৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানচিত্রের বাইরে মানুষের দেশ: ‘সুবর্ণপুরাণ’-এ ইতিহাস, স্মৃতি, শ্রম ও স্বদেশের পুনর্নির্মাণ
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
সৈকত আরেফিন
গল্পকার, প্রাবন্ধিক
137

সৈকত আরেফিন
গল্পকার, প্রাবন্ধিক

137

‘সুবর্ণপুরাণ’-এ ইতিহাস, স্মৃতি, শ্রম ও স্বদেশের পুনর্নির্মাণ

মানচিত্রের বাইরে মানুষের দেশ

খাসনগরের অতিকায় দিঘির বা মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র-লাক্ষ্যা-ধলেশ্বরীর জল ছুঁয়ে আসা ভেজা হাওয়ায় বাঁশের আড়ায় শুকোতে থাকে এমন এক সুতো, চোখে পড়ে না বললেই চলে। ধানের খৈ আর চুনগোলা মাড়ে ভিজিয়ে, ছায়ায় মেলে রেখে, জল-হাওয়ার সঙ্গে মানুষের আঙুলের ধৈর্য মিশিয়ে তাকে প্রস্তুত করা হয়। উপন্যাসের ভাষা তখন হঠাৎ বলে ওঠে—‘ওগুলো সুতা নয় যেন আলোর তন্তু!’ (পারভেজ ২০২৩: ১১)। আলোর তন্তু! মসলিনকে এর চেয়ে সুন্দর আর কী নামে ডাকা যায়?

কিন্তু পারভেজ হোসেনের সুবর্ণপুরাণ পড়তে পড়তে খুব দ্রুতই আমরা বুঝে যাই, এই আলো একাকি আসে না। এর পেছনে আছে সুতাকাটুনি মেয়েদের নিবিষ্ট চোখ, তাঁতির ঝুঁকে থাকা শরীর, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুখে-মাথায়-আঙুলে বহন করে আনা জ্ঞান, আর এমন এক দীর্ঘ সময় যার কোনো চিহ্ন শেষ পর্যন্ত কাপড়টির গায়ে লেগে থাকে না। একখানা বেগমখাস বুনতে আট মাস লাগে; কাপড়টি রয়ে যায়, মানুষের জীবন থেকে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে যায় দুশো চল্লিশ দিন।
আর এখান থেকেই সুবর্ণপুরাণ পাঠের সবচেয়ে ফলপ্রসূ দরজাটি খুলে যেতে থাকে।


মানচিত্রের বাইরে

একটি দেশকে মানচিত্রে দেখা যায়। সোনারগাঁ কোথায়, ঢাক্কা কোথায়; মেঘনাদ, ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী, লাক্ষ্যা কোন পথে বয়ে গেছে; কোন দুর্গ কার হাতে, কোন রাজধানী কখন সরল—সবই মানচিত্রে ধরা সম্ভব। কিন্তু মানচিত্র জানে না একটি মসলিনে কত মাসের জীবন জমা থাকে। জানে না লাক্ষ্যার নির্জন চরে অর্ধেক কাদায়, অর্ধেক জলে পড়ে থাকা অচেনা এক মেয়েকে দেখে কেউ একদিন বলেছিল—‘এ আমার মেয়ে।’ (পারভেজ: ১৮৯)। জানে না কোনো নারী কেন কোমরে বিষমাখা গুপ্তি রাখে। জানে না একজন বিদেশি নাবিক ঠিক কোন মুহূর্তে আবিষ্কার করে, অন্য মানুষের বিপদকে দূর থেকে দেখে চলে যাওয়ার অধিকারটি সে হারিয়ে ফেলেছে।

মানচিত্র ভূখণ্ডের আয়তন জানে, মানুষের জীবনের ভার জানে না। পারভেজ হোসেনের সুবর্ণপুরাণ সেই অমাপনীয় ভারের উপন্যাস।

ফলে একে পড়তে গিয়ে মনে হয়, উপন্যাসকার ইতিহাসের আরেকটি মানচিত্র আঁকেন না; বরং যেন ক্রমাগত ইতিহাসের একটি বস্ত্র বুনে চলেন। তার এক পিঠে রাজা, সাম্রাজ্য, যুদ্ধ, বন্দর, বাজার, মসলিনের ঐশ্বর্য; উল্টো পিঠে সেলাইয়ের গিঁটের মতো লেগে আছে শ্রম, ক্ষত, ভয়, প্রেম, স্মৃতি, নির্বাসন এবং এক মানুষ আরেক মানুষকে ‘আপন’ বলে চিনে নেওয়ার ক্ষুদ্র অথচ অমোচনীয় মুহূর্তসমূহ।

মানচিত্র উপর থেকে দেখা হয়। বস্ত্র তৈরি হয় হাতের কাছে। এই দুই দেখার মাঝখানে নিভৃতে সুবর্ণপুরাণ-এর সাহিত্যিক অঞ্চলের গোড়াপত্তন ঘটে যায়।


মহাকাব্যের আলো, দিনলিপির অস্বস্তি

ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে শুরু থেকে সুবর্ণপুরাণ-এ একটি কৌতূহলোদ্দীপক খেলা দেখতে পাই। ‘শুরুর আগে’ অংশে রাফায়েলের দিনলিপি আবিষ্কারের যে আকরকথা নির্মিত হয়, তাকে ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে নেওয়া চলে না; সেটি উপন্যাসেরই নির্মিত উৎস-কল্পনা। কিন্তু প্রকৌশলটি গুরুত্বপূর্ণ। কথাশিল্প যেন এখানে দলিলের পোশাক পরে আমাদের সামনে আসে—এবং তারপর প্রশ্ন করতে শুরু করে, দলিলই কি ইতিহাসের একমাত্র স্মৃতি?

এই প্রশ্ন আরও গভীর হয় যখন পাশাপাশি এসে দাঁড়ায় দুটি লেখা—পর্তুগিজ জাতীয় মহাকাব্য উজ লুজিয়াদাস এবং ফ্রান্সিস রাফায়েলের ব্যক্তিগত দিনলিপি। একদিকে জাতির মহাকাব্য। অন্যদিকে ব্যক্তির অস্বস্তি।

জাতীয় মহাকাব্যের এক মৌল প্রয়োজন—বিচ্ছিন্ন মৃত্যু, ভয়, রক্তপাত, ঝুঁকি, বিপর্যয়কে একটি বৃহৎ অর্থে সংগঠিত করা। সমুদ্রযাত্রা তখন সাহস; অজানা পথে পৌঁছানো আবিষ্কার; নতুন ভূখণ্ডে উপস্থিতি বিস্তার; প্রাণহানি বিজয়ের মূল্য। জাতীয় স্মৃতি ছিন্ন ঘটনাকে একটি মহৎ গল্পে বাঁধে।

রাফায়েলের দিনলিপি সেই গল্পের মধ্যে প্রথমে একটি খুব ক্ষুদ্র, পরে ক্রমশ গভীর হতে থাকা চিড়। নিজ জাতির ভবিষ্যৎ স্মৃতি বিষয়ে সে প্রত্যাশা করে: ‘সব অন্যায়, সব অত্যাচার; হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের সকল কথা একদিন ভুলে যাবে পৃথিবীর মানুষ।’ (পারভেজ: ৩২)। তারপর তার আশাবাদ আরও দৃঢ়তা পায়। সে ভাবে, একদিন সবাই বিশ্বাস করবে, পর্তুগিজদের সমস্ত অর্জন তাদের ‘বাণিজ্য’ এবং ‘বীর নাবিকদের বুদ্ধিমত্তা, শ্রম আর সাহসিকতার ফসল’ (পারভেজ: ৩৩)

রাফায়েলের ভয় আর আশাবাদ কেবল বিস্মৃতির নয়। হয়তো আরও ভয়ংকর কিছুর—ঘটনার নাম বদলে যাওয়ার। তখন দখলের নাম আবিষ্কার হতে পারে, প্রভুত্বের নাম সভ্যতা, লুণ্ঠনের নাম বাণিজ্য।

আর বহু বছর পরে এমনও হতে পারে, যার শরীরে ক্ষত ছিল সে ইতিহাসের বাইরে চলে গেছে, কিন্তু যে ক্ষতটি দিয়েছিল তার নাম ইতিহাসে গৌরব হয়ে টিকে আছে। ক্ষমতার সবচেয়ে সূক্ষ্ম ক্ষমতা হয়তো এখানেই—সে শুধু ঘটনা ঘটায় না; অনেক সময় ঘটনার অভিধানও তৈরি করে।

আবু ইবনে আল আসাদের একটি বাক্য তাই রাফায়েলের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পৃথিবীতে প্রথম বড় অসুবিধাটি ঘটায়: ‘বাণিজ্যটা ছিল ওদের মুখোশ’ (পারভেজ: ২৪)। কথাটি কোনো ইতিহাসবিদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; উপন্যাসের একজন চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি। অথচ সাহিত্যিকভাবে তার কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন যে কাহিনিতে রাফায়েলের জাতি ছিল দুঃসাহসী সমুদ্রযাত্রীর জাতি, আবু ইবনে আল আসাদ সেই গল্পটিকে উল্টে ধরে দেখান—এর অন্য পাশে কারও পিঠে ক্ষত থাকতে পারে।

তবে সুবর্ণপুরাণ যদি এখানেই থামত, তার ইতিহাসবোধ অনেক সরল হয়ে যেত। কেননা উজ লুজিয়াদাস-এর ভেতরেও সাম্রাজ্যবাদী গৌরবের বিরুদ্ধে আত্মসমালোচনার দীপ্তি আছে। আবু ইবনে আসাদ নিজেই কামোঁইশের সেই উচ্চারণ স্মরণ করেন—‘হে গর্ব ও ক্ষমতা! খ্যাতির দম্ভের জন্য হে নিরর্থক লালসা! হে অন্তঃসারহীন নিজেকে ফুলানো অহংকার, যাকে গণসঙ্গীতে ডাকা হয় সম্ভ্রম আর মর্যাদা বলে!’ (পারভেজ: ৩৬)

ফলে দ্বন্দ্বটি তখন আর ‘মিথ্যা মহাকাব্য বনাম সত্য দিনলিপি’র নয়। বরং এক ধরনের লেখা জাতির গৌরবকে সংগঠিত করে; অন্য ধরনের লেখা সেই সংগঠনের ভেতরে অস্বস্তি রেখে দেয়।

আর এখানে, সুবর্ণপুরাণ-এ সেই অস্বস্তিই শেষ পর্যন্ত রাফায়েলকে নিজের দিকে ফেরায়। মালাক্কায় নিজের পরিবারের ধর্মপ্রচারের ইতিহাস ভাবতে গিয়ে রাফায়েল প্রশ্ন করে: ‘এও কি একধরনের কর্তৃত্ব বা প্রভুত্ব নয়? মালাক্কাবাসী কি আমাদের আহ্বান করে এনেছে? শাসনক্ষমতায় থেকে নিজেদের ধর্ম প্রচার কি আর একটা জনগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বিস্তার নয়?’ (পারভেজ: ৩৩) এই প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ধর্ম নয়; নিজেকেও প্রশ্নের মধ্যে টেনে আনা।

এতদিন পর্তুগিজ আগ্রাসন ছিল ইতিহাসের একটি বিষয়—অন্যদের করা অন্যায়। এবার রাফায়েলের দৃষ্টি ঘুরে আসে নিজের ঘরে: ‘আমার দাদা, বাবা’, ‘আমি, আমার ভাই’—অর্থাৎ বিচারকের নিরাপদ আসন থেকে সে নিজেকেই নামিয়ে আনে বিচারের পরিসরে। অন্যায় সম্পর্কে নৈতিক হওয়া সহজ, যতক্ষণ অন্যায়টি অন্য কেউ করছে। কঠিন মুহূর্ত আসে তখন, যখন সেই একই প্রশ্ন নিজের উত্তরাধিকার, নিজের সুবিধা, নিজের পরিবারের ইতিহাসের দিকেও ফিরে আসে।

রাফায়েলের নৈতিক-যাত্রা আসলে এখানেই শুরু—অন্যের ইতিহাস বিচার করা থেকে নিজের ইতিহাসের ভেতর দাঁড়িয়ে নিজেকেও বিচার করার মুহূর্তে। তখনও সে ভাটি বাংলার মানুষ নয়। কিন্তু আগের মানুষটিও আর নয়। তখন তার নিজের ইতিহাসের আয়নায় প্রথম চিড় ধরেছে।

এই ইতিহাসবোধের আরেকটি বিপরীত উৎস উপন্যাসে লোকস্মৃতি। বেহুলা-মনসার কাহিনি বলতে বলতে আবু ইবনে আল আসাদ প্রশ্ন করেন—‘একি শুধুই একটা জনপদের কল্পকথা? নাকি ওই জনপদের মানুষদের গোটা জীবনের লড়াইয়ের গল্প?’ (পারভেজ: ১৯-২০)। প্রশ্নটি উপন্যাসের নামের ‘পুরাণ’ শব্দটিকেও অন্য আলোয় নিয়ে আসে। পুরাণ এখানে ইতিহাসের প্রতিপক্ষ নয়।

দলিল তারিখ মনে রাখে; লোককথা কখনো মনে রাখে ভয়। রাজা দলিল মনে রাখে; গান মনে রাখতে পারে অপেক্ষা। দলিল যুদ্ধের ফল লিখে রাখে; মানুষের মুখে মুখে চলা গল্প যুদ্ধের পরে ঘরের ভেতর বেঁচে থাকা দীর্ঘ শোক বহন করতে পারে।

লোকস্মৃতি অবশ্য নিষ্পাপ সত্য নয়; স্মৃতিও নির্বাচন করে, অতিরঞ্জিত করে, মূল্যবোধ বহন করে। কিন্তু সুবর্ণপুরাণ-এর শিল্পকৌশল এখানে স্বতন্ত্র এজন্য যে, সে একটিকে অন্যটির পরিপূরক করতে চায় না। মহাকাব্য, দিনলিপি, লোকশ্রুতি, শরীর, বস্ত্র—সবগুলোকে পরস্পরের পাশে রেখে জিজ্ঞেস করে: মানুষের অতীত মূলত কোথায় থাকে?

