েছিল– ‘উখিয়ায় হচ্ছে দেশের প্রথম উন্মুক্ত কারাগার’। চট্টগ্রামের কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বড়বিল গ্রামে ওই দেশের প্রথম ‘উন্মুক্ত কারাগার’ নির্মাণের কথা জানা গিয়েছিল। প্রকল্পটি তখন একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। জানি না এতদিনে সেটা চালু হয়েছে কিনা! চালু হয়ে থাকলে তার কাজকর্ম কেমন চলছে সেটাও অজানা।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের লালগোলায় ১৯৮৭ সালের ৩১শে জুলাই দেশের প্রথম মুক্ত কারাগার চালু করা হয়। এখানে ঠাঁই দেওয়া হয় যাবজ্জীবন দণ্ডাজ্ঞা প্রাপ্ত আসামিদের। অবশ্যই সেইসব আসামি, যাঁদের বিগত কয়েক বছরের জেলবাস করার রিপোর্ট ভালো। প্রথমে সেখানে ২০ জন আসামিকে রাখা হয়। তাঁরা ওখানে তাঁদের পরিবার নিয়ে বাস করার সুযোগ পান। তাঁরা দিনের বেলায় বাইরে বেরিয়ে কাজ করারও অনুমতি পান। তাদের কেউ কেউ কারাগারের বাইরে ছোটোখাটো ব্যবসা করার সুযোগ পান। তবে সবাইকেই রাত আটটার মধ্যে কারাগারে তাঁদের নিজস্ব আবাসস্থলে ফিরে আসার নিদান দেওয়া হয়। এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি আজও। সেখান থেকে কেউ পালিয়ে যায়নি। ওই আদলেই মেদিনীপুরেও একটি মুক্ত কারাগার স্থাপন করা হয়। তবে এখানে বন্দিরা বাইরে বেরিয়ে কাজ করার সুযোগ পেলেও ওখানে তাঁদের পরিবার নিয়ে বাস করার সুযোগ দেওয়া হয় না। বন্দিদের সকাল আটটায় বেরিয়ে বিকেল পাঁচটার মধ্যে ফিরে আসতে হয়। বলাবাহুল্য এখান থেকেও কেউ কোথাও পালিয়ে যাননি। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের দুর্গাপুর ও উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে দুটো মুক্ত কারাগার আছে। মেদিনীপুরের পরে শিলিগুড়িতেও এমন একটি মুক্ত কারাগার তৈরি করার কথা জানা গেছে। এছাড়া দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি জায়গায় মুক্ত কারাগার আছে বলে জানা যায়। দিল্লির তিহার এবং উত্তরাখণ্ডের সিতারগঞ্জে মুক্ত কারাগার আছে।

আটষট্টি বছর আগে মুম্বাইতে ‘দো আঁখে বারহ হাত’ নামে একটি ছবি তৈরি করেছিলেন ভি শান্তারাম। সেই ছবির মূল গল্পটাই ছিল মুক্ত কারাগারের উপর ভিত্তি করে। বলাবাহুল্য সেই সময়ে অমন একটি ভাবনা ভাবাই ছিল অত্যন্ত মৌলিক ও অভিনব। ছবিটা এতই শিল্পসম্মত হয়েছিল যে দেশে বিদেশে যথেষ্ট সম্মান ও মান্যতা পেয়েছিল। আশ্চর্যের কথা এই ভারতে অনেক দেরিতে হলেও মুক্ত কারাগারের ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়।

মানুষ মানুষের বন্ধু এবং একইসঙ্গে শত্রু। একজন আরেকজনের যেমন বন্ধু তেমন প্রতিপক্ষও। ক্ষমতা ও দম্ভের লড়াইয়ে মত্ত হয়ে মানুষ ধংস করেছে অনেক জনপদ, হত্যা করেছে অজস্র নিরপরাধীদের। আণবিক বোমার আঘাতে ধংস হয়ে গেছে কত জনপদ! তবু সভ্যতার অগ্রগতি থামেনি। মানুষ ক্রমশ এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। একদিকে যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা অন্যদিকে নিত্যনতুন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। বহু নিহত মানুষের লাশের উপর উল্লাস করেছে পিশাচের দল। তবু মানুষের সভ্যতার অবলুপ্ত ঘটেনি। আমাদের অপেক্ষা কেবল সকলের শুভবুদ্ধির।

সেই শুভবুদ্ধির আলোকে শুধু লালঘর নয়, একদিন মানুষের মন থেকে মুছে যাবে ঘৃণা, বিদ্বেষ আর অবমাননা। জানি না, এসব শুধু দুর্বল মানুষের অলীক কল্পনা কিনা! লেখকের সুরে সুর মিলিয়ে পরিশেষে বলতে ইচ্ছে করে, “আইনভঙ্গ করলেই প্রায় বিনা ব্যতিক্রমে মানুষের হাতে কেন পরাতে হবে হাতকড়া? কেন করতে হবে বন্দি? এই নিয়ম তো চালু হয়েছিল ‘জোর যার মুল্লুক তার’ যখন চালু ছিল পৃথিবীতে।

প্রশ্ন হলো, সেই নিয়ম কি একেবারে উঠে গেছে? এখনও তো গণতন্ত্রের নামে এক ধরনের দলতন্ত্র কাজ করে যাচ্ছে। ক্ষমতার দম্ভে সবল সব সময় ছড়ি ঘোরাচ্ছে দুর্বলের উপর। হ্যাঁ, গণতন্ত্রের একটা মনোলোভা মোড়ক অবশ্যই আছে। কিন্তু পৃথিবীর বুকে প্রতিরক্ষার নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দেশগুলো। সমগ্র মনুষ্য জাতির উপর, পৃথিবী নামক এই ছোট্ট গ্রহের আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে ক্ষমতায় মদমত্ত মার্কিন মুলুক, এ কথা কি অস্বীকার করা যায়? তারা কি নিত্যদিন আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে না, তাঁরাই এই গ্রহের অধীশ্বর!

পরিশেষে রবীন্দ্রনাথের ‘অচলায়তন’ নাটকের একটিমাত্র সংলাপ উল্লেখ করে আমার এই সন্দর্ভের ইতি টানছি।

“দাদাঠাকুর – ভাবনা নেই আচার্য, ভাবনা নেই – আনন্দের বর্ষা নেমে এসেছে – তার ঝর ঝর শব্দে মন নৃত্য করছে আমার। বাইরে বেরিয়ে এলেই দেখতে পাবে চারিদিক ভেসে যাচ্ছে। ঘরে বসে ভয়ে কাঁপছে কারা। এ ঘনঘোর বর্ষার কালো মেঘে আনন্দ, তীক্ষ্ণ বিদ্যুতে আনন্দ, বজ্রের গর্জনে আনন্দ। আজ আমার উষ্ণীষ যদি উড়ে যায় তো উড়ে যাক, গায়ের উত্তরীয় যদি ভিজে যায় তো ভিজে যাক – আজ দুর্যোগ একে বলে কে! আজ ঘরের ভিত যদি ভেঙ্গে গিয়ে থাক না – আজ একেবারে বড়ো রাস্তার মাঝখানে হবে মিলন।“   (পৃষ্ঠা – ৭৮৬, রবীন্দ্র রচনাবলী ৫ম খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৮৪)

ইচক দুয়েন্দে সেই ঘনঘোর বর্ষার কথা বলেছেন, তীক্ষ্ণ বিদ্যুৎ আর বজ্রের গর্জনে আনন্দ প্রাপ্তির সন্দেশ দিয়েছেন। তাঁর সেই স্বপ্ন সফল হোক বা না হোক, জিজ্ঞাসু মানুষের মনের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের উৎস-মুখের সন্ধান করার বার্তা দিয়েছে। সেই বার্তা কি বিফলে যাবে?

মন্তব্য লিখুন

ধন্যবাদ। নাম ও মতামত লিখুন। পর্যালোচনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মন্তব্যটি প্রকাশিত হবে।

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত