২৪ অক্টোবর ২০২৬
ঘাসের পাতায় ফিরে আসা মানুষ
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
কালাম আজাদ
গল্পকার, প্রাবন্ধিক
131

কালাম আজাদ
গল্পকার, প্রাবন্ধিক

131

ঘাসের পাতায় ফিরে আসা মানুষ

সেদিন ঢাকায় ভোর নামছিল বৃষ্টির ভেতর দিয়ে। জুলাইয়ের বৃষ্টি। রাতভর টিনের চাল, বারান্দার কার্নিশ আর জানালার কাচে যে একটানা শব্দ হচ্ছিল, ভোরে এসে তা যেন আরও গভীর হয়ে উঠেছিল। ঢাকা তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। মিরপুর রোডে দু-একটি বাস ছুটছিল। ফুটপাতের চায়ের দোকানে আগুন জ্বলছিল। হাসপাতালের সামনে কয়েকজন মানুষ ভেজা ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে ছিল কেউ কারও অপেক্ষায়, কেউ কোনো খবরের। শ্রাবণের বৃষ্টি ঢাকাকে তার নিজের কাছ থেকেই কিছুক্ষণের জন্য আড়াল করে দেয়। ধুলো ধুয়ে যায়। দেয়ালের পুরোনো পোস্টারগুলো আরও পুরোনো দেখায়। রিকশার ঘণ্টি বৃষ্টির শব্দে হারিয়ে যায়। ফুটপাতের মানুষ পলিথিনের নিচে শরীর গুটিয়ে নেয়। কোথা থেকে যেন কদমফুলের গন্ধ আসে। রাত অনেক হয়েছে। জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা এসে ভাঙছে। দূরে কোনো একটি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন মাঝে মাঝে রাতের নীরবতা কেটে দিচ্ছে। শহরের আলো বৃষ্টির পর্দার ভেতর অস্পষ্ট হয়ে আছে।

আমি টেবিলে বসে পুরোনো সংবাদপত্রের একটি ফাইল পড়ছিলাম। ইতিহাস নিয়ে লিখতে বসলে আমার এমন হয়। একটি পুরোনো খবর আমাকে আরেকটি খবরের কাছে নিয়ে যায়। একটি নাম খুলে দেয় আরেকটি নাম। একটি মৃত্যু আমাকে নিয়ে যায় তার জন্মের কাছে। একটি ভুলে যাওয়া গ্রামের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে কখনো পুরো একটি সময়ের মুখোমুখি হয়ে পড়ি। আমি বহু বছর সাংবাদিকতা করেছি। তারপর উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজ করেছি মানুষের সঙ্গে, মাঠে, প্রকল্পে, সংকটে। কখনো বস্তির মানুষের সঙ্গে বসেছি, কখনো উদ্বাস্তু মানুষের জীবন দেখেছি, কখনো শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করেছি, কখনো এমন পরিবারের সামনে দাঁড়িয়েছি যাদের কাছে একটি ছোট সহায়তাও ছিল বেঁচে থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু আমার সবচেয়ে পুরোনো পরিচয়টি ছিল লেখার সঙ্গে। আমি ইতিহাস নিয়ে লিখি। ইতিহাস আমার কাছে রাজা-বাদশাহদের কাহিনি নয়। ইতিহাস হলো সেই নামহীন মানুষটিরও গল্প, যার ঘর নদীতে ভেঙে গেছে; সেই মায়ের গল্প, যার সন্তান যুদ্ধ থেকে আর ফেরেনি; সেই শ্রমিকের গল্প, যার ঘাম দিয়ে শহর তৈরি হয়েছে অথচ শহরের ইতিহাসে যার নাম নেই।

যখন উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজ করেছি তখন বুঝেছি, একটি প্রকল্পের প্রতিবেদনে লেখা একটি সংখ্যার পেছনেও একজন মানুষ থাকে। একটি শিশুর ক্ষুধা থাকে। একজন মায়ের অপেক্ষা থাকে। একটি বেকার যুবকের অপমান থাকে। একটি ভাঙা পরিবারের দীর্ঘশ্বাস থাকে। ইতিহাস আমাকে শিখিয়েছে মানুষের কথা হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। আর উন্নয়ন কাজ আমাকে শিখিয়েছে কোনো মানুষকে শুধু একটি সংখ্যা হিসেবে দেখা যায় না। এই মানুষগুলোর জীবন লিখতে লিখতে কখন যে নিজের জীবনটাকেও ইতিহাসের মতো দেখতে শুরু করেছি, বুঝিনি। কিন্তু নিজের জীবন সম্পর্কে আমি কখনো এতটা নিশ্চিত ছিলাম না।

রাত প্রায় দেড়টা। পাশে রনো আর বসন্ত শান্তিতে ঘুমুচ্ছে। ফাইলের ভেতর থেকে একটি পুরোনো সংবাদ কাটিং বের করছিলাম, তখন ফোনটি বেজে উঠল। অপরিচিত নম্বর।

– হ্যালো? ওপাশে নীরবতা। তারপর একটি নারীকণ্ঠ – আপনি কি আমাকে চিনতে পারবেন?

আমি কিছু বললাম না। কণ্ঠটি অচেনা নয়। কিন্তু স্মৃতি কখনো কখনো মুখের চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর। সে পরিচিত কণ্ঠকে চিনিয়ে দেয়, অথচ তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সময়টাকে ফিরিয়ে আনতে চায় না।
– কে বলছেন?
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বলল – আমি শবনম।

আমার হাত থেমে গেল। কাগজের ওপর রাখা আঙুলটি কেঁপে উঠল। শবনম। একটি নাম কখনো কখনো একটি সম্পূর্ণ সময়কে ফিরিয়ে আনতে পারে। আমি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি তখনও পড়ছে।

– শবনম ফারজানা?
ওপাশে খুব মৃদু হাসি।
– তাহলে ভুলে যাননি।
আমি উত্তর দিলাম না।

অনেক বছর আগে এই নামটি আমার জীবনের একটি অসমাপ্ত অধ্যায়ে লেখা হয়েছিল। কিন্তু সেই অধ্যায়ের শেষ কোথায়, তা আমি কোনোদিন জানতে পারিনি।

– আপনি কোথায়?
– ঢাকায়। কি অবস্থা! কেমন আছো?
– আলহামদুলিল্লাহ। সময় হলে একদিন দেখা করি এবং অনেকদিনের গল্প জমা আছে।
– কোথায় দেখা করতে চাও?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল – নীলক্ষেতের সেই পুরোনো বইয়ের দোকানের কাছে।

আমার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন একটা শব্দ হলো। সেই জায়গাটি আমি ভুলিনি।

পরদিন বিকাল ৫টার দিকে নীলক্ষেতে পৌঁছালাম। বৃষ্টি তখন কমেছে। দোকানগুলোর সামনে ত্রিপল টাঙানো। ভেজা রাস্তায় হলুদ আলো কাঁপছে। পুরোনো বইয়ের গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে ভেজা কাগজ আর মাটির গন্ধ। শবনম দাঁড়িয়ে ছিল একটি দোকানের সামনে। প্রথম দেখায় তাকে চিনতে আমার কয়েক সেকেন্ড লেগেছিল। সময় মানুষকে বদলায়। কিন্তু কিছু চোখ বদলায় না। সে আমাকে দেখে বলল:

– অনেক বদলে গেছেন।
আমি হাসলাম।
– তুমিও।
– আমি তো বদলাতেই চেয়েছিলাম।
– কেন?
সে উত্তর দিল না।

তারপর ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো খাম বের করল এবং বললো এটা আপনার।

খামটি হাতে নিয়ে আমার বুকের ভেতর হঠাৎ পুরোনো কোনো দরজা খুলে গেল। হাতের লেখা আমার। অনেক বছর আগের। আমি খাম খুললাম। ভেতরে একটি চিঠি। মাত্র কয়েকটি লাইন।

কিছু মানুষকে ভালোবাসা যায় না
তাদের শুধু মনে রাখা যায়।
কারণ কাছে গেলে তারা বাস্তব হয়ে যায়,
আর দূরে থাকলে তারা কবিতা হয়ে থাকে।

আমি অনেকক্ষণ চিঠিটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

শবনম বলল – আপনি আমাকে চিঠিটা কখনো দেননি।
– তুমি রেখেছিলে?
– আপনার ডেস্ক থেকে পেয়েছিলাম।
– এত বছর পর ফিরিয়ে দিলে কেন?

সে এবার সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকাল।
– কারণ মনে হচ্ছে, এবার গল্পটার শেষ লেখা দরকার।

আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম – সে শুধু চিঠি ফেরত দিতে আসেনি।

২.
আমরা একটি ছোট চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম। টিনের চালের ওপর বৃষ্টি পড়ছিল। চা এল। শবনম কাপের ভেতর তাকিয়ে বলল:
– আপনি এখন কী লিখছেন?
– ইতিহাস।
– শুধু ইতিহাস?
– মানুষের ইতিহাস।

সে মৃদু হেসে বলল – মানুষের ইতিহাস আর ইতিহাস কি আলাদা?
– হওয়ার কথা নয়।
– তবু আলাদা।

আমি তার দিকে তাকালাম।
– কীভাবে?
– যাদের নিয়ে ইতিহাস লেখা হয়, তারা সাধারণত ক্ষমতাবান। আর যাদের জীবন দিয়ে ইতিহাস তৈরি হয়, তাদের নাম থাকে না।

আমি চুপ করে গেলাম। এই কথাটি শবনমের মুখে শুনে মনে হলো, সে এত বছর কোথায় ছিল–এই প্রশ্নের চেয়ে সে এত বছর কী দেখেছে, সেটাই হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সে বলল – আপনি কি আমাকে ভালোবাসতেন?

প্রশ্নটি এত সরাসরি ছিল যে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। বাইরে বৃষ্টি বেড়ে গেল। আমি ধীরে বললাম:
– আমরা তখন যে বয়সে ছিলাম, ভালোবাসা আর আকাঙ্ক্ষার পার্থক্য বুঝতাম না।
– এখন বোঝেন?
– কিছুটা।
– কী?

আমি চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলাম।

– ভালোবাসা কাউকে নিজের করে নেওয়ার নাম নয়। কখনো কখনো তার জীবনকে নিজের ইচ্ছার বাইরে সম্মান করার নামও ভালোবাসা।
শবনম কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল – তাহলে সেদিন আমাকে যেতে দিয়েছিলেন কেন?

এই প্রশ্নের কোনো প্রস্তুত উত্তর আমার ছিল না। কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি। শুধু উচ্চারণ করতে পারি না।
আমি বললাম – কারণ তোমাকে আটকে রাখার অধিকার আমার ছিল না।

সে মাথা নিচু করল।
– অথবা সাহস ছিল না?
আমি তাকিয়ে রইলাম।
শবনম এবার হাসল।

– আপনি এখনো আগের মতোই। নিজের সত্যটাকে একটু সুন্দর করে বলেন। আর মিথ্যাটাকে সত্যের মতো বদমাইশ-এর মতো করে বলেন।

পরদিন দুপুরে সে ফোন করল।
– আপনার সঙ্গে একটা জায়গায় যেতে চাই।
– কোথায়?
– পুরান ঢাকায়।

আমরা যাদের হারিয়ে ফেলি, তারা কি সত্যিই হারিয়ে যায়? নাকি তারা অন্য কোনো রূপে ফিরে আসে? কোনো পুরোনো চিঠিতে। কোনো সংবাদ কাটিংয়ে। কোনো অচেনা কণ্ঠে। কোনো অসমাপ্ত ভালোবাসায়। অথবা একটি ঘাসের পাতায়।

আমরা একটি পুরোনো বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজার রং উঠে গেছে। লোহার গ্রিলে মরিচা। দেয়ালে পুরোনো পোস্টারের ছেঁড়া অংশ। বাড়িটাকে দেখে মনে হচ্ছিল, শহর বহুদিন আগে তাকে ভুলে গেছে। শবনম বলল:
– এখানে একসময় আমার বাবা থাকতেন।

আমি অবাক হলাম।
– তুমি তো বলেছিলে তোমাদের বাড়ি অন্য জায়গায়।
– বলেছিলাম।
– তাহলে?

সে দরজা খুলল। ঘরের ভেতরে ধুলো। একটি ভাঙা চেয়ার। একটি কাঠের আলমারি। আর কোণের দিকে একটি ছোট কাঠের বাক্স। সে বাক্সটি খুলল। ভেতরে কিছু পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং, কয়েকটি চিঠি, সাদা কালো ছবি এবং একটি ডায়েরি। ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা– ‘যে ইতিহাস কেউ লিখবে না।’

আমার শরীরের ভেতর দিয়ে কেমন একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। পাতা উল্টালাম। একটি নাম। আরেকটি নাম। একটি তারিখ। তারপর একটি ঘটনা। একজন শ্রমিক নিখোঁজ। নদীভাঙন। আন্দোলন। রাতের গুলি। আর প্রতিটি ঘটনার পাশে এমন কিছু নাম, যেগুলো আমি বহু বছর আগে সংবাদপত্রের পুরোনো কাটিংয়ে দেখেছি। আমি ধীরে ধীরে বললাম:
– এগুলো কোথায় পেয়েছ?
– বাবার বাক্সে।
– তুমি জানতেও না?
– না।
– তাহলে এখন আমাকে কেন দিচ্ছ?
সে বলল – কারণ আপনি একসময় এই ঘটনাগুলো নিয়ে লিখেছিলেন।

আমি ডায়েরির দিকে তাকালাম।
– আমি?
– আপনি খবর লিখেছিলেন। কিন্তু পুরো সত্য জানতেন না।

আমার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
– কী সত্য?

শবনম উত্তর দিল না। ডায়েরির একটি পাতা আমার সামনে খুলে দিল। সেখানে মাত্র একটি বাক্য– “যে মানুষটিকে তারা নিখোঁজ বলেছিল, সে নিখোঁজ হয়নি।”
আমি শবনমের দিকে তাকালাম।
– তাহলে?
সে বলল—
– সে বেঁচে ছিল।
– কোথায়?

শবনম এবার জানালার বাইরে তাকাল।
– এই শহরে নয়।
– তাহলে কোথায়?
সে ধীরে বলল – যেখানে মানুষ নিজের নাম ভুলে গিয়ে আবার মানুষ হতে পারে।

সেদিন রাতে ঘুম হলো না। ডায়েরিটি আমার সামনে খোলা। একদিকে সাংবাদিক হিসেবে আমার পুরোনো প্রতিবেদন। অন্যদিকে বাবার ডায়েরি।

মাঝখানে শবনম। আমি বুঝতে পারছিলাম, ঘটনাটি শুধু একটি পুরোনো নিখোঁজ মানুষের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্ষমতা। ভয়। মিথ্যা। আর এমন কিছু মানুষের জীবন, যারা ইতিহাসের পাতায় কখনো জায়গা পায়নি। কিন্তু আরও একটি সত্য আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। শবনম এই ডায়েরি আমাকে কেন দিয়েছে? সে কি সত্য প্রকাশ করতে চায়? নাকি শুধু কাউকে বিশ্বাস করতে চায়? রাত তিনটার দিকে জানালার পাশে দাঁড়ালাম। ঢাকা তখন অদ্ভুত নীরব। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। ভেজা রাস্তায় একটি রিকশা চলে গেল। আমি হঠাৎ বুঝলাম, জীবনের সবচেয়ে কঠিন নৈতিক প্রশ্নগুলো কোনো আদালতে আসে না। এসব আসে গভীর রাতে।

একজন মানুষের গোপন কথা কি আমার লেখার বিষয়?
একটি পরিবারের কষ্ট কি আমার সাহিত্যিক সম্পদ?
সত্য প্রকাশের নামে আমি কি আরেকটি মানুষের জীবন ধ্বংস করতে পারি?
সাংবাদিক বলছিল– সত্য প্রকাশ করো। ইতিহাসবিদ বলছিল– সত্য সংরক্ষণ করো। উন্নয়নকর্মী বলছিল– মানুষকে আগে দেখো। আর হৃদয় বলছিল– কাউকে ভেঙে দিয়ে কোনো সত্য মহৎ হয় না।

পরদিন শবনমকে বললাম– আমি তোমার ডায়েরি প্রকাশ করব না।
সে অবাক হলো।
– কেন?
– কারণ সব সত্য প্রকাশের জন্য নয়।
– তাহলে আপনি কী করবেন?
– ঘটনাগুলো যাচাই করব।
– তারপর?
– যা জনস্বার্থের, তা লিখব। কিন্তু তোমাদের পরিচয় প্রকাশ করব না।

সে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল– আপনি জানেন, সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার কী?
– কী?
– মানুষ মরে গেলে তার কবর থাকে। কিন্তু মিথ্যা ইতিহাসে চাপা পড়ে গেলে তার কোনো কবরও থাকে না।

আমি কিছু বললাম না। সে ডায়েরিটি আমার দিকে এগিয়ে দিল।
– নিন।
– তুমি নিশ্চিত?
– হ্যাঁ।
– এটা তোমার পরিবারের ইতিহাস।
– না।

সে মাথা নেড়ে বলল– এটা শুধু আমার পরিবারের নয়। এটাই তো সমস্যা।

পরের কয়েক সপ্তাহ আমি পুরোনো সংবাদপত্র ঘাঁটলাম। একটি খবরের সঙ্গে আরেকটি খবর মিলল। একটি নামের সঙ্গে আরেকটি নাম। কিছু তথ্য মিলে গেল। কিছু মিলল না। একটি সরকারি নথিতে যে মানুষটি নিখোঁজ, অন্য একটি পুরোনো চিঠিতে তার জীবিত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেল। আমি আরও গভীরে গেলাম। তারপর একদিন এমন একটি তথ্য পেলাম, যা আমাকে বহুক্ষণ চুপ করে বসিয়ে রাখল। নিখোঁজ মানুষটি সত্যিই বেঁচে ছিল। কিন্তু সে নিজের নাম বদলে ফেলেছিল।

কেন?
কারণ তার পরিবারকে বাঁচাতে হয়েছিল।
তার নিজের জীবন বাঁচাতে হয়েছিল।
আর সেই মানুষটি শেষ জীবনে কোথায় ছিল জানেন?
একটি প্রত্যন্ত গ্রামের প্রান্তে।
সেখানে সে নিজের হাতে ঘাস লাগাত।
বাড়ির সামনে।
পুকুরের ধারে।
রাস্তার পাশে।

যে মানুষটিকে শহর ইতিহাস থেকে মুছে দিয়েছিল, সে নিজের চারপাশে ছোট ছোট সবুজ জায়গা তৈরি করে বেঁচে ছিল।

শবনম আমাকে বলেছিল– ‘মানুষ নিজের নাম ভুলে গিয়ে আবার মানুষ হতে পারে।’ তখন কথাটার অর্থ বুঝিনি। এবার বুঝলাম।
আমি শবনমকে ফোন করলাম।

– তোমার বাবার ডায়েরির মানুষটিকে আমি খুঁজে পেয়েছি।
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। তারপর খুব আস্তে–
– কোথায়?
– সে আর নেই।

শবনম কিছু বলল না।
– কিন্তু তার বাড়ি আছে।
– কোথায়?

আমি গ্রামের নাম বললাম।
ওপাশে কান্নার শব্দ পেলাম।
– আপনি যাবেন?
– হ্যাঁ।
– আমাকে নিয়ে যাবেন?

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম।
– হ্যাঁ।

দুই দিন পর আমরা সেই গ্রামে পৌঁছালাম। বর্ষার পানি নেমে গেছে। কাঁচা রাস্তার দুপাশে ঘাস। বাড়িটি খুব সাধারণ। মাটির দেয়াল। টিনের চাল। সামনে একটি ছোট পুকুর। আর আশপাশে অদ্ভুত সবুজ। ঘাস। শুধু ঘাস। শবনম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ তাকে চিনত না। আমরা একজন বৃদ্ধ প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বললাম। তিনি বললেন:

– লোকটা চুপচাপ ছিল। কারও সঙ্গে বেশি কথা বলত না।
– কী করত?
– ঘাস লাগাত।

শবনম চমকে উঠল।
– ঘাস?

বৃদ্ধ হাসলেন।
– হ্যাঁ। বলত, মানুষ যেখানে পা রাখে, সেখানে একটু নরম থাকা দরকার।

শবনম আর কথা বলতে পারল না। সে বাড়ির সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। এক মুঠো ঘাস হাতে নিল। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। আমি দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম। সেদিন প্রথমবার বুঝলাম, ফিরে আসা সবসময় কোনো মানুষের কাছে ফিরে আসা নয়। কখনো কখনো ফিরে আসা হয় একটি ঘাসের পাতার কাছে। একটি ভুলে যাওয়া নামের কাছে। একটি জীবনের কাছে, যাকে ইতিহাস তার নিজের ভাষায় লিখতে পারেনি।

কয়েক মাস পর আমার লেখা প্রকাশিত হলো। শিরোনাম ‘বৃষ্টির শহরে হারিয়ে যাওয়া মানুষের ইতিহাস।’ প্রবন্ধে কোনো ব্যক্তিগত নাম ছিল না। ছিল না শবনমের নাম। ছিল না তার বাবার নাম। ছিল শুধু একটি মানুষের গল্প–যাকে রাষ্ট্রের নথি একদিন নিখোঁজ বলেছিল, অথচ সে বেঁচে ছিল মানুষের স্মৃতির বাইরে, নিজের তৈরি সবুজের মধ্যে। লেখাটি প্রকাশের পর অনেক আলোচনা হলো। কেউ বলল, এটি রাজনৈতিক ইতিহাস। কেউ বলল, সামাজিক ইতিহাস। কেউ বলল, প্রান্তিক মানুষের ইতিহাস। কেউ জানল না, সেই ইতিহাসের ভেতরে একটি অসমাপ্ত প্রেমও ছিল। শবনমও আর আমার জীবনে ফিরে আসেনি। শুধু একদিন একটি ছোট মেসেজ এসেছিল– “সব ভালোবাসার শেষ একসঙ্গে থাকা নয়। কিছু ভালোবাসা মানুষকে তার নিজের জীবনের কাছে ফিরিয়ে দেয়।”

আমি উত্তর দিইনি। কিছু উত্তর শব্দে দিলে তাদের অর্থ ছোট হয়ে যায়। অনেক দিন পর এক বর্ষার সকালে আমি আবার সেই গ্রামের পথে গেলাম।

একাই। বাড়িটি তখন আর আগের মতো নেই। দরজার কাঠ পচে গেছে। পুকুরের পাড়ে আগাছা। কিন্তু ঘাস আছে। অসংখ্য ঘাস। বৃষ্টিতে ভেজা। হাওয়ায় দুলছে। আমি নিচু হয়ে একটি ঘাসের পাতা ছুঁয়ে দেখলাম। পাতাটির গায়ে একটি স্বচ্ছ জলবিন্দু। সেই জলবিন্দুর ভেতর যেন পুরো আকাশটি আটকে আছে। আমি হঠাৎ ভাবলাম– মানুষও কি এমন? একটি ছোট জীবনের ভেতর একটি সম্পূর্ণ ইতিহাস বহন করে? আমরা যাদের হারিয়ে ফেলি, তারা কি সত্যিই হারিয়ে যায়? নাকি তারা অন্য কোনো রূপে ফিরে আসে? কোনো পুরোনো চিঠিতে। কোনো সংবাদ কাটিংয়ে। কোনো অচেনা কণ্ঠে। কোনো অসমাপ্ত ভালোবাসায়। অথবা একটি ঘাসের পাতায়।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। দূরে বৃষ্টি নামছিল। শহর থেকে বহু দূরে, সেই নিঃশব্দ গ্রামের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো ইতিহাস শেষ পর্যন্ত রাজাদের নয়। রাষ্ট্রের নয়। বিজয়ীদেরও নয়। ইতিহাস তাদেরও–যারা হারিয়ে যায়। যাদের নাম মুছে ফেলা হয়। যারা ফিরে আসে না। তবু কোনো এক শ্রাবণ সকালে তাদের রেখে যাওয়া ঘাসের পাতায় জল জমে থাকে।

আমি হাঁটতে শুরু করলাম। পেছনে পড়ে রইল বাড়িটি। ঘাসগুলো বাতাসে দুলছিল। আর মনে হচ্ছিল কিছু মানুষ চলে যায়। কিছু মানুষ ফিরে আসে। আর কিছু মানুষ ফিরে আসে না কোথাও। তারা শুধু পৃথিবীটাকে একটু নরম করে রেখে যায়। যাতে পরের মানুষগুলো হাঁটতে গিয়ে অন্তত একবার অনুভব করতে পারে এখানে একসময় একজন মানুষ ছিল।

সময়ের সন্তানেরা
সময়ের সন্তানেরা-২
After-Article Banner 2
After-Article Banner 2 mob

মন্তব্য লিখুন

ধন্যবাদ। নাম ও মতামত লিখুন। পর্যালোচনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মন্তব্যটি প্রকাশিত হবে।

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত