আমার সেই সব উন্মূল সময়গুলোতে, যখন আরামবাগ, শাহবাগ, পিজির বটতলা, নীলক্ষেত করতাম—এক চক্করে সকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা, তারপর রাত নামত, তখন রথোর সঙ্গে পরিচয়। সে অনেক আগের কথা, হয়তো ২০০৪ সাল। মাত্র দেড়-দুই বছরের একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক আমাদের টিকে ছিল, তারপর উধাও। একই শহরে সকাল হতো, সন্ধ্যা নামত, হয়তো পাশাপাশি হেঁটেছি, অথচ দেখা হয়নি। এমনকি ছায়াও। কেন?
আমি তখন নটরডেম কলেজের পেছনে একটা মেসে থাকি। সেখানে থাকে কবি জামাল উদ্দিন বারী, কবি ও লিটলম্যাগ সম্পাদক তৌফিক জহুর। এই কবিদের সূত্রেই এখানে রথোর আসা-যাওয়া। হয়তো এভাবেই ও চিনেছিল আমাকে। কয়েক গলি পরেই আরও কয়েকজনের সঙ্গে রথো মেসে থাকত। সেখানে যেতাম। কবি মজনু শাহ-এর সঙ্গে দেখা হতো। আড্ডা হতো, কবিতার কথা হতো, কত বিচিত্র বিষয়ে কথা গড়িয়ে যেত। তখন আমাদের সময়ের কোনো হিসাব ছিল না। দিন কোথায় শেষ হয়, রাত কখন শুরু হয়, তা বুঝে ওঠারও প্রয়োজন বোধ করতাম না।
রথোর সঙ্গে যতই অন্তরঙ্গতা বাড়ছিল, ততই আমার দিনরাতের রুটিনটা বদলে যেতে লাগল। আমি যেতাম ওর মেসে, ও আসত আমার এখানে। গভীর রাতে কড়া নাড়ত, ‘ভাই, দরজাটা খোলেন।’ ওদের মেসের গেট রাত এগারোটায় বন্ধ হয়ে যেত। তাই আশ্রয়ের খোঁজে এখানে। গভীর রাতে কড়া নাড়া প্রায়শই হতো। অবস্থা এমন হলো, কড়া নাড়ার টোন শুনেই বুঝতে পারতাম, অতিথি এসে গেছে। দরজা খুলে দিতাম। তারপর কথা, কখনো গান, কখনো নিঃশব্দ বসে থাকা। এভাবে একই বিছানায় একদিন, দুইদিন, অনেক দিন। কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। ছিল না কোনো হিসাব-নিকাশ। একজনের জায়গায় আরেকজনের শুয়ে পড়া, রাতটাকে ভাগ করে নেওয়া—ব্যস, এতটুকুই।
ক্রমশ রথোর সঙ্গে আমার সকাল-সন্ধ্যা, রাত; তারপর গভীর রাত—সেই এক অদ্ভুতুড়ে সময়, রাতের ঢাকা, জিন-পরি, দেও-দানোর শহর। ছোটবেলায় শোনা যত কিচ্ছা-কাহিনি আর রূপকথার চরিত্র, মনে হতো তারা রাতের শহরে হাঁটাচলা করছে। আমি আর রথো এদের মধ্যে ঘুরে বেড়াতাম। কখনো জোছনা, কখনো ঘোর অন্ধকার—সবকিছুতেই মোহান্ধ আমরা। যা দেখি, লাগে ভালো। আমরা খুব বেশি কথা বলতাম না, দৃশ্যাবলি উপভোগ করতাম। রাস্তার বাতি, বন্ধ দোকানপাট, দূরে পড়ে থাকা কোনো ছায়া, নির্জন ফুটপাত—সবকিছুর মধ্যেই কেমন একটা অচেনা সৌন্দর্য ছিল।
এর মধ্যে কখন যে রথোর শরীর তরঙ্গে দোলায়িত হতো, প্রথমে গুনগুন, তারপর গলা ছেড়ে গান গাইত, নিজের লেখা গান। একসময় হাত দুটো উপরে তুলে, পা দুটোয় বাউল ছন্দ তুলে নাচতে থাকত। আমার মনে হতো, ও যে কোনো সময় উড়ে যাবে, কিংবা কোনো মহাশক্তি তাকে সাত আসমানের ওপারে নিয়ে যাবে। কারণ চারদিকের জগৎটা তখন অপার্থিব হয়ে উঠত। কালো অন্ধকারকে সাদা কফিনের কাপড়ের মতো ফকফকা দেখা যেত। আবার জোছনার আলো এত গাঢ় হতো যে বেলিফুলের মতো মুঠোয় ভরে তার সুবাস নিতাম। বাস্তব আর কল্পনার মাঝখানে তখন কোনো দেয়াল ছিল না। রাত আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছিল, তা জানতাম না। জানার প্রয়োজনও ছিল না।
রথোর ঠোঁটের কোণে একফালি রহস্যময় হাসি লেগে থাকত। পকেটে সব সময়ই খসড়া কবিতা থাকত। শোনাত। প্রচুর কবিতা পড়ত। ওর উছিলায় আমিও অনেক কবির কবিতা পড়েছিলাম। ভালো লাগত নির্মল হালদার, স্যাফু, ট্রান্সটোমারের কবিতা। রথোর দেখাদেখি আমি গান লেখার চেষ্টা করেছিলাম। ফালতু হয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল, গান লিখতে হলে গান গাইতেও জানতে হয়। আর হ্যাঁ, আমি একটি কোরীয় নভেলা অনুবাদ করেছিলাম, লেখক জঙ ছান। এটাই ছিল আমার সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ কোনো নভেলা অনুবাদ। এই অনুবাদের নেপথ্যেও ছিল রথোর দরদি উৎসাহ। রথো সর্বদা সবাইকে নিয়ে সুখী হতে চাইত। ওর মধ্যে কখনো হতাশা ভর করেনি। একটা হতাশা মনে হয় ছিল। ও বলত, ‘আল মাহমুদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সব আঞ্চলিক শব্দ হজম কইরা ফালাইছে, আমি একটাও খুঁজে পাইতেছি না।’ কথাটা বলার সময় ওর মুখে কেমন একটা অভিমান ফুটে উঠত। নিজের মাটি, নিজের ভাষার ভেতর থেকে নতুন কিছু তুলে আনার আকাঙ্ক্ষা ছিল ওর।
সময়টা নিরুপদ্রব ছিল না। বেরসিক পুলিশ এসে ধরল। আমি ভড়কে গেলাম। রথো সিনা টানটান করে বলল, ‘আমরা কবি, কবিরা রাতবিরাতে ঘোরাফেরা করে।’ পুলিশ ক্ষণিক থমকে দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল। রথোর সেই ভঙ্গি দেখে আমার হাসি পেয়েছিল। যেন কবি হওয়াটাই রাতের শহরে ঘোরাফেরার বৈধ পরিচয়পত্র
একবার আমি আর রথো কমলাপুর রেলস্টেশনে যাত্রাপালা দেখব বলে রাতে বের হলাম। ওখানকার পরিবেশটা ভালো লাগল না। আমরা রেললাইনের পাশে বসে ট্রেনের আসা-যাওয়া দেখছিলাম। কত দূর থেকে ট্রেন আসছে, ট্রেনের চাকায় লেগে আছে কত গাঁ-গেরামের মাটি, গায়ে লেগে আছে কত শহর-গঞ্জের বাতাস, আসছে কত মানুষ। আমরা মানুষ দেখে আর রকমফেরের মাটি-বাতাসের গন্ধ শুঁকে রাতটা প্রায় শেষ করে দিলাম। তবে সময়টা নিরুপদ্রব ছিল না। বেরসিক পুলিশ এসে ধরল। আমি ভড়কে গেলাম। রথো সিনা টানটান করে বলল, ‘আমরা কবি, কবিরা রাতবিরাতে ঘোরাফেরা করে।’ পুলিশ ক্ষণিক থমকে দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল। রথোর সেই ভঙ্গি দেখে আমার হাসি পেয়েছিল। যেন কবি হওয়াটাই রাতের শহরে ঘোরাফেরার বৈধ পরিচয়পত্র। ফিরতি পথে ফকিরাপুল মোড়ে এক বুড়ির কাছ থেকে শুঁটকি ভর্তা দিয়ে চিতই পিঠা খেয়ে ঘরে ফিরলাম।
সেই সময়টা, আমার রথো-সময়টায়, আমি ঢাকা শহরের দ্বিতীয় রূপটি দেখি। রাতের ঢাকা-রহস্য, প্রেমপ্রীতি, বিরহ, বেদনা আর একাকিত্বের শহর। রাতের শহর আনন্দ, আদিম শীৎকার আর বাজিগরের শহর। নির্মমতা আর নৃশংসতার শহর। আর এই সবকিছু মিলে যে সংমিশ্রণটা ঘটে, তা হলো রাতের ঢাকা মুগ্ধতার শহর। এই মুগ্ধতার টানেই আমরা রাতে ঘর ছাড়ি—পা দুটোকে ছেড়ে দিই, নিয়ে যা তুই মনপাখি, যেথা খুশি।
মতিঝিল, ফকিরাপুল, কমলাপুর, সেখান থেকে আরেকটু এগিয়ে কবি জসীম উদ্দীনের বাড়ি, যদি দেখা যেত! কখনো খিলগাঁও, মায়াকানন হয়ে ফুটওভার ব্রিজ পেরিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশন, ভিনগাঁয়ের মাটি-বাতাস-মানুষের গন্ধ শুঁকে মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় থিতু। এই এলাকাটি দিনে ঘুমায়, রাতে জেগে থাকে। হাউজির মেলা বসে। আমরা চা-পাউরুটি, কখনো তেহারি খাই। খেতে খেতে শুনি: নম্বর ১, ‘প্রথম কদম ফুল’; নম্বর ২, ‘জোড়া হাঁসের দুই’; নম্বর ৩, ‘তিন ভুবনের তিন’। রাতের এইসব শব্দ, মানুষের মুখ, আলো-আঁধারি—সব মিলিয়ে যেন এক অদ্ভুত নাট্যমঞ্চ। আমরা তার দর্শক, আবার কখনো নিজেরাই তার চরিত্র।
ততক্ষণে আলো ফিকে হয়ে আসে, চোখে ঘুম, শরীর শিথিল হয়ে আসে। কোনো রকমে শরীরটা টেনে নিয়ে চলি। চলতে চলতে কখনো মাইকে ভেসে আসে, ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাওম।’ রাত ফুরিয়ে সকাল হচ্ছে। আমাদের ঘরে ফিরতে হবে। অথচ মনে হতো, এই রাতেরও বুঝি একটা নিজস্ব জীবন আছে। আমরা চলে গেলে সে আবার অন্য কাউকে নিয়ে বেরিয়ে পড়বে।
সেই সময়, রাতের ঢাকায় ঘুরতে ঘুরতে অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিতে একটা গল্প লিখি—‘জিন পরী দেও-দানো’। হয়তো আরও অনেক কিছু হতো, কিংবা হতো না। কিন্তু রথোর সঙ্গে দেড়-দুই বছরের রমরমা সম্পর্কটা কেন হঠাৎ নাই হয়ে গেল, বুঝলাম না।
তারপর কত দিন, কত বছর কেটে গেল। একই শহরে থেকেও মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হয় না। কখনো কখনো মনে হয়েছে, বুঝি কোথাও দেখা হয়ে যাবে। কোনো ফুটপাতে, কোনো চায়ের দোকানে, কিংবা রাতের কোনো নির্জন মোড়ে। রথো হয়তো আগের মতোই বলবে, ‘ভাই, দরজাটা খোলেন।’ কিন্তু সেই কড়া নাড়া আর শোনা হয়নি।
গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে জানতে পারি, রথো নেই। ২২ অক্টোবর, ২০২৬।
ভাবছি, সাদা কফিনের মতো কালো অন্ধকারের এক রাতে আমি আবার আরামবাগ, মতিঝিল, ফকিরাপুল, কমলাপুর, মায়াকানন ঘুরে বেড়াব। হয়তো কোথাও জোছনা থাকবে, কোথাও থাকবে ঘন অন্ধকার। দূরে কোনো ট্রেন ছুটে যাবে, তার চাকায় লেগে থাকবে কত গাঁ-গেরামের মাটি, গায়ে লেগে থাকবে কত শহর-গঞ্জের বাতাস।
তুমি আইসো রথো।
রাতভর আমরা আবার হাঁটব…




































