১.
অমঙ্গলের পূর্বাভাস ঝমঝমিয়ে নামছে। ভাবো, নইলে ডুবো। মানো, নইলে মরো। ওপরে তাকাও, নইলে বাদ পড়ো। আর এই মোটেই মোলায়েম নয় এমন সব হুমকির হাত ধরে এসে পড়েছে এআইয়ের যুগ – অ্যাকচুয়াল ইডিয়সি, অ্যাকচুয়াল সুপার ইডিয়সি, নিজের ওপর নিজে চড়ে তুষারগোলার মতো ফুলতে থাকা নির্বুদ্ধিতা – আমাদের দোরগোড়ায়। ধুর, শুরুর এই অনুচ্ছেদেই দুটো ড্যাশ ব্যবহার করে ফেললাম। লোকে যাকে বলে, ধরা পড়ার লক্ষণ। তাহলে হয়তো এই প্রবন্ধটা আমি লিখিইনি। সত্যিই এআইয়ের লেখা কি না, আর আমি সত্যিই আমি, আদৌ আমি নই, নাকি আংশিক আমি, সেটা যাচাই করতে আপনাকে একটা এআই অ্যাপ ব্যবহার করতে হবে। নিজের সহজবোধ্যতা দিয়ে আর কাজ চলবে না। অ্যাপ লাগবে। এম ড্যাশের মালিকানা যখন এআইয়ের হাতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এমিলি ডিকিনসন আর ড্যাশের প্রতি তাঁর ভালোবাসাকে কী চোখে দেখবে? তাঁকেও কি যন্ত্রের পেটে পুরে দেওয়া হয়েছে? তারা কি তাঁকে কম ভালোবাসবে? ভাষার দরজায় তালা মেরে কি ক্রমে আমাদেরই বাইরে রাখা হচ্ছে? তাতে কি আর কিছু এসে যায়?
বিশ্বাসের চেয়ে লেখকের অহংবোধের সঙ্গেই যার বেশি সম্পর্ক, এমন কিছু কারণে সেন্ট জনের সুসমাচারের প্রথম শ্লোকটি আমাকে বরাবর মুগ্ধ করেছে: “আদিতে ছিলেন বাক্য, আর বাক্য ছিলেন ঈশ্বরের সঙ্গে, আর বাক্যই ছিলেন ঈশ্বর।” আমি একে সত্য বলে বিশ্বাস করি। আমার বিশ্বাস, মানুষ ও ভাষার মৌলিক সম্পর্ককে ছিন্নভিন্ন আর কলুষিত করলে সামাজিক সংহতির যা-কিছু অবশিষ্ট আছে, তার ভিতও নড়ে যাবে।
এআই সাহিত্যের জগতে ধাক্কা মেরে ঢুকেছে। লেখক, প্রকাশক, সাহিত্যিক এজেন্ট, পাঠক, সমালোচক, শিক্ষক, ছাত্র, সবারই মনে হচ্ছে পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। অধ্যাপকদের এখন ছাত্রছাত্রীদের অ্যাসাইনমেন্ট দেখতে হয় সন্দেহের চোখে। প্রকাশকদের নতুন লেখকদের যাচাই করতে হয় সম্ভাব্য অপরাধস্থল পরীক্ষা করা গোয়েন্দার মতো। পড়াশোনা আর শেখার ওপর এর কী প্রভাব পড়ছে, ভাষায় বোঝানো কঠিন। বুদ্ধিবৃত্তিক আদানপ্রদানের আনন্দ আর চ্যালেঞ্জের জায়গায় এসে বসেছে রুদ্ধ, তিক্ত, যান্ত্রিক কিছু একটা। মৃত প্রাণীর চামড়ায় খড় ঠেসে মূর্তি বানানো কারিগরদের এক শাংগ্রি-লা। যেখানে এককালে জীবন্ত যা-কিছু ছিল, সবকিছুরই চামড়া ছাড়িয়ে ভেতরটা ঠেসে ভরা হয়েছে। তারা এখন পলকহীন তাকিয়ে থাকে আপনার দিকে, উজ্জ্বল নকল চোখে অর্থপূর্ণ ঝিলিক নিয়ে। যেন কারও দিকে তাকিয়ে ভাবছেন, যাকে দেখছেন বলে মনে হচ্ছে, এ কি সত্যিই সেই মানুষ? কিংবা আয়নায় নিজের অবিকল মুখ দেখছেন, অথচ জানেন, ওটা আসলে আপনি নন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জানাটুকুও হয়তো হারাব। তখন আর জানব না আমরা কারা। এমনকি আমরা আদৌ আছি কি না, সেটাও না।
আর গোটা সমাজের, গোটা প্রজাতির যখন এমন হয়? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শেখা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া সহজবোধের ওপর যখন আর ভরসা করা যায় না? নিজের হৃদয়, চোখ, কান যখন আর বিশ্বাস করা যায় না? সত্য আর মিথ্যা, ভার্চুয়াল আর বাস্তব যখন আর আলাদা করা যায় না? সময় যখন ভেঙে পড়ে, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ একে অন্যের মধ্যে ঢুকে যায়? অগণিত ভাষা আর সংস্কৃতিকে যখন ব্লেন্ডারে পিষে একতাল থকথকে মণ্ড বানানো হয়? সীমাবদ্ধতা আর খুঁত যা-ই থাক, এক প্রাচীন সামাজিক বোঝাপড়াকে যখন দুমড়েমুচড়ে অচেনা করে দেওয়া হয়? আমরা কি নিজেদের গণমানসিক বিকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি?
এভাবে ভাবার জন্য আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতেই পারে: নতুন, দুর্বোধ্য কিছুর মুখোমুখি হলে যে অনিবার্য নৈতিক আতঙ্ক হয়, আমিও তারই শিকার। শিল্পবিপ্লবের আগে বা কম্পিউটার আসার সময় যেমন হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, ব্যাপারটা কি শুধু সেটুকুই? মানব “প্রগতি”র বিবর্তনে আমরা কি স্রেফ একটা অস্বস্তিকর পালাবদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি? নাকি এ সত্যিই এক বিপর্যয়কর বিচ্ছেদ?
এই গৌরবময় নতুন প্রযুক্তি যাঁরা তৈরি করছেন, তাঁদের কথাই হয়তো শোনা উচিত। গত মাসে অ্যানথ্রপিকের এক তরুণ কর্মী, জেকব কক্সন, চাকরি ছেড়েছেন। বলেছেন, যে প্রকল্প মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে, তাতে কাজ করতে তাঁর বিবেক সায় দেয় না। নিজের কর্মক্ষেত্রের যে ছবি তিনি এঁকেছেন, তা মোটামুটি স্টেরয়েড খাইয়ে ফুলিয়ে তোলা ম্যানহাটন প্রকল্প। তবে আমরা জানি, এবার বিজ্ঞানীদের প্রেরণার বড় অংশজুড়ে রয়েছে মুনাফা আর “সবার আগে পৌঁছানোর” দৌড়। কক্সনের পদত্যাগের পর যা ঘটল, তা হতবুদ্ধি করে দেওয়ার মতো। যিনি তাঁদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন, সেই ভেতরের খবর ফাঁস করা মানুষটিকে নিয়ে আলোচনা করতে, তাঁর সঙ্গে দ্বিমত জানাতে বা সহমত হতে সবচেয়ে বড় এআই কোম্পানিগুলোর সিইওরা হুড়োহুড়ি শুরু করলেন। আমাদের পর্দা ভরে গেল সেই বিলিয়নিয়ার ক্ষমতাধরদের ভিডিওতে। গম্ভীর, সমাধির মতো ঠান্ডা গলায় তাঁরা জানালেন, যে যন্ত্রদেবতাকে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করতে চলেছেন, তার হাতে মানবসভ্যতার শেষ হয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।
আমাদের প্রজাতির ওপর নিজেদের অধিরাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে তাঁরা আশ্বস্ত করলেন, ঝুঁকি কমাতে যথাসাধ্য করছেন। সরকারি নিয়ন্ত্রণ চাইলেন। তাঁদের এই সাহায্যের আর্তিতে একরকম অসুস্থতার আভাস ছিল। ব্যাপারটায় খানিক বাঁধাবাঁধির বিকৃত সুখের গন্ধ: আমাকে বাঁধো! বেঁধে রাখো! ব্যাপারটা কি সেই রকম? নাকি এ পুঁজিবাদেরই সহজাত চরিত্র? লাগামহীন লোভের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ?
এই ধনকুবেররা নিজেদের বিলুপ্তির গল্পে বিশ্বাস করেন বলেই মনে হয়। অন্তত পৃথিবীর দূরতম প্রান্তে নিজেদের জন্য জল, খাবার, গোলাবারুদে ঠাসা বাঙ্কার বানানোর মতো বিশ্বাস তো করেনই। তবে আমাদের কাছে তাঁরা বিলুপ্তি বেচছেন না। (ডোনাল্ড ট্রাম্প আর প্রযুক্তিজগতের লিবার্টারিয়ানরা তো প্রকাশ্যেই একে ধাপ্পা বলেন।) তাঁদের বিক্রির বুলি দাঁড়িয়ে আছে প্রগতি, গৌরব আর মানবকল্যাণের ওপর। তাঁদেরই একজন, প্যালান্টিয়ারের পিটার থিল, সমালোচক আর নিয়ন্ত্রণের দাবিদারদের “অ্যান্টিক্রাইস্ট” পর্যন্ত বলেছেন: তাঁরা নাকি শয়তানের সঙ্গে সখ্য করছেন। অর্থাৎ নিজের কোম্পানি আর তার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আপনাআপনিই দেবত্ব দিয়ে দেওয়া হলো। (হ্যাঁ, সেই লোকটিই। মানবজাতির টিকে থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন কি না জানতে চাইলে যাঁর বিখ্যাত উত্তর ছিল, “উম্ম্…।” তারপর তোতলানো আর বিড়বিড় করা।)
শেষ পর্যন্ত এই ফাটাফাটি, পটাপট আওয়াজ প্রযুক্তিজগতের চেনা বিভাজনরেখাগুলো ধরে থিতিয়ে গেল: সর্বনাশবাদী, ত্বরান্বিতকরণবাদী, সংশয়বাদী। কিন্তু অন্য কেউ যখন এআই শিল্পের হাতে এখনই ঘটে চলা বাস্তব, বিপর্যয়কর ক্ষতির কথা বলেন, তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করে বাইরে রাখা হয়।
মজার ব্যাপার, অন্য কয়েকজন তথ্যফাঁসকারীর তুলনায় জেকব কক্সনকে নিয়ে ধনকুবেররা অনেক বেশি স্বস্তিতে আছেন বলে মনে হয়। মেরেডিথ হুইটেকারের পাশে তাঁরা এভাবে দল বেঁধে দাঁড়াননি। বর্তমানে সিগন্যাল ফাউন্ডেশনের সভাপতি হুইটেকার ২০১৯ সালে গুগল ছেড়েছিলেন, মার্কিন ড্রোনের জন্য যন্ত্রকে দৃশ্য চেনানোর প্রযুক্তি তৈরির চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর। সাত বছর বাদে এআই শিল্প আর অস্ত্রশিল্পের সেই মেলবন্ধন আমাদের সবার চোখের সামনে। (দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে ফেব্রুয়ারিতে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরপর দুবার চালানো হামলার কথা ভাবুন। সেখানে ১২০ জন স্কুলশিশুসহ ১৫৬ জন নিহত হয়েছিল। কেউ ক্ষমা চায়নি, কারণ কাজটা তো কেউ করেনি। যন্ত্রের পরিকল্পনায় খুন করলে অপরাধবোধ পোহাতে হয় না। গাজায় হামাস যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের হত্যাভিযানের পেছনে থাকা ল্যাভেন্ডার, গসপেল আর হোয়্যার’স ড্যাডি? নামের এআই ব্যবস্থাগুলোর বেলাতেও একই কথা। মানবাধিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, লোক খুঁজে বের করা আর তার গতিবিধি অনুসরণ করার এসব ব্যবস্থায় নিশানা নির্ধারণের মৌলিক একক ছিল পরিবারের বসতবাড়ি।)
২০২০ সালে টিমনিট গেবরুকে গুগল থেকে বরখাস্ত করার সময়ও ধনকুবেরদের সমর্থনের এমন ঢল নামেনি। সিলিকন ভ্যালির উচ্চপদস্থ প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে অতি অল্পসংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ নারীর একজন তিনি। যৌথভাবে লেখা একটি গবেষণাপত্র সরিয়ে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। গবেষণাটিতে গুগলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বৃহৎ ভাষা-মডেল বা এলএলএম প্রশিক্ষণের পরিবেশগত মূল্য তুলে ধরা হয়েছিল। দেখানো হয়েছিল, মডেলগুলো যে বিপুল তথ্যভাণ্ডার গোগ্রাসে গিলেছে, তার মধ্যে থাকা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ আর নারীবিদ্বেষ কীভাবে আরও বড় করে পুনরুৎপাদন করে। তাঁর সতর্কবাণী ছিল, মডেলগুলো যত বড় হবে আর সেগুলো নিরীক্ষা করা যত কঠিন হবে, এই বিকারগুলোও তত বাড়বে। আরেক গবেষক আবেবা বিরহানে তাঁর বক্তব্যকে আরও জোরালো করেন। বিরহানে “On Hate Scaling Laws for Data-Swamps” নামে একটি গবেষণাপত্রের সহলেখক; বিষয়, তথ্যের জলাভূমিতে ঘৃণা বৃদ্ধির নিয়ম।
এআই বিজ্ঞানী থেকে সমালোচক হয়ে ওঠা জেফ্রি হিন্টন বা জেকব কক্সনের মতো সম্পূর্ণ বিলুপ্তির ভবিষ্যদ্বক্তাদের চেয়ে হুইটেকার, গেবরু আর তাঁদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো ধনকুবেরদের বেশি ভাবাবে কেন? হয়তো কারণ, বিশাল আতশবাজির প্রদর্শনীর মতো হিন্টন আর কক্সনের সতর্কবার্তা গোটা পরিবেশে ভয়মেশানো রোমাঞ্চ যোগ করে। শেষ পর্যন্ত তা ধনকুবেরদের ক্ষমতার খেলাকেই আরও বড় করে তোলে। তাঁদের কোম্পানিগুলো যখন শেয়ারবাজারে আসবে, যেমন শিগগিরই আসার কথা, তখন এই খেলাটা বেশ কাজে দেবে। তাঁদের মডেল কতটা উন্নত, আর এআই অস্ত্রব্যবস্থার ক্ষেত্রে কতটা প্রাণঘাতী, তার ওপরই কোম্পানির মূল্যায়ন নির্ভর করবে।

কারা এই বিলিয়নিয়ার, যাঁদের দাবি মানবজাতির জীবন-মরণের ক্ষমতা তাঁদের হাতে? তাঁদের দেখে মনে হয়, মানবজাতি আর যে গ্রহকে আমরা ঘর বলি, তার সঙ্গে সম্পর্ক তাঁরা ইতিমধ্যেই ছিন্ন করেছেন। তাঁরা কি স্যাটায়ার, সেই পৌরাণিক আধা-মানুষ প্রাণী? অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক যন্ত্র? এঁদের সাইক্লোপিস বলা যাক। শেষটা “পিস”, বহুবচন। গ্রিক আর রোমান পুরাণের সেই দৈত্যাকৃতি, একচোখো, গুহাবাসী মেষপালকের দল। (একুশ শতকে তাঁদের গুহাগুলো বিলাসবহুল, আর ভেড়াগুলো মানুষ।)
এঁদের একটিমাত্র সত্তা ভাবুন। এক বিকৃত বিবর্তন। সাইক্লোপিসের মাথা একটাই। কপালে একটা ফ্যাকাশে, পলকহীন চোখ, মাঝখান থেকে অনেকটা ডানদিকে বসানো। সেই চোখ সাধারণ মানুষকে দেখে পক্ষপাতের হলুদ কাচের ভেতর দিয়ে। খনিজসমৃদ্ধ অরণ্যে খনিমালিক যা দেখে, কিংবা প্রবল স্রোতের নদীতে বাঁধনির্মাতা যা দেখে, এ-ও শুধু সেটুকুই দেখে। উত্তোলন করে, জমিয়ে, বাজারে ছাড়ার মতো সম্পদ। চুলোয় যাক বন। চুলোয় যাক নদী। চুলোয় যাক মানুষ।
তবে সম্প্রতি সিনেমার পর্দায় দেখা চুপচাপ, হোঁচট খেতে থাকা সাইক্লপসটির মতো এ নয়। সাইক্লোপিসের ঘাড়ের নিচ থেকে বেরিয়েছে বেশ কয়েকটা ঝগড়াটে শরীর। দেখে মনে হয় তাদের বনিবনা নেই। কিন্তু প্রলয়কালের প্রশ্নে, আরও নির্দিষ্ট করে নাওমি ক্লাইন আর অ্যাস্ট্রা টেলরের চমৎকার নতুন বইয়ের নাম ধার করে বললে, ‘প্রলয়কালের ফ্যাসিবাদ’-এর প্রশ্নে, তাদের দিব্যি বনিবনা হয়।
শিল্পের বহু পর্যবেক্ষকের চোখে সাইক্লোপিসের এই বিলুপ্তি-উৎসব এক সাজানো দৃশ্য। ক্রমশ ক্ষুব্ধ, উত্তেজিত জনতাকে বোঝানোর আয়োজন: মার্কিন অর্থনীতি, সে দেশের মানুষের নিরাপত্তা আর ভবিষ্যতের জন্য এআই কোম্পানিগুলো কতখানি কেন্দ্রীয়, জরুরি, অপরিহার্য, আর তাদের পেছনে ফেরানো কতখানি অসম্ভব।
নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে বলার মধ্য দিয়ে শিল্পটাকে রাষ্ট্রের গায়ে কলমের মতো জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সরকার আর এই করপোরেশনগুলোর মাঝখানে যতটুকু ফাঁক দিয়ে দিনের আলো ঢোকে, সেটুকুও বন্ধ করতে হবে। ধনকুবেরদের আশা, নিয়ন্ত্রণের এই আলিঙ্গন থেকেই মিলবে তাঁদের অতি প্রয়োজনীয় ব্ল্যাঙ্ক চেক। কারণ যে বিপুল পরিমাণ টাকা, জমি, জল আর শক্তি তাঁদের দরকার, একমাত্র সরকারই তা দিতে পারে। সোজা কথায়, তাঁরা আসলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিজেরা করার সরকারি অনুমতি চান। নিয়ন্ত্রণ না ছেড়ে বৈধতার সিলমোহর।
এ রকম সূক্ষ্ম কৌশল মঞ্চস্থ করতে হয় কাবুকি নাটকের মতো। তার জন্য একটা খলনায়ক চাই, একটা জুজু। ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠা জনগণকে ভয় দেখাতে হবে। আর ভয় দেখাতে হবে ভবিষ্যতের সেই সব সরকারকেও, যারা হয়তো ট্রাম্প প্রশাসনের মতো সহজে তালুতে নাচবে না।
মঞ্চের বাঁ দিক দিয়ে প্রবেশ: চীন।
উত্থানশীল চীনের হুমকি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বাঁচাতে সাইক্লোপিস মার্কিন সরকারকে দিচ্ছে একের পর এক প্রাণঘাতী স্বয়ংচালিত অস্ত্রব্যবস্থার প্রস্তাব, যা অন্য দেশ স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। সঙ্গে গবেষণাগারে তৈরি ভাইরাস আর বিজ্ঞানের কাছে এখনো অজানা জীবাণু অস্ত্রের কল্পলোক। দেশের অশান্ত জনগোষ্ঠীকে বাগে আনতে, নিজের ছাঁচে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্র আর অন্য বন্ধু সরকারগুলোর জন্য তার ঝুলিতে আছে নজরদারি আর মুখ শনাক্তকরণব্যবস্থা। প্রতিশ্রুতি এমন যে, ইসরায়েলের পেগাসাস স্পাইওয়্যারকেও খেলনা মনে হবে। বিনিময়ে চাই পুঁজির অবাধ প্রবাহ, আর বিরাট ডেটা সেন্টার ও সুপারকম্পিউটার চালাতে যত জমি, জল, শক্তি লাগবে, সব দেওয়ার অঙ্গীকার।
কথাগুলো সোজাসুজি বললে দাঁড়ায় মোটামুটি এই রকম: আমরা নিজেদের বেচব মানব আলোকপ্রাপ্তির অগ্রভাগ হিসেবে, সীমান্তহীন মানবজ্ঞানের ব্যবস্থাপক আর বণ্টনকারী হিসেবে। কিন্তু আসলে আমাদের চেহারা হবে মানচিত্রের ছাঁচে। আমাদের দেশ, তার অর্থনীতি, গোয়েন্দা জাল আর নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে এমনভাবে জুড়ে যাব যে, আমাদের সঙ্গে নিজের তফাতই করতে পারবেন না। ব্যাংক ব্যালান্স ছাড়া। বিনিময়ে, চাঁদ আর মহাশূন্যে উপনিবেশ বসানোর লক্ষ্য পূরণ হওয়া পর্যন্ত আপনি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করার অভিনয় করতে পারবেন। সীমান্ত নেই, ভয় নেই। তারপর দয়া করে যে মইটা ধার দিয়েছিলেন, সেটাকেই লাথি মেরে ফেলে দেব। আপনার জায়গা দখল করারও দরকার হবে না। আপনি থাকবেনই না। আপনার জনগণ, শহর, যোগাযোগব্যবস্থা, আর্থিক ব্যবস্থা, আদালত, সেনাবাহিনী, পুলিশ, সব চালাব আমরা। আমরা না চালালে চীন চালাবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বড় এআই করপোরেশনগুলোর সরকারি নিয়ন্ত্রণের এই আকুতির আরেক কাজ হলো ছোট প্রতিযোগীদের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া। ফলে এআই নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক চুক্তি হবে, যা হতেই হবে, তখন ময়দানে থাকবে শুধু তারাই। হাতে গোনা কয়েকটা “নিয়ন্ত্রিত” করপোরেশন।
করপোরেশন আর দেশের একীভবন বেশ এগিয়ে গেছে। এআইয়ের বিজ্ঞান নতুন হতে পারে। কিন্তু যেভাবে তাকে আমাদের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে, তা ঔপনিবেশিকতার মতোই পুরোনো। ভারতে কোম্পানির উপনিবেশ হয়ে থাকার ইতিহাস আমাদের আছে। আর হ্যাঁ, আমাদের শাসকশ্রেণিই তাদের ডেকে এনেছিল, আমেরিকার শাসকেরা এখন যেমন করছেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজতন্ত্র অধিগ্রহণ করেছিল। এখন অবশ্য উল্টোটা ঘটছে। ভারতের অবকাঠামোর বড় অংশের মালিক দুই করপোরেট গোষ্ঠী, আদানি গ্রুপ আর রিলায়েন্স গ্রুপ। দুটোই এআই-সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য তৈরি।
সাইক্লোপিস মার্কিন রাষ্ট্র দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্যালান্টিয়ারের সিইও অ্যালেক্স কার্পকে শুনুন: “আমার মনে হয় প্যালান্টিয়ার, আমেরিকা আর গোটা বিশ্বের প্রধান ঝুঁকি হলো এক পশ্চাৎমুখী চিন্তাধারা, যা আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কলুষিত করছে, ভেতর থেকে ক্ষয়ে দিচ্ছে।” যেসব বিশ্লেষক বলেছিলেন প্যালান্টিয়ারের মূল্যায়ন অতিরিক্ত, তাঁদের ওপর তিনি বিরক্ত ছিলেন। (মানে, একটা দেবতার “মূল্য” নির্ধারণের স্পর্ধা হয় কী করে?) এরপর এল সেই চেনা, কুল, বড়লোকি রসিকতা: “যেসব বিশ্লেষক আমাদের বাঁশ দেওয়ার চেষ্টা করেছে, একটা ড্রোন এনে তাদের ওপর হালকা করে ফেন্টানিল-মেশানো প্রস্রাব ছিটিয়ে দেওয়ার ভাবনাটা আমার দারুণ লাগে।”
আর এখন ওপেনএআইয়ে থাকা স্যাম অল্টম্যানের এই বিখ্যাত কথাটা শুনুন। এআই হয়তো মানবজাতিকে নরকের শর্টকাটে নিয়ে যাচ্ছে, তা স্বীকার করেই বলেছিলেন: “… তবে এর মধ্যে জোরদার মেশিন লার্নিং দিয়ে দারুণ সব কোম্পানি তৈরি হবে।” কিংবা মার্ক অ্যান্ড্রিসেনের এই কথাটা কেমন? তিনি অতি-ত্বরান্বিতকরণবাদী, ট্রাম্পের সঙ্গে অতি-ঘনিষ্ঠ, আর বুদ্ধ্যঙ্কও সম্ভবত সেই একই অতি-মানের। “প্রযুক্তিকে হতে হবে অজানার শক্তিগুলোর ওপর এক হিংস্র আক্রমণ, যাতে তাদের মানুষের সামনে মাথা নোয়াতে বাধ্য করা যায়… আমরা ভুক্তভোগী নই; আমরা বিজেতা।”
মনে আছে, থাইল্যান্ড আর ইন্দোনেশিয়ায় সমুদ্র কীভাবে উপকূল থেকে সরে গিয়েছিল? হঠাৎ জেগে ওঠা মাইলের পর মাইল আনকোরা সৈকত দেখতে মানুষ দৌড়ে গিয়েছিল। বুঝতে পারেনি, অনেক দূরে সমুদ্রে একটা জলের দেয়াল তৈরি হচ্ছে, যা এসে তাদের ওপর ভেঙে পড়বে। আমরা এখন সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। নির্বুদ্ধিতার এক আকাশছোঁয়া দেয়াল আমাদের ভাসিয়ে নিতে চলেছে
২.
প্রলয়ের নানা ব্র্যান্ড, আর তার সঙ্গে আসা দুর্দশা নিয়ে মানুষকে যুঝতে হচ্ছে। আছে বিলুপ্তির ভয়ংকর গল্প। আছে এমন এক সংস্করণ, যেখানে আমাদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান এক প্রজাতি আমাদের পদানত করে। (এর ফল কী হতে পারে বুঝতে চাইলে ভাবুন, একই গ্রহে আমাদের সঙ্গে থাকা অন্য প্রজাতিগুলোর সঙ্গে আমরা কী করেছি। তখন বিলুপ্তিকেই বেশ লোভনীয় মনে হবে।)
তারপর আছে প্রযুক্তিজগতের বাইরের মানুষের উদ্বেগ। এআই শিল্পের কার্বন নিঃসরণ নিয়ে বিপর্যস্ত জলবায়ু আন্দোলনকারীরা; সামনে গণবেকারত্ব আর শূন্য ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়া ছাত্রছাত্রী ও শ্রমিকেরা; আমার মতো শিল্পী, সংগীতশিল্পী, লেখকেরা। আমরা টের পাচ্ছি সেই ঘূর্ণির টান, যা আমাদের শরীর থেকে ধুকপুক করা হৃদয়টাকে শুষে নিচ্ছে, আর সমাজ নিয়ন্ত্রণের ইস্পাতের সুতো সব একসঙ্গে জড়ো করছে একটা শক্ত করে বন্ধ যান্ত্রিক মুঠোর মধ্যে।
আমাদের কীভাবে সাড়া দেওয়ার কথা? নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে? যে শিল্পের পাশে ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার ‘অ্যাপোক্যালিপস নাউ’, তার বর্ণবাদী বাঁধাধরা ছকগুলোসহ, সমসাময়িক ঘটনাবলির তথ্যচিত্র বলে মনে হয়, তাকে শাসনে আনবেন কী করে?
সাইক্লোপিস হলো কর্নেল কার্টজ। যুদ্ধের নিষ্ঠুরতায় উন্মাদ হয়ে যাওয়া এক বয়স্ক প্রাক্তন মেরিন। ‘হার্ট অব ডার্কনেস’-এর ভেতর নিজের বিকারগ্রস্ত, রক্তস্নাত, মাদকাচ্ছন্ন সাম্রাজ্য আর সেখানকার স্থানীয় প্রজাদের শাসন করে সে। কনরাডের আফ্রিকা থেকে সেই অন্ধকারের হৃদয় কপোলার ভিয়েতনামে এনে বসানো হয়েছে। সহযোদ্ধা মেরিনের বিদ্রোহ শেষ করতে যে তরুণ অফিসারকে পাঠানো হয়, মার্কিন সেনা হাইকমান্ড তাকে স্পষ্ট নির্দেশ দেয়: “চরম নির্মমতায় খতম করো।”
আমাদের স্লোগান কী হবে? চরম নির্মমতায় নিয়ন্ত্রণ করো? হয়তো। যদিও সত্যি বলতে, কথাটার মানে কী বা কাজে সেটা কেমন হবে, আমি জানি না।
অনেকটা ২০০৪ সালের সুনামির ঠিক আগের মুহূর্তের মতো লাগছে। মনে আছে, থাইল্যান্ড আর ইন্দোনেশিয়ায় সমুদ্র কীভাবে উপকূল থেকে সরে গিয়েছিল? হঠাৎ জেগে ওঠা মাইলের পর মাইল আনকোরা সৈকত দেখতে মানুষ দৌড়ে গিয়েছিল। বুঝতে পারেনি, অনেক দূরে সমুদ্রে একটা জলের দেয়াল তৈরি হচ্ছে, যা এসে তাদের ওপর ভেঙে পড়বে। আমরা এখন সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। নির্বুদ্ধিতার এক আকাশছোঁয়া দেয়াল আমাদের ভাসিয়ে নিতে চলেছে।
চকচকে বালির ওপর সুস্বাদু টুকরো ছড়ানো পথটা আমাদের টানছে সমুদ্রের আরও গভীরে। সেখানে দেখা মিলছে জাদুর ধনরত্ন, মণিমুক্তোখচিত ঝিনুক আর গোপন প্রাসাদের। প্রতিশ্রুতি, চিরকালের হানিমুন। কিংবা মানিমুন, যদি টাকার সোহাগই আপনার বেশি পছন্দ হয়। ঝিনুকগুলো কুড়িয়ে নিন। আপনার জন্য তারা কী করতে পারে দেখে তাক লেগে যাক। তাদের বিচ্ছিরি নামটা হলো “কনজিউমার অ্যাপ্লিকেশন”। তারা হতে পারে আপনার মা, প্রেমিক বা প্রেমিকা, থেরাপিস্ট, ডাক্তার। আপনার পছন্দের ঢঙে এক মিনিটে উপন্যাস লিখে দিতে পারে, অনুবাদ করে দিতে পারে যে ভাষা চান সেই ভাষায়। আপনার সিনেমা সম্পাদনা করতে পারে, সুর বাঁধতে পারে, গবেষণা করতে পারে, আইনি নথির খসড়া বানাতে পারে। চিকিৎসায় তারা যা করতে পারে, তাকে অলৌকিক বললেও কম বলা হয়। (তাতে কলেরা, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, কিংবা স্রেফ ক্ষুধা আর দারিদ্র্যে গরিবের মরে যাওয়া বন্ধ হবে না।) ফোনের ভেতর দিয়ে তাৎক্ষণিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা আর গণতন্ত্র পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও আছে। আপনার ঝোঁক যদি উল্টো দিকে হয়, আপনার নাৎসি স্যালুট আরও নিখুঁত করে দেবে, হাতে তুলে দেবে একখানা মানসিক চেন-করাত। ভালো না বেসে উপায় কী? এ প্রলোভন ঠেকাবেন কী করে? আর ঠেকাবেনই বা কেন?
এআই আর কর্তৃত্ববাদ নিয়ে এত কথার পরও কি এ সত্যি নয় যে, আমাদের সেরা, সবচেয়ে প্রিয় কয়েকজন ফ্যাসিবাদবিরোধী ইউটিউবার আর অক্লান্ত আন্দোলনকর্মী, অন্তত ভারতে তো বটেই, এআইয়ের একনিষ্ঠ সমর্থক? সব মিলিয়ে তাঁদের সাবস্ক্রাইবার কয়েক কোটি। কিংবা মোদি সরকারের বিরুদ্ধে জেন-জির ‘ককরোচ’ বিদ্রোহ, যা শুকনো মাটিতে বৃষ্টির মতো আমাদের ওপর এসে পড়েছিল, তা কি সবচেয়ে আনন্দদায়ক, কাউকে রেয়াত না করা এআই ভিডিওগুলোর হাত ধরে আসেনি?
এসেছে।
কিন্তু বিপদের হিসাবে যখন সত্যিকারের হুমকি ধরা পড়বে, ওই জানালা এক মুহূর্তে সজোরে বন্ধ করে দেওয়া যাবে। আমি যখন লিখছি, দিল্লির ককরোচ বিক্ষোভের যাকে ‘সিজন ২’ বলা হচ্ছে, তা চলছে। আমার পাড়ায় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাশ্মীর আর মণিপুরের মতো অঞ্চলে অন্য বিক্ষোভের সময় ভারত সরকার মাসের পর মাস ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছিল।
*
সাইক্লোপিস তার রক্তহীন দুই হাতে তুলে ধরেছে এখনো শিশুবয়সে থাকা যন্ত্রদেবতাকে। আমাদের ডাকছে তাঁর সামনে মাথা নোয়াতে। তাঁকে বিশ্বাস করো, তোমার সর্বস্ব তাঁকে দাও। বিনিময়ে তিনি দেবেন তাঁর চোখধাঁধানো ভেলকি।
উপনিবেশ সব সময় চকচকে উপহার নিয়েই আসে। কিন্তু এআই এমন এক ধরনের উপনিবেশ স্থাপন, যার কল্পনাও আমাদের খুব কমজনের পক্ষে সম্ভব। এ পুঁজিবাদের শেষ গন্তব্য।
যে কথাটা চুপিচুপি বলার কথা, সেটা জোরে বলতে সাইক্লোপিসের কখনো লজ্জা হয় না।
আবার শুনুন প্যালান্টিয়ারের চেয়ারম্যান পিটার থিলকে: “শুরুর প্রতিষ্ঠাকালীন স্বপ্নটা ছিল, প্রযুক্তি দিয়ে আমরা গোটা দুনিয়া বদলে দেব, বিশ্বের মুদ্রাব্যবস্থা উল্টে দেব… আমরা কখনো নির্বাচনে জিততে পারব না… কারণ আমরা এতই ছোট এক সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। কিন্তু হয়তো একতরফাভাবেই পৃথিবীটা বদলে দেওয়া যায়। সারাক্ষণ মানুষকে বোঝানো, অনুনয় করা, মিনতি করা লাগবে না, যারা এমনিতেই কখনো আপনার সঙ্গে একমত হবে না।”
আর এই কথাগুলো ইসরায়েলি প্রযুক্তি কোম্পানি কেটো নেটওয়ার্কসের সিইও শ্লোমো ক্রেমারের: “প্রথম সংশোধনীকে রক্ষা করার জন্যই এবার তাকে সীমিত করার সময় এসেছে… প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সব সামাজিক প্ল্যাটফর্ম। অনলাইনে যে-ই নিজের মত প্রকাশ করে, সে কতটা আসল, সেই অনুযায়ী সবাইকে ওপর-নিচে ক্রম সাজাতে হবে। তারপর সেই ক্রমের ভিত্তিতে তারা কী বলছে, তার নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে।”
এই অধিকারবোধ, এই সম্পদ, এই ক্ষমতা, এই স্পর্ধা, ঈশ্বর তাঁদের হাতে তুলে দেননি। আমাদের কাছ থেকে তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এআইয়ের জয় হবে মানুষসত্তার বিরুদ্ধে এক অপরাধ। আমাদের মস্তিষ্ক সে ফর্মালডিহাইডে ডুবিয়ে বোতলবন্দি করবে। আমাদের চেনা পৃথিবীটাকে ধ্বংস করবে। যে পুরুষেরা তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তার থেকে মুনাফা করছেন, তাঁরা এ কথা জানেন। আর অন্য এক জগতে সরে পড়ার ব্যবস্থাও ইতিমধ্যে সেরে রেখেছেন
৩.
নিজের যন্ত্রদেবতাকে প্রশিক্ষণ দিতে সাইক্লোপিসের চাই মানবসভ্যতার এযাবৎ সমস্ত অর্জন উজাড় করে তুলে এনে মজুত করা। হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষের সম্মিলিত শ্রমের ফল, পুঞ্জীভূত সব অর্জন সে একসঙ্গে কোম্পানির সম্পত্তিতে বদলে ফেলতে চায়। সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, গণিত, দাবা, গবেষণা, সবকিছু। এই জ্ঞান নিজের ভাণ্ডারে পুরে সে ঠিক করবে কীভাবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, ছেঁটেকেটে ‘শুদ্ধ’ করা যায়, তার গায়ে রাজনীতির রং চড়ানো যায়। ঠিক করবে, কে সেই জ্ঞানের নাগাল পাবে, কে পাবে না। আর কত দামে পাবে? একে বলা যাক মানুষের সমস্ত সাধনার ইতিহাসের বেসরকারীকরণ ও করপোরেটকরণ। খোদ সভ্যতারই। আপনাকে শুধু নিজের আত্মাকে ডিজিটাল করে ডেটায় বদলে ফেলার অনুমতি দিতে হবে। আপনার যেটুকু অবশিষ্ট থাকবে, তা মানুষের থকথকে পাঁক আর তরল কাদা। শিল্পবর্জ্য।
আবার স্যাম অল্টম্যানের কথা শুনুন: “আমরা এমন এক ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি, যেখানে বুদ্ধিমত্তা হবে বিদ্যুৎ বা জলের মতো একটি পরিষেবা, আর মানুষ মিটার ধরে আমাদের কাছ থেকে তা কিনবে।”
কিন্তু বেচার মতো করে ওটা আদৌ কি তাদের নিজের জিনিস?
যে কয়েক লক্ষ লেখকের বই অনুমতি ছাড়াই নিজেদের বৃহৎ ভাষা মডেল বা এলএলএমকে প্রশিক্ষণ দিতে ব্যবহার করেছে অ্যানথ্রপিক, আমি তাঁদেরই একজন। একটি সম্মিলিত মামলার জেরে আমাকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। মামলা মিটিয়ে নিতে বইপিছু হাজার দুয়েক ডলার ছুড়ে দেওয়ার প্রস্তাব। এই বইগুলোর পেছনে আছে আমার সারা জীবনের বেঁচে থাকা, কয়েক বছরের লেখার শ্রম। নোটিশে বলা হয়েছে, পাইরেটেড পিডিএফ রাখা হয় এমন দুটি ওয়েবসাইট থেকে কোম্পানিটি বইগুলো ডাউনলোড করেছে, তবে “কোনো অন্যায় করেছে বলে অ্যানথ্রপিক স্বীকার করে না।” আমাকে একটি ক্লেম নম্বর আর একটি পিন কোড দেওয়া হয়েছে। যেন আমার অজান্তে আমার শরীর থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হয়েছে। যন্ত্রটিকে এখন আমার লেখা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে গেছে। আমার ভয় হয়, খুব শিগগিরই যখন আমি আমার মতো করে লিখব, যে ভাষাকে একান্ত নিজের করে তুলতে কয়েক দশক ধরে খেটেছি, সেই ভাষায় লিখব, তখন আমাকে বলা হবে, এ তো আপনার লেখা বলে মনে হচ্ছে না। এ তো আসলে এআই। বাকি জীবনটা আমি কী করব? নিজের লেখার ধরনটাকেই পাশ কাটিয়ে চলব? নতুন কোনো ভাষা খুঁজব? একে আমরা কী বলব? হৃদয়-খনন? মস্তিষ্ক-খনন? জীবন-খনন?
ছুরির ফলার মতো ধারালো, তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণসমৃদ্ধ বই এম্পায়ার অব এআই-তে ক্যারেন হাও লিখেছেন জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের চলতে থাকা সর্বগ্রাসী লুঠের কথা। লিখেছেন, কীভাবে দরিদ্র দেশগুলোর শ্রমিকদের পেট না-ভরার মতো মজুরিতে ‘ডেটা সংগ্রাহক’ হতে বাধ্য করা হচ্ছে, যাতে সাইক্লোপিসের স্বপ্নগুলো ভেসে থাকতে পারে। তার কোম্পানিগুলো আর ১০০ বিলিয়ন ডলারের সুপারকম্পিউটারগুলোর বিপুল শক্তিক্ষুধা মেটানোর মতো জল বা বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই সাইক্লোপিস বেসরকারি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ার এবং নিরাপত্তাবিধি শিথিল করার দাবিতে জোরদার তদবির করছে। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবেও ফিউশন শক্তির অফুরন্ত উৎস তৈরি করতে ঢালা হচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার, যাতে ডেটা সেন্টারগুলোকে মহাকাশে কিংবা চাঁদে সরিয়ে নেওয়া যায়।
এদিকে আমাদের এই আদরের, জরাজীর্ণ বুড়ো পৃথিবীতে ভারত সরকার আরও শক্তিখেকো ডেটা সেন্টার গড়ার জন্য দুহাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসেছে। শুধু বিশাখাপত্তনমেই ছয়টি, যার মধ্যে আছে গুগলের ১৫ বিলিয়ন ডলারের একটি কেন্দ্র। কার্যত কোনো পরিবেশগত নজরদারি ছাড়াই এগুলোকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে, যেন এরা স্রেফ কিছু বাড়িঘর, গুদাম। ভারত আর আমেরিকার মধ্যে এ এক পুরোনো রেওয়াজ: তোমাদের আবর্জনা আমাদের দাও, বিষ ছড়ানো শিল্প আমাদের দাও, তোমাদের বিষের পেয়ালা আমাদের হাতে তুলে দাও। আমরা যত্ন করে আগলে রাখব। আর আমেরিকার মতো ভারতেও আন্দোলনকারীরা নিজেদের শরীরকে বাজি রেখে রুখে দাঁড়াচ্ছেন, যাতে প্রস্তাবিত এই ‘গুদাম’গুলোর আশপাশে বসবাসকারী কয়েক দশ হাজার মানুষের জল আর বাতাসে বিষ না মেশে।
আমেরিকায় ডেটা সেন্টারবিরোধী আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে সেই নির্মাণশ্রমিকদের, যাঁরা এই বিশাল স্থাপনাগুলো তৈরির কাজ পেয়েছেন। স্থানীয় মানুষের হয়ে লড়তে নামা আন্দোলনকারীদের দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিদেশি টাকায় পুষ্ট দেশদ্রোহী, সন্ত্রাসবাদী কিংবা বামপন্থী উগ্রবাদী বলে। বলা হচ্ছে, দেশপ্রেমিক মার্কিন কোম্পানিতে চাকরি করা ভদ্র, পরিশ্রমী আমেরিকানদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে এরা। মানুষকে এভাবে মানুষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার চাল এত পুরোনো যে ভরদুপুরে পড়ে থাকা লাশের মতো তার গন্ধ ছাড়ছে। ভারতের দক্ষিণের রাজ্য কেরল, যেখান থেকে আমি এসেছি, সেখানে এই খেলা দেখতে দেখতেই শিখেছি, সবকিছুকে কেবল ‘বাম’ আর ‘ডান’-এর মেরুকরণকারী চশমা দিয়ে দেখা সব সময় কাজে দেয় না।
একটা ছোট্ট গল্প বলি। দেশকালের হিসাবে বেশ দূরের, কিন্তু আজও তার কাছ থেকে শেখার আছে।
১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে কেরলের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতায় এসে গোড়াতেই যে কাজগুলো করেছিল, তার একটি ছিল একটি বড় করপোরেশনকে রেয়ন কারখানা গড়তে ডেকে আনা। রাজ্যের উত্তরে, কালিকট শহর থেকে উজানে, চালিয়ার নদীর তীরে। শিল্পপতি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কারখানায় ৩,০০০ চাকরি হবে। বিনিময়ে কাঁচামাল, বিদ্যুৎ আর জলে সরকারি ভর্তুকি চেয়েছিলেন। কাছের বন থেকে তাঁকে বাঁশ দেওয়া হয়েছিল টনপ্রতি এক রুপিতে। অথচ বাঁশের কাজ করে যাঁদের পেট চলত, যাঁদের বেশির ভাগই আদিবাসী, তাঁদের একটিমাত্র বাঁশ কিনতেই দিতে হতো এক রুপি।
উৎপাদন শুরু হলে কারখানাটি এক দিনে গোটা কালিকট শহরের চেয়েও বেশি জল টেনে নিতে লাগল। তারপর বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি ফেলে দিতে লাগল সেই নদীতেই। ভাটিতে শহরের জল দূষিত হলো। মাছ মরে গেল। হাজার হাজার জেলে জীবিকা হারালেন। হাতের কাছে যত বাঁশ ছিল, সব ফুরিয়ে গেলে শুরু হলো ইউক্যালিপটাসের ব্যবহার। একরের পর একর ঘন প্রাচীন বন সাফ করে শুধু ইউক্যালিপটাসের বাগান করা হলো। হাজার হাজার বনবাসী, বাঁশ ও বেতের কারিগর জীবিকা হারালেন। কিন্তু কারখানার ৩,০০০ শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে ফেললেন, তাঁদের অবস্থার উন্নতি হতে লাগল।
যত দিন না ধীরে ধীরে কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে ক্যানসার আর শ্বাসযন্ত্রের রোগ ছড়াতে শুরু করল। ক্ষতিপূরণের দাবিতে তাঁরা ধর্মঘটে গেলেন। শিল্পপতি একটি ক্যানসার হাসপাতাল বানিয়ে দিলেন। বেসরকারি। লড়াকু কারখানা-শ্রমিকেরা বেতন বৃদ্ধি আর অন্যান্য সুবিধার দাবিতে ধর্নায় বসলেন, তালা ঝোলালেন। নিজেদের জন্য ধাপে ধাপে ছোটখাটো কিছু জয় আদায় করে আবার কাজে ফিরলেন।
কয়েক বছর পর ইউক্যালিপটাসের বাগানও উধাও। কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। ইউনিয়নের সুরক্ষায় ভালো চাকরি পাওয়া শ্রমিকেরা কারখানা খোলার দাবিতে অনশনে বসলেন। কারখানা আর খোলেনি।
গোটা পৃথিবীর ‘ডেটা সংগ্রাহক’ শ্রমিকবাহিনীর সামনেও এ এক উভয়সংকট। প্রায় অস্তিত্বেরই সংকট।
বিপুল জনসংখ্যার ভারত সাইক্লোপিসের অতৃপ্ত ক্ষুধার সামনে ডেটার এক মহাভোজ। প্রত্যন্ত গ্রাম আর ছোট শহরগুলোয় থাকা দরিদ্রতম মানুষদের বাধ্য করা হচ্ছে খনন করে তোলা যায় এমন প্রতিটি কল্পনাযোগ্য তথ্য জোগান দিতে। নির্মাণস্থলে আর কারখানায় শ্রমিকদের মাথায় ক্যামেরা বেঁধে কাজ করতে হচ্ছে, যাতে এআই তাঁদের চলাফেরা, হাত-পা নাড়ানোর ভঙ্গি গিলে নিয়ে সেই রোবটগুলোকে প্রশিক্ষণ দিতে পারে, যেগুলো খুব শিগগিরই তাঁদের জায়গা নেবে। শ্রমিকেরা জানেন, তাঁরা নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়ছেন। কিন্তু না বলার উপায় নেই, তাঁদের জায়গা নিতে অগুনতি মানুষ অপেক্ষা করছেন। তাঁদের কাজগুলো চলে গেলে পৃথিবী কী করবে এই লক্ষ লক্ষ ‘উদ্বৃত্ত মানুষ’কে নিয়ে? পৃথিবীর সীমিত সম্পদ ভোগ করে অথচ সমাজে কোনো অবদান রাখে না বলে যাঁদের চিহ্নিত করা হয়, ফ্যাসিবাদীরা তাঁদের এই নামেই ডাকে। এ নিয়ে ফ্যাসিবাদীদের নিজস্ব গণহত্যামুখী ভাবনাচিন্তা বহু দিনের।
সাইক্লোপিস, কিংবা গিল দুরান তাঁর একই নামের বইয়ে যাকে বলেছেন নার্ড রাইখ, মাঝে মাঝে আরেকটি পথ নিয়েও একটু প্রেম-প্রেম খেলা খেলেছে। সর্বজনীন মৌলিক আয়, সংক্ষেপে ইউবিআইয়ের ধারণাটি নিয়ে তার আজ ভাব, কাল আড়ি। অন্যের টাকায়। নিজের টাকায় নয়। কী দারুণ কুল, কী বিপুল পুঁজিবাদবিরোধিতা! মাসে মাসে ইউবিআইয়ের টাকা পেয়ে নিজেই বরং বছর দুয়েক চালিয়ে দেখুক। ‘চরম নির্মমতায় নিয়ন্ত্রণ করো’ কর্মসূচির প্রথম ধাপ হয়তো সেটাই হওয়া উচিত।
কথাটা নথিতে থাক: সম্পদ আরও সমানভাবে বণ্টন করা হলে পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ আজই, এই মুহূর্তেই সর্বজনীন মৌলিক আয় পেতে পারেন। তার জন্য গ্রহটাকে ধ্বংস করার দরকার নেই। আর হ্যাঁ, এই ইউবিআই বিলি করবে কে? কে ঠিক করবে, কার পাওয়ার যোগ্যতা আছে, কার নেই? এমনি জিজ্ঞেস করছি। হয়তো কমরেড শ্লোমো ক্রেমারের ভাবনাটাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে, মানুষকে তাদের বর্ণ, জাতপাত, ধর্ম, লিঙ্গ, রাজনৈতিক মত আর আনুগত্যের মাত্রা অনুযায়ী ওপর-নিচে সাজিয়ে র্যাঙ্ক দেওয়া যেতে পারে?
কিংবা ভারত সরকার হয়তো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। সম্প্রতি দেশের ভোটার তালিকার যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন তারা করেছে, তাতে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। জনসংখ্যার প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ। বেশ বড়সড় একটা টুকরো। সভ্য পদ্ধতিতে মানুষ ছাঁটাই। ইউবিআই পাওয়ার যোগ্যতা তাঁদের থাকবে না, কোনো অধিকারই থাকবে না। আসামের মতো রাজ্যে তাঁদের কেউ কেউ নির্মাণশ্রমিকের কাজ করছেন সেই বিশাল আটককেন্দ্রগুলো গড়তে, যেখানে তাঁদেরই মতো মানুষদের রাখা হবে। সরকার তার জনগণকে নির্বাচিত করে। সাইক্লোপিস সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে। বেশ ঝকঝকে ব্যবস্থা।
এরপর আছে সদিচ্ছায় ভরা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী সংস্করণটি। বার্নি স্যান্ডার্স চান, জনসাধারণ, অন্তত উত্তর আমেরিকার জনসাধারণ, এআই কোম্পানিগুলোর সরাসরি মালিকানা পান। তাঁর প্রস্তাব, সবচেয়ে বড় এআই কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ওপর এককালীন ৫০ শতাংশ কর বসিয়ে স্বাধীন তত্ত্বাবধানে একটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ তহবিল গড়া হোক। এই তহবিলের মূল্য নাকি হবে প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। সেখান থেকে প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলার সরাসরি মার্কিন নাগরিকদের দেওয়া হবে, পাশাপাশি খরচ করা হবে স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও শিক্ষার কর্মসূচিতে। (আবারও বলি, ওই ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার তো এখনই আছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছাটুকু নেই। বদলাবে কী?) কিন্তু এই গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী ব্যবস্থাতেও ডেটা শুষে নেওয়া হবে দক্ষিণ থেকেই, ভারত, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে। আর মুনাফা থেকে যাবে উত্তরে।
অবশ্যই ডেটার দাম কোম্পানিগুলোর দেওয়া উচিত। কিন্তু আমরা কি এর মধ্যেই এই জায়গায় এসে ঠেকেছি? প্রলয়ের শেয়ার হাতে পাওয়াই কি এখন আমাদের একমাত্র বিকল্প?
*
এআই মানুষের জন্য কী করতে পারে আর কী পারে না, তা নিয়ে এত আলোচনা। অথচ এআই মানুষের কী হাল করছে, তা নিয়ে কথা বড্ড কম। গবেষণায় এআই ব্যবহারের সঙ্গে মানুষের চিন্তা ও বোঝার ক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত বাড়বে, মানুষের বুদ্ধিমত্তা যেন সেই অনুপাতে তলিয়ে যাওয়ার মুখে। হয়তো অব্যবহারে আমাদের মস্তিষ্ক শুকিয়ে যাবে, মাথা ছোট হয়ে আসবে, আর আঙুলগুলো বদলে যাবে ঢেউ খেলানো প্রম্পট-শুঁড়ে।
আমরা যারা অন্য এক ধরনের পৃথিবীতে জীবন কাটিয়ে এসেছি, তারা জানি কী হারাচ্ছি। কিন্তু যে প্রজন্ম এখন প্রাপ্তবয়স্ক হতে চলেছে, তাদের কী হবে? তাদের কি নিজস্ব ভাষা থাকবে, নিজস্ব ভাবনা থাকবে, নিজস্ব শোক থাকবে? তাদের কি চেষ্টা করার অধিকার থাকবে? হোঁচট খাওয়ার? ব্যর্থ হওয়ার? অসম্পূর্ণ হওয়ার? গণিতের একটি সমীকরণ সমাধান করার, কিংবা নিজের শিল্প, সাহিত্য, সংগীত সৃষ্টি করার অসহ্য যন্ত্রণা আর উন্মাতাল আনন্দ কি তারা অনুভব করবে? সেই সৃষ্টি যতই খুঁতেভরা হোক?
এআইয়ের জয় হবে মানুষসত্তার বিরুদ্ধে এক অপরাধ। আমাদের মস্তিষ্ক সে ফর্মালডিহাইডে ডুবিয়ে বোতলবন্দি করবে। আমাদের চেনা পৃথিবীটাকে ধ্বংস করবে। যে পুরুষেরা তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তার থেকে মুনাফা করছেন, তাঁরা এ কথা জানেন। আর অন্য এক জগতে সরে পড়ার ব্যবস্থাও ইতিমধ্যে সেরে রেখেছেন।
এই ধনকুবের ক্ষমতাধরেরা সগর্বে, জোর গলায় যুদ্ধের পক্ষ দুটো ঘোষণা করে দিচ্ছেন: আমরা বনাম তারা। তাঁদের এতটুকু কুণ্ঠা নেই বলতে, সাইক্লোপিসকে ফুলেফেঁপে উঠতে হলে মানবজাতিকে হয়তো মরতে হবে। যে তরুণ প্রজন্ম এর বিরুদ্ধে লড়তে উঠে দাঁড়াচ্ছে, তারা কথাটা বোঝে। জানি, এই প্রবন্ধের আগের দিকে আমি বলেছিলাম, আমাদের উচিত ‘চরম নির্মমতায় নিয়ন্ত্রণ করা’। কিন্তু ওই এআই কোম্পানিগুলো সম্পর্কে আমি আসলে যা বলতে চাই, তা হলো: চরম নির্মমতায় খতম করো।
এই প্রবন্ধের একাংশ ১৯ অক্টোবর নিউইয়র্ক শহরে দ্য পিপলস এআই অ্যাসেম্বলিতে বক্তৃতা হিসেবে পেশ করা হবে।












































































































