‘সমুদ্রের কবিতা’ বইটির লেখক জহির হাসান। মোট ৩৭টি কবিতার চমৎকার একটি সংকলন। পাঠকদের জন্য বইটি প্রকাশ করেছে বেড়াল প্রকাশন।
লেখকের জীবনের একটি বিশেষ ভ্রমণকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বইটির প্রেক্ষাপট ও অনুপ্রেরণা। ২০২৫ সালে সেন্টমার্টিন যাওয়ার প্রথম অভিজ্ঞতা থেকেই কবিতার বইটি অনুপ্রাণিত। সেন্টমার্টিনের সমুদ্রের সেই প্রথম দর্শনে লেখক এবং তার পুত্র উভয়েই গভীরভাবে বিমোহিত হয়ে পড়েন। সেই সফরের বিচিত্রসব দৃশ্য ও গভীর অনুভূতিগুলো লেখকের মনে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়। তিনি উপলব্ধি করেন যে, সমুদ্রে না গেলে সমুদ্রের প্রতি তার যে আজন্ম নস্টালজিয়া ছিল, তা হয়তো চিরকাল অনাবিষ্কৃতই থেকে যেত। এই কবিতাগুলোর মাধ্যমেই লেখকের অস্তিত্বের গভীরে চাপাপড়া আনন্দময় অনুভূতিগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকা নোনাশোকও পাঠকদের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
কবি জহির হাসানকে আমার ভালো লাগে ওর নিজের একটা ভাষা-প্রচেষ্টার জন্য, যা অত্যন্ত সাবলীল, আটপৌরে এবং কথ্য রীতির। তিনি সচেতনভাবে প্রমিত বা সাধু-চলিত রীতির ব্যাকরণগত কড়াকড়ি এড়িয়ে লোকজ, আঞ্চলিক ও প্রাত্যহিক মুখের ভাষার ব্যবহার করেন। তার ভাবপ্রকাশের ভঙ্গিটি অনেকটা নির্লিপ্ত, অকপট এবং আত্মমগ্ন। প্রচলিত রোমান্টিকতা এড়িয়ে সম্পূর্ণ আধুনিক এবং চমকপ্রদ সব চিত্রকল্প ও উপমার আশ্রয় নিয়েছেন জহির হাসান। তার রূপকগুলো খুবই অভিনব। যেমন, সময়কে বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেছেন— “আইসক্রিমের মতো গলতে আছে যে সময়” কিংবা “বাবলের মতো ফাটে যে সময়।”
বইটির বিষয়বস্তুর গভীরে প্রবেশ করলে আমরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়ের দেখা পাই। পাঠকদের সুস্পষ্ট অনুধাবনের জন্য কবিতাগুলোর সরাসরি উদ্ধৃতিসহ বিষয়বস্তুর এক সাবলীল বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো:
২.
জহির হাসানের কবিতায় যেন অস্তিত্বের বিশাল আয়না বসানো। আয়নাটি কেবল সমুদ্রের প্রাকৃতিক দৃশ্য বা ভ্রমণের গন্তব্য নয়, বরং মানব জীবনের অসারতা ও গভীরতম সত্যকে তুলে ধরার এক আধ্যাত্মিক আয়না। সমুদ্রের অসীম বিস্তৃতি ও তার অবিরাম ঢেউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের ক্ষুদ্র অস্তিত্বের সংকট কবির কাছে প্রবল হয়ে ওঠে। মানুষ কেন পৃথিবীতে আসে, কেনই বা মারা যায়, আর যারা বেঁচে থাকে তারাই বা ঠিক কী কারণে টিকে থাকে, সমুদ্রের এই আদিম রূপের সামনে দাঁড়িয়ে অস্তিত্বের এই অন্তহীন প্রশ্নগুলোই কবির মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। ঢেউয়ের তীরে বসে তিনি মানব জন্মের প্রয়োজনীয়তা এবং মৃত্যুর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছেন। মানব জীবনের উদ্দেশ্যহীনতা বা অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি অনায়াসেই বলে ওঠেন, ‘সমুদ্রের কবিতা ২’-এ এই দার্শনিক জিজ্ঞাসার প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে তিনি লিখেছেন, “আমাদের বেহুদা জন্মেরই বা / কী দরকার ছিল, কিংবা মওতেরই বা কী দরকার আছিল! / কেবল আমরা গেছি বাঁচি, বাকিরা গেছে মরি—”। এখানে জগতের সব বিপ্লব ও হিসাব-নিকাশ তুচ্ছ হয়ে যায়; সেখানে শুধু ঢেউয়ের কথাই প্রাধান্য পায়।
৩.
সময়ের শৈশবও স্মৃতির ঢেউ তাঁকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। তাঁর কাছে সমুদ্র কেবল সীমাহীন জলের আধার নয়, পৃথিবীর আদিম রূপ ও সময়ের উৎপত্তিস্থল এক চিরন্তন প্রতীক। মানব সভ্যতার অনেক আগে থেকেই সমুদ্র তার বিশালতা নিয়ে বিরাজমান, তাই সমুদ্রের কাছে যাওয়া মানে স্মৃতির ঢেউ বেয়ে সেই সুপ্রাচীন অতীতে বা সৃষ্টির আদিলগ্নে ফিরে যাওয়া। জলের স্পর্শে লেখক যেন সময়ের একদম শুরুর দিনগুলোতে, অর্থাৎ সময়ের ‘শৈশবে’ নিজেকে আবিষ্কার করেন। এই সমুদ্রস্নান কেবল শরীরের নয়, বরং এটি মহাকালের আদিম স্মৃতির সাথে একাত্ম হওয়ার এক গভীর আত্মিক প্রক্রিয়া।

প্রচ্ছদ: কবির আলোকচিত্র, প্রকাশকাল: ২০২৬
প্রকাশক: বেড়াল প্রকাশনা
জহির হাসানের কাছে সমুদ্র হলো সময়ের শুরু। তিনি মনে করেন, সমুদ্রে গোসল করা মানে সময়ের শৈশবে ঘুরে আসার একটি ঘটনা। ‘সমুদ্রের কবিতা ৩’-এ এসে জহির অতীতকে এক “মিথ্যাচারী রাখাল” এবং মানুষকে তার “ভেড়া” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই ভাবনাটি আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, “সমুদ্রে গোসল মানে / সময়ের শৈশবে ঘুরে আসার ঘটনা” এই পঙক্তিতে। আবার ‘সমুদ্রের কবিতা ১’-এ কবি অনুভব করেছেন, “এইখানে সময় নাড়ির মতো পেঁচানো”, অর্থাৎ সমুদ্রের কাছে এলে সময় যেন তার নিজস্ব এক আদিম রূপ ধারণ করে এবং জাগতিক কোনো কিছুই আর অর্থবহ মনে হয় না।
৪.
জহির ডাঙা ও দরিয়ার মাঝে দোদুল্যমান সত্তা আবিষ্কার করেছেন। মানুষের এক চিরন্তন মানসিক দ্বন্দ্বের চিত্র ফুটে উঠেছে তাঁর কবিতায়। মানুষ স্বভাবতই তার পরিচিত গণ্ডি, নিরাপদ আশ্রয় বা ‘ডাঙা’-র প্রতি এক গভীর পিছুটান অনুভব করে। কিন্তু একই সঙ্গে, সমুদ্রের অসীম রহস্য, বিশালতা এবং আদিম ডাক তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ এতটাই তীব্র যে, তা এক ধরনের অন্তর্গত বা মানসিক পীড়ার জন্ম দেয়। ফলে মানুষের ভেতরের সত্তাটি নিরন্তর একটি দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে। না পারে সে পুরোপুরি মাটির মায়া চিরতরে ছাড়তে, না পারে সমুদ্রের বিশালতাকে এড়িয়ে যেতে। পরিচিত জীবনের আশ্রয় এবং অসীমের হাতছানি—এই দুইয়ের মাঝেই মানুষের এই অদ্ভুত দ্বৈত সত্তার বসবাস।
এই সংকলনে মানুষের সেই অদ্ভুত দ্বৈত সত্তার কথা বলা হয়েছে, যেখানে আমরা সবাই যেন একদিকে ডাঙার জন্য হোমসিক, আবার অন্যদিকে সমুদ্র-পীড়িত। বইটির মুখবন্ধে লেখক তার এই মানসিক দ্বন্দ্বের কথা এভাবেই ব্যক্ত করেছেন, “আমরা সবাই যেন একদিকে ডাঙার জন্য হোমসিক, অন্যদিকে সমুদ্রপীড়িত।” এছাড়াও ‘সমুদ্রের কবিতা ৪’-এ দেখা যায়, সমুদ্রের ঘোর ও ঘূর্ণিতে একবার পড়লে আপন ঘরও মানুষের কাছে পর হয়ে যায়।
৫.
পৌরাণিক প্রতিধ্বনি ও বিশ্বাসের নোঙর হয়ে উঠেছে জহির হাসানের ‘সমুদ্রের কবিতা’। সমুদ্র কেবল প্রমত্ত জলোচ্ছ্বাস নয়, বরং প্রাচীন মিথ ও ঐশী অলৌকিকতার এক বিশাল ক্যানভাস। সমুদ্রের অসীম বিস্তৃতি ও ভয়াল রূপের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের অসহায়ত্ব ঘোচাতে যুগে যুগে যেসব ঐশী সাহায্য ও নবী-রাসূলদের জীবনে ঘটে যাওয়া অলৌকিক ঘটনা রয়েছে, কবি সেগুলোকে তার কবিতায় সযত্নে তুলে এনেছেন। উত্তাল সাগরের মাঝে এই ঈশ্বর-বিশ্বাসই যেন মানুষের টিকে থাকার একমাত্র ‘নোঙর’। পৌরাণিক চরিত্র ও ধর্মীয় উপাখ্যানের এই ‘প্রতিধ্বনি’গুলো কেবল অতীতকে স্মরণ করায় না, বরং কবির নিজস্ব অস্তিত্বের সংকটকে বৃহত্তর এক আধ্যাত্মিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে।
বইটিতে আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় প্রসঙ্গের দারুণ ব্যবহার রয়েছে। নিজেকে জহির কিংবদন্তি নাবিক সিনদাবাদের সাথে তুলনা করে বলেছেন, “খালাসি বা নাবিকরা আমারে চিনে ফেলছে আমিই / সেই সিনদাবাদ!” ‘সমুদ্রের কবিতা ৯’-এ তিনি সমুদ্রতীরে এক দাড়িওয়ালা বৃদ্ধকে দেখে নিজেকে ‘কুলি সিনদাবাদ’ এবং সেই বৃদ্ধকে ‘সওদাগর নাবিক সিনদাবাদ’ বলে ভেবে নিয়েছেন। এছাড়া ‘সমুদ্রের কবিতা ৩৬’-এ তিনি বনী ইসরাইলদের ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা, নূহ নবীর কিস্তি, যিশুর অলৌকিক ঘটনা এবং ইউনুস নবীর প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। তিনি লিখেছেন, “বনী ইসরাইলগোরে ফেরাউনের জুলুম থাইক্যা বাঁচাইতে ক্যামনে / আল্লাহ সমুদ্ররে দুই ভাগ করছিলেন।” ধর্মীয় অনুষঙ্গের বিস্তারিত বর্ণনায় আরও উল্লেখ করেছেন, “…নুহের কিস্তিতে আল্লাহ ঈমানদারগোরে ক্যামনে রক্ষা করছিলেন। / …যিশু শিষ্যদের সামনে সমুদ্রের পানির উপর দিয়া ক্যামনে হাঁটছিলেন। / …ইউনুস নবীরে মাছের পেটেও খোদা ক্যামনে আছান দিছিলেন!”
৬.
জহির হাসানের কবিতায় সাহিত্যের ঢেউয়ে পুরনো নাবিকের ডাক শোনা যায়। তাঁর কাছে সমুদ্র কেবল ধর্মীয় বা পৌরাণিক আখ্যানের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী চরিত্রগুলোকে চোখের সামনে জীবন্ত করে তুলেছে। সমুদ্রের বিশালতা ও রহস্যময়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লেখকের মনে সাহিত্যের সেইসব ‘পুরনো নাবিক’ বা সমুদ্রচারীদের কথা স্মরণ হওয়াটা এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগিক সংযোগ। সমুদ্রের ঢেউগুলো যেন বিশ্বসাহিত্যের পাতায় পাতায় লুকিয়ে থাকা মানুষের অদম্য সংগ্রাম, টিকে থাকার লড়াই এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের চিরন্তন সম্পর্কের গল্পগুলোকে নতুন করে ডাক দিয়ে যায়। ব্যক্তি মানুষের সমুদ্রদর্শনের অভিজ্ঞতা এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বিশ্বসাহিত্যের সর্বজনীন চেতনার সাথে।
জহির হাসানের কবিতায় যেন অস্তিত্বের বিশাল আয়না বসানো। আয়নাটি কেবল সমুদ্রের প্রাকৃতিক দৃশ্য বা ভ্রমণের গন্তব্য নয়, বরং মানব জীবনের অসারতা ও গভীরতম সত্যকে তুলে ধরার এক আধ্যাত্মিক আয়না। সমুদ্রের অসীম বিস্তৃতি ও তার অবিরাম ঢেউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের ক্ষুদ্র অস্তিত্বের সংকট কবির কাছে প্রবল হয়ে ওঠে
ধর্মীয় প্রসঙ্গের পরপরই ছেলের সাথে কথোপকথনে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের বিখ্যাত উপন্যাস “দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি”-এর সান্তিয়াগো ও মানোলিনের প্রসঙ্গ সরাসরি উঠে এসেছে উক্ত কবিতাতেই। ছেলের জিজ্ঞাসায় তিনি লিখেছেন, “এইসব শুনি পোলা কয় / আব্বা, সান্তিয়াগো আর মানোলিনের ঘটনাডা যে কইলা না! / আমি কইলাম, দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি?”
৭.
প্রকৃতির রহস্যময়ী নারী ও রূপান্তরের গল্প শুনতে পাওয়া যায় জহির হাসানের কবিতায়। প্রকৃতি তার কবিতায় কেবল নিষ্প্রাণ উপাদান নয়, বরং তা এক রহস্যময়ী নারীসত্তার রূপক হিসেবে ধরা দিয়েছে। সমুদ্রের বিশালতাকে স্পর্শ করাকে তিনি সেই আদিম, অকৃত্রিম নারীসত্তার নিবিড় স্পর্শের মতোই গভীর বলে মনে করেন। পাশাপাশি, সময়ের বহমানতায় প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর যে পরিবর্তন ঘটে, তা তিনি অত্যন্ত দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। একসময়ের চঞ্চল ও প্রাণবন্ত ঢেউ কীভাবে কালের পরিক্রমায় স্তব্ধ ও প্রাণহীন প্রবালে পরিণত হয়, তা মূলত প্রকৃতির বুকে সময়েরই এক অনিবার্য রূপান্তরের আখ্যান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দৃশ্যমান পৃথিবীর সবকিছুই এক অবিরাম রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সমুদ্র ছোঁয়াকে জহির নারীপ্রকৃতিকে ছোঁয়ার সাথে চমৎকারভাবে তুলনা করেছেন, যেমন তিনি লিখেছেন, “সমুদ্র ছোঁয়া মানে আমার প্রকৃতি নারী রে ছোঁয়া।” তিনি প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকে দার্শনিক দৃষ্টিতে দেখেন; তিনি তার ছেলেকে বলেন, তীরে পড়ে থাকা মৃত প্রবালগুলো সময়ের রূপান্তরে এই অবস্থায় এসেছে, তারা একদিন ঢেউরূপে বিরাজ করত। ‘সমুদ্রের কবিতা ৫’-এ তিনি ছেলেকে এই ব্যাখ্যা দেন, “কইলাম, সময় রূপান্তর হইলে প্রবাল হয় / এরা একদিন ঢেউরূপে বিরাজ করত এইখানে!” এই একই কবিতায় অতীত ভুলে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে, “যেন ভুলে গেছি আমি কী ছিলাম / যেন আমি কেবলই জন্ম নিছি”।
জহির পরাবাস্তব অনুভূতি ও আত্মানুসন্ধান করেছেন সমুদ্রের কবিতায়। সমুদ্রের কাছে এসে জহির নিজের সত্তাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন। বালুর ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ‘সমুদ্রের কবিতা ৭’-এ কবির মনে হয়েছে, “হয়তো আমি আয়নার ভিতর আটকা পড়ছি”, যা প্রকৃতির বিশালতায় মানুষের পরাবাস্তব আটকে পড়ার অনুভূতিকে তুলে ধরে। ‘সমুদ্রের কবিতা ৮’-এ সমুদ্রে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে আবার নিজেকেই যেন নতুন করে খোঁজার চেষ্টা করেন তিনি, যেমনটা বলেছেন, “সমুদ্রে হারাই আসি নিজেরে / খুঁজতে গিয়া ফের নিজেরে ফের।” ‘সমুদ্রের কবিতা ১০’-এ সমুদ্রের সেই অসীম বিশালতা খুব সাবলীলভাবে ছোট মেয়ের হাসিতে মিশে যায়, যেখানে তিনি দেখেছেন, “অসীমের মুখোশ পরা সমুদ্র / আমার ছোট মেয়ের মুখে ঢুকি হাসতে থাকে!” এবং ভালোবেসে তিনি মেয়েকে দরিয়া বলে ডাকেন।
৮.
সমুদ্রের কবিতায়ও জহির শেকড় ও শব্দের কারিগর। তাই তার সাহিত্যকর্মের পেছনে তার জন্মস্থান, বেড়ে ওঠার পরিবেশ এবং বহুমাত্রিক আগ্রহের এক গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। জহিরের ক্ষেত্রে গ্রামবাংলার স্নিগ্ধ প্রকৃতি তার ‘সৃষ্টির শেকড়’ হিসেবে কাজ করেছে, যা তার কাব্যে এক নিবিড় জীবনমুখী দর্শনের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও শব্দ, ভাষা, দর্শন ও শিল্পের প্রতি তার এই নিবিষ্ট অনুরাগ তাকে একজন সত্যিকারের ‘শব্দের কারিগর’ হিসেবে গড়ে তুলেছে। বিজ্ঞান ও মননের এক অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি নিজের গভীরতম উপলব্ধিগুলোকে শব্দের নিপুণ গাঁথুনিতে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।
৯.
জহির হাসানের ‘সমুদ্রের কবিতা’ বইটি বাংলা কবিতায় এক অনন্য সংযোজন, যা নিছক কোনো ভ্রমণ-অনুভূতির সংকলন নয়, বরং মানব জীবনের অসারতা ও গভীরতম সত্যকে তুলে ধরার এক আধ্যাত্মিক আয়না। কবিতাগুলোতে ‘প্রবাল’, ‘গাঙচিল’ বা ‘সিনদাবাদ’-এর মতো কিছু নির্দিষ্ট রূপকের পুনরাবৃত্তি এবং মাঝেমাঝে সরাসরি উপদেশমূলক বাক্যের উপস্থিতির কারণে দীর্ঘ পাঠে কিছুটা একঘেয়েমি তৈরি হওয়ার অবকাশ থাকলেও, এর অন্তর্নিহিত পরাবাস্তব দর্শন ও আত্মানুসন্ধানের আবেদন কোনোভাবেই ম্লান হয় না।
আবার অনেক কবিতায় দর্শন বা উপদেশকে রূপকের আড়ালে না রেখে সরাসরি বলে দেওয়া হয়েছে। ‘সমুদ্রের কবিতা ১২’-এ তিনি সরাসরি একটি আপ্তবাক্য জুড়ে দিয়েছেন: “মূলত জগতে কেউই কারো কোনো কথা শোনে না।” এ ধরনের সরাসরি বক্তব্য কবিতাকে অনেক সময় উপদেশের মতো নীরস করে তোলে, যা পাঠকের নিজস্ব কল্পনার জায়গাকে সীমিত করে দেয়। যেহেতু পুরো বইটি সমুদ্রদর্শন ও তার ফলে সৃষ্ট অনুভূতি নিয়ে লেখা, তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে একই ধরনের দার্শনিক চিন্তার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
পরিশেষে, পরিচিত ডাঙার প্রতি মানুষের নিরাপদ পিছুটান এবং অসীম সমুদ্রের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণের যে চিরন্তন দ্বৈত সত্তা ও মানসিক দ্বন্দ্ব, তা অত্যন্ত নিপুণভাবে এই গ্রন্থে মূর্ত হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান ও মননের অপূর্ব সমন্বয়ে রচিত এই কাব্যগ্রন্থটি পাঠককে কেবল সমুদ্রস্নানই করায় না, বরং নিজের অস্তিত্বের গভীরে ডুব দিয়ে নিজেকে নতুন করে খুঁজতে বাধ্য করে।
বিবিধ-এর ১০১ রিভিউ সংখ্যায় প্রকাশিত































































1 Comment. Leave new
বাহ! পরিচ্ছন্ন পত্রিকা, দেখে খুব ভালো লাগল। ধন্যবাদ সম্পাদক, মেঘচিল এবং কবি জহির হাসানকে ।