১৭ এপ্রিল ২০২৬
অ্যাড্রিফ্‌ট অন দ্য নাইল: বিশ্বাস–অবিশ্বাসের দোলাচল
বইপ্রচ্ছদ :
আল নোমান
স্বরলিপি
কবি ও কথাশিল্পী
26

স্বরলিপি
কবি ও কথাশিল্পী

26

অ্যাড্রিফ্‌ট অন দ্য নাইল

বিশ্বাস–অবিশ্বাসের দোলাচল

অবিশ্বাসীরা বিশ্বাস করেন, ‘মানুষ বিশ্বাসের ভেতর পালিয়ে বেড়ায়!’ এই যে জীবন, এখানে কিছুই নিশ্চয়তার সঙ্গে সম্পন্ন হয় না। যাই হোক, সমাজের মূল স্রোত থেকে ধীরে দূরে সরে যাওয়া—সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে আদতে অবিশ্বাসী এক ঝাঁক মানুষের গড়ে তোলা দোদুল্যমান সমাজের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত হয়েছে উপন্যাস অ্যাড্রিফ্‌ট অন দ্য নাইল। নোবেল বিজয়ী মিশরীয় কথাসাহিত্যিক নাগিব মাহফুজ এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের কাছে আপাত মূল্যহীন মানুষেরা কীভাবে ধীরে ধীরে সামাজিক মূল্যবোধ হারাতে শুরু করে।

অ্যাড্রিফ্‌ট অন দ্য নাইল-এর বর্ণনার ভেতর দিয়ে ঔপন্যাসিক দেখান যে এলোমেলো চিন্তাধারার মানুষগুলো খুব দ্রুত একত্রিত হতে পারে। নীল নদের ওপর ভাসমান হাউসবোটটিও এখানে একটি চরিত্র হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, নীল নদের ওপর ছড়িয়ে পড়া রাতের অন্ধকার কিংবা চাঁদের আলোও চরিত্র হয়ে উঠতে দেখা যায়।

সব সমাজের ভেতর আলাদা ছোট ছোট সমাজ থাকে; রাষ্ট্রের ভেতর থাকে রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ হারানো ছোট ছোট গোষ্ঠী। এই উপন্যাস সেই ছোট ছোট গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে।

উপন্যাসটি রচনাকালে মিশরের রাজনৈতিক অবস্থা এবং ঔপন্যাসিকের জীবন কেমন ছিল—এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য জুড়ে দিয়েছেন অনুবাদক ফজল হাসান। ফলে একজন পাঠক সহজেই উন্মোচন করতে পারেন উপন্যাসের চরিত্রগুলোর অস্থিরতার নানা কারণ।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আনিস জ্যাকি, যিনি সরকারি চাকরিতে থিতু হতে ব্যর্থতার পরিচয় দেন। ক্রমে হতাশাগ্রস্ত হয়ে তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। তারই নেতৃত্বে গড়ে উঠতে থাকে ‘হাউসবোট সোসাইটি’। এখানে আসা প্রতিটি মানুষ জীবনের প্রধান উপকরণ করে তোলে মাদক আর যৌনতাকে। হাউসবোটটি যিনি দেখাশোনা করেন, তার চলাফেরা এত জীবন্তভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে অবাক হতে হয়। যেমন—‘আবদুহ চাচা যখন হাউসবোটটি টেনে নেন, এটি অনুগতের মতো তাকে অনুসরণ করে।’

এই আবদুহ চাচা একজন বিশ্বস্ত মানুষ। তিনি নিজে একটি মাটির মসজিদ নির্মাণ করেন, সেখানে আজান দেন। আবার হাউসবোটেরও তিনি একজন বিশ্বস্ত সেবক। হাউসবোটে আসা প্রত্যেককে প্রয়োজনীয় সব কিছুর যোগান তিনি দেন—তা হোক মাদকদ্রব্য কিংবা নারী।

উপন্যাসের আলোচনা এগিয়েছে সংলাপের পর সংলাপের ভেতর দিয়ে, তারপর ধীর হয়েছে। এক একটি চরিত্রকে ঔপন্যাসিক নাটকের আলাদা আলাদা চরিত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এক পর্যায়ে মূল চরিত্র স্বপ্ন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার মতাদর্শ ও জীবনবোধ পাল্টে ফেলে। আনিস জ্যাকি স্বপ্নে দেখেন—অনুগত আবদুহ চাচাই তাকে হত্যা করার জন্য তাড়া করছে। পাঠক হিসেবে আহত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় আনিস জ্যাকির প্রশ্নে, ‘এই বুড়ো, তুমি কি আমাকে হত্যা করতে চাও? তুমি কি কাউকে হত্যা করে এই এলাকায় এসেছ?’

আবদুহ চাচা শুধু উত্তর দেন, ‘কী বলেন? আমি একজন সেবক।’ পাঠকও এবার আবদুহ চাচা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠে, কিন্তু তা উহ্যই থেকে যায়। ফলে পাঠক অস্বস্তিতে ভুগতে শুরু করতে পারেন—এই উপন্যাসে বিশ্বাস দিয়ে অবিশ্বাস আর অবিশ্বাস দিয়ে বিশ্বাসকে বারবার কাটা হয়েছে।

অ্যাড্রিফ্ট অন দ্য নাইল ও অনুবাদক: ফজল হাসান
নাগিব মাহফুজের অ্যাড্রিফ্‌ট অন দ্য নাইল
অনুবাদ: ফজল হাসান, প্রচ্ছদ: আল নোমান
প্রকাশক: ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ
প্রকাশকাল: ২০২৫, মূদ্রণ মূল্য: ৪০০ টাকা

সাংবাদিক সামারা যখন হাউসবোটে আসার অনুমতি চান—সে কে, তার অতীত কেমন, দেখতে কেমন—এই নিয়ে হাউসবোটে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়। যা অনেকটা উন্মোচিত ক্ষতের মতো মনে হতে পারে।

হাউসবোটের মানুষেরা নেশায় বুঁদ হয়ে যখন একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন, সংলাপগুলো হয়ে ওঠে দার্শনিক ঢঙের।

যেমন—‘আমরা যদি হৃদয়কে বিচার করি, তাহলে,’ বললেন খালিদ, ‘তিনি একজন মৌলবাদী।’
‘ইচ্ছে হলে তাকে প্রগতিশীল বলুন। তবে তিনি খাঁটি এবং আন্তরিকও।’

আবার উল্লেখ করা যায়—‘এই অন্ধকারের সততা কোথায়? পোকামাকড়ের কাছে আমাদের কণ্ঠস্বরের অর্থ কী? আপনাদের বয়স এখন চল্লিশের কোঠায়, রাগাব। আপনাকে শিগগিরই আলাদা চরিত্রে অভিনয় শুরু করতে হবে। আপনি কি জানেন না, কীভাবে বিখ্যাত ক্যাসানোভা ডিউকের গ্রন্থাগারে লুকিয়ে ছিলেন?’

আনিস বিশ্বাস করতে শুরু করেন, প্রতিটি হাউসবোটের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, রঙ, যৌবন অথবা বার্ধক্যের ছাপ রয়েছে; জানালায় ভেসে উঠছে আরোহণ করা লোকজনের মুখ। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—তীরে হলুদ রঙের খেজুরভর্তি গাছও আছে।

হাউসবোটে ধূমপায়ী বন্ধুদের আলোচনার বিষয়—কারা মন্ত্রী হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি কী, কেমন চলছে সবকিছু।

আনিস তবু খুঁজে বেড়াতে শুরু করেন—সংযমের যন্ত্রণা, রাতের রহস্যময় আলাপচারিতা আর সব ঘটনার জন্য দায়ী কে—তাকে।

আনিস ফিরে যান কর্মজীবনের ভুলের কাছে, ফিরে যান শৈশবের বন্ধুদের স্মৃতির কাছে।

যেকোনো সমাজেই কোনো এক সময়ে অন্য সমাজের মানুষ কৌতূহলবশত কিংবা গুপ্তচরবৃত্তির জন্য হাজির হয়। এখানেও তাই। এক নারী সাংবাদিকের দায়িত্ব পড়ে—প্রতি সন্ধ্যায় হাউসবোটে কারা আসে, সারা রাত সেখানে কী কী চলে—সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা। দায়িত্বপ্রাপ্ত নারী সাংবাদিক, যার মাধ্যমে প্রথমে হাউসবোটে আসার সুযোগ খোঁজা হচ্ছিল, তিনি অনেকটা ভোটাভুটির খণ্ডচিত্র উপস্থাপন করেন। কেউ মেয়েটির আসার পক্ষে মত দেন, কেউ মত দিয়ে আবার দ্বিমত পোষণ করেন, আর কেউ একেবারে ‘না’-তেই স্থির থাকেন। কিন্তু ভোটাভুটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগেই হাউসবোটে এসে হাজির হয়ে যায় মেয়েটি—যা একটি সমাজে গুপ্তচরবৃত্তির নিরীহ সূচনা দেখিয়ে শেষে ক্রমে হাউসবোটের গোপনীয়তা ভেঙে ফেলার কারণ হয়ে ওঠে।

এই উপন্যাসের আরেকটি বৈশিষ্ট্য—একটি ক্ষয়প্রাপ্ত সমাজ কিংবা মানুষকে অবশ্যম্ভাবী ঘটনা এসে গ্রাস করার আগেই আচমকা আরেকটি ঘটনা তা পণ্ড করে দেয়। অনিশ্চয়তাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।

শেষ দিকে উপন্যাসের চরিত্রগুলো—রাগাব, সামারা, লেইলা, মুস্তফা, আলি, আহমাদ, খালিদ, সানিয়া, আনিস—একটি গাড়িতে ফারাওদের সমাধিস্থল দেখার জন্য রওনা দেয়। যাত্রাপথে অন্ধকারে হেঁটে বেড়ানোর জন্য গাড়ি থামায় দলটি। অন্ধকারের ভেতর এগোতে থাকে তারা। তাদের উদ্দেশ্য—কে কত জঘন্য কাজ করেছে, তার স্বীকারোক্তি বের করা। আকস্মিকভাবে ভয়ংকর চিৎকার শোনা যায়, এবং বাতাসে একটি কালো আকৃতির বস্তু দেখতে পায় তারা। প্রতিষ্ঠিত নিয়মনীতি নিয়ে মশকরা করে গাড়িতে ফিরে যাওয়ার পর ওই বস্তু দেখে রাগাব যখন গাড়ি চালানো শুরু করেন, গাড়িটি প্রায় উল্টে যাচ্ছিল। আচমকা সবাই গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন। তারপর রাগাব বলেন, ‘আমরা পৃথিবীতে বাস করছি, নাটকে নয়।’

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত