আট.
গ্রামের লোকেরা বলে, ছায়াটা তোমার বড় ভারী,
ফিতে বাঁধবার ছলে নিচু হয়ে বসে থাকি আমি।
পিঠের ওপর বসে নীরবে সে ছায়া, নেই ডাকাডাকি,
ঘাটের পথে সন্ধ্যায় আগে আগে হাঁটে সে একা।
নয়.
শেষ ট্রেনটা আমার বুকের ওপর দিয়ে চলে গেছে। কোনো ব্যথা নেই, শুধু লোহার গন্ধ। স্টেশনমাস্টার এসে আমার পকেট থেকে টিকিট বের করে দেখল, তারিখটা আগামীকালের। সে বলল, আপনি এখনো পৌঁছাননি। আমি উঠে দাঁড়ালাম, বুকের লাইনের ফাঁক দিয়ে ঘাস গজিয়েছে। একটা শিশু সেখানে বসে দুটো ঢিল ঠুকে ট্রেনের শব্দ লিখছে।
দশ.
ছাদের কার্নিশে বসে একটা কচ্ছপ আকাশ দেখছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওপরে কী আছে। সে বলল, ওপরে একটা পুকুর, সেখানে আমার বাবা ডুবে আছে। আমি সিঁড়ি লাগিয়ে উঠতে গেলাম, সিঁড়িটা প্রতি ধাপে একটা করে বছর কমিয়ে দিল। ওপরে পৌঁছে দেখি আমি এক শিশু, আর আমার হাতে একটা ছিপ, সুতোটা নিচের দিকে নেমে গেছে।
এগারো.
রান্নাঘরে হাঁড়ির ঢাকনা সরাতেই দেখি ভেতরে একটা ছোট্ট শহর। রাস্তায় লোক হাঁটছে, সবার মুখ আমার মতো। একজন ওপর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। আমি তাড়াতাড়ি ঢাকনা চাপা দিলাম। হাঁড়িটা সারারাত ফুটতে থাকল, আর ভোরে উঠে দেখি উনুনের পাশে একসারি ছোট্ট জুতো রাখা।
বারো.
গরুর গাড়ির চাকায় আমার নাম খোদাই করা। গাড়ি যত চলে, নাম তত ক্ষয়ে যায়। কোচোয়ান বলল, নাম থাকা ভালো না, ভারী হয়। আমি চাকাটা খুলে কাঁধে নিলাম। এখন সারা গ্রাম আমাকে চাকাওয়ালা বলে ডাকে। শুধু রাতে চাকাটা ঘুরতে ঘুরতে একটা পুরোনো গানের সুর বাজায়, আমি সেটা কাউকে শোনাই না।
তেরো.
আমার ডান পায়ের নখে একটা ছোট্ট নদী বইছে। নদীতে নৌকা নেই, আছে শুধু একটা লুঙ্গি, ভেসে ভেসে যাচ্ছে। আমি নখ কাটতে গেলাম, নদীটা বলল, আমাকে কেটো না, আমি তোমার হয়ে কাঁদি। আমি নখকাটার যন্ত্রটা হাঁড়িতে ফেলে ভাত রান্না করলাম। ভাত খেতে গিয়ে দেখি, প্রতিটা দানায় একটা করে মাছের চোখ।
চৌদ্দ.
বাজার থেকে আধ কেজি ঘুম কিনে এনেছি। দোকানি বলেছিল, এক রাতের বেশি টিকবে না। আমি সেটা ঝোলায় ভরে ছাদে উঠলাম। বৃষ্টি এলে ঘুমগুলো ভিজে ফুলে উঠল, ঝোলা ফেটে সারা শহর ঘুমিয়ে পড়ল। শুধু আমার ঘরের বাতিটা জেগে রইল, আর বাতির নিচে একটা চেয়ার, যেখানে কেউ বসে নেই অথচ চেয়ারটা গরম।
পনেরো.
গ্রামের মোড়ে একটা বটগাছ আমার নামে ঋণ নিয়েছে। মহাজন এসে বলল, গাছটা শোধ করতে পারছে না, তুমি দাও। আমি বললাম, আমার কাছে শুধু একটা ঘুম আছে, আধপোড়া। মহাজন ঘুমটা মেপে নিয়ে গেল। এখন বটগাছের তলায় রোজ একজন শুয়ে থাকে, তার মুখটা আমার মতো, আর সে কখনো জাগে না।



































































































