তখন আমি রায়েরবাজার মুক্তি সিনেমা হলের ঠিক পেছনের মেস বাসা থেকে রায়েরবাজারেরই আখড়া মন্দিরের গলিতে আর এক মেস বাসায় শিফট হচ্ছি। মেসমেট বলতে দুই ছোটভাই শামীম ও শাকিল। বাসা বদলের দিন দেখা গেল ঝক্কি। আমার আসবাবপত্র বলতে বইয়ের পাহাড়। কাছাকাছি এলাকায় বাসাবদল করছি কিন্তু এত এত বই তো আর হাতে হাতে নেওয়া সম্ভব না। শামীম ও শাকিল আমার দুরবস্থা দেখে বেশ কিছু চালের বস্তায় বেঁধে ভ্যানে করে নিয়ে লোক দিয়ে ওঠানোর ব্যবস্থা করল লিফটবিহীন ৫ তলার নতুন মেস বাসায়।
বাসাবদলের ক্লান্তিতে বইয়ের বস্তাগুলো বেশ কিছুদিন সেভাবেই ফেলে রাখলাম। ভেবেছিলাম, হাতে টাকা এলে ভালো কিছু সেলফ কিনে বইগুলো এবার ঠিকঠাক সংরক্ষণ করব।
কিন্তু বাস্তবে হলো ঠিক উল্টোটা। বাসার ট্যাপে প্রায়ই পানি থাকত না। একদিন আমাদের ঠিক করা নতুন বুয়া সকালে পানির ট্যাপ ছেড়েছিল, তখন তাতে পানি আসেনি কিন্তু বাসা থেকে কাজ করে যাওয়ার সময় সে ট্যাপটা ঘুরিয়ে বন্ধ করে যেতে বেমালুম ভুলে গেছিল। আর যা হওয়ার তা-ই হলো। আমি, শাকিল, শামীম বাসা থেকে চলে তো গেছি কিন্তু জোর প্রতাপে এসে পড়েছেন পানি মহাশয়। খোলা ট্যাপ থেকে যেন আমার আশু অশ্রুধারার মতোই অঝোরে পানি পড়ে মেঝেতে থাকা সব জিনিস ভিজিয়ে দিয়ে গেল। দুপুর নাগাদ শামীম-শাকিল ভার্সিটি থেকে এসে হতভম্ব হয়ে ট্যাপ বন্ধ তো করল, পানি তো নিষ্কাষণ করল, মেঝেতে থাকি বিছানা-বালিশ ও অন্যান্য শুকানোর উপযোগী জিনিসপাতি রোদে দিয়ে ধীরে ধীরে ঠিক তো করল কিন্তু ভিজে একাকার হয়ে গেল আমার বস্তাভর্তি বইয়ের অনেকাংশ।
সন্ধ্যা নাগাদ শামীম-শাকিলের ফোন যখন এলো আমি তখন বেলাল ভাই মানে কবি বেলাল চৌধুরীর পুরানা পল্টনের বইভারাতুর বাসায় আড্ডা দিচ্ছিলাম শক্তি-সুনীল-সন্দীপন-উৎপল-বিনয়-শামশের আনোয়ার আর তুষার রায়সহ তাঁর ফেলে আসা কলকাতাজীবনের দিনগুলি-রাতগুলি নিয়ে। বেলাল ভাই বলছিলেন, সেই ষাটের দশকে কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটের ছাপড়ামতো বাসায় এলোমলো ছড়ানো বইয়ের কথা, ইন্দ্রনাথ মজুমদারের মতো বইগ্রস্থ মানুষের কথা কিংবা তাঁর সংগ্রহ থেকে হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান বইপত্রের কথা।

তো সেসময় আমার মেসমেট শামীম-শাকিলের কেউ একজন আমাকে ফোন করে কাতরস্বরে বলল, ‘ভাইয়া, সর্বনাশ হয়ে গেছে। বুয়ার ভুল করে ছাড়া ট্যাপের পানিতে আপনার অনেক বই ভিজে গেছে। আমরা কিছু কিছু ছাদে রোদে দিয়ে শুকানোর চেষ্টা করছি। আপনি দ্রুত বাসায় এলে ভালো হয়।’
বাকরুদ্ধ আমার ফোনটা হাত থেকে পড়ে যেতে দেখে বেলাল ভাই স্নেহার্দ্র স্বরে শুধালেন, ‘কী হয়েছে পিয়াস?’ আমি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললাম বাসার ঘটনা। আমাকে অবাক করে দিয়ে নির্বিকার বেলাল ভাই বললেন, ‘মানুষই থাকে না, আর বই!’
আশ্চর্যের বিষয়, আমার সংগ্রহের প্রিয় বইদের সলিল দশাপ্রাপ্তিতে শোকাকুল আমি মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিলাম। দেখি বেলাল ভাই তখনও তার সংগ্রহের কোনও পুরনো বইয়ের ছেঁড়া পাতা ঠিক করার চেষ্টা করছেন আঠা দিয়ে। ভেতরে ভেতরে ছেঁড়াখোঁড়া আমি পুরানা পল্টন থেকে বেরিয়ে রায়েরবাজার আখড়া মন্দিরের গলিতে আমার মেস বাসায় ঢুকলাম। দেখি শাকিল-শামীম বইয়ের বস্তাগুলো খুলে ফ্যানের নিচে শুকানোর চেষ্টা করছে। হায় হায় করে উঠল বুক! সেলিম আল দীনের উপহার দেওয়া নিমজ্জন, বহু কষ্টের টাকায় কেনা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ডায়েরি, ক্যাম্পাসে এক জন্মদিনে লিপি আপুর উপহার দেওয়া হুমায়ূন আহমেদের এই শুভ্র, এই-সহ কিছু বই ভিজে এমন হয়েছে যে উদ্ধারের উপায় নেই একটা পাতাও। আর অনেক বই-ই অর্ধভেজা, শুকোতে দিলেও ভেতরে পোকায় ধরার সম্ভাবনা শতভাগ। আর বস্তাগুলোর উপরিভাগের বইগুলো অক্ষত আছে কেবল।
ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। শামীম ও শাকিল আমাকে সান্ত্বনা দিতে এলে আমি উল্টো ওদের বেলাল ভাইয়ের বচন ধার করে সান্ত্বনা দিলাম, ‘মানুষই থাকে না, আর বই!’
৩০ অক্টোবর ‘২৬





































