কুশীলব
~
সভাপতি
ভোঁদড়
অন্ধ যুবক
নেতা ১, ২, ৩, ৪
—
লুট হয়ে যায় ভালোবাসা
রক্ত বলিদান,
রাজপথে আর দেয়াল জুড়ে
লেখা আমার গান,
রক্ত ঢালা বিদ্রোহ দিন
রক্তে আঁকা দেশ,
চেনা মুখের চেনা চোয়াল
চিবিয়ে করছে শেষ।
তবু আমি ভালোবেসে
গেয়ে যাচ্ছি গান,
আমারই তো জন্মভূমি
আমারই সম্মান।
[মেঝে ঝাড় দিতে দিতে একজন নেতা বিড়বিড় করতে থাকে। মঞ্চের এক পাশ দিয়ে ঝাড়ু দিতে দিতে তার আগমন]
সভাপতি: জনগণের কথা ভাবতে ভাবতে আমার কোমরটা বাঁকা হয়ে গেলো অথচ অফিস ঝাড় দেবার জন্য একটা লোক নেই। শালার কপাল আমার এমন, আমি না-কি সভাপতি এই পার্টির। অথচ দেখেন একটা কুকুরও নেই যে অফিসটায় শুয়ে থাকবে। ময়লা ঝাড়া তো দূরের কথা। অথচ লোকেরা বলে, জনগণ আমাদের পক্ষে আছে। তা কোথায় জনগণ? একটা পয়সা নেই যে একাটা লোক রাখবো। আমিই সভাপতি আমিই ঝাড়ুদার। বিদেশ থেকে নাকি পয়সার ট্রেন আসছে। কিছুদিন বিশ্বাস করেছিলাম, তারপর বুঝলাম— ইঞ্জিন ছাড়াও ট্রেন হয়। আর সে ট্রেন চলে না।
অথচ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখবেন, দলে দলে ছেলেমেয়েরা আসছে। দাঁত বের করে সমাজ রাষ্ট্র গার্বেজ ইত্যাদি মাখামাখি করে কামড়াকামড়ি করছে। অথচ ফ্লোর পরিস্কার করার সময় তাদের দেখা নেই! আশ্চর্য লাগে জানেন? আরে পলিটিক্সটাকে দোকানদারি বা ব্যবসা হিসেবে নিলেও তো একটু যত্ন করতে হয় দোকান ঘরের? নাহ! এরা খাব্লে খেয়ে বিদায় নেওয়াতে বিশ্বাসী! সিজেনাল কাঁঠাল বণিক। মানে গোটা বিশ তিরিশেক কাঁঠাল এনে রাস্তার পাশে নামিয়ে গরম গরম বিক্কির করে দিয়ে ভ্যানিশ! এটাও অবশ্য ব্যবসা। দোকান ভাড়া নেওয়ার ঝামেলা নেই। চাঁদা দেওয়ার গেঞ্জাম নেই। দায় দায়িত্বের বালাই নেই। টুক করে ভ্যান থেকে মাল নিয়ে নেমে টকাটক বিক্রি করে পয়সা গুনতে গুনতে বাড়ি চলে যাওয়া।
[একজন মাথায় একটা কাঁঠাল নিয়ে প্রবেশ করে। এদিক ওদিক তাকায়। যেন খুঁজে পাচ্ছে না কাউকে]
সভাপতি: কাকে চাই?
ভোঁদড়: জি আমার নাম ভোঁদড়।
সভাপতি: সে-তো দেখতেই পাচ্ছি।
ভোঁদড়: না মানে নামে ভোঁদড়।
সভাপতি: বুঝলাম। তা ভোঁদড় আপনি কাকে খুঁজছেন সেইটা একটু বলেন বাবাজী।
ভোঁদড়: আমি কাঁঠাল পার্টির অফিস খুঁজতিছি।
সভাপতি: ওহ! সে-তো এইটাই। এই ঘরই কাঁঠাল পার্টির অফিস! আমিই সভাপতি।
ভোঁদড়: তা কিরাম কইরে হয়?
সভাপতি: কেন হবে না?
ভোঁদড়: আপনার হাতে ঝাঁটা আর আপনি কচ্ছেন আপনি সভাপতি?
সভাপতি: ওহ! তাইতো। মনে ছিলো না। যাইহোক এটা আমাদের প্রতীক হিসেবে আমরা ভাবছি। মানে সমাজ-রাষ্ট্রকে ঝেঁটিয়ে পরিস্কার করার মধ্য দিয়ে সংস্কার আনতে হবে। নইলে আবর্জনার ভাগাড়ে উন্নতি কিছু হবে না। তাই ঝাঁটা। মানে ঝাড়ু হাতে ঘুরঘুর করি আমি। ময়লা দেখলেই ঝেঁটিয়ে দিই। তা তোমার মাথায় কাঁঠাল ক্যানো বাবা?
ভোঁদড়: আজকে না কাঁঠাল উৎসব!
সভাপতি: কাঁঠাল উৎসব?
ভোঁদড়: জি! কাঁঠাল পার্টি হবে আজ পার্টি অফিসে। আমারে তো তাই কয়ে দেলো। কলো যে, ভোঁদড় তোর বাগানের সবচেয়ে বড় কাঁঠালডা নিয়ে চইলে আয় পার্টি অফিসে।
সভাপতি: কি আশ্চর্য আমি সভাপতি আমিই জানি না। অথচ কাঁঠাল-ভোঁদড় দুটোই হাজির? তা কে ফোন দিয়েছিল তোমাকে?
ভোঁদড়: ক্যান সভাপতি!
সভাপতি: জ্ঞানত আমি কাউকে কাঁঠাল নিয়ে অফিসে আসতে বলিনি! তবে ঘুমের মধ্যে বল্লেও বলতে পারি।
ভোঁদড়: ঐ একই কথা। তাছাড়া আপনাগের মধ্যি যে পরিমাণ ঠেলাঠেলি তাতে কেডা যে অরিজিনাল সভাপতি আর কিডা যে ডুপ্লিকেট সেডা ধারে না আস্লি বোঝার উপায় নেই! আপনার হাতে এক ঝাঁটা। এট্টুপর দেখবানি আরেকজন দুইহাতে দুই ঝাঁটা নিয়ে আইসে কবেনে আমিই আদী এবং আসল সভাপতি!
আপনাগের মধ্যি যে পরিমাণ ঠেলাঠেলি তাতে কেডা যে অরিজিনাল সভাপতি আর কিডা যে ডুপ্লিকেট সেডা ধারে না আস্লি বোঝার উপায় নেই!
[শ্লোগান ভেসে আসে]
হাতের কাছে যা পাও,
চেটেপুটে তাই খাও।
রক্তের দান বেঁচে,
খাচ্ছি সবাই নেচে!
সভাপতি: কারা আসছে? শুনতে পারছ ভোঁদড়? এসব কেমন শ্লোগান?
ভোঁদড়: এইটেই তো এখনকার ইস্টাইল। নেগেটিভে নেগেটিভে পজেটিভ!
[দল ধরে ঢোকে নেতারা। ভোঁদড় এগিয়ে যায়]
ভোঁদড়: আসেন আসেন। আপনাদের আপ্যায়নের জন্য আমি নিজের গাছের রসখাজা কাঁঠাল নিয়ে হাজির!
নেতা ১: বাহ! তাহলে কাঁঠালের উপর একটু আলোচনা করা দরকার আগে?
নেতা ২: কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল!
নেতা ৩: রচনা না বক্তৃতা?
সভাপতি: এই যে আমি এখানকার কমিটির সভাপতি!
নেতা ৩: ওহ! তাই নাকি? তাহলে তো আপনার কোলে উঠে বসতে হবে।
সভাপতি: সে কেমন কথা?
নেতা ২: তাছাড়া কি বলেন তো? আমরা এসেছি জনগণের মধ্যে নিজেদের বিলীন করে দিতে। কিন্তু সভায় কোন জনগণ নেই, আছে আস্ত একটা কাঁঠাল!
সভাপতি: কিন্তু আমি তো কোন খবর পাইনি।
নেতা ৪: বুঝতে পেরেছি। এখানে কজন সভাপতি?
সভাপতি: কেন, একজন। আমি।
নেতা ১: সেটা সম্ভবই না। আপনার বিরোধীপক্ষ আছে?
সভাপতি: না।
নেতা ২: আচ্ছা বাদ দাও তো। কাঁঠালটা আগে ভাঙ্গো।
ভোঁদড়: একটু তেল হবে? মানে যেকোনো তেল।
নেতা ৪: কেন?
ভোঁদড়: কাঁঠাল ভাঙতি লাগে।
নেতা ৪: আমার কাছে ভেসলিন আছে। তেল নেই!
ভোঁদড়: থাক! ওডা আর হাতে মাইখে কাজ নেই!
[এক নেতা এসে ঘুসি মারে কাঁঠালে]
নেতা ৩: ওরে বাবারে! আমার হাত ছিলে গেলো!
সভাপতি: আনাঙলা ছুয়ালপুয়াল। কাঁঠাল কেউ ঘুসি দিয়ে ভাঙ্গে? নিজেরে কি নায়ক জসিম লাগে?
ভোঁদড়: তেল আনেন লিডার। তেল ছাড়া কাঁঠাল ভাঙ্গা যায় না!
নেতা ২: গাধা না-কি? আছাড় দিলেই তো চুরমার হয়ে যাবে!.
ভোঁদড়: এরাম লিডার হলি দেশ চালাবেন কি কইরে? সব যদি আছাড় মারলিই ভাঙতো তালি তো কলা ছিলে কেউ খাতো না!
সভাপতি: দেখি দেখি। আমি দেখছি। আমার এলাকায় যেহেতু এসেছে সেহেতু আমার অতিথি হিসেবে আমিই ভেঙ্গে দিচ্ছি কাঠাল।
[কাঁঠাল ভাঙে]
নেতা ১: আহা! নান্দনিক! ভীষণ নান্দনিক! যেন হাজার হাজার মানুষের মতো জোট বেঁধে আছে কোয়াগুলো।
নেতা ৩: কি বললে গোয়া গুলো?
নেতা ২: আরে ধুরো। এতো রস খাজা মাল। মুখে দেও।
[মূহুর্তের মধ্যে চারদিক থেকে হাত বাড়িয়ে সবাই খেতে শুরু করে]
ভোঁদড়: বিচি গুলো কিন্তু লিডার আমার।
লিডার ৩: ক্যান নিজের বিচি কম পড়ে গেছে?
ভোঁদড়: ছি ছি কি কন এইসব। মুরগির সালুন দিয়ে হেব্বি লাগে কাঁঠালের বিচি।
লিডার ৪: আমার মামাবাড়ি ছিলো একটা কাঁঠাল গাছ। কোয়াগুলো লালচে রঙ্গের হতো।
লিডার ১: ও কাঁঠাল বিলুপ্তপ্রায় এখন আমাদের এদিকে।
লিডার ২: ঐ কাঁঠালের বিচিও কি লাল হতো?
সভাপতি: দুস কিসের মধ্যে কি? বিচি বিচি…!
ধরুন, একটা কাঁঠালের মধ্যে শত শত কোয়া যদি মিলেমিশে থাকে জনগণের মতো। সেই কোয়াগুলোকে নিংড়ে ছিবড়ে চিবিয়ে খায় কারা? আমি জানি আপনারা জানেন!
[সাদা ছড়ি হাতে কালো চশমা পড়া এক যুবক মঞ্চে ঢোকে। তাকে দেখে একজন নেতা বলে]
নেতা ৪: কে? তুমি কে?
অন্ধ: চেনেন নাই? অনেকবার তো রাজধানী ডাকলেন। সাক্ষাতকার নিলেন। আমাকে নিয়ে গৌরব করলেন! ভুলে গেছেন চেহারা? অবশ্য ভোলার কথা। সারাদেশকে মাথায় নিয়ে ঘুরছেন আপনারা হাতে গোনা কয়েকজন। আমাদের মত রাস্তায় আন্দোলন করে চোখ হারানো, হাত-পা হারানো কিংবা জীবন হারানোদের কি মনে রাখা সম্ভব?
নেতা: ওহ! আন্দোলনকর্মী?
অন্ধ: কিহ? কর্মী? আমার রক্তের উপর দাঁড়িয়ে আমার হারানো চোখের বিনিময়ে আজকে মন্ত্রী এম্পি নেতা হয়ে হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছ। আর আমি কর্মী? সহযোদ্ধা শব্দটাও মুখে আসে না তাই না?
নেতা ২: আপনি আসুন। কাঁঠাল খান আমাদের সঙ্গে। ভীষণ মজার।
অন্ধ: মজা তো নিতে আসি নাই! জানতে এসেছিলাম আপনারা এখন কোন পথে? আমাদের চোখের মূল্য এভাবে বিক্রি করছেন কেন?
নেতা ১: এই এইটারে বাইর কর তো! বাল্ডা আইসা কাঁঠালের রসের মইধ্যে বিষ দিতেছে!
সভাপতি: আহা আহা! এমন করলে হবেনা। আর যাই হোক, সে আমার এলাকার একজন চোখ হারানো যোদ্ধা। তাকে খেদিয়ে দেওয়া যাবে না।
নেতা ১: আরে বাবা, আপ্নেও তো দেখি কায়দার আছেন। এইজন্য সব কমিটিতে একাধিক সভাপতি সেক্রেটারি থাকার দরকার। গেঞ্জাম না থাকলে ঠিকঠাক চাটুকার থাকে না। নিজেদের মধ্যেই প্রতিপক্ষ রেডি না রাখলে খেলা জমে না।
অন্ধ: সে তো টের পাচ্ছি দিনে দিনে।
নেতা ১: তুমি চোখে কালো চশমা পরে দেখতে পাচ্ছ তাহলে?
অন্ধ: খবর্দার! নিজেদের মত গাদ্দার ভাব্বেন না অন্যদের। চোখে অন্ধ হলেও কানে কালা হইনি!
ভোঁদড়: আমি কচ্ছিলাম কি কাঁঠাল কলাম ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আগে খায়েদায়ে নেন। তারপর গায়ে জোর হলি আচ্ছা মতন গেঞ্জাম কইরেন। আমরা আমরাই তো দিন শেষে।
[আবার সবাই কাঁঠাল খেতে মনযোগী হয়! একটা চেয়ারে অন্ধ যুবককে বসায় সভাপতি। তাকে কাঁঠাল দেয় পিরিচে, সে নেয় না। হঠাৎ একজন কাঁঠাল খেতে গিয়ে বিচি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখতে থাকে মনোযোগ দিয়ে। দাঁত দিয়ে কামড় দিয়ে দেখতে থাকে গভীর মনোযোগ দিয়ে]
নেতা ৩: একি? একি?
ভোঁদড়: কি?
সভাপতি: কই দেখি?
নেতা ১: বিচি!?
নেতা ২: বিচিই তো!
নেতা ৪: কাঁঠালের বিচি!
নেতা ৩: উহু! দেখো।
[সবাই হাতে নিয়ে দেখে। সভাপতি দাঁত দিয়ে কামড়ে দেখে হা হয়ে যায়। ভোঁদড় মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে]
সভাপতি: এ-তো সোনা! সোনার বিচি!
নেতা ১: বলেন কি গোল্ড?
[সভাপতি মাথা নেড়ে জানায় হ্যাঁ। মুহূর্তের মধ্যে চার নেতা খাব্লাখাব্লি হাতাহাতি করে নিয়ে যায় কাঁঠালের সব কোয়া। একজন ভূতিটা নিয়ে দৌড় দেয়। তাঁর পেছন পেছন ভোঁদড় দৌড়ায়। অন্য তিন নেতা তিন দিকে ভেগে যায়। মঞ্চে বসে থাকে অন্ধ যুবক আর সভাপতি]
ভোঁদড়: আরে আমারে ভূতিটা দিয়ে যান। গাছটা তো আমার। এট্টু ভাগ দেবেন্না!
[সভাপতি টেবিল গোছাতে গোছাতে বিড়বিড় করে]
সভাপতি: যাহ্ শালা এই যদি সবার পেটের মধ্যে থাকে তাহলে সামনে আর পেছনে তো একই জিনিস হয়ে গেল। কার পেছনে যে দাঁড়িয়ে আছি বুঝতে পারি না।
অন্ধ: নিজের পায়ে দাঁড়ান। ঘৃণা করুন, অন্তত ঘেন্না করে যান। রাতের বেলায় দেখবেন ওই ভোঁদড়কে জবাই করে ওর কাঁঠাল গাছ সহ উপড়ে নিয়ে আসবে এরা জোট বেন্ধে। আর সকালবেলায় দেখবেন ওই ভোঁদড় হত্যার প্রতিবাদের জ্বালাময়ি ভাষণ দিচ্ছে ওরাই। আর আপনি বেকুবের মত খেলা শেষে মঞ্চ ঝাড় দিচ্ছেন!
[সভাপতি ঝাঁটা ফেলে দিয়ে পিলপিল পায়ে বেরিয়ে যায়। মঞ্চে একা বসে থাকে অন্ধ যুবক। দর্শকের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলো কমে আসে। প্রথমে মুচকি হাসে যুবক। তারপর গা দুলিয়ে হা হা হা হা হা… হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে বলে…]
অন্ধ: এক প্রশ্ন রেখে যাই? ধরুন, একটা কাঁঠালের মধ্যে শত শত কোয়া যদি মিলেমিশে থাকে জনগণের মতো। সেই কোয়াগুলোকে নিংড়ে ছিবড়ে চিবিয়ে খায় কারা? আমি জানি আপনারা জানেন! আমিও এখন জানি। তবে আমার হারানো চোখ দুটো জানতো না। কারণ, ওরা তো চালাক নয়। ওরা তো অন্যায়ের চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়েছিল!
২৩ জুলাই ২০২৫
(প্রথম মঞ্চায়ন: জেলা শিল্পকলা একাডেমি খুলনা, ৪ আগস্ট ২০২৫, নির্দেশনা: সুদীপ্ত দাশ, দল: রং মশাল)


















