এক.
শৈষ্যাফুলিকে কেউ পাগল ভাবে, কেউ ভাবে বেখেয়ালি আর কেউ বলে সে একটা আস্ত বদমাশ। লোকের কথা শুনে শৈষ্যাফুলি কেবল একটু শুকনো হাসি দেয়, কখনওবা উল্টোদিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন কিছুই শোনেনি, আবার কখনও খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়ে চারপাশ কাঁপিয়ে।
শৈষ্যাফুলি ঠিক তাই করে যা তার করতে ভালো লাগে। তাই তো তার গা ভরা দাগ আর কাটাকুটির চিহ্ন, মারসেলের মারের স্মৃতি সে বহন করে সারা শরীরে। কিন্তু ভারি আশ্চর্য মেয়ে বটে শৈষ্যাফুলি, মারসেলের মতো ব্যাটামানুষ যখন তাকে গায়ের ঝাল মিটিয়ে মারে, তখন পাড়ার লোকে আহা উহু করলেও এ মেয়ে টু শব্দটি করে না। ওর প্রতিবেশি হেপনা টুডুর বউ তুলসীরানীর ভাষায়— ‘এ কোনো সাধারণ মেয়ে নয় লা, এ হলো কেরণমালা’…
কিরণমালা সিরিয়ালটার কিছু কিছু দেখেছিল শৈষ্যাফুলিও। ওর নিজেরই তখন নিজেকে কিরণমালা মনে হতো, আহা! কেমন সুন্দর মেয়ে! আর কী যে তার দুঃখকষ্ট! শৈষ্যাফুলির মনে হতো কিরণমালার কষ্টগুলো নিজের বুকের ভেতর রেখে দেয়।
কষ্ট কি শৈষ্যাফুলিরও কম? লোকে তো বলে এত কষ্ট নিয়ে সে বাঁচে কী করে, সারাদিন তার এত খিলখিল হাসি আসে কোথা থেকে! লোকের কথা অবশ্য সে থোড়াই কেয়ার করে। মা বলত— ‘নোকের কথা না শুনিলে নোকে তুকে খারাপ কহিবে।’
লোকে যে তাকে খারাপ কয়, তা সে ঠিকই বোঝে। কিন্তু শৈষ্যাফুলির হিসাব পরিষ্কার, যে লোক তার দুর্দিনে একমুঠো খাবার মুখে তুলে দিতে পারে না, সেই লোকের কথার মুখে ছাই।
মায়ের পছন্দ ছিল খেতজোড়া সরিষাফুলের আরাম, সেজন্যই মেয়ের নাম রেখেছিল শৈষ্যাফুলি। ছোটবেলা থেকে হাজারবার লোকে তাকে বলেছে— আহা অমন কালো কুচকুচে বেটিছইলের অমন সোন্দর নাম! তাতে তাদের মা-বেটির থোড়াই কিছু এসেছে গেছে। মা ওকে চিরদিনই বলেছে— মোর কাছোত তুই শৈষ্যাফুলের মতোনে সোন্দর।
শৈষ্যাফুলি জানে, মায়ের কাছে মেয়েরা আজীবন অমন সুন্দরই থাকে। কিন্তু মায়ের কাছ থেকে চলে এলে তার আদর, আরাম, চোখের শীতল ছায়া সব ভুলে যেতে হয়। মায়ের কাছ থেকে এ বাড়িতে এসেই সে জানতে পেরেছে মারসেল নামের মানুষটার কাছে তার দুই পয়সার দাম নেই।
এবার আলুর দাম নেই বাজারে, মারসেল কেন রশিদের চার বিঘা জমিতে আলু চাষ করল কে জানে। এখন সেই লস পোষাতে না পেরে ভ্যান নিয়ে আগের মতো সকাল-সন্ধ্যা বাইরে থাকছে। বাড়িতে এলেই মুখ ভার। শুধু শৈষ্যাফুলি রাতের খাবার এগিয়ে দিলে গপগপিয়ে সেই ভাত খেয়েই শুয়ে পড়ছে। মারসেল খেয়ে উঠলে দুটো ভাত খেয়ে সেও শুয়ে পড়ে। ঘরের টিমটিমে বাতিটা নিভিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে তারা দুজন বিছানায় পড়ে থাকে মরা মানুষের মতোন।
বাইরে খোপড়ায় হাঁসমুরগিগুলোও জড়াজড়ি ঘুমায় সেই ভোর পর্যন্ত। কেবল মাঝেমধ্যে মারসেলের শরীর জেগে উঠলে সে উঠে পড়ে শৈষ্যাফুলির গায়ের ওপর, ওর শ্বাসের সঙ্গে পচানি আর সিগারেটের যৌথ গন্ধে বমি আসে তার, তবু কিছু বলে না। ওই তো মারসেলের পৌরুষ, একটু পরেই ফোঁসফোঁসাতে ফোঁসফোঁসাতে নেমে যাবে তার ওপর থেকে মারসেলের ন্যাংটো কালো শরীরটা। ওইটুকু সময় সে তাই দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে। তবে শৈষ্যাফুলি জানে মারসেল বরাবর এমন ছিল না, আগে ও যথেষ্ট ভালো ভাব ভালোবাসা করতে পারত বিছানায়। আজকাল এমন হয়ে গেছে কেন তা কে জানে।
তবে কোনো এক অদ্ভুত কারণে শরীরের এইসব ব্যাপারস্যাপার শৈষ্যাফুলির কোনোদিনও তেমন ভালো লাগেনি। লাজু তো বলে এসব শরীরের সুখ নাকি দারুণ ব্যাপার, একবার শরীরে শরীর মিললে সেই সুখ বারবার নিতে মনে চায়। তো বিয়ের দু’বছর হয়ে এলেও সে কেন তাহলে কিছুই বুঝতে পারল না। লাজু একথা শুনে গম্ভীর মুখে বলেছিল— ‘এ তো ভালো কথা লয় রে, ফুলি। তুই উহাক কিছু কহিস নাই?’
না, শৈষ্যাফুলি এ নিয়ে আজ পর্যন্ত মারসেলকে কিছু বলেনি। লোকটার সঙ্গে তার ভাব ভালোবাসা নেই। দুই বছর আগে একদিন দুপুরবেলা তার মা এসে বলল, ‘চল ফুলি আইজ তুহার বিয়া’ আর ওর বিয়ে হয়ে গেল মারসেল টুডু নামের লোকটার সঙ্গে। তার আগ পর্যন্ত শৈষ্যাফুলি মুর্মু ছিল সিংড়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী, রোল নম্বর দুই। স্যারেরা বলত লেখাপড়া শিখে শৈষ্যাফুলি একদিন অনেক বড়ো হবে।
গাইতে গাইতে তার চোখে জল আসে, কী কারণে আচমকা এমন আছাড়িপিছাড়ি কান্না পায়, তা বুঝতে পারে না শৈষ্যাফুলি কিন্তু এমন নির্জনতার মধ্যে তার কাঁদতে খুব আরাম লাগে। মনে হয় যেন মা পাশে বসে তার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে
দুই.
কাল বাহা পরব শেষ হয়েছে। আজও সক্কালবেলাতে মারসেল ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে গেছে বটতলির দিকে। কাল নেশা হয়ে গিয়েছিল শৈষ্যাফুলিরও। সেই নেশায় আজ তার ঘরে থাকতে মন করে না। ঢুলুঢুলু শরীরে সে ঘরদোর গোছায়, হাঁসমুরগিদের আদার দেয়, বাড়িঘর সাফসুতরো করে। তারপর নীল শাড়িটা ঠিকমতো গুঁজে বাড়ি থেকে ছুট লাগায়, সিংড়া বন, নর্তের চিকন ধারা ডাকছে তাকে।
এই বনে ওরা মূলত আসে রান্নার জন্য খড়ি কুড়াতে। বনভরা শুকনো পাতা মাটিতে গালিচা বিছিয়ে থাকে, সেই পাতা জড়ো করে ওরা বাড়িতে নিয়ে আসে। পাতা কুড়ানোর ফাঁকে লাজু ওকে একদিন নিয়ে গিয়েছিল নর্তের কাছে। সেই ছোট্ট নদীর জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর বুকের ভেতর একটা শীতল ঝর্ণাধারা বয়ে গিয়েছিল। আর সেই ঝর্ণার পথ ধরে তার মা বাসন্তী এসে বসেছিল ওর পাশে। মাকে সেদিন সে জিজ্ঞাসা করেছিল— মোর বিহাটা ক্যানে তুই দিয়েছিলি রে মা?
মা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলেছিল— তোর মরদটা খুব মারে তুকে, লয়?
মারসেল কারণে-অকারণে তাকে মারে। সে দোষ করে বলে মার খায়, আবার কিছু না করেও মার খায়। আলী চাচা ভ্যান নিয়ে কথা শোনালে, রশিদ আগামিবার চাষের জমি বর্গা দেবে না বললেও ঘুরেফিরে শৈষ্যাফুলিই মার খায়। জীবনে মারসেল টুডু নামের মানুষটা যে একটা জুতের কিছু করে উঠতে পারেনি— তার জন্যও সে মার খায়। জীবনের যাবতীয় না পাওয়ার খেদ মারসেল শান্ত করে বউ পিটিয়ে। তবে তার সঙ্গে লুকানো আছে আরও এক গভীর গোপন অসুখ, সেটাও টের পায় শৈষ্যাফুলি। তার অমন কালো কুচকুচে শরীরের উপচেপড়া বিভঙ্গ দেখে মারসেল অশান্তিতে মরে। সে যে লম্বা সময় বাড়িতে থাকে না, সেই সুযোগে শৈষ্যাফুলির হয়তো কারও সঙ্গে প্রেম পীরিতি—এই সন্দেহ মারসেলের মনে গেঁথে গেছে।
সেদিন মায়ের কথার জবাব দেয়নি শৈষ্যাফুলি, কেবল হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠেছিল। পাশে বসা লাজু পেছন থেকে আলতো হাতে জড়িয়ে রেখেছিল তাকে। তার ঠিক কতক্ষণ পরে লাজু তার হাত ধরে ঘরে নিয়ে গিয়েছিল, জানে না সে।
সেদিন ঘরে ফিরে তার রাঁধতে মন করেনি। সকালের ভাতে এক পাতিল জল দিয়ে পান্তা বানিয়ে রেখেছিল, লাজু দিয়েছিল শুঁটকি আর আলুর ঘাঁটি। বাড়ি ফিরে পান্তা দেখে বেদম পিটিয়েছিল মারসেল। তারপর রাত গভীর হলে ন্যাংটো মারসেল উঠে পড়েছিল তার ওপর, মারসেলের এই অহেতুক দলাই মলাই দেখে অনেকদিন বাদে গানের সুরে সুরে সিটি বাজিয়েছিল সে, আর সেই অপরাধে মারসেল তাকে গালি দিয়েছিল ‘ছিনাল মাগি’ বলে।
শেষবার বনে এসে যে বেতের ঝোপটা খুঁজে পেয়েছিল সে, আজ এসেই শৈষ্যাফুলি সেদিকে চলে যায়। শৈষ্যাফুলি যখন এদিক দিয়ে যাচ্ছিল এই ঝোপের পাশে দুটো বুনো শূকরকে সঙ্গম করতে দেখেছিল। এমন দৃশ্য এ জীবনে সে আগে কোনোদিন দেখেনি। শৈষ্যাফুলির পা যেন আঠার মতো আটকে গিয়েছিল এখানে। সেই বেতঝোপের পাশে অনেকক্ষণ বসে থেকে সে ঘরে ফিরেছিল আর জীবনে প্রথমবারের মতো প্রায়ান্ধকার ঘরে নিজের শরীরকে আদর করেছিল উন্মত্তের মতো।
আজ আবার সেই দৃশ্য দেখার লোভেই হয়ত শৈষ্যাফুলি বেতঝোপটার কাছে যায়। এই ঝোপটার মাঝামাঝি একটা রক্তকাঞ্চনের গাছ, সেই গাছে থরে থরে ফুটে আছে বেগুনি রঙের ফুল, মাটিতেও এলোমেলো পড়ে আছে কতগুলো। কিন্তু ঝোপের চারপাশটা ভালো করে দেখেও সে কিছুই পায় না, ওদের পাড়ার পোষা শূকরগুলো পর্যন্ত ধারেকাছে নেই। তবু শৈষ্যাফুলি আঁচল পেতে বসে ঝোপটার পাশে, ওর বুভুক্ষু আত্মা কী যেন খুঁজে বেড়ায়।
মাটিতে পড়ে থাকা ফুলগুলো থেকে বেছে বেছে শৈষ্যাফুলি একটা সতেজ ফুল কুড়িয়ে চুলে গোঁজে, সঙ্গে আয়না থাকলে সে দেখতে পেত তার কালোবরণ মুখখানি রক্তকাঞ্চনের রূপে একবারে ঝলমল করছে। সে গুনগুনিয়ে গায়— তুমি কোন শহরের মাইয়া গো, লাগে উড়াধুরা।
গাইতে গাইতে তার চোখে জল আসে, কী কারণে আচমকা এমন আছাড়িপিছাড়ি কান্না পায়, তা বুঝতে পারে না শৈষ্যাফুলি কিন্তু এমন নির্জনতার মধ্যে তার কাঁদতে খুব আরাম লাগে। মনে হয় যেন মা পাশে বসে তার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে।
কতক্ষণ এমন করে কাঁদে সে জানে না, তারপর আচমকা তার কাঁধে একটা অচেনা স্পর্শে চমকে ওঠে। সে টের পায় এ এক পুরুষের হাত। অচিন পুরুষের এমন ছোঁয়ায় গা শিরশির করে ওঠে তার কিন্তু হাতটা কাঁধ থেকে নামিয়ে দিতে মন চায় না। ধীরে ধীরে পেছনে ফেরে সে, সত্যিই এক অচেনা পুরুষ তার পেছনে। যেন কষ্টিপাথর ছেনে এই পুরুষমূর্তি গড়েছে ঠাকুর জিউ— সে মূর্তি যেমন সুন্দর, তেমন সুঠাম। সেই অচেনা সুন্দর পুরুষ এবার দুহাতে ওকে আকর্ষণ করে। শৈষ্যাফুলির কী হয় সে বুঝতে পারে না। এমন বেগুনি রঙের প্রায় দুপুর, এই অপূর্ব পুরুষ—এসব সত্যি নাকি বিভ্রম, সে জানে না কিন্তু সেই সত্যি কিংবা সুন্দর ভ্রমের বাহুডোরে নিজেকে নিঃশর্তে সমর্পন করে। তার শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটায়। সবুজ বনের শ্যামল গন্ধের সঙ্গে মিশে যাওয়া এক প্রবল বুনো পুরুষালি গন্ধ সমস্ত শরীরে মেখে নিতে নিতে শৈষ্যাফুলি সাঁতার কাটতে থাকে নর্ত নামের নদীর শীতল আদুরে জলে।




















































































