[বালিকা বৈকালিক, শোনো—শহরে শীতকাল আর মাখো মাখো ঘুম; দেখলাম, চিৎশোয়া লাশ; মৃতদেহ; দেখলাম উবুশোয়া লাশ; শবদেহ; দেখলাম উলঙ্গ সে লাশ! নিঃশব্দ! নাই নাই শব্দের কাতশোয়া মড়া! কথা নাই—বার্তা নাই। নড়ে না, হাঁটে না—ওঠে না, বসে না। সে মড়া নেই প্রেমে, সঙ্গমে নেই।
নাই জানা নামও! দেখলাম মৃত, দেখলাম আমি; দেখলাম আমাকেই; চিৎশোয়া—কাতশোয়া—উবুশোয়া ব্যর্থ মহাকাল!…]
মঞ্চের ঠিক মাঝ বরাবর একটি মৃতদেহ। উবু। উলঙ্গ। রঙিন আলো আঁধারিতে বোঝা যায় কি যায় না। মৃতদেহ ঘিরে একদল নারী ও পুরুষ।
প্রত্যেকেই মৃতদেহটিকে নিজের লাশ বলে দাবি করছে।
(কোরাস)
শুনতে পাচ্ছি, শোনা যাচ্ছে, পষ্ট যাচ্ছে শোনা
শুনতে পাচ্ছি, শোনা যাচ্ছে, পষ্ট যাচ্ছে শোনা
একটা একটা মারের শব্দ যাচ্ছে কিন্তু গোনা
একটা একটা মারের শব্দ যাচ্ছে কিন্তু গোনা!
নীলমানুষ:
শোনা যাচ্ছে! কান পেতেছি, শুনতে পাচ্ছি সব
ব্যর্থ প্রেমের গল্পে যত নীরব কলরব—
শোনা যাচ্ছে সব।
লালমানুষ:
শুনতে পাচ্ছি! গানের কলি, শরীর ভরা সুর
এবং যত বিষাদ বিষাদ পাঁজরে ভাঙচুর…
(কোরাস)
শুনতে পাচ্ছি, শোনা যাচ্ছে, পষ্ট যাচ্ছে শোনা
শুনতে পাচ্ছি, শোনা যাচ্ছে, পষ্ট যাচ্ছে শোনা
একটা একটা মারের শব্দ যাচ্ছে কিন্তু গোনা
একটা একটা মারের শব্দ যাচ্ছে কিন্তু গোনা!
হলুদমানুষ: (লাশের বুকে কান পেতে…)
শুনতে পাচ্ছি, দেহের ভেতর পাথর ভাঙার গান
কান পেতেছি কান
শুনতে পাচ্ছি, দেহের ভেতর সমস্ত খানখান
কান পেতেছি কান।
[লাশটি এখন চিৎশোয়া। তাকে ঘিরে সংখ্যাতীত নারী।]
ষোড়শী: (লাশের দিকে আঙুল তুলে)
এই দেহ আমারই। ওই শোন, নদীভাঙনের ঝুপঝাপ
ওই ওই ওই যে, শোন মরাবর্ষার জলটুপটাপ..
শোনোওওওও…
অষ্টাদশী: (লাশের চারদিকে পাক খেতে খেতে)
এই দেহ আমারই। ভেতরে চুড়ির শব্দ যত
এক, এক কোটি পায়ের শব্দ অন্তত
জুতার খসখাসানি, আমার যত যাওয়া কিংবা আসা
সব, সব শব্দ, শব্দে শব্দে মৃতদেহ ঠাসা…
আটাশেকুমারি:
আমার নয় কেন! চেনা যাচ্ছে নূপুরের ঝুমুর ঝুমুর
চেনা যাচ্ছে কণ্ঠভরা তিক্ত-কালো সুর
চেনা যাচ্ছে, ঝগড়াঝাটি, নটির পোলা গালি
শুনে দ্যাখো, চড়ের শব্দ—গোঙানি—হাততালি!
(কোরাস)
শুনতে পাচ্ছি, শোনা যাচ্ছে, পষ্ট যাচ্ছে শোনা
শুনতে পাচ্ছি, শোনা যাচ্ছে, পষ্ট যাচ্ছে শোনা
একটা একটা মারের শব্দ যাচ্ছে কিন্তু গোনা
একটা একটা মারের শব্দ যাচ্ছে কিন্তু গোনা!
[মৃতটি কোনফাঁকে যে কাত হয়ে শুয়েছে, কেউ টের পাবে না। যেন এক উলঙ্গ পাগল নিজের বাহুতে মাথা রেখে (পেছন ফিরে) দিবানিদ্রায় আছে]
লালমানুষ: (লাশকে প্রদক্ষিণরত)
টাকার শব্দ, চাকার শব্দ, থাকার শব্দ—বাজো;
বাজো মিনমিনে বাজখায়ী আর ধমক ধমক বাজো
রাজার শব্দ বাজার শব্দ, নুলে ভিখিরির থালা
তর্কে তর্কে খানকির পোলা, মাদারচোদ ও শালা
জুতার বাড়ি, ছুরির ঘ্যাচাং, এবং যত খুন
নরম প্রেমের রবীন্দ্রগান আর চুমুর মনসুন
সবাই বাজো!
কোরাস:
বাজো প্রেম, বাজো বিরহ, বাজো যে মনখারাপ
বাজো কুকুরেরা, শেয়ালেরা, ফণা তুলে বাজো সাপ
বাজো শত্রুরা, বন্ধুরা বাজো, চেনা ও অচেনা যত
বাজো দুঃখ, বাজো হতাশা; বাজো হে রক্ত-ক্ষত!
নারীচৌত্রিশ:
লাশের ভেতর, ঢোল-করতাল-তবলা বাজে
লাশের ভেতর একতারা আর লালন বাজে
লাশের ভেতর বীণার শব্দ, ঠুমরি এবং খেয়াল বাজে
লাশের ভেতর থুবড়ে পড়া দেয়াল বাজে।
(কোরাস)
বাজছে বাজুক, আমার কি
ছিঁড়লে বোতাম জামার কি
বাজছে বাজুক, বাজতে দে
লাশের মতো লাশকে এবার বাঁচতে দে…
বাজছে বাজুক, কান্না-হাসি
বাজছে বাজুক, মোহন বাঁশি
বাজছে বাজুক, বাজতে দে
লাশের মতো লাশকে তোরা বাঁচতে দে…
কামনাময়ী:
বাজছে, অভিশাপের শব্দ
উলঙ্গ, তার লিঙ্গভরা ঠাপের শব্দ
কাম বাজছে, নাম বাজছে
বাজছে ওঁম, সঙ্গম আর লিপ্সা-লালস
বাজছে একা পুরুষ পুরুষ স্বপ্নদোষ
(কোরাস)
বাজুক, বাজুক আরো, বাজবেই
মৃতের তো আর রঙ-প্রসাধন-সাজ নেই
মৃতের পায়ে আলতা, চোখে কাজল নেই
কণ্ঠে কথা, কাওয়ালী আর গজল নেই
লাশ, সে নিজের নাম ডাকে না
লাশ, কোনদিন কয়না কথা কথার পিঠে
লাশের ভাষা বুঝবে এমন লাশ কই
লাশ ঘুমাবে এমন তাজা ঘাস কই!
সকলে সমস্বরে:
এই লাশ, এই মড়া—আমার, অশ্লীল অসভ্য মুখ
এই লাশ, এই মড়া—লোমহীন সাদা বুক
এই লাশ, তার কাশির শব্দ হাসির শব্দ আর
এই লাশ, এই মড়া—যত ক্লান্তি, হাহাকার
আমার। সমস্ত আমার, আমি তাকে বাড়ি নিয়ে যাবো।
আমি তাকে বাড়ি নিয়ে যাবো।
আমি তাকে বাড়ি নিয়ে যাবো।
[উত্তেজি জনতা, নারী ও পুরুষ, কেউ লাশের হাত ধরে, কেউ পা ধরে টানছে। প্রত্যেকেই অধিকার চায় নিজের লাশের।
দীর্ঘশ্বাসের শব্দ হয়। বিকট সে শব্দ… লাশের বুকে জমা থাকা শতাব্দীর সমস্ত হাওয়া যেন একসাথে বের হয়ে আসে।
লাশটি উঠে দাঁড়ায়। হাঁটতে শুরু করে। আধো অন্ধকারে তার থলথলে পাছাটি দেখে ঠাওর করা যায় না, আদতে সে নারী নাকি পুরুষ]
একটানা এলার্মঘড়ির শব্দ শোনা যায়। মঞ্চটি হঠাৎই দিনের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে, কিন্তু মঞ্চটি ফাঁকা। কোত্থাও কেউ নেই।

















