আয়েশা জাহান-এর লেখা ‘অন্য মানুষে’ বইটি প্রথাগত কাঠামোতে লেখা কোনো আখ্যান নয়, এটি মূলত মানুষের মনস্তত্ত্ব, একাকীত্ব, প্রেম ও অস্তিত্বের যন্ত্রণা নিয়ে লেখা এক গভীর আখ্যান।
বইটিতে নির্দিষ্ট কোনো নিটোল গল্প নেই, আবার আছেও। বইটির কাহিনি মূলত কতিপয় খণ্ডিত চরিত্র এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের গল্প।
বিভাস ৩২ বছর বয়সী একজন গায়ক ও সুরকার, যে নির্জনতার খোঁজে গ্রামে যায়। সেখানে তার পরিচয় হয় বিচিত্রার সঙ্গে, যে কিনা একা থাকে, নীরব ও নির্জন জীবনযাপন করে বলা যায়। বিচিত্রা প্রেম ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত দর্শন লালন করে। সে মনে করে সম্পর্কে জড়ালে তার নিজস্ব সত্তা ও আনন্দ উপভোগের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাবে, তাই সে বিভাসকে তার জীবনে প্রবেশ করতে নিষেধ করে দেয়।
বিভাসের বন্ধু অরিমা একজন লেখক, যে সমাজের আরোপিত সম্পর্ক ও সামাজিকতার ভার নিতে রাজি নয়। সেও একাকীত্ব উপভোগ করে। অন্যদিকে সুদিবা নারী-পুরুষের লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও সমাজসৃষ্ট দ্বন্দ্বের তীব্র সমালোচক। সে একা থাকাকেই নারীদের ক্ষমতায়নের পথ বলে মনে করে।
বিভাসের আরেক পরিচিত তমসা ইশকুল শিক্ষক, যে নিজের জীবনের প্রত্যাখ্যান ও আবেগের আঘাত থেকে বাঁচতে পুরুষদের মনস্তত্ত্ব ও ভালোবাসার গভীরতা মাপার জন্য একটি অদ্ভুত স্কেল তৈরি করেছে।
যূথিকা ৩৫ বছর বয়সি একজন লেখক, যে নিজের আত্মবিশ্বাস ও একাকীত্বের মাঝেই জীবনের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছে।
৪০ বছর বয়সি অদিতি সমাজের কোনো উৎসব বা প্রথা পালন করে না। সে অত্যন্ত সচেতনভাবে ও প্রশান্তির সঙ্গে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয় এবং শেষপর্যন্ত এক পূর্ণিমার রাতে সম্পূর্ণ একা, স্নিগ্ধ পরিবেশে মৃত্যুকে বরণ করে।
‘অন্য মানুষে’ বইটিতে আছে পাঠকের, অর্থাৎ যেইসব পাঠক বইটাকে নিতে পারবে, তাদের চিন্তায় তীব্র আঘাত করবার মতো রসদ, যা তাদের নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে।
বইটির ছত্রে ছত্রে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের উদ্ধৃতি-সহ নানা দার্শনিকতা রয়েছে। লেখক প্রেমের চেয়ে প্রেমিকা বা প্রেমিকের মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
‘অন্য মানুষে’ বইটিতে আছে পাঠকের, অর্থাৎ যেইসব পাঠক বইটাকে নিতে পারবে, তাদের চিন্তায় তীব্র আঘাত করবার মতো রসদ, যা তাদের নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে
বইয়ের প্রতিটি নারী চরিত্র যথা বিচিত্রা, অরিমা, সুদিবা, তমসা, যূথিকা, অদিতি প্রবল বুদ্ধিবৃত্তিক আর ছকভাঙা। তারা সমাজের চিরাচরিত প্রেমময়ী, আত্মত্যাগী নারী রূপের বাইরে গিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব, একাকীত্ব ও স্বাধীনতাকে উদযাপন করেছে। সম্পর্ক তাদের কাছে নির্ভরতা নয়, বরং কখনো কখনো নিজস্বতা হারানোর ভয়।
একাকীত্ব যে কোনো অভিশাপ নয়, বরং আত্ম-আবিষ্কারের সবথেকে বড়ো অস্ত্র, বইটি যেন তারই বিশদ ভাষ্য। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের অসাড়তা এবং নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়ার গভীরতা বইটির মূল শক্তি।
সাধারণ পাঠকের কাছে বইটি অতিরিক্ত সংলাপনির্ভর বা ভাষণধর্মী মনে হতে পারে। কাহিনির গতিশীলতার চেয়ে চিন্তার বিস্তার বেশি হবার কারণে যারা প্লটনির্ভর গল্প পড়তে পছন্দ করেন, তাদের এই বই না পড়াই ভালো।
এই জাতীয় দর্শন-নির্ভর ফিকশন বিশ্বসাহিত্যে নতুন না হলেও, বাঙলা সাহিত্যে এই মাত্রায় মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ বেশ সাহসী একটি উদ্যোগ।
মিলান কুন্ডেরার ‘দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং’ উপন্যাসে যেমন প্রেম, যৌনতা ও দর্শনের এক অদ্ভুত মিশেল রয়েছে, ‘অন্য মানুষে’ বইটিতেও তমসা বা বিচিত্রার চরিত্রগুলি প্রেমকে কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং চরম বুদ্ধিবৃত্তিক আর যৌক্তিক জায়গা থেকে বিচার করেছে।
ভার্জিনিয়া উলফের ‘দ্য ওয়েভস’ বা ‘টু দ্য লাইট হাউজ’ বইতে মানুষের ভেতরের চিন্তার স্রোত যেভাবে উঠে আসে, আয়েশা জাহানও তাঁর বইয়ে চরিত্রের ভেতরের ভাবনাগুলিকে বাইরের ঘটনার চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। বিশেষ করে একাকী নারী চরিত্রগুলির আত্মানুসন্ধান উলফের নারী চরিত্রগুলির মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার সমান্তরাল।
এমন অনেক ফিকশন বিশ্বসাহিত্যে আছে, আমি মুহূর্তেই মনে পড়ল এমন দুটোর সঙ্গে তুলনা দিলাম। এমন আপাত আখ্যানরহিত দার্শনিক-মনস্তাত্ত্বিতক আখ্যান আমিও একটা লিখেছি। ‘সমুদ্রের দিকে’ আমার বইটার নাম। তবে আরো অনেক ব্যাপার আছে। যাইহোক, আরেকজনের বই নিয়ে বলতে গিয়ে নিজের বইয়ের ঢাক আর না বাজাই।
লেখক আয়েশা জাহানকে আমি কয়েকমাস আগে আবিষ্কার করেছি, ফেইসবুকে। তার নামে একটা পেইজ তার বইয়ের বিজ্ঞাপন আমার হোম ফিডে শো করছিল। বইয়ের বিজ্ঞাপনের সঙ্গে বই থেকে গুরুগম্ভীর দার্শনিক কোটেশন পড়ে কৌতূহল তৈরি হয়। তার বই সংগ্রহ করে পড়ি। তার প্রায় সব বই মানে ৫/৬টা বই আমি পড়েছি। সব বইই এই ধারার। আমি একটা বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখতে চেষ্টা নিলাম।
বইয়ের ফ্ল্যাপ থেকে জানা যায়, এই লেখকের বয়স এখন ৩৩ বছর। বই প্রকাশিত হচ্ছে আরও ছয় সাত বছর আগে থেকে। এটাই আমার কাছে আশ্চর্যের, যা বাঙলাদেশের মতো ‘মধ্যপ্রাচ্যে’র একটা দেশে বিরল।
আয়েশা জাহানের জন্য ভালোবাসা।



























































