ঘরের ভেতর থেকে কেমন রিনরিনে একটা কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছে তমাল। মেয়েলী কণ্ঠে, চাপা স্বরে। গলা উঁচু করে দু-একবার ডাইনিং রুমের পর্দা ভেদ করে সে ভেতরের দিকে দেখতে চেয়েছে কাউকে দেখা যায় কি না। ঠিক তখনি ইফতির মেজো বোন বসার ঘরের পাশে থাকা বারান্দায় গিয়ে তোয়ালে নাকি গামছা কি যেন হাতে নিয়ে দ্রুতই ভেতরের রুমে চলে গেছে।
তমাল কাঁচুমাচু মুখ করে বসে আছে ইফতিদের বসার ঘরে। অন্যসময় সে বাসায় ঢুকে সরাসরি ইফতির রুমে চলে যায়। কিন্তু আজ দরজা খুলেই ইফতি বললো, টিচার, আপনার সাথে বাবা কথা বলবে।
ইফতির বাবা আমীর আলী লোকটাকে কেন যেন ভয় লাগে তমালের। মনে হয় সারাক্ষণ রেগে থাকেন। তমাল যখন ইফতিকে পড়াতে আসে সে সময়টায় সাধারণত তিনি বাসায় থাকেন না। আর থাকলেও বেশির ভাগ সময়ই ঘুমিয়ে থাকেন। লোহার ব্যবসা আমীর আলীর। সারাক্ষণ লোহা-লক্করের ঝনঝনানির মধ্যে থাকতে থাকতে লোকটার মনটা লোহার মতো কঠিন হয়ে গেছে মনে হয়। তিনি কথাও বলেন কপাল কুঁচকে, চোখ মুখ শক্ত করে।
আজ টিউশনিতে আসার সময় হঠাৎ এমন বৃষ্টি শুরু হলো, এদিকে তমালের হাতে কোনো ছাতা না থাকায় বলতে গেলে প্রায় কাকভেজা হয়েই তমাল ইফতিদের বাসায় ঢুকেছে। এখন আষাঢ় মাস। যে কোনো সময় বৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তমালের ছাতা নেই। ছাতা কেনার দু-চারদিনের মধ্যেই কিভাবে যেন ছাতাটা হারিয়ে যায়। প্রতিবারই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এত মেজাজ খারাপ হয়! কিন্তু কিছুই করার থাকে না। এ মাসের টিউশনির বেতনটা পেলেই প্রথম কাজ হবে ছাতা কিনে ফেলা। তমাল বলতে গেলে পুরা ভিজেই আছে, কিন্তু তা খেয়াল করার মতো কেউ নেই এখানে। সে ইফতিদের দেয়ালে ঝুলানো সুইচ বন্ধ করা টিভিটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
ভেতরের রুম থেকে ইফতির বাবা আমীর আলী একটা ঝুড়িতে অনেকগুলো সাগর কলা হাতে নিয়ে তমালের সামনে এসে বসলেন। আমীর আলী বিশাল এক দেহের অধিকারী। গায়ের রঙটা হাবশিদের মতো। কথা বলেন আঞ্চলিক ভাষায়। তিনি খুব স্বাভাবিক কথা বলার পরও মনে হয় কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করছেন। ইফতির কাছে সে শুনেছে তার বাবা প্রায় সময় তার মাকে মারে। তার বোনদেরকে মারে। একমাত্র ইফতি ছাড়া তিনি প্রায়-সময় মনের সাধ মিটিয়ে সবাইকে পিটিয়ে আধমরা করে ছাড়েন এক-একদিন। ওহ্, শুধু ইফতি না, ইফতির দাদিও থাকেন একই বাসায়। ইফতির দাদি আর ইফতি বেঁচে থেকে অসহায়ের মতো চোখের সামনে অন্যদের আধমরা হতে দেখেন। ইফতির দাদি অবশ্য সবটা দেখেন না। তার ছানি পড়া চোখে সব কিছুই ঝাপসা। আমীর আলী তাকে ছানি অপারেশন এর জন্য পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে গেছেন দুইবার। দুইবারই তিনি কান্নাকাটি করে ফিরে এসেছেন। তার ধারণা অপারেশন মানেই তার চোখ বের করে ফেলবে কোটর থেকে। তিনি আর বাঁচবেন ক’দিন। অপারেশন এর ঝক্কি ঝামেলায় যেতে নারাজ। মনে মনে তিনি ভাবেন, ঝাপসা হলেও তবু্ও তো সবাইকে দেখেন। অপারেশন করতে ডাক্তাররা চোখ বের করে ফেললে বাকিটা জীবন কিভাবে চলবেন। চোখের ছানি অপারেশন খুবই সাধারণ অপারেশন, ভয়ের তেমন কিছুই নেই এই কথা ইফতির দাদিকে বোঝানোর সাধ্য কারো নেই। ইফতির বাবা আমীর আলীর তো একেবারেই নেই। ছেলেকে মুখের উপরই ভর্ৎসনা করেন তিনি। বলেন, তুই মর হারামজাদা। রক্তের দোষ, বেক অইছে তোগো রক্তের দোষ, তোগো জাতের দোষ, বলে ছেলেকে বকেই যান।
ইফতির মুখে প্রায়-সময় তার বাবার পেটানোর গল্প শুনে তমাল বেশ দমে যায়। টিউশনিটা নেহায়েত প্রয়োজন না হলে ছেড়েই দিতো। অবশ্য শুধু টাকা না ইদানীং ইফতির প্রতিও ভীষণ একটা মায়া অনুভব করে তমাল। ছোট ভাইয়ের প্রতি বড় ভাইয়ের মনে যে মায়ার উদ্রেক হয় ঠিক সেরকম একটা মায়ার অস্তিত্ব টের পায় তমাল নিজের মধ্যে।
ইফতির প্রথম সাময়িক পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে পরশুদিন। ইফতি খুবই খারাপ রেজাল্ট করেছে। অংক, ইংরেজি দুটোতেই ফেল। আর বাকিগুলো ফেলের পাশে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো অবস্থা। গতকাল টিউশনিতে আসার সময় তমাল কিছুটা আতঙ্কে ছিল, এই বুঝি ইফতির বাবা-মা তাকে কথা শোনাবে। কিন্তু না, সেরকম কিছু না হওয়ায় তমাল যেন কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। কিন্তু আজকে ইফতির বাবা তার সাথে কথা বলবে শুনেই তমাল বুঝেছে কি বলবে। টিউশনিটা নিশ্চিত হাতছাড়া হলো। ইফতি ভালো ছেলে। কিন্তু পড়ালেখায় ওর বেসিকটা খুবই দুর্বল। ক্লাস সেভেনে পড়ে। অথচ আলজেব্রার সাধারণ সূত্রগুলো পারে না। দু-চারটা মুখস্থ করার পরও সূত্রের নিয়ম কানুন বোঝে না। বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার এগুলোতে মারাত্মক দুর্বলতা। কিন্তু ও যথেষ্ট পরিশ্রমী ছাত্র। পড়ালেখায় একদমই ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে না। তারপরও ফলাফলের যাচ্ছেতাই অবস্থা।
আমীর আলীকে দেখে তমাল দাঁড়িয়ে সালাম দিল। তাকে হাত ইশারায় বসতে বলে আমীর আলী কলার ঝুড়িটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরে গম্ভীর গলায় বললেন, কলা খান মাস্টার সাব। সাগর কলায় পচুর ভিটামিন আছে।
ভদ্রলোক তমালকে সব সময় মাস্টার সাব বলেই ডাকেন। আরে আমনে তো হুরা ভিজি গেছেন। কেউ গামছা দেয় নাই আমনেরে? ইফতি, তোমার মাস্টার সাবেরে একটা গামছা দেও। তোমার স্যারে ভিজি রইছে, তুমি চোখে দেখোনো? চোখের তো একটা ফাংশন আছে, শুধুমাত্র সাজাই রাখনের জইন্য তো আল্লাহ আমাদেরকে কফালের নিচে চোখ দেয় নাই।
ইফতি বাবার কথার প্রত্যুত্তর না করে একটা গামছা এনে তমালের দিকে বাড়িয়ে ধরে। তমাল গামছা হাতে নিয়ে কোনো কথা না বলে মুখে একটা হাসি ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
আমীর আলী সেই হাসির তোয়াক্কা না করে বলে, আমনেরে একটা ধাঁধা জিজ্ঞেস করি, উত্তর দেন তো মাস্টার সাব।
ইফতি মনে মনে বলে, আজ কয়টা টাকার জন্য একটা হাবশি গুন্ডার ধাঁধার জবাব দিতে হচ্ছে, এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি একটা মানুষের জীবনে আর কি হতে পারে! বেটা বদ কোথাকার!
কিন্তু মুখে কোনো কথা না বলে আমীর আলীর দিকে তাকিয়ে থাকে তমাল।
ধরেন আমনের বাসায় বিরানি রান্না অইবো। আমনে চিনিগুড়া চাইল, মাংস, হলুদ, মরিচ, লবন, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, জিরা, ধইন্না, গোল মরিচ, এলাচি, দারচিনি, তেজপাতা, সোয়াবিন তেলসহ যা যা লাগে বেক কিছু দিলেন, কিন্তু খাইতে বসি দেখলেন, বিরানি খাওন যাইতেছে না। রান্না খাওনের উপযোগী হয় নাই। বলেন তো মাস্টার সাব, তাইলে দোষটা কার?
তমাল ফুটা বেলুনের মতো চুপসে যায় যেন। সে চূড়ান্ত-ভাবে নিশ্চিত হয়ে যায় টিউশনিটা হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। আমীর আলী লোকটাকে তার পছন্দ না হলেও আমীর আলী কিন্তু তাকে মাসের এক তারিখেই বেতনটা দিয়ে দেয়। যেটা অন্য অনেক ভদ্রলোকের ঘরে ও পায় না। ওর বন্ধুরাও বলেছে টিউশনির টাকাটা নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীর বাবা-মা যে নাটকটা করে তা বলতে গেলে আরেকটা বিষাদ সিন্ধু হয়ে যাবে।
হুমায়ূন আহমেদের দারুচিনি দ্বীপ উপন্যাসে বন্ধুদের সাথে অয়নের দারুচিনি দ্বীপে যাওয়া প্রোগ্রাম মিস হয়ে যাচ্ছিল টিউশনির ছাত্রের মা যথাসময়ে তাকে বেতনটা না দেওয়ার কারণে। ভাগ্যিস সেখানে অয়নের বন্ধু সঞ্জুর ছোট বোন মোনা ছিল। মোনার আবার বল্টু ভাইয়ের প্রতি দুর্বলতা ছিল। কিন্তু তমালের কাছের বন্ধুদের কারোরই কোনো ছোট বোন নেই। সে এরকম বিপদে পড়লে তাকে বাঁচানোর জন্য তিথি ছাড়া আর কেউ-ই নেই। তিথির নিজেরও সমস্যার শেষ নেই। তারপরও তিথি নিজের সব সমস্যা এক পাশে রেখে তমালের পাশে এসে দাঁড়ালে তমাল নিজের মধ্যে আশ্চর্য এক শক্তির উৎস টের পায়।
ইফতি মনে মনে বলে, আজ কয়টা টাকার জন্য একটা হাবশি গুন্ডার ধাঁধার জবাব দিতে হচ্ছে, এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি একটা মানুষের জীবনে আর কি হতে পারে! বেটা বদ কোথাকার!
তিথির সাথে দেখা নেই এক সপ্তাহ ধরে। তিথি ভার্সিটিতে যাচ্ছে না। চিকনগুনিয়ায় নাকাল হয়ে আছে। ফোনেই যা একটু হাই-হ্যালো করে ফোন রেখে দিতে হয়। কারণ চিকনগুনিয়ার অসহ্য ব্যথায় তিথির কথা বলার শক্তিও থাকে না। ক্যাম্পাসের বাইরে তিথির সাথে খুব কমই দেখা হয়। ক্যাম্পাস থেকে ফিরে তিথিকে ব্যস্ত থাকতে হয় অসুস্থ মায়ের সেবা যত্ন নিয়ে। বড় ভাইদের বাচ্চা পালা নিয়ে। আর তমাল দৌড়াতে থাকে টিউশনিতে, কোচিং সেন্টারের ক্লাস নিতে।
সন্ধ্যার পরে বাইরে থাকতে তিথি খুবই অস্বস্তি বোধ করে। ওর সারাক্ষণ মনে হয় কেউ ওদেরকে ধাওয়া করছে। তমালকে বেঁধে রেখে তাকে রেপ করছে। এই বীভৎস দুঃস্বপ্নটা তিথিকে প্রায় সময় তাড়া করে।
তিথির সঙ্গে একবার সিআরবির শিরিষতলায় বসে গল্প করছিল তমাল, কি কথায় তিথি যেন হেসে গলে পড়ছিল, তমাল মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে ছিল দুনিয়াদারি ভুলে, কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গিয়েছিল স্বপ্নের ঘোরে ঠিক তখনি এক বয়স্ক চাচামিয়া এসে দাঁড়ায় চোখের সামনে। গলা খাঁকারি দিয়ে বলে এইটা ভদ্রলোকের জায়গা। এটা রঙ তামাশার জায়গা না। দেখে তো মনে হয় ছাত্র-ছাত্রী। এখানে বসে আছ কেন? ঘর-বাড়ি নাই? খালি রঙ্গলীলা।
তিথির সামনে লজ্জায় কাঁচুমাচু হয়ে তমাল বলে, এখানে কি বসতে মানা আছে?
বুড়ামিয়া চোখ রাঙিয়ে জবাব দেয়, হ্যাঁ, মানা আছে। এটা রঙ্গলীলার জায়গা না।
তিথি রেগে গিয়ে বলে, আপনি বারবার রঙ্গলীলা, রঙ্গলীলা বলছেন কেন? আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। আমরা বন্ধু। এখানে বসে গল্প করছিলাম, সমস্যা আছে আপনার?
ঠিক তখনি মাগরিবের আজান শোনা গেলো।
বুড়ামিয়া গলার স্বর আগের চেয়ে কিছুটা নিচু করে বলে, এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে, সন্ধ্যায় এখানে ছেলে-মেয়ে একসাথে বসে থাকা যাবে না।
তমাল কিছু বলতে চাচ্ছিল। কিন্তু তিথি আর কথা বাড়াতে চাইলো না। চারপাশটা প্রায় অন্ধকার হয়ে আসছিল। তিথির মনে ভয় হচ্ছিল এই লোকের সাথে কথা বাড়ালে কোনো ঝামেলা হলে চারপাশের লোকজন এই লোকের পক্ষেই কথা বলবে। তাদের পক্ষে বলার জন্য একটা মানুষও থাকবে না।
ইফতিদের বাসায় টিউশনির আরেকটা ভালো দিক হচ্ছে তারা প্রতিদিন নিয়ম করে তাকে নাস্তা দেয়। বেশ ভালোই নাস্তা দেয়। নাস্তার সাথে দেয় এক কাপ দুধ চা। এই দুধ চা-টা পৃথিবীর সেরা চা মনে হয় তমালের কাছে। কখনো কখনো এক কাপ চা শেষ হয়ে গেলে আরেক কাপ চা খাওয়ারও প্রচণ্ড আগ্রহ জাগে তার। কিন্তু বাংলা অভিধানে “চক্ষুলজ্জা” নামে শব্দের বাঁধা ডিঙানোর সংকোচটাকে কাবু করতে পারেনি সে। তমাল নিশ্চিত এই চা ইফতির মা নিজ হাতে বানায়। অমৃতসমান চায়ের স্বাদ তমালের জিভে লেগে থাকে দীর্ঘক্ষণ। ইফতির মা ভদ্রমহিলা অসম্ভব রূপসী। তমালের সামনে নিজ থেকে এসে এসে কথা বলেননি তিনি। কিন্তু হাঁটা চলায় ঘরের স্বাভাবিক কাজকর্মে কখনো কোনো দরকারে ইফতির রুমে আসলে তমালের সাথে দেখা হয়ে গেলে তমাল সালাম দেয়। তিনি নিঃশব্দে মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের কাজ শেষ করে রুম থেকে চলে যান। আবার কখনো কখনো সৌজন্য করে জিজ্ঞেস করেন তমাল ভালো আছে কি না। ইফতির পড়ালেখায় যেন আরও একটু মনোযোগ দেয়, তমাল যেন ইফতিকে বোঝায়, এরকম টুকটাক দু-একটা কথা। ভেতরের রুম থেকে তার ঘর গেরস্থালির কথার শব্দও মাঝে মাঝে তমাল শুনতে পায়। ভদ্রমহিলার গলার স্বরটা অস্বাভাবিক রকমের শান্ত। ঠিক যেন ইফতির বাবার বিপরীত মেরু।
একদিন ইফতির কাছে শুনলো তার বড় বোন স্কুল ছুটির পর বাসায় না ফিরে কোন বন্ধুর সাথে রেস্টুরেন্টে গেছে। এদিকে তার বাবা বাসায় এসে যখন দেখে মেয়ে স্কুল থেকে ফিরে নাই, তার তো মাথা খারাপ অবস্থা। একে ফোন দেয়, তাকে ফোন দেয়। তারপর কয়েকঘন্টা পরে ইফতির বাবার এক ব্যবসায়ী পার্টনার ইফতির বাবাকে ফোন দিয়ে সেই রেস্টুরেন্টে নিয়ে আসে। আর সেদিনই ইফতিদের বাসায় এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে যায়। সেদিন তমাল ইফতিকে পড়াতে গিয়ে সারাক্ষণ গোঙানির আওয়াজ শুনেছিল ভেতরের রুম থেকে। ইফতিও ভয়ে প্রায় শক্ত হয়ে ছিল পুরোটা সময়। তমাল যে একটু আগে ইফতিকে ছুটি দিয়ে চলে আসবে সে উপায়ও ছিল না। কারণ ইফতির বাবা দুই ঘন্টা সময় কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বারবার মনে করিয়ে দেয় তমালকে। সেদিন দুই ঘন্টা পুরোটা সময় এক রুদ্ধকর ঘরে আবদ্ধ থাকার মতো রুদ্ধ মনে হয়েছিল তমালের কাছে। ভেতরের ঘর থেকে আসা কান্নার মিহি শব্দে কতবার যে আনমনা হয়েছিল সে!
ইফতি তো ফরীক্ষায় আন্ডা ফাইছে। এখন এত আন্ডা দিয়ে আমার কাজ কি? হাঁস মুরগী কি আন্ডা ফাড়া বন্ধ করে দিছেনি? হেতে ফড়ালেখা করে না আমনের কাছে? আমীর আলীর প্রশ্ন শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় তমাল। তার মনে হয় সে কত হাজার বছর ধরে এই হাবশি পর্বতের সামনে বসে আছে। সে কি আদতে এখানে আছে! নাকি যা হচ্ছে সব স্বপ্নের ভেতর হচ্ছে! এখন সময় কত! ঠিক তখনই তার প্যান্টের পকেটে থাকা মোবাইলটা বেজে ওঠে। সে কাঁচুমাচু হয়ে প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখে তার মায়ের ফোন। মায়ের ফোন দেখে সে দ্রুত লাইন কেটে দেয়। কিন্তু তার মা আবারও ফোন দেয়। তখন সে রিংটোন সাইলেন্ট করে রাখে।
হঠাৎ আমীর আলী বলে ওঠে, কি ব্যাপার মাস্টার সাব, আমি তো আমনের সাথে কথা বইলতেছি। আমনে কথার জবাব দেন না কেন?
তমাল তখনও বিহবল চোখে তাকিয়ে থাকে আমীর আলীর দিকে।
তখন ভদ্রলোক আবার বলেন, আমনে হা করি তাকাই রইছেন কা? ইফতি কি ফড়ালেখা করে না?
আমীর আলীর প্রশ্নের জবাবে তমাল কী বলবে কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। সে খুব নরম গলায় বললো, আগামীবার থেকে ভালো করবে। ওর ব্রেন অনেক ভালো।
আমীর আলী কিছু বলার আগে এবার ভদ্রলোকের নিজের মোবাইলটা বেজে উঠলে তিনি মোবাইলে কথা বলতে বলতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। তাতে করে তমাল একটা লম্বা দম নেওয়ার সুযোগ পেল।
ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে অনেক ভোগান্তি পেরিয়ে বাসায় ঢোকার পরপরই তমালের মোবাইলটা আবার বেজে ওঠে। মায়ের ফোন দেখে এবার দ্রুতই ধরলো সে। মা জানালেন বাড়িতে তার চাচার সাথে তাদের গ্রামের হোমড়াচোমরা রাজনীতিবিদের ছেলের ঝামেলা হয়েছে। ঝামেলার এক পর্যায়ে তাদের ছেলেপেলেরা তার চাচার ঘর-বাড়ি ভাঙচুর করে গেছে। সেই সঙ্গে সামনের দিনে চাচা কেমন করে ভালো থাকে সেটা তারা দেখে নেয়ার প্রত্যয় নিয়ে ফিরে গেছে। তমাল হতাশ হয়ে মায়ের কথা শুনে যায়। দু-দিন পরপর মা ফোন দিয়ে জানায় তাদের গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় উঠতি বয়সী ছেলেপেলেরা দল বেঁধে হামলা করছে, বাড়িঘর ভাঙছে। একে ধমকাচ্ছে। ওকে চড় মারছে। তমাল শুনেছে হাল আমলে এ ধরনের হামলাগুলো নাকি মববাজি নামে পরিচিত। চাচার বাড়িতে হামলার এক পর্যায়ে তারা ঘরে ঢুকে তার চাচার হাইস্কুলে পড়ুয়া দুই কন্যাকে নিয়ে টানাহেঁচড়াও করেছে।
মায়ের কথা শুনে তমালের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসতে চায়।
তমালের চাচা থানায় মামলা করার জন্য যেতে চাইলে তার বাবা এবং গ্রামের অন্যরা তাকে আটকায়। তারা বোঝায়, মামলা করলে এরা আরও ক্ষেপে যাবে। থানা পুলিশ সব সময় ক্ষমতাবানদের পক্ষেই থাকে। নিরীহদের জন্য এই উপাত্যকা নয়। তুমি কেন নিরীহ হয়ে জন্মাইলা, কিংবা জন্মের পর এই দীর্ঘ যাত্রায় নিজের গা থেকে নিরীহ তকমা কেন দূরে সরাইতে পারো নাই, এটা তোমার অপরাধ। গুরুতর অপরাধ। তাই অপরাধের মাত্রা আর না বাড়িয়ে চেপে যাও। বেঁচে থাকতে হইলে কিংবা বেঁচে থাকার নামে টিকে থাকতে হইলে সব চেপে যাও।
মায়ের কাছ থেকে বাড়ির খবরগুলো শুনে তমাল ঝিম মেরে বিছানায় শুয়ে থাকে। তার কিছুই ভালো লাগে না। হঠাৎ হঠাৎ মনে হয় সব ছেড়ে ছুঁড়ে দূরে কোথাও চলে যায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর মন শান্ত হয়ে এলেই বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, তিথিসহ সবার জন্য মন কেমন করে ওঠে। তখন তার খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে। কখনো কখনো তার খুব ক্ষমতাধর হয়ে বাঁচতে ইচ্ছে করে।
যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শরীরে বহন করে মাদক পাচার করে শুধু তাদেরকেই গ্রেফতার করার খবর শোনা যায়। কিন্তু যারা মাদকের মূল হর্তাকর্তা তাদের হদিস কেউ পায় না। অথচ সবাই তাদের নাম জানে। তারা নেতা হয়। রাজ্য শাসন করে। আতিথেয়তা করে
গত সপ্তাহে ইফতিদের বাসা থেকে বেরিয়ে বাসায় আসার জন্য ঝাউতলা বাজার পেরিয়ে যেতেই অন্ধকারাচ্ছন্ন রাস্তাটাতে দেখে মাদকাসক্ত ছেলে কতগুলো রিকশা আটকিয়ে পথচারীর পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছিল। ঠিক তখনই ইলেক্ট্রিসিটি চলে আসায় ছেলেগুলো এদিক সেদিক ছুটে যায়। এই দৃশ্য দেখে তমাল খুব ভয় পেয়েছিল। পুরা দেশটা যেন নেশার ছোবলে আটকা পড়েছে। ঝাউতলা থেকে আমবাগান হয়ে ফেরার সময় প্রায় রাতেই তার গা ছমছম করে রাস্তার দু-ধারে নেশাখোরদের জটলা দেখলে। সে খুব দ্রুত পায়ে এই রাস্তাটুকু হেঁটে পার হয়। সপ্তাহ খানেক আগে এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় জ্যামের কারণে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল কিছুক্ষণ। এই কিছুক্ষণের মধ্যে তরুণ বয়সী একটা ছেলে মুখের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি চুলকাতে চুলকাতে তার পাশে এসে ফিসফিস করে বললো, ভাই, বাবা লাগবো? বাবা আছে, অরিজিনাল বাবা।
ছেলেটার কথা শুনে তমালের শিরদাঁড়া বেয়ে শিরশির করে একটা তরল স্রোত যেন নিচে নেমে গেছে। সে ভয় পেয়ে ভিড় ঠেলে দ্রুত পায়ে হাঁটা শুরু করে।
মাদক নিয়ে পুলিশের অভিযানগুলোও তার কাছ খুব হাস্যকর লাগে। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শরীরে বহন করে মাদক পাচার করে শুধু তাদেরকেই গ্রেফতার করার খবর শোনা যায়। কিন্তু যারা মাদকের মূল হর্তাকর্তা তাদের হদিস কেউ পায় না। অথচ সবাই তাদের নাম জানে। তারা নেতা হয়। রাজ্য শাসন করে। আতিথেয়তা করে। মসজিদ বানায়। মাদ্রাসা বানায়। গরীব বাবার বিবাহযোগ্য কন্যার বিয়েতে সহায়তা করে। ভাষণ দেয়। ক্ষমতা তাদের সাথে সাথে ঘোরে। পুলিশ তাদের ধরে না। কারণ তারা তো নিপাট ভদ্র মানুষ। অনেকটা ফেরেশতা তুল্য। তাই তাদের নাম কি উচ্চারণ করা যাবে! পুলিশের বড় বড় হর্তাকর্তারা তাদের নামে অভিযোগ পায় না। যে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অবর্ণনীয় কষ্ট করে ফসল ফলাতে গিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিঃস্ব হয়ে ব্যাংকের কৃষি লোনের কয়টা টাকা পরিশোধ করতে পারে না তার হাতে হাতকড়া পরিয়ে তাকে থানায় নিয়ে যায়। এদিকে মাদক সম্রাটদেরকে দেখার সময় চোখে টিনের চশমা পরে থাকে, আর ছিঁচকে মাদক বহনকারীদের আটক করে নিজেদের হিরোগিরি জাহির করছে; তাদের দেখলে কখনো কখনো তমালের মনে হয় সব ধ্বংস হয়ে যায় না কেন? ইস্রাফিল কেন ফুঁ দেয় না শিঙ্গায়?
টানা ক্লাস করে ক্লান্তি এসে যায়। সামনে সেমিস্টার ফাইনাল। তাই সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখার চেষ্টা করে তমাল। কারণ তার ভালো করার সাথে আরও অনেকগুলো মানুষের ভালো জড়িয়ে আছে।
কিন্তু মন সব সময় নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এই যেমন এখন তমালের পড়া জরুরি, কিন্তু তার এই মুহূর্তে পড়তে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে তিথির সাথে কথা বলতে। কিন্তু তিথি এখনো জ্বরে কাবু হয়ে আছে। আগামীকাল থেকে কোচিং ক্লাসে আবার মডেল টেস্ট শুরু হবে। মডেল টেস্ট এর সময় একটু চাপ যায়। প্রশ্ন করা, খাতা কাটা এগুলো বাড়তি কাজ। কিন্তু দুর্দিনে এই কোচিং সেন্টারে ক্লাস নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল বলে বাড়ি থেকে বাবার উপর বাড়তি টাকার চাপ দিতে হয়নি এ কথা মনে করে কোচিং ক্লাসটা এখনও ছাড়তে পারছে না। যদিও সে চাইলে কোচিং সেন্টারের ক্লাস বাদ দিয়ে একটা টিউশনি বাড়তি করলে অনেক বেশি টাকা পেতো। কিন্তু দুঃসময়ের কথা মনে রাখাটাও মানুষের নীতি-নৈতিকতার পরিচয় বলে তমাল মনে করে।
সপ্তাহখানেক পরে আবার একদিন ইফতির বাবা আমীর আলীর সাথে তমালের দেখা হয়ে যায়। তিনি বোধহয় কোথাও যাচ্ছিলেন, তাড়াহুড়ো করছিলেন। দরজা খুলে তমালকে দেখে বললেন, মাস্টার সাব ইফতির ফড়ার দিকে একটু ভালো করি নজর দিয়েন। চেষ্টা করবেন সামনের ফরীক্ষায় রান্না করা বিরানি যেন খাওয়া যায়, বলে তিনি তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যান।
সেদিনই ইফতিকে পড়িয়ে বের হতে হতে একটু রাত হয়ে গেল। রাত নয়টা আসলে কোনো রাত নয়। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে ইরান, আমেরিকা আর ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে বিশ্বের জ্বালানি সংকটের হাওয়া দেশের জ্বালানি ক্ষেত্রে তীব্র আঘাত করায় দেশের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। ফলশ্রুতিতে আপতকালীন ব্যবস্থা হিসেবে মার্কেট, দোকানপাট সব সাতটায় বন্ধের ঘোষণা দেয় সরকার। ফলে রাতের শহরের জৌলুশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। বড় বড় শপিংমল বন্ধ থাকলেও অলিগলির দোকানপাট ঠিকই খোলা থাকে। কিন্তু রাস্তার বাতিগুলো বন্ধ হয়ে যায় বলে রাস্তাঘাট অন্ধকারে ডুবে থাকে। ইফতিদের বাসা থেকে বেরিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে টাইগারপাস মোড়ে যাচ্ছিল সিটি সার্ভিসের গাড়ি ধরার জন্য। অন্ধকার রাস্তার মোড়ে জটলা দেখে হাঁটার গতি কমিয়ে দেয় তমাল। ভয়ও কাজ করে মনে। কোনো সমস্যা হলো না তো! তার ধীর গতির হাঁটার মধ্যেই পুলিশের গাড়ি একটা কয়েকজনকে তাড়া করতে করতে তমালের পাশ দিয়ে চলে যায়। চোখের পলকে আরও কয়েকজনের সাথে পুলিশ সদস্যরা তমালকে টেনে হেঁচড়ে গাড়িতে তোলে। তমাল ভয় পেয়ে তোতলানো গলায় জিজ্ঞেস করছিল, আ.. আ…আমাকে ধরছেন কেন? আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
একজন পুলিশ সদস্য তমালের গালে ঠাস করে চড় দিয়ে বলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলে সারাদিন ইয়াবা নিয়ে পড়ে থাকিস কেন, হারামজাদা? বল, তোদের মাদকের সাপ্লায়ার কে? হঠাৎ থাপ্পড় খেয়ে তমাল স্তব্ধ হয়ে থাকে কিছুক্ষণ। পুলিশ সদস্যরা অন্য ছেলেগুলোকেও চড়, থাপ্পড় দেয়। বকাবকি করতে থাকে। মা-বাপ তুলে গালিগালাজও করতে থাকে।
থানায় ঢোকানোর আগে তমাল আবার বলে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার আইডি কার্ড দেখুন। ওসি তমালকে রেখে বাকিদের লকআপে ঢোকাতে নির্দেশ দেয়। ওসি বলেছে ওর একজন জামিনদাতা লাগবে। তমাল ভেবে পায় না এসময় ও কাকে ফোন করবে। তারপর ওসির কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তিথিকে ফোন করে। তিথি চিকনগুনিয়ার ব্যথা থেকে এখনো মুক্তি পায়নি। তবু তিথি ওদের ডিপার্টমেন্টের মাকসুদ স্যারের কথা মনে করিয়ে দেয় তমালকে। মাকসুদ স্যার তমালকে খুবই স্নেহ করেন। তিথিকেও স্নেহ করেন। আসলে মাকসুদ স্যার তার প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীকে অনেক ভালোবাসেন। স্নেহ করেন। আর পড়ুয়াদের প্রতি তার এই ভালোবাসার কথা সবাই জানে। তিথি মাকসুদ স্যারের নাম্বার যোগাড় করে দেয় তমালকে। কিন্তু মাকসুদ স্যারকে ফোনে পাচ্ছে না তমাল। স্যারের মোবাইল বন্ধ। তমাল হতাশ হয়ে ওসির দিকে তাকিয়ে থাকে। রাত বাড়ছে। তমালের খুব অসহায় লাগছে। সে জেল হাজতে রাত কাটিয়েছে এ কথা জানলে তার বাবা হার্টফেল করে মারা যাবে। গ্রামের বাড়িতে এ কথা জানাজানি হয়ে গেলে ঘটনার নেপথ্যের কারণ জানার চেষ্টা না করেই সবাই এসে তার বাবা-মা, আত্মীয় স্বজনকে গালমন্দ করবে, হাসি ঠাট্টা করবে এসব ভাবতেই তমালের চোখ ছলছল করে ওঠে।
ওসি সাহেব বলেছেন আগামীকাল সকালের মধ্যে কেউ এসে তার জামিনদার না হলে তাকে অন্য আসামীদের সাথে কোর্টে চালান করে দিবে। তখন কোর্ট থেকে জামিন নিতে হবে। ওসির কথা শুনে ঘাবড়ে যায় তমাল। তবে ওসি ভদ্রলোক তমালের সাথে যথেষ্ট ভালো ব্যবহার করেছে। তিনি চাইলে তাকে লকআপে ঢোকাতে পারতেন। খারাপ ব্যবহার করতে পারতেন। তিনি তমালের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড দেখে বললেন, ছোট ভাই, সময় খারাপ। এ সময়টাতে রাত-বিরেতে রাস্তাঘাটে থাকবেন না। এখন আসলে ভালো মানুষ, মন্দ মানুষের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কথা শেষ করে ওসি খুব দ্রুত আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে সাথে নিয়ে বের হয়ে যান।
ভয়ঙ্কর এক রাতের আঁধার গ্রাস করে তমালকে। তমালের মনে হচ্ছে এই রাত বোধহয় আর ফুরাবে না।
শার্ট-প্যান্ট পরা অবস্থায় আমীর আলীকে আগে কখনও দেখেনি তমাল। ইফতিও আছে বাবার সঙ্গে। আমীর আলী তমালকে বলে, মাষ্টার সাব, চোখ-কান খোলা রাখি চলন লাইগবো। এরপর থেকে বেশি রাত করে বাসায় যাইবেন না। সাবধানে চলাফেরা কইরবেন। ইফতিরে মনোযোগ দি ফড়াইবেন। হেতের ফড়ালেখায় মনোযোগ কম। মাথায় শুধু বেরেন থাকলে হবে না, বেরেনরে কাজে লাগাইতে হবে, বলে মুচকি একটা হাসি দেন আমীর আলী। আমীর আলী যে হাসতে জানে তাতেই তমাল অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। হাসলে মানুষকে এত সুন্দর দেখায়!
আমীর আলীর কথাগুলো আজ আর একটুও কর্কশ মনে হচ্ছে না তমালের কাছে। বরং এতদিন মনে মনে তাকে হাবশি গুন্ডা বলার জন্য লজ্জিত হচ্ছে।
গতকাল শেষ মুহূর্তে অসহায় হয়ে তমাল ইফতিকে ফোন করে বলেছিল তার দুরাবস্থার কথা। কয়েকজন বন্ধুকেও ফোন করেছিল। কিন্তু এখনকার সময়টাই এমন যে কে কখন কোনদিক দিয়ে বিপদে পড়ে যাবে এই আতঙ্কে কেউ কারো পাশে এসে দাঁড়ায় না। বন্ধুরা বলেছিল সকালে অবশ্যই একটা ব্যবস্থা হবে। সে যেন টেনশন না করে। সকাল বেলা ওসি সাহেব যখন তাকে ডাকলো, তখন সে ভেবেছিল তার বন্ধুরা হয়তো এসে গেছে। কিন্তু সামনে গিয়ে আমীর আলীকে দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল সে।
তার মনে হচ্ছিল তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা যেন সাক্ষাৎ এক ফেরেশতা!



































































































