আলমিরার কাপড়গুলো গোছানো বা অগোছালো, কয়েকদিন পরপর বের করে আবার গোছানো, কিছু সময় দাঁড়িয়ে ন্যাপথলিনের ঘ্রাণ নেওয়া বড্ড ভালো লাগে যে। নতুন কাপড়টি বারবার ট্রায়াল দিয়ে আয়নার সামনে একটু-আধটু কার্ভ হয়ে ঢঙ করায়ও বেশ হাসি হাসি লাগে। একই কাপড়, একই আয়না, একই আমি; তবু প্রতিবার আয়নার সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, মানুষ বুঝি নিজের কাছেও প্রতিদিন একটু একটু করে নতুন।
ফ্রিজের খাবারগুলো দেখে বলি, “ইশ, আমি যে তোদের কবে খেয়ে শেষ করতে পারবো, আল্লাহ মালুম।” রুমমেট তখন হেসে কুটিপাটি হয়ে যায়। তখন মনে হয়, খাবারের সাথে কথোপকথন বৃথা যায়নি। মানুষ না থাকলেও আমি জিনিসপত্রের সাথে কথা বলি। কখনো কাপড়ের সাথে, কখনো খাবারের সাথে, কখনো দেয়ালের সাথে। জিনিসপত্র অন্তত আমার কথার জবাব দিয়ে আমাকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করে না। একটা জড়বস্তু চুপ করে থাকে, আর সেই চুপ করে থাকাটাও কখনো কখনো মানুষের অনেক কথার চেয়ে আরামদায়ক লাগে।
ইদানীং দু-একটা বিড়াল দরজা ফাঁকা পেলেই রুমে ঢুকে যায়। “এই তুই আবার ঢুকছিস? তোর কী খাইয়্যা কোনো কাজকাম নাই? কীতার লাগি হুদাই জ্বালাইতাছস, বাইর হ এক্ষুনি।” এইসব মানবীয় স্বৈরাচারিতা দেখিয়ে পরক্ষণেই বলি, “বাবু, প্লিইজ যা, দেখ গিয়ে রান্নাঘরে তোর খাবার আছে। আমার তো তোমাকে উচ্ছিষ্ট দেওয়া ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার নাই। যদি আমার আব্বু অনেক ধনী হতো, ট্রাস্ট মি, তোমাকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাছ-মাংসগুলো দিয়ে দিতুম।” এইসব বকবক বেশ মজাই লাগে তো। মনের কথা প্রকাশ করতে না পারা বিড়াল আমাকে হয়তো পাগল-ছাগলও ভাবতে পারে। ভাবলে ভাবুক, সেটি বিড়ালের সমস্যা, আমার না। মানুষ অন্তত নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দিয়ে আমার কথার অর্থ বদলে ফেলতে পারে; বিড়াল সেটা পারে না। সে শুধু তাকায়, একটু লেজ নাড়ায়, তারপর নিজের প্রয়োজনমতো চলে যায়।
অতিশয় শ্রান্ত হয়ে আম্মুর নিজ হাতে বানানো শিমুল তুলোর বালিশ, যেটি আমি তেরো বছর যাবৎ ব্যবহার করে আসছি, সেই বালিশে মাথা এলিয়ে, দেয়ালে পা তুলে ভাবি, জীবনে এই বালিশটা ছাড়া আর কিছুই ধরে রাখতে পারলাম না। অসহায়ত্ব, অপূর্ণতাগুলোকে “ধ্যাৎ, অতো ধইরা রাইখ্যা অইবোডা কী” তুড়ি মেরে হাসি নাকি কাঁদি, এ আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারার সময় পাই না। কারণ ততক্ষণে ফ্যানে বেশ ময়লা জমেছে, ৬২টা ফুটো দিয়ে বানানো ভেন্টিলেটরটি মাকড়শাদের দখলে, আয়নায় স্ক্র্যাচ হয়েছে। এইসব দেখতে-দেখতে, ভাবতে-ভাবতে এন্টি-ক্লকে পা ঘোরানো বেশ স্বস্তি স্বস্তি লাগে যে। শরীরের কোনো একটা অংশ নড়াচড়া করতে থাকলে মাথার ভেতরের অস্থিরতাটাও যেন কিছুক্ষণের জন্য অন্যদিকে সরে যায়।
আবার কী যেন একটা মিসিং ভেবে নিচে নেমে রাজকীয় স্টাইলে চা পান আর গালগল্প করে গুণে গুণে ৫৪টি সিঁড়ি পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছে রবীন্দ্রসংগীত শুনতে-শুনতে সামনের বারান্দায় দাঁড়াই। পাশের বাসার মহাজন কামরাঙ্গা গাছটা কেটে দিলো রুম বড় করার জন্য। এটা ভেবে আমার কী বোধ হয় জানি না, শুধু অনুভব হয়, “আমি বড্ড ক্লান্ত; পুঁজিবাদের ধোঁয়ায় জর্জরিত আকাশের মতো ক্লান্ত।”
মনে পড়ে যায় বিভূ বাবুকে নিয়ে প্রচলিত একটি কথা, বাড়ির আমগাছ কেটে ফেলার পর কাটা গুঁড়ি ধরে তিনি নাকি অনেক কেঁদেছিলেন। সত্যি-মিথ্যা যাচাই করার মতো মন তখন থাকে না। কথাটার ভেতরকার অনুভূতিটাই আমাকে ধরে ফেলে। একটা গাছেরও তো একটা জায়গা থাকে। প্রতিদিন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে সে মানুষের সঙ্গে এমন এক সম্পর্ক তৈরি করে, যেটা মানুষ আলাদা করে খেয়ালই করে না। জানালার বাইরে তাকালে গাছটা আছে, রোদে ছায়া দিচ্ছে, পাখি বসছে, ফল ধরছে, বাতাসে পাতাগুলো নড়ছে–এইসব এত স্বাভাবিক হয়ে যায় যে তার অস্তিত্বকে আমরা আর আলাদা করে অনুভব করি না। তারপর একদিন গাছটা থাকে না। জায়গাটা থাকে, দেয়াল থাকে, আকাশ থাকে, অথচ কোথাও একটা জিনিস কমে যায়।
আরও মনে পড়ে যায়, পথের পাঁচালী উপন্যাসে দুর্গা ফল খাওয়ার জন্য অপুকে দিয়ে কঞ্চি আনিয়ে পুকুরধারের ঝোপ থেকে ভাই-বোন মিলে ম্যালা পরিশ্রমে শেওড়া ফল সংগ্রহের কথা। তখন মনে হয়, মানুষের সুখের সংজ্ঞা হয়তো বয়সের সঙ্গে কতবার বদলায়। ছোটবেলায় একটা ফল, একটা বৃষ্টি, একটা গাছের নিচে দাঁড়ানো, কারও সঙ্গে লুকিয়ে কোথাও যাওয়া–এসবই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঘটনা মনে হয়। বড় হতে হতে আমরা সেই একই জিনিসের ওপর কত স্তরের প্রয়োজন, হিসাব, ভয় আর সামাজিক অর্থ চাপিয়ে দিই।
আহারে অপরাজিত অপু, ওগো দুর্গা। এই দুর্গা, তুমি নিশ্চয়ই জানো না, এই পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তের নেক্রোপলিস শহরের এক শাখা গলিতে ৭০ বছর যাবৎ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বিল্ডিংয়ের রোয়াকে বসে তোমাকে ভাবছি। তোমার দুইবারের মৃত্যুই আমাকে ব্যথিত করে তোলে। তোমাদের নিয়ে ভাবতে গিয়ে ডোপামিন বা অ্যাড্রেনালিন জাতীয় কোনো হরমোন নিঃসৃত হয় কি না, আমি জানি না। আমি শুধু জানি, এটি কেবলই আমার বিষাদময় তিক্ত-মিষ্টি আনন্দ। কিছু চরিত্রের সঙ্গে মানুষের এমন অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়, যাদের সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি, কথা হয়নি, তবু তারা নিজের জীবনের মানুষ বলেই মনে হয়। বই বন্ধ করে রাখার পরও তারা মাথার ভেতর থেকে যায়।
এর মধ্যে আবার হুট করে কানে বাজে ৫০ ছুঁইছুঁই এক নারীর চেঁচামেচি। কেন, কিসের জন্য প্রায়ই তার / তাদের অশান্তি, আমি জানি না। অবশ্য ঝগড়ার ভঙ্গি দেখে, শব্দ প্রয়োগ আর বাক্যবোমা শুনে মনে হয়, স্বামীকে শারীরিকভাবে সন্তুষ্ট না করতে পারার অক্ষমতা, মেনোপজের প্রসেস শুরু হয়ে যাওয়া, শারীরিক জটিলতা–এইসব নিয়ে তাদের প্রায়ই অশান্তি লেগে থাকে। বুলেটের বিনিময়ে বুলেট প্রয়োগ করে শ্রান্ত হয়ে মহিলাটি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে একদম নিশ্চুপ হয়ে আশপাশ দেখে। আমিও তাকে দেখি। কী সুন্দর তার ক্যারাটিন করা কালারিং চুল, হাতে নেইলপলিশ, বাহ্যিকভাবে কী চমৎকার গোছানো সুচয়না নারী। আমি তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হই, জীবনে যতই ক্ষরা আসুক না কেন, রুচিপূর্ণ সাজসজ্জায় নিজেকে সজ্জিত রাখার বিষয়টি বেশ চমৎকার।
একই মানুষকে আমরা কখনো শুধু তার চেঁচামেচি দিয়ে দেখি, কখনো আবার তার চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি দিয়ে। কোনটা আসল মানুষ, কে জানে। হয়তো দুটোই। হয়তো মানুষের জীবনে এমন অনেকগুলো সংস্করণ পাশাপাশি থাকে, যেগুলো একে অপরের সঙ্গে ঠিকমতো পরিচিতও নয়।
আমার বড্ড মায়ার শরীর, দয়ার শরীর। ইচ্ছে করে মহিলাকে ডেকে এনে জড়িয়ে ধরে বলি, “ছেড়ে তো সবাই যায়; তুমি না হয় ঝগড়া করে হলেও আমার সাথে থেকে যাও।” এইসব ফাউ সস্তা টক্সিক বুলশিট না বলে চুপ থাকাই শ্রেয়। আরও ইচ্ছে করে, দুই কাপ কফি নিয়ে “ঝগড়া, মনোমালিন্য, একমত না হওয়া, ভুল বোঝাবুঝি সকল সম্পর্কের স্বাভাবিক বাস্তবতা। নিজেদের সম্পর্ককে সবার ওপরে রেখে, সঙ্গীকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত না করে, পুরোনো প্রসঙ্গ তুলে না এনে কেবল সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে যৌক্তিকভাবে ঝগড়া করুন”–বিখ্যাত সাইকো-অ্যানালিস্ট, গবেষক, সাইকোলজিস্ট ও থেরাপিস্ট নিকোল লেপেরা সফল দম্পতি নিয়ে এই সহ আরও যা বলেছেন তা নিয়ে কথা বলতে। পরক্ষণেই আবার নিজেকে বলি, “এই মাধবী, ভবিষ্যতে যদি বিয়ে-শাদি করিস আর যদি খালি মরে যাওয়া সম্পর্কে আবদ্ধ থাকতে হয় অথবা বিচ্ছেদে যেতে হয়, তখন লোকে তোর এই লেখা দেখে হাসবে আর বলবে, ও মাই গড, হোয়াট আ সাইকোঅ্যানালাইসিস অফ মাধবী।” ধুর, বললে বলবে। সেটি তাদের সমস্যা, আমার না।
মানুষের সুখের সংজ্ঞা হয়তো বয়সের সঙ্গে কতবার বদলায়। ছোটবেলায় একটা ফল, একটা বৃষ্টি, একটা গাছের নিচে দাঁড়ানো, কারও সঙ্গে লুকিয়ে কোথাও যাওয়া–এসবই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঘটনা মনে হয়। বড় হতে হতে আমরা সেই একই জিনিসের ওপর কত স্তরের প্রয়োজন, হিসাব, ভয় আর সামাজিক অর্থ চাপিয়ে দিই
একই বারান্দায় আমার আব্বুর মতোই টকটকে ঝকঝকে স্কিন, শুভ্র সাদা দাড়িওয়ালা এক ভদ্রলোক ইজি চেয়ারে বসে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশু মায়ের বুক থেকে অত্যন্ত মনোযোগের সহিত যেভাবে দুধ আহরণ করে, ঠিক সেরকম করে কী যেন পড়ে। বয়সের দিক হিসেব করলে ভদ্রলোকের মৃত্যু সন্নিকটে। তাকে দেখে হঠাৎ মনে হয়, বয়স আসলে মানুষের শরীরে আগে আসে, নাকি তার চারপাশের মানুষদের চোখে, কে জানে। একজন বৃদ্ধ মানুষকে দেখলে আমরা তার মৃত্যুর কথা ভাবি, অথচ তিনি হয়তো সেই মুহূর্তে কোনো কবিতা, খবরের কাগজ, পুরোনো চিঠি কিংবা একেবারে তুচ্ছ কোনো বিষয় নিয়ে ভাবছেন।
অতঃপর রুমে ঢুকে আয়োজন করে আব্বুর প্রিয় গান, “বাগিচার ওই বুলবুলি তুই”, “তুমি কী দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়”, “মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই”, “তাওহীদেরও মুর্শিদ”, “ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ”, “সালাম সালাম হাজার সালাম”, জসীমউদ্দীনের “কবর” কবিতা শুনি। মনে হয় যেন, স্পিরিচুয়ালি আব্বু আমার কপোলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কিছু গান আছে, যেগুলো আর শুধু গান থাকে না। একটা মানুষ, একটা ঘর, একটা সময়, একটা গন্ধ, একটা বিকেল–সবকিছুকে একসঙ্গে ফিরিয়ে আনে। তখন গান শুনি না, বরং একটা সময়ের মধ্যে গিয়ে বসি।
এসব আয়োজনের মধ্যেই হঠাৎ করে মনে হয়, আমার ৫ বছরের কী সুন্দর, চমৎকার, প্রাণোচ্ছল, কিউট লক্ষ্মী বাবাটা আমার সামনেই তার মাকে প্রশ্ন করেছিল, “আচ্ছা মা, নানাভাই মারা যাওয়ার পর মাধবী খালামণি কান্না করেনি?” বাচ্চারা অনুকরণপ্রিয়। হয়তো আমার বাবার মৃত্যুর দিন কিংবা দাফন হওয়ার দিন কিংবা অন্য সময়ে এইরকম আলোচনা ওর সামনে হয়েছে বলেই এই কথা। এই হয়তো মানে সম্ভাব্য নয়, ঠিক এবং ঠিকই। আমি জানি কে বা কারা এরকম আলোচনা করেছে, কিন্তু তাদের বোঝাতে ইচ্ছে করে না, “শোক বড্ড বিচিত্র বিষয়, এর ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই।”
কেউ কাঁদে, কেউ চুপ থাকে। কেউ মানুষের সামনে ভেঙে পড়ে, কেউ একা ঘরে গিয়ে। কেউ মৃত মানুষের ছবি বারবার দেখে, কেউ ছবি দেখতে পারে না। কেউ কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকে, কেউ তার প্রিয় গান শোনে। কেউ মৃত মানুষের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে পারে না, আবার কেউ সবকিছু নিখুঁত করে সাজিয়ে রাখে। শোকের মধ্যে কে কতটা কাঁদলো, সেই হিসাব দিয়ে ভালোবাসার পরিমাণ মাপা যায় না। বরং কখনো কখনো যে মানুষটা বাইরে থেকে সবচেয়ে স্বাভাবিক থাকে, তার ভেতরেই সবচেয়ে বড় ভাঙনটা চলতে পারে।
বড্ড লোড হয়ে যাচ্ছে মাথায়। কী করবো ভাবতে ভাবতে রেহানা খালারে ফোন দেই।
“ও খালা, কই তুমি?”
খালা বলে, “আমি ব্যস্ত, দশতলা বাড়ির মালিকের বাসায় কাম কত্তাসি। আইজকা শাডুইল (schedule) নাই আমার।” খালার ইংরেজি ভালোই লাগে।
“আচ্ছা খালা, কাম শেষ অইলে মঞ্জুর দোকান থিকা দুইজনের জন্য চা আনবা, আর তোমার লাই পান আনবা। ঘেরাণ করে এমন একটা নতুন সাবান আনসি তোমার জন্য।”
খালা বলে, “আইচ্ছা দেহি কিতা করন যায়।”
মনে মনে বলি, খালা, তোমারে আইনা গপ্প করার টোপ ফেইলা দিসি। আইবাই তুমি।
দশ মিনিট যাইতে না যাইতেই খালা হাজির। তারপর দুজন মিলে চা, পান, নুডুলস পার্টি করি। পেশাদারিত্বের পৃথিবীতে খালা যেমন অহেতুক আসে না, তেমনি এমনি-এমনি আমিও তারে আনি না। কিন্তু আমাদের দুজনের লাভটুকু খুবই গৌণ। খালার দুঃখগুলো শুনি, খালাকে মাঝেমধ্যে সান্ত্বনা দেই, মাথা বেশি গরম হয়ে গেলে কীভাবে ঠান্ডা করতে হবে কোরআনের আয়াত টেনে বুঝাই। ৫৫ বছরের খালা বাঙালি যে স্পেকট্রামে বাঁধা, সেই দিকটার কথা চিন্তা করে তাকে বোঝাতে প্রতি বাক্যে ধর্ম, আল্লাহ উচ্চারণ করতেই হবে। এইখানে সাহিত্যিক আলাপ চলবে না।
খালার জীবনের সমস্যাগুলো শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, মানুষের দুঃখেরও শ্রেণিবিন্যাস আছে, কিন্তু দুঃখের ওজনের কোনো সার্বজনীন মাপযন্ত্র নেই। একজনের কাছে যে সমস্যাটা তুচ্ছ, অন্যজনের কাছে সেটাই হয়তো সারারাত ঘুম না আসার কারণ। কেউ মাসের শেষে বেতন না পাওয়ার চিন্তায় থাকে, কেউ সন্তানের জন্য, কেউ স্বামীর জন্য, কেউ নিজের শরীরের জন্য, কেউ আবার এমন কোনো অপমান বয়ে বেড়ায় যার কথা কাউকে বলা সম্ভব নয়। বাইরে থেকে দেখলে জীবন একই রকম; ভেতরে ভেতরে প্রত্যেকের ঘরে আলাদা আলাদা যুদ্ধ চলে।
আরবান এলিটেরা অবশ্য আমাকে নিয়ে টিটকিরি করে, এসব নিম্ন লেভেলের মানুষের সাথে আমার কীসের কথোপকথন?
আমিও মনে মনে বলি, জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন নাই বা গেলাম, খালার জীবনের গল্প শুনে “চিত্ত সংযমে বিলক্ষণ ক্ষমতাশালিনীকে অর্থের বিনিময়ে নিম্নগামী করা যায় না”–ঘরে বসে না হয় এটাই শিখলাম। মানুষকে তার পোশাক, পেশা, ভাষা, বাসস্থান কিংবা ব্যাংক-ব্যালেন্স দিয়ে মাপার অভ্যাসটা আমার কাছে বরাবরই অদ্ভুত লাগে। মানুষের জীবন সম্পর্কে যত কম জানি, তাকে নিয়ে তত বেশি সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলি। খালা আমার কাছে শুধু একজন কাজের মানুষ নয়; তারও একটা পূর্ণ জীবন আছে, যার কতটুকুই বা আমি জানি।
আলাপ শেষে দুজন ক্লান্ত হই। ল্যাপটপে একটা বাংলা ছবি দিয়ে আমি রঙচঙ মেখে চলে যাই গন্তব্যহীন সন্ধ্যা কাটাতে।
রিকশাওয়ালা রফিক ভাইরে কল দেই। ঘণ্টা চুক্তিতে দুই-তিন ঘণ্টা ঘুরি, এর মধ্যে আমরা চা ব্রেক নিই। রফিক ভাইয়ের জীবনের গল্প শুনি। আমরা মন খারাপ করতে গিয়ে হেসে ফেলি আর বলি, “আপনার হাতের গোল্ডলিফ সিগারেটটা যৌবন নয়, এটি জীবন। জীবন যদি না-ই হতো, তাহলে কি আর রিকশা, ভ্যান চালিয়ে ১০ বছর যাবৎ বউয়ের চিকিৎসা করে যাচ্ছেন?”
প্রত্যুত্তরে রফিক ভাই বলে, “মাধবী আপা, জীবন সত্যিই অনেক কঠিন।”
আমি বলি, “সক্রেটিসও বলে গেছেন, জীবন মৃত্যুর থেকেও কঠিন।”
রফিক ভাই প্রশ্ন করে, “উনি আবার কেডা?”
আমি বলি, “সক্রেটিস হলো আমার প্রেমিক।”
“ওহ আচ্ছা, তাইলে আপা আপনে প্রেম করেন? একই এলাকায় প্রায় ১২ বছর যাবৎ আছেন, একদিনও তো একটা প্রেমিক দেখলাম না।”
আমি বলি, “এই প্রেমিক ঈশ্বরের সাথে সবসময় মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকে বলে দেখতে পান না।”
রফিক ভাই একগাল হাসি দিয়ে আবার আমাকে নিয়ে চলে।
রিকশায় বসে শহরটাকে অন্যরকম লাগে। হাঁটতে হাঁটতে যে রাস্তা শুধু রাস্তা মনে হয়, রিকশায় বসলে সেখানে কত মানুষের জীবন দেখতে পাওয়া যায়। কেউ দোকান বন্ধ করছে, কেউ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে, কেউ ফোনে কারও সঙ্গে ঝগড়া করছে, কেউ বাসার বারান্দা থেকে নিচে তাকিয়ে আছে। একটা শিশু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে, একটা বৃদ্ধ ধীরে ধীরে হাঁটছে, একটা মেয়ে দ্রুত রাস্তা পার হচ্ছে। প্রত্যেকেই কোথাও যাচ্ছে। অথচ তাদের কারও গন্তব্য সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। আমার নিজের গন্তব্যও তখন থাকে না। শুধু চলতে থাকি।
মনে হয়, বয়স আসলে মানুষের শরীরে আগে আসে, নাকি তার চারপাশের মানুষদের চোখে, কে জানে। একজন বৃদ্ধ মানুষকে দেখলে আমরা তার মৃত্যুর কথা ভাবি, অথচ তিনি হয়তো সেই মুহূর্তে কোনো কবিতা, খবরের কাগজ, পুরোনো চিঠি কিংবা একেবারে তুচ্ছ কোনো বিষয় নিয়ে ভাবছেন
গন্তব্যহীনতারও একটা আলাদা আনন্দ আছে। কোথাও পৌঁছাতে হবে না বলে পথের দিকে মন দেওয়া যায়। কখনো মনে হয়, জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আমরা গন্তব্যের কথা ভাবতে ভাবতে পথটাকে মিস করি। চাকরি, বিয়ে, টাকা, সাফল্য, সম্পর্ক, সামাজিক অবস্থান–সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট গন্তব্য বানিয়ে ফেলি। তারপর সেখানে পৌঁছানোর পর বুঝি, আরেকটা গন্তব্য সামনে দাঁড়িয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত কোথাও গিয়ে থামা হয় না।
একটি গন্তব্যহীন সন্ধ্যা কাটিয়ে এসে দেখি খালা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে আর ল্যাপটপে শাবনূর বলছে, “মন বসে না পড়ার টেবিলে।” খালার ঘুমন্ত মুখ দেখে কেমন যেন একটা শান্তি পাই। মনে মনে বলি, ওরে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট দেওয়া শাহেদ, ওরে বিপ্লবী উপদেষ্টাদের পিও, ওরে প্রধানমন্ত্রীর পিওন, জীবনে চলতে গেলে আসলে খুব বেশি টাকার প্রয়োজন নাই। একটা মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারছে কি না, সেটাও তো এক ধরনের সম্পদ। পৃথিবীর সব সম্পদ থাকলেও যদি মাথার ভেতর সারাক্ষণ হিসাব চলতে থাকে, তাহলে ঘুমটুকুও বিলাসিতা হয়ে যায়।
ফোনের দিকে আমার নজর কম থাকে, দ্যাটস হোয়াই ঠিক টাইমে খুব একটা কল ধরতে পারি না। প্রতিদিন আম্মুর দেওয়া ফোন কল হিসেব করলে দশ মিনিট সম্ভবত চলে যাবে। আম্মুর স্বার্থে নয়, নিজের স্বার্থেই তাকে কল ব্যাক করি, কারণ তার থেকে আমার সিমপ্যাথি নিতে হবে। প্যাম্পার পাওয়ার পর আমার গোসলে যেতে হবে। যখনই খুব বেশি মন খারাপ হয়, তখন আম্মুকে কল দিয়ে ইচ্ছে করেই বলি, “আম্মু, আমি এখন মরে যাব।”
এইসব বুলশিট শুনে আম্মু ফোনে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কান্না করে দেয় আর বলে, “মা, তুমি এইডা কইরো না। এইডা করলে আমি আর তোমার বাপ পরকালে শান্তি পাবো না। তুমি আমার শেষ বয়সের সন্তান, তোমারে জন্ম দিতে খুব কষ্ট হইসিল।”
এই কথা শুনে আমিও কোনো ছাড় না দিয়ে বলি, “শেষ বয়সে প্রোডাকশন দিতে আমি কইসিলাম?”
মা কাঁদতে-কাঁদতে হেসে দেয়। আবারও প্যারা দিয়ে বলি, “মইরা যাই আম্মা। কিসু হবে না, কারণ মৃত্যুজনিত শোক বেশিদিন স্থায়ী হয় না।”
মা তখন বলে, “সন্তানের লাশ কাঁধে উঠানোর মতো যন্ত্রণা পৃথিবীতে আর কীসে, মাধু?”
এই একটা বাক্যের পর আমারও কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে যেতে হয়। মায়ের ভয়টা আমার মৃত্যুর চেয়েও বড়। সে আমার জীবনকে নিজের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে রেখেছে যে আমার অনুপস্থিতির কথা তার কাছে কেবল একজন মানুষের অনুপস্থিতি নয়, তার নিজের একটা অংশ হারিয়ে যাওয়া। মায়েরা বোধহয় এই জায়গাটাতেই আলাদা। তারা সন্তানের জীবনকে নিজের শরীর থেকে আলাদা করতে অনেক বছর সময় নেয়, কখনো হয়তো পুরোপুরি পারে না।
আম্মু ফোনেই আমার দিকে দৃষ্টি রেখে আয়াতুল কুরসী পড়ে ফুঁ দিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা নফল নামাজে গিয়ে সেজদায় ঝুঁকে থাকে। আমি আমার আম্মুর কাছ থেকে জীবনে কী শিখতে পেরেছি, এ আলাপ অন্য একদিন করা যাবে। তবে সবচেয়ে মাইন্ড-ব্লোয়িং যে বিষয়টি শিখেছি, তা হলো, মানুষ যখন মানুষকে খেলনা ভেবে বর্শা দিয়ে আঘাত করে বুকের প্রতিটি পাঁজর ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখনই আমি যখন যে অবস্থায়ই থাকি না কেন, সেজদায় লুটে পড়ার চেষ্টা করি। এই সেজদার ধর্মীয় এক্সপ্লেনেশন দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ সায়েন্স এখনো মহাবিশ্বের রহস্য পুরোপুরি উন্মোচন করতে পারেনি। পৃথিবী নামের ডিভাইসটি যিনি চালাচ্ছেন, সেই সুপার পাওয়ারের কাছে মাথা লুটিয়ে দেওয়ায় আমার ক্ষতি নয়, বরং অনেক বেশি হ্যাপি হরমোন নির্গত হয়।
আম্মুর প্যাম্পার নিয়ে গোসল, সেজদা, খাওয়া শেষ করে আবার সেই বারান্দায় বসি।
বারান্দায় বসে তিনটি বাড়ির মালিকের ছেলে, প্রায় চল্লিশ বছর বয়সী এক ভদ্রলোকের চিল্লানো শুনতে পাই। রোদ, বৃষ্টি, গরম সবসময়ই মাথায় ক্যাপ, পরনে জিন্স আর পায়ে বুট থাকে আর সারাক্ষণ হেঁটে চলে। তাহাজ্জুদের সময়টা হলেই সে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে গান করে, “যৌবন একটা গোল্ডলিফ সিগারেট”, পরক্ষণেই সবাইকে জোরালো শব্দে আহ্বান করে, “সেহরির সময় হয়েছে, ফজরের সময় হয়েছে। আপনারা উঠুন।” ভদ্রলোক গলির সিকিউরিটি গার্ডের সাথে তাহেরীর ভাইরাল আলাপ গানের স্বরে বলতে থাকে, “ভাই, পরিবেশটা সুন্দর না? কোনো হৈচৈ আছে? আমি কী কাউকে গালি দিয়েছি? কাহারো বিরুদ্ধে বলিতেছি?” এরপরেও দেখবেন, সকালে একদল লোক এসে বলবে, “আমি ভালা না।”
মানুষের এই নিজেকে ব্যাখ্যা করার তাড়াটাও অদ্ভুত। কেউ কিছু বলার আগেই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চায়, কেউ নিজের ভালোত্ব প্রমাণ করতে চায়, কেউ নিজের কষ্ট বোঝাতে চায়। অথচ যে মানুষ সত্যিই আমাদের বুঝবে, তার কাছে হয়তো এত ব্যাখ্যার দরকারই হবে না। আর যে বুঝবে না, তাকে শত ব্যাখ্যা দিয়েও লাভ নেই।
মাথাটা আমার ঝিমঝিম করে। দীর্ঘ ছয় মাস খেয়ে যাওয়া অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পদার্থে বড্ড ক্ষতি হয়েছে শরীরের। মনে হয়, আজকাল মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা কমে গেছে। মেরুদণ্ডের ওখানটাতে চিনচিন পেইন হয় মাঝেমধ্যে। জীবনের প্রায় অর্ধেক সময়টাতে দুটো ফুল অ্যানেস্থেশিয়া হয়েছে, লাস্টেরটায় একটা ঝামেলা হয়েছে। অতি অ্যাক্টিভ ব্রেইন পুরা সেন্সলেস করতে ডাক্তারের অনেকগুলো ইনজেকশন পুশ করতে হয়েছে। বাকি জীবনটায় আর কতবার এসব কাঁটাছেঁড়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে, আমি জানি না।
এতসবের মধ্যেও একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। মানুষ যখন নিজের শরীরের ভেতর দিয়ে মৃত্যুর সম্ভাবনাকে খুব কাছ থেকে দেখে, তখন বেঁচে থাকার কথাটাও অন্যরকম লাগে। বেঁচে থাকা তখন আর কেবল ভালো থাকা নয়। ব্যথার মধ্যেও থাকা, বিরক্তির মধ্যেও থাকা, অপূর্ণতার মধ্যেও থাকা, কখনো আবার একেবারে অর্থহীন মনে হওয়া একটা দিনও পার করে দেওয়া। এই যে এতক্ষণ ধরে আমি একটার পর একটা কথা বললাম, এর কোনোটাই হয়তো খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে প্রতিটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ মানুষ বোধহয় তার জীবনের বড় ঘটনাগুলো দিয়ে যতটা না বাঁচে, তার চেয়ে অনেক বেশি বাঁচে এইসব ছোট ছোট অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হওয়া মুহূর্তের ভেতর দিয়ে।
একটা চায়ের কাপ, একটা বিড়াল, একটা গাছ, একটা পুরোনো গান, কারও সঙ্গে পাঁচ মিনিটের কথা, হঠাৎ পাওয়া একটা হাসি–এসবের কোনোটা জীবনবৃত্তান্তে লেখা থাকে না। কেউ মারা গেলে তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমরা তার চাকরি, সাফল্য, সম্পত্তি, সামাজিক অবস্থান এসব বলি। কিন্তু হয়তো মানুষটার আসল জীবন লুকিয়ে থাকে অন্য কোথাও। সে কোন গান শুনে চুপ হয়ে যেত, কোন খাবার পছন্দ করত, কার জন্য অপেক্ষা করত, রাগ করলে কী করত, কাউকে ভালোবাসলে কীভাবে তাকাত–এইসব ছোট ছোট জায়গায়।
হুমায়ূন আহমেদের বাণী, “বেঁচে থাকার মতো আনন্দ কিছু নেই”–এইসব আমি বলবো না, কারণ সক্রেটিসের মতো মৃত্যুকে আমি মানুষের জীবনের সর্বাপেক্ষা বড়ো আশীর্বাদ বলে মনে করি। মৃত্যু নিয়ে ভাবলে আমার ভয়ও লাগে, আবার কেমন একটা স্বস্তিও লাগে। কারণ জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত বিষয় এটিই। কত কিছুই অনিশ্চিত–কে থাকবে, কে চলে যাবে, কে ভালোবাসবে, কে ঘৃণা করবে, কোন সম্পর্ক টিকবে, কোন গাছ কাটা পড়বে, কোন গান হঠাৎ বাবাকে মনে করিয়ে দেবে–কিছুই জানি না। শুধু জানি, একদিন সবকিছুরই একটা শেষ আছে।
গন্তব্যহীনতারও একটা আলাদা আনন্দ আছে। কোথাও পৌঁছাতে হবে না বলে পথের দিকে মন দেওয়া যায়। কখনো মনে হয়, জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আমরা গন্তব্যের কথা ভাবতে ভাবতে পথটাকে মিস করি। চাকরি, বিয়ে, টাকা, সাফল্য, সম্পর্ক, সামাজিক অবস্থান–সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট গন্তব্য বানিয়ে ফেলি। তারপর সেখানে পৌঁছানোর পর বুঝি, আরেকটা গন্তব্য সামনে দাঁড়িয়ে আছে
বাই দ্য ওয়ে, আই অ্যাম নট প্রোমোটিং সুইসাইড। বাঁচো, দুধে-ভাতে বাঁচতে না পারলেও কাঁদতে গিয়ে হেসে-হেসে কিংবা হাসতে-হাসতে কেঁদে ফেলে বাঁচো। একটিবারের জন্য হলেও ভেবে দেখো, সমুদ্রের মতো আদি-অন্তহীন দুঃখের মধ্যে আর এক বিন্দু ঢেলা জমা হলে কিচ্ছুটি হবে না। বিশ্বাস রাখো, সমস্ত কান্নার সমুদ্র পেরিয়েও তার পার আছে। মানুষের মন কখনো কখনো এমন একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়, যেখানে মনে হয় আর কিছুই বাকি নেই। অথচ পরের দিন কোনো একটা গান, কোনো মানুষের একটা ফোন, কোনো রিকশাওয়ালার একটা কথা, কোনো বিড়ালের মুখ, কিংবা মায়ের একটা কান্না আবার তাকে টেনে নিয়ে আসে। জীবন যে কীভাবে মানুষকে ধরে রাখে, তার কোনো একক ব্যাখ্যা আমার জানা নেই।
এইসব ক্রান্তিলগ্নে নিজের উপ্রে অতিরিক্ত মাত্রায় জাস্ট স্বাভাবিক মৃত্যু হবেই হবে ভেবে যতই জোর প্রয়োগ করবা/করবেন, ঠিক ততই আত্মহননের জোর কমে আসবে। কারণ মৃত্যুকে যদি জীবনের অনিবার্য শেষ হিসেবেই মেনে নেওয়া যায়, তাহলে তাকে নিজের হাতে ডেকে আনার তাড়নাটাও হয়তো একটু একটু করে কমে আসে। মৃত্যু তো আসবেই। তার জন্য এত তাড়া কিসের?
ফ্রয়েডের সেই কথা মনে পড়ে, “ভালোবাসা এবং কাজ আমাদের মানবতার ভিত্তি।” কথাটা ভাবলেই আব্বুর কথা মনে পড়ে। ভালোবাসা, কাজ, সম্পর্ক, শরীর, আকাঙ্ক্ষা, ক্লান্তি–সবকিছুর নিচে কোথাও একটা টান আছে, যা মানুষকে সামনে ঠেলে দেয়। আবার আরেকটা টান আছে, যা তাকে শেষের দিকে নিয়ে যায়। ফ্রয়েডের ডেথ ড্রাইভের কথা মনে পড়ে। সমস্ত জীবনের লক্ষই তো মৃত্যু। কিন্তু সেই শেষটা জানার পরও মানুষ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চা খায়, কাপড় পরে, রিকশায় ওঠে, অফিসে যায়, কারও সঙ্গে প্রেম করে, কারও সঙ্গে ঝগড়া করে, গাছ কাটে, গাছ লাগায়, সন্তান জন্ম দেয়, আবার সন্তানের মৃত্যুর ভয়ে কাঁদে। এই বিরোধাভাসটাই হয়তো মানুষ।
মৃত্যু যদি শেষ সত্য হয়, তবু মানুষ শেষের আগের প্রতিটি দিনকে নিজের মতো করে অর্থ দিতে থাকে। কেউ ধর্মে অর্থ খুঁজে পায়, কেউ প্রেমে, কেউ কাজে, কেউ সন্তানের মুখে, কেউ লেখায়, কেউ আবার কোনো অর্থই খুঁজে পায় না। তবু সকালে উঠে পড়ে। হয়তো অর্থ না থাকলেও অভ্যাস থাকে। অভ্যাসের মধ্যেও জীবন থাকে। কখনো কখনো জীবনকে চালিয়ে নেওয়ার জন্য বড় কোনো দর্শনের প্রয়োজন হয় না; শুধু আজকের দিনটা শেষ করার মতো সামান্য শক্তিই যথেষ্ট।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমরা আসলে কতটুকু জানি নিজেদের সম্পর্কে? একজন মানুষকে দেখে বলি, সে সুখী। আরেকজনকে দেখে বলি, সে খারাপ। কাউকে দেখে বলি, তার অনেক টাকা, তাই সে নিশ্চয়ই ভালো আছে। কাউকে দেখে বলি, সে নিম্ন লেভেলের মানুষ। অথচ রেহানা খালার জীবনের একটা বিকেল আমার বহু বইয়ের চেয়ে বেশি কিছু শিখিয়ে দিতে পারে। রফিক ভাইয়ের একটা কথায় এমন কোনো সত্যি থাকতে পারে, যা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে শুনিনি। আবার কোনো শিক্ষিত মানুষ হয়তো আমার দিকে তাকিয়ে এমন কিছু বলবে, যা আমাকে অনেকদিন ভাবাবে। মানুষের ভেতরটা বাইরে থেকে বোঝার এই যে আমাদের অসম্ভব আত্মবিশ্বাস, সেটাই বোধহয় সবচেয়ে হাস্যকর।
তাই গন্তব্যহীন সন্ধ্যাগুলো আমার ভালো লাগে। রফিক ভাইয়ের রিকশায় বসে শহরের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে মনে হয়, কোথাও যাচ্ছি না, অথচ কত কিছু পার হয়ে যাচ্ছি। একটা দোকান, একটা আলো, একটা মানুষের মুখ, একটা মসজিদের মাইক, একটা রিকশার ঘণ্টা, কোনো বাসার বারান্দা, কারও ঝগড়ার শব্দ–সবকিছু একসঙ্গে মিশে যায়। গন্তব্যে পৌঁছানো না থাকলেও পথটা তো থাকে। আর কখনো কখনো পথটাই বোধহয় আসল গল্প হয়ে যায়।
সেই গল্পের মধ্যে আবার কেউ একজন এসে বলে, “জীবন সত্যিই অনেক কঠিন।” আর আমি তাকে বলি, “সক্রেটিসও বলে গেছেন, জীবন মৃত্যুর থেকেও কঠিন।” সে জানে না সক্রেটিস কে। আমি তাকে বলি, “সক্রেটিস হলো আমার প্রেমিক।” সে হাসে। আমারও হাসি পায়। এই হাসিটুকুর কোনো দার্শনিক ব্যাখ্যা দরকার হয় না। আমরা আবার চলতে থাকি।
শেষ পর্যন্ত তো আবার একই জায়গায় ফিরতে হয়। খালা ঘুমিয়ে পড়ে। ল্যাপটপে শাবনূর বলে, “মন বসে না পড়ার টেবিলে।” বারান্দার ভদ্রলোক আবার তার গান গায়। ফোনটা পড়ে থাকে। আম্মু হয়তো আবার কল করবে। আব্বুর কোনো গান হঠাৎ কোথাও বাজবে। কোনো গাছ আবার কাটা পড়বে। কোনো নতুন মানুষকে দেখে মনে হবে, তাকে নিয়ে কিছু ভাবা যায়। কোনো পুরোনো মানুষকে মনে পড়ে বুকের ভেতর হালকা ব্যথা হবে। তারপর আবার চা খাবো, বকবক করবো, রাস্তায় বের হবো।
এই যে এক চিন্তা থেকে আরেক চিন্তায় চলে যাওয়া, একটা মানুষ থেকে আরেক মানুষে, একটা স্মৃতি থেকে আরেক স্মৃতিতে, একটা জীবনের ভেতর থেকে আরেকটা জীবনের দিকে তাকানো–এই প্রবাহটা থামে না। থামাতে গেলেই হয়তো আমি আমি থাকবো না। কারণ আমার মাথার ভেতর যে এত মানুষ, এত শব্দ, এত গান, এত মৃত্যু, এত হাসি, এত অপূর্ণতা–সবাই মিলে যে বিশৃঙ্খলাটা তৈরি করেছে, সেটাই তো আমার ভেতরের পৃথিবী।
হয়তো এই কারণেই একটা গল্পও কখনো এক জায়গায় থাকতে পারে না। একটা গাছ থেকে শুরু করে অপু-দুর্গা, সেখান থেকে পাশের বাসার নারী, তারপর আব্বু, তার গান, শিশুর প্রশ্ন, রেহানা খালা, রফিক ভাই, আম্মু, সেজদা, মৃত্যু, ফ্রয়েড, আবার রিকশা, আবার বারান্দা–সবকিছু একে অন্যের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে থাকে যে কোথায় গল্প শুরু হলো আর কোথায় শেষ হলো, সেটাও বোঝা যায় না। আমার মাথার ভেতরও বোধহয় এমনই। একটা চিন্তার দরজা খুললে তার ভেতর থেকে আরেকটা দরজা বের হয়। তারপর আরেকটা। শেষে বুঝি, আসলে কোনো দরজাই আলাদা ছিল না।
অনেক বকবক করেছি। ম্যালা ক্লান্ত। এতক্ষণ ধরে কত কী ভাবলাম, কতজনের সঙ্গে মনে মনে কথা বললাম, কত জায়গায় গেলাম, অথচ শেষ পর্যন্ত আবার এই একই ঘরে, এই একই বারান্দায় ফিরে এলাম। কোথাও যাওয়া হলো না, অথচ কত দূর ঘুরে এলাম। মানুষের জীবনের প্রবাহও এমনই–আমরা ভাবি সামনে যাচ্ছি, অথচ বারবার নিজেদের কাছেই ফিরে আসি। শুধু ফিরে আসার সময়টুকুতে আমরা একটু বদলে যাই।
কিছু মানুষ থাকে, কিছু মানুষ চলে যায়। কিছু কথা মনে থাকে, কিছু কথা ভুলে যাই। কোনো গাছ কেটে ফেললে তার ছায়াটা আর থাকে না, কিন্তু সেই গাছটার কথা মনে পড়ে। কোনো মানুষ চলে গেলে তার কণ্ঠটা আর শোনা যায় না, কিন্তু তার প্রিয় গান শুনলে মনে হয়, সে ঠিক পাশেই আছে। শোকেরও হয়তো এটাই নিয়ম–কোনো নিয়ম নেই।
জীবনও তাই কোনো গোছানো গল্প না। আলমিরার কাপড়ের মতো গোছাতে যাই, আবার এলোমেলো হয়ে যায়। একটা চিন্তা গোছাতে যাই, তার মধ্যে আরেকটা চিন্তা ঢুকে পড়ে। একটা মানুষকে বুঝতে যাই, তার মধ্যে আরেকজন মানুষ এসে দাঁড়ায়। একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরও দশটা প্রশ্ন জন্ম নেয়। তারপর একসময় ক্লান্ত হয়ে মনে হয়, থাক, আজ এতটুকুই।
আজও তাই।
এতক্ষণ ধরে মাথার ভেতর যে হইচইটা চলছিল, তাকে এবার একটু বসতে দিই। বাইরে হয়তো আবার কোনো বিড়াল হাঁটছে, কোনো রিকশা যাচ্ছে, কোনো মানুষ কারও সঙ্গে ঝগড়া করছে, কোনো মা সন্তানের জন্য দোয়া করছে, কোনো মানুষ তার মৃত বাবার গান শুনছে। পৃথিবী তার নিজের মতো চলবেই।
আমি শুধু একটু চুপ করে থাকি।
তারপর আবার কোনোদিন, কোনো একটা গন্ধ, কোনো একটা গান, কোনো একটা মুখ, কোনো একটা অপ্রয়োজনীয় ঘটনা কিংবা হঠাৎ মাথায় ঢুকে পড়া কোনো অদ্ভুত চিন্তা আমাকে আবার কথা বলতে বাধ্য করবে।
ততদিন থাক।
এবার আসি। কেমন?







































































































