২৫ অক্টোবর ২০২৬
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
রিটন খান
লেখক, প্রকৌশলী
50

রিটন খান
লেখক, প্রকৌশলী

50

অ্যালেন গিন্সবার্গ

একটা চিৎকার, সত্তর বছর পরেও যার প্রতিধ্বনি থামেনি

• যে কবি পৃথিবী বদলাতে চেয়েছিলেন, আর পৃথিবী যাঁকে শেষ পর্যন্ত পপ সংস্কৃতির সম্পত্তি বানিয়ে ফেলল

১৯৮৯ সাল। নিউইয়র্ক। কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের বয়স বাষট্টি। আরেক কবি অগাস্ট ক্লাইনজাহলার তাঁর সঙ্গে দুপুরে খেতে গেছেন। গিন্সবার্গকে দেখে তিনি খানিক অবাক। যে লোকটাকে এতদিন আমেরিকার যাবতীয় ভদ্রতাবিরোধী আন্দোলনের পুরোহিত বলে জেনেছেন, সে দেখছি দিব্যি শান্ত, সহৃদয়, চিন্তাশীল। কথাবার্তায় যথেষ্ট সংযমও আছে।

খাওয়াদাওয়ার পর গিন্সবার্গ তাঁকে নিয়ে গেলেন ইস্ট ভিলেজের অ্যাপার্টমেন্টে। সেখানে পৌঁছে অবশ্য বোঝা গেল, বিপ্লবের পুরোহিত হওয়ার কিছু সাংসারিক অসুবিধে আছে। টেলিফোন অনবরত বাজছে। কেউ টাকা চাইছে, কেউ কবিতা পড়তে ডাকছে, কেউ জীবনীতে ভুল তথ্য ছাপিয়েছে। একজন আবার এলএসডি খেয়ে আবিষ্কার করেছে গিন্সবার্গই তার চিরন্তন আত্মার সঙ্গী। এখন সেই আত্মার সঙ্গে স্থায়ী বন্দোবস্ত করতে চায়। গিন্সবার্গ প্রত্যেককে বোঝাচ্ছেন, কখনও রাজি হচ্ছেন, কখনও প্রত্যাখ্যান করছেন।

এর মধ্যে হাজির কবি গ্রেগরি করসো। হেরোইন কেনার টাকা চাই। গিন্সবার্গ দিলেন। করসো ধন্যবাদটুকু দেওয়ার প্রয়োজন বোধ না করে চলে গেলেন। পাশের ঘরে গিন্সবার্গের দীর্ঘদিনের সঙ্গী পিটার অরলভস্কি, গুরুতর মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন, চিৎকার করছেন, ধাক্কাধাক্কি করছেন।

কয়েক ঘণ্টা পর ক্লাইনজাহলার বিদায় নিতে উঠলেন। বাইরে শীতের বিকেল অন্ধকার হয়ে এসেছে। ইস্ট রিভারের হাওয়া রাস্তায় ঝাপটা মারছে। গিন্সবার্গ বললেন, ‘এখনই যেতে হবে? আর একটু থাকতে পারো না?’এই সামান্য অনুরোধে হঠাৎ অন্য একজন মানুষকে দেখা গেল। এতক্ষণ যে লোকটা নির্বিকার দক্ষতায় আমেরিকার বিকল্প সংস্কৃতির টেলিফোন এক্সচেঞ্জ সামলাচ্ছিলেন, তাঁর আড়ালে এক বৃদ্ধ, নিঃসঙ্গ মানুষ।

এককালে স্বপ্ন দেখেছিলেন নতুন সমাজের। যেখানে ম্যাকার্থিবাদের রাজনৈতিক সন্দেহ, যৌনতার ওপর নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক যুদ্ধের আতঙ্ক থাকবে না। কবি, ভবঘুরে, প্রেমিক, পাগল, সবাই নিজের মতো বাঁচবে। এখন রোনাল্ড রেগানের আমেরিকায় দাঁড়িয়ে সেই স্বপ্নের মানুষটি যেন নিজের যুগেরই পুরোনো আসবাব।

টেলিফোনটা যখন আর বাজে না, তখন গিন্সবার্গ কী ভাবতেন? প্রশ্নটা থেকে যায়।

এবার আরেকটা দৃশ্য। ৪ জুলাই, ২০২৫। আমেরিকার ২৪৯তম জন্মদিন। লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে নব্বই হাজার দর্শকের সামনে গান গাইছেন লানা ডেল রে।

মঞ্চে আমেরিকার এক আশ্চর্য স্বপ্নরাজ্য। অ্যান্ড্রু ওয়াইয়েথের ছবির মতো গ্রামীণ বাড়ি, দ্য উইজার্ড অব অজ-এর কানসাস, ডিজিটাল আগুন, গোলাপি-নীল স্বর্গ। সেখানে এলভিস প্রিসলি, জন ওয়েন, মেরিলিন মনরো, এমনকি মখমলের ছবিতে আঁকা যিশুও হাজির। হঠাৎ পর্দায় লানার বিরাট মুখ। শুরু হল কবিতার আবৃত্তি।

‘I saw the best minds of my generation destroyed by madness, starving hysterical naked…’
আমার প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ মনগুলোকে দেখেছি উন্মাদনায় ধ্বংস হয়ে যেতে, ক্ষুধার্ত, হিস্টিরিয়াগ্রস্ত, নগ্ন।

কবিতার নাম ‘হাউল’ (Howl)। লেখক অ্যালেন গিন্সবার্গ। সত্তর বছর আগে যে কবিতা আমেরিকার ভদ্রসমাজকে অশ্লীলতার আতঙ্কে আদালতে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, আজ সেই কবিতা পপ সংগীতের বিরাট অনুষ্ঠানে নব্বই হাজার মানুষের সামনে উচ্চারিত হচ্ছে। ইতিহাসের রসবোধ আছে। মাঝে মাঝে বেশ নিষ্ঠুর রসবোধ।

এক.
১৯৫৫ সালের ৭ অক্টোবর সান ফ্রান্সিসকোর সিক্স গ্যালারিতে প্রথম প্রকাশ্যে পড়া হয় হাউল। পরের বছর বই হিসেবে প্রকাশ। অর্থাৎ ২০২৬ সালে তার প্রকাশনার সত্তর বছর। কবিতাটা নিয়ে আজ কী ভাবব?

গিন্সবার্গের সমস্যা হচ্ছে, তিনি সাহিত্যিকের চেয়ে অনেক বড় সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর নাম শুনলে অনেকের আগে মনে পড়ে এলভিস, বব ডিলান, ইজি রাইডার, হিপি আন্দোলন। এলিজাবেথ বিশপ কিংবা জন বেরিম্যানের পাশে তাঁকে বসাতে সমালোচকদের অস্বস্তি হয়।

কারণও আছে। হাউল প্রচণ্ড উচ্চকণ্ঠ। তার বাক্য দীর্ঘ, ঘোষণা সরাসরি, আবেগ প্রায় লাগামছাড়া। ওয়ালেস স্টিভেন্সের কবিতার মতো দুরূহ অর্থস্তর খুঁড়তে হয় না। টি এস এলিয়টের মতো সূক্ষ্ম আবেগের ওঠানামাও নেই।

আর গিন্সবার্গের নিজের জীবন? সেখানেও বিস্তর গোলমাল।

তিনি বিশ্বাস করতেন গাঁজা, সাইকেডেলিক মাদক, যৌন স্বাধীনতা এবং চেতনার সম্প্রসারণ মানুষকে উন্নত সমাজের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ইতিহাস সেই আশাবাদকে বিশেষ সমর্থন করেনি।

আরও গুরুতর ব্যাপার তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি যৌন আকর্ষণ এবং নর্থ আমেরিকান ম্যান-বয় লাভ অ্যাসোসিয়েশনকে সমর্থন। এককালে যেসব আচরণকে বিখ্যাত কবির উদ্ভট ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হত, আজ সেগুলো যথার্থই নৈতিক বিচারের মুখে পড়েছে।

নারীবাদী লেখিকা অ্যান্ড্রিয়া ডোয়ার্কিনের সঙ্গে তাঁর এক তর্কের গল্প প্রচলিত। গিন্সবার্গ অভিযোগ করেছিলেন, দক্ষিণপন্থীরা তাঁকে কারাগারে পাঠাতে চায়। ডোয়ার্কিনের উত্তর, ‘ওরা দেখছি বেশ ভাবপ্রবণ। আমি হলে তোমাকে মেরেই ফেলতাম।’

বিট প্রজন্মের সাহিত্য আজ অনেকের কাছে বিরক্তিকর পুরুষতান্ত্রিক আত্মমুগ্ধতার নমুনা। একসময় যাঁরা সমাজের চোখে বিপজ্জনক বিদ্রোহী ছিলেন, তাঁদের অনেককে এখন অসহ্য প্রেমিকের গোত্রে ফেলা হচ্ছে। অথচ হাউল টিকে গেছে। কেন?

Celebrating the 70th anniversary of the publication of Howl
Celebrating the 70th anniversary of the publication of Howl

দুই.
প্রথম কারণ, কবিতাটির শব্দ। গিন্সবার্গ কবিতাটি লিখেছিলেন জোরে পড়ার জন্য। প্রথম পাঠের সময় দর্শকেরা সস্তা মদ খেয়ে উত্তেজিত হয়ে ‘গো! গো! গো!’ বলে চেঁচাচ্ছিল। কবি পড়ে চলেছেন, শ্রোতারা যেন তাঁকে আরও জোরে, আরও গভীরে ঠেলে দিচ্ছে।

কয়েকটা শব্দবন্ধ দেখুন।

‘Angelheaded hipsters.’
দেবদূতের মাথাওয়ালা বোহেমিয়ান।
‘Starry dynamo.’
নক্ষত্রখচিত ডায়নামো।
‘Hydrogen jukebox.’
হাইড্রোজেনের জুকবক্স।

শব্দগুলো পাশাপাশি থাকার কথা ছিল না। গিন্সবার্গ তাদের জোর করে পাশাপাশি বসিয়েছেন। আর ওই সংঘর্ষ থেকেই বিদ্যুৎ তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘ পঙ্‌ক্তিগুলোর নিজস্ব শ্বাসপ্রশ্বাস আছে। কোথায় গতি বাড়াতে হবে, কোথায় থামতে হবে, কোথায় নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসবে, কবিতা নিজেই তার ব্যবস্থা করে রেখেছে।
এক জায়গায় ব্রুকলিন ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দেওয়া মানুষের কথা বলতে বলতে শেষ হচ্ছে ‘not even one free beer’ দিয়ে। এত দীর্ঘ বাক্যের শেষে এই সামান্য আক্ষেপ, একটা বিনামূল্যের বিয়ারও জুটল না! মহাকাব্যিক বিপর্যয়ের শেষে পানশালার হিসেব। ব্যাপারটা একই সঙ্গে হাস্যকর এবং করুণ।

সমালোচক লুসি সান্তে বলেছিলেন, হাউল শেষ কবিতা, যা সংবাদের মতো পৃথিবীকে আঘাত করেছিল এবং পপ গানের মতো মানুষের মনে আটকে গিয়েছিল। কবিতাটির আরও একটা আকর্ষণ আছে। সে পাঠককে এক গোপন সমাজের সদস্য করে নেয়। সেখানে ভবঘুরে, উন্মাদ, সমকামী, মাদকাসক্ত, কবি, জ্যাজ সংগীতশিল্পী, সমাজের প্রত্যাখ্যাত মানুষগুলোই যেন বাস্তবের প্রকৃত দ্রষ্টা। বিশেষত তরুণ পাঠকের কাছে এই আমন্ত্রণ দুর্দান্ত।

যে সমাজ আপনাকে বলেছে আপনি অযোগ্য, সেই সমাজের বিরুদ্ধে একজন কবি ঘোষণা করছেন, সম্ভবত আপনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে জরুরি সত্য।

তিন.
এবার প্রশ্ন, এই কবিতা লিখলেন কী করে?

গিন্সবার্গকে নিয়ে একটা জনপ্রিয় ধারণা, তিনি মাদক খেয়ে দৈবপ্রেরণায় বাক্যগুলো উগরে দিয়েছিলেন।

তাঁর নিজের ১৯৭৭ সালের বক্তৃতাগুলো (পরে The Best Minds of My Generation নামে প্রকাশিত) অন্য ইতিহাস জানায়। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গিন্সবার্গ ছিলেন লায়োনেল ট্রিলিংয়ের ছাত্র। জন ডান, অ্যান্ড্রু মার্ভেল পড়েছেন। প্রথম জীবনে নিয়মমাফিক ছন্দে জটিল কবিতাও লিখেছেন।

তারপর জ্যাক কেরুয়াকের সঙ্গে বন্ধুত্ব, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের কবিতার সন্ধান, জ্যাজ ক্লাব, টাইমস স্কোয়ারের ভবঘুরে জীবন। ধীরে ধীরে বুঝলেন, প্রচলিত ছন্দে তাঁর অভিজ্ঞতাগুলো আটছে না।

সান ফ্রান্সিসকোতে বাজার-গবেষণার চাকরি হারানোর পর একদিন টাইপরাইটারের সামনে বসে ভাবলেন, সম্পূর্ণ বিপরীত দুটি শব্দ পাশাপাশি রাখলে কী ঘটে?
ইয়েটসের ‘murderous innocence’ কিংবা শেক্সপিয়ারের আপাতবিরোধী শব্দবন্ধ তাঁর মাথায় ছিল। গিন্সবার্গের ধারণা, বিপরীত দুটি মেরুর মধ্যে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো মনের মধ্যে নতুন অর্থ তৈরি হয়। বিরোধ যত তীব্র, সেই চমকও তত প্রবল।

এই পদ্ধতিতেই জন্ম নিল হাউল-এর অদ্ভুত সব চিত্রকল্প। অর্থাৎ আপাতস্বতঃস্ফূর্ততার পিছনে ছিল দীর্ঘ সাহিত্যশিক্ষা।

বিট প্রজন্মের অন্যদের ক্ষেত্রেও তাই। কেরুয়াক মার্সেল প্রুস্তের গভীর অনুরাগী। নিজের আত্মজৈবনিক উপন্যাসগুলোকে তিনি আধুনিক In Search of Lost Time-এর মতো ভাবতেন। গ্যারি স্নাইডার নবম শতকের চীনা ভবঘুরে কবিদের মধ্যে নিজের জীবনদর্শনের সন্ধান পেয়েছিলেন। সমালোচক নরম্যান পোডোরেৎস তাঁদের অশিক্ষিত বোহেমিয়ান বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু অশিক্ষা আর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এক ব্যাপার নয়। গিন্সবার্গদের বিদ্রোহের পিছনে বিপুল পড়াশোনা ছিল। স্বতঃস্ফূর্ত হওয়ার জন্যও মাথার মধ্যে কিছু জমা থাকা চাই। শূন্য হাঁড়ি যতই নাড়ুন, বিরিয়ানি বেরোবে না।

হাউল পড়লে মনে হয়, পৃথিবীর যে মানুষগুলো নিজেদের বেমানান ভাবছে, তারা একা নয়। কোথাও আরও কয়েকজন আছে, যাদের একই রকম অস্বস্তি, একই রকম ক্ষোভ, একই রকম স্বপ্ন। কবিতাটা সেই অদৃশ্য মানুষদের পরস্পরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়

চার.
১৯৫৬ সালে হাউল প্রকাশের পর অশ্লীলতার অভিযোগে বই আটকানো হল। মামলা চলল। ১৯৫৭ সালে আদালত বইটির পক্ষে রায় দিল। সেন্সরশিপের একটা মজার স্বভাব আছে। যে বইটাকে লুকিয়ে ফেলতে চায়, মাঝে মাঝে তাকেই দেশের সবচেয়ে আলোচিত বই বানিয়ে দেয়।

ওই সময় কেরুয়াকের On the Road প্রকাশিত হল। বিট প্রজন্ম রাতারাতি বিখ্যাত। মাথায় বেরে টুপি, হাতে বংগো, মুখে প্রতিষ্ঠাবিরোধী বুলি। আমেরিকার বাজার আবিষ্কার করল নতুন পণ্য, বিটনিক।

কেরুয়াক খ্যাতিতে অস্বস্তি বোধ করলেন। গিন্সবার্গ বরং বেশ উপভোগ করলেন। কবিতা পাঠ, টেলিভিশন, যুদ্ধবিরোধী মিছিল, বব ডিলানের সঙ্গে সফর, উইলিয়াম এফ বাকলির অনুষ্ঠানে মন্ত্রপাঠ। হিপি আন্দোলনের একরকম আধ্যাত্মিক কাকু হয়ে উঠলেন তিনি।

হাউল-এর পরে লিখেছিলেন Kaddish, মাকে নিয়ে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘ কবিতা। কিন্তু পরবর্তী রচনায় সেই আগের শক্তি ক্রমশ দুর্লভ। ২০১৫ সালের The Essential Ginsberg-এ চারশো পাতার মধ্যে ষাটের দশকের মাঝামাঝির পরের উল্লেখযোগ্য কবিতা খুব কম। গিন্সবার্গ অবশ্য নিজের আদর্শ বেচে বিলাসী জীবন কাটাননি। জীবনীকারদের বিবরণে তিনি উদার, কখনও দায়িত্বজ্ঞানহীন রকমের উদার। খ্যাতি বজায় রাখতে সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানের দরবারে তোষামোদ করার বদলে প্রকাশ্য প্রচার আর নিজের সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে কাজে লাগিয়েছেন।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়। খ্যাতির আহ্বানে এত সাড়া না দিলে আরও কত কবিতা লিখতে পারতেন? একজন মানুষ পৃথিবী বদলাতে গিয়ে নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে গেলেন। প্রতিষ্ঠানটা সারাক্ষণ ফোন করছে। কবিতার জন্য সময় কোথায়?

পাঁচ.
আরও অস্বস্তিকর প্রশ্ন আছে। গিন্সবার্গের বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পৌঁছল?

হাউল যে আমেরিকার বিরুদ্ধে চিৎকার করেছিল, সেখানে ছিল যন্ত্রের মতো জীবন, একই ধরনের পোশাক, একই ধরনের চিন্তা, সামরিক-শিল্প ক্ষমতা, ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ। এই দানবকে গিন্সবার্গ বলেছিলেন ‘মোলক’।

ষাটের দশকের হিপিরা ব্যক্তিস্বাধীনতার ঘোষণা করলেন। প্রত্যেকে নিজের মতো বাঁচবে, নিজের চেতনা তৈরি করবে। সেখান থেকে পরবর্তী কয়েক দশকে জন্ম নিল ক্যালিফোর্নিয়ার প্রযুক্তি-আদর্শ। স্টিভ জবস, স্টুয়ার্ট ব্র্যান্ডদের প্রজন্ম প্রতিসংস্কৃতির প্রভাব নিয়ে প্রযুক্তির নতুন পৃথিবী গড়তে চাইল।

প্রতিশ্রুতি একই। মানুষ আরও স্বাধীন হবে। নিজের জায়গা পাবে। পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো ভেঙে যাবে।

তারপর ইন্টারনেট, সমাজমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রতিটি পর্যায়ে আরও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি। অথচ মানুষের মনোযোগ, পছন্দ, সম্পর্ক ক্রমশ নতুন প্রযুক্তি-প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও বেড়েছে। ভবিষ্যতের সবচেয়ে ভয়াবহ সম্ভাবনা, যন্ত্র আমাদের জন্য অনন্ত বিনোদন তৈরি করবে, শিল্পও তৈরি করবে। প্রত্যেকে নিজের পছন্দের জগতে বসে থাকবে। আর মানুষের যৌথ সংস্কৃতি, একই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার ক্ষমতা ক্রমে ক্ষয় হবে।

তাহলে গিন্সবার্গ যে মোলকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, সেই বিদ্রোহ থেকেই আরও ক্ষমতাবান মোলকের জন্ম?

এই যুক্তির একটা আকর্ষণ আছে। তবে ইতিহাসকে এত সোজা বংশলতিকায় বাঁধা বিপজ্জনক। প্রযুক্তি-পুঁজিবাদের সমস্ত অপরাধের দায় সত্তর বছর আগের কয়েকজন কবির ঘাড়ে চাপানো যায় না। অর্থনীতি, রাষ্ট্রক্ষমতা, সামরিক গবেষণা, কর্পোরেট স্বার্থ, সবকিছুর নিজস্ব ভূমিকা আছে।

তবু একটা পরিহাস অস্বীকার করা কঠিন। যে ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বপ্নে গিন্সবার্গ আনন্দিত হয়েছিলেন, বাজার সেই স্বাধীনতাকেও বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত করতে শিখেছে। বিপ্লব এখন প্যাকেটবন্দি হয়। প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে, স্বাধীনতা।

ছয়.
তাহলে হাউল আজও পড়ব কেন? কারণ কবিতার মধ্যে এমন কিছু আছে, যা তার লেখকের ভুল, আন্দোলনের ব্যর্থতা, এমনকি পরবর্তী ইতিহাসের পরিহাসও নিঃশেষ করতে পারেনি। সেটা মানুষের প্রতি এক অসম্ভব আস্থা।

গিন্সবার্গ বিশ্বাস করতেন মানুষের কল্পনাশক্তি বাস্তবকে বদলাতে পারে। তাঁর কাছে প্রেম, বন্ধুত্ব, সংগীত, কথোপকথন, উন্মাদনা, সবই মানুষের সম্ভাবনার অংশ। হাউল পড়লে মনে হয়, পৃথিবীর যে মানুষগুলো নিজেদের বেমানান ভাবছে, তারা একা নয়। কোথাও আরও কয়েকজন আছে, যাদের একই রকম অস্বস্তি, একই রকম ক্ষোভ, একই রকম স্বপ্ন। কবিতাটা সেই অদৃশ্য মানুষদের পরস্পরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

এখানেই হুইটম্যানের সঙ্গে গিন্সবার্গের আত্মীয়তা। এমারসনের সঙ্গেও। আর বব ডিলানের ‘Like a Rolling Stone’-এর সঙ্গেও। সমাজ আপনাকে যতবার বোঝাবে সমস্ত দরজা বন্ধ, এই শিল্পীরা ততবার নতুন দরজা কল্পনা করতে বলবেন। গিন্সবার্গের কবিতায় ক্লান্তি আছে, যন্ত্রণা আছে, ধ্বংস আছে। কিন্তু আত্মসমর্পণের ইচ্ছে আশ্চর্য রকম কম।

হাউল-এর শেষদিকে মানুষ যেন নিজের আত্মার বিমানগর্জনে ঘুম থেকে জেগে উঠছে। হাসপাতালের দেয়াল ভেঙে যাচ্ছে। সবাই বাইরে ছুটছে। মুক্তির এক উন্মত্ত আহ্বান। অবশ্য বাস্তবে হাসপাতালের দেয়াল অক্ষতই থাকে। মোলকও বহাল তবিয়তে। বিপ্লবীদের বয়স বাড়ে। বন্ধুরা টাকা ধার নিয়ে পালায়। প্রেমিক পাশের ঘরে চিৎকার করে। টেলিফোন বাজতেই থাকে।

তারপর এক শীতের সন্ধ্যায় বৃদ্ধ কবি অতিথিকে বলেন, ‘আর একটু থাকতে পারো না?’

আমার মনে হয়, এই প্রশ্নটার মধ্যেই হাউল-এর সবচেয়ে গভীর অর্থ লুকিয়ে আছে। একজন মানুষ পৃথিবী বদলাতে চেয়েছিলেন। তাঁর সমস্ত চিৎকার, বিদ্রোহ, কবিতা, প্রেমের শেষে দেখা গেল, মানুষের কাছে তাঁর একটা সামান্য আবেদন আছে।

আমার পাশে আর একটু থাকো।

পৃথিবীটা যতই ভুল হোক, আমরা যেন পরস্পরকে সম্পূর্ণ হারিয়ে না ফেলি। সত্তর বছর পরেও হাউল পড়ার একটা কারণ বোধহয় এইটুকুই।

সময়ের সন্তানেরা
সময়ের সন্তানেরা-২
After-Article Banner 2
After-Article Banner 2 mob

মন্তব্য লিখুন

ধন্যবাদ। নাম ও মতামত লিখুন। পর্যালোচনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মন্তব্যটি প্রকাশিত হবে।

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত