ছোটগল্প নিয়ে বাংলাদেশে যে কয়েকজন লেখক বেশ নিরীক্ষা করেন, তাদের একজন অলাত এহ্সান। তার গল্প যে ‘ক্লাসিক সাহিত্যের’ কাতারেই পড়ে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
গত চার-পাঁচ বছরে পড়া বইয়ের মধ্যে তরুণ লেখকদের যদি কিছু এক্সপেরিমেন্টাল (নিরীক্ষাধর্মী) কথাসাহিত্যের নাম নিতে হয়, তাহলে আমার চেনাজানার ভেতর কয়েকটা বইয়ের নাম আসবে। তার মধ্যে আছে— মোজাফ্ফর হোসেনের ‘নো ওম্যান’স ল্যান্ড’ ও ‘মানুষের মাংসের রেস্তোরাঁ’; মুরাদুল ইসলামের ‘পলায়নপর’, আশান উজ জামানের ‘বা অথবা কিংবা’ ইত্যাদি। উপন্যাসের ভেতর আসে এনামুল রেজার ‘চায়ের কাপে সাঁতার’, মুরাদ কিবরিয়ার ‘প্রেম প্রার্থনা মৃত্যু’ ও ‘নিনাদ’; মাহরীন ফেরদৌসের ‘জলজ লকার’; হামিম কামালের ‘জাদুকরী ভ্রম’ ইত্যাদি। ঠিক তেমনি চলে আসে অলাত এহ্সানের ‘অনভ্যাসের দিনে’ ও ‘বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি’ গল্পগ্রন্থ দুটির নাম।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির, মাহমুদুল হকের মতো লেখকরা যেমন শক্তিশালী গল্পকার; তাঁদের পরে এসেছেন শাহাদুজ্জামান, ইমতিয়ার শামীম, মামুন হুসাইন, প্রশান্ত মৃধাসহ অনেকেই। তাঁদের পরেও বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্প সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হয়েছে এবং হচ্ছে। তাদেরই একজন অলাত এহ্সান বললে অত্যুক্তি হবে না।
প্রথমেই স্বীকার করে নিই, অলাত এহ্সানের বই নিয়ে বিশদে আলোচনা করার মতো পাঠের অভিজ্ঞতা আমার নেই। আমি পুরোদস্তুর একজন গল্প শুনিয়ে। গল্প শুনতে ভালোবাসি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কথা বলা যেতে পারে।
অলাত এহ্সানের গল্প আমার কাছে মনে হয়েছে— খুব বেশি সহজ সাধারণ নয়! এর জন্য অবশ্যই মনোযোগী শ্রোতা হওয়া আবশ্যক। জটিল তাঁর গল্পের গতিপথ, চরিত্রের ভেতরও দেখা যায় মনস্তাত্ত্বিক অস্পষ্টতা। কখনো জাদুবাস্তববাদ, ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব কিংবা মার্কসীয় দর্শন তাঁর বিভিন্ন গল্পেই দেখা যায়। গল্পের চরিত্ররা কখনো নির্বিকার, অসম্ভব নীরব কিংবা খুব হতাশ, বিষণ্ণ।

by অলাত এহ্সান
প্রচ্ছদ: পরাগ ওয়াহিদ, প্রকাশক: জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, মূল্য: ৪০০ টাকা
আলোকচিত্র: সৈয়দ আশরাফুল আলম
সংগ্রহের লিংক: www.rokomari.com/book/454550
‘নাজিবউদ্দিন রোডের পাশে অপেক্ষমান ছেলেটি’ গল্পটার কথাই ধরা যাক। প্রতীকী গল্প। যে গল্পে এক মা নীরবে তাঁর কাজ করে যান, কিন্তু তিনি কথা বলেন না। একটা পাহাড়ি মোরগ ‘উড়িলাল’কে সুতা দিয়ে ছোট্ট ছেলেটির পায়ের আঙুলে বেঁধে দেয়া যেন তার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণকেই ইঙ্গিত করে। শেষে একটা প্রিজন ভ্যান থেকে বয়সি লোকটা ছেড়ে দিয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায়। মানে আমরা ছোটবেলা থেকেই যে সিস্টেমের ভেতর বেড়ে উঠি, যেখানে জন্মাই, সেখানকার বন্দিত্বের দশা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রেই একদিন মেনে নিই। যেমন দেখা যেতে পারে তাঁর বহুল আলোচিত ‘কয়েকটি কাঠগোলাপ’ গল্পে। একজন ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষ শেষ পর্যন্ত পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়।
‘মিজানের ইঁদুর-বিড়াল গল্প’-এ আমরা দেখতে পাই মিজান নামের এক মানুষের জীবনের গল্প। সহজ-সাধারণ মানুষের আবার কি গল্প থাকতে পারে! মিজান বই পড়ুয়া হলেও সে একসময় আর বই পড়ে না। প্রবাসে চলে যায়। সেখানে প্রথমে সে ইঁদুর পালে, পরে বেড়াল। যা কি না একই সঙ্গে মানুষের ভেতরের দুটি বিপরীত দিকের অবস্থানকেই তুলে ধরে হয়তো। সংসারের টানাপোড়েনও আমরা একসময় দেখি। আমরা আরও দেখি কিভাবে একটা মানুষ অনিয়ন্ত্রিত হতে পারে নিঃসঙ্গতা আর সমাজের ‘বিকৃত নৈতিকতার’ জেরে।
অলাত এহ্সানের দ্বিতীয় এই বইয়ে আমার সবচাইতে ভালো লেগেছে যে গল্পটি, তা হলো ‘মুশার মা আমাদের আত্মীয় হতেন’। এই গল্পে এসেছে লোকাল ফোকলোরের কথা, গ্রামীণ আঁকরের কথা। মুশার মা এক প্রৌঢ়া, অসাধারণ কেউ নন। তাঁর সাধারণ, স্বাভাবিক গ্রাম্য কুসংস্কার, বিশ্বাস এক গাছের খণ্ডের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। গ্রামের মানুষের কুসংস্কারচ্ছন্ন আর অহেতুক ভয় ইত্যাদি জন্ম দেয় নিষ্ঠুরতার। বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য জন্ম হয় অতিপ্রাকৃত গল্পের। মুশার মা আমাদের বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালি’র সেই আতুরি বুড়ি, যাঁকে গ্রামের লোকজন অহেতুক ভয় পেত, আর বিভিন্ন গল্প বানিয়ে চলত।
‘ষষ্ঠ দরজার ওপাশে’ গল্পের বাবা চরিত্রটি একদিন হুট করে তাঁর ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন। শত চেষ্টা করেও বাবাকে ভেতর থেকে বের করা যায় না। একদিন দরজা ভেঙে দেখা যায় তার ঘরের ভেতর ইটের গাথুনি তুলে দিয়েছেন। এই সবকিছুই স্বাভাবিক যেন মেনে নেন গল্পের বাকিরা, এমনকি মা-ও। বাবাকে ছাড়াই তারা জীবন শুরু করে। শুধু গল্পের ছেলেটিই বাবার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। আমাদের মনে হতে পারে, তিনি জীবন থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন কিংবা গভীরতম হতাশায় নিমজ্জিত কোনো মানুষ। কিংবা এমন ও হতে পারে পুরানো স্মৃতি আর প্রেমকে ধারণ করার এক প্রয়াসে নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মানুষ হারিয়ে যেতে পারে, হয়তো কোনো এক দরজার ওপাশে।
‘বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি’ গল্পগ্রন্থটি বিষয় বৈচিত্র্যে বিস্তৃত। শুধু রাজনীতি বা সামাজিক বাস্তবতাই মুখ্য নয়, বরং প্রেম, নস্টালজিয়া, ম্যাজিক রিয়ালিজম তার গল্পগুলোতে উঠে এসেছে
আরেকটি গল্প নিয়ে সামান্যই আলাপ করব। সেটা হচ্ছে গল্পগ্রন্থের নাম গল্প ‘বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি’।
গল্পের কথক একজন চাকরি হারানো যুবক। ঢাকায় বন্ধু তহিদুলের বাসায় উঠেছে। এক সন্ধ্যায় সে যায় ধানমন্ডির একটি অদ্ভুত বার-কাম-কফি হাউসে। নাম ‘নেক হেড বার’। সেখানে সে দেখে— অনেক বয়স্ক পুরুষ, বুড়ো প্রায়, বছরের পর বছর ধরে সেখানে বসে আছে। তারা মদ খায়, তাস খেলে, ক্রিকেটে বাজি ধরে। কিন্তু বাস্তবে তারা হারেও না, জেতেও না। সবাই একজন নারীর জন্য অপেক্ষা করছে। এই নারীকে সবাই ভিন্নভাবে দেখে— কেউ বলে সে দেবী, কেউ হুর, কেউ অড্রে হেপবার্ন, কেউ প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকা; কিন্তু কথক তাকে দেখে ‘টিফানি নারী’ হিসেবে।
আসলে আমরা ধীরে ধীরে দেখতে পারি, এই নারী আসলে কফি হাউসের মালিকের বানানো এক মিথ বা ফাঁদ। তিনি মডেল হিসেবে বসে থাকেন। পুরুষদের আসক্তি, কামনা ও অপেক্ষাকে পুঁজি করে। টাকা ও জীবন দুটোই শুষে নেয়া হয়।
গল্পের এক পর্যায়ে কথক তাকে সেখান থেকে ‘উদ্ধার’ করতে চায়। শেষে তাকেই মারধর করে ফেলে দেয় বার-কাম-কফি হাউসের লোকেরা। বুড়োরা কিছুই করে না। কথক হাসপাতালে জ্ঞান ফেরায় সবাই বলে— ‘এটা তো শহরের পৌরাণিক গল্প, আদৌ ছিল কিনা কে জানে!’ কিন্তু শেষে নার্স জানায়— একজন নারী ফুল দিয়ে গেছে। যার হাতে মোটা পলা। মুখ নৌ-সেনার নারীর মতো নয়। অর্থাৎ— টিফানি বাস্তবও, অবাস্তবও।
‘এটা তো শহরের পৌরাণিক গল্প, আদৌ ছিল কিনা কে জানে!’ এটাই গল্পের প্রধান বক্তব্য। আমরাও দ্বন্দ্বে আক্রান্ত হই। কফি হাউসে বসে ওই নারীকে দেখার অপেক্ষায় বুড়িয়ে যাওয়ার মতো গল্পের শেষের দিকে এগিয়ে যাই!
এ রকম সব মিলিয়ে দশটি গল্প আছে। আমি এই গল্পের বই পড়া শুরু করি গত বছরের (২০২৫) জুলাইতে। গুরুত্বপূর্ণ আর শক্তিশালী বইপত্র, লেখা আমি সময় নিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। তাই বিভিন্ন গল্প বিভিন্ন সময়ে পড়া।
‘বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি’ গল্পগ্রন্থটি বিষয় বৈচিত্র্যে বিস্তৃত। শুধু রাজনীতি বা সামাজিক বাস্তবতাই মুখ্য নয়, বরং প্রেম, নস্টালজিয়া, ম্যাজিক রিয়ালিজম তার গল্পগুলোতে উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ বলতেই একাত্তরের কষ্ট কল্পনা নয়, বরং আজকে দিনে একাত্তর কিভাবে টিকে আছে দেখিয়েছেন ‘পুরোনো ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের রহস্য’ গল্পের মাধ্যমে। দেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধ দেখিয়েছেন অলাত এহ্সান।
দিন শেষে আমরা গল্প শুনতে ভালোবাসি। আমরা গল্প শুনিয়ে। লেখা যখন সরস হয়ে উঠে, সাধারণ ঘটনাও উপস্থাপিত হয় অসাধারণ হয়ে। অতি নিরীহ চরিত্রগুলোকেও আমাদের কাছে বিশেষ বলে মনে হয়, আমরা নিজেদেরও খুঁজে পাই সেসব গল্পে। অলাত এহ্সানের গল্প আমাদের সেই অভিজ্ঞতা এনে দেয়, অত্যন্ত উপভোগ্য করে।




























































