১৭ এপ্রিল ২০২০
প্রচ্ছদ :
রাজিব রায়
সৈয়দ তারিক
কবি, ভাবুক
6482

সৈয়দ তারিক
কবি, ভাবুক

6482

তুমি আমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও

জন এলিয়ার দ্বিপদীগুচ্ছ

নাম শুনলে মনে হয় ইউরো-মার্কিন কেউ হবেন, নিদেনপক্ষে ফিরিঙ্গি। আসলে নেহাত পাকিস্তানি তিনি। আসল নাম সৈয়দ সিবত-ই-আসগর নকভি। ১৯৩১ সালে ব্রিটিশ ভারতের উত্তর প্রদেশে জন্ম তার। উর্দুভাষী কবি তিনি, দার্শনিক, জীবনীকার ও পণ্ডিতজন।

 

বহুভাষাবিদ ছিলেন তিনি, জানতেন উর্দু, আরবি, ইংরেজি, ফারসি, সংস্কৃত ও হিব্রু। বিদ্যা অর্জন করেছিলেন দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ইসলামের ইতিহাস, সুফিবাদ, ইসলামি ধর্মতত্ত্ব, পাশ্চাত্য সাহিত্য ও ইহুদি মরমিবাদ কাবালা বিষয়ে।

 

তার বাবা শফিক এলিয়া সাহিত্য ও জ্যোতির্বিদ্যায় বিজ্ঞ ছিলেন। আরবি, ইংরেজি, ফারসি, হিব্রু ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতা ছিল তার। বারট্রান্ড রাসেলের মতো শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের সাথে যোগাযোগ ছিল তার।

 

জন এলিয়া কবিতা লিখতে শুরু করেন আট বছর বয়সে, কিন্তু তার প্রথম কাব্য ‘শায়াদ’ প্রকাশিত হয় যখন তার বয়স ষাট। কবিতার ভাষার ব্যাপারে তিনি খুব সচেতন ছিলেন। তার শব্দপ্রয়োগের মূল যদিও ধ্রুপদী কবিতায় প্রোথিত ছিল, বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে তিনি নতুনত্ব খুঁজতেন। তার কবিতার ভাববস্তু হিসাবে দুঃখ-বেদনা একটা উল্লেখযোগ্য বিষয়। চিন্তা-ভাবনার দিক থেকে তার মধ্যে একটু নৈরাজ্যবাদী আদর্শ পাওয়া যায়। আবার প্রেমের দর্শনও রয়েছে তার কবিতায়। তার মতে, প্রেমের উচ্চস্তর শুরু হয় বিচ্ছেদের সময় থেকে। মির্জা গালিবের উত্তরাধিকার নিয়ে উর্দু কবিতার একটি আলাদা পরিচ্ছেদ তিনি।

 

এলিয়া একজন অনুবাদকও ছিলেন। বিশেষত সুফি, মুতাজিলা ও ইসমাইলিয়া ভাবাদর্শের রচনা তিনি অনুবাদ করেন।

২০০২ সালে করাচিতে প্রয়াত হন তিনি।

 

ভূমিকা ও ভাষান্তর: সৈয়দ তারিক

Old friends: Jaun Elia and Obaidullah Aleem | Photo: Vintage Pakistan.

১.
একাকিত্বের দুঃখ হলো সেটা ঈশ্বর যেটি
মানবজাতি সৃষ্টির জন্য চেয়েছেন।

 

২.
আমাদের পতন হয়েছে আসমানে, এর অর্থ হলো
আমরা পৃথিবীর দিকে উড়ে আসছি।

 

৩.
সমাবেশে আমার নীরবতা
সে কি সম্মান আর পরিণত অবস্থা হতে নয়? আমি ভয় পেয়ে গেছি। (তোমাদের চিন্তা আর কথার ধরনে।)

 

৪.
সমালোচক? কৃত্রিম হাসির আড়ালে…
এত দেখানেপনা কেন?

 

৫. 
সুতরাং জানা গেল শেষে…
সুন্দর হলো যা তোমার নাই…

 

৬. 
সুতরাং আজ নিশ্চিত হওয়া গেল যে আমি তোমার সবচেয়ে প্রিয় নই,
আজ আমি আমার সাথে তোমার দেখানো লৌকিকতা অনুভব করতে পারলাম।

 

৭.
লোকেরা নতুন নতুন শহর গড়ে তুলছে, তবু
তারা পরস্পর অসম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে…

 

৮.
এমনভাবে তুমি আকাশের দিকে তাকাও…
ওখানে কি কেউ বসবাস করে?

 

৯.
যখন আমাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ থাকে না
তখনও আমাদের মাঝে বন্ধন থাকে…
আমি কি এখনও বেঁচে আছি?
তুমি কি এখনও ওখানে রয়েছ?

 

১০.
লাভ-ক্ষতির এই দুনিয়ায় গরিবের দিকে সাহায্যের হাত কে বাড়ায়?
যদি সৌন্দর্য আর সম্পদের মধ্যে বিরোধ ঘটে, প্রেম সব সময় সম্পদের পক্ষই নেয়।

 

১১.
এভাবেই সমস্ত জীবন কাটাতে হবে এতে আমি অনিচ্ছুক,
যদি কেবল বেঁচেই থাকা হয় সেটা মৃত্যুর চেয়ে ভালো কিছু নয়।

 

১২.
আমি যা দেখি তাই বলতে অভ্যস্ত,
এই শহরে আমিই সবচেয়ে খারাপ দাঙ্গাবাজ।

 

১৩.
অনেকদিন পরে আজ আমি আমার ঘরের দরজায় এলাম,
দরজা খোলার সময়ে তার সুরভী আমাকে
বাধাগ্রস্ত করল।

 

১৪.
আমার সকল কথাই অকার্যকর,
আমি কি নিজেকে প্রকাশ করতে জানি না?

 

১৫.
কেন আমি শান্তিতে নাই?
সারা দুনিয়ায় কি শুধু একটি মানুষই ছিল?

 

১৬.
আমি কি কেবল বেদনাই চাইছি? একদম না।
আমার কি কোনো অভিযোগ আছে?

 

১৭.
প্রতি মুহূর্তে আমার অসম্পূর্ণতার অনুভূতি হয়,
সর্বদাই আমি নিজেকে উন্নত করতে চেষ্টা করে যাই।

 

১৮.
আজকাল তুমি এত কাছে চলে আসছ কেন?
তুমি কি চিরতরে সব কিছু শেষ করে দিতে চাইছ?

 

১৯.
যেইসব অবস্থা যাপন করা অত কঠিন
সারাটা জীবন আমি তার মধ্যেই পার করেছি।

 

২০.
শহরের চতুর্মুখী আক্রমণ এটা দরজা ও দেয়াল নিয়ে,
পুরো অরণ্যকে শহর তার জরায়ুর ভিতরে নিতে চাইছে।

 

২১.
আমার ঘরের দেখাশোনা করবে কে?
এর জিনিসপত্র রোজই ভেঙে যায়।

 

২২.
আমি এতই আজব যে নিজেকে ধ্বংস করে ফেলেছি,
অথচ সেইজন্য কোনো অনুশোচনাই নাই।

 

২৩.
হ্যাঁ, এটা ঠিক, আমি অহমে আক্রান্ত,
কেন কেউ আমার বৈশিষ্ট্যে নাক গলাতে আসবে?

 

২৪.
বেশি কাছাকাছি হয়ে গিয়ে তুমি কি এখন আলাদা হতে চাইছ?
অনেক গভীর ওটা, সব সময়ে বলি আমি, আলাদা হবার পক্ষে।

 

২৫.
কী বলছ তুমি? প্রেম চিরন্তন!
তবে কি এটাই আমাদের শেষ দেখা?

 

২৬.
আমার স্বভাব এতই আজব যে
আজ যখন তুমি এলে না তখন আমি হাঁফ ছাড়লাম।

 

২৭.
দিনরাত্রি ধরে আমি নিজেকে অপেক্ষমাণ রেখেছি,
এখন তুমি আমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও।

 

২৮.
আমাকে এত আন্তরিকভাবে শুভেচ্ছা জানাচ্ছ যে!
তুমি কি এত তাড়াতাড়ি স্মৃতি থেকে আমাকে বাদ দিতে পেরেছ?

 

২৯.
তোমার জিহ্বা হাজার হাজার উত্তর দিয়েছে,
তাই এখন আর নালিশ তুলবার দরকার কী?

 

৩০.
সম্ভবত আমি কারোরই প্রেমে পড়ি নাই,
কিন্তু আমি অন্তত তাদের সেরকম মনে করাতে পেরেছি।

 

৩১.
অনুভূতি আর প্রজ্ঞার সব অবস্থাকেই
তুমি পাগলামির ছাঁচে ঢালাই করে দিয়েছ
প্রেম ছেড়ে যাবার জন্য এরই মাঝে আমি ওয়াদা করেছি
আবারও তুমি আমাকে তোমার আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিয়েছ।

 

৩২.
তুমি তো বাস্তব নও, কেবল একটি ইচ্ছা
এমন আনন্দ যাকে স্বপ্নে অনুভব করা যায়,
কাহিনি এখন শেষ হবার পথে,
তুমিই শেষ ব্যক্তি যাকে আমি ভালোবেসেছি।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত