৫ নভেম্বর ২০২৬
শেখ মদন বাউলের খোঁজে
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
মোস্তাক আহমাদ দীন
কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক
16

মোস্তাক আহমাদ দীন
কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক

16

শেখ মদন বাউলের খোঁজে

প্রচলিত শাস্ত্রের সঙ্গে বাউল-ফকিরদের মত-পথগত বিরোধের বিষয়টি বহুদিন ধরেই চলে আসছে, গবেষণা-সূত্রে এই বিরোধের কারণও এখন আর কারও কাছে অস্পষ্ট  নয়। বাউল-ফকিরেরা নির্দ্বিধায় বলে যে, যে-‘শাস্তর মানুষ তৈরি করেছে, আমরা সেই শাস্তর না-খুঁজে মানুষকে খুঁজি’—এ সেই মানুষ যাকে বেদে বা শরিয়তেও পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় না শালগ্রাম শিলাতেও; না, সে নোড়ায় নেই, মন্দিরে মসজিদেও নেই, সে আছে মানুষে, আর, ‘যে-খোঁজে মানুষে খোদা সেই তো বাউল’। কবীর তো স্পষ্টই বলেছেন: ‘জৌর খুদাই মসজিদ বসতু হৈ ঔর মুলুক কিসকেরা। / তীরথ মুরত রাম নিবাসী দুহুমেঁ কিনহু’ন হেরা ॥’ [মসজিদে যদি খোদার বসতি হয়, তাহলে অন্য জায়গার মালিক কে? আর তীর্থ-মূর্তিতেই যদি রামের অবস্থান হয় তাহলে কেউই তাকে খুঁজে পাবে না]; আর  শাস্ত্রপন্থী মুসলমানেরা গান গাওয়ার জন্য নিন্দা করলে মদন বাউল গাইলেন:

যদি করছ মানা ওগো বন্ধু, মানি এমন সাধ্য নাই
আমার নামাজ আমার পূজা গানে গানে চলছে তাই।
কোনো ফুলের নামাজ রং বাহারে,
কারও গন্ধে নামাজ অন্ধকারে
আবার বীণায় নামাজ তারে-তারে, আমার নামাজ কণ্ঠে গাই॥

বাহ্য আচার বিষয়ে তাঁরা এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছন মহাজনদের গান শুনে, কখনো-কখনো তত্ত্বপুথি শুনে ও পড়ে আর প্রধানত গুরু/মুর্শিদের সহবতের মাধ্যমে। কিন্তু শেখ মদন বাউল শাস্ত্রবিরোধিতার পাশাপাশি সেই গুরু/মুর্শিদকেই যে পথের বাধা হিসেবে দাঁড় করালেন তার কারণ কী?

তোমার পথ ঢাইক্যাছে মন্দিরে মসজেদে।
তোমার ডাক শুনি সাঁই
চলতে না পাই,
রুইখ্যা দাঁড়ায়, গুরুতে মোরশেদে॥

প্রথম পঙ্ক্তি তো ঠিকই আছে, এমনকি মর্মের অনুরোধে দ্বিতীয় পঙ্ক্তির হেঁয়ালি বা দ্বন্দ্বের ব্যাপারটিও না হয় বোঝা গেল, কিন্তু তৃতীয় পঙ্ক্তির বক্তব্য আমাদেরকে শুধু বিব্রতই করে না, প্রচলিত বাউল-ফকিরদের সঙ্গে এককাতারে রেখে বিচার করার ক্ষেত্রে মহা সমস্যায় ফেলে দেয়। এমনিতে মুর্শিদকে নিয়ে বাউল-ফকিরেরা কম রহস্য করেননি; শুধু রহস্যই নয়, স্থানে স্থানে নানা কথা বলে, নানা রকম তথ্য উপস্থাপন করে, গুরু/মুর্শিদ-বরণের চলতি রীতিকে পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ করেন। বাউল কামাল উদ্দিন গেয়েছেন: ‘হিরামন মানিকের দেশে আমার মুর্শিদ আছে’। এই পদের মাধ্যমে শুরু-হওয়া গানটিতে বলা হচ্ছে মুর্শিদের অবস্থান হলো ‘চান্দের বাড়ি’, কখনো বলা হচ্ছে ‘মদিনাপুরী’; কখনো বলা হচ্ছে ‘মুর্শিদ আমার নায়ের মাঝি’ অর্থাৎ দেহনৌকার চালক—বোঝাই যাচ্ছে দেশ এখানে কোনোভাবেই নির্দিষ্ট কোনো স্থান নয়। বাউল শাহ আবদুল করিমের মুর্শিদ ছিলেন ইব্রাহিম মস্তান, কিন্তু তিনি তাঁর একাধিক সাক্ষাৎকারে তাঁর স্ত্রী আফতাবুন্নেছা ওরফে সরলাকে মুর্শিদ বলে পরিচয় দিয়েছেন [তাঁর প্রথম বইয়ের নামও ছিল ‘আফতাব সঙ্গীত’]। যেহেতু তাঁর একজন নির্দিষ্ট মুর্শিদ ছিল, তাঁর বইয়ে মুর্শিদি গানের সংখ্যাও কম নয় এবং এই কথাগুলো মুর্শিদকে সদর্থে মান্য করেই বলেছেন, প্রতিবন্ধ রূপে নয়, তাই এই সকল দৃষ্টান্তকে প্রতীকী মর্মে গণ্য করাই সংগত। ফলে একথা বলাই যায় যে, মদন বাউলের পরে অন্য কোনো বাউল—তাঁর এমন লক্ষযোগ্য দৃষ্টান্ত/বাণী সত্ত্বেও—মুর্শিদকে এভাবে প্রতিবন্ধ রূপে গণ্য করার সাহস দেখাতে পারেননি। তাঁর আগেও কি কেউ এমন সাহস দেখাতে পেরেছিলেন?

সাহস দেখিয়েছিলেন একজন, তিনি বঙ্গভাষী নন, হিন্দিভাষী, নাম মহাবলী, পরিচিত নাম দাদূ; ১৫৫৪ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণকারী এই মহাজন গেয়েছিলেন:

মহম্মদ কিসকে দীনমেঁ জবরাঈল কিস রাহ।
ইন্হকে মরসিদ পীর কো কহিয়ে এক অলাহ॥
য়ে সব কিসকে হ্ রৈ রহে য়হু মেরে মন মাহি।
অলখ ইলাহী জগতগুরু দূজা কোঈ নাঁহি॥

[মুহম্মদ কার ধর্ম পালনকারী, জিবরাইল কোন পথের পথিক
তাদের মুর্শিদ কে ছিলেন বলো হে আল্লাহ, 
ভাবি এরা কোন দলের অনুসারী। 
জগৎগুরু হলেন অদ্বিতীয়, অলখ ঈশ্বর॥]  

গানই এই কথার প্রমাণ দেয় যে, দাদূ ছিলেন দল ও শিষ্য তৈরির বিরোধী, আরও স্পষ্ট করে বললে, সম্প্রদায় ও স্থাপনা গড়ার বিরোধী। এমনিতে একজন অন্যজনের কাছ থেকে অধ্যাত্ম জ্ঞান অর্জন করবে, সহবত (সঙ্গ) নেবে, তাতে কারো আপত্তি নেই। আপত্তি দাদূরও ছিল না, তিনি যার কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন, তিনি হলেন কবীর-শিষ্য কমাল। কবীর-শিষ্যরা কমালকে কেন্দ্র করে একটি সম্প্রদায় গড়ার ইচ্ছা পোষণ করলে তিনি বলেছিলেন: মহাজনেরা মানবসাধনার বরযাত্রা চালনার জন্য আসেন, তাই পৃথিবীতে এসে তারা যদি দেখেন বরযাত্রীরা ঘুমাচ্ছে, তখন সেই ঘুমন্তদেরকে বজ্রাঘাতের মাধ্যমে জাগান এবং তাদের হাতে মন্ত্র বা বাণীরূপ (বজ্রাগ্নির) মশাল দেন। কিন্তু কমালের কথা তারা শোনেনি, কবীরের অন্য দুই শিষ্যকে কেন্দ্র করে সম্প্রদায় তৈরি হয়েছিল। আসলে কমাল বা দাদূ বা মদন বাউল কেউই গুরুবিরোধী নন, কারণ গুরু হলেন পরম/লক্ষ্য বা মঞ্জিলে  পৌঁছার উপলক্ষ্য, কিন্তু সেই উপলক্ষ্য যদি লক্ষ্যে পরিণত হয়, তাহলেই সমস্যা। এই কারণে পরমকে গুরু সম্বোধন করে কবীর স্পষ্টভাবেই বলেছেন: ‘প্যাস আহদ কা পথ হাম লায়া, রামানন্দ চেতায়ে’, এখানে  রামানন্দ গুরু বটে, কিন্তু তিনি চৈতন্যদাত্রীমাত্র; দাদূকে স্মরণ করিয়ে দিতে হয়: ‘অলখ ইলাহী জগতগুরু দূজা কোঈ নাঁহি’, আর মদন বাউলকেও তাঁর গানে গুরু-কৃপা ছাড়া চাঁদের/পরমের দেখা পাওয়া যায় না বলা সত্ত্বেও খেদের সঙ্গে গেয়ে জানাতে হয় সাঁইয়ের ডাক শুনেও চলতে না পারার খবর এবং যেখানে ডুব দিলে অঙ্গ জুড়ানোর কথা, তারই দ্বারা জগৎ পুড়ে যাওয়ার সংবাদ।

এই ভাবে বাণীর ক্ষেত্রে মর্মান্তিক পথ অবলম্বন করায়—বিশেষত পরমকে পেতে গেলে প্রয়োজনে গুরুবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করার কারণেই হয়ত—মদন বাউলের প্রত্যক্ষ শিষ্যপরম্পরার খোঁজ পাওয়া যায় না। সেজন্য তাঁর গানও এখন আর আগের মতো গাওয়া হয় না, এবং একটা সময়ের পর গানগুলো সংগ্রহেরও চেষ্টা করা হয়নি। সেকারণে শেখ মদনের জন্মস্থান পূর্ববঙ্গ থেকে তাঁর কোনো বই তো বেরই হয়নি, এখানে ক্ষিতিমোহন সেন, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন ও আবদুল কাদির ছাড়া আর কেউ তাঁর গান সংগ্রহ করেছেন বলেও জানি না [আর উপেন্দ্রনাথ নিজে যে-গানগুলি সংগ্রহ করেছেন বা সূত্র ছাড়া গ্রহণ করেছেন, সেগুলিকে তিনি মদন বাউলের গান বলতে নারাজ]। বরং তাঁর গুরু ঈশান যুগী, যার বাড়িও ছিল পূর্ববঙ্গ, মদনের তুলনায় কম পরিচিত হলেও, তাঁর অনেক গান নানা সংকলনে দেখা যায়।

মদন বাউলের গান সংগৃহীত না হওয়ার পেছনের গুরুবিরোধী অবস্থানের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য হলো উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মন্তব্য, যিনি তাঁর গানের ভাষাকে ‘আধুনিক-গন্ধী’ বলে উল্লেখ করে সেগুলো শিক্ষিতজনদের দ্বারা পরিমার্জিত-রূপে প্রকাশিত হয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর বাংলার বাউল ও বাউল-গান বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে দুই বাংলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাউল-গানের প্রতি আগ্রহী শিক্ষিত সমাজে কতটা প্রভাবশীল হয়েছে তা সকলেই জানেন। প্রভাবশীল হওয়ার পেছনে গবেষকের গুণপনা নিশ্চয়ই রয়েছে, কিন্তু তাঁর দীর্ঘ ভূমিকার স্থানে-স্থানে রয়েছে নিজের মত ও ব্যাখ্যার প্রতি চণ্ড আত্মবিশ্বাস এবং তাকে নানা দিকে পল্লবিত করার চেষ্টা। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কম, সুধীর চক্রবর্তীর মতো সর্বদিকবিচারী গবেষক অবশ্য অভিযান সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন: ‘উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বা আশুতোষ ভট্টাচার্য কেউই গান জানতেন না। কিন্তু লোকসংস্কৃতির ভিত্তি হচ্ছে সংগীত। তাই আমাদের দেখার চোখটাই ভুল হয়ে গেল।’ তারপরও তাঁর স্থিরনিশ্চিত সিদ্ধান্ত ও মতের শিকার হয়েছেন ক্ষিতিমোহন সেনের মতো সুপণ্ডিত এবং মদন বাউলের মতো মহাজনও। প্রভাবশীল এজন্যেই বলেছি যে, ভবতোষ দত্ত তাঁর কীর্তির্যস্য বইয়ে ‘রবীন্দ্রসহচর পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন’ নামক প্রবন্ধে ক্ষিতিমোহন সেনের স্ব-ভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখা দিয়ে উপেন্দ্রনাথের মতের আলোচনা করলেও তা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নজরে পড়েছে বলে মনে হয় না। পড়লে, রমাকান্ত চক্রবর্তীর ‘পশ্চিমবঙ্গে বাউল-ধর্ম বিষয়ক অধ্যয়নের বিভিন্ন ধারা’ শীর্ষক প্রবন্ধে উপেন্দ্রনাথের লেখার সূত্র ধরে মদন বাউল-বিষয়ক সমস্যাটি এভাবে বিবেচিত হতো না:

যে মদন বাউলের গান উপেন্দ্রনাথের সংকলনে দেখা যায়, অন্তত গানের ভাষায় সুস্পষ্ট অনুসারে তিনি ক্ষিতিমোহন সেন-শাস্ত্রী উল্লিখিত মদন বাউল হতে পারেন না। এই ‘মদন’ বাউল ছিলেন কি না, এ প্রশ্নও করা যেতে পারে।

উপেন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘মদন-এর ভণিতায় কতকগুলি গান পাওয়া গিয়াছে, তাহার মধ্য হইতে আমার এই সংগ্রহে ছয়টি গান লইয়াছি (গান নং ২৯৫, ৩৩৩, ৩৪২, ৩৪৩, ৩৫০, ৪১৬, ও ৪২৯)। ৩৪৩ নং গানে মদনকে আনন্দমোহিনীর শিষ্য বলিয়া মনে হয় এবং ৪১৬ নং গানে মদনের পূর্বে ক্ষ্যাপা বিশেষণটি যুক্ত হইয়াছে। এই সব গানে বাংলার অন্যান্য বাউল-গানের মতো বাউলদের সাধন-তত্ত্ব ও সাধনার ইঙ্গিত সম্বন্ধে ভাব ব্যক্ত হইয়াছে। ক্ষিতিমোহনবাবুর ‘মদন’ বোধ হয় এই সব মদন হইতে পৃথক।” উপেন্দ্রনাথ আন্দাজ করেছেন যে, এই সব গানে যেহেতু ‘বাংলার অন্যান্য বাউল-গানের মতো বাউলদের সাধন-তত্ত্ব ও সাধনার ইঙ্গিত ব্যক্ত’ হয়েছে তাই এগুলির রচয়িতা ক্ষিতিমোহন সেনের মদন বাউল নন, আর তাঁরই আন্দাজি কথার সূত্র ধরেই হোক বা অগোচরে গানের ভাষা নিরীক্ষণ করেই হোক, তার কোনো প্রমাণ না দিয়ে আরেক ধাপ এগিয়ে শেখ ‘মদন’ বাউল ছিলেন কি না সেই প্রশ্ন তুললেন রমাকান্ত চক্রবর্তী!

২.
শেখ মদন বাউলের গান উল্লিখিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের অভিভাষণে, সেখানে উদ্ধৃতও হয় তাঁর ‘নিঠুর গরজী’ গানটি; পরে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত বঙ্গবীণায়ও তাঁর গান মুদ্রিত হয়। এ-কারণে বিদ্বৎসমাজে মদন বাউলের গানটি প্রচারিত, বিভিন্ন লেখকের আলোচনায়ও নানাভাবে গানটি আলোচিত, কেউ কেউ গানের অন্তর্নিহিত তত্ত্বকে খোঁজার চেষ্টাও করেছেন। দেখতে পাচ্ছি ১৯৫৭ সালে মুহম্মদ আবদুল হাই-সংকলিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ইন্টারমিডিয়েট শ্রেণির পাঠ্য হিসেবে সাহিত্য সংগ্রহ (পদ্য) সংকলনে ‘নিঠুর গরজী’ ও ‘তোর পথ ঢাক্যাছে মন্দিরে মসজিদে’ গান দুটি যথাক্রমে ‘প্রতীক্ষা’ ও ‘পথের বাধা’ শিরোনামে পদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কবির নাম: ‘সেখ মদন বাউল’ জন্মসাল: প্রশ্নচিহ্ন-যুক্ত ‘(১৮ শতক?)’, কবির পরিচয় দিতে গিয়ে ‘বঙ্গবীণা: পৃ. ৪৬১’-এর সূত্র উল্লেখ করে সংকলক লিখেছেন: ‘মদন বাউল সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তিনি মদন বাউল বা মদন সেখ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁহার গানের ভাষা হইতে বুঝা যায় তিনি পূর্ববঙ্গবাসী ছিলেন।’ শেখ মদন বাউল সম্পর্কে খুব বেশী জানা না গেলেও তিনি যে পূর্ববঙ্গের বাউল/কবি ছিলেন সে-বিষয়ে ১৯৪০ সালে লিখিত হারামণির দ্বিতীয় খণ্ড [প্রথম প্রকাশ ১৯৪২]-এর ভূমিকায়ও: ‘লালন ব্যতীত মদন প্রভৃতি পূর্ববঙ্গীয় মুসলমান বাউল ফকীরদের রচিত এবং লোকমুখে প্রচারিত গ্রাম্যগানগুলিও বিশেষ মনোহর’। মদন বাউল সম্পর্কে আগ্রহী হওয়ায় ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে তাঁর জীবনতথ্য জানবার জন্য অন্নদাশঙ্কর রায়কে চিঠি লেখেন মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, তিনি চিঠি পেয়ে ক্ষিতিমোহনের কাছ থেকে যে সংক্ষিপ্ত তথ্য উদ্ধার করেন তা হলো: ‘রাজা রাজবল্লভের সময় প্রায় দুই শত বৎসর পূর্বে বিক্রমপুরের ধলছত্র গ্রামে মদন বাউলের জন্ম হয়। ধলছত্র গ্রাম এখন পদ্মাগর্ভে।’ অন্যত্র, ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে রচিত একটি লেখায়ও উল্লেখ করেছেন মদন বাউলের জন্ম সেই সময় থেকে দুই শত বছর পূর্বে—সে-হিসেবে তাঁর জন্ম ১৮ শতকের মাঝামাঝি বলে অনুমান করা যায়। তাঁর গুরু ছিলেন ঈশান যুগী [নাথযুগী], ঈশানের গুরু তিনুু [জাতিতে নট], তার গুরু হারাই নমশুদ্র, তার গুরু কালাচাঁদ মিস্ত্রী, তার গুরু বাউল মনাই শেখ। মদনের বন্ধু ছিলেন গঙ্গারাম, তিনিও ছিলেন বাউল; কিন্তু মদনের কোনো শিষ্যের খবর পাওয়া যায় না। এই সব তথ্যের উৎস হলেন বিক্রমপুরের সোনারং গ্রামের ক্ষিতিমোহন সেন, যাঁর সংগ্রহ-ভাণ্ডারকে রবীন্দ্রনাথ ‘অমূল্য সঞ্চয়’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর এই অমূল্য সঞ্চয় অতিনিকটজন ছাড়া কাউকে দেখাতেন না এবং এ নিয়ে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকায় নিজে পারতপক্ষে সেগুলো প্রকাশ ও প্রচারে আগ্রহ দেখাতেন না। হারামণির সংকলক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন বাউল গানের প্রতি প্রীতিবশত এ-বিষয়ে অনুযোগ প্রকাশ করে ক্ষিতিমোহন সেনকে ‘অতিশয় কৃপণ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং শান্তিনিকেতন থেকে লিখিত ডক্টর আর্নল্ডের চিঠির উল্লেখ করে তাঁর সবিস্ময় বক্তব্য তুলে ধরে লিখেছিলেন, মুক্তা যেমন গোপন থাকে, তেমনি ক্ষিতিমোহনের কণ্ঠে এই সব গান ‘লুক্কায়িত’ রয়েছে, তিনি তা সহজে প্রকাশ করতে চান না, ‘ইহা ভারী আশ্চর্য্য’, তিনি বাউলদের মতো ‘Uncommunicative এবং নির্লিপ্ত’। আর্নল্ড ও মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন দুজনেই স্বীকার করেছেন, ‘সহজে’ গান প্রকাশ করতে চান না ক্ষিতিমোহন, তবে রবীন্দ্রনাথ ও চারুচন্দ্রের মতো বিশ্বস্ত সুজনদের হাতে যথামর্যাদায় ব্যবহারের জন্য তুলে দিতেও তাঁর আপত্তি ছিল না; আসলে এগুলো দুর্ব্যবহার হতে পারে, এই ছিল তাঁর ভয়। বোঝাই যায় এই দুই জনের অনুযোগই ছিল সপ্রেম অনুযোগ, ক্ষিতিমোহন সেন তার জবাবও দিয়েছিলেন, সে-জবাবে তিনি কেন ‘Uncommunicative এবং নির্লিপ্ত’ তার উত্তরও আছে, কিন্তু এখানে তার উল্লেখ করার আগে ক্ষিতিমোহন সেন ও শেখ মদন বাউলের গান এবং অন্যান্য কিছু গান-বিষয়ে যে-অভিযোগ করেছিলেন উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, তার উল্লেখ করা জরুরি, কারণ এই সকল অনুযোগ ও অভিযোগের জবাবি বক্তব্য একসঙ্গেই দিয়েছিলেন ক্ষিতিমোহন তাঁর বাংলার বাউল বইটিতে।

উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য উল্লেখ করেছেন, প্রবাসীর ‘হারামণি’ শীর্ষক বিভাগ ও চারুচন্দ্র সম্পাদিত ও ইন্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত বঙ্গবীণা সংকলনে ক্ষিতিমোহন সেন-সংগৃহীত কয়েকটি বাউল গানের নমুনা দেখে তিনি বাউল গান-সংগ্রহ ও বাউল মতবাদ সম্পর্কে জানার অনুপ্রেরণা লাভ করেন; তাঁর ভাষায় ‘বাউল-গানের নমুনাস্বরূপ ‘‘নিঠুর গরজী, তুই কি মানস-মুকুল ভাজবি আগুনে’’ প্রভৃতি গান দেখিয়া পল্লী-কবিদের এই প্রকার রচনায় বিস্মিত ও মুগ্ধ হইয়া যাই।’ এরপর দীর্ঘদিন ধরে বাংলার বাউল গান সংগহ করার পর তিনি যখন দেখলেন ক্ষিতিমোহন-সংগৃহীত গানগুলির সঙ্গে সেই গানগুলি মেলে না, একটি-দুটি একই রকম ভাবপ্রকাশক গান খুঁজে পাওয়া গেলেও সেরকম ‘প্রকাশ-ভঙ্গী’ খুঁজে পাওয়া যায় না, তখনই সেই মুগ্ধতা কেটে যায়। তাঁর মতে, বাংলার বাউল গানের প্রধান বিষয়বস্তু ও প্রকার এক, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন-সংগৃহীত হারামণির গানগুলিই প্রকৃত বাউল গান, ‘ক্ষিতিমোহনবাবুর সংগৃহীত কয়েকটি গানের সহিত তাহাদের ভাব, ভাষা, উপস্থাপন প্রভৃতিতে মৌলিক প্রভেদ বর্তমান’; তিনি ‘নিঠুর গরজী’ গানটির উল্লেখ করে বলেন, এর মতো ‘বাগ্বৈদগ্ধ্যপূর্ণ’ ও ‘আধুনিক-গন্ধী’ একটা গানও খুঁজে পাননি; তাঁর অভিযোগ সুললিত ‘মানস’ কথাটির সঙ্গে সুললিত ‘মুকুল’ শব্দের সমাস-যোগে অলঙ্কার সৃষ্টি আর ‘যুগযুগান্তে’ ও ‘বেদন’ শব্দের ব্যবহার আধুনিক শিক্ষিত ব্যক্তিগণ করে থাকেন। এই সকল অভিযোগের জবাব দিয়েছিলেন ক্ষিতিমোহন সেন, এ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন রবীন্দ্রনাথও, এরপরও উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বাংলার বাউল ও বাউল-গান-এর পরবর্তী সংস্করণে বা অন্য কোনো লেখায়ও এ-বিষয়ে কোনো সংশোধন বা সংযোজন লক্ষ করা যায়নি।

আসলে ক্ষিতিমোহন সেনের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্যক উপলব্ধি না করে মদন বাউলের একটি-দুটি গানের দৃষ্টান্ত সামনে নিয়ে অত্যাকাঙ্ক্ষা লালন করে বিভিন্ন অঞ্চলের বাউলদের গানে সেই গানের ছায়া খুঁজে ব্যর্থ হয়ে আবার সেই গানের দু-একটি কথাকে কেন্দ্র করে যেভাবে অভিযোগগুলি সাজিয়েছেন উপেন্দ্রনাথ, তা রবীন্দ্রনাথ ও ক্ষিতিমোহন সেনকে দুঃখিত/স্তম্ভিত করার পাশাপাশি মদন বাউলসহ আরও অনেক বাউলের মূল্যবান গানগুলি প্রকাশের প্রতিবন্ধক হয়েছে

মনসুরউদ্দীনের অনুযোগের কথা মাথায় রেখে ক্ষিতিমোহন সেন লিখেছিলেন, বাউল-সাধকদের উপরে অত্যাচারের কারণে তিনি তাদের অনেক আখড়ার খবর সকলকে দেন না, যেগুলোর খবর দিয়েছিলেন সেগুলোর উপরও অনেক অত্যাচার হয়েছে। মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের বইয়ে যে-স্থানগুলির কথা লেখা আছে, সেগুলোর তথ্যও তাঁর দেওয়া। এই স্থানগুলোর খবর পেয়ে ডক্টরেটপ্রার্থীদের তৎপরতার কারণে কী পরিমাণ বিব্রত হয়েছিলেন কেন্দুলীর নিত্যানন্দ দাস, ক্ষিতিমোহন সেনকে-বলা মন্তব্যে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে: ‘বাবা, বৎসরান্তে এখানে আসিতাম। কিন্তু তোমাদের পিস্তলের মত পেন্সিল ওঁচানো দেখিয়া স্থানটি ছাড়িতে হইল।’ এছাড়া বাউলেরা তাদের গান প্রচারের ক্ষেত্রে যে-দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেন, তারও উল্লেখ করেছিলেন:

বাবা, ইহা তো সাহিত্য নয়। ইহা আমাদের অন্তরঙ্গ প্রাণবস্তু, আপন আত্মজা। যদি কেহ আমার কন্যাকে এই বলিয়া প্রার্থনা করেন যে, ‘তাহাকে লইয়া আমি গৃহী হইব’, তবে সেক্ষেত্রে আমার দেওয়াই উচিত। সেই দেওয়াতে আমি ধন্য, তিনি ধন্য, আমার আত্মজাও ধন্য। কিন্তু কোনো লোক যদি শুধু রসাস্বাদন-সুখের জন্য আমার আত্মজাকে চাখিয়া দেখিতে চাহেন, তবে প্রার্থয়িতাও অধন্য, আমিও অধন্য, আত্মজাও অধন্য।

পরে যে-গানগুলো প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই সেগুলো প্রচারের জন্য ক্ষিতিমোহন সেনকে অনুরোধ করেন রবীন্দ্রনাথ, সেই সূত্রে প্রবাসীতে কিছু গান প্রকাশ করেন তিনি—এই গানগুলি নিয়েই কথা তুলেছিলেন উপেন্দ্রনাথ। এর উত্তরে ক্ষিতিমোহন সেন লেখেন, তিনি সাহিত্যিক হিসাবে এগুলো সংগ্রহ করেননি, এজন্য কারও সাহায্যও নেননি, তাই এক্ষেত্রে তাঁর কোনো দায়বদ্ধতাও নেই, তিনি শুধু অধ্যাত্ম-ক্ষুধা লাঘবের জন্য এগুলো সংগ্রহ করেছেন। তারপরও ওই সময়ে প্রকাশিত ৯টি গান ছাড়াও আরও কিছু গান রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা ও লেখায় প্রচারিত হয়েছে, এছাড়া রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে বাউল-তত্ত্বগুলি ব্যাখ্যা করে ফুলস্কেপ ৪০ পৃষ্ঠার যে লেখাটি লেখেন তাতেও কিছু গান উল্লিখিত হয়েছে। এর পর থেকে ছাপানোর ক্ষেত্রে সাবধান হয়ে যান ক্ষিতিমোহন এবং লেখেন: ‘বাউল রচনা সম্বন্ধে ঐরূপ বিরুদ্ধ মতবাদ শোনাতে তাহা আমি চল্লিশ বৎসরের বেশি নিজের কাছেই রাখিয়া দিয়াছি। হয়তো তাহা আর প্রকাশিত হইবে না। কারণ বাউল বিষয়ে আমার সংগ্রহ কোনো খ্যাতি-প্রতিপত্তির জন্য নহে। ইহা আমার অন্তরের বস্তু।’ যার সংগ্রহ-সম্পর্কে এই বিরুদ্ধতা, তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় একই সঙ্গে ‘প্রাচীন শাস্ত্রজ্ঞ’ ও ‘অত্যন্ত উদার’, খ্যাতিমান হওয়ার আগেই প্রথমবার রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার পর দ্বিতীয়বার সনির্বন্ধ অনুরোধ ও দাবি জানানোর পর শান্তিনিকেতনে যোগদান করেন ক্ষিতিমোহন, সেই নির্মোহ পণ্ডিতের প্রতি এমন অভিযোগ মারাত্মকই বটেই। গানগুলো প্রকাশ ও প্রচারের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে আগ্রহী যেহেতু ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, আর ‘আধুনিক-গন্ধী’ করে তোলার অভিযোগের ইঙ্গিত থেকে প্রকাশ-সংশ্লিষ্টতার কারণে যেহেতু তিনিও বাদ পড়েন না, তাই, এগুলো আধুনিক শিক্ষিত জনের রচনা, এই অভিযোগ শুনে রবীন্দ্রনাথ স্তম্ভিত হয়ে লেখেন: ‘শিক্ষিত লোকের মুরদ তো আমার অজানা নাই। এই সব জিনিষ যে তাঁহাদের রচনার শক্তির বাহিরে তাহা আমি খুবই বুঝি। একটা গান পাইলে হয়তো তাঁহারা কতক অনুরূপ আর একটা গান করিতে পারেন, কিন্তু মূল রচনা করা কোনো শিক্ষিত লোকের কর্ম নয়। অন্তত আমার তো তাহার কাছাকাছি শক্তিও নাই।’ এবার মদন বাউলের সমাসবদ্ধ ‘মানস-মুকুল’ নিয়ে চণ্ড আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নির্দিষ্টভাবে যে-অভিযোগ তুলেছিলেন উপেন্দ্রনাথ, সে-বিষয়ে আলোকপাত করা জরুরি।

তিনি লিখেছেন: ‘বাউলদের মধ্যে যাহারা কিছু শিক্ষিত, তাহারা ভারতচন্দ্র, ঈশ্বর গুপ্ত, দাশরথি রায় প্রভৃতির কবিতার সহিত পরিচিত হইতে পারে এবং রচনা-রীতিতেও অনেকখানি তাঁহাদের অনুসরণও করিতে পারে, কিন্তু মাইকেল, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতির কাব্যের সহিত পরিচিত না থাকাই সম্ভব, থাকিলেও তাঁহাদের রচনা-রীতি তাঁহারা অনুসরণ করে না।’ দেখতে পাচ্ছি তাঁর কথামতো মদন বাউলকে ‘কিছু শিক্ষিত’ বাউল না বলে উপায় নেই, তিনি ‘মানস-মুকুল’ ব্যবহার করতে গিয়ে মাইকেলের ‘মানসসরোবর’ অনুসরণ না করতে পারেন, ভারতচন্দ্রের ‘মানস-সারস’ বা দাশরথি রায়ের ‘মানস শুকপাখি’র অনুসরণ তো করতেই পারেন, রবীন্দ্র-অগ্রজ পণ্ডিত দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মানস সর’-এর অনুসরণ নাই-বা করলেন। এই কথাগুলো যাচাই করার জন্য পাঠকদের উপরিউক্ত বইগুলোর পাতা না উল্টালেও চলবে, আপাতত, মান্য অভিধান হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ  [সাহিত্য আকাদেমি, পঞ্চম মুদ্রণ ২০০১]-এর দ্বিতীয় খণ্ডের ১৭৭১ পৃষ্ঠায় ‘মানস’ ভুক্তিটি দেখলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। যাচাইয়ের লক্ষ্যে সহজ উপায় উল্লেখের কারণ, শেখ মদন বাউলকে কল্পিত মদনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি যে-যুক্তিগুলো সাজিয়েছেন তা যাচাই করা সময়সাপেক্ষ এবং আয়াসসাধ্যও বটে, তাই অন্তত একটি গানের কৃত্রিমতা নিরূপণের জন্য তার সিদ্ধান্তকে বিচার করার এই প্রস্তাব।

উপেন্দ্রনাথের অন্য অভিযোগ ছিল ‘তাঁহার সেই গানগুলির মধ্যে তাহাদের ধর্মতত্ত্ব বা সাধন-বিষয়ে কোনো বর্ণনা, ইঙ্গিত বা আভাস পাওয়া যায় না’, তাঁর এই কথাটি কতটা অগভীর, তার প্রমাণ এই লেখার সঙ্গে যুক্ত গানগুলি পড়লেই পাঠকেরা বুঝতে পারবেন, তবে ক্ষিতিমোহন বাউলদের সাধনক্রিয়া সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি গোপন রাখেননি, তিনি লিখেছেন: ‘সহজ নামে তাঁহারা সস্তা ইন্দ্রিয়-উপভোগের পন্থা খুলিয়াছেন, তাহা বাস্তবিক পক্ষে কোনো সাধনার ভিত্তি হইতে পারে না।’… ‘ইহাদের দেহসাধনায় চারিচন্দ্রের ভেদ অতি গোপনীয় ব্যাপার, এবং তাহা অতি বীভৎস’, ক্ষিতিমোহন সেনের এই দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা, তিনি যত বড় পণ্ডিতই হোন না কেন, হতে পারে; এই দৃষ্টিভঙ্গি কেউ গ্রহণ নাও করতে পারেন; মৌলবী আবদুল ওয়ালীর ১৮৯৮ সালে পঠিত ‘বাউলফকির বিষয়ে বাঙালির প্রথম সরেজমিন লেখা’য় তাদের তত্ত্বকে ‘শয়তানি ধর্মতত্ত্ব’ বলে অভিহিত করেছিলেন, অক্ষয়কুমার দত্তও লিখেছিলেন ‘ইহাদের ঘৃণ্য প্রবৃত্তি পরাভবের অন্য অন্য লক্ষণও দেখিতে পাওয়া যায়’, এসব কথার সমালোচনা হয়েছে এবং হতে পারে, কিন্তু এই সকল মত তো তাঁদের নিজস্ব মত, এগুলো গ্রহণ না করেও গবেষকেরা ‘ধর্মমতের সম্যক পরিচয়’ প্রাপ্তির চেষ্টা করতে পারেন বা ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া সত্য সন্ধান’ও করতে পারেন।

আসলে ক্ষিতিমোহন সেনের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্যক উপলব্ধি না করে মদন বাউলের একটি-দুটি গানের দৃষ্টান্ত সামনে নিয়ে অত্যাকাঙ্ক্ষা লালন করে বিভিন্ন অঞ্চলের বাউলদের গানে সেই গানের ছায়া খুঁজে ব্যর্থ হয়ে আবার সেই গানের দু-একটি কথাকে কেন্দ্র করে যেভাবে অভিযোগগুলি সাজিয়েছেন উপেন্দ্রনাথ, তা রবীন্দ্রনাথ ও ক্ষিতিমোহন সেনকে দুঃখিত/স্তম্ভিত করার পাশাপাশি মদন বাউলসহ আরও অনেক বাউলের মূল্যবান গানগুলি প্রকাশের প্রতিবন্ধক হয়েছে। উপেন্দ্রনাথের পক্ষে এটা বোঝা সম্ভব হয়নি যে, ক্ষিতিমোহন সেন কবীর ও দাদূকে নিয়ে মূল্যবান কাজ করলেও তাঁর মেজাজ ঠিক গবেষকের নয়, তিনি ভাবুকের জীবন-তত্ত্ব, মর্ম ও সত্যের সন্ধানী। কবীরকে নিয়ে কাজ করার পর এর ভাবচিন্তাগুলি প্রাচীন পুঁথিতে পাওয়া যায় না বলে কথা উঠেছিল, পণ্ডিত হাজারীপ্রসাদ দ্বিবেদী তার প্রতিবাদে ক্ষিতিমোহন সেনকে সমর্থন করে লেখেন, যারা এমনটি বলেন তারা ভারতীয় মনীষার মহত্ব বুঝতে চায় না, সমাদরকেও সহ্য করতে চায় না। দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কারণে তিনি ক্ষিতিমোহনের কবীর-পাঠ পুরোটা গ্রহণ করেননি সত্য, কিন্তু তাঁর লেখায় এরকম সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি রয়েছে যে, তার প্রেরণা না পেলে তিনি নাকি বইই লিখতে পারতেন না। তাঁর প্রতি হাজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর যে বিচারশীল সশ্রদ্ধ মনোভাব, তা উপেন্দ্রনাথের থাকলে ক্ষিতিমোহনের কাছ থেকে আমরা আরও অনেক অমূল্য উপহার পেতাম ও উপকৃত হতাম। তিনি বাউল-মতকে বেদ উপনিষদের সারসত্য, তার মুক্ত ভাব, এবং পুর্বকার মহাজনদের শাশ্বত মর্ম-চিন্তার ধারাবাহিকতায় দেখতে চেয়েছেন, তাঁর সংগৃহীত যে-বাণীগুলোতে সেই ধারা সুন্দরভাবে এসেছে, সেগুলো বারবার উল্লেখ করেছেন, এই সূত্রে মদন বাউলের ‘তোর পথ ঢাইক্যাছে মন্দিরে মসজেদে’ গানটি একাধিক লেখায় এসেছে, এসেছে তাঁর অন্যান্য গান এবং অন্যান্য বাউলের গানও। এই সকল গানে বাউল-তত্ত্বের কোনো খবর/পরিচয় নেই, তা বিলকুল অমূলক কথা হয়ত কোনো অঞ্চলের সাধনক্রিয়ার সঙ্গে তাঁর পার্থক্য আছে, অঞ্চল ভেদে তার তর-তম থাকাটাই স্বাভাবিক, তবে ক্ষিতিমোহন ভাবানুন্ধানী বলে—বা হতে পারে বাউলদের অনাগ্রহের কারণে—সাধনক্রিয়াপ্রকটিত গানগুলি প্রকাশের জন্য দেননি। উল্লেখ করা জরুরি, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য যে-মনসুরউদ্দীনের সংগৃহীত গানগুলিকে ‘প্রকৃত বাউল গান’ বলে মনে করতেন, তাঁরই তো প্রবল আগ্রহ ছিল মদন বাউলের প্রতি, আমরা মদন বাউলের জীবন-তথ্য বিষয়ে যতটা জেনেছি তার অধিকাংশ তথ্যই তাঁরই আগ্রহে আহরিত, মদনের গান ও তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি ঢাকা থেকে তাঁর গুরু ঈশান যুগীর একটি গানও সংগ্রহ করেন, সেই  মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন তাঁর বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা বইয়ের ‘শেখ মদন বাউল’ শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন:

শেখ মদন বাউলের সকল গান সংগ্রহ করা একান্ত প্রয়োজন। পাঞ্জাবের বুলেহ শাহকে পাঞ্জাবের জনসাধারণ পাঞ্জাবী রুমী বলিয়া উল্লেখ করেন। …

দিলীপকুমার রায় তাহার ‘সাঙ্গীতিকী’ গ্রন্থে শেখ মদন বাউলের অশেষ প্রশংসা করিয়াছেন। তিনি বলেন, রুমীর কবিতার মধ্যে যে অন্তর্জ্বালার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, শেখ মদন বাউলের রচনায় তাহা লক্ষ্য করা যায়।

মনসুরউদ্দীনের মতো আমরাও মনে করি তাঁর সব গান সংগ্রহ করা প্রয়োজন এবং মদনচাঁদ, মদন শাহ, মদন শা, খ্যাপা মদন, গোঁসাই মদন প্রভৃতির ভণিতায় যে-গানগুলো সংগৃহীত হয়েছে, সেগুলো শেখ মদন বাউলের গান কি না তারও মীমাংসা প্রয়োজন। যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য-সংকলিত বাঙ্গালার বৈষ্ণবভাবাপন্ন মুসলমান কবিদের পদমঞ্জুষা সংকলনে ‘মদন শা’ ভণিতায় গান প্রকাশিত হয়েছে, সংকলকের মতে, তাঁর বাড়ি সিলেটে; কিন্তু মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন তাঁর ‘শেখ মদন বাউল’ শীর্ষক লেখায় ‘মদন শাহ’ ভণিতাযুক্ত একটি গানের উল্লেখ করেছেন। তাই শেখ মদন বাউলের গান সংগ্রহ ও সংকলনের জন্য মিলিত চেষ্টা দরকার। এখানে শেখ মদন বাউলের গানের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার জন্য বক্ষ্যমান ৭টি গান বাছাই করতে গিয়ে আপাতত ‘মদন’ ভণিতাযুক্ত গানই শুধু নিয়েছি এবং গানের নিচে তার উৎসও উল্লেখ করেছি।

প্রথম গানটি লেখার শুরুতেই আলোচিত হয়েছে, পূর্বোল্লিখিত সাহিত্য সংগ্রহ (পদ্য)-এর সম্পাদক মুহম্মদ আব্দুল হাই এই গানটিকে ‘আধ্যাত্মিক অনুভূতি সমৃদ্ধ’ বলে উল্লেখ করে বলেছেন, বাউল সম্প্রদায়ের মতবাদের সঙ্গে এই কবিতাটির বক্তব্যের মিল রয়েছে।

দ্বিতীয় গানটির প্রকাশভঙ্গি ও শব্দ ব্যবহার নিয়েও আলোচনা আগে হয়েছে, শব্দের এমন ব্যবহার শিক্ষিত ব্যক্তিগণরাই করে থাকেন বলে ১৩৬৪ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত বাংলার বাউল ও বাউল গান গ্রন্থে মন্তব্য করেছিলেন উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, কিন্তু এখানে সাহিত্য সংগ্রহ (পদ্য)-এর সম্পাদক, একই সময়ে, ১৩৬৪ বঙ্গাব্দে [১৯৫৭ খ্রি.] লিখছেন:

প্রকৃতিতে তরুলতা সময়মতো আপনা হইতেই বিকশিত হয়; তাহার জন্য তাড়াহুড়া করিয়া লাভ নাই। ধৈর্যের ভিতর দিয়াই বিধাতার রাজ্য চলিতেছে। অশিক্ষিত কবি শেখ মদন বাউল তাঁহার অনুভূতি-লব্ধ জ্ঞানের সাহায্যে মানুষকে প্রকৃতি হইতে এই শিক্ষা গ্রহণ করিতে উপদেশ দিতেছেন।

এই গান সম্পর্কে আর কোনো কথায় না গিয়ে শুধু একই সময়ের দুই ব্যাখ্যাতার বিপরীতমুখী ‘শিক্ষিত’ ও ‘অশিক্ষিত’ শব্দ দুটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এখানে আরেকটি কথা বলা যায় যে, এই সংকলনে—অধ্যাত্মমূল্য বা সাহিত্যমূল্য যে-কারণেই হোক—গান দুটি কবিতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, তাতেই তো মদন বাউলের গুরুত্ব ধরা পড়েছে, এ-ক্ষেত্রে [রমাকান্ত চক্রবর্তী-উত্থাপিত প্রশ্ন] তিনি বাউল ছিলেন কি না, বা [উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য উত্থাপিত বিষয়] এতে বাউলদের ধর্মতত্ত্ব বা সাধন বিষয় কতটা যুক্ত আছে সে-প্রশ্নও আর প্রাসঙ্গিক থাকে না।

তৃতীয় গানটিতে রয়েছে সুফি ভাবের সম্বন্ধ, এখানে জালালুদ্দিন রুমির ‘মসনবি’তে উল্লিখিত সওদাগরের খাঁচাবদ্ধ তোতাপাখির প্রেরিত পয়গামের ঘটনায় বর্ণিত মরার আগে মরা বা জ্যান্তে মরার তাৎপর্য নিহিত। জ্যান্তে মরার বিষয়টি বাউল-ফকির-সুফিদের গানে পাওয়া যায়। কিন্তু লক্ষ করি, এগুলির ব্যাখাতারা প্রায়ই গানের ব্যাখ্যা করার সময় পাঠবস্তুর আক্ষরিক/নিকট-সম্পর্কের মধ্যে এর অর্থ খুঁজে মীমাংসায় পৌঁছান, কিন্তু জ্যান্তে মরার নেপথ্য/মূল ঘটনা না জানলে গানগুলির মর্মে পৌঁছা অসম্ভব। মূল ঘটনা সংক্ষেপে এরকম: সওদাগরের একটি তোতা পাখি ছিল, পাখিটিকে খাঁচায় বন্দি করে রাখা হতো। সওদাগর বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে হিন্দুস্তানে যাওয়ার সময় বদান্যতাবশত তার সকল দাসদাসীকে ডেকে বলল ‘তোমাদের জন্য কী আনব?’ সবাই যার যার মতো করে কাঙ্ক্ষিত বস্তুর কথা বলল, কিন্তু তোতাটিকে যখন বলা হলো, ‘তুমি কী উপহার চাও?’ তখন সে বলল, আপনি সেখানে তোতা পাখির ঝাঁক দেখলে আমার অবস্থা জানিয়ে বলবেন আমি তাদের সাক্ষাৎপ্রার্থী, তারা যেন আমার মুক্তির উপায় বলে দেয়। পরে হিন্দুস্তানে একঝাঁক তোতা পাখির দেখা পেলে তাদের কাছে সওদাগর তার খাঁচাবদ্ধ তোতা পাখির আকুতি জানাল এবং তা শুনে ঝাঁকের মধ্য থেকে একটি পাখি মাটিতে পড়ে মারা গেল। সওদাগর দেশে ফিরে এই সংবাদ খাঁচাবদ্ধ পাখিটিকে বলল, মৃত্যুসংবাদ শুনে সেও মাটিতে পড়ে মারা গেল। সওদাগর হায় হায় করতে করতে খাঁচা থেকে তোতা পাখিটিকে বাইরে ফেলে দিল এবং পাখিটি তখনই উড়ে গিয়ে উঁচু ডালের ওপর বসল। মসনবিতে রয়েছে: বা’দ আযানাশ আয কাফাস বেরোঁ ফাগান্দ/তুতিয়াক পরবিদ তা শাখে বুলন্দ। জ্যান্ত অবস্থায় মরা বা ‘মরার সঙ্গে হইয়ে মরা’র  মধ্য দিয়ে যে মুক্তি পাওয়া সম্ভব, স্বজাতি তোতার কাছে এই বার্তাটি পেয়েছিল খাঁচাবদ্ধ তোতা পাখি—এই অধ্যাত্মবার্তাটুকুই যুগে যুগে বাউল-ফকির-সুফিদের পদে দেখা গেছে এবং তা এসেছে মদন বাউলের একাধিক গানেও। তৃতীয় গানটিতে রয়েছে:

ধরার কাছে আছে ধরা,
সেই মানুষটি জ্যান্তে মরা,
মরার সঙ্গে হইয়ে মরা
খোঁজে যে বা জন।

গানটিতে শব্দ ব্যবহারের সচেতনতার পাশাপাশি প্রকাশভঙ্গির অনন্যত্বও বর্তমান।

চতুর্থ গানটিতে তৃতীয় গানের সমভাব লক্ষণীয়।

পঞ্চম গানটি পড়লে মনে হয় এটি মানুষ ভজনার গান, আছে দেহতত্ত্বের বার্তাও, আছে জ্যান্তে-মরার কথাও, কিন্তু শেষপর্যন্ত এটি পরমতত্ত্ব বা পরম ভাবেরই গান—মানুষই এখানে পরম। গানের প্রথম পঙ্ক্তি দুটি পড়লে তাঁর প্রকাশভঙ্গি, ভাবপ্রকাশক শব্দ ও বাক্য ব্যবহারের দক্ষতা চোখে পড়বে:

অকৈতব মানুষের কথা কইতে লাগে ভয়।
মনে হয়, ফল্গুনদী যেমন অন্তঃশীলা বয়॥

গানটি উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বাংলার বাউল ও বাউল-গান বইটি থেকে গৃহীত, এর সংগ্রাহকও তিনি নিজে। [২সংখ্যক] নিঠুর গরজী গানটিকে যে-কারণে তিনি ‘আধুনিক-গন্ধী’ এবং আধুনিক শিক্ষিত জনের রচনা বলে সন্দেহ করেছেন, সেই কারণগুলি কি এই গানে নেই? ‘অকৈতব’ শব্দটির অর্থ ছলনাহীন, অকপট বা ‘অকৈতব কৃষ্ণপ্রেম’-এর উল্লেখ মান্য অভিধানগুলোতে আছে, কিন্তু বাউল গানে কি তা সুলভ? সুলভ না হলে তাঁর নিজের সংগ্রহে এই গানটি স্থান পায় কীভাবে? দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে ‘ফল্গুনদী’ ও ‘অন্তঃশীলা’র ব্যবহারও কি স্বাভাবিক? [‘অন্তঃশীলা’ শব্দের যথা অর্থ ও তার প্রতীকী ব্যঞ্জনা উপলব্ধি করা যায় ধুর্জ্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অন্তঃশীলা উপন্যাসটি পড়লে।] উপেন্দ্রনাথের অভিযোগ-অনুযায়ী তাঁর সংগৃহীত মদনের গানে বা কোনো বাউল-গানে এরকম শব্দ-ব্যবহার অস্বাভাবিক, কিন্তু আমরা ক্ষিতিমোহন সেন-সংগৃহীত বিক্রমপুরের ধলছত্র গ্রামের অধিবাসী মদন বাউলের গানে এমন শব্দের ব্যবহার স্বাভাবিক বলেই মনে করি। মদন বাউলের যে গুরু এবং তার উপরের দিকের যে-পরম্পরা, এবং হরিআনন্দ বাড়রী In Sun and Shower বইয়ে বিক্রমপুরের তৎকালীন বিদ্যাচর্চার যে-বিবরণ দিয়েছেন, তাতে সেই সময়কার বাউলদের গানের ভাষায় তার ছিটেফোঁটা প্রভাব থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

ষষ্ঠ গানটি গুরুমুখী, এতে গৃরুকৃপা ছাড়া যে পরমকে পাওয়া যাবে না সে-কথাটাই বলা হয়েছে। গানটি উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বাংলার বাউল ও বাউল-গান বইটি থেকে গৃহীত; মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন-সংগৃহীত একটি ভিন্নপাঠও এখানে উপস্থাপিত হয়েছে। উপেন্দ্রনাথ-কথিত ‘প্রকৃত বাউল গান’-এর সংগ্রাহক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের গানটিকে মূল গান হিসেবে ধরে নিলে উপেন্দ্রনাথ-সংগৃহীত গানটিতে আধুনিক শিক্ষিত হাতের প্রসাধন লেগেছে বলে মেনে নিতে হবে। পরবর্তী সময়ে লালনের গানেও ‘মাখা-চোখা’ ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।

সপ্তম গানটি ‘মনঃশিক্ষা’মূলক, এতে কাম তত্ত্ব/তথ্য-এর কথা বলা আছে। এই ধরনের গানকে কোনো কোনো বাউল ‘নিগূঢ় তত্ত্ব’ বলে থাকেন, কিন্তু এখানে নিগূঢ় ভাবের চেয়ে ‘কাম’ [আসলে ‘নিষ্কাম’]-এর সহজ ভাবেরই প্রকাশ ঘটেছে।

মেঘচিল

শেখ মদন বাউলের গান

১.

তোমার পথ ঢাইক্যাছে মন্দিরে মসজেদে।
তোমার ডাক শুনি সাঁই,
.           চলতে না পাই,
রুইখ্যা দাঁড়ায়, গুরুতে মোরশেদে॥

ডুইব্যা যাতে অঙ্গ জুড়ায়,
.        তাতেই যদি জগৎ পুড়ায়,
বল তো গুরু কোথায় দাঁড়ায়, অভেদ সাধন মরলো ভেদে॥
.        তোর দুয়ারেই নানান তালা,
.        পুরাণ কোরান তসবী মালা,
.        ভেখ-পথই তো প্রধান জ্বালা, কাঁইদে মদন মরে খেদে॥

[ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা, ক্ষিতিমোহন সেন, বিশ্বভারতী, কলকাতা, সংস্করণ ১৩৯৭, পৃ. ৩০। গানটি ক্ষিতিমোহন সেন-কর্তৃক সংগৃহীত। এটি ক্ষিতিমোহন সেনের একাধিক লেখায় উদ্ধৃত; এটি মুহম্মদ আবদুল হাই-কৃত সংকলন সাহিত্য সংগ্রহ (পদ্য) ছাড়াও, কাজী আবদুল ওদুদ, আবদুল কাদির, আনিসুজ্জামান, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়সহ আরও অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে তাদের লেখায় উল্লেখ করেছেন। এই সব জায়গায় ক্রিয়াপদের রূপ ভিন্ন: কোথাও রুইখ্যা, কোথাও রুইখ্যে, কোথাও রুখে, একই ভাবে কোথাও কাঁইদে, কোথাও কাঁইন্দে, কোথাও কেঁদে, কোথাও কেন্দে; আর [ফারসি উচ্চারণ-অনুসারে ব্যবহৃত] ‘মসজেদে’ সর্বত্র হয়েছে ‘মসজিদে’]; পঙ্ক্তি-বিন্যাসের ভিন্নতাও দেখা যায়।

 

২.

নিঠুর গরজী, তুই কি মানস-মুকুল ভাজবি আগুনে?
তুই ফুল ফটাবি, বাস ছুটাবি, সবুর বিহনে?

.        দেখনা আমার পরম গুরু সাঁই,
যে যুগ যুগান্তে ফুটায় মুকুল, তাড়াহুড়া নাই।
.        তোর লোভ প্রচণ্ড,
.        তাই ভরসা দণ্ড
.           এর আছে কোন উপায়?

.        কয় যে মদন,
.        শোন নিবেদন
.        দিসনে বেদন
.           সেই শ্রীগুরুর মনে,

.        সহজ ধারা,
.        আপন হারা
.           তাঁর বাণী শুনে,
.              রে গরজী।

[৬৬৬ সংখ্যক গান, বাংলার বাউল ও বাউল-গান, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য সংকলিত, ওরিয়েন্ট বুক কম্পানি কলকাতা, তৃতীয় সংস্করণ, ১৪০৮, পৃ. ১০৪১; উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য গানটি ‘শ্রীললিতমোহন চট্টোপাধ্যায় ও চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গবীণা নামক প্রাচীন ও আধুনিক বাংলা কাব্য-সংগ্রহ পুস্তক হইতে উদ্ধৃত ‘কয়েকটি বাউল গান’ শিরোনামে যুক্ত করে তৃতীয় বন্ধনীর ভিতরে ‘এই গানগুলি শ্রীযুক্ত ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয় কতৃক সংগৃহীত বলিয়া পরিচিত’, এই ভাবে উল্লেখ করেছেন।]

 

৩.

ধরবি যদি অধর মানুষ ধরাকে ধররে মন।
মনফুলে নয়নজলে পূজগে মানুষের শ্রীচরণ॥
ধরার কাছে আছে ধরা,
সেই মানুষটি জ্যান্তে মরা,
মরার সঙ্গে হইয়ে মরা
খোঁজে যে বা জন।
হিংসা নিন্দা তমো যাবে,
তবে দেহ শুদ্ধ হবে,
তবে সে ফল হাতে পাবে,
অধর ধরার এই লক্ষণ॥

আপন দিল দরিয়ায় বুঝ,
বুইঝ্যা প্রেমরসে মজ,
তবে হবে ধরার খোঁজ
হবে উদ্দীপন।
চৈতন্যকে রাইখ্যা খাড়া
হুঁসার হয়ে দেও পাহারা,
ঠিক রাখ দুই নয়নতারা,
সহজভাবে কয় মদন।
শুদ্ধভাবে নিষ্ঠা কইরা
থাকরে মন চাতক হইয়া
নবঘন বারি পাইলে
শান্ত হবে রে ততক্ষণ॥

[৩৪৪ সংখ্যক গান, বাংলার বাউল ও বাউল-গান, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য সংকলিত, ওরিয়েন্ট বুক কম্পানি কলকাতা, তৃতীয় সংস্করণ, ১৪০৮, পৃ.৭৭৯]

 

৪.

ধরবি রে অধর জানবিরে অধর
ধরবি সে আলেক মানুষ তার পাটনী ঠিক কর।
আসমান পাতালে পাত ফাঁদ
যোগিনী ধরতে হবে গগনের চাঁদ,
মনে প্রাণে ঐক্য হলে তারে পাওয়া যায়
মদন শা ফকিরে বলে তারে পাওয়া যায়॥

[মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন রচনাবলী (প্রথম খণ্ড), মোমেন চৌধুরী সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৪, পৃ. ২৯২।]

 

৫.

অকৈতব মানুষের কথা কইতে লাগে ভয়।
মনে হয়, ফল্গুনদী যেমন অন্তঃশীলা বয়॥

.        মানুষ মানুষ সকলেতে কয়,
.        কথা মিথ্যা কিছু নয়,
.          এই মানুষের প্রলয়েতে
.              তিন মানুষ হয়।
.        মানুষ স্বয়ং শক্তি,
.        জীবের মুক্তি,
.        যুক্তি করে জানতে হয়॥

রত্নবেদীতে নিধি বসে রয়,
.        এ তিন মানুষের কেউ নয়,
.        পূর্ণিমার চাঁদ ষোলকলা নিগমে উদয়।
.          ইহার নির্ণয় করে ধরো তারে,
.              সে সকলের অগোচরে রয়॥

.        ভাণ্ড হইতে এ ব্রহ্মাণ্ড হয়
.              যুগে আছে পরিচয়,
.        হলে মরা, যাবে ধরা রসিক মহাশয়।
মদন কয়, সে মানুষ বেশে, এই স্বদেশে,
.        লাগিয়ে দিশে দেশে রয়॥

[৪৫২ সংখ্যক গান, বাংলার বাউল ও বাউল-গান, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য সংকলিত, ওরিয়েন্ট বুক কম্পানি, কলকাতা, তৃতীয় সংস্করণ, ১৪০৮, পৃ. ৮৬১-৮৬২]

 

৬.

আছে পূর্ণিমার চাঁদ মেঘে ঢাকা।
মেঘ না কাটলে চাঁদের
.      পাবি না রে দেখা॥

যখন মেঘ তোর কেটে যাবে,
.        তখন চাঁদের উদয় হবে,
.        জ্ঞান-চন্দ্রে দেখতে পাবে
.        চাঁদে চাঁদে মাখা-চোখা॥

মেঘের কোলে চাঁদ রয়েছে
.        চাঁদের কোলে বিদ্যুৎ-সখা।
.        মেঘ কেটে চাঁদ উদয় করা
.        সেটা কিন্তু লেখা-জোখা॥

মদন বলে, অন্ধকারে
.        ধন্ধ হয়ে রইলাম একা।
.        যার হয়েছে গুরু-কৃপা
.        সেই পেয়েছে চাঁদের দেখা॥

[৫৩১ সংখ্যক গান, বাংলার বাউল ও বাউল-গান, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য সংকলিত, ওরিয়েন্ট বুক কম্পানি কলকাতা, তৃতীয় সংস্করণ, ১৪০৮, পৃ. ৯২৭] এই গানের একটি ভিন্নপাঠ সংগ্রহ করেছেন হারামণির সংকলক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, নিচে তার উল্লেখ করা হলো:

আছে পূর্ণিমার চাঁদ মেঘে ঢাকা
.        চাঁদের নিচে বিন্দু সখা।
মেঘের আড়ে চাঁদ রয়েছে
মেঘ কেটে চাঁদ উদয় করা
সেডা কেবল কথার কথা।
মদন বলে অন্ধকারে
বন্দি হয়ে রলি একা,
যাহার আছে মুরশিদ সখা
সেই সে পাবে চাঁদের দেখা॥

[মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন রচনাবলী প্রথম খণ্ড, মোমেন চৌধুরী সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৪, পৃ. ২৯২।

 

৭.

কাম নদীতে সাঁতার দিতে
কখনও যেও না রে।
দিলে সাঁতার পাবি না কিনার,
যাবি রে ঘোলায় পড়ে॥
চুম্বক পাহাড়ে লাগলে ধাক্কা
ধাক্কায় আগুন ছুটে
অনুরাগের হাল মানে না
হাল যায় রে টুটে
তাই বলেছে মদন, থাক হুঁশিয়ারে॥

[বাংলার লোকায়ত সাহিত্য, আবদুল কাদির, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৫, পৃ. ১০১। লেখক গানটিকে তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ বলে উল্লেখ করেছেন।]
সময়ের সন্তানেরা
সময়ের সন্তানেরা-২
After-Article Banner 2
After-Article Banner 2 mob

মন্তব্য লিখুন

ধন্যবাদ। নাম ও মতামত লিখুন। পর্যালোচনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মন্তব্যটি প্রকাশিত হবে।

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত