৩১ মার্চ ২০২০
ব্যবহৃত শিল্পকর্ম :
মাহবুব মুর্শিদ
সৈয়দ তারিক
কবি, ভাবুক
2517

সৈয়দ তারিক
কবি, ভাবুক

2517

বালাগাল উলা বি-কামালিহি

নবিজির বন্দনায় অপূর্ব একটি কাওয়ালি

আমার সবচেয়ে প্রিয় যে-কয়টি কাওয়ালি গান আছে, যা আমাকে দারুণভাবে আপ্লুত করেছে, মুগ্ধ করেছে, অভিভূত করেছে, তার একটি হলো ‘বালাগাল উলা বি-কামালিহি’। কাওয়াল দুই ভাই সাবরি ব্রাদার্স নামে পরিচিত একজন গোলাম ফরিদ সাবরি (১৯৩০ – ১৯৯৪) ও অন্যজন মকবুল আহমেদ সাবরি (১৯৪৫ – ২০১১) যুগলবন্দিতে এই গানটি করেন। বড় অপূর্ব, বড় মনমাতানো এই উপস্থাপনা।

 

এই গানটি নিয়ে আমার ব্যক্তিগত একটি স্মৃতি আছে। অত্যন্ত উজ্জ্বল ও আমার জন্য অতীব তাৎপর্যপূর্ণ সেই স্মৃতি। কুড়ি বছর আগের কথা। আমার যিনি মুরশিদ তার সাথে দেখা করবার জন্য প্রথমবার গেছি তার দরবারে। তার কক্ষের সামনে গিয়ে দেখি, সেখানে অনেক মানুষের ভীড়, কিন্তু সবাই বসে আছে স্থির হয়ে। ক্যাসেটে গান বাজছে লাউড স্পিকারে জোরে। যে গান বাজছে সেটির কথাই আলাপ করছি। কক্ষের মাঝখানটায় তিনি বসা। তাকে ঘিরে পুরো কক্ষে ভক্ত-আশেকেরা বসে আছে। তিনি ধ্যানস্থ। তিনি সমাহিত। আর ধ্যানে নিমগ্ন মানুষের মুখে অপূর্ব এক বিভা থাকে। যে যত নিমগ্ন থাকেন, চিত্তানন্দে থাকেন, তার মুখমণ্ডল তত স্নিগ্ধ থাকে। তার স্নিগ্ধ ও স্থির মুখ আমি দেখতে থাকলাম। ওই সময়ের বিবরণটা যেন-বা মিলে যায় আমির খসরুর একটি কালামের সাথে, যেখানে তিনি বলছেন, গতরাতে তিনি এক দিব্য মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন, যেখানে উজ্জ্বলতম প্রদীপ হয়ে বসেছিলেন স্বয়ং মহানবি। মুহাম্মদ শাম-ই মেহফিল বুদ সব জায়েকে মান বুদাম।

 

আলোচ্য গানটির ভিত্তি শেখ সাদি বিরচিত অমর রুবাই ‘বালাগাল উলা বি-কামালিহি’। তবে এটি বিস্তৃত হয়েছে মহানবির পবিত্র মেরাজের আবহে।

 

মেরাজ। বড় বিস্ময়কর সেই ঘটনা। ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদু বাস্তবতার একটা বয়ান কি এটা, নাকি পরাবাস্তবতা? নাকি আধ্যাত্মিক বাস্তবতা বলাই উচিত? এই ঘটনা কতজনকেই না ভাবিয়েছে কতভাবে। দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ রচনায় মেরাজের বয়ানের বড় প্রভাব আছে বলে জানা যায়।

 

একরাতে বোরাক নামের এক ডানাঅলা ঘোড়া আকৃতির জীবের পিঠে সওয়ার হয়ে মহানবি পৃথিবী ও মহাকাশ ছাড়িয়ে সৃষ্টির শেষ সীমা সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছান। বর্ণনায় আছে, এই পর্যন্ত ফেরেশতা জিবরাইল তার সাথে সঙ্গ দিয়েছিলেন। তারপর? তারপর জিবরাইল বিদায় নিলেন। কেন? তার পরই লা-মোকাম : না-এর রাজ্য, কোনো সৃষ্টি সেখানে যেতে পারে না। জিবরাইল তো আল্লাহর একটি মাখলুক মাত্র। তার প্রবেশাধিকার নাই লা-মোকামে। সেই লা-মোকামেই রয়েছে আরশে আজিম, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেখানে সমাসীন। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে মহানবির নিমন্ত্রণ সেই না-এর রাজ্যে, লা-মোকামে।

 

এটা কীভাবে সম্ভব হলো? সে ভারি রহস্যের কথা। স্পষ্ট করে বলাও মুশকিল। ‘শেরেক, শেরেক’ হাঁক উঠতে পারে চৌদিকে, হামলে পড়তে পারে ‘তৌহিদি জনতা’। এসব রহস্যলোকের কথা কইতে বারণ। ‘সে দেশের কথা এ দেশে কহিলে লাগিবে মরমে ব্যথা।’ সাঁইজির কোনো একটা গানে এমন জিজ্ঞাসা আছে : মহানবি যে গেলেন মেরাজে নিরাকার আল্লাহর সাথে দেখা করতে আর মিলন হলো দুজনার, এটা কেমনে ঘটল? মহানবি আকার হারিয়েছিলেন, নাকি আল্লাহ আকার ধরেছিলেন? আহা! এ যে বড় ভেদ আকার-সাকার-নিরাকারের।

 

সেই ভেদ এখানে না ভাঙি, বরং মাথা নত করে জোরহাতে কবুল করি : আমি এসব কিচ্ছু জানি না। নমি দানাম। আর জানলেও কইতে পারব না। গুরুর নিষেধ আছে। যার জানার আগ্রহ আছে, নিজ-নিজ গুরুর কাছ থেকে জেনে নিন। অথবা মোরাকাবায় বসলে আল্লাহর রহমত হলে প্রাঞ্জল হবে সব কিছু।

 

গানটির প্রসঙ্গে ফিরি। এটিতে আরবি, ফারসি ও উর্দু তিন-তিনটি ভাষায় রচিত বয়ান রয়েছে। এর মূল রুবাইটি আরবি ভাষায় লেখেন সাদি। একজনের কাছে শুনেছিলাম একদা, এটির শব্দচয়ন এমন যে আরবি ও ফারসি উভয় ভাষায় প্রচলিত শব্দে এটি রচিত। গানটিতে একদিকে মেরাজের অনুষঙ্গ অন্যদিকে রুবাইটির ভাবের বিস্তার এইভাবে পুরো কালামটি গড়ে উঠেছে। পুরুষোত্তম মুহম্মদের (সা.) বন্দনা ও তার সাথে মিলনের জন্য ব্যাকুলভাবে অপেক্ষমাণ স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। আল্লাহই এখানে প্রেমিক, নবিজি প্রেমাস্পদ। কোরান শরিফে আছে, স্বয়ং আল্লাহ ফেরেশতাদের নিয়ে নবিজির উপর দরুদ পেশ করেন, বান্দাদের জন্য হুকুম, তারাও যেন সম্মানের সাথে তা করে। গানটির শেষের দিকে বলা হয়েছে, সকল কথার সার কথাই হলো নবিপ্রেম, ইশকে রাসুল। কোরান-এরই কথা এটা : ‘যে আমাকে ভালোবাসতে চাও, সে আমার হাবিবকে ভালোবাসো।’ আহা! ‘সখি হে, কি পুছসি অনুভব মোয়! সোই পীরিতি অনুরাগ বাখানিতে তিলে তিলে নতুন হোয়।’

 

অনুবাদ ও ভূমিকা : সৈয়দ তারিক

ইয়া নবি সালাম আলাইকা

ওগো শেষ নবি, তুমি কাঙ্ক্ষিত কাবা,
যা-কিছু আকার আছে সব কিছুতেই তুমি আছ,
পরম সত্যের যত নিদর্শন আছে,
তোমাকে দেখানো হয়ে গেছে।
তুমি সেই সারবস্তু ছিল যা আড়ালে পর্দার।

চমৎকার ছিল সেই রাত,
চারিদিক শান্ত সমাহিত।
প্রেমের আকর্ষণ পুরোপুরি কার্যকর ছিল।
তিনি তাঁর প্রেমিককে ডেকেছেন আরশের দিকে।
ইচ্ছা হয়েছে তাঁর তাকে দেখবার,
মেরাজ তো শুধু বাহানার।
লা-মোকাম হতে ডাক এসেছিল তাই,
সৃষ্টির সীমানা সেই সিদ্রাতুল মুন্তাহায় গিয়েছেন নবি।
এটাই মোজেজা ছিল সৌন্দর্যের পরিপূর্ণতার,
সত্তার পরম যিনি তিনিও বিচ্ছেদে বিচলিত।
লা-মোকাম হতে ডাক এসেছিল তাই,
সৃষ্টির সীমানা সেই সিদ্রাতুল মুন্তাহায় গিয়েছেন নবি।
সীমানা ছিল কি কোনো আরোহণে তার?
শিখরে ওঠেন তিনি পরিপূর্ণতার।
বালাগাল উলা বি-কামালিহি।

সৃষ্টির সেরা
সূক্ষ্মের স্মারক
নির্দেশী তারা
স্তম্ভে আলোক।

ঊষার অরুণ
রাত্রির চাঁদ,
যা ধারণ করে আছে
নবি মোহাম্মদ।

ছিল কি সীমানা কোনো
আরোহণে তার?
ওগো প্রভু, ওগো দীনের প্রধান,
ওগো রহমত দুনিয়ার,
ওগো রসুলগণের নেতা,
ওগো নবিদের সরদার।

বেহেশত স্মারক চিহ্ন রাস্তায় তোমার
ঈমানের সূর্য হলো চেহারা তোমার
রাত্রি প্রশংসা গায় সেই চেহারার
ভোরের কল্যাণ হলো চেহারা তোমার
ইসমে আজম হলো নামটি তোমার
জগৎ-জীবন হলো শরীর তোমার
মানবজাতির গর্ব যাত যে তোমার
পরমের মহিমাই মহিমা তোমার।

সীমানা ছিল কি কোনো আরোহণে তার?
মাটি হতে যিনি যান আরশে আল্লাহর,
বোরাকের পিঠে তিনি নির্ভয়ে চড়েন,
পৃথিবীর তল আর বেহেশতের ফলক,
পায়ের তলায় তার সাঁকো ও সড়ক।
চুলের গুচ্ছ তার ঝুলে দুলছিল
সমস্ত জাহান ঘ্রাণে ভরে উঠেছিল
বুলবুল পাখি যত মাস্ত্ হয়েছিল
গোলাপকুঁড়িরা সব ফুটে উঠেছিল
সীমানা ছিল কি কোনো আরোহণে তার?
বাড়ি ছেড়ে বোরাকের পিঠে যাত্রা যার।
মিলনের রাতে মুখ এনেছিল ভোর
ভালোর চাইতে ভালো ছিল এ সফর
এই কথা মুখে মুখে ছিল সব্বার,
সীমানা ছিল কি কোনো আরোহণে তার?
শিখরে ওঠেন তিনি পরিপূর্ণতার।
বালাগাল উলা বি-কামালিহি।

এটাই আরম্ভ ছিল, এইটাই শেষ।
তিনি এই উজ্জ্বলতাধারী
সত্যের যে প্রকাশকারী,
ঝলমল করেছিল সমস্ত জাহান
রূপের বিভায় তার পালালো আঁধার
কাশাফাদদুজা বি-জামালিহি।
ছিল না আকাশ, চাঁদ, রাত, তারা আর,
যদি না-ই হতো সৌন্দর্য তোমার
হতো না কিছুই এই জগতের আর
ঝলমল করছিল প্রতিটি জিনিসই
রূপের বিভায় তার পালালো আঁধার
কাশাফাদদুজা বি-জামালিহি
এমন রোশনি ছিল মুখে মোস্তফার।

মূর্তিমান রূপ তিনি খোদার দয়ার
সব মানুষের কাছে উদারতা যার
প্রকাশ্য কোরান তিনি সামনে সবার
চরিত্র-স্বভাব বড় সুন্দর তার
হাসুনাত জামিউ খিসালিহি।
হক-ই-মুহম্মদি অবাক হবার
সবার উপরে আছে রহমত তার
হাশর অবধি রবে উম্মতি তার
চরিত্র-স্বভাব বড় সুন্দর তার
হাসুনাত জামিউ খিসালিহি।

সত্য রক্ষাকারী তিনিই একা
সত্য প্রকাশকারী তিনিই একা
মুহম্মদের মুখ দর্পণ সেই
মহান আল্লাহ্ তাই বলেন নিজেই
ওনাকে সপরিবারে সালাম জানাও
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।
আমার দীনের ঘ্রাণ ওয়ারিসানের
খোদার কসম : সেটা ইশকে রাসুল,
সকল কথার সার জিকিরে-ফিকিরে
জানাও সালাম তাকে সপরিবারে
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।

কী বলি বোঝাতে কথা পরিপূর্ণতার
শিখরে পৌছান তিনি পরিপূর্ণতার
বালাগাল উলা বি-কামালিহি
দিয়েছে ঝলক যেই সৌন্দর্য তার
রূপের ছটায় তিনি তাড়ান আঁধার
কাশাফাদ-দুজা বি-জামালিহি
আমি অভিভূত হই স্বভাবে যে তার
স্বভাবে সৌন্দর্য ছিল অসীম অপার
হাসুনাত জামিউ খিসালিহি
আমাদের সকলের জীবন, হৃদয়
ভরে থাকে অবিরল তার ভাবনায়
ওনাকে সপরিবারে সালাম জানাও
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।

প্রকাশিত রূপ ওগো খোদার আলোর
শিখরে পৌঁছান তিনি পরিপূর্ণতার
বালাগাল উলা বি-কামালিহি,
মাওলা আলি হন মুশকিল কুশা,
রূপের ছটায় তিনি তাড়ান আঁধার
কাশাফাদ-দুজা বি-জামালিহি,
ফাতেমার দুই প্রিয় হাসান-হোসেন,
স্বভাবে সৌন্দর্য ছিল অসীম অপার
হাসুনাত জামিউ খিসালিহি,
অর্থাৎ মোহাম্মদ মোস্তফা
ওনাকে সপরিবারে সালাম জানাও
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।।

শুনুন- বালাগাল উলা বি-কামালিহি

 

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত