প্রত্যেক কবি-শিল্পীর কাছেই কোনো না কোনো ঋতু প্রিয়। রবীন্দ্রনাথে আমরা প্রথমত বর্ষা এবং পরে বসন্তের সগৌরব উপস্থিতি লক্ষ করি। জীবনানন্দের প্রিয় ঋতু হেমন্ত। রবীন্দ্রনাথ বর্ষার রূপ-সৌন্দর্যকে মহিমান্বিত করেছেন তাঁর কবিতায়-গানে নানাভাবে নানা ভঙ্গিতে। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় সেই বর্ষা ঋতুর বিপরীত প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়। তাঁর ‘এইসব দিনরাত্রি’ কবিতায় আমরা ‘শ্রাবণের নির্গলিত ক্লেদরক্ত বৃষ্টির ভিতর’ দেখতে পাই ‘এ-পৃথিবী ঘুম স্বপ্ন রুদ্ধশ্বাস শঠতা রিরংসা মৃত্যু নিয়ে কেমন প্রমত্ত কালো গণিকার উত্তাল সংগীতে …… নরক শ্মশান হল সব।’ আবার অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের বসন্ত কানায় কানায় পূর্ণ; কত ফুল ফুটে, কতপাখি গায়, কিন্তু জীবনানন্দের ‘বসন্তের কোন সাড়া নেই’ (উত্তরপ্রবেশ, সা,তা,তি)। জীবনানন্দ দাশের ঋতুপ্রত্যয় রবীন্দ্রনাথের বিপরীত; এই বৈপরীত্য তাঁর কবি স্বভাবেরই বৈপরীত্য, রোমান্টিকতার বিরুদ্ধে আধুনিকতার বিদ্রোহ। রবীন্দ্রনাথের ‘আকাশভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণ’-এর বিপরীতে জীবনানন্দে পাওয়া যায় ‘আমি সেই পুরোহিত– সেই পুরোহিত!-/ যে নক্ষত্র মরে যায়, তাহার বুকের শীত / লাগিতেছে আমার শরীরে–’…।
জীবনানন্দের অনেক কবিতায় তাঁর প্রিয় ঋতু ‘হেমন্ত’র নানাবিধ উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এই হেমন্তকে ঘিরেই তাঁর যাবতীয় ক্ষয়িষ্ণুবোধের সঞ্চালন এবং মৃত্যুচেতনার, শূন্যতার, রিক্ততার এবং অবসাদগ্রস্ততার আবহ সৃষ্টি হয়েছে। এই হেমন্ত আবার কখনো কখনো উজ্জীবনের, পূর্ণতার এবং জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি কোনো চেতনারও প্রতীক হিসেবে এসেছে। তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’য় সংকলিত কবিতার এক চতুর্থাংশ জুড়েই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এই হেমন্তের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। হেমন্ত জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টিপ্রেরণার অন্যতম উৎস, তাঁর কাব্যদর্শনের অনেকখানিই হেমন্তের নৈকট্যে সিদ্ধহেতু তিনি হেমন্তের কবি হিসেবেও ভাবিত হতে পারেন। নিশ্চেতনা, মৃত্যুচেতনা এবং বিনষ্টি বা ধ্বংসের প্রতীক হেমন্ত মূলত কবির স্বপ্নমন্থিত জীবনচেতনার-ই এক ভিন্ন দিক। জীবনানন্দ দাশের কবি-অভিব্যক্তির সাথে হেমন্তের অভিযোজন নিতান্তই ব্যক্তি জীবনানন্দের মননশীলতার লাজনম্র নিঃসঙ্গ ছাঁয়া। ‘হেমন্তের হিম মাঠে, আকাশের আবছায়া ফুঁড়ে / বক বধূটির মত কুয়াশায় শাদা ডানা যায় তার উড়ে’ (কবি, ঝরাপালক), অথবা ‘হেমন্তের ঝড়ে আমি ঝরিব যখন– / পথের পাতার মত তুমিও তখন / আমার বুকের পরে শুয়ে রবে?’ (নির্জন স্বাক্ষর, ধূ ,পা)। জীবনানন্দ দাশের প্রেম ও যে মৃত্যু-স্বপ্নের বিষণ্ণ আঁধারে, রিক্ততার গহিনে বিমলিন, সে ব্যাপারে আমাদের আর কোনো সন্দেহ থাকে না। ‘হেমন্তের হিম মাঠ’ অথবা ‘হেমন্তের ঝড়’ এইসব চিত্রকল্প নিতান্তই ক্ষয়িষ্ণুবোধেরই উদ্গিরণ।
জীবনানন্দ দাশের হেমন্ত কখনো কখনো উৎসবেরও প্রতীক, যদিও তা পূর্ণ অঙ্গীকারের ধারণারহিত; অবসাদের ছায়ায় ভারাক্রান্ত। ‘মাঠের নিস্তেজ রোদে নাচ হবে–/ শুরু হবে হেমন্তের নরম উৎসব …… কার্তিকের মিঠে রোদে আমাদের মুখ যাবে পুড়ে;’ (অবসরের গান, ধূ ,পা)। এই উৎসবের চিত্রকল্প, কীটস-এর Ode to a Nightingale কবিতার ‘Dance, and Provencal song and suburnt mirth’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। এই উৎসব শেষ হলে ‘দূরের নদীর মতো সুর তুলে অন্য এক ঘ্রাণ-অবসাদ / আমাদের ডেকে লয়, তুলে লয় আমাদের ক্লান্ত মাথা, অবসন্ন হাত’ (ঐ) এবং শেষমেশ অবসাদিত কর্ণকুহরে প্রবেশ করে ‘গ্রীষ্মের সমুদ্র থেকে চোখের ঘুমের গান’। মদ্য-মাতাল এই অবসাদ কবির উজ্জীবনোন্মুখ অন্তর্গত গূঢ় বেদনারই এক বিশেষ অভিজ্ঞান। আবদুল মান্নান সৈয়দ বলছেন, ‘অবসরের গান কবিতার শস্যোৎসব বস্তুত কবির হৃদয়োৎসব’ (শুদ্ধতম কবি, ১৯৭২ পৃ. ৯৪)। এই উৎসব উজ্জীবনের প্রতীক হলেও এর অন্তঃস্থিত ধ্বনি, জীবন ও মৃত্যুর চেয়ে অধিক অন্য কোনো অনুধ্যানে স্থিতধি।
‘পিরামিড’ কবিতায় মানবজীবনের নশ্বরতার ট্র্যাজিক আকুতি ফুটে উঠেছে। বিস্মৃতপ্রায় সময়ের কথা মনে করে কবি-মনে হাহাকার পড়ে যায়। ‘মোদের জীবনে যবে জাগে পাতাঝরা / হেমন্তের বিদায় কুহেলী / অরন্তুদ আঁখি দু’টি মেলি/ গড়ি মোরা স্মৃতির শ্মশান …… অতীতের হিমগর্ভ কবরের পাশে / ভুলে যাই দুইফোটা অশ্রু ঢেলে দিতে’ (পিরামিড, ঝ,পা)। এই কবিতায় পুনরুজ্জীবনবাদী চেতনার সংক্রমণ লক্ষ করা যায়।
জীবনানন্দের কবিতায় প্রকৃতির বীভৎস-বিরূপ, ভয়ার্ত রহস্যঘন বর্ণনা রয়েছে; তবে সে প্রকৃতি ইংরেজ কবি ও ঔপন্যাসিক টমাস হার্ডি’র (১৮৪০-১৯২৮) শত্রুতায় অবতীর্ণ প্রকৃতির মতো নয়। হার্ডির প্রকৃতি প্রতিকুল এবং শত্রুতায় ক্রিয়াশীল, জীবনানন্দ দাশের প্রকৃতি কখনো কখনো বীভৎস হলেও শত্রুতায় ক্রিয়াশীল নয়। ‘ডাইনীর মতো হাত তুলে তুলে ভাঁট আশশ্যাওড়ার বন / বাতাসে কি কথা কয় বুঝিনাকো, বুঝিনাকো চিল কেন কাঁদে; পৃথিবীর কোনপথে দেখি নাই আমি, হায় এমন বিজন শাদাপথ-সোঁদাপথ …… / সন্ধ্যা আসে সহসা কখন; / সজিনার ডালে পেঁচা কাঁদে নিম-নিম-নিম কার্তিকের চাঁদে’ (গোলপাতা ছাউনির বুক চুমে, রূ, বা)। এই কবিতায় প্রেতগ্রস্থ প্রকৃতির ভয়াবহ রহস্যঘন প্রশ্বাসই মূর্ত হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির এরকম বিরূপ প্রতিকৃতি তিনি খুব কম সংখ্যক কবিতায়ই এঁকেছেন। গা ছমছমে, শ্বাসরুদ্ধকর ভূতুড়ে এই কাব্যচিত্র কবির প্রকৃতিবিষয়ক গূঢ় দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয়ক।
‘হেমন্ত’ আবার কখনো কখনো নস্টালজিক আমেজে ভরপুর। ‘লোকেন বোসের জর্নাল’ কবিতায় যেমন সুজাতাকে তিনি কি এখনো ভালবাসেন, এ প্রশ্নের জবাব তিনি নিজেই দিয়েছেন এভাবে ‘সেটা অবসরে ভাববার কথা / অবসর তবু নেই, / তবু একদিন হেমন্ত এলে অবকাশ পাওয়া যাবে।’ অথবা ‘হেমন্তে ঘাসে নীল ফুল ফোটে / হৃদয় কেন যে কাঁপে, / ‘ভালোবাসতাম’ স্মৃতি-অঙ্গার-পাপে, / …… ঘাসের ভিতরে নীল শাদা ফুল ফোটে হেমন্ত রাগে’–এইসব পঙ্ক্তিতে উজ্জীবনের হঠাৎ জাগা প্রত্যাশা যেন বিষণ্ণতার মহাশূন্যতায় হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়। অতীতমুখীনতায় অন্বিষ্ট কবি স্বস্তি খোঁজেন স্মৃতি শৃঙ্গারে; স্মৃতি রোমন্থনের অবকাশ যেন একমাত্র হেমন্ত।
‘প্রথম ফসল গেছে ঘরে / হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে / শুধু শিশিরের জল; (পেঁচা, ধূ, পা) ‘ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম পউসের রাতে’ (অন্ধকার, ব.সে) কারণ, ‘গভীর অন্ধকারের ঘুমের আস্বাদে’ তাঁর ‘আত্মা লালিত’; তিনি লক্ষ করেন ‘গভীর নীলাভতম ইচ্ছা চেষ্টা মানুষের … / হেমন্তের কুয়াশায় ফুরাতেছে অল্পপ্রাণ দিনের মতন।’ (সিন্ধুসারস, ম, পৃ)। এইসব কবিতা মূলত রিক্ততা, শূন্যতা এবং মৃত্যুচেতনার অঙ্গীকারে ঋদ্ধ।
‘বেড়াল’ কবি জীবনানন্দ দাশের একটি সুররিয়ালিস্টিক কবিতা। আত্মমগ্ন কবির এ এক অন্তরঙ্গ স্বপ্নযাত্রা। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় ১৯৩৭ সালে এবং পরে ১৯৪২ সালে ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়। এটি কবির অন্যতম বিখ্যাত কবিতা। কবি বেড়ালের প্রতীকে এক অন্যরকম জগতের চিত্র এঁকেছেন যা আমাদের বিস্ময়ের উদ্রেক করে। অনুভূতির জগৎকে তছনছ করে ফেলে।
‘সারাদিন একটা বিড়ালের সঙ্গে ঘুরে-ফিরে কেবলই আমার দেখা হয় / গাছের ছায়ায়, রোদের ভিতরে, বাদামী পাতার ভিড়ে’; বেড়াল ও মানুষের সংগ্রাম যেন মুখোমুখি এখানে।
কবি আল মাহমুদ এক জায়গায় লিখেছেন, আমি অনেকবার পড়েও আজ পর্যন্ত জীবনানন্দ দাশের বেড়াল কবিতাটি বুঝি নাই। কবিতা যে সত্যি সত্যি রসেরই ব্যাপার জীবনানন্দ-কথিত এ বাণী আরো সত্য হয়ে ওঠে যখন আমরা বেড়াল কবিতাটি পড়ি। যে বেড়াল ‘সারাদিন সূর্যে পিছনে-পিছনে চলছে’ এখানে বেড়াল কবির অন্তরাত্মার প্রতীক। এখানে প্রতীক এক রহস্যের আবরণে কেবলই পাঠককে বিভ্রান্ত করে, এক বিস্ময়ের দিকে ধাবিত করে। সেই বিস্ময় আরো প্রকটিত হয় ‘শাদা মাটির কঙ্কালের ভিতর’। স্বপ্নের দুরন্ত রাস্তা থেকে তুলে আনা এই বেড়াল জীবনানন্দের এক অদ্ভুত সৃষ্টি।
কবি জীবনানন্দ দাশ সেই বহুস্তরিক, আলোকসঞ্চারী কবি যিনি ক্রমশই উজ্জ্বল থেকে উজ্জলতর হচ্ছেন, ছড়িয়ে পড়ছেন সাধারণ্যেও এবং যার ছায়া এড়িয়ে নতুন কবিতা লেখা আজকে অনেকখানি মুশকিল হলেও আমাদের একালের মেধাবী কবিরা লড়ে যাচ্ছেন জীবনানন্দ-উত্তর কবিতার নতুন পথের সন্ধানে
‘বেড়াল’ কবিতায় ‘হেমন্তের সন্ধ্যায় জাফরানরঙের সূর্যের নরম শরীরে / শাদা থাবা বুলিয়ে বুলিয়ে’ খেলতে খেলতে যে ‘বেড়াল’ অন্ধকারকে ছোট ছোট বলের মতো সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিল, সেই বিড়াল এলিয়টের ম্যাকাভিটি নয়। ম্যাকাভিটিকে কেউ দেখতে পেত না; কিন্তু জীবনানন্দের বিড়ালের সাথে ঘুরেফিরে কেবলই দেখা হয়, ‘মৌমাছির মতো নিমগ্ন’ এই বিড়াল মিশে গেছে প্রকৃতির অন্তর্সত্তায়। এলিয়টের ঔপনিবেশিক বিড়াল থেকে জীবনানন্দ বেরিয়ে এসেছেন ‘খণ্ডবাদ থেকে অখণ্ডবাদের দিকে’। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন: ‘বেড়াল’ কবিতাটি অদ্ভুত রসে ভরপুর, বিস্ময়করকে চরমে টেনে নিলে কী দাঁড়ায় এটি তারই উদাহরণ (কালের পুতুল)। ‘তারপর অন্ধকারকে ছোটো-ছোটো বলের মতো থাবা দিয়ে লুফে আনলো সে, সমস্ত পৃথিবীর ভিতর ছড়িয়ে দিলো’। অবিরাম স্বপ্নসৌন্দর্যের দাঁড় টেনে টেনে পরিশেষে এক নিরাশার মধ্যে এর পরিসমাপ্তি– সমস্ত পৃথিবীতে সে বেড়াল ছড়িয়ে দিল অন্ধকার। ‘হেমন্তের সন্ধ্যা’ এখানে পৌঢ়ত্বের প্রতীক, ফুরিয়ে যাওয়া জীবনের বিষাদ। নানা কারণেই পরাবাস্তববাদী কবিদের কাছে হেমন্ত প্রিয় ঋতুর বিশেষ আবহ নিয়ে দাঁড়ায়। মগ্নচৈতন্যের, স্বপ্নময়তার, আত্মতার বিপুল বিস্তৃত গহীনের সন্ধান পাওয়া যায় এই কবিতায়।
স্বপ্ন ও কল্পনার গভীর তলদেশ ছুঁয়ে অবচেতনের অন্তর্ভেদী আলোড়ন সাযুজ্য পেয়েছে তাঁর কিছু পরাবাস্তববাদী কবিতায়। তবে তাঁর এই স্বপ্ন-কল্পনা লাগামহীন ঔদ্ধত্যে বিলীন হয়ে না গেলেও কখনো কখনো অনেকটা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। আমাদের বোঝাবুঝির জগৎ অসহায় হয়ে পড়ে। অবশ্য ভালো কবিতা বোঝাবুঝির আগে ‘কম্যুনিকেট’ করে যেমনটি বলেছেন টি.এস. এলিয়ট।
‘কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে’ আমরা দেখি ‘মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়’। ঘোড়া কবিতায় যে পরাবাস্তব চিত্রকল্পের সন্নিবেশ ঘটেছে, তা কার্তিকের জ্যোৎস্নাকে কেন্দ্র করে বেশি প্রত্যয়ী হয়ে উঠেছে। নরম বিকেল, কুয়াশা, জ্যোৎস্না এবং সর্বোপরি অন্ধকারের প্রতি তাঁর দুর্নিবার মোহ তাঁর মৃত্যুচেতনার দিগন্তকে আরো প্রসারিত করেছে। তাঁর এই মৃত্যুচেতনা এক নার্সিসাসীয় উন্মাদনায় উন্মুখ এবং গভীর মমতায় আবেশিত। ‘অন্ধকার’ কবিতায় এই বোধ সর্বাধিক উন্মোচিত এবং গাঢ়ীকৃত হয়েছে। এই কবিতার জীবন-বিমুখীনতা কখনোই জীবনহীনতা নয়; ‘যুগজ্বরে’ আক্রান্ত মানস-প্রতিক্রিয়া যা আধুনিক কবিতার চারিত্র্যলক্ষণ।
‘হেমন্তের রাত আজ ক্ষুব্ধতায় জনতায় নর্মদায়-ক্লেদে / লোভাতুর ক্রুর রাষ্ট্র সমাজের রতির নৈরাজ্যে অসম্ভব অন্ধ মৃত্যুতে …… নরকের নিরাশার প্রয়োজন, রয়ে গেছে জেনে, তবু বলে; / ‘গভীর গভীরতর তবুও জীবন’ (অনেক মৃত বিপ্লবী স্মরণে, আ,পৃ)। ইতিহাস পরিক্রমণ এবং রাষ্ট্র সমাজের বাহ্যিক আবরণের তলে এক উজ্জ্বলতর জীবনের ইঙ্গিত রয়েছে এই কবিতায়। রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, সাধারণ জনতার ক্লেদাক্ত জীবনবঞ্চনা ও গভীর নিরাশায়ও জীবনের জয়গান করেছেন কবি ‘গভীর, গভীরতর তবুও জীবন’। ‘হেমন্ত’ এখানে জরা, রিক্ততা এবং নৈরাশ্য সত্ত্বেও গভীর জীবনের আশ্বাসে ভরপুর।
‘রূপসী বাংলা’র কবি বাংলার প্রকৃতিসম্ভার ‘তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ’ দেখে আর পৃথিবীর রূপ খুঁজতে যান না, সেই কবির এই প্রকৃতিগত ভাব, ভাষা পেয়েছে ‘হেমন্ত’কে কেন্দ্র করে। তাই মৃত্যুর পরে তিনি ‘ধানসিঁড়ি নদীর তীরে এই বাংলায় …… ‘কার্তিকের নবান্নের দেশে’ ফিরে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন কখনো, ‘শঙ্খচিল শালিখের বেশে’ অথবা ‘ভোরের কাক হয়ে’ …… বাংলার নদী মাঠ খেত ভালোবেসে’ (আবার আসিব ফিরে, রূ,বা)। তাঁর এই স্বাদেশিক মমতাময় উচ্চারণ তাঁর কবি-অভিব্যক্তির সম্পূরক এক স্বতন্ত্র প্রত্যয় যা সমগ্র বাংলা কবিতায় শুধু বিরলই নয়, অপ্রত্যাশিতও বটে। কবিতাটির শেষের কথা ‘আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে’ বাংলাদেশের প্রকৃতির প্রতি তাঁর নিবিড় মমতা তাঁকে প্রকৃতিরই অভিন্ন সত্তায় রূপান্তরিত করেছে যেন। যদিও সমস্ত কবিতাটি-ই মৃত্যুচেতনার প্রগাঢ় ছায়ায় আবৃত, তথাপি নতুন জীবনের তথা পুনরুজ্জীবনবাদী চেতনার অভিঘাত-ই এখানে মুখ্য।
জীবননানন্দ দাশ সেই নতুন রাস্তার নিঃসঙ্গ পথিক, যার কাব্যচেতনার যুগনিঃসৃত ভার, কালচেতনার সংক্রাম তাঁকে চিরবহমান সময়ের দিকে ধাবিত করেছে। আধুনিক বাংলা কবিতায় মৃত্যুচেতনার তিনিই প্রথম সফল আমদানীকার এবং তাঁর কবিতায় যে ক্লান্তি, যন্ত্রণা এবং অবসাদ লেগে আছে আতীব্র, তা আধুনিক যুগ-যন্ত্রণারই প্রতিভূ। তাঁর প্রেমের সর্বাংশে লেগে আছে জরার গন্ধ; তাঁর প্রেমের মৃত্যু ঘটে ক্ষণিকেই, অতৃপ্তির ঐশ্বর্যে তাঁর প্রেমচিন্তা উচ্ছ্বসিত। ‘অঘ্রান এসেছে আজ পৃথিবীর বনে; / সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে / হেমন্ত এসেছে তবু; (অঘ্রান প্রান্তরে, ব,সে)। ‘আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউস সন্ধ্যায়, / দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল / কুয়াশার; …… / সব রাঙ্গা কামনার শিয়রে যে দেয়ালের মতো এসে জাগে / ধূসর মৃত্যুর মুখ– ……।’ (মৃত্যুর আগে, ধূ ,পা)
এই ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতাটির বিষয়ে দীপ্তি ত্রিপাঠী’র বক্তব্য: ‘কবিতাটি পড়তে পড়তে মনে হয়, সর্ব ইন্দ্রিয় দিয়ে কবি জীবনের পাত্রে মৃত্যু রস পান করছেন।’ (আধুনিক বাংলা কাব্য পরিচয় ১৯৯২, পৃ: ১৪৫)। ভয়ঙ্করের মধ্যে সৌন্দর্য অবলোকনের একটি কাব্যিক অভিযান জীবনানন্দে রয়েছে এবং তাঁর গভীর মৃত্যুচেতনার, জরা ও বিনাশী বৈচিত্র্যের আড়ালেও ভেসে ওঠে এক পরিব্যাপ্ত জীবনের উন্মাদনা, ‘সৌন্দর্য আস্বাদনের’ প্রত্যয়। জীবনানন্দের হেমন্ত-প্রীতির উৎস সম্পর্কে আসাদুজ্জামানের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য– ‘এ হেমন্ত শীতের অস্ত্রাঘাতে জর্জর, স্থবিরতার পটভূমি হলেও এখানেই কবি সাক্ষাৎ পান জীবনের পরিপূর্ণতার; …জীবনানন্দ দাশের কাব্যের কেন্দ্রীয় ঋতু হেমন্ত …… তার আপাত ধূসরতার প্রচ্ছদে জীবনের অপর আকর্ষণকে উদগ্র করে তোলে।’ (জীবন-শিল্পী জীবনানন্দ দাশ, পৃ. ২৪)। উল্লেখ্য যে, জীবনানন্দের মৃত্যুচেতনার মোহন দীপাবলী হেমন্ত ও শীতের সান্নিধ্যেই মহিমান্বিত এবং মূলত হেমন্তেই পরিব্যাপ্ত, ভাস্বর। যন্ত্র-সভ্যতার প্রতি গভীর ঘৃণা ছিল তাঁর; তিনি বুঝেছিলেন ‘নিখিল বিষ কী রকম মধুর হতে পারে।’ শেষ আশ্রয় হিসেবে প্রকৃতির সান্নিধ্যই খুঁজেছেন এবং মৃত্যুর পরেও প্রকৃতিসত্তায় একাকার হয়ে যাবার, প্রকৃতি পরিবারের চিরকালীন সখ্যই তাঁর আরাধ্য হয়েছে। আর সে কারণেই জীবনের বহিঃরঙ্গচর্চা থেকে ফিরে এসেছেন জীবনের ভিতরে, একান্ত হৃদয়ে। ‘বৃত্ত যেন শুদ্ধতায় নিরুত্তর কেন্দ্রে ফিরে এল / এই শান্ত অঘ্রানের রাতে …… বাংলার শস্যহীন ক্ষেতের শিয়রে/মৃত্যু, বড়, গোল চাঁদ’, (হেমন্ত, আ,পৃ)। তাঁর অন্তর্মুখী বেদনার, শূন্যতার আভাসন ‘অঘ্রান’ কবিতায় ধরা পড়েছে। ‘আমি এই অঘ্রানেরে ভালোবাসি বিকেলের এই রঙ-রঙের শূন্যতা / রোদের নরম রোম ঢালু মাঠ / বিবর্ণ বাদামী পাখি হলুদ-বিচালি …… এখন অঘ্রান এসে পৃথিবীর ধরেছে হৃদয়’; (অঘ্রান, বে,অ,ক)।
প্রকৃতির বিভৎসতা, রিক্ত-শূন্য-বিরূপ আবহ, বৈনাশিক ভাব-বৈচিত্র্যের প্রচ্ছায়ায় তাঁর কিছু কিছু কবিতা উদ্বেলিত হলেও প্রকৃতিকে নিয়ে অবিশ্বাসের গান তিনি গাননি কখনো। প্রগাঢ় বিশ্বাসের মধ্যেই তাঁর প্রাকৃতিক স্বপ্নমন্থন ভাস্বরিত; ‘কোথাও আসিবে মৃত্যু কোথাও সবুজ মৃদু ঘাস / আমারে রখিবে ঢেকে – ভোরে, রাতে, দু-প্রহরে পাখির হৃদয়’ (দূর পৃথিবীর গন্ধে, রূ, বা)।
‘অঘ্রানের বিকেলের কমলা আলোকে / নিড়োনো খেতের কাজ করে যায় ধীরে’; (আহ্বমান ব,সে) এই নির্জন খেতের মূর্খ অভিভূত চাষাদের চিরকালীন জীবনসংগ্রাম এবং দারিদ্র্য অতঃপর অস্তিত্বের টানাপোড়েন, ধ্বংস – এ সবের মধ্যেই কবির নির্ঘোষ মনোবাঞ্ছা স্ফুরিত হয় ‘কবে তার ক্ষুদ্র হেমন্তের বেলা হবে নিসর্গের চেয়েও প্রবীণ’। নিম্নবর্গীয় চেতনা এবং কসমিকবোধে আক্রান্ত এই পঙ্ক্তি বিশ্বকবিতার ক্ষেত্রেও বিরল ও ব্যতিক্রম।
আশা ও নিরাশার মিশ্র প্রত্যয় বিভাসিত হয় তাঁর ‘কুড়ি বছর পর’ কবিতায়। জীবনানন্দের স্বপ্নচেতনে আলো ও আঁধারের যৌথ উপস্থিতি তাঁর কাব্যসত্তায় বাহিত করেছে এক অতিবর্তী সত্যতা, যা তাঁর কবিতার মৌল অঙ্গীকারকে স্থায়িত্ব দিয়েছে, বহুমাত্রিক দিকনির্দেশনায় অভিষিক্ত করেছে। ‘আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি! …… হয়ত ধানের ছড়ার পাশে / কার্তিকের মাসে …… সোনালী-সোনালী চিল – শিশির শিকার ক’রে নিয়ে গেছে তাওে / কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তাহারে’ (কুড়ি বছর পরে, ম,পৃ)। চেতন-অবচেতনের যৌথ প্রক্রিয়ায় সংগঠিত তাঁর দার্শনিক প্রত্যয় আমাদের এমন এক রহস্যঘন পরিবেশে নিয়ে যায় কখনো কখনো অথবা প্রায়শ যে আমরা তাঁর কবিতার সেই সুদূর প্রদেশে নিতান্তই অসহায়ত্ব বোধ করি এবং ব্যর্থতায় বিমলিন হই। টি.এস. এলিয়েট বলেছেন, অনেক ভালো কবিতা-ই তিনি বহুবার পাঠেও বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন; শুধু কবিতাই নয়, যা কিছু মহৎ শিল্প তা অর্থের নিরিখে বা বোঝা না-বোঝার মাপকাঠিতে বিবেচ্য নয়। কারণ, কালোত্তীর্ণ শিল্পমাত্র-ই বহুমাত্রিক এবং বহুস্তরিক।
কবিতা বা শিল্প আমাদের উপলব্ধির গভীর জগৎকে নাড়া দিয়ে যায়, চেতনার নন্দনভূমে ছড়িয়ে দেয় সৌন্দর্য-আলো, যে আলোয় আমরা দেখতে পাই জীবন ও জগতের সমূহ বিন্যাসকে। কবি জীবনানন্দ দাশ সেই বহুস্তরিক, আলোকসঞ্চারী কবি যিনি ক্রমশই উজ্জ্বল থেকে উজ্জলতর হচ্ছেন, ছড়িয়ে পড়ছেন সাধারণ্যেও এবং যার ছায়া এড়িয়ে নতুন কবিতা লেখা আজকে অনেকখানি মুশকিল হলেও আমাদের একালের মেধাবী কবিরা লড়ে যাচ্ছেন জীবনানন্দ-উত্তর কবিতার নতুন পথের সন্ধানে। মৃত্যুর প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ জীবনের প্রতিই যে প্রচণ্ড ভালোবাসার বিষয়, সেকথা আমরা আগেই বলেছি। তিনি বলেছেন ‘সব ভালোবাসা হলো যার, দেখুক সে মৃত্যু ভালোবেসে।’ একথা নির্মম হলেও সত্য যে, মৃত্যুকে ভালোবাসার মধ্য দিয়েই কেবল জীবনের পরিপূর্ণতাকে স্পর্শ করা যায়– জীবনানন্দ দাশ তা ভালো করেই বুঝতেন। তার মধ্যে এই চেতনা দানা বেঁধে উঠেছিল হয়তো ব্যক্তি জীবনের আনন্দহীনতা কিংবা অশান্তির মিথস্ত্রিয়ায় – মৃত নক্ষত্রের শীতল আবরণে তিনি খুঁজেছিলেন আশ্রয়।
‘হেমন্তের প্রান্তরের তারার আলোক’ (তিমির হননের গান) এবং সেই আলোকের হাতছানিতে নিজেকে মানুষ হিসেবে – ‘সৃষ্টির হৃদয়ে / হৈমন্তিক স্পন্দনের পথের ফসল’ (সময়ের কাছে) তুলে দিয়ে শেষাবধি তিনি একটি নক্ষত্রের মতো এসে ‘তারপর একপায়ে চলে / ঝাউয়ের কিনার ঘেঁসে হেমন্তের তারাভরা রাতে’ (একটি নক্ষত্র আসে) ‘উজ্জ্বল ও নিরুজ্জ্বল নক্ষত্র-গ্রহের আলোড়নে / অঘ্রানের রাত্রি হয়; ……’ আর ‘শেষ ট্রাম মুছে গেছে, শেষ শব্দ, কলকাতা এখন / জীবনের জগতের প্রকৃতির অন্তিম নিশীথ; (ঐ)। হেমন্ত ছিল তাঁর প্রগাঢ় কবিসত্তারই অভিব্যক্তি; ধ্বংস, বিনষ্টি ও অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে হেমন্তের প্রতীকীসত্তা উজ্জ্বলতর হয় যখন দেখি, ব্যাপারটি কাকতালীয় যদিও, কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু হেমন্ত ঋতুতে ঘটেছে। ট্রামের ধাক্কায় আহত হওয়া এবং (১৩৬১ কার্তিক ৫) মৃত্যুবরণ যেন সেই বিনাশী হেমন্তেরই মহাডাক ‘শেষ ট্রাম মুছে গেছে, শেষ শব্দ……..।’

















































































































































