১৭ মার্চ ২০২৬
My Father's Suitcase: The Nobel Lecture Orhan Pamuk
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
মাসুদুল হক
কথাসাহিত্যিক
87

মাসুদুল হক
কথাসাহিত্যিক

87

ওরহান পামুকের নোবেল ভাষণ

আমার বাবার স্যুটকেস

ওরহান পামুক ৭ জুন ১৯৫২ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সমকালীন তুর্কি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক এবং বিশ্বসাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসেবে স্বীকৃত। ইস্তাম্বুলের একটি সমৃদ্ধ ও শিক্ষিত পরিবারে তার শৈশব কাটে। প্রথমদিকে তিনি স্থাপত্যবিদ্যা পড়ার জন্য Istanbul Technical University-এ ভর্তি হন, কিন্তু পরে লেখালেখির প্রতি গভীর আগ্রহের কারণে সেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে তিনি সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করেন Istanbul University-তে। তরুণ বয়স থেকেই তিনি উপন্যাস রচনায় মনোনিবেশ করেন এবং ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক সাহিত্য অঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলেন।

ওরহান পামুকের সাহিত্যকর্মে তুরস্কের ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিচয় সংকট, পূর্ব-পশ্চিমের দ্বন্দ্ব এবং ব্যক্তির মানসিক জগৎ গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে My Name Is Red, Snow, The Black Book এবং Istanbul: Memories and the City। এসব রচনায় ইতিহাস, শিল্প, রাজনীতি ও ব্যক্তিগত স্মৃতিকে তিনি এমনভাবে একত্রিত করেছেন যে তা বিশ্বসাহিত্যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিয়েছে। তার লেখার বৈশিষ্ট্য হলো দার্শনিক ভাবনা, প্রতীকী উপস্থাপন এবং গল্প বলার অভিনব কৌশল। এইসব সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০০৬ সালে Nobel Prize in Literature লাভ করেন, যা তুরস্কের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি যে ভাষণ প্রদান করেন, সেটি My Father’s Suitcase নামে পরিচিত। এই ভাষণে তিনি তার পিতার স্মৃতি, ব্যক্তিগত লেখকজীবনের সংগ্রাম এবং একজন লেখকের নিঃসঙ্গ সাধনার কথা গভীর আবেগের সঙ্গে তুলে ধরেন। ভাষণের মূল বক্তব্যে তিনি দেখিয়েছেন যে সাহিত্য কেবল গল্প বলা নয়; এটি মানুষের আত্মপরিচয় খোঁজার একটি প্রক্রিয়া। লেখকের কাজ হলো মানুষের অন্তর্গত অনুভূতি, স্মৃতি ও সমাজের জটিল বাস্তবতাকে ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করা। তার এই নোবেল ভাষণ বিশ্বসাহিত্যে লেখকের দায়িত্ব, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গুরুত্ব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে।

• ভূমিকা ও অনুবাদ: মাসুদুল হক

Ferit Orhan Pamuk is a Turkish novelist, screenwriter, academic, and recipient of the 2006 Nobel Prize in Literature.
Orhan Pamuk. Photography: Anita Schiffer-Fuchs, Image source: Alamy

মৃত্যুর দু’ বছর আগে আমার বাবা আমাকে একটি ছোট্ট স্যুটকেস দিয়েছিলেন—তার ভেতরে ছিল তাঁর লেখা, পাণ্ডুলিপি আর নোটবই। তাঁর স্বভাবসুলভ ঠাট্টা-বিদ্রূপ মেশানো ভঙ্গিতে তিনি বলেছিলেন, তিনি চান আমি এগুলো তাঁর চলে যাওয়ার পরে পড়ি—অর্থাৎ তিনি মারা যাওয়ার পর।

‘একবার শুধু চোখ বুলিয়ে দেখো’, তিনি বললেন, সামান্য অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে। ‘ভেতরে এমন কিছু আছে কি না দেখো, যেটা তোমার কাজে লাগতে পারে। হয়তো আমি না থাকলে তুমি কিছু বেছে নিয়ে প্রকাশ করতে পারবে।’

আমরা তখন আমার পড়ার ঘরে বসে আছি, চারদিকে বইয়ের স্তূপ। বাবা স্যুটকেসটি রাখার জন্য একটা জায়গা খুঁজছিলেন—এদিক-ওদিক হাঁটছিলেন, যেন এমন একজন মানুষ, যে কষ্টকর কোনো বোঝা নামিয়ে রাখতে চাইছে। শেষ পর্যন্ত তিনি সেটিকে এক অলক্ষণীয় কোণের নিরীহ জায়গায় রেখে দিলেন। মুহূর্তটি ছিল আমাদের দু’জনের জন্যই কিছুটা লজ্জাজনক—একটি মুহূর্ত, যা আমরা কেউ কোনোদিন ভুলতে পারিনি। কিন্তু সেই অস্বস্তি কেটে গেলে এবং আমরা আবার আমাদের স্বাভাবিক ভূমিকায় ফিরে গেলে, জীবনের প্রতি আমাদের চিরচেনা হালকা দৃষ্টিভঙ্গি আর পরিহাসময় স্বভাব ফিরে এল। আমরা আগের মতোই গল্প করতে লাগলাম—প্রতিদিনের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বিষয় নিয়ে, তুরস্কের অন্তহীন রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে, আর বাবার বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়ে যাওয়া ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিয়ে—তেমন কোনো গভীর দুঃখ অনুভব না করেই।

আমার মনে আছে, বাবার মৃত্যুর পর কয়েক দিন ধরে আমি স্যুটকেসটার পাশ দিয়ে বারবার হেঁটে গেছি, কিন্তু একবারও সেটাকে ছুঁইনি। ছোট্ট কালো চামড়ার স্যুটকেসটি—এর তালা আর গোলাকার কোণাগুলো—সবই আমার খুব চেনা ছিল। বাবা ছোটখাটো সফরে গেলে এটি সঙ্গে নিতেন, আর কখনো কখনো অফিসে নথিপত্র নিয়ে যেতেও এটি ব্যবহার করতেন।

শৈশবের কথা মনে পড়ে। বাবা কোনো ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফিরলে আমি এই ছোট স্যুটকেসটি খুলে তার জিনিসপত্র ঘেঁটে দেখতাম। তখন তার ভেতর থেকে ভেসে আসা কোলোনের গন্ধ আর দূরদেশের আবহের সন্ধান পেয়ে আমি গভীর আনন্দ উপভোগ করতাম।

এই স্যুটকেসটি ছিল আমার খুব পরিচিত সঙ্গী, আমার শৈশব ও অতীতের স্মৃতি উস্কে দেওয়া এক বস্তু। অথচ আমি সেটাকে ছুঁতেও পারছিলাম না। কেন? নিঃসন্দেহে তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা জিনিসগুলোর রহস্যময় ভারই ছিল তার কারণ।

এখন আমি সেই ভারের অর্থ নিয়ে কথা বলতে চাই। একজন মানুষ যখন নিজেকে একটি ঘরের ভেতর বন্ধ করে, টেবিলে বসে, এক কোণে গুটিয়ে নিজের চিন্তাগুলো প্রকাশ করতে বসে—তখন যা কিছু সৃষ্টি হয়, সেইটিই এই ভারের অর্থ; অর্থাৎ সাহিত্যের মর্মার্থ।

যখন শেষ পর্যন্ত আমি বাবার স্যুটকেসটি স্পর্শ করলাম, তখনও সেটি খুলে দেখার সাহস আমার হয়নি। তবে ভেতরের কিছু খাতায় কী আছে, তা আমি মোটামুটি জানতাম। এর কয়েকটিতে আমি বাবাকে লিখতে দেখেছিলাম। স্যুটকেসটির ভেতরে এমন ভারী বোঝা আছে—এই কথাটাও আমার কাছে নতুন ছিল না। বাবার ছিল একটি বড় লাইব্রেরি। যৌবনে, চল্লিশের দশকের শেষ দিকে, তিনি ইস্তাম্বুলের একজন কবি হতে চেয়েছিলেন এবং পল ভ্যালেরি (Paul Valéry)-র লেখা কবিতা তুর্কি ভাষায় অনুবাদও করেছিলেন। কিন্তু এমন একটি দরিদ্র দেশে, যেখানে পাঠকসংখ্যা অল্প, সেখানে কবিতা লিখে যে ধরনের জীবনযাপন করতে হয়—সেটা তিনি চাননি। বাবার বাবা—আমার দাদা—ছিলেন একজন ধনী ব্যবসায়ী। ফলে বাবা শৈশব ও যৌবনে বেশ স্বচ্ছল জীবন কাটিয়েছিলেন এবং সাহিত্যের জন্য, লেখালেখির জন্য কষ্টসহিষ্ণু জীবন বেছে নেওয়ার কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না। তিনি জীবনের সব সৌন্দর্য গভীরভাবে ভালোবাসতেন—এ কথাটা আমি বুঝতাম।

বাবার স্যুটকেসের ভেতরের জিনিসগুলো থেকে যে ব্যাপারটি প্রথমেই আমাকে দূরে রেখেছিল তা এক অজানা ভয়। আমি যা পড়তে ভালোবাসি হয়তো তা ওই স্যুটকেসে নাও থাকতে পারে। বাবা সম্ভবত তা বুঝতেন বলেই এমন ভান করতেন যেন স্যুটকেসের ভেতরের লেখাগুলোকে তিনি খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। পঁচিশ বছর ধরে লেখালেখি করার পর এই ব্যাপারটি অনুধাবন করে আমার খুব মর্মপীড়া হয়েছিল। আবার সাহিত্যের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য বাবার ওপর রাগ করতেও আমার মন চাইত না।

আমার আসল ভয় ছিল অন্য জায়গায়—যে বিষয়টি আমি জানতে বা আবিষ্কার করতে চাইতাম না, সেটি হলো এই সম্ভাবনা যে আমার বাবা হয়তো একজন ভালো লেখক হতে পারেন। এই ভয়েই আমি বাবার স্যুটকেসটি খুলতে পারিনি। তার চেয়েও ভয়ের বিষয়, আমি নিজের কাছেই খোলাখুলিভাবে স্বীকার করতে পারতাম না যে, যদি সত্যিই বাবার স্যুটকেসের ভেতর থেকে মহৎ সাহিত্য বেরিয়ে আসত, তবে আমাকে মেনে নিতে হতো—আমার বাবার ভেতরে আরেকজন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ বাস করে। এই সম্ভাবনাটি ছিল ভীতিকর। কারণ এত বয়স হওয়ার পরও আমি চাইতাম, আমার বাবা শুধু আমার বাবাই থাকুন—কোনো লেখক নয়।

একজন লেখক সেই মানুষ, যিনি বছরের পর বছর ধৈর্য নিয়ে নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দ্বিতীয় সত্তাটিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন, এবং সেই জগতটিকেও বোঝার চেষ্টা করেন, যা তাকে তিনি করে তোলেন। আমি যখন লেখালেখির কথা বলি, তখন প্রথমেই আমার মনে কোনো উপন্যাস, কবিতা বা সাহিত্যিক পরম্পরার কথা আসে না; বরং মনে পড়ে এমন একজন মানুষের কথা, যিনি নিজেকে একটি ঘরে আবদ্ধ করেন, টেবিলে বসেন এবং একা একা নিজের ভেতরের দিকে ফিরে তাকান। সেই নিঃসঙ্গতার ছায়াঘেরা পরিসরে তিনি শব্দ দিয়ে গড়ে তোলেন এক নতুন পৃথিবী।

এই মানুষটি—সে পুরুষ হোক বা নারী—টাইপরাইটার ব্যবহার করতে পারেন, কম্পিউটারের সহজ সুবিধা নিতে পারেন, কিংবা আমার মতো ত্রিশ বছর ধরে কাগজে কলম দিয়েও লিখতে পারেন। লিখতে লিখতে তিনি চা বা কফি পান করতে পারেন, কিংবা সিগারেট টানতে পারেন। মাঝে মাঝে তিনি টেবিল থেকে উঠে জানালা দিয়ে রাস্তার শিশুদের খেলতে দেখতে পারেন; ভাগ্য ভালো হলে দেখতে পারেন গাছপালা কিংবা দূরের কোনো দৃশ্য, আর না হলে তাকিয়ে থাকতে পারেন কোনো কালো দেয়ালের দিকে। তিনি কবিতা, নাটক বা উপন্যাস লিখতে পারেন—যেমন আমি লিখি। কিন্তু এই সব পার্থক্যের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো টেবিলে বসে ধৈর্যের সঙ্গে নিজের ভেতরের দিকে ফিরে তাকানো।

আমি যখন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আমার টেবিলে বসে ফাঁকা পাতায় ধীরে ধীরে নতুন নতুন শব্দ যোগ করি, তখন আমার মনে হয় যেন আমি এক নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করছি। যেন আমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা আরেকজন মানুষকে আমি অস্তিত্বে এনে দিচ্ছি

লেখা মানে এই অন্তর্মুখী দৃষ্টিকে শব্দে রূপ দেওয়া; নিজের ভেতরে ডুবে গেলে যে জগতে মানুষ প্রবেশ করে, সেই জগতকে মনোযোগ দিয়ে অন্বেষণ করা—ধৈর্য, একগুঁয়েমি ও আনন্দ নিয়ে। আমি যখন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আমার টেবিলে বসে ফাঁকা পাতায় ধীরে ধীরে নতুন নতুন শব্দ যোগ করি, তখন আমার মনে হয় যেন আমি এক নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করছি। যেন আমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা আরেকজন মানুষকে আমি অস্তিত্বে এনে দিচ্ছি—যেমন কেউ একটি সেতু বা একটি গম্বুজ নির্মাণ করে, পাথরে পাথর জুড়ে।

আমরা লেখকেরা যে পাথর দিয়ে এই নির্মাণকাজ করি, সেগুলো হলো শব্দ। আমরা যখন শব্দগুলো হাতে ধরি, তখন অনুভব করি কীভাবে প্রতিটি শব্দ অন্য শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। কখনো দূর থেকে তাদের দেখি, কখনো আঙুলের স্পর্শে কিংবা কলমের ডগায় প্রায় সোহাগের মতো ছুঁয়ে দেখি। তাদের ওজন মাপি, এদিক-সেদিক সরাই, বছরের পর বছর ধৈর্য ও আশায় কাজ করে যাই—এভাবেই আমরা তৈরি করি নতুন নতুন পৃথিবী।

একজন লেখকের গোপন শক্তি অনুপ্রেরণা নয়—কারণ সেই অনুপ্রেরণা কোথা থেকে আসে, তা কখনোই স্পষ্ট নয়। তার আসল শক্তি হলো তার একগুঁয়েমি আর ধৈর্য। তুর্কি ভাষায় একটি সুন্দর প্রবাদ আছে—“সুঁই দিয়ে কুয়া খোঁড়া।” আমার মনে হয়, কথাটি যেন বিশেষভাবে লেখকদের কথা ভেবেই বলা হয়েছে। পুরোনো কাহিনিগুলোতে প্রেমের জন্য পাহাড় কেটে পথ বানানো ফারহাদের ধৈর্য আমাকে মুগ্ধ করে—আর আমি সেটাকে বুঝতেও পারি। আমার উপন্যাস My Name Is Red-এ যখন আমি সেই পুরোনো পারস্যের ক্ষুদ্রচিত্রশিল্পীদের কথা লিখছিলাম—যারা বছরের পর বছর একই আবেগে একই ঘোড়ার ছবি এঁকেছে, প্রতিটি আঁচড় এত গভীরভাবে মুখস্থ করেছে যে চোখ বন্ধ করেও সেই সুন্দর ঘোড়াটিকে বারবার আঁকতে পারত—তখন আমি জানতাম, আসলে আমি লেখালেখির পেশা এবং নিজের জীবন নিয়েই কথা বলছি। যদি একজন লেখক তার নিজের গল্প বলতে চান—ধীরে ধীরে, যেন তা অন্য কারও গল্প—যদি তিনি অনুভব করতে চান যে গল্পের শক্তি তার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে, যদি তিনি টেবিলে বসে ধৈর্যের সঙ্গে নিজেকে এই শিল্পের, এই কারুকার্যের হাতে সঁপে দিতে চান—তবে তার ভেতরে প্রথমে কিছুটা আশা জাগতে হবে।

অনুপ্রেরণার সেই ফেরেশতা—যে কারও কাছে নিয়মিত আসে, আবার কারও কাছে খুব কমই—সে আসলে আশা ও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর মানুষদেরই পছন্দ করে। আর যখন একজন লেখক সবচেয়ে বেশি একা বোধ করেন, যখন নিজের চেষ্টা, স্বপ্ন আর লেখার মূল্য নিয়ে তার মনে গভীর সন্দেহ জাগে—যখন মনে হয় তার গল্প কেবল তার নিজের গল্পই—ঠিক তখনই সেই ফেরেশতা এসে তাকে কিছু গল্প, কিছু দৃশ্য, কিছু স্বপ্নের ইশারা দেয়, যা তাকে সাহায্য করে সেই পৃথিবীটিকে গড়ে তুলতে, যেটি তিনি নির্মাণ করতে চান। আমি যখন ফিরে দেখি সেই বইগুলোর দিকে, যেগুলোর জন্য আমি আমার পুরো জীবন উৎসর্গ করেছি, তখন আমাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করে সেই মুহূর্তগুলো—যখন অনুভব করি, যে বাক্যগুলো, যে স্বপ্নগুলো, যে পৃষ্ঠাগুলো আমাকে এত আনন্দে উচ্ছ্বসিত করেছে, সেগুলো যেন আমার নিজের কল্পনা থেকে আসেনি। যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি সেগুলো খুঁজে এনে উদারভাবে আমার হাতে তুলে দিয়েছে।

আমি বাবার সুটকেস খুলে তার খাতাগুলো পড়তে ভয় পাচ্ছিলাম, কারণ আমি জানতাম—আমি লেখক হওয়ার পথে যে সব কঠিন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গিয়েছি, তিনি সেগুলো সহ্য করতে পারতেন না। তিনি নিঃসঙ্গতা ভালোবাসতেন না; বরং বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা, আড্ডা, ভিড়, সভা-সমাবেশ, রসিকতা আর সঙ্গই তার প্রিয় ছিল।
কিন্তু পরে আমার ভাবনা অন্যদিকে মোড় নিল। ত্যাগ আর ধৈর্যের যে কল্পনাগুলো আমি মনে লালন করছিলাম, সেগুলো আসলে ছিল আমার নিজের জীবন আর লেখক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া কিছু পূর্বধারণা। অনেক উজ্জ্বল লেখকই আছেন, যারা ভিড়ের মধ্যে, পরিবার-পরিজনের পরিবেশে, হাসি-আড্ডার উষ্ণ আলোয় বসেই লিখেছেন।

তার ওপর, আমরা ছোট থাকতেই বাবা পারিবারিক জীবনের একঘেয়েমিতে ক্লান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে প্যারিস চলে গিয়েছিলেন। সেখানে—অনেক লেখকের মতোই—তিনি হোটেলের ঘরে বসে খাতার পর খাতা লিখে ভরিয়েছিলেন। আমি জানতাম, সেই খাতাগুলোর কিছু এই স্যুটকেসের ভেতরেই আছে। কারণ স্যুটকেসটি আমার কাছে দেওয়ার আগের কয়েক বছরে বাবা অবশেষে তার জীবনের সেই সময়ের কথা আমার সঙ্গে খোলামেলাভাবে বলতে শুরু করেছিলেন।

আমি ছোট থাকলেও তিনি কখনো সখনো সেই দিনগুলোর কথা বলতেন, কিন্তু নিজের দুর্বলতা, লেখক হওয়ার স্বপ্ন, কিংবা হোটেলের ঘরে বসে তাকে যে পরিচয়ের প্রশ্নগুলো তাড়িয়ে বেড়াত—সেসবের কথা তিনি বলতেন না। তার বদলে তিনি বলতেন, কতবার তিনি জঁ-পল সার্ত্র (১৯০৫-১৯৮০)-কে প্যারিসের ফুটপাথে হাঁটতে দেখেছেন, কী কী বই পড়েছেন, কী কী সিনেমা দেখেছেন—সবই এমন উচ্ছ্বসিত আন্তরিকতায় বলতেন, যেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংবাদ শোনাচ্ছেন।

আমি যখন নিজে লেখক হলাম, তখন কখনো ভুলে যাইনি যে এর পেছনে আংশিকভাবে সেই বাবারই অবদান আছে—যিনি তুরস্কের পাশা বা বড় ধর্মীয় নেতাদের কথা বলার চেয়ে বিশ্বের লেখকদের কথা অনেক বেশি বলতেন। তাই হয়তো আমাকে বাবার খাতাগুলো এই ভাবনাকে মনে রেখে পড়তে হয়েছিল, এবং তার বিশাল লাইব্রেরির কাছে আমি যে কতটা ঋণী, সেটাও মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের সঙ্গে বসবাস করার সময়েও বাবা—আমার মতোই—নিজের বই আর চিন্তার সঙ্গে একা থাকতে উপভোগ করতেন; আর তার লেখার সাহিত্যিক মান নিয়ে ততটা উদ্বিগ্ন থাকতেন না কখনোই।

কিন্তু আমি যখন উৎকণ্ঠা নিয়ে বাবার রেখে যাওয়া স্যুটকেসটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম, তখন একই সঙ্গে অনুভব করতাম—এই কাজটাই হয়তো আমি করতে পারব না। বাবা মাঝে মাঝে বইয়ের আলমারির সামনে থাকা ডিভানে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়তেন। হাতে থাকা বই বা পত্রিকাটি একপাশে রেখে দিতেন, আর ধীরে ধীরে স্বপ্নে ভেসে যেতেন—দীর্ঘ সময় নিজের চিন্তার ভেতর হারিয়ে থাকতেন।

পরিবারের হাসি-ঠাট্টা, খুনসুটি আর তর্ক-বিতর্কের ভেতর যে মুখভঙ্গি তার থাকত, তার থেকে একেবারে ভিন্ন এক অভিব্যক্তি যখন তার মুখে দেখতাম—যখন তার ভেতরের দিকে ডুবে যাওয়া দৃষ্টির প্রথম আভাস পেতাম—তখন বিশেষ করে শৈশব আর কৈশোরে আমি এক ধরনের আশঙ্কা নিয়ে বুঝতে পারতাম যে তিনি সন্তুষ্ট নন।

এখন, এত বছর পরে, আমি বুঝতে পারি—এই অসন্তুষ্টিই মানুষকে লেখক করে তোলার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

লেখক হওয়ার জন্য শুধুমাত্র ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রমই যথেষ্ট নয়। তার আগেই প্রয়োজন নিজেকে ভিড়, সঙ্গীসাথী ও দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা থেকে আলাদা করার ইচ্ছা। এক সময় নিজেকে একটি ঘরে সীমাবদ্ধ করতে হবে, যেখানে মন একাকীত্বের মধ্যে ডুবে যেতে পারে। ধৈর্য আর আশার সঙ্গেই থাকা দরকার, যেন লেখায় একটি গভীর, স্বতন্ত্র জগৎ গড়ে তোলা যায়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই ঘরে নিজেকে বন্দি রাখার আকাঙ্ক্ষা—যা আমাদের প্রকৃতপক্ষে কাজ শুরু করতে প্ররোচিত করে।

এই ধরনের স্বাধীনচেতা লেখকের পূর্বসূরি—যিনি নিজের ইচ্ছামতো বই পড়েন, কেবল নিজের বিবেকের কণ্ঠস্বর শুনে অন্যদের কথার সঙ্গে তর্ক করেন, বইয়ের সঙ্গে একান্ত আলাপে নিজের চিন্তা ও নিজস্ব জগৎ গড়ে তোলেন—নিঃসন্দেহে আধুনিক সাহিত্যের সূচনালগ্নের সেই লেখক মিশেল ডি মন্টেইন (১৫৩৩-১৫৯২)। তিনি এমন একজন লেখক, যার কাছে আমার বাবা বারবার ফিরে যেতেন এবং যাকে তিনি আমাকে পড়তে পরামর্শ দিতেন। আমি নিজেকেও সেই লেখকদের ঐতিহ্যের অংশ বলে ভাবতে চাই—যারা পৃথিবীর যেখানেই থাকুন না কেন, পূর্বে বা পশ্চিমে, সমাজ থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে নিজের ঘরে বইয়ের সঙ্গেই নিজেদের আবদ্ধ করে রাখেন। প্রকৃত সাহিত্যের সূচনা সেখানেই—একজন মানুষ তার বইগুলো নিয়ে নিজেকে একটি ঘরের ভেতর বন্ধ করে দেয়, আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় সাহিত্য।

একজন লেখকের গোপন শক্তি অনুপ্রেরণা নয়—কারণ সেই অনুপ্রেরণা কোথা থেকে আসে, তা কখনোই স্পষ্ট নয়। তার আসল শক্তি হলো তার একগুঁয়েমি আর ধৈর্য। তুর্কি ভাষায় একটি সুন্দর প্রবাদ আছে—“সুঁই দিয়ে কুয়া খোঁড়া।” আমার মনে হয়, কথাটি যেন বিশেষভাবে লেখকদের কথা ভেবেই বলা হয়েছে

কিন্তু আমরা যখন নিজেকে একটি ঘরের ভেতর আবদ্ধ করি, তখন অচিরেই বুঝতে পারি—আমরা আসলে যতটা একা ভেবেছিলাম, ততটা একা নই। আমাদের সঙ্গী হয়ে ওঠে আমাদের আগের প্রজন্মের মানুষের শব্দ, অন্য মানুষের গল্প, অন্যের লেখা বই, অন্যের উচ্চারিত বাক্য—যাকে আমরা ঐতিহ্য বলে জানি। আমার বিশ্বাস, মানুষ নিজেকে বোঝার যে দীর্ঘ প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে, তার মধ্যে সাহিত্যই সবচেয়ে মূল্যবান সঞ্চয়। সমাজ, জাতি ও সম্প্রদায় তখনই আরও বুদ্ধিমান, সমৃদ্ধ ও অগ্রসর হয়ে ওঠে, যখন তারা তাদের লেখকদের গভীর ও উদ্বিগ্ন কথাগুলোর প্রতি মনোযোগ দেয়। আর আমরা সবাই জানি, যখন বই পোড়ানো হয় বা লেখকদের অবমাননা করা হয়, তখন তা অন্ধকার ও অদূরদর্শী সময়ের আগমনেরই লক্ষণ। তবে সাহিত্য কখনোই কেবল একটি জাতির বিষয় নয়। যে লেখক নিজেকে একটি ঘরের ভেতর আবদ্ধ করে প্রথমে নিজের ভেতরের দিকে যাত্রা শুরু করেন, তিনি ধীরে ধীরে সাহিত্যের এক চিরন্তন সত্য আবিষ্কার করেন—নিজের গল্পকে এমনভাবে বলতে হবে যেন তা অন্য কারও গল্প, আর অন্যের গল্প এমনভাবে বলতে হবে যেন তা নিজের গল্প। কারণ সাহিত্য আসলে এইভাবেই জন্ম নেয়। কিন্তু তার আগে আমাদের অন্য মানুষের গল্প ও বইয়ের ভেতর দিয়ে এক দীর্ঘ ভ্রমণ সম্পন্ন করতে হয়।

আমার বাবার একটি চমৎকার গ্রন্থভাণ্ডার ছিল – মোট এক হাজার পাঁচশোটি বই – যা একজন লেখকের জন্য যথেষ্টই বলা যায়। বাইশ বছর বয়সের মধ্যে হয়তো আমি সবগুলোই পড়িনি, তবে প্রতিটি বই আমার কাছে পরিচিত ছিল – কোনগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কোনগুলো হালকা ও সহজপাঠ্য, কোনগুলো শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম, কোনগুলো শিক্ষার জন্য অপরিহার্য, কোনগুলো স্মরণীয় নয় কিন্তু স্থানীয় ইতিহাসের মজার বিবরণ এবং কোন ফরাসি লেখকদের আমার বাবা অত্যন্ত মূল্যায়ন করতেন—সবকিছু আমি জানতাম। মাঝে মাঝে দূর থেকে আমি এই গ্রন্থভাণ্ডারের দিকে তাকিয়ে থাকতাম এবং ভাবতাম, একদিন অন্য কোনো বাড়িতে, আমি নিজেই আমার একটি গ্রন্থভাণ্ডার গড়ব, আরও ভালো, আরও পূর্ণ বইয়ের ভাণ্ডার দিয়ে—একটি জগৎ নির্মাণ করব। বাবার গ্রন্থভাণ্ডারকে দূর থেকে দেখলে তা আমার কাছে বাস্তব জগতের একটি ছোট্ট প্রতিচ্ছবি মনে হতো। আমার বাবা বিদেশে ভ্রমণ করে তার গ্রন্থভাণ্ডার গড়েছিলেন, প্রধানত প্যারিস ও আমেরিকা থেকে আনা বই দিয়ে, তবে ৪০ ও ৫০-এর দশকে ইস্তাম্বুলের পুরনো ও নতুন বইয়ের দোকান থেকে বা বিদেশি ভাষার বই বিক্রেতাদের কাছ থেকেও সংগ্রহ করেছিলেন, যাদের সঙ্গে আমি নিজেও পরিচিত ছিলাম। তাই হয়তো আমার জগতটি স্থানীয়, জাতীয় এবং পশ্চিমী উপাদানের একটি মিশ্রণ।

সত্তর-এর দশকে, আমি নিজেও, কিছুটা উচ্চাকাঙ্ক্ষীভাবে, আমার নিজের গ্রন্থভাণ্ডার গড়া শুরু করেছিলাম। তখন আমি লেখক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিইনি – যেমনটি আমি ‘ইস্তাম্বুল’-এ উল্লেখ করেছি, আমি অনুভব করেছিলাম যে চিত্রশিল্পী হওয়া হবে না, তবে জীবনের পথ কী হবে তা নিশ্চিত ছিলাম না। আমার ভিতরে ছিল অদম্য কৌতূহল, পড়াশোনা ও শেখার আশায় ভরা আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু একই সাথে জীবনের কিছুটা অভাব অনুভব করতাম, মনে হতো আমি অন্যদের মতো জীবন যাপন করতে পারব না। বাবার গ্রন্থভাণ্ডারের দিকে তাকিয়ে থাকার মতো অনুভব নিয়ে ভাবনায় ডুবে যেতাম এই ভেবে হয়তো গ্রন্থভাণ্ডারের মতো আমাকে নিঃসঙ্গই থাকতে হবে। অন্য একটি কারণ ছিল দুশ্চিন্তা ও অভাবের – কারণ আমি খুব ভালো জানতাম যে আমি এমন দেশে বসবাস করি, যেখানে শিল্পীদের – চিত্রশিল্পী হোক বা লেখক – যাদের প্রতি খুব কম মনোযোগ দেওয়া হয়, এবং তাদের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই মানুষের। সত্তর-এর দশকে, যখন আমি বাবার দেওয়া অর্থ নিয়ে এক ধরনের নেশায় ইস্তাম্বুলের পুরনো বইয়ের দোকান থেকে ছেঁড়া, ধুলোঢাকা, পুরনো বই কিনতাম, তখন তাদের বইয়ের মতোই এই দোকানগুলোর দরিদ্র ও বিছিন্ন অবস্থার কারণে আমি বেদনাহত হতাম – রাস্তার ধারে, মসজিদের আঙিনায়, পুরনো দেয়ালের শিবিরে বই সাজানো দারিদ্র্য-ছাপা বিক্রেতাদের অবস্থা আমাকে সমানভাবে মর্মাহত করত। আমার জীবনে বা সাহিত্যে আমার অবস্থান নিয়ে একটি মৌলিক অনুভূতি ছিল যে আমি ‘কেন্দ্রে নেই’। বিশ্বের কেন্দ্রের জীবন আমাদের জীবনের চেয়ে সমৃদ্ধ ও রোমাঞ্চকর; আর আমি ইস্তাম্বুল এবং পুরো তুরস্কের সঙ্গে তার বাইরে। আজ আমি মনে করি, এই অনুভূতি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের সাথেই ভাগ করে নেয়া যায়। একইভাবে, একটি বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রও আমার থেকে অনেক দূরে ছিল। আসলে আমার মনোযোগ পশ্চিমী সাহিত্যের দিকে বেশি ছিল, বিশ্বসাহিত্যের নয়, আর আমরা তুর্কিরা তার বাইরে। বাবার গ্রন্থভাণ্ডারই এর প্রমাণ ছিল। একদিকে ছিল ইস্তাম্বুলের বই – আমাদের স্থানীয় সাহিত্য, আমাদের প্রিয় জগত – আর অন্যদিকে ছিল পশ্চিমী জগতের বই, যার সঙ্গে আমাদের নিজস্ব জগতের কোনো মিল নেই। আমাদের এই মিলের অভাবই আমাদের কষ্ট দিত এবং একই সঙ্গে আশা দিত। পড়া, লেখা—এক জগত ছেড়ে অন্য জগতের বিস্ময় ও বৈচিত্র্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার মতো।

আমি অনুভব করতাম, বাবাও তার জীবন থেকে পালানোর জন্য বই পড়তেন, পশ্চিমের দিকে যেতেন – যেমন অনেক বছর পরে আমি করছি। সে সময় আমরা আমাদের সংস্কৃতির অবরুদ্ধতার কারণে বইয়ে ভরসা রাখতাম। শুধু পড়ার মাধ্যমে নয়, লেখার মাধ্যমেও আমরা ইস্তাম্বুলের জীবন থেকে পশ্চিমের জগতের দিকে যাত্রা করতাম। বাবার সেই নোটবুকগুলো পূরণ করার জন্য, তিনি প্যারিসে গিয়ে নিজের কক্ষে নিজেকে একা আবদ্ধ করতেন এবং পরে সেই লেখা লিখে তুরস্কে ফেরত আনতেন। বাবার স্যুকেসের দিকে তাকালে, মনে হতো, এ কারণেই আমি অস্বস্তি অনুভব করি। তুরস্কে ২৫ বছর ধরে লেখক হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য যে একাকীত্ব ও পরিশ্রম আমি সহ্য করেছি, বাবাকে দেখতাম তার গভীর ভাবনা এই স্যুটকেসে লুকিয়ে রাখেছেন, যেন লেখালেখি এমনই এক কাজ যেটা সাহিত্যিককে সমাজ, রাষ্ট্র, মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে সম্পন্ন করতে হয়। সম্ভবত এই কারণে আমি বাবার প্রতি একটু রাগ অনুভব করতাম, যে তিনি সাহিত্যকে আমার মতো এতো সিরিয়াসভাবে গ্রহণ করেননি। আমি বাবার প্রতি রাগান্বিত ছিলাম, কারণ তিনি আমার মতো জীবনযাপন করেননি, জীবন নিয়ে কখনো ঝগড়া বিবাদে জড়াননি, বরং সবসময় বন্ধু এবং প্রিয়জনের সঙ্গে হাসি-খুশিতেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমার সত্তার ভেতরে ঠিক ‘রাগ’ বলব না বরং ‘ঈর্ষা’ই বলব, যা হতো আমার বাবাকে নিয়ে। আমি এভাবে ভাবতে ভাবতে নিজেই অস্থির হয়ে পড়তাম। তখন আমি নিজেকে আমার পরিচিত বিদ্রুপাত্মক, রাগান্বিত স্বরে প্রশ্ন করতাম: ‘সুখ কী?’ সুখ কি সেই একাকী ঘরে গভীর জীবন যাপন করা? না কি সুখ হলো সমাজে আরামদায়ক জীবন যাপন করা, সকলের মতো একই বিশ্বাসে বেঁচে থাকা, অথবা যেন তাই আচরণ করা? সুখ কি তবে গোপনে লিখে যাওয়া, কিন্তু সকলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হওয়া? কিন্তু এই প্রশ্নগুলো বেশ কঠোর ছিল। কোথা থেকে আমি ধারণা পেয়েছিলাম যে জীবনের মান মাপার একমাত্র দিক হলো সুখ? মানুষ, পত্রিকা, সবাই আচরণ করছিল যেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মান হলো সুখ। এমনকি এটা ইঙ্গিত দিচ্ছিল না যে হয়তো এর পুরো বিপরীতটি সত্য হতে পারে? শেষ পর্যন্ত, বাবা তার পরিবার থেকে কতবার পালিয়েছেন—আমি তাকে কতটা জানি, কতটা বুঝতে পারি তার অশান্তি?

এই ভাবনাগুলো আমাকে তাড়িয়ে ফিরছিল যখন আমি প্রথমবার বাবার স্যুটকেস খুললাম। আমার বাবা কি তবে স্যুটকেসে কোনো গোপন কথা রাখতেন, জীবনের কোনো দুঃখ যা আমি জানতাম না, যা তিনি শুধুমাত্র লেখার মধ্যে ঢেলে সহ্য করে গেছেন? স্যুটকেসটি খুলতেই আমি তার ভ্রমণের সুবাস অনুভব করেছিলাম, কয়েকটি নোটবুক চিনতে পেরেছিলাম, মনে হলো তিনি সেগুলো বছর আগে আমাকে দেখিয়েছিলেন, তবে বেশি সময় দেননি। বেশিরভাগ নোটবুক যেগুলো আমি হাতে নিয়েছি, সেগুলো তিনি পূরণ করেছিলেন যখন যুবক হিসেবে আমাদের ছেড়ে প্যারিসে গিয়েছিলেন। আর আমি, খুব জানার আগ্রহে ছিলাম, বাবা সেই বয়সে কী লিখেছিলেন, কী ভেবেছিলেন, যখন তিনি আমার বর্তমান বয়সে ছিলেন।

দ্রুতই বুঝতে পারলাম, এখানে আমি এমন কোনো উত্তর পাব না। আমাকে সবচেয়ে বেশি অস্থির করেছিল, যখন নোটবুকের কিছু অংশে লেখকসুলভ ভাষা খুঁজে পেয়েছি। আমি নিজেকে বলেছিলাম, এটি আমার বাবার স্বর নয়; এটি আসল নয়, অন্ততঃ আমার পরিচিত বাবার সাথে মিলে যায় না। আমার ভয়ের তলে আরও গভীর একটি ভয় লুকিয়ে ছিল: সে ভয়টা হচ্ছে, হয়তো আমি সত্যিকারের কোনো লেখক নই, বাবার লেখায় ভালো কিছু পাব না! এই ভয় আমার অতীতের নিরাশা আরও বাড়িয়েছিল, যখন আমি যুবক ছিলাম, আমার জীবন, আমার অস্তিত্ব, লেখার আকাঙ্ক্ষা এবং কাজের ওপর প্রশ্ন উঠেছিল। লেখক হিসেবে আমার প্রথম দশ বছরে এই উদ্বেগগুলো আরও গভীরতর হয়েছিল, এবং যদিও আমি তাদের মোকাবিলা করতাম, মাঝে মাঝে ভয় পেতাম যে একদিন আমাকে স্বীকার করতে হবে পরাজয় – ঠিক যেমন চিত্রশিল্পে করেছি – এবং অশান্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে উপন্যাস লেখা ত্যাগ করতে হতে পারে।

আমার বাবার স্যুটকেসটি বন্ধ করে সাজিয়ে রাখার সময় যে দুটি গভীর অনুভূতি আমার মধ্যে জেগে উঠেছিল তা ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি। কেবল প্রথমবারের মতোই সেগুলো আমার মধ্যে অনুভূত হয়নি।

বছরের পর বছর ধরে আমার আমার পাঠ ও লেখার মাধ্যমে এই অনুভূতিগুলো ছায়ার মতো পিছু নিয়েছে। সেগুলো আমি খুঁজে বেড়িয়েছি, গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করেছি, তাদের বিভিন্ন রূপ, অপ্রত্যাশিত প্রভাব, সংবেদনশীলতা এবং প্রতিক্রিয়াগুলো অনুধাবন করতে চেয়েছি। অবশ্যই, জীবনের ছোটখাটো বিভ্রান্তি, সংবেদনশীলতা এবং বইয়ের মাধ্যমে উদ্ভূত ক্ষণস্থায়ী যন্ত্রণা প্রায়শই আমার মনকে দুলিয়েছে, বিশেষত তরুণ বয়সে। কিন্তু কেবলমাত্র বই লিখে আমি ‘অমায়িকতা’ সংক্রান্ত সমস্যা (যেমন My Name is Red এবং The Black Book-এ) এবং প্রান্তীয় জীবনের সমস্যা (যেমন Snow এবং Istanbul-এ) আরও গভীরভাবে বুঝতে পারি। একজন লেখক হওয়ার জন্য আমাদের ভিতরে লুকানো গোপন ক্ষতগুলোকে স্বীকৃতি দিতে হবে, ক্ষতগুলো এতটাই লুকানো যে আমরা নিজেরাই অনেক সময় এ বিষয়ে সচেতন থাকি না। ধৈর্য সহকারে তা অন্বেষণ করা, বোঝা, আলোকিত করা ও ওই ক্ষণগুলো ধারণ করা অন্তর্গত করা এবং সেগুলোকে আমাদের আত্মার ও লেখার সচেতন অংশে পরিণত করাই একজন লেখকের কাজ।

একজন লেখক এমন বিষয় নিয়ে কথা বলেন যা সবাই জানে, কিন্তু তারা যে জানেন এটাই জানে না তারা।
এই জ্ঞানকে অন্বেষণ করা এবং তা বৃদ্ধি পেতে দেখার আনন্দ অসীম; এতে পাঠক একই সঙ্গে পরিচিত ও জাদুকরী এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয় তাতে।

যখন একজন লেখক কয়েক বছর ধরে নিজেকে একটি ঘরে বন্দি করে তাঁর কলাকে নিখুঁত করতে থাকেন – একটি জগৎ সৃষ্টি করতে থাকেন— তখন জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে মানবিকতায় বিশ্বাস স্থাপন করেন।

আমার আস্থা এই বিশ্বাস থেকেই উঠে আসে যে, সকল মানুষই একে অপরের সঙ্গে অভিন্ন রকমের, অন্যরাও আমার মতো ক্ষত বহন করে চলেন এবং কোনো না কোনো সময় তিনি তা অনুধাবন করবেন।

সমস্ত সত্যিকার সাহিত্যকর্মই এই শিশুসুলভ আশাবাদ থেকে সৃষ্টি যে সব মানুষই একে অপরের প্রতিচ্ছবি।
একজন লেখক কয়েক বছর ধরে ঘরে বন্দি থাকলেও, এই অঙ্গভঙ্গি দিয়ে তিনি একটি একক মানবতার কেন্দ্রবিহীন জগতের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন।

কিন্তু আমার বাবার স্যুটকেস এবং ইস্তানবুলে আমাদের জীবনযাপনের ফিকে রঙগুলো দেখলে বোঝা যায়, পৃথিবীরও একটি কেন্দ্র ছিল এবং তা আমাদের থেকে অনেক দূরে। আমার বইগুলোতে আমি কিছুটা বিশদে বর্ণনা করেছি কীভাবে এই মৌলিক সত্যটি কেন্দ্রগামী অনুভূতিকে জাগিয়ে রাখে‌ এবং আরেকটি পথে কীভাবে এটি আমাকে আমার অমায়িকতা নিয়ে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে। আমি অভিজ্ঞতা থেকে জানি, পৃথিবীর মানুষের একটি বড় অংশ এই অনুভূতি নিয়ে জীবনযাপন করে এবং এঁদের অনেকেই আমার চেয়েও গভীরতর অপ্রতুলতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং ক্ষয়ক্ষতির অনুভূতি সহ্য করে। হ্যাঁ, মানবজাতির সবচেয়ে বড় সংকটগুলো এখনও ভূমিহীনতা, গৃহহীনতা এবং ক্ষুধা। কিন্তু আজকের দিনের আমাদের টেলিভিশন এবং সংবাদপত্র এই মৌলিক সমস্যা আরো দ্রুত ও সাহিত্যের চেয়ে আরো সহজভাবে উপস্থাপন করে।

একজন লেখক হওয়ার জন্য আমাদের ভিতরে লুকানো গোপন ক্ষতগুলোকে স্বীকৃতি দিতে হবে, ক্ষতগুলো এতটাই লুকানো যে আমরা নিজেরাই অনেক সময় এ বিষয়ে সচেতন থাকি না

আজকের দিনের সাহিত্যের সে বিষয়টি উল্লেখ ও তদন্ত প্রয়োজন— তা হচ্ছে মানবসম্প্রদায়ের মৌলিক ভীতি: কেন্দ্রের বাইরে থেকে যাওয়ার ভয়, অবহেলিত হওয়ার ভয়, নিগৃহীত হওয়ার ভয়। এই ভয় থেকে উদ্ভূত নিজেকে অবমূল্যায়িত করার অনুভূতি; সমষ্টিগত অপমান, দুর্বলতা, লাঞ্ছনা, অভিযোগ, সংবেদনশীলতা এবং কল্পিত আপত্তির পরবর্তী রূপ হিসাবে জাতীয়তাবাদী অহংকার ও অতিরঞ্জিত আত্মশ্লাঘার জন্ম হয়। যখনই আমি এমন অনুভূতিগুলোর মুখোমুখি হই এবং সেই অতিরিক্ত, অহেতুক ভাষা দেখি— যা প্রায়শই ব্যবহৃত হয়, আমি বুঝি এগুলো আমার ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গে সংস্পর্শ করছে। আমরা প্রায়ই পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে থাকা মানুষ, সমাজ এবং জাতিগুলোকে দেখেছি — এবং আমি সহজেই তাদের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারি—যারা লজ্জার ভয়ে এবং সংবেদনশীলতার কারণে কখনও কখনও বোকার মতো জীবনযাপন করে। আমি এটাও জানি, পশ্চিমেও বিভিন্ন জাতি ও মানুষ তাঁদের অতিরিক্ত সম্পদ নিয়ে গৌরব করে।
রেনেসাঁ, এনলাইটেনমেন্ট, আধুনিকতা নিয়ে আত্মতুষ্টি তাঁদেরকেও বোকা বানায়।

এর মানে হল, আমার বাবা একা ছিলেন না, কেন্দ্রমুখী একটি পৃথিবীর ধারণার প্রতি আমরা সবাই অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদান করি। অন্যদিকে যে বিষয়টি আমাদের একটিমাত্র ঘরে আটকে রেখে লিখতে বাধ্য করে তা সম্পূর্ণ বিপরীত এক বিশ্বাস। এ বিশ্বাসটি হচ্ছে একদিন আমাদের এ সাহিত্যকর্ম মানুষ পড়বে ও আত্মস্থ করবে। কারণ সমস্ত পৃথিবীর মানুষই একে অন্যের প্রতিচ্ছবি।

আমি আমার এবং বাবার লেখার অভিজ্ঞতা থেকে যেটা জেনেছি তা হচ্ছে, একটি সংঘাতময় আশাবাদ, যা প্রান্তে রাখা এবং বাইরে থাকার ক্রোধের দ্রোহে উন্মত্ত।

দস্তয়েভস্কি যা সারাজীবন পশ্চিমের প্রতি ভালোবাসা এবং ঘৃণা বোধ করেছেন তেমনি আমিও অনেকবার তা অনুভব করেছি। কিন্তু যদি আমি একটি সত্যিকারের সত্য উপলব্ধি করে থাকি, যদি আমার আশাবাদের কোনো কারণ থাকে, তার কারণ আর কিছুই না, এই মহান লেখকের পশ্চিমের প্রতি ভালোবাসা-ঘৃণার সম্পর্কের দোলাচলের ক্লান্ত ভ্রমণ শেষে অপর যে বিশ্ব তিনি নির্মাণ করেছেন তা প্রত্যক্ষ করার লোভ।

যে সব লেখক জীবনের দীর্ঘ সময় এই সাধনায় নিবেদন করেছেন, তারা এক গভীর সত্য জানেন—আমরা যে উদ্দেশ্য নিয়েই লেখালেখি শুরু করি না কেন, বহু বছরের আশা, ধৈর্য ও শ্রমে যে জগৎ আমরা গড়ে তুলি, শেষ পর্যন্ত তা আমাদের সেই প্রাথমিক উদ্দেশ্য থেকে অনেক দূরে অন্য এক ভুবনে নিয়ে যায়। সেই জগৎ আমাদের টেবিলের পাশে বসে থাকা দুঃখ বা ক্রোধের মুহূর্তগুলো থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, সেই দুঃখ-ক্রোধেরও ওপারে, এক ভিন্ন বাস্তবতায় পৌঁছে দেয়। আমার বাবাও কি এমন এক জগতে পৌঁছাতে পারতেন না? যেমন দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর কুয়াশার আবরণ ভেদ করে ধীরে ধীরে রঙিন এক দ্বীপ চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তেমনি এই নতুন জগৎও ধীরে ধীরে আকার পায় এবং আমাদের মুগ্ধ করে। আমরা যেন সেই সব পশ্চিমা ভ্রমণকারীর মতো, যারা দক্ষিণ দিক থেকে যাত্রা শুরু করে কুয়াশা ভেদ করে ধীরে ধীরে ইস্তাম্বুলকে উঠতে দেখেছিল। আশা ও কৌতূহল নিয়ে শুরু হওয়া দীর্ঘ যাত্রার শেষে তাদের সামনে উদ্ভাসিত হয় এক বিস্ময়কর নগরী—মসজিদ ও মিনারের সারি, অসংখ্য বাড়িঘর, সরু রাস্তা, পাহাড়, সেতু আর ঢালু পথের সমাহার; যেন এক সম্পূর্ণ নতুন জগৎ।

সেই দৃশ্য দেখে আমাদের মনে হয়, আমরা যেন এই জগতে প্রবেশ করি এবং এর ভেতরেই হারিয়ে যাই—যেমন আমরা একটি বইয়ের ভেতরে ডুবে যাই। এক সময় আমরা যে টেবিলে বসেছিলাম নিজেকে প্রান্তিক, বিচ্ছিন্ন, ক্ষুব্ধ কিংবা গভীর বিষণ্ণ মনে করে—সেই সব অনুভূতিরও ওপারে এসে আমরা আবিষ্কার করি এক সম্পূর্ণ নতুন জগৎ।

এখন আমার অনুভূতিটা শৈশব ও তরুণ বয়সের অনুভূতির সম্পূর্ণ বিপরীত। আজ আমার কাছে পৃথিবীর কেন্দ্র হলো ইস্তাম্বুল। এর কারণ শুধু এই নয় যে আমি সারা জীবন সেখানেই বাস করেছি; বরং গত তেত্রিশ বছর ধরে আমি তার রাস্তা, তার সেতু, তার মানুষ, তার কুকুর, তার বাড়িঘর, তার মসজিদ, তার ফোয়ারা, তার অদ্ভুত নায়ক, তার দোকানপাট, তার খ্যাতিমান চরিত্র, তার অন্ধকার কোণ, তার দিন ও রাত—সবকিছুর গল্প বলে চলেছি। লিখতে লিখতে আমি সেগুলোকে নিজের ভেতরে ধারণ করেছি, নিজের অস্তিত্বের অংশ করে নিয়েছি, ভালোবেসে জড়িয়ে ধরেছি।

একসময় এমন এক মুহূর্ত এল, যখন আমার নিজের হাতে গড়ে তোলা এই জগৎ—যে জগৎ প্রথমে শুধু আমার কল্পনায়ই ছিল—বাস্তবে যে শহরে আমি বাস করতাম, তার চেয়েও আমার কাছে বেশি সত্য ও জীবন্ত মনে হতে লাগল। তখন মনে হতো, এই মানুষগুলো, এই রাস্তাগুলো, এই বস্তু ও স্থাপনাগুলো যেন নিজেদের মধ্যেই কথা বলতে শুরু করেছে, এমনভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছে, যা আমি আগে কল্পনাও করিনি। যেন তারা কেবল আমার কল্পনায় বা বইয়ের পাতায় নয়, নিজেদের স্বতন্ত্র জীবন নিয়েই অস্তিত্বশীল। ‘সূচ দিয়ে কূপ খনন করা’র মতো ধৈর্য ও একাগ্রতায় আমি যে জগৎ নির্মাণ করেছিলাম, সেই জগৎ তখন আমার কাছে অন্য সব কিছুর চেয়েও সত্য বলে মনে হতে থাকে।

বাবার স্যুটকেসটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে হলো, হয়তো দীর্ঘদিন লেখালেখি করতে গিয়ে বাবাও এক ধরনের আনন্দ আবিষ্কার করেছিলেন। তাই তাঁকে আগে থেকেই বিচার করা ঠিক হবে না। আসলে তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তিনি কখনোই কর্তৃত্বপরায়ণ, ভীতিজাগানিয়া, দমিয়ে রাখা বা শাস্তি দিতে উদগ্রীব সেই প্রচলিত ধরনের বাবা ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন এমন একজন বাবা, যিনি আমাকে সবসময় স্বাধীনতা দিয়েছেন, আমার প্রতি গভীর সম্মান দেখিয়েছেন। আমি প্রায়ই ভেবেছি, মাঝে মাঝে যদি আমি আমার কল্পনার জগতে অবাধে বিচরণ করতে পেরে থাকি—হোক তা স্বাধীন উচ্ছ্বাসে, কিংবা শিশুসুলভ সরলতায়—তার একটি বড় কারণ হলো, শৈশব ও কৈশোরের অনেক বন্ধুর মতো আমাকে কখনো বাবাকে ভয় পেতে হয়নি। এমনকি কোনো কোনো সময় আমি গভীরভাবে বিশ্বাসও করেছি যে আমি লেখক হতে পেরেছি আংশিক এই কারণেই যে, আমার বাবাও তরুণ বয়সে একসময় লেখক হতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁর লেখাগুলো আমাকে সহনশীল মন নিয়ে পড়তে হবে—সেই হোটেলকক্ষগুলিতে বসে তিনি যা লিখেছিলেন, তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে।

এই আশাব্যঞ্জক চিন্তাগুলো মনে নিয়েই আমি ধীরে ধীরে সেই স্যুটকেসটির দিকে এগিয়ে গেলাম—যেটি আমার বাবা রেখে গিয়েছিলেন ঠিক সেই জায়গাতেই। সমস্ত ইচ্ছাশক্তি জড়ো করে আমি তার ভেতর থেকে কয়েকটি পাণ্ডুলিপি ও নোটবই পড়তে শুরু করলাম। বাবা আসলে কী লিখেছিলেন? আজ মনে পড়ে, প্যারিসের কিছু হোটেলঘরের জানালা থেকে দেখা দৃশ্যের বর্ণনা ছিল সেখানে, ছিল কয়েকটি কবিতা, কিছু প্যারাডক্স (বৈপরীত্যময় চিন্তা), কিছু বিশ্লেষণ।

এখন যখন লিখতে বসি আমার নিজের অনুভূতিটা যেন এমন কারও মতো হয়ে ওঠে, যে সদ্য একটি সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে পড়েছে এবং মরিয়া হয়ে মনে করার চেষ্টা করছে কীভাবে ঘটনাটি ঘটল—কিন্তু একই সঙ্গে আবার ভয় পাচ্ছে, যদি খুব বেশি কিছু মনে পড়ে যায়! ছোটবেলায়, যখন মা-বাবার মধ্যে ঝগড়া শুরু হওয়ার উপক্রম হতো—যখন হঠাৎ ঘরজুড়ে নেমে আসত সেই ভয়ংকর নীরবতা—তখন বাবা দ্রুত রেডিও চালিয়ে দিতেন, যেন পরিবেশটা বদলে যায়। আর রেডিওর সুর আমাদের সাহায্য করত সেই অস্বস্তিকর মুহূর্তগুলো দ্রুত ভুলে যেতে।

আমিও তাই এখন সেই রেডিওর সুরের মতো কয়েকটি কোমল বাক্য দিয়ে পরিবেশটা বদলে নিতে চাই।

আমি লিখি, কারণ আমার মনে হয় কোথাও যেন আমাকে পৌঁছাতে হবে—কিন্তু স্বপ্নের মতোই সেই জায়গায় ঠিকমতো পৌঁছাতে পারি না। আমি লিখি, কারণ আমি কখনো পুরোপুরি সুখী হতে পারিনি। আর শেষ পর্যন্ত—আমি লিখি সুখী হওয়ার জন্য

আপনারা জানেন, লেখকদের সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি করা হয়, সেটি হলো—আপনি কেন লিখেন? আমিও তার উত্তরে নানা কথা বলতে পারি। আমি লিখি, কারণ লেখার এক অদম্য প্রয়োজন আমার ভেতরে কাজ করে। আমি লিখি, কারণ অন্যদের মতো স্বাভাবিক কোনো কাজ আমার পক্ষে করা সম্ভব হয় না। আমি লিখি, কারণ আমি এমন বই পড়তে চাই, যেমন আমি লিখি। আমি লিখি, কারণ আমি আপনাদের সবার ওপর, সমগ্র পৃথিবীর ওপর কখনো কখনো গভীর রাগ অনুভব করি। আমি লিখি, কারণ একটি ঘরে সারাদিন বসে লিখে যাওয়াকে আমি ভালোবাসি। আমি লিখি, কারণ বাস্তব জীবনে অংশ নেওয়ার একমাত্র উপায় আমার কাছে হলো তাকে শব্দের মাধ্যমে নতুনভাবে রূপ দেওয়া।

আমি লিখি, কারণ আমি চাই অন্যরা—সবাই, পুরো পৃথিবী—জানুক আমরা কী ধরনের জীবন যাপন করেছি এবং এখনো করে চলেছি ইস্তাম্বুলে, তুরস্কে। আমি লিখি, কারণ কাগজ, কলম আর কালি—এই সবকিছুর গন্ধ আমার ভীষণ প্রিয়। আমি লিখি, কারণ সাহিত্য ও উপন্যাসের শিল্পের ওপর আমার বিশ্বাস অন্য যেকোনো কিছুর চেয়েও গভীর। আমি লিখি, কারণ লেখালেখি আমার অভ্যাস, আমার নেশা। আমি লিখি, কারণ আমি ভয় পাই—কখনো যদি সবাই আমাকে ভুলে যায়। আমি লিখি, কারণ লেখালেখি যে সম্মান ও আগ্রহ এনে দেয়, সেটাও আমার ভালো লাগে। আমি লিখি একা থাকার জন্য। হয়তো আমি লিখি এই আশায় যে, কেন আমি আপনাদের সবার ওপর এত গভীর রাগ অনুভব করি, তার কারণ একদিন বুঝতে পারব। আমি লিখি, কারণ আমি পড়তে ভালোবাসি। আমি লিখি, কারণ একবার কোনো উপন্যাস, প্রবন্ধ বা একটি পৃষ্ঠা লেখা শুরু করলে তা শেষ না করা পর্যন্ত আমার শান্তি হয় না। আমি লিখি, কারণ সবাই আমার কাছে লেখার প্রত্যাশা করে। আমি লিখি, কারণ গ্রন্থাগারের অমরত্বে আমার এক ধরনের শিশুসুলভ বিশ্বাস আছে—আর সেই তাকের ওপর আমার বইগুলো নীরবে টিকে থাকবে, এই কল্পনাও আমাকে আনন্দ দেয়। আমি লিখি, কারণ জীবনের সৌন্দর্য ও প্রাচুর্যকে শব্দে রূপান্তর করার মধ্যে এক অদ্ভুত উত্তেজনা আছে। আমি লিখি কেবল গল্প বলার জন্য নয়, বরং গল্পকে গড়ে তোলার জন্য। আমি লিখি, কারণ আমার মনে হয় কোথাও যেন আমাকে পৌঁছাতে হবে—কিন্তু স্বপ্নের মতোই সেই জায়গায় ঠিকমতো পৌঁছাতে পারি না। আমি লিখি, কারণ আমি কখনো পুরোপুরি সুখী হতে পারিনি। আর শেষ পর্যন্ত—আমি লিখি সুখী হওয়ার জন্য।

আমার অফিসে এসে স্যুটকেসটি রেখে যাওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর আমার বাবা আবার আমাকে দেখতে এলেন। প্রতিবারের মতো এবারও তিনি সঙ্গে করে একটি চকলেট বার নিয়ে এসেছিলেন—সম্ভবত তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন যে তখন আমার বয়স আটচল্লিশ। আগের মতোই আমরা গল্পে মেতে উঠলাম—জীবন নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে, আর পরিবার ঘিরে নানা ছোটখাটো গসিপ নিয়ে। কথার ফাঁকে হাসি-ঠাট্টাও চলছিল।

হঠাৎ একসময় বাবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ঘরের সেই কোণটিতে, যেখানে তিনি স্যুটকেসটি রেখে গিয়েছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, সেটি আর আগের জায়গায় নেই—আমি সরিয়ে রেখেছি। আমাদের চোখে চোখ পড়ল। মুহূর্তের জন্য ঘরজুড়ে নেমে এল এক ঘন নীরবতা।

আমি তাঁকে বললাম না যে আমি স্যুটকেসটি খুলে তার ভেতরের লেখা পড়ার চেষ্টা করেছি। বরং দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। কিন্তু তিনি বুঝে গেলেন। আর আমি বুঝলাম যে তিনি বুঝেছেন। ঠিক তেমনি তিনিও বুঝলেন যে আমি বুঝেছি—তিনি বুঝেছেন। এই নীরব বোঝাপড়া কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই যেন আমাদের মধ্যে সম্পূর্ণ হয়ে উঠল, কিন্তু তার সীমাও ছিল ঠিক ততটুকুই। কারণ আমার বাবা ছিলেন সহজ-সরল, প্রফুল্ল এক মানুষ, যিনি নিজের ওপর গভীর আস্থা রাখতেন। তাই তিনি আগের মতোই মৃদু হেসে আমার দিকে তাকালেন। তারপর অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়, অন্য সব দিনের মতোই তিনি আমাকে কিছু স্নেহময় ও উৎসাহভরা কথা বললেন—একজন বাবার স্বাভাবিক মমতা নিয়ে।

সব সময়ের মতোই আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাবাকে চলে যেতে দেখছিলাম। তাঁর সহজ, নিরুদ্বেগ এবং অচঞ্চল স্বভাব আমাকে এক ধরনের ঈর্ষায় ভরিয়ে দিত। কিন্তু সেদিন সেই অনুভূতির পাশাপাশি আমার ভেতরে হঠাৎ এক মুহূর্তের আনন্দও জেগে উঠেছিল—যে আনন্দ আমাকে সঙ্গে সঙ্গেই লজ্জিত করে তুলেছিল। কারণ তখন আমার মনে হয়েছিল, হয়তো আমি তাঁর মতো এত স্বচ্ছন্দভাবে জীবন কাটাতে পারিনি; হয়তো তাঁর মতো এত সুখী বা নিরুদ্বেগ জীবনও আমার হয়নি। কিন্তু তার বদলে আমি আমার জীবনকে নিবেদন করেছি লেখালেখির কাছে—আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমি কী বলতে চাই।

এই চিন্তাটাই আমাকে লজ্জা দিয়েছিল, কারণ মনে হচ্ছিল যেন আমি নিজের পথকে বড় করে দেখাতে গিয়ে বাবার জীবনের মূল্য কমিয়ে দিচ্ছি। অথচ তিনি তো সেই মানুষ, যিনি কখনোই আমার কষ্টের কারণ হননি; বরং যিনি সবসময় আমাকে স্বাধীন থাকতে দিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে লেখালেখি ও সাহিত্য প্রায়ই মানুষের জীবনের গভীরে থাকা এক ধরনের অভাববোধের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে—আর সেই অভাবের সঙ্গে যেমন যুক্ত থাকে সুখের অনুভূতি, তেমনি কখনো কখনো অপরাধবোধও।

কিন্তু সেই দিনটির কথা ভাবতে গিয়ে আমার মনে আরেকটি ঘটনার কথাও ভেসে উঠেছিল, যার মধ্যে যেন এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য আছে এবং যা আমাকে আরও গভীর এক অপরাধবোধে আচ্ছন্ন করেছিল। বাবার সেই স্যুটকেসটি আমাকে দেওয়ার তেইশ বছর আগে—আর আমি যখন বাইশ বছর বয়সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমি একজন ঔপন্যাসিক হব‌ এবং অন্য সবকিছু ছেড়ে নিজেকে একটি ঘরের ভেতরে বন্দী করে লিখতে শুরু করেছিলাম—তার চার বছর পর আমি আমার প্রথম উপন্যাস Cevdet Bey and His Sons শেষ করেছিলাম। তখনও সেটি প্রকাশিত হয়নি। কাঁপতে থাকা হাতে আমি সেই উপন্যাসের টাইপ করা পাণ্ডুলিপিটি বাবাকে দিয়েছিলাম, যেন তিনি পড়ে আমাকে জানান—তিনি কী ভাবছেন। আমি শুধু তাঁর রুচি ও বুদ্ধিবৃত্তির ওপর আস্থা রেখেই তা করিনি; তাঁর মতামত আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, আমার মায়ের মতো তিনি কখনোই আমার লেখক হওয়ার ইচ্ছার বিরোধিতা করেননি। তখন বাবা আমাদের সঙ্গে ছিলেন না, দূরে কোথাও ছিলেন। তাঁর ফেরার অপেক্ষায় আমি অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। দুই সপ্তাহ পর তিনি ফিরে এলেন। দরজা খুলতে আমি ছুটে গেলাম। বাবা কিছুই বললেন না; বরং তিনি আমাকে এমনভাবে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, যেটুকুই বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল যে তিনি বইটি খুব পছন্দ করেছেন।

কিছুক্ষণ আমরা সেই অস্বস্তিকর নীরবতার মধ্যে ডুবে ছিলাম—যে নীরবতা গভীর আবেগের মুহূর্তে প্রায়ই নেমে আসে। পরে যখন আমরা কিছুটা শান্ত হলাম এবং কথা বলতে শুরু করলাম, তখন বাবা তাঁর স্বভাবসুলভ অতিরঞ্জিত ও আবেগময় ভাষায় আমার ওপর এবং আমার প্রথম উপন্যাসের ওপর তাঁর আস্থার কথা প্রকাশ করলেন। তিনি বলেছিলেন, একদিন আমি সেই পুরস্কারই পাব, যে পুরস্কার গ্রহণ করার জন্য আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি।

তিনি এসব কথা বলেননি আমাকে তাঁর মতামত বিশ্বাস করানোর জন্য, কিংবা কোনো পুরস্কারকে আমার লক্ষ্য করে দেওয়ার জন্য। তিনি বলেছিলেন একজন তুর্কি বাবার মতো করে—ছেলেকে সাহস জোগাতে, উৎসাহ দিতে। যেমন অনেক সময় বলা হয়, “একদিন তুমি বড় মানুষ হবে, একদিন তুমি পাশা হবে!” এরপর বহু বছর ধরে যখনই তিনি আমাকে দেখতেন, একই কথাগুলো বলে আমাকে উৎসাহ দিতেন। ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে আমার বাবা মারা যান।

আজ, যখন আমি এই মহান পুরস্কার গ্রহণ করতে এসে সুইডিশ একাডেমির সম্মানিত সদস্যদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি—এই বিরাট সম্মান ও আনন্দের মুহূর্তে—তখন আমার বিশ্বাস হচ্ছে, বাবা আজ এখানে আমাদের মাঝেই উপস্থিত রয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত