আমি ল্যুবেরোঁ১ পাহাড়ে পশু চড়াতাম তখন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে যেত কোনো মানুষের মুখ না দেখে, আমার কুকুর লাব্রি আর ভেড়ার পালকে নিয়ে আমি চারণভূমিতে পড়ে থাকতাম একা। মাঝে মাঝে মঁ-দ্য-ল্যুরের২ সন্ন্যাসী বুনো ঔষধি গাছপালা সংগ্রহ করতে ওদিক দিয়ে হেঁটে যেতেন, কিংবা দেখতে পেতাম পীয়েমোঁ৩ অঞ্চলের কোনো কয়লা-শ্রমিকের কালো মুখ; তবে তারা সবাই ছিল সহজ-সরল, একাকিত্বের ভারে একদম নীরব, কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলা এমন একদল মানুষ, যারা নিচের গ্রাম বা শহরগুলোর বিন্দুমাত্র খবরাখবরও রাখত না। তাই প্রতি পনেরো দিন অন্তর, যখন পাহাড়ের ওপরের দিকে চলে যাওয়া পথে আমাদের খামারের খচ্চরটির গলার ঘণ্টার শব্দ শুনতে পেতাম, যে খচ্চরটি আমার পনেরো দিনের রসদ নিয়ে আসত আর পাহাড়ের ঢালের ওপরে ধীরে ধীরে ছোট্ট মিয়ারোর (খামারের ছেলেটি) সজাগ মাথাটা কিংবা বুড়ি চাচি নোরাদের লালচে মাথার টুপিটা দেখতে পেতাম, তখন আমি সত্যিই ভীষণ খুশি হয়ে উঠতাম। আমি নিচের এলাকার খবরাখবর জেনে নিতাম, ব্যাপটিজমের খবর, বিয়ের খবর; তবে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল আমার মালিকদের মেয়ে, আমাদের তরুণী স্তেফানেত কেমন আছে, সে কী করছে, সেই খবর জানতে—আশপাশের দশ লিওয়ের৪ মধ্যে যার মতো সুন্দরী আর কেউ ছিল না। এমন একটা ভাব করে আমি খোঁজখবর নিতাম যেন আমার তেমন বিশেষ কোনো আগ্রহই নেই, সে কি প্রায়ই উৎসব-অনুষ্ঠানে, রাতের আসরে যেত কি না, তার কাছে সবসময় নতুন নতুন প্রেমিকের আগমন ঘটত কি না; আর যারা আমাকে জিজ্ঞেস করবে পাহাড়ের এই গরিব রাখালের এসব ব্যাপারে কীই-বা আসে যায়, তাদের আমি বলব যে, আমার বয়স তখন ছিল কেবল বিশ আর আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটি ছিল এই স্তেফানেত।
এক রবিবার দুই সপ্তাহের রসদ আসার অপেক্ষায় ছিলাম, সেদিন দেখা গেল তা পৌঁছাতে বেশ দেরি হয়ে গেছে। সকালে নিজেকে বলছিলাম: নিশ্চয়ই বড় গির্জার প্রার্থনার জন্যই দেরি হচ্ছে, তারপর দুপুরের দিকে হঠাৎ এক প্রবল ঝড় এল আর তখন ভাবলাম, পথঘাটের এমন বেহাল দশার কারণে নিশ্চয়ই খচ্চরটা রওনা হতে পারেনি। শেষমেশ, বেলা প্রায় তিনটার দিকে, আকাশ যখন ধুয়ে-মুছে একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেছে, পাহাড় তখন বৃষ্টি আর রোদের ঝলকে চকচক করছে, ঠিক সেই সময় পাতার ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরার শব্দ আর ফুলে-ফেঁপে ওঠা ঝরনাগুলোর উচ্ছ্বসিত কলধ্বনির মধ্যে শুনতে পেলাম খচ্চরের গলার ঘণ্টাধ্বনি। সেই ঘণ্টাধ্বনি ছিল এতোটাই প্রফুল্ল, এতোটাই চঞ্চল, যেন ইস্টারের দিনে একসঙ্গে বেজে ওঠা বিশাল সব ঘণ্টার মিলিত ধ্বনি। কিন্তু খচ্চরটাকে চালিয়ে নিয়ে আসছিল না ছোট্ট মিয়ারো, না সেই বুড়ি নোরাদ চাচি। ছিল… বলো তো কে!… আমাদের সেই তরুণী, আমার বন্ধুরা! স্বয়ং আমাদের সেই তরুণী! বেতের বস্তাগুলোর মাঝখানে সোজা হয়ে বসে আছে, পাহাড়ি বাতাস আর ঝড়ের পরের শীতল সতেজতায় তার মুখখানি একেবারে গোলাপি হয়ে উঠেছে।
ছোট্ট মিয়ারো অসুস্থ, আর নোরাদ চাচি গেছেন ছেলেমেয়েদের কাছে ছুটি কাটাতে। সুন্দরী স্তেফানেত আমাকে এসব কথা জানাল খচ্চর থেকে নামতে নামতে; সেই সঙ্গে এটাও বলল যে, পথে হারিয়ে গিয়েছিল বলেই তার এত দেরি হয়েছে। তবে তার ফুলেল ফিতে, চকচকে স্কার্ট এবং লেসের কাজ খচিত এমন সুন্দর সাজপোশাক দেখে মনে হচ্ছিল, সে ঝোপঝাড়ের মধ্যে পথ খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে যায়নি, বরং কোনো নাচের আসরে অনেকক্ষণ সময় কাটিয়ে এসেছে। আহা কী সুন্দর এক সৃষ্টি! আমার চোখ যেন তাকে দেখে কিছুতেই আর তৃপ্ত হচ্ছিল না। সত্যি বলতে, এর আগে আমি তাকে এত কাছ থেকে কখনো দেখিনি। শীতকালে যখন ভেড়ার পাল সমতলে নেমে আসত আর আমি রাতের খাবারের জন্য খামারবাড়িতে ফিরতাম, সে তখন খুব দ্রুত পায়ে খাবার ঘরটি পার হয়ে যেত, চাকর-বাকরদের সাথে বিশেষ কথা বলত না, সব সময়ই সেজেগুজে থাকত আর যেন একটু গর্বিত ভাব বজায় রাখত… এখন সে আমার ঠিক সামনে, কেবলই আমার জন্য; এটা কি মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো অবস্থা নয়?
ঝুড়ি থেকে রসদগুলো বের করে নেওয়ার পর, স্তেফানেত কৌতূহলী দৃষ্টিতে চারপাশে তাকাতে লাগল।রবিবারের সুন্দর স্কার্টটি যাতে নষ্ট না হয়ে যায়, তাই তা একটু উপরে তুলে ধরে সে ঘেরা চারণভূমির ভেতরে ঢুকল। দেখতে চাইল আমি কোথায় শুই: খড়ের বিছানা, তার ওপর ভেড়ার চামড়া, দেয়ালে ঝোলানো আমার বড় চাদর, মেষপালকের লাঠি, আর পাথর-ঠোকা বন্দুক! এই সবকিছুই তাকে বেশ আনন্দ দিচ্ছিল।
— তাহলে, এইখানেই তুমি থাকো, বেচারা রাখাল? সবসময় একা একা থাকতে নিশ্চয়ই তোমার খুব একঘেয়ে লাগে! কী করো তুমি? আর কী-ই বা ভাবো?…
আমার ইচ্ছে করছিল বলতে, “আপনার কথাই ভাবি”, আর তা বললে একটুও মিথ্যে বলা হতো না; কিন্তু আমার অস্থিরতা এমনই চরমে উঠেছিল যে, মুখ দিয়ে একটি কথাও বের করতে পারছিলাম না। আমার মনে হয়, সে ব্যাপারটা বেশ বুঝতে পারছিল, আর এই দুষ্টু মেয়েটি যেন আমার অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়ে বেশ মজা পাচ্ছিল। সে দুষ্টুমি করে বলল:
— আর তোমার সেই ভালোবাসার মানুষটি, রাখাল? সে কি কখনো-সখনো তোমার সঙ্গে দেখা করতে এখানে উঠে আসে?… সে নিশ্চয়ই সেই সোনালি ছাগলটি, অথবা সেই পরী এস্তেরেল, যে কেবল ঘুরে বেড়ায় পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায়…
আর আমার সঙ্গে কথা বলার সময় তাকে যেন সেই পরী এস্তেরেলের মতোই লাগছিল, মাথা পেছনে এলিয়ে মিষ্টি হেসে বিদায় নেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করছিল, যেন তার এই আগমনই ছিল ক্ষণিকের কোনো আবির্ভাব।
— বিদায়, রাখাল।
— বিদায়, মালিকের মেয়ে।
আর এই বলে সে চলে গেল খালি ঝুড়িগুলো সাথে নিয়ে।
যখন সে ঢালু পথ ধরে মিলিয়ে যাচ্ছিল, তখন মনে হলো—খচ্চরের খুরের নিচে গড়িয়ে পড়া নুড়ি-পাথরগুলো যেন একের পর এক এসে পড়ছে আমার হৃদয়ের ওপর। দীর্ঘক্ষণ, দীর্ঘক্ষণ ধরে আমি সেই পাথরগুলোর গড়িয়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম আর যেন ঘোরের মধ্যে বসে রইলাম অনেক বেলা অবধি; নড়তেও সাহস হলো না, পাছে ভেঙে যায় আমার সেই স্বপ্ন
যখন সে ঢালু পথ ধরে মিলিয়ে যাচ্ছিল, তখন মনে হলো—খচ্চরের খুরের নিচে গড়িয়ে পড়া নুড়ি-পাথরগুলো যেন একের পর এক এসে পড়ছে আমার হৃদয়ের ওপর। দীর্ঘক্ষণ, দীর্ঘক্ষণ ধরে আমি সেই পাথরগুলোর গড়িয়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম আর যেন ঘোরের মধ্যে বসে রইলাম অনেক বেলা অবধি; নড়তেও সাহস হলো না, পাছে ভেঙে যায় আমার সেই স্বপ্ন। সন্ধ্যার দিকে, যখন উপত্যকার তলদেশ ধীরে ধীরে নীল হয়ে আসছিল এবং ভেড়াগুলো ডাকতে ডাকতে একে অপরের গা ঘেঁষে জড়ো হচ্ছিল চারণভূমিতে ফিরে যাওয়ার জন্য, তখন শুনলাম নিচের ঢাল থেকে কেউ আমাকে ডাকছে। তাকিয়ে দেখি মেয়েটি ফিরে আসছে, কিছুক্ষণ আগে যেমন হাসিখুশি ছিল, তেমন আর নেই; বরং ঠান্ডা, ভয় আর ভেজা কাপড়ে কাঁপছিল। পরে জানা গেল, ঢালের নিচে সে দেখেছিল বৃষ্টির ঝড়ে ফুলে-ফেঁপে ওঠেছে সর্গ নদীটি আর কোনোভাবে পার হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে সে প্রায় ডুবে যেতে বসেছিল। ভয়ংকর ব্যাপারটি হলো, রাতের এই সময়ে খামারবাড়িতে ফেরার কথা আর ভাবাই যাচ্ছিল না; কারণ মেয়েটি একা একা ফেরার পথ খুঁজে পেত না, আর আমিও ফেলে রেখে যেতে পারতাম না ভেড়ার পালটাকে। পাহাড়ে রাত কাটানোর ভাবনাটা তাকে ভীষণভাবে পীড়া দিচ্ছিল, বিশেষ করে তার আপনজনদের উদ্বেগের কথা ভেবে। আমি যথাসাধ্য তাকে আশ্বস্ত করলাম:
— জুলাই মাসে রাত তো ছোটই হয়… এই দুঃসময়ও বেশিক্ষণ থাকবে না।
আমি তাড়াতাড়ি আগুনটা ভালো করে জ্বেলে দিলাম, যাতে তার পা আর নদীর জলে ভিজে যাওয়া পোশাকটা শুকিয়ে নিতে পারে। তারপর তার সামনে দুধ আর কয়েক টুকরো পনির এনে রাখলাম। কিন্তু বেচারি মেয়েটির তখন গা গরম করা বা কিছু খাওয়ার কথা মনেই ছিল না। তার চোখে বড় বড় অশ্রু জমতে দেখে আমারও ইচ্ছে করছিল কান্না করতে।
ইতোমধ্যে অন্ধকার নেমে এসেছিল। পাহাড়ের চূড়াগুলোর ওপর তখন সূর্যের শেষ রেশটুকুই কেবল রয়ে গেছে আর পশ্চিম আকাশের দিকে ছড়িয়ে ছিল এক আবছা আলোর আভা। আমি চাইলাম, আমাদের তরুণীটি যেন বিশ্রাম নিতে ঘেরা চারণভূমির ভেতরে গিয়ে শোয়। তাজা খড়ের ওপর একেবারে নতুন একটি সুন্দর চামড়া বিছিয়ে দিলাম। তারপর তাকে রাতের শুভেচ্ছা জানিয়ে বাইরে গিয়ে দরজার সামনে বসলাম… ঈশ্বর সাক্ষী, ভালোবাসার আগুনে রক্ত জ্বলতে থাকলেও কোনো খারাপ চিন্তা আসেনি আমার মনে; বরং কেবল খুব বেশি গর্ব হচ্ছিল এই ভেবে যে, চারণভূমির এক কোণে, আমার কৌতূহলী ভেড়ার পালটি যার ঘুমের দিকে তাকিয়ে আছে, সেখানে আমার মালিকের মেয়ে—অন্য সব ভেড়ার চেয়ে যেন আরও অনেক বেশি মূল্যবান, আরও অনেক বেশি শুভ্র একটি ভেড়ির মতো নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিচ্ছে আমার জিম্মায়। কখনো ওই আকাশকে এত গভীর, তারাগুলোকে এত উজ্জ্বল বলে মনে হয়নি আমার…হঠাৎ চারণভূমির কাঠের বেড়ার দরজা খুলে গেল, আর সুন্দরী স্তেফানেত বাইরে এসে দাঁড়াল। ঘুম আসছিল না তার। ভেড়াগুলো নড়েচড়ে উঠলে খড়ের শব্দ হচ্ছিল, আবার কেউ কেউ ঘুমের ঘোরেই ডাকছিল। তার চেয়ে আগুনের কাছে এসে বসতেই বেশি ভালো লাগল স্তেফানেতের। সেটা দেখে আমি আমার ছাগলের চামড়াটা তার কাঁধের ওপর জড়িয়ে দিলাম, আগুনটা আরও উসকে দিলাম, আর কোনো কথা না বলে আমরা দুজন বসে রইলাম পাশাপাশি। তুমি যদি কখনো খোলা আকাশের নক্ষত্রদের নিচে রাত কাটিয়ে থাকো, তবে তো জানো—যে সময়টাতে আমরা ঘুমে ডুবে থাকি, সেই সময় নিঃসঙ্গতা আর নীরবতার মধ্যে জেগে ওঠে এক রহস্যময় জগৎ। তখন ঝরনাগুলো আরও স্বচ্ছ সুরে গান গায়, জলাভূমিগুলোয় জ্বলে উঠে ছোট ছোট আলোর শিখা। পাহাড়ের সমস্ত অদৃশ্য আত্মারা তখন অবাধে ঘুরে বেড়ায়; আর বাতাসে শোনা যায় নানা মৃদু স্পর্শের শব্দ, এমন সব অস্পষ্ট আওয়াজ—মনে হয় যেন গাছের ডালপালা বেড়ে ওঠা আর ঘাস গজিয়ে ওঠার শব্দও শোনা যাচ্ছে। দিনের বেলা হল প্রাণীদের জগৎ; কিন্তু রাত হল জড়বস্তুদের। এর সঙ্গে অভ্যস্ত না হলে ভয় লাগবেই… তাই মেয়েটিও ভয়ে কাঁপছিল, আর সামান্য কোনো শব্দ হলেই এসে বসছিল আমার গা ঘেঁষে। একবার নিচে ঝলমল করতে থাকা জলাভূমির দিক থেকে একটি দীর্ঘ, বিষণ্ণ আর্তনাদ ঢেউয়ের মতো দুলতে দুলতে উঠে এলো আমাদের কাছে। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি উজ্জ্বল ছুটন্ত নক্ষত্র আমাদের মাথার ওপর দিয়ে সেই একই দিকে পিছলে চলে গেল—মনে হল, এইমাত্র যে বিষণ্ণ আর্তনাদটি আমরা শুনলাম, তার সঙ্গে যেন বয়ে চলেছে একটি আলোও।
— ওটা কী? নিচু গলায় আমাকে জিজ্ঞেস করল স্তেফানেত।
— স্বর্গে প্রবেশ করছে একটি আত্মা। কথাটি বলে আমি বুকে ক্রুশচিহ্ন আঁকলাম।
সেও নিজের বুকে ক্রুশচিহ্ন আঁকল এবং কিছুক্ষণ মাথা উঁচু করে গভীর ভাবাবিষ্ট হয়ে রইল। তারপর আমাকে বলল:
— তাহলে কি সত্যিই তোমরা রাখালেরা জাদুকর?
— মোটেই না। তবে এখানে আমরা নক্ষত্রদের আরও কাছাকাছি বাস করি, আর আকাশে কী ঘটে, তা সমতলের মানুষের চেয়ে অনেক ভালো জানি।
সে তখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল, এক হাতের ওপর মাথা ঠেকিয়ে, ভেড়ার চামড়ায় নিজেকে জড়িয়ে—মনে হচ্ছিল যেন স্বর্গের এক ছোট্ট রাখালী:
— কত নক্ষত্র! কী সুন্দর! আমি জীবনে কখনো এতো নক্ষত্র দেখিনি… রাখাল, তুমি কি এদের নাম জানো?
— অবশ্যই জানি। এই দেখুন! ঠিক আমাদের মাথার ওপরেই রয়েছে সেন্ট জেমসের পথ (আকাশগঙ্গা)। এটি ফ্রান্স থেকে সোজা স্পেনের দিকে চলে গেছে। গালিসিয়ার সেন্ট জেমসই এই পথটি এঁকেছিলেন, যাতে সারাজাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় বীর শার্লেমান তাঁর পথ চিনে নিতে পারেন। আরও একটু দূরে দেখুন, চারটি ঝলমলে চাকাসহ আত্মাদের রথ (সপ্তর্ষিমণ্ডল)। সামনে যে তিনটি নক্ষত্র রয়েছে, সেগুলো হল তিনটি পশু, আর তৃতীয়টির গা ঘেঁষে যে ছোট্ট নক্ষত্রটি রয়েছে, সেটি রথচালক। চারদিকে ঝরে পড়া নক্ষত্রের বৃষ্টি দেখতে পাচ্ছেন? তারা হল সেইসব আত্মা, যাদের পরমেশ্বর রাখতে চান না তাঁর কাছে… আর একটু নিচে দেখুন, ওই যে রেঁকনি, কিংবা তিন রাজা (কালপুরুষ)। আমাদের মতো রাখালদের কাছে এইসব নক্ষত্রই তো ঘড়ির কাজ করে। কেবল তাদের দিকে তাকিয়েই এখন বুঝতে পারছি মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। আর একটু নিচে, দক্ষিণ আকাশের দিকে, জ্বলজ্বল করছে মিলানের জন, নক্ষত্রদের মশাল (লুব্ধক)। এই তারাটিকে নিয়ে রাখালেরা একটা গল্প বলে। শোনা যায়, এক রাতে মিলানের জন, তিন রাজা আর প্লেয়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জ–তাদের এক বান্ধবী-নক্ষত্রের বিয়েতে নিমন্ত্রণ পেয়েছিল। প্লেয়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জ একটু বেশি তাড়াহুড়ো করত, তাই তারাই নাকি সবার আগে রওনা দিয়েছিল এবং আকাশের উঁচু পথ ধরে এগিয়ে গিয়েছিল। ওই যে, আকাশের একেবারে গভীরে তাকিয়ে দেখুন। তিন রাজা একটু নিচের পথ ধরে এগিয়ে গিয়ে তাদেরকে ধরে ফেলল; কিন্তু অলস মিলানের জন তখনও ঘুমিয়ে। দেরি করে ঘুম থেকে ওঠায় সে একেবারে পিছিয়ে পড়েছিল। শেষে রাগে, তাদেরকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য নিজের লাঠিটাই ছুড়ে মারল। এই কারণেই তিন রাজাকে আবার বলা হয়—মিলানের জনের লাঠি… কিন্তু সব নক্ষত্রের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর যে নক্ষত্রটি, তা হল আমাদের রাখালের নক্ষত্র। সে আমাদের পথ দেখায়—ভোরবেলা ভেড়ারপাল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি, আবার সন্ধ্যায় যখন ভেড়ারপাল নিয়ে ফিরে আসি। আমরা তাকে মাগেলোন নামেও ডাকি, সেই সুন্দরী মাগেলোন, যে প্রোভঁসের পিয়েরের (শনি) পেছনে পেছনে ছুটে চলে এবং প্রতি সাত বছর অন্তর তার সঙ্গে বিয়ে হয়।
— কী বলছ! রাখাল, তাহলে নক্ষত্রদেরও বিয়ে হয়?
— তা হয় বৈকি।
আমি যখন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম, নক্ষত্রদের এই বিয়েটা আসলে কী, তখন অনুভব করলাম, ঠান্ডা আর কোমল কিছু একটা হালকাভাবে এসে ঠেকেছে আমার কাঁধের ওপর। তা ছিল ঘুমে ভারী হয়ে আসা তার মাথা; ফিতে, লেস আর ঢেউ খেলানো চুলের মৃদু মর্মরে যা এসে হেলান দিয়েছিল আমার গায়ে। ভোরের আলো ফুটে আকাশের নক্ষত্রগুলো যখন একে একে ফিকে হয়ে মিলিয়ে গেল, সে ততক্ষণ একইভাবে নিঃশব্দে আমার গায়ে হেলান দিয়ে রইল। আমি তার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার অন্তরের কোথাও যেন একটু অস্থিরতা জেগে উঠেছিল, তবু সেই নির্মল রাত আমাকে পবিত্র এক আশ্রয়ে আগলে রেখেছিল—যে রাত কোনোদিনই আমার মনে সুন্দর চিন্তা ছাড়া আর কিছু জাগায়নি। আমাদের চারপাশে নক্ষত্রগুলো তখনও তাদের নীরব পথ ধরে এগিয়ে চলেছে, এক বিশাল ভেড়ারপালের মতো অনুগত ও শান্ত। আর মাঝে মাঝে আমার মনে হচ্ছিল, আকাশের সেই নক্ষত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কোমল, সবচেয়ে উজ্জ্বল কোনো একটি হয়তো পথ হারিয়ে আমার কাঁধের ওপর এসে বসেছে, ঘুমিয়ে পড়বে বলে…
- ১ ল্যুবেরোঁ (Luberon): দক্ষিণ ফ্রান্সের প্রোভঁস অঞ্চলের পর্বতমালা। ল্যুবেরোঁর বিস্তীর্ণ ঢাল ও উপত্যকায় ছড়িয়ে আছে চারণভূমি, বনভূমি ও ছোট ছোট গ্রাম।
- ২ মঁ-দ্য-ল্যুর (Mont-de-l’Ure): প্রোভঁস অঞ্চলের ল্যুবেরোঁ পর্বতমালার একটি পাহাড়ি এলাকা।
- ৩ পীয়েমোঁ (Piémont): আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত উত্তর-পশ্চিম ইতালির একটি ঐতিহাসিক ও সমৃদ্ধশালী অঞ্চল, যা ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের সীমান্তসংলগ্ন। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফরাসি সংস্কৃতির সাথে এর দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রয়েছে।
- ৪ লিও (Lieue): ফ্রান্সে মেট্রিক পদ্ধতি চালুর আগে ব্যবহৃত দূরত্বের একটি ঐতিহাসিক একক। সাধারণত ১ লিও প্রায় ৪ কিলোমিটারের সমান হতো। ১৭৯৫ সালে কিলোমিটার চালুর পর এর ব্যবহার বন্ধ হলেও, পুরাতন নথিপত্রে উল্লেখিত এই একক আজও বহুলভাবে পরিচিত।










































































































































































































