২৪ অক্টোবর ২০২৬
পৃথিবীর সব শালগম বোধহয় গোপন আদরে বাড়ে
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য

কবিতাগুচ্ছ

পৃথিবীর সব শালগম বোধহয় গোপন আদরে বাড়ে

রামীর সঙ্গে

সপ্তাহের শেষদিন। আহ্, কাল ছুটি–

রামী, রাতে দেহের মরিচা সব তোমার শিরিষে ঘষে তুলে নেব। তারপর, ঘুম আর ঘুম। গহন মিস্টিসিজম? হুজ্জতির পর, ঘুম থেকে উঠে, সকালে, কুণ্ঠিত আঙুল গলিয়ে সেদ্ধ ডিম খাব বাধ্যতামূলক। নাস্তা খাব। গাছের পেয়ারা খাব– নিজস্বতার অহং, জিভে, লেগে থাকা ভাল। স্যান্ডেল গলিয়ে তোমার পেছন পেছন হাঁটব। প্রচুর নিরীক্ষা শেষে আমাদের কিছু পদ্ধতি হয়েছে। বারান্দার গ্রিল ধরে তোমাকে শোনাবো কয়েকটি মাছভাজা ক্রিয়াপদ। চোখে-চোখে দেখে নেব হাসির হরিণ। আর ঢুকে যাব গভীর সুন্দরবনে। বের হয়ে, দুধ-কফিতে চুমুক দিতে দিতে তোমার ভারিক্কি কুড়াবো দৃশ্যের হাতে। তাড়া খাব। তারপর হাটে যাব। আমার পছন্দ মাছ। তোমার মাংস। লিস্টিমত সব। আজ শালগম দেখে চমকে উঠেছি। পৃথিবীর সব শালগম বোধহয় গোপন আদরে বাড়ে–

রামী, ধুঁয়ে দাও আমার বস্ত্রসকল।

 

জানালায়, দাঁড়িয়ে…

যতিচিহ্নের ভেতর পড়ে-পড়ে খাবি খাচ্ছে অসংখ্য শব্দেরা। আমাকে বলতে দাও। চোখের ভেতর থেকে উড়ে যাওয়া কথার আরোগ্য বসে আছে নিখিল শিশিরে। বাকদগ্ধ বাতাসের হাতেরা ছুঁয়েছে আমার মৌচণ্ডা ফুল। রূপক আঙুলগুলাে ঝাড়ু দিচ্ছে জ্যোৎস্নার পতঙ্গ– হায় মেঘ, সাদা-সাদা মোরগ তাড়িয়ে কোথায় চলেছ! ঝরে পড়ো তাগড়া কামুকদের আঙিনায়। আকাশের ওইপারে, বেশ্যাপাড়ার দোকানি খয়ের মাখছে পানে– ঠোঁটের দু-পাশ সাদা– ভিটামিন সি, সবুজ চলে গেছে পেয়ারা মেঘের দেশে! কার কৈফিয়ৎ উড়ে-উড়ে ফিরে আসে নাই-ডানার আতর মেখে? অন্তর্লীনে ঝরে নীরব আকাশগঙ্গা, নিভৃত রুমাল? তন্দ্রাবিমুখ তারাসমূহ কথা বলছে আমার সাথে! সৌরশিশির, তোমার ছইয়ের নিচে নিঃশব্দের শব্দ বাজিয়ে দৃশ্যের কুয়াশা ধরছি– জীবন, বিদ্বান হয়ে ওঠো, জাদুময় আকাশের তলে সেতু খুলে বসে আছি– কে বসেছে নীলদীঘির বুদ্ধির পাড়ে! যা কিছু আড়াল তারাই আসল দরবেশ– মানুষ, পার্থিব মায়াদের মওসুম, ভবঘুরে! এইক্ষণে, বিষাদের বায়োগ্রাফি লিখি– একার নার্সারি, পাতায়-পাতায়, পুষ্পে-পুষ্পে, বড় হতে থাকে…

 

রাত্রির আকাশ

একটি ধারণা জন্ম হলে ঘিলুর নির্যাস ঢেলে দেই। ঠুলির পাতিলে সিদ্ধ করি। উলট-পালট বুল্কি খাই। আকাশগঙ্গায় বিস্ময় ছিটিয়ে দেই। দৃষ্টির বোটায় লেগে যায় সমস্ত আকাশ। রাত্রির আকাশে রাত্রির কুকুর থাকে। কুকুরেরা সেদ্ধ-হাড় চাটে। লালার তোয়াজ ঝরিয়ে, গড়িয়ে পড়া রস খায়। তারাদের রোদে শুকনো হাড় ও রস শুকিয়ে পড়লে, তার পাশে ঘাড়মুড়ে শুয়ে থাকে। কুইকুই করে। কেউ শুনুক বা না-শুনুক তার শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে। শোনা আর না-শোনা, দুটোই, বোধের ইন্ধন। বোধ-হওয়া, একটি উচ্চমানের সম্প্রসারণবাদ। নিমগ্ন-বিস্কুট হাতে দাঁড়িয়েছি। কুকুরকে খাওয়াবো। অসীমের কুকুর এগুলো। বিস্কুট দেখলে কুকুরের কুইকুই করা বেশ লাগে। এটাও সম্প্রসারণবাদ। আমি অসীমকে ভালোবাসি। আমার ছাগলছানারা ছুটোছুটি করছে। ক্লান্ত হয়ে ওরা একটু বসলো তারাদের নূর ঘেষে। তারাদের কি যে গোস্বা! মনে হয় নামাজের অজু আছে। ফুলকি ছোটাচ্ছে বেশ। ভয় পেয়ে ভ্যা-ভ্যা করে বেচারা ছাগলছানারা দৌড়াচ্ছে আর হাঁপাচ্ছে এখনও। অসীম হাসতে হাসতে, আঙুল তাক করে, কুকুরগুলোকে ধর ধর করে লেলিয়ে, নিজেই কুকুরের বিস্কুট চিবাচ্ছে। আমি বিহ্বলিত হয়ে পড়লাম। দেখছি ক্রমশ জমে উঠছে দেখার নেশা। হঠাৎ হাতের তালু চুলকে উঠলো। কী খবর হবে? জ্যোতিষশাস্ত্র সময়-চশমা লাগিয়ে, নড়চড়ে, পরিণতি বলবে আমার ছাগলের? তালু চুলকাতে চুলকাতে দেখি অসীম আমার হাতে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম– দোস্ত, তুই অধমের হাতে ক্যান? সে বললো– দোস্ত, অসীমই অসীমের সঠিক ধারণা। হাত দ্যাখ, দেহ দ্যাখ, সব রেখাই পরিসমাপ্তিহীন। আমি চললাম– বলেই, অসীম লাফিয়ে পড়লো আমার হাত থেকে, রাত্রির আকাশে। আমি রয়ে গেলাম থালার মানচিত্রে। চুপচাপ কুকুরগুলো দেখছি। গতি বাড়ছে তো বাড়ছেই। কিন্ত ছাগলছানারা কোথায় এখন? আমি কি সত্যিই থালার ভেতর? চিন্তাটা জটিল। কারণ, আমার মাথার মগজ ফেটে চুইয়ে পড়ছে দিগন্তের নীল-ঘিলু…

 

সেতু ছুঁড়ে দিচ্ছি তোমার চোখের দিকে

তোমার ওখানে যে অন্ধকার সেখানেই আমি থাকি। আমার কপালে তোমার আঙুল রাখো। আমরা কি সেতুর আত্মার নির্জন অতল হতে পারি? প্রশ্নটি জলজ– যেন, কুয়াশা ধূমল পাহাড়ের ওপাশে ঝরছে জল। স্নানঘরে, অনেক মর্মরধ্বনি তুমি কি ফেরত পেয়েছ কখনও? ফলেরা নিঃশব্দ, শুধু বীজমন্ত্রে উচ্চকিত ভাষার ভেতর সে ঝুলছে, এবং, হাওয়ার তীর্থের গূঢ়তা আমরা কি কখনও জেনেছি! দ্যাখো, চাঁদ অপূর্ণাঙ্গ আজ– সময় তাকিয়ে রয়েছে ঘড়ির দেহশূন্য পিপাসার দিকে। পরিপূর্ণ এক চৈতন্যের জন্যই কি দেহের কোথাও লুকিয়ে রাখছি চাঁদ! নীল কাতরতার তলে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে, মুখর সমুদ্রগুলি শুধুই কি জল-জ্যামিতির নুন-শিরা আঁকে! অনুভব করো, আমাদের শরীরের মধ্যে লুটোপুটি করছে অসংখ্য শিশু– এই দিনরাত্রি, ভাতসেদ্ধ উনুনের তলে, যে অন্ধকার আমরা কখনও দেখতে পাইনি, অনেক ইতস্ততার মেঘ আমরা গোপন করছি সজ্ঞানে, আফসোস, অনেক রসালো লাল তরমুজ আমরা খাইনি স্বেচ্ছায়, অনেক আইসক্রিম গলতে দিয়েছি অবহেলায় আর খুন করে যাচ্ছি শিশুদের দৌড়ভাগ্য। আহা, দিন, কোন্ পাখি ঠুকরে-ঠুকরে খাচ্ছে। এই দেহবাঘ জাগিয়ে রেখেছি অস্পর্শ খাঁচায়। সখা, তাঁকে মুক্ত করো। আমাদের অন্ধকার এক টুকরো আলোর মধ্যে লাফিয়ে উঠুক আমাদের লেবুতলার জোনাকি বাগানে… সেতু ছুঁড়ে দিচ্ছি তোমার চোখের দিকে…

 

নীলজ্বর

ঘুমুতে যাবার পরই প্রকৃতপক্ষে আমি জেগে উঠি। অনন্ত চাঁদের নিচে বয়ে চলে ডিপ্রেশন– নীলজ্বর— সাদাকাঁথা আর চামচিকাদের ঢেউ। কোনো মানে নেই, যদি তাঁতঘরে তোমার আঙুল দেখতে পেতাম! ব্যর্থতা বিষয়ে একটা মোচুটে থ্রিলার লিখছে কেউ– যেন ঘামগুলো শামুকের মতো হেঁটে যাচ্ছে। ভেজা রাস্তা– অসম্ভব এক টিলাস্কেচ জেগে উঠতে-উঠতে ধ্বস করে বসে পড়লো সামনে। ঘুমের চশমা তাকিয়ে দেখছে কালো রামধনুর গলুই। আকাশ উড়ছে সমুদ্রের দিকে। ঘুম– দূরগামী পাতালের মতো অন্ধকারের ব্যায়াম করতে-করতে তলিয়ে পড়ছে। কোথায় স্পন্দনগুলো টোকা দেয়? ঘাসফুলে ফুটে ওঠে শিশিরের ফুল? মাধবীর মতো শীত-বেলুন উড়ছে। কেউ নেই–ঝাঁক-ঝাঁক এম্বুলেন্সের কাতর আর তীব্র কুচকাওয়াজ ট্রেনিং করছে চারপাশে। কি শিখব আমি! খুলে ফেলো ওই লাল-নীল বক্ষবন্ধনীর শব্দ। দুধ ফেটে বরফের সাইরেন বেরিয়ে পড়ছে। সাইবেরিয়া কতটা দূরে? কাঁচা চর্বি দাও। কি অসাধারণ অসম্ভব মাথা ঠুকছে মাথায়…

সময়ের সন্তানেরা
সময়ের সন্তানেরা-২
After-Article Banner 2
After-Article Banner 2 mob

1 Comment. Leave new

  • মুকুট মেহেদী
    24 October 2026 8:59 pm

    রশীদ হারুন, আমার ছোট্ট শহরে এক নির্জন নিভৃতের কবি। কালো কালো অক্ষরের রঙ আর চিত্রে কবিতার ঘ্রাণ।

    Reply

মন্তব্য লিখুন

ধন্যবাদ। নাম ও মতামত লিখুন। পর্যালোচনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মন্তব্যটি প্রকাশিত হবে।

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত