১.
একটি ভাষাকে কেন্দ্র করে একটি দেশ গঠন হলো; আধুনিক রাষ্ট্রের ইতিহাসে এটা একটা অভূতপূর্ব ঘটনা। পৃথিবীতে অন্তত ৫ হাজার ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী এবং ২০০-র মতো রাষ্ট্র আছে। কিন্তু প্রতিটি ভাষাকে কেন্দ্র করে পৃথক পৃথক রাষ্ট্র নির্মাণ হয়নি। খুবই মুষ্টিমেয় সংখ্যক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো ঘটনা ঘটেছে। বাংলা ভাষার এই অন্তর্গত শক্তি বিস্ময়কর। বাংলা ভাষা বিনির্মাণ হতেও সময় লেগেছে অন্তত ১০০০ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলা ভাষাকে অসংখ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যে নিজেকে নিজের পথ তৈরি করে এগোতে হয়েছে। ইতিহাসের উত্থান পতনের সেই সকল কালপর্বে নজর ফেললে দেখা যাবে বাংলা ভাষার চরিত্র ও স্বভাব জন্ম থেকেই ‘বিদ্রোহী’। হাজার বছর ধরে কয়েকটি প্রভাবশালী রাজবংশ ও রাজভাষার (সরকারি ভাষা) সাথে সংগ্রাম করে বাংলাকে টিকে থাকতে হয়েছে। যেমন: সেন রাজাদের সময় সংস্কৃত ভাষা, সুলতানি আমলে ফার্সি, ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন আমলে ইংরেজি এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রে উর্দুর সাথে। এর মধ্যে ঔপনিবেশিক আমলে সংস্কৃত-পণ্ডিতদের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃত-ঘেঁষা বাংলা ভাষার সাথেও তাকে যুঝতে হয়েছে। বর্তমানে বাংলা ভাষার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে বিশ্বায়নের নতুন বাস্তবতা ।
শত শত বছর ধরে চলতে থাকা এই জনগোষ্ঠীর ভাষার লড়াইয়ের মহাবিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ তে। বায়ান্নের পথ ধরে ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা।
বায়ান্নের সূচনাবিন্দুকে আমরা খুঁজে পাবো হাজার বছর পূর্বে কাহ্নুপা, লুইপাদের হাতে গড়ে ওঠা সাহিত্যের ভেতর। কেননা ভাষার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটে সাহিত্যে। বাংলা ভাষার আদি রূপ “চর্যাপদ” (নবম থেকে দ্বাদশ শতক)। তখন এ অঞ্চল শাসন করতো সেন-বর্মন বংশ। পাল সাম্রাজ্য তখন নিভু নিভু। মুসলিম শাসকরা বাংলা দরজায় কড়া নাড়ছে। চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রথম বই। চর্যাপদের ভাষাকে অনেকে বলেন সান্ধ্য ভাষা। সন্ধ্যার আলো আঁধারের মত তার চেহারা। বাংলা ভাষার আদি রূপ হিসেবে তাকে চিনতে আমাদের ধন্ধে পড়ে যেতে হয়। হাজার বছর আগে বাংলা ভাষার যখন জন্ম হচ্ছিল তখন তা ছিল আধো গঠিত। চর্যাপদের যে বাংলা তা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। সেটাও একটি পুরোনো ভাষার ক্রমবদলের ফল। পুরোনো সেই ভাষাটির নাম “প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা”। শত শত বছর ধরে বদলে তা আজকের বাংলায় রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে আজকের যে বাংলাদেশ তার আকৃতিও কিন্তু বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ছিল এবং বাংলাদেশ বিভক্ত ছিল নানা খণ্ডে, ভিন্ন ভিন্ন নামে। যেমন: বল্লাল সেনের সময় (দ্বাদশ শতক) বর্তমান বঙ্গদেশ, রাঢ়, বরেন্দ্র, বাগড়ি এই চারটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। কখনো এই ভূখণ্ড জুড়ে গেছে প্রতিবেশী অপর ভূখণ্ডের সাথে। কখনো অধীন হয়েছে। আবার কখনো কখনো তার স্বাতন্ত্র নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাংলার এ ধরনের বাক বদলের বিস্তৃত ইতিবৃত্ত আছে।
জানা যায়, বাংলার আদি নাম ছিল বঙ্গ। মহাভারতে বঙ্গ নামে একজন রাজার নাম পাওয়া যায়। সম্ভবত বঙ্গরাজাই এই ভূখণ্ডের গোড়াপত্তন করেছিলেন। বঙ্গ নাম সর্বপ্রথম পাওয়া যায় “ঐতোরীয় আরণ্যক” গ্রন্থে। রামায়ণেও বঙ্গ নামের উল্লেখ আছে। এই সকল সূত্র এই জনপদের প্রাচীনত্বেরও প্রমাণ দেয়। এর রাজধানীর নামও পরিবর্তিত হয়েছে বিভিন্ন যুগে। হিন্দু আমলে প্রাচীন বাংলার রাজধানী ছিল গৌড়। সেন আমলে গৌড়ের নাম বদলে হয় লক্ষণাবতী, পরে মুসলিম শাসনামলে হয় লখণাবতী। প্রাচীনকাল থেকে নানা খণ্ডে বিভক্ত বাংলাদেশের জনপদকে পাঠান শাসকরা বঙ্গ নামে একত্র করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, আমাদের এই দেশকে মুসলমানেরা বাংলা বলিতেন। মুঘল সম্রাট আকবরের মন্ত্রী ও বন্ধু আবুল ফজল তার আইন ই আকবরী গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বঙ্গ’ শব্দের সাথে আল শব্দটি যুক্ত হয়ে এদেশের নাম হয়েছে ‘বাঙ্গাল’ বা ‘বাঙ্গালা’। প্রকৃত অর্থে, ১৩৫২ খ্রীস্টাব্দে সুলতান শামস উদ দীন ইলিয়াস শাহ নিজেকে স্বাধীন শাসক হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ‘বাঙ্গলা’ নামের প্রতিষ্ঠা করেন।
২.
বাংলা ভাষার আদি রূপ চর্যাপদের পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয় ১৯০৭ সালে। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ওই বছর নেপালের রাজ দরবার থেকে এটা উদ্ধার করেন। চর্যাপদ আবিষ্কারের পর বাঙালি, ওড়িশা, অসমীয়া, মৈথিলী, হিন্দি পণ্ডিতেরা এটাকে তাদের নিজেদের ভাষার আদি রূপ হিসেবে দাবি করেন। পণ্ডিতদের তর্ক বিতর্ক শেষে এটা বাঙালির নিজস্ব সম্পদ বলে সাব্যস্ত হয়। চর্যাপদের কবিতাগুলি পড়লে বোঝা যায় ‘বাংলা সাহিত্যে শ্রেণি সংগ্রামের শুরু হয় প্রথম কবিতাগুচ্ছে।’ কবিদের নামগুলিও অন্যরকম— কাহ্নুপা (কৃষ্ণাচার্য), লুইপা, ভুসুকুপা প্রভৃতি। এঁরা ছিলেন গৃহহীন বাউল বৌদ্ধ সাধক। তাদের সংসার ছিল না। তারা সাধনা করতেন গোপন তত্ত্বের। তাদের নিজেদের তেমন কোনো ঘর বাড়ি ছিল না। নগরের বাইরে বাস করতেন। অর্থাৎ সমাজের নিচু তলার অধিবাসী ছিলেন আমাদের ভাষার প্রথম কবিরা। তাদের জীবন যাপনের প্রকাশ ঘটেছে তাদের কবিতায়— ‘টালত ঘর মোর নাহি পড়বেষী।/ হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেসী।।’ অর্থাৎ ‘টিলার উপরে আমার ঘর, সেখানে প্রতিবেশী নেই, আমার হাঁড়িতে ভাত নেই, (অথচ) নিত্য প্রেমিক (অতিথি) ভিড় করে’ অথবা ‘নগর বাহিরে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ।/ ছই ছোই যাইছি ব্রাহ্ম নাড়িআ।’— ‘নগরের বাইরে, ডোম্বী, তোমার কুঁড়েঘর; ব্রাহ্মণ নেড়েকে তুমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাও।’ এসব কবিতায় উঠে এসেছে তাঁদের বঞ্চনার কথা, তাঁদের দারিদ্র ও নিপীড়নের কথা। অন্যদিকে তাদের কবিতা ছিল রাজসভায় অচ্ছুত। কারণ সেগুলি লেখা হতো বাংলা ভাষায়। তখন রাজ দরবারের ভাষা (সরকারি ভাষা) সংস্কৃত। উল্লেখ্য, সংস্কৃত হল একটি কৃত্রিম ভাষা, সচেতনভাবে মানুষ যে ভাষা তৈরি করেছিল। সমাজের উঁচু শ্রেণির অভিজাত মানুষেরা সে ভাষার চর্চা করতেন। আর বাংলা ছিল নিচু শ্রেণির মানুষের ভাষা। এই ভাষায় কাব্যচর্চা তখন নিষিদ্ধ ছিল। রাজসভায় বাংলা ভাষার প্রবেশাধিকার তো ছিলই না বরঞ্চ বাংলা ভাষায় কাব্যচর্চার দায়ে দণ্ডিত করা হতো। চর্যাপদের সময়ের পটভূমিতে লেখা সেলিনা হোসেনের উপন্যাস ‘নীল ময়ূরের যৌবন’। সেখানে উঠে এসেছে ‘বাংলা ও বাঙালির কথা। চর্যাপদের কবি কাহ্নুপাদ স্বপ্ন দেখেন স্বাধীন ভূখণ্ডের। যেখানে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রবল নিপীড়ন থাকবে না, তার মুখের ভাষা হবে রাজদরবারের ভাষা, তাই প্রতিবাদমুখর হলে কেটে দেওয়া হয় কাহ্নুপাদের দু’হাত, ডোম্বিকে ফাঁসি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং রাজার লোকেরা পুড়িয়ে দেয় ওদের পল্লী। যারা বাঁচতে পারে পালিয়ে যায় পাহাড়ের পাদদেশে। এ পলায়ন শুধু আত্মরক্ষার জন্য নয়। নতুন করে শক্তি অর্জনের জন্যও।’ এভাবে যুগ যুগ ধরে শক্তি সঞ্চয় করে আমাদের পূর্বসূরীরা পরম মমতায় বুকের ভেতর আগলে রেখেছিলেন আমাদের ভাষা ও জনগোষ্ঠীকে।
৩.
বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর উপর ব্রাহ্মণ্যবাদী নিপীড়ন ও সংস্কৃত ভাষার আধিপত্যের যুগে এ অঞ্চলে নতুন শাসক হিসেবে আবির্ভূত হন বখতিয়ার খিলজি। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি নবদ্বীপের বৃদ্ধ রাজা লক্ষণ সেন কে পরাজিত করেন। এই জনগোষ্ঠীর মানুষের সাথে খিলজি ও তাঁর বিদেশাগত অনুসারীদের ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতির কোন মিল ছিল না। কারণ সে সময় এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মূল অংশ ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। নবাগত মুসলিম শাসকেরা এখানে এসেছিলেন স্থায়ীভাবে বসবাস ও শাসন করার মনোভাব নিয়ে। শাসন কাজ পরিচালনার জন্য তাদেরও প্রয়োজন হল একটি সরকারি ভাষা। তারা রাজভাষা হিসেবে ‘ফার্সি’কে নির্ধারণ করলেন কারণ সেটা ছিল শাসকের মুখের ভাষা। অথচ বিশাল জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা তখন বাংলা হলেও সে ভাষা সরকারি ভাষা হিসেবে গৃহীত হয়নি। বরং মুষ্টিমেয় মানুষের মুখের ভাষা ফার্সিই সেখানে প্রাধান্য পেল।
অবশেষে ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৈরি হলো এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারের রক্তস্রোত মিশে গেল হাজার বছর আগের কাহ্নুপাদের রক্তের সাথে। ভাষা সংগ্রামের সেই রক্ত-আগুনের পথ ধরে আমরা পৌঁছে গেলাম একাত্তরের মহাকাব্যিক অধ্যায়ে
সমাজের অভিজাত শ্রেণি যেহেতু একটি সুবিধাবাদী শ্রেণি কাজেই তারা তখন ফার্সি ভাষা আয়ত্ত করার চেষ্টা করল। যেভাবে পূর্ববর্তী রাজন্যদের সময় তারা সংস্কৃত ভাষা রপ্ত করে রাজসভায় উচ্চ পদে আসীন ছিলেন। সুলতানি আমলেও ফার্সি শেখার ফলে তাদের শ্রণি অবস্থানের বিশেষ পরিবর্তন হলো না। তবে সেন রাজাদের তুলনায় মুসলিম সুলতানরা শিক্ষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে কতগুলি ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তারা শিক্ষা গ্রহণের অধিকারকে একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। এবং ফার্সির সাথে বাংলা ভাষায়ও শিক্ষার প্রচলন করেন। কারণ নবাগত মুসলিম শাসকরা এটা উপলব্ধি করেছিলেন যে, এ অঞ্চলের মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা না করলে শাসন প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব হবে না। কাজেই কৌশল হিসেবে হোক বা আন্তরিক উদ্যোগ হোক—তারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করলেন। পূর্ববর্তী সেন রাজাদের সময়ে বাংলা ভাষার কবিরা উপেক্ষিত ছিলেন কিন্তু সুলতানি আমলে মুসলমান সম্রাটরা কবিদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। পূর্বে বাংলা ভাষায় রামায়ণ মহাভারত অনুবাদ নিষিদ্ধ ছিল। কারণ এই ধর্মগ্রন্থগুলি সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ হলে মর্যাদাহানি হবে এটা ছিল তাদের যুক্তি। এ ঘটনা শুধু বাংলায় নয় অন্যান্য দেশেও ঘটেছে। বিশেষ করে ইংরেজি ও জার্মান ভাষায় বাইবেল অনুবাদের ক্ষেত্রে। জার্মান ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করতে গিয়ে মার্টিন লুথারকে অনেক বিরোধীতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু মুসলিম সুলতানরা রামায়ণ ও মহাভারত অনুবাদের জন্য উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। প্রকৃত অর্থে, চর্যাপদের যুগের আধোগঠিত বাংলা ভাষা সুলতানি আমলেই বিকশিত হয়। এই বিকাশের পেছনে শাসকের আনুকূল্য যেমন ছিল তেমনি সময়ের সাথে সাথে ভাষার নিজস্ব চরিত্র পরিগঠনের প্রক্রিয়াও চলছিল। বাংলা সাহিত্যে এ সময়ে রচিত হতে থাকে মঙ্গলকাব্য। মঙ্গলকাব্যে ধরা আছে ওই সময়ের সামাজিক ইতিহাস। এ সময়ে শ্রীচৈতন্যের জাতপাতবিরোধী প্রচারে হিন্দু ধর্মে নতুন এক প্রেমময় ধারার উন্মেষ হয়। সেই প্রেমময় ধর্মের চেতনায় রচিত হতে থাকে বৈষ্ণব পদাবলী। শ্রীচৈতন্যের প্রেম ধর্ম সম্পর্কে ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেন (১৮৬৬—৯৩৯) লিখেছেন, ‘প্রেম পৃথিবীতে একবার মাত্র রূপ গ্রহণ করেছিল তা বাংলাদেশে।’ চৈতন্যের ভালোবাসার ধর্ম সমাজে নতুন জোয়ার নিয়ে এলো। তখন মুসলমান কবিরাও কেউ কেউ বৈষ্ণব পদাবলী রচনা করতেন। এবং মধ্যযুগের কবিদের কাছেই আমরা পাই সেই ভালোবাসার বাণী— ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তার উপরে নাই।’ বাংলা সাহিত্যের এই জোয়ারের যুগেও সুলতানি আমলের কয়েকশো বছরের শাসনকালে রাজভাষা হিসেবে ফার্সিই থেকে গেল। এবং কয়েকশো বছরের রাজনৈতিক সামাজিক উত্থান পতনের মধ্যেও বাংলা ভাষা নিজেকে সমৃদ্ধ করে তার লড়াই জারি রাখল।
৪.
সুলতানি আমলের অবসান হলেও সরকারি কাজকর্মে ফার্সি ভাষার প্রচলন বন্ধ হয়নি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরাজিত করে বাংলার শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করে। তখন এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা ছিল বাংলা। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা যত দ্রুত বদলে ফেলা সম্ভব দীর্ঘদিনের প্রথা তত দ্রুত বদলানো যায় না। তাই কোম্পানির শাসকেরা সরকারি কাজকর্ম থেকে ফার্সিকে সাথে সাথে তুলে দিতে পারেননি। কোম্পানি আমলেও আইন-আদালতে ফার্সি ভাষার প্রাধান্য বহাল থাকে। সে সময়ের অভিজাত হিন্দু-মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই অত্যন্ত যত্নের সাথে ফার্সি ভাষা রপ্ত করার কসরত করতেন। রাজা রামমোহন রায় তাদের মধ্যে অন্যতম। রামমোহন ফার্সি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তিনি মিরাত উল আখবার নামে একটি ফার্সি পত্রিকাও প্রকাশ করতেন।
কোম্পানি শাসনের প্রায় ৮০ বছর পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮৩৫ সালে এসে সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজি এবং নিচু স্তরে বাংলার প্রচলন হয়। অর্থাৎ কোটি কোটি জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা বাংলা সরকারি ভাষা হিসেবে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলেও স্বীকৃতি পায়নি। কারণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ছিল অত্যন্ত কর্তৃত্বপরায়ণ এবং সেটা এক অর্থে সেনা শাসন। সরকারি প্রায় সব প্রশাসনিক দপ্তরে পদস্থ সৈনিকেরা ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। কোম্পানির সৈনিক, করণিক এবং বণিক মিলে আকণ্ঠ দুর্নীতি ও লুটপাটে জড়িত ছিলেন। বাংলার সম্পদ তখন পাচার হত ইংল্যান্ডে। ব্রিটিশরা ছাড়া বাংলায় বাইরে থেকে আসা শাসকদের কেউ এ অঞ্চল থেকে সম্পদ পাচার করেনি।
১৮০০ সালে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উইলিয়াম কেরি সাহেব বাংলা গদ্য ভাষা চর্চার উদ্যোগ নেন। তাঁর সহযোগিদের মধ্যে ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার ও রাম রাম বসু। কিছু বই-পুস্তকও তখন প্রকাশিত হতে থাকে। উল্লেখ্য, এর আগে বাংলা ভাষায় আনুষ্ঠানিকভাবে গদ্য চর্চার নজির ছিল না। কারণ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ছিল পদ্য নির্ভর। কিন্তু ফোর্ট উইলিয়ামের তৈরি গদ্য বাংলা ভাষার সহজ, স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত, প্রাঞ্জল বৈশিষ্ট্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘সংস্কৃত শব্দ বাংলায় অনেক আছে। এবং চিরদিন থাকিবেই—সেখানে সংস্কৃতের রূপ ও প্রকৃতি আমাদের মানিতেই হইবে—কিন্তু যেখানে বাংলা শব্দ বাংলাই সেখানেও সংস্কৃতের শাসন যদি টানিয়া আনি, তবে রাস্তায় যে পুলিস আছে ঘরের ব্যবস্থার জন্যও তাহার গুঁতা ডাকিয়া আনার মতো হয়। সংস্কৃতে কর্ণ লিখিবার বেলা মূর্ধন্য ব্যবহার করিতে আমরা বাধ্য, কিন্তু কান লিখিবার বেলাও যদি সংস্কৃত অভিধানের কানমলা খাইতে হয় তবে এ পীড়ন সহিবে কেন?… যে সময়ে ফোর্ট উইলিয়াম হইতে বাংলা দেশ শাসন শুরু হইয়াছিল সেই সময়ে বাংলা ভাষার শাসন সেই কেল্লা হইতেই আরম্ভ হয়।’ রবীন্দ্রনাথ আরো লেখেন, — ‘বাংলা গদ্য সাহিত্যের সূত্রপাত হইল বিদেশির ফরমাশে, এবং তার সূত্রধর হইলেন সংস্কৃত পণ্ডিত, বাংলাভাষার সঙ্গে যাঁদের ভাসুর-ভাদ্র বউয়ের সম্বন্ধ। তাঁরা এ ভাষার কখনো মুখ দর্শন করেন নাই। এই সজীব ভাষা তাদের কাছে ঘোমটার ভিতরে আড়ষ্ট হইয়া ছিল, সেই জন্য ইহাকে তাঁরা আমল দিতেন না। তাঁরা সংস্কৃত ব্যকরণের হাতুড়ি পিটিয়া নিজের হাতে এমন একটা পদার্থ খাড়া করিলেন যাহার কেবল বিবিধ আছে কিন্তু গতি নাই।’ পরবর্তীকালে বাংলা ভাষাকে সুগঠিত করার ক্ষেত্রে রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার দত্তের মত মনীষীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
৫.
ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও দেশ ভাগের পরিণতিতে বাংলার উপর নতুন খড়্গ চাপিয়ে দেয় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৮৪৮ সালে ঘোষণা দিলেন উর্দু হবে রাষ্টভাষা। তাঁর এই ঘোষণার প্রেক্ষিতে পুরো বাংলার জনগণের ভিতর তৈরি হল মহাবিস্ফোরণ। একদিকে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসনের নাগপাশ অন্যদিকে মাতৃভাষার ওপর আক্রমণ। শিল্পী আব্দুল লতিফ তখন গান বাধলেন, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’। অবশেষে ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৈরি হলো এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারের রক্তস্রোত মিশে গেল হাজার বছর আগের কাহ্নুপাদের রক্তের সাথে। ভাষা সংগ্রামের সেই রক্ত-আগুনের পথ ধরে আমরা পৌঁছে গেলাম একাত্তরের মহাকাব্যিক অধ্যায়ে। সেখানে এসে রক্তের শত স্রোত সাগরে রূপ নিল। শত শহীদের রক্তের উপরে দাঁড়ালো মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ। সহস্র বছরের সংগ্রাম শেষে একটি ভাষার নামে একটি রাষ্ট্রের জন্ম হলো।
৬.
বাংলাদেশ রাষ্ট্র অর্জিত হলেও ভাষার লড়াই থেমে যায়নি। নিজের দেশেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু অথবা মাতৃভাষায় শিক্ষার পথ প্রশস্ত হয়নি। অন্যদিকে গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়ন আমাদেরকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বায়নের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পৃথিবীর দেশে দেশে যে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আছে তাকে ঘুচিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ বৈচিত্রের এক ধরনের বিনাশ। জানা যাচ্ছে, একাকারের এই ‘প্রতিযোগিতামূলক অদৃশ্য যুদ্ধে সবচেয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে ভাষার ক্ষেত্রে।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ধারণা করা হতো ‘জোর যার মুলুক তার’। যার হাতে সুগঠিত ‘ওয়েল-ইকুইপড’ সৈন্যবাহিনী আছে দুনিয়ায় সেই জাতিই হবে শক্তিধর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই পরিস্থিতি পাল্টে গেল, সৈন্যের জায়গা দখল করল পণ্য। অধুনা বলা হচ্ছে ‘শ্রেষ্ঠ পণ্য’ থাকলেই হবে না। ‘শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি’, ‘শ্রেষ্ঠ উৎপাদন ও বিনিময় সংগঠন’ এবং ‘শ্রেষ্ঠ ভাষা’ থাকতে হবে। ‘কারণ আমরা এমন এক নতুন যুগে ঢুকে পড়েছি যেখানে যার হাতে যত অগ্রণী ও সমৃদ্ধ শব্দবাহিনী (বা ভাষা) সে হবে ততো অপ্রতিরোধ্য।’ একই সাথে সেই ভাষাটিকে হতে হবে কমোডিটি ও কম্পিউটার ফ্রেন্ডলি। কারণ আধিপত্যকামী তথা মাস্তান ভাষাগুলির (টেরোরিস্ট ল্যাঙ্গুয়েজ) সাথে যুদ্ধে তাকে টিকে থাকতে হবে। যেমন, বর্তমান দুনিয়াতে প্রায় পাঁচ হাজার ভাষা প্রচলিত আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, আগামী ১০০ বছরের মধ্যে এর সংখ্যা কমে দাঁড়াবে ৫০০তে। অর্থাৎ ৯০ ভাগ ভাষা ইতোমধ্যে ঝুঁকির মধ্যে আছে। ভাষাবিজ্ঞানী Gerry T.M. Altmann বলছেন, আগামী ৫০ বছরে মানুষের অর্ধেক ভাষাই হারিয়ে যাবে। পৃথিবীর শক্তিশালী ভাষার (মাস্তান ভাষা) মধ্যে যারা দুনিয়া জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, জার্মান, রুশ, চীনা প্রভৃতি। ভাষা যুদ্ধে তারাও থেমে নেই। কেননা কেউ কারো জায়গায় ছাড় দিতে রাজি না। ‘যেমন ফরাসিরা, আপন দেশের সর্বত্র কড়া নির্দেশ জারি করেছেন— ‘No English’। তাঁদের ভয় মাস্তান ইংরেজি যদি মেরে ফেলে।’ অন্যদিকে ‘লাতিন আমেরিকার নিরীহ নেটিভ ভাষাগুলিকে নিশ্চিহ্ন করতে উঠে পড়ে লেগেছে ‘English only’-র হল্লা।’ অন্যদিকে ভাষা যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত আদিবাসী ভাষাগুলি। কারণ যে ভাষার বক্তা সংখ্যা যত কম তার বিপদ তত বেশি।
ভাষাতাত্ত্বিক কলিম খান বলছেন, ‘যে কোনো জাতির সমস্ত অর্জিত সম্পদের প্রধান ও বৃহত্তম কোষাগার তার ভাষা, ভাষা চলে গেলে তো তার কৃতি, সংস্কৃতি, বিশ্বদর্শন সব চলে যাবে। তাই এ ব্যাপারে কোনো জাতি কোনোরকম জায়গা ছেড়ে দিতে সহসা রাজি হয় না। আবার বিপরীতে, কোন জাতির ভাষাকে মেরে ফেলতে পারলে, সেই ভাষাহীন জাতিটিকে না মারলেও চলে।’ কলিম খান বলছেন, ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে তার ভিতর কতগুলি বৈশিষ্ট থাকতে হবে। যেমন: ভাষাকে ‘কম্পিউটার ফ্রেন্ডলি হতে হবে’। সেক্ষেত্রে বাংলা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। দ্বিতীয়ত: যে মাস্তান ভাষাগুলোর কথা বলা হয়েছে দেখা যাচ্ছে তাদের গড় বক্তা সংখ্যা প্রায় ছয় কোটির মতো সেখানে বাংলা ভাষার বক্তা সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি। তৃতীয়ত, বাংলা ভাষা স্বভাবের দিক থেকে ‘বহুরৌখিক-ডায়নামিক-ক্রিয়াভিত্তিক।’ বাংলা ভাষার বড় শক্তি তার ভিতরে বিদ্যমান এই গুণগুলি। কাজেই বিশ্বায়নের অদৃশ্য যুদ্ধে বাংলা ভাষা সফলভাবে উত্তীর্ণ হবে ভাষাবিদরা এমনটি আশা করছেন। বাংলা ভাষা বাঙালির আশা।
সূত্র:
১. বাংলা শব্দতত্ত্ব, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২. লাল নীল দীপাবলি, হুমায়ুন আজাদ
৩. পরমা ভাষার সংকেত, কলিম খান
৪. চর্যাপদ, অতীন্দ্র মজুমদার
৫. সুলতানি আমলে বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা, ডক্টর আবু নোমান






















































































