পারভেজ হোসেন
সুবর্ণপুরাণ, পারভেজ হোসেনের উপন্যাস • প্রচ্ছদ: সব্যসাচী মিস্ত্রী, প্রকাশক: সংবেদ, ঢাকা—২০২৩। ছবি: মুম রহমান


আলোর তন্তু, ঘামের বয়ন

এই প্রশ্নের সবচেয়ে স্পর্শযোগ্য উত্তর এসে ধরা দেয় মসলিনে। তাঁতিপাড়ায় শুকোতে দেওয়া সেই প্রায় অদৃশ্য সুতোর দিকে তাকিয়ে উপন্যাসের ভাষা সেই যে বলে উঠেছিল—‘ওগুলো সুতা নয় যেন আলোর তন্তু!’ (পারভেজ: ১০)

‘আলোর তন্তু’—উপমাটি কেবল মসলিনের সূক্ষ্মতাকে দৃশ্যমান করে না, প্রায় অলৌকিকও করে তোলে। মানুষের হাতে তৈরি একটি বস্তু যেন মুহূর্তের জন্য তার বস্তুত্ব হারায়; সুতো আর সুতো থাকে না, আলো হয়ে ওঠে। কিন্তু সুবর্ণপুরাণ সেই আলোয় আমাদের চোখকে বেশিক্ষণ আবিষ্ট থাকতে দেয় না। আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমরা এর অন্তরালের ‘হাত’টিকে দেখে ফেলি।

হাফিজুদ্দিন মসলিনের কথা বলতে গিয়ে সুতাকাটুনি মেয়েদের নিবিড় অভিনিবেশের কথা বলেন, চোখে প্রায় ধরা পড়ে না এমন সুতো কাটার দক্ষতার কথা বলেন, তাঁতিদের দীর্ঘ পরিশ্রমের কথা বলেন। শেষে সে বলে, ‘তাদের শ্রমে-ঘামে-নিষ্ঠায় বোনা এই বস্ত্র’ (পারভেজ: ৪৪)

তখন আমরা মসলিনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দুটি পৃথিবীকে দেখতে পাই। একটিতে—আলো। অন্যটিতে—ঘাম। কিন্তু এরা পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং দ্বিতীয়টিকে না দেখলে প্রথমটির সত্য সম্পূর্ণ হয় না। যে তন্তুকে চোখ আলো বলে ভুল করে, সেই তন্তুর মধ্যে আসলে মানুষের আঙুল, মনোযোগ, দক্ষতা এবং ব্যয়িত সময় বোনা থাকে। মসলিনের সৌন্দর্য তাই শ্রমকে আড়াল করে না; বরং শ্রমকে ভুলে গেলে সেই সৌন্দর্য সম্পর্কেই আমাদের জানা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ফলে তখন সুবর্ণপুরাণ-এর মসলিন আর কেবল কোনো কিংবদন্তিতুল্য শিল্পবস্তু থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে দৃশ্যমান ঐশ্বর্যের মধ্যে অদৃশ্য মানুষের উপস্থিতি পাঠ করার একটি উপায়।

গৌরীপ্রসাদের তাঁতঘরে গিয়ে এই উপলব্ধি আরও গভীর হয়। সেখানে রাফায়েল দেখে, একখানা বেগমখাস প্রায় আট মাস ধরে বোনা হচ্ছে। চারপাশে রং, মাড়, চরকা, শুকোতে থাকা সূক্ষ্ম সুতা; তালপাতায় আঁকা নকশা; আবার সেই নকশা তাঁতে তোলার এমন জটিল হিসাব, যা শিষ্য গুরুর কাছ থেকে প্রায় ‘মন্ত্র’-এর মতো আত্মস্থ করে নেয়। গৌরীপ্রসাদ বলে, ‘এগুলার গায়ে এই যে দ্যাখতেছেন লৌয়ার কাঁটা দিয়া আঁকা। পরথমে কাঁচা পাতার উপ্রে মায়াময়ী আর সোনাময়ী নিজের হাতে আঁকছে। অঙ্কনের হেই পাতা নুন জলে সেদ্দ করা হৈছে যাতে নষ্ট না অয়। ওদের মা আছিলো মসলিনের গুণী নকশাকার। এ তল্লাটের প্রায় সক্কলেই তার থে নকশা নিত। এহন তো বেশ কয়জন খাড়াইয়া গেছে। এরা সবাই তার শিষ্য-শিষ্যা। তার কাছেই শিখছে। […] এ হৈল গিয়া মোদের পরম্পরা মা জননী।’ (পারভেজ: ১৪৭)

এই দৃশ্যটি মসলিনের সঙ্গে আরেকটি অদৃশ্য উপাদান জুড়ে দেয়—সময়।

একখানা কাপড়ের দাম নির্ধারণ করা যায়। তার দৈর্ঘ্য মাপা যায়। তার সূক্ষ্মতা নিয়ে বিস্মিত হওয়া যায়। কিন্তু তার মধ্যে মিশে যাওয়া আট মাসের মানবজীবনকে কোন দাঁড়িপাল্লায় মাপা যাবে? ক্রেতার হাতে শেষ পর্যন্ত বস্ত্রটি থাকে। আট মাসের অধ্যবসায় হারিয়ে যায়। এখানেই হয়তো শ্রমের এক গভীর ট্র্যাজেডি: ফল দৃশ্যমান থাকে, ব্যয়িত জীবন অদৃশ্য হয়ে যায়। আর সুবর্ণপুরাণ সেই অদৃশ্য জীবনটিকেই আবার দৃশ্যমান করে।

উপন্যাসে মসলিন কেবল ইতিহাসের বিষয় নয়; ধীরে ধীরে তার আঙ্গিকেরও এক প্রতিরূপ হয়ে ওঠে। একটি মসলিন যেমন একটিমাত্র তন্তুর সৃষ্টি নয়, সুবর্ণপুরাণও একটিমাত্র কাহিনির উপন্যাস নয়। পর্তুগিজ স্মৃতি, রাফায়েলের দিনলিপি, ভাটি বাংলার রাজনীতি, লোককথা, নদী, ধর্ম, দাদন, নারী, প্রেম, যুদ্ধ—একটি তন্তু আরেকটির ওপর-নিচ দিয়ে যেতে যেতে আখ্যানের নকশা তৈরি করে।

এবং মসলিনের কারিগরির মতোই এখানে সব জ্ঞানও লিখিত নয়। কিছু জ্ঞান থাকে আঙুলে। কিছু পেশিতে। কিছু কানে। কিছু স্মৃতিতে।

তাঁতির শরীর নকশার হিসেব বহন করে, মাঝির শরীর স্রোতের হিসেব, শিল্পীর শরীর তাল-লয়; আর আক্রান্ত মানুষের শরীর বহন করে এমনকিছু ইতিহাস, যার কোনো রাজকীয় দলিল নাও থাকতে পারে। ফলে শরীরও তখন আর্কাইভ হয়ে যায়।

এখান থেকে মসলিনের সৌন্দর্য একদিন অর্থনীতির প্রশ্নে পৌঁছায়। হাবেলি-সোনারগাঁ চোখধাঁধানো। দালানকোঠা, রাজপথ, বাণিজ্য, সংস্কৃতির সমাবেশ দেখে রাফায়েল মুগ্ধ। অথচ সেই একই দৃষ্টি নদীপথের গ্রামে গিয়ে নগর ও সাধারণ মানুষের জীবনের মধ্যে ‘বড় রকমের অসমতা’ খুঁজে পায়, ‘এত দালানকোঠা, এত চাকচিক্য, এত কৃষ্টির সমাবেশ! সত্যি, তারিফযোগ্য বাণিজ্যের নগরই বটে। কিন্তু নদীপথে গ্রামগুলোকে যেভাবে যতটুকু দেখেছি, মনে হয়েছে সর্বত্রই প্রকৃতির সঙ্গে সহজ-সরলভাবে, স্বচ্ছন্দে মিশে গিয়ে অতি দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন-যাপন করছে মানুষ।’ (পারভেজ: ৯০-৯১)

একটি দেশ তাই একইসঙ্গে ধনী এবং দরিদ্র হতে পারে। প্রশ্ন হলো, কার চোখ দিয়ে তাকে দেখা হচ্ছে। সাম্রাজ্যের হিসেব বলবে কত পণ্য রপ্তানি হলো। রাজদরবার বলবে কোন বস্ত্র কার শরীরে উঠল। বাজার বলবে কত দাম পেল। উপন্যাসটি আরেকটি হিসাব চায়: যে হাত তৈরি করল, তার জীবন কেমন?

‘সুবর্ণ’ তাই সবার শরীরে সমান আলো ফেলে না। হাফিজুদ্দিনের মুখে দাদনের প্রসঙ্গটি এই বৈষম্যকে আরও সূক্ষ্ম করে। ফড়িয়া ও দালালেরা কার্পাসচাষি, তাঁতি, সুতাকাটুনিকে দাদন দিচ্ছে—‘তাদের হাতে রাখছে’ (পারভেজ: ৪৬)

‘হাতে রাখছে’—শব্দবন্ধের মধ্যে যেন অর্থনীতির সম্পূর্ণ একটি অন্ধকার ঘর খুলে যায়। শিকল নেই। প্রহরী নেই। তবু একজন মানুষের ভবিষ্যৎ শ্রমের ওপর আগাম দাবি তৈরি হয়েছে। কামান ভূমি দখল করে। ঋণ মানুষের আগামী সময় দখল করতে পারে। দুটি ক্ষমতা এক নয়; কিন্তু উভয়ের গভীরে মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্তের জায়গা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই সুবর্ণপুরাণ-এ সাম্রাজ্য শুধু যুদ্ধজাহাজে করে আসে না। কখনো বাজারের পথ ধরেও ক্ষমতা মানুষের ঘরে প্রবেশ করে।


শরীরে লেখা দ্বিতীয় ইতিহাস

ভূখণ্ডের যেমন শরীর আছে, শ্রমিকের শরীর আছে তেমনি নারীর শরীরও আছে। সুবর্ণপুরাণ-এ ক্ষমতার ইতিহাস এই তিন শরীরেই আলাদা আলাদা অক্ষরে লেখা হয়।

লাক্ষ্যার চরে যে মেয়েটিকে পাওয়া যায়, তার নাম জানার আগেই তার সামাজিক পরিচয় তৈরি হয়ে যায়। অর্ধেক কাদায়, অর্ধেক জলে পড়ে থাকা শরীর দেখে অনুমিত হয়, সে নিশ্চয় ‘মগ-ফিরিঙ্গির ছোঁয়া’; সমাজে জায়গা নেই, তাই নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে।

এই দৃশ্যটির নির্মমতা শুধু মেয়েটির সম্ভাব্য নির্যাতনে নয়। আরও ভয়ংকর হলো—ঘটনার আগেই যেন সামাজিক রায় প্রস্তুত হয়ে থাকে। তার সঙ্গে কী ঘটেছে, কে ঘটিয়েছে, সে কী চায়—এসবের আগে একটি শব্দ তার ওপর বসে গেছে: ‘ছোঁয়া’। অপরাধীর কাজ আক্রান্ত নারীর পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।

ঠিক এই মুহূর্তে জদ্দন বাঈ বলেন: ‘আজ থেকে এ আমার মেয়ে, একে ঘরে নিয়ে চলো’ (পারভেজ: ১৮৯)

বাক্যটি যত সহজ, কাজটি তত নয়।

এ। আমার। মেয়ে।

প্রথম শব্দে অচেনা শরীর। দ্বিতীয় শব্দে সম্পর্ক। তৃতীয় শব্দে আত্মীয়তা। জদ্দন আয়শার সঙ্গে যা ঘটেছে তা মুছে দেন না; তিনি তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করেন—ঘটনাটিকে আয়শার সম্পূর্ণ পরিচয় হতে দেন না। কেননা মানুষ তার ক্ষতের চেয়ে বড়। এই মানবিক সত্যটি আরও গভীর হয় রুস্তমের মুখে। আয়শা নিজের সম্পর্কে সমাজের ভাষাই ব্যবহার করে—‘মুই মগ-ফিরিঙ্গির ছোঁয়া একটা মাইয়া।’ (পারভেজ: ১৯০) সে জানে সমাজ তাকে নেবে না, রুস্তমকেও না।

রুস্তম বলে: ‘মুই সোমাজের কানুন মানি না। কে কিসের ছোঁয়া বুঝি না। মুই বুঝি তোমারে’ (পারভেজ: ১৯০)। বাক্যটির সবচেয়ে ভারী শব্দটি ‘তোমারে’ নয়, ‘বুঝি’।

রুস্তম আয়শাকে উদ্ধার করতে আসেনি। তাকে ক্ষমাও করছে না—ক্ষমার তো কিছু নেই। সমাজ যে নামটি তার শরীরে সেঁটে দিয়েছে, রুস্তম সেটি সরিয়ে মানুষটিকে দেখতে চায়। ‘মগ-ফিরিঙ্গির ছোঁয়া’—এই পরিচয়ের বিপরীতে তার একটি ‘বুঝি’ যেন বলে: তোমার ওপর যা ঘটেছে, তুমি তার সমান নও।

অথচ আয়শার ভয় তাতেও যায় না। যাওয়ার কথাও নয়। একজন মানুষের স্বীকৃতি প্রেমের আশ্রয় তৈরি করতে পারে; বহুদিনের সামাজিক নিষ্ঠুরতা এক বাক্যে বিলীন হয় না। ফলে প্রেম এখানে মুক্তির চকচকে দরজা নয়—বরং বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষের সাহস।

আয়শার পাশে রওশনকে রাখলে একই ইতিহাসের আরেকটি, আরও আতঙ্কজনক পিঠটি দেখা যায়। আয়শা জানে সহিংসতার পরে কী ঘটে। রওশন যেন তা ঘটার আগেই জানে। তাই তার কোমরে বিষমাখা গুপ্তি। রাফায়েল জিজ্ঞেস করে, ‘এমনটা কেনো রাখো?’ ছোট্ট করে শক্ত জবাব দেয় রওশন, ‘আত্মঘাতী হতে!’ (পারভেজ: ১৬৫)। এই দুই শব্দের সামনে কিছুক্ষণ নীরব থাকা প্রয়োজন। কারণ গুপ্তিটির সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস বিষ নয়। রওশনের ভবিষ্যৎ-জ্ঞান।

সে জানে, কোনো দস্যু বা আক্রমণকারীর হাতে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে গেলেও তার আগের সামাজিক জীবন হয়তো বাঁচবে না। অর্থাৎ সহিংসতা ঘটার আগেই সমাজ তার কোমরে মৃত্যুর একটি সম্ভাবনা ঝুলিয়ে দিয়েছে। আক্রমণকারী নারীর শরীর দখল করতে পারে। আপন সমাজ পরে সেই শরীরটিকে আর আপন বলে স্বীকার না-ও করতে পারে। নারীকে তাই দুটি সহিংসতার মাঝখানে দাঁড়াতে হয়। একটি আক্রমণকারীর। অন্যটি নিজের সমাজের। দ্বিতীয়টির কোনো কামান নেই। কোনো রক্তাক্ত তরবারিও দরকার হয় না। একটি বন্ধ দরজাই যথেষ্ট।

রওশনকে প্রথমদিকে যে চোখে দেখা হয়, সেই চোখ নিয়েও প্রশ্ন আছে। রাফায়েলের দৃষ্টিতে তার চোখ, নাক, কণ্ঠ, দেহভঙ্গি প্রায় অলৌকিক হয়ে ওঠে; তার মনে হয়—‘রূপ হলে তা এমনই হতে হয়!’ (পারভেজ: ১২১)। পুরুষের বিস্মিত দৃষ্টি এখানে স্পষ্ট। কিন্তু রওশন সেই দৃষ্টির ভেতরে বন্দি থাকে না। এবং সম্ভবত এখানেই চরিত্রটি সার্থক হয়ে ওঠে।

জদ্দন বাঈ মেয়েদের শুধু গাইয়ে হিসেবে দেখতে চান না। তাঁর উচ্চারণ—‘ম্যায় গওয়াইয়া চাহতি নহি, ভাইজান। ম্যাঁয় কালাকার চাহতি’ (পারভেজ: ১৩৪)। শিল্প মানে শুধু চটক নয়, অন্তরে ধারণ করা একটি শৃঙ্খলা; আর সেই শিল্পীসত্তাই রওশনকে ধীরে ধীরে রাফায়েলের চোখে দেখা সুন্দরী নারী থেকে নিজের বোধসম্পন্ন মানুষে পরিণত করে। যুদ্ধের সামনে এসে এই রূপান্তর সম্পূর্ণ হয়।

আলাউদ্দিন বাগদাদি তাকে আশ্বস্ত করে নদী-খালের কৌশল, নৌবহরের শক্তি, দুর্গের নিরাপত্তা দিয়ে। রওশন তার বদলে প্রশ্ন করে: ‘দুর্গে গিয়ে ওঠাটাই কি সমাধান?’ (পারভেজ: ১৮১)। যুদ্ধ জিতলেও নগর, ঐশ্বর্য, সাধারণ মানুষের ‘স্বপ্ন, সাধ, সংসার’ কতটা বিলীন হবে, সেই হিসাব সে চায়। যুদ্ধের ইতিহাস সাধারণত জানতে চায়—কে জিতল? রওশন জানতে চায়— জিততে জিততে কী হারালাম? দুর্গ অক্ষত থাকতে পারে, অথচ ঘর শেষ হয়ে যায়।

শাসকের পতাকা টিকে থাকতে পারে, অথচ একটি পরিবারের সমস্ত পৃথিবী পুড়ে যায়। ‘জয়’ শব্দটির মধ্যে মানুষের সব ক্ষতির হিসেব থাকে না। রওশন সেই অনুক্ত হিসেব চায়। আর সেই প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত প্রেমের মধ্যে ফিরে আসে।

বিদায়ের মুহূর্তে সে বলে, ‘এই জীবনে যুদ্ধ বলো, প্রণয় বলো তা কি কেবল ছাই হওয়ার জন্যে?’ (পারভেজ: ১৯৯)। যুদ্ধ ও প্রণয় একই জিনিস নয়। তবু দুটিই মানুষের অস্তিত্বকে তীব্র করে তোলে। মানুষ যুদ্ধ করে কিছু রক্ষা করতে; প্রেম করে কারও কাছে পৌঁছাতে। অথচ কখনো দুটির শেষেই মুঠোয় থাকে তীব্র অনুপস্থিতি অথবা ছাই। রাফায়েল উত্তর দেয় না। উপন্যাসও না। এই না-দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ভালো সাহিত্য সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পাঠককে বিদায় করে না; কিছু প্রশ্ন তার সঙ্গে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।

রওশনকে তাই কেবলই সুন্দর দেখলে রওশনকে দেখা হয় না। তার রেওয়াজ শুনতে হয়। তার কোমরে বিষময় গুপ্তি দেখতে হয়। যুদ্ধের আগে তার উদ্বেগ শুনতে হয়। আর সেই শেষ ‘ছাই’ শব্দটির প্রতিধ্বনি যতক্ষণ শোনা যায়, ততক্ষণ বুঝতে হয়—রাফায়েল প্রথমে যে নারীকে দেখছিল, একসময় সেই নারীই তার দেখার পদ্ধতি বদলে দিয়েছে।

যখন সমাজ যে মানুষটিকে তার ক্ষতের নামে ডাকতে চায়, অন্য একজন তাকে বলে—আমি তোমাকে বুঝি। যখন একজন নারী যুদ্ধের বিজয়ের আগে সাধারণ মানুষের স্বপ্নের হিসেব চায়। যখন একজন বিদেশি তরুণ নিরাপদ জাহাজের পথ ছেড়ে বিপদের দিকে নৌকা ঘুরিয়ে দেয়। …তখন সম্ভবত দেশ মানচিত্র থেকে সরে মানুষের ভেতরে প্রবেশ করে


নদী যে ভূগোল শরীরে লিখে রাখে

ভাটি বাংলার সবচেয়ে নীরব অথচ সর্বব্যাপী চরিত্র নদী। মেঘনাদ, ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী, লাক্ষ্যা—এরা পটভূমি নয়। জীবনব্যবস্থা। মসলিনের সুতা এদের জল-হাওয়া চায়। বাজার এদের বুক দিয়ে চলে। দস্যু আসে নদীপথে। নৌবহর যুদ্ধ করে নদী ধরে। প্রেমিক বিদায় নেয় জলপথে। একটি সমাজের জীবনপ্রবাহ যেন আক্ষরিক অর্থেই নদীর সঙ্গে গাঁথা।

কিন্তু নদীর সবচেয়ে গভীর তাৎপর্য তার সৌন্দর্যে নয়। তার জ্ঞানে। দূরযাত্রার মাঝিরা জানে কখন রাতের অন্ধকারে লাক্ষ্যা দিয়ে বেরোতে হবে, কোথায় ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে পদ্মাবতীতে পড়তে হবে, কখন ‘বাতাসের ভাও বুঝে’ পাল খাটাতে হবে, কখন উজানে দাঁড় টানতে হবে (পারভেজ: ১৮৭)। নাইয়া প্রধান জুলমত গাজী আবার ভরা কটালের স্রোত দেখে আগাম বুঝে নেয় যাত্রায় কয়েক দিন বেশি লাগবে। এই জ্ঞান কোনো রাজদরবারের মানচিত্রের নয়। এটি শরীরের জ্ঞান। নদীকে শুধু চোখ দিয়ে পড়া যায় না। পেশি দিয়ে পড়তে হয়।

বাতাসের চাপ, স্রোতের টান, জোয়ারের সময়, দাঁড়ের প্রতিরোধ—বহু বছরের অভ্যাসে মানুষের শরীর নিজেই একটি চলমান মানচিত্র হয়ে ওঠে। এ কারণে আলাউদ্দিনের আত্মবিশ্বাস স্থানীয় জলজ্ঞান নিয়ে। নদী-খাল-বিলের ভেতরে নৌযুদ্ধের যে কৌশল, বহিরাগত মোগল বাহিনী সহজে তা কল্পনাও করতে পারবে না বলে তার বিশ্বাস: ‘জলাদেশের জলের খবর আর পাল্টা হামলার নকশা মোগলরা কল্পনাও করতে পারবে না। জান বাঁচাতে কেবল পালাবার পথ খুঁজবে মির্জা নাথান বাহিনী।’ (পারভেজ: ১৮২)। এখানে সাম্রাজ্যের মানচিত্র হঠাৎ অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে। ক্ষমতা দূর থেকে ভূখণ্ড দেখে। বাসিন্দা ভূখণ্ডের সঙ্গে বাঁচে। এই দুই দেখাও এক নয়।

তবে উপন্যাস নদীকে কোনো নিষ্পাপ মাতৃপ্রতীকে পরিণত করে না। যে নদীর হাওয়া মসলিন তৈরি করে, সেই নদীপথেই দস্যু আসে। যে জল আয়শার শরীরকে চরে ফেলে রাখে, সেই জলই জদ্দনের নৌকাকে তার কাছে নিয়ে যায়। প্রকৃতি নৈতিক সিদ্ধান্ত নেয় না। মানুষ প্রকৃতির মধ্যে ইতিহাস তৈরি করে। আর এই নদীর কাছেই এসে ‘দেশ’ শব্দটির অর্থ বদলাতে থাকে। দেশ কি শুধু সেই জমি, যার ওপর শাসকের কর আছে? নাকি সেই জলও, যার ‘ভাও’ মাঝির শরীর জানে? দেশ কি রাজধানীর নাম? না তাঁতিপাড়ার আর্দ্রতা? দেশ কি রাজবংশের ধারাবাহিকতা? না বহু প্রজন্ম ধরে মানুষের শরীরে জমে থাকা অভ্যাস, গান, ভাষা, শ্রম, স্মৃতি ও পারস্পরিক নির্ভরতার জাল?

সুবর্ণপুরাণ এসব প্রশ্ন তত্ত্বের আবরণে ঘোষণা করে না। মানুষের জীবন দিয়ে ধীরে ধীরে তাদের সত্য করে তোলে। আর সেই জীবন দেখতে দেখতে বদলে যেতে থাকে পর্তুগিজ মালাক্কান যুবক ফ্রান্সিস রাফায়েল।


যে মানুষটি এসেছিল দেখতে

রাফায়েলের প্রথম পরিচয়টি ভুলে গেলে তার শেষ সিদ্ধান্তের গুরুত্বও কমে যায়। সে পর্যটক। সে দেখতে এসেছে, দখল করতে নয়। ভাটি বাংলার নদী, মসলিন, সংগীত, খাদ্য, স্থাপত্য, রওশন—সবই প্রথমে তার কাছে বিস্ময়। বিস্ময়ের মধ্যে সৌন্দর্য আছে। কিন্তু দূরত্বও আছে। আমি তোমাকে দেখে মুগ্ধ, কারণ তুমি আমার পরিচিত জগতের অংশ নও।

পর্যটকের একটি বিশেষ সুবিধা আছে—সে দেখে চলে যেতে পারে। তার দেখা পৃথিবী পরে পুড়ল কি বাঁচল, তা তাকে অপরিহার্যভাবে দায়ী করে না। সুবর্ণপুরাণ-এ রাফায়েলের প্রকৃত রূপান্তর ফলে ‘বিদেশি মানুষ বাংলা ভালোবেসে ফেলল’র মতো এত সরল নয়। আরও গভীর একটি ঘটনা ঘটে। সে ধীরে ধীরে দর্শক থাকার নিরাপদ অধিকার হারায়। আবু ইবনে আল আসাদ তার জাতিগত গৌরবের মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়। নিজ পরিবারের ধর্মীয় উত্তরাধিকার তাকে নিজের সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন করতে শেখায়। মসলিন-সৌন্দর্যের আড়ালের শ্রম আর সাধনা দেখায়। সোনারগাঁর ঐশ্বর্যের পাশে দারিদ্র্য। আয়শা মানুষের ওপর সমাজের দেওয়া নিষ্ঠুর নাম। রওশন এমন এক নারীকে দেখায়, পুরুষের বিস্ময়ের বিষয় হয়ে শুরু করেও যে শেষে পুরুষটির নীতি-শিক্ষক হয়ে ওঠে।

আর যুদ্ধ তাকে শেখায়—কিছু সম্পর্ক একবার তৈরি হয়ে গেলে দূরত্ব আর আগের মতো নির্দোষ থাকে না। রওশনের সঙ্গে বিদায়ের দৃশ্যে এর একটি অসাধারণ বস্তুগত প্রতীক আছে।

খাসনগর থেকে গৌরীপ্রসাদের বোনা মসলিনের উড়ানি আনিয়ে রওশন সেটি রাফায়েলের ‘গলায় জড়িয়ে দিয়ে চোখের জলে এলোমেলো হয়ে পাশেই বসে থাকে’ (পারভেজ: ১৯৮)। মসলিনটি এতক্ষণ ছিল সৌন্দর্য, শ্রম, ঐতিহ্য, বাজার ও অসমতার প্রতীক। এই মুহূর্তে সেটি স্মৃতি। একটি ভূখণ্ড যেন কাপড় হয়ে বিদেশি মানুষের শরীর ছুঁয়ে থাকে। রওশন তার চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। নিরাপদ জাহাজ আছে। ফিরে যাওয়ার পথ আছে। রাফায়েলের পক্ষে চলে যাওয়া সম্পূর্ণ সম্ভব। কিন্তু নৌকা কিছুদূর যেতেই সে মাঝিকে বলে: ‘তাম্রলিপ্তের জাহাজে আমি যাব না, মাঝি। আমাকে আলাউদ্দিন বাগদাদির বহরে নিয়ে চলো’ (পারভেজ: ১৯৯)। এই মুহূর্তটিকে শুধু প্রেমের রোমান্টিক সিদ্ধান্ত হিসেবে পড়লে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হারিয়ে যায়।

রওশনকে রাফায়েল পায় না। তবু রওশনের পৃথিবীর বিপদ আর তার কাছে পুরোপুরি ‘অন্যের বিপদ’ হয়ে থাকে না। এখানেই তাদের প্রেমের সবচেয়ে সুন্দর পরিণতি। প্রেম তাকে অধিকার দেয় না ঠিকই, দায় দেয়।

কাউকে নিজের করে পাওয়া এবং কারও পৃথিবীর প্রতি দায়ী হয়ে ওঠা এক নয়। রাফায়েলের প্রেম দ্বিতীয়টির দিকে যায়। তাই তার সবচেয়ে বড় যাত্রা মালাক্কা থেকে সোনারগাঁ নয়। সমুদ্রের ওপরও নয়। তার সবচেয়ে বড় যাত্রা—নিস্পৃহতা থেকে জড়িয়ে-পড়ার দিকে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে সূক্ষ্ম চিহ্ন সম্ভবত একটি শব্দে— ‘মাতৃভূমি’।

উপন্যাসের শুরুতে রাফায়েলের মাতৃভূমি পর্তুগাল। আদ্রিয়াকে সে বলে ‘আমার মাতৃভূমি পর্তুগালের মেয়ে’ (পারভেজ: ১৩)। অনেক পরে আলাউদ্দিন বাগদাদির প্রতিরোধবহরে যুদ্ধ করতে করতে সে লেখে: ‘এরা আমার সহোদর। আমি আমার নির্ভীক সহোদরদের সঙ্গে মাতৃভূমির জন্য লড়ছি’ (পারভেজ: ২০০)

একই শব্দ। কিন্তু একই অর্থ আর নেই। প্রথম মাতৃভূমি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। দ্বিতীয়টির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে অভিজ্ঞতা, ক্ষতি, সঙ্গ, দায়ের ভিতর দিয়ে। এখানে সুবর্ণপুরাণ স্বদেশ সম্পর্কে তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় সম্ভাবনাটি তৈরি করে: মানুষ জন্মভূমি নির্বাচন করতে পারে না; দায়ভূমি কখনো নির্বাচন করতে পারে।

দিনলিপিতে রাফায়েল পরে লিখেছে—‘গোটা দেশ এক হয়ে না দাঁড়ালে এ রকম লড়াই পূর্ণ হয় না।’ (পারভেজ: ২০১) ভবিষ্যৎ কোনো প্রজন্ম সম্মিলিতভাবে লক্ষ্যে পৌঁছাবে বলেও তার বিশ্বাস।

সপ্তদশ শতকের এক পর্তুগিজ চরিত্রের মুখে ‘গোটা দেশ’, ‘ঐক্য’, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্মিলিত লক্ষ্য—এই শব্দভান্ডার কখনো কখনো লক্ষণীয়ভাবে বেশিমাত্রায় আধুনিক শোনায়। অতীতের রাফায়েলের কণ্ঠে বর্তমান উপন্যাসকার কি এখানে কিছুটা বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন? প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনীয়। কেননা, ঐতিহাসিক উপন্যাস সবসময় দুটি কালের টানে লেখা হয়—যে অতীতকে সে নির্মাণ করে এবং যে বর্তমানে থেকে লেখক সেই অতীতের দিকে ফিরে তাকান। বর্তমানকে পুরো সরিয়ে দিলে ইতিহাসকল্পনা অসম্ভব; আবার বর্তমান অতীতের মুখে অতিরিক্ত জোরে কথা বললে সেই অতীত তার স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলে।

সুবর্ণপুরাণ এই সরু দড়ির ওপর অনেক জায়গায় অসাধারণ দক্ষতায় হাঁটে। কোথাও তার পা একটু কেঁপেও ওঠে। ইতিহাস, ভূগোল, মসলিন, বাণিজ্য, সংগীত, পর্তুগিজ বিস্তার, মোগল রাজনীতি—লেখকের তথ্যভাণ্ডার বিপুল। বহু জায়গায় এই জ্ঞান আখ্যানকে গভীরতা দেয়; আবার কিছু দীর্ঘ সংলাপে চরিত্র যেন মানুষ না থেকে গবেষণার বাহক হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে পড়ে। আবু ইবনে আল আসাদকে কখনো কখনো এরকম এক জ্ঞানভাণ্ডার মনে হয়। মানুষের মুখ থেকে যখন খুব বেশি তথ্য বেরোয়, কখনো তার সঙ্গে ফুটনোটের শব্দও শোনা যায়।

তবু সুবর্ণপুরাণ-এর গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলো—তার বহু তথ্য পরে রক্ত পায়। মসলিনের কারিগরি শ্রমের ইতিহাস হয়ে ফেরে। নারীর সামাজিক বিধান আয়শার জীবন হয়। নদীর ভূগোল যুদ্ধের কৌশল হয়। পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের ইতিহাস রাফায়েলের বিবেক হয়। রাজধানী স্থানান্তর মানুষের ঘরবদল হয়ে ওঠে। যেখানে এই রূপান্তরটি ঘটে, সেখানেই গবেষণা শিল্প হয়ে ওঠে।


দুটি ‘আমার’-এর মাঝখানে একটি দেশ

সুবর্ণপুরাণ-এর দুটি দৃশ্য এবার পাশাপাশি রাখা যাক।

তাদের মধ্যে পৃষ্ঠা-দূরত্ব অনেক। কিন্তু নৈতিক দূরত্ব আশ্চর্যভাবে কম। লাক্ষ্যার চর থেকে পাওয়া অচেনা মেয়েটিকে দেখে জদ্দন বাঈ বলেন: ‘এ আমার মেয়ে।’

বহু পরে প্রতিরোধযোদ্ধাদের নিয়ে রাফায়েল লেখে: ‘এরা আমার সহোদর।’

এই দুই ‘আমার’-এর মাঝখানেই সম্ভবত উপন্যাসটির সবচেয়ে গভীর দেশ তৈরি হয়। জদ্দনের ‘আমার’ রক্তের নয়। রাফায়েলের ‘আমার’ও নয়। একজন অচেনা নারীকে মেয়ে বলে গ্রহণ করে। একজন বিদেশি অন্য ভূখণ্ডের মানুষকে ভাই বলে অনুভব করে। আইন তাদের সম্পর্ক তৈরি করেনি। এক ধর্মও নয়। এক জাতিও নয়।

সম্পর্ক তৈরি হয় এমন এক জায়গায়, যেখানে অন্য মানুষের জীবনকে আর সম্পূর্ণ দূরের জীবন বলে মনে করা সম্ভব হয় না। এখানে আয়শা ও রাফায়েলকে পাশাপাশি রাখলে উপন্যাসের মধ্যে একটি বিস্ময়কর বিপরীত গতি দেখা যায়।

আয়শা এই ভূখণ্ডেরই মানুষ। তবু তাকে তার নিজের সমাজের ভাষা শেখায়—তুমি আর পুরোপুরি আমাদের নও। রাফায়েল বহিরাগত। তবু তার যাত্রা এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে এই ভূখণ্ডের মানুষ আর পুরোপুরি ‘ওরা’ থাকে না।

একজনকে স্বদেশের ভেতর থেকে বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে; অন্যজন বাইরে থেকে নৈতিক স্বদেশের ভেতরে প্রবেশ করছে। এই দুই বিপরীত চলনের মাঝখানেই সুবর্ণপুরাণ-এর ‘দেশ’ রাষ্ট্রের সংজ্ঞা ছাড়িয়ে যায়।

এ দেশ নিষ্পাপ কোনো মানবতাবাদের দেশ নয়। এখানেও শোষণ আছে। পুরুষতন্ত্র আছে। বাজারের অসমতা আছে। ধর্মের কর্তৃত্ব আছে। সাম্রাজ্য আছে। যুদ্ধ আছে। কিন্তু এই সমস্ত বড় শক্তির মধ্যে ছোট ছোট সম্পর্ক বারবার সীমারেখা অস্বীকার করে। জদ্দনের—‘এ আমার মেয়ে।’ রুস্তমের—‘মুই বুঝি তোমারে।’ রওশনের—জয়ের আগে মানুষের স্বপ্ন, সাধ, সংসারের হিসাব চাওয়া। রাফায়েলের—নিরাপদ জাহাজের বদলে বিপদের দিকে নৌকা ঘুরিয়ে দেওয়া। এসবের কোনোটি একা সাম্রাজ্য ভাঙে না। সমাজের নিষ্ঠুর বিধানও রাতারাতি মুছে যায় না। তবু প্রতিটি মুহূর্তে একজন মানুষ অন্য মানুষের দিকে এমনভাবে হাত বাড়ায়, যা প্রতিষ্ঠিত কোনো না কোনো সীমানাকে অস্বীকার করে।

সম্ভবত এ কারণেই সুবর্ণপুরাণ-এর প্রকৃত নায়ক কোনো একক চরিত্র নয়। সম্পর্ক। যে সম্পর্ক জন্মের নয়, তবু আপন। যে সম্পর্ক ক্ষত মুছে দিতে পারে না, কিন্তু ক্ষতকে মানুষের পুরো পরিচয় হতে দেয় না। যে সম্পর্ক পার্থক্য বিলোপ করে না; বরং পার্থক্য রেখেই অন্যের যন্ত্রণার কাছে দায়ী হতে শেখে। এখানে আবার মসলিনের কাছে ফিরে যেতে হয়। একটি বস্ত্র এক সুতোয় তৈরি হয় না। প্রতিটি সুতো আলাদা বলেই নকশা সম্ভব।

সব সুতোকে এক করে দিলে বস্ত্র থাকে না; আবার তাদের পরস্পরের সঙ্গে না জুড়লে থাকে শুধু বিচ্ছিন্ন সুতো।

সুবর্ণপুরাণ-এর মানবিক কল্পনাও সম্ভবত এমন। মানুষ এক নয়। ভাষা আলাদা। ধর্ম আলাদা। স্মৃতি আলাদা। ইতিহাস আলাদা। জন্মভূমিও আলাদা। কিন্তু পৃথক ইতিহাস মানেই পরস্পরের যন্ত্রণা সম্পর্কে নৈতিকভাবে নির্লিপ্ত থাকার অধিকার নয়। অন্য মানুষের জীবন যখন আর শুধু ‘অন্যের জীবন’ বলে মনে হয় না, তখনই দায়ের শুরু।

এই দায়ের কাহিনির শেষদিকে আবার মসলিন ফিরে আসে। এবার তার সঙ্গে ফিরে আসে রাজধানী। সোনারগাঁয়ের জীবন স্তিমিত হচ্ছে; দলে দলে মানুষ, বিশেষত বস্ত্রশিল্পের মানুষ, আয়োজন গুটিয়ে ঢাক্কায় নতুন জীবন শুরু করছে। রাজনৈতিক ইতিহাস একে রাজধানীর স্থানান্তর বলে লিখতে পারে।

কিন্তু তাঁতির কাছে রাজধানী স্থানান্তর মানে নতুন ঘর। কারও কাছে পুরোনো ঘাট হারানো। কারও কাছে পেশার নতুন কেন্দ্র। কারও কাছে স্মৃতির ভৌগোলিক স্থানচ্যুতি। রাষ্ট্রের জন্য রাজধানী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। মানুষের জন্য তা জীবন সরিয়ে নেওয়া।

আর ঠিক তখনই ‘সর্বোৎকৃষ্ট শ্রেণির মসলিন দিল্লির সম্রাট ও তাঁর পরিবারের জন্য সংরক্ষিত’ (পারভেজ: ২০২) হচ্ছে; পরের শ্রেণির বিশেষ বস্ত্রও ক্ষমতার উচ্চপর্যায়ের ব্যবহারে সীমাবদ্ধ।

আবার সেই মসলিন। জল ভাটি বাংলার। হাওয়া ভাটি বাংলার। কার্পাস, আঙুল, তাঁত, সময়—সব স্থানীয়। কিন্তু শ্রেষ্ঠ বস্ত্রের ওপর দাবি ক্ষমতার কেন্দ্রের। সাম্রাজ্য শুধু মানচিত্রে নিজের রং ছড়ায় না। মানুষের আলমারিতেও ঢুকে পড়ে।

তবু উপন্যাসটি নতুন মোগল শাসনের কেবল অন্ধকার দেখায় না। ঢাক্কায় প্রাণের সঞ্চার আছে, নিরাপত্তার উদ্যোগ আছে, শিল্পীদের জন্য নতুন সুযোগ আছে। এর মধ্যেই রাফায়েলের প্রশ্ন—‘ভুলে থাকলেই কি সব অসমতা ঘুচে যায়?’ (পারভেজ: ২০২)

এই প্রশ্ন সুবর্ণপুরাণ-এর রাজনৈতিক বোধকে একমাত্রিক হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। কোনো শাসন নতুন সুযোগ তৈরি করেও বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে। নিরাপত্তা আনতে পারে, আবার সম্পদ কেন্দ্রে টেনে নিতে পারে। একটি শহর জেগে উঠতে পারে আরেকটির নিভে যাওয়ার দামে। ইতিহাসের সত্য প্রায় কখনো একরঙা নয়।

শেষ দিনলিপিতে রাফায়েল লেখে: ‘কোথাও ফিরব না আমি। না মালাক্কায়, না পর্তুগালে। বাঙ্গালার মানুষ আর এর জল-হাওয়ার বিরাট হৃদয়ের উপরে থেকে যাব’ (পারভেজ: ২০৪)। বাক্যটিকে খুব সহজে রোমান্টিক করা যায়। এক বিদেশি বাংলা ভালোবেসে থেকে গেল। কিন্তু রাফায়েলের যাত্রা এত সহজ নয়। সে থেকে যায় শুধু বাংলা সুন্দর বলে নয়। বরং সে আর আগের মানুষটির কাছে সম্পূর্ণ ফিরে যেতে পারে না বলে। সে অনেক কিছু দেখে ফেলে। নিজের জাতির গৌরবের উল্টো পিঠ। আলোর তন্তুর মতো মসলিনের নিচে শ্রমের ঘাম। ঐশ্বর্যের পাশে দারিদ্র্য। আয়শার শরীরে সমাজের দেওয়া নাম। রওশনের কোমরের বিষময় গুপ্তি। যুদ্ধের ছাই। হাফিজুদ্দিনের মৃত্যু।

মাঝির শরীরে নদীর ভূগোল। অন্য জাতির মানুষকে ‘সহোদর’ বলে অনুভব করার অভিজ্ঞতা। জানারও মূল্য আছে। কিছু সত্য জানার পরে মানুষ আগের নিরাপদ অজ্ঞতায় আর ফিরতে পারে না।

রাফায়েলের শেষ সিদ্ধান্ত তাই কেবল ভৌগোলিক না-ফেরা নয়। এ এক নৈতিক প্রত্যাবর্তনের অসম্ভবতা। সে এসেছিল দেখতে। শেষ পর্যন্ত নিজেই দৃশ্যটির অংশ হয়ে গেছে।


মানুষের দেশে

মানচিত্রে একটি দেশ কোথায় শেষ হয়, আমরা জানি। একটি রেখায়। কিন্তু মানুষের কাছে দেশ কোথায় শুরু হয়? হয়তো সেই মুহূর্তে, যখন নির্জন চরে পড়ে থাকা অচেনা একটি মেয়েকে কেউ বলে—‘আমার মেয়ে’।

যখন সমাজ যে মানুষটিকে তার ক্ষতের নামে ডাকতে চায়, অন্য একজন তাকে বলে—আমি তোমাকে বুঝি। যখন একজন নারী যুদ্ধের বিজয়ের আগে সাধারণ মানুষের স্বপ্নের হিসেব চায়। যখন একজন বিদেশি তরুণ নিরাপদ জাহাজের পথ ছেড়ে বিপদের দিকে নৌকা ঘুরিয়ে দেয়। যখন অন্যের ক্ষত আর শুধু দেখার বিষয় থাকে না। তখন সম্ভবত দেশ মানচিত্র থেকে সরে মানুষের ভেতরে প্রবেশ করে। এ কারণে সুবর্ণপুরাণ শুধু হারানো সোনারগাঁয়ের ঐশ্বর্যের উপন্যাস নয়।

এটি ঐশ্বর্যের নিচে চাপা পড়ে থাকা মানুষের উপন্যাস। মহাকাব্যের গৌরবের পাশে অস্বস্তিকর দিনলিপি রেখে দেওয়ার উপন্যাস। আলোর মতো কাপড়ের মধ্যে ঘাম দেখতে শেখার উপন্যাস। বিজয়ের নামের পাশে ক্ষত মনে রাখার উপন্যাস। নিজের ইতিহাসের আয়নায় চিড় দেখতে শেখার উপন্যাস। এবং সবচেয়ে বেশি—অন্য মানুষের জীবন থেকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলার উপন্যাস।

সাম্রাজ্য মানচিত্র আঁকে। বাজার মূল্য নির্ধারণ করে। সমাজ পরিচয়ের বিধান দেয়। ইতিহাস বিজয়ীর নাম সংরক্ষণ করে। কিন্তু মানুষের জীবনের কিছু সত্য এই সমস্ত ব্যবস্থার ফাঁক গলে থেকে যায়। কখনো লোকগানে। কখনো মাঝির শরীরে জমা নদীর জ্ঞানে। কখনো দুশো চল্লিশ দিন ধরে বোনা প্রায় অদৃশ্য সুতোয়। কখনো বিষমাখা গুপ্তির নীরবতায়। কখনো ক্ষয়ে যাওয়া দিনলিপিতে। আর কখনো মাত্র তিনটি শব্দে—‘এ আমার মেয়ে।’

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মানচিত্রেও হয়তো এই বাক্যের জন্য আলাদা কোনো চিহ্ন নেই। থাকার কথাও নয়। কারণ মানচিত্র ভূমির সীমা জানে। মানুষের হৃদয়ে কে কখন কার আপন হয়ে ওঠে—সেই ভূগোল তার জানা নেই। সুবর্ণপুরাণ শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে সেই অজানা ভূগোলটির কাছেই নিয়ে যায়।

মানচিত্রের বাইরে। মানুষের দেশে।

তথ্যসূত্র: পারভেজ হোসেন। সুবর্ণপুরাণ। ঢাকা: সংবেদ, ২০২৩

মন্তব্য লিখুন

ধন্যবাদ। নাম ও মতামত লিখুন। পর্যালোচনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মন্তব্যটি প্রকাশিত হবে।

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত