২৬ মার্চ ২০২৬
‘কুত্রাপি’ দ্রাবিড় সৈকত প্রণীত স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ উত্তরাধুনিক বাংলা কবিতা
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
দ্রাবিড় সৈকত
কবি ও চিত্রশিল্পী
185

দ্রাবিড় সৈকত
কবি ও চিত্রশিল্পী

185

‘কুত্রাপি অবিনশ্বর’ থেকে কুত্রাপিগুচ্ছ

হাইফেন মুছে গেলে একাকার শাপলা-শালুক

কুত্রাপি কথা

নিবিড় আত্মমন্থনের স্থিতাবস্থায় অঙ্কুরোদগম হয় বহুবিধ ইমেজের, অর্থহীন-অর্থবোধকতার; যেখানে প্রত্নপদচিহ্নের ফসিল, দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া শব্দের আর্তচিৎকার, অর্থ খসে যাওয়া বাক্যের দগদগে ক্ষত, অব্যবহৃত-পরিত্যক্ত-অপ্রচলিত পন্থার বৈঠকে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে আসে ভূমিগত অস্তিত্বের অবিনশ্বর বিন্যাসে প্রোথিত কুত্রাপি।‎

‘কুত্রাপি’ স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ উত্তরাধুনিক বাংলা কবিতা। প্রাচীন এবং আধুনিক কবিতার সাথে এর সাদৃশ্য অতি সামান্য। কাজেই পুরাতন স্বাদে অভ্যস্ত পাঠক ‘কুত্রাপি’র প্রথম পাঠে হোঁচট খাবেন। এখানে ছন্দ-ব্যঞ্জনা-মাত্রা ব্যবহারের ধরন, ভাষা ও শব্দ শক্তির উন্মোচন প্রয়াস, লেখকের একচ্ছত্র আধিপত্যের অস্বীকার, অর্থকে নির্দিষ্ট খোপ থেকে বের করে দিগ্বিদিগ ছড়িয়ে দেয়া, পঙ্ক্তি বিন্যাসের স্বতন্ত্র পদ্ধতি, নামকরণের নির্যাতন প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্ত খোলা সমাপ্তির রীতি, একক বিষয় থেকে বের হয়ে বহুমাত্রিকতাকে আশ্রয় করা ইত্যাদি বিবিধ কারণে কেন্দ্রমুখিতার ধারণা প্রচণ্ড চাপে থাকে। কেন্দ্র তৈরি করার বিষয়ে লেখকের সচেতন প্রয়াসের পরেও অধিকাংশক্ষেত্রেই সেটি সম্ভব হয় না এর বৈশিষ্ট্যগত কারণে। আদি-অন্ত-মধ্য ও ভাবছন্দের ব্যবহার, অনুপ্রাস-যমক-উৎপ্রেক্ষা-রূপকের বিন্যাসে এটিকে পরিকল্পিত বিকেন্দ্রীকরণ না বলে বলা যায় বৈশিষ্ট্যগত বিকেন্দ্রীকরণ; ফলে ‘কুত্রাপি’ উত্তরাধুনিক হলেও সেটি বঙ্গীয় বৈশিষ্ট্যে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত।

তাৎক্ষণিক গ্র্যাটিফিকেশনের তুলতুলে বোধকে নাকচ করে ভাব-ভাবনার নান্দনিক প্রত্ন-সচেতনতার দীর্ঘ ভবিষ্যৎ ইতিহাস তৈরি করাই এর প্রধানতম কাজ। কুত্রাপি অবিনশ্বর স্থানিক প্রাইমর্ডিয়াল ইমেজের প্রত্নতাত্ত্বিক গভীরতা নিরূপণের মাধ্যমে সময়ের বহুস্তরীয় আকাঙ্খাকে আলোকিত করে কবিতার অবিনশ্বরতার অভিযাত্রী।

কুত্রাপির প্রথম গ্রন্থ ‘কদাচিৎ কুত্রাপি’তে ১ থেকে ২১১ নাম্বার পর্যন্ত; দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘বিকস্বর কুত্রাপি’তে ২১২ থেকে ৫০৪ পর্যন্ত এবং তৃতীয় গ্রন্থ ‘কুত্রাপি অবিনশ্বর’-এ ৫০৫ থেকে ১০০৯ পর্যন্ত কুত্রাপি গ্রন্থিত হয়েছে। তিন গ্রন্থে সর্বমোট এক হাজার নয়টি কুত্রাপি প্রকাশিত হয়েছে।

৮৯৩

বালিহাঁস উড়ে গেলে আকাশেরা ফাঁকা হয়ে যায়
দালি ঘাসহীন মাঠের মাঝে দৌড়ে গেলে পুরানো গাছের থেকে গলে পড়ে ঘড়ি
তড়িঘড়ি শূন্য প্রান্তরে নেই শঙ্খচিলের
অংক মিলের সাথে জীবনের যতটুকু দেখা হয় বালুচরে প্রতিটি কণায়
চালু স্বরে গ্রাফিতি ঘনায় তার
মাপিতি ফণায় যার বিষের বদল আর বদ নসিবেরে
কিসের বাদল তার দোচালা ঘরের গৃহসজ্জায় বাঁকা দৃষ্টির
মেহ-মজ্জায় রাখা কৃষ্টির কারাবাস
পাড়া নাশ করে পাতকুয়ার যত পাতলা পাতন অনুভূতিহীন বলে আঁকা রয়ে যায়।

৮৯৪

ঘৃণার আবাদ করে শান্তির পয়ার পংক্তি ও বিহঙ্গ লিখো কবি
সিনার যা বাদ করে ভ্রান্তির জোয়ারে ভাসো
আসো, তারে নিগূঢ় নজরে দেখি নিখাদ প্রেমের দামে
শ্যামের নামে রাই বন্দনা ফোটে
তাই যন্ত্রণা জোটে সব প্রগলভ লেখকের খাঁ খাঁ পণ্ডিতি জুড়ে খরার খানাখন্দ
নানা অন্ধ হলে নাতিরাও দৃষ্টি হারায়? জীনবিজ্ঞানের আছে মতামত?
দিন অজ্ঞানের কাছে কথা মতো দাঁড়িয়ে থাকার নামে নিত্যপ্রলয়ে বাঁধে ঘর
মীন সজ্ঞানে সস্তা জনপ্রিয়তার খোপে আটকালে আতরদানির আত্মকথনের লোভ
ভাত তো যতনের ক্ষোভ উগড়ে দেয়ার কথা ভাবে না
পাবে না মনের অতল, অন্তরে আরষ্ট হলে দুকূল উপচায়ে আসে বিদ্বেষ হিংসার কুঁচকানো ছবি।

৮৯৫

দেশ দিশা হারায়ে গেলে রোদের নিকটে বসো
শেষ ভিসা নাড়ায়ে দিলে বোধের পকেটে আসো
ক্রোধের লকেটে পাগলা ঘোড়ার মতো এইসব বোঝার চেষ্টাই বৃথা
পিতা সন্তানে বিরোধের কালে কার দিকে হেলে যায় পাল্লার ডাঁট?
চারদিকে তেলে ভাজা পুরি বার্গার পাস্তার স্তুপাকার স্টমাকের হেলদোল হেতুশাস্ত্র
দারগার রাস্তার রূপা কার?
ফুপা যার ফিল্টারে ফেনায়মান নিপাতনে সিদ্ধ হবার থাকে ধার
বিলটারে তেনায় প্রমাণ করা উৎকট আর্তির আকর্ণনয়ন
বনে বাদাড়েও থাকে সমাজের পাঠ শুধু ফেলে দিয়ে যেতে হয় বুদ্ধির যাতাকলে পচে যাওয়া ফিতা।

৮৯৬

সত্যের আরাম পেলে কথকের দিকে হেলে পড়া
তথ্যের ক্যারাম খেলে জাতকের ফিকে হয় ঘুম গুণধর যেনো শিল্পীর তুলি
ঢুলিরা ভাড়াটিয়া দৈনিকে খুশি
কুলিরা তাড়া দিয়া দই রেখে ভুষি নিয়ে মহল্লা মাতায়ে করে শোরগোল
দোর খোল; অন্তত জানালাটা খোলা থাক বাতাসের গন্ধেও কিছু পাল্টায় পুঁটলির ভাব
কন্ কত কানালা দাঁড়িয়ে রয় দেয়ালের পিঠে খুলে দিতে লুঙ্গির গিঁট গিন্নিপনায়!
সিন্নি ঘনায়ে আসে মানতের টাইটেলে টোটকার ট্যাটু
বিন্নি ফনায়ে কাশে লানতের, ভাই ঠেলে বলে ভাগ্—
নাগ বিষের থলি পোষে প্রয়োজনে, মানুষেরা কেন কে জানে পুরোটাই বিষ হয়ে দুধে আলতায় কাটে ছড়া।

৮৯৭

মৃত আত্মার সেলফিতে ডিজিটাল দেবতার অ্যালগরিদম
যম জীর্ণদশায় ভাবে শূন্যতাবাদ সঙ্গদোষের কোনো খেলা
অঙ্গ মোষের হলে নিরাপদে খেয়ে যায় জোঁক
লোক নেই শোকের ভাড়ার খালি খেয়ানৌকার খোলাঘর
ঝোলা ভরপুর বিজ্ঞাপনের ট্যাগলাইন
বিজ্ঞজনের ব্যাগ আইন
বাইন মাছের মতো পিছলা ও পিডিএফ ফরম্যাটে ফোকলা জাতের
হাতের সুখ্যাতি হলে পেটেও দানাপানি গতিশীল
কানাকানি অতি দিল খুলে বন্ধ হলেই তবে কনটেন্ট নির্মাণ রোগের উপশম।

৮৯৮

অগ্নি দেখেছি আমরা দহনের জ্বালা তার ভিন্ন জাতের
ভগ্নি রেখেছি কামরা বহনের তালা যার শূন্য হাতের
প্রাতের নকশায় ফোটেনি ফুটফরমাশের ব্যাকরণে ব্যাকুল দশায়
অকারণে দুকূল ধসায়ে দিলে নদীরাও বোবা হয়ে যায় বর্তনে স্বাধীনতা বর্গায় রেখে
কর্তনে বাদী যথা আলামত নিমগ্ন থাকে
নালা সৎ হলে সমুদ্র্রের নাগাল পাওয়া নখরামি নয়
মালা বদ বলে গলায় খঞ্জর চালানোর নিয়মেরা বুদ্ধিজীবীতার পায় ভার
পার হওয়া সোজা
ধার সওয়া গোঁজামিলের নয়, ইতিহাসে ভর করে শাড়িটাও বুনতে হয় পরম্পরার ডাকে পাঠানো তাঁতের।

৮৯৯

হাইফেন মুছে গেলে একাকার শাপলা-শালুক
নাই ধ্যান গুছে গেলে বেঁকা তার পাপটা বলুক
ঝাপটা চলুক চোখে নতুন জলের, ঘুম ঢুলুঢুলু পথে তন্দ্রালু পৃথিবীটা ঝোলা
ধুম উলুজুলু লোকে আনন্দ আবেশের প্রীতিকর প্রত্যুত্তর পরমার্থ
ভীতিকর শত্রুরা ঘনীভূত কোরাসের মতো লাল হুইসেলে লাশবাহী গাড়ি
তুই ঠেলে যতটুকু যাবি তার ছক সাজানো আগের
ভাগের ভ্যাকসিন নিয়ে নতুন মোড়কে পাবি পুরাতাত্ত্বিক পুতুল নাচের
রাগের নেক সিন দিয়ে সিরিয়াল আসমানি হলে জমিনে দাঁড়ালে হবে বেনাগাল
কে নাগাল পায়? নিকাশের নিগড় নিয়ে জনতাও জেনে গেছে এইসব ছলনা তালুক।

৯০০

পদচারণার অগণন স্মৃতি নিয়ে পরাবাস্তব চোখে আমাদের দেখে পথ
মরা গাছ সব বুকের ভেতরে লুকিয়ে রাখে তরুণ পত্রালি
শোকের কাপড়ে শুকিয়ে থাকে করুণ জোড়াতালি জবুথবু জবানের
পোড়া বালি তবু সূর্যের সাথে কথা কয়
সুর ফের কাঁধে রাখে হাত
দূর ঢের
জের টানা শেষ হয় না কখনো জেয়ারতে জেলেডিঙি চোখের সীমানা থেকে মুছে যায়
কে আড়তে গেলে কেমন হিসাব তার তাকিয়ায় মিত্র ভোলা
আঁকি আয় চিত্রকলায় তার প্রত্ন হরফের অচেনা লিপির মতো নিঃশ্বাস অদেখা অমত।

৯০১

নর্দমায় নোনতা বিকেলে ভাবি সকালেও সূর্য ছিলো
সর জমায় যে দোকানি তার হাতে রিপুর লাল পাসপোর্ট
বাস রোডে ধোকার বাহন হয়ে ঘোরে
খোকার কাহন বেয়ে নেমে আসা সুরের সাথে নস্টালজিয়ার নত অক্ষর
দশটা বাজিয়া গেলে হলে থাকা মেয়েরাও মরে যায়
যশটা তাজিয়া মিছিলের মতো জমকালো চাই
কম আলো তাই
সবাই মিটিমিটি চোখে হয়ে আছে নিজেরাই নক্ষত্র গ্যালাক্সির সাথে ঘোরে
সেলাক ধীর হাতে জামা, খালি গায়ে এইবার পথে নেমে যাবো এইমতো আমাদের প্রত্যাশা ছিলো।

৯০২

ডিম ফেটে যাবে
নিম ঘেটে পাবে তিতা
ফিতা খুলিবার আগে আরক্তমুখের আতরদানিতে রাখো আইডিয়া
ধারক তো শোকের ভাষার শোভাযাত্রায় হয় ধইঞ্চা
ডোবা কাতরালে জলের দুয়ারে বসো বদনসিবের মতো নমনীয় নয়াজ্ঞান
তলের কুয়ারে যতই গুপ্ত রাখো তার সাথে দেখা হয় কপিল মুনির
খুনির বাঙ্কারে নরম তক্তাও হাড়কালা হিটলারি হাতা
কার তালা, কার হাতে চাবি?
পস্তাবি, ফাঁকা খুলির ভিতর হাতুড়ি কোদাল নিয়ে দেখো কারা জ্ঞাতিগোষ্ঠী নিয়ে ডোবে!

৯০৩

অপেক্ষার ট্রেন থেকে ছিটকে পড়া যাত্রীরা দুঃস্বপ্নের কুয়াশায় দ্যুতিময়
যে আশায় গতি ক্ষয় হলো অনুদিত অন্ধকারে
কে ভাসায় পতি বেহুলার নাওয়ে!
ভাষায় যতি চিহ্নের সত্যকথনের রীতি ভগ্নিপতির ভজঘট
পথ্য পতনের সিঁথিতেই আমরা খুলেছি রক্ত সিঁদুরের ফুটন্ত সিন্দুক
ভক্ত ইঁদুরের দন্তেও কাটে, ব্যথার বাটখারা থাকে
শক্ত মাদুরের ভান্তেরা বাজারের যেইদিকে হাঁটে নির্জলা নিয়মের নিরুপদ্রব
আজব আলকাতরায় অভিভূত
খাল সাঁতরায়ে পাড় হলে নষ্ট নিরক্ষরেখায় সূর্যের চোখেও থাকে পোষাক ভেজার পাকা ভয়।

৯০৪

সবাই পরিষ্কার ফকফকা ময়লা কোথায় কারো জানা নেই
হ ভাই, ধরিস যার লকলকা লেজ তাকে নামানোই কাজ
ভাঁজ নেই কোথাও মসৃণ মখমল তোর দুনিয়া
চোর শুনিয়া সবাই চোখ উপড়ে ফেলার কাজে হাতা গুটিয়ে নামে ময়দানে
লোক স্যুপরে মাঠা ভাবে মাঠারে মাখন-মণ্ডা-মিঠাই
ঝাঁটারে যখন যেই পায় মারে
‘তারে ধরতে গেলেই মনবেড়ি’ তিনি তো তেমন নন বাকিদের বদকাম
সাকি ঘিরিয়া ঘিরিয়া নাচে
চা কি বিড়িটার সাথে খাবেন? আপনি তো সঠিক পথের দিশা কোনোকিছু মানা নেই।

৯০৫

তত্ত্বের জঙ্গলে উত্তেজনার ছল-চাতুরী চিমটি কাটা
সত্যের দঙ্গলে সব দেবদুত দলিলের দল
সলিলের তল খোঁজা বৃথা ভাবনার সাথে একটা জীবন জহুরির
লহু তীরের দিকে বেহায়ার মতো চায়
আয়
তলায় কুড়ায় যারা গাছেরেও খায় জহরব্রতের মতো সাধুতার সাশ্রু নয়ন
দাদু তার কথাই বলেছেন, সাবধান!
ঝাঁপ খান বুঝেই দিবা, জলে জনতায় জঙ্গলে জলসায় যেখানেই হোক
দল সায় দিলে ভালো, পাশে না থাকলেও কেউ চোখে চোখ রেখে দাঁড়াও, বুকের শক্ত রাখো পাটা।

৯০৬

পোস্ট থিয়োরির বুস্টারে মাথায় রাখো পুস্তক অক্ষরে ভরা
হোস্ট নায়রির দোষটারে খাতায় রাখো মস্তক লক্করে ধরা
চক্করে লড়া দিলে ভীমরুল ভয়ানক গীতিময়
নয়া শখ যদি হয়
দয়া নখ থেকে শুরু হোক বিশ্বায়নের কোলে ঘুমাবার আগে আপ্তকামে
বাপতো খামের চিঠি নয়, নয় তত্ত্বের কোনো ফুটা জাল
সত্যের জানো কটা ডাল হয়? শাখা-প্রশাখার পরে শেকড়ের দিকে গেলে মৃত্তিকা
পাকা দশা যার ঘরে বেকারের
রেকারে হবে না কাজ, বুলডোজারের তলে দলে দলে শুয়ে পড়ো পুরাতন পঙ্কিল মরা।

1 Comment. Leave new

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত