৪ নভেম্বর ২০২৬
আমার ঋত্বিক
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
নাফিউল হক
কবি, সমালোচক
60

নাফিউল হক
কবি, সমালোচক

60

আমার ঋত্বিক

ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে ভাবতে বসলে আসলে কোনো মানুষকে নিয়ে ভাবা হয় না। ভাবতে হয় একটা নদীকে নিয়ে, একটা দেশকে নিয়ে, একটা ক্ষতকে নিয়ে। যে নদী পার হওয়া যায় না, যে দেশে আর ফেরা যায় না, যে ক্ষত কোনোদিন শুকায় না।

ধরুন, আপনি বসে আছেন ঢাকার একটা মেসবাড়ির ছাদে, কিংবা কলকাতার যাদবপুরের কোনো ইউনিভার্সিটি হলের ভাঙা চেয়ারে, কিংবা রাজশাহীর কোনো চায়ের দোকানে, কিংবা আপনার নিজের ঘরে, যেখানে কারেন্ট নেই, হাতে এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, লোডশেডিং, বাইরে মিছিলের শব্দ, আর পর্দায়, আপনার ল্যাপটপের ভাঙা পর্দায় চলছে মেঘে ঢাকা তারা। নীতা চিৎকার করছে না, নীতা কাঁদছেও না ঠিক, নীতা শুধু ভাঙা গলায়, যক্ষ্মা রোগীর মতো হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে– দাদা, আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম। এই একটা বাক্য, এই সামান্য, অতি সামান্য, প্রায় ফিসফিস করে বলা আর্তনাদ, আপনাকে কেন সারারাত ঘুমোতে দেয় না? কেন এই বাক্যটা শোনার পর আপনার মনে হয় আপনার নিজের বোন, আপনার নিজের মা, আপনার নিজের প্রেমিকা, আপনার নিজের মেয়ে, আপনার নিজের দেশ সবাই একসাথে এই কথাটা বলছে, সবাই একসাথে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে, আপনার শার্টের কলার ধরে ঝাঁকাচ্ছে? কারণ এই বাক্যটা আপনার নয়, আমার নয়, এটা আমাদের সবার মায়ের, আমাদের সবার বোনের, যে বোনকে আমরা দেশভাগের পর আর খুঁজে পাইনি, যাকে আমরা সংসারের জাঁতাকলে, চাকরির বাজারে, বিয়ের বাজারে, বিসিএস-এর বাজারে পিষে মেরেছি, যাকে আমরা বলেছি– তুই একটু মানিয়ে নে। ঋত্বিক ঘটক এই জায়গাটাতেই আলাদা, সম্পূর্ণ আলাদা, ভয়ংকর রকমের আলাদা, নির্মম রকমের আলাদা। তিনি সিনেমা বানাননি, তিনি বিনোদন তৈরি করেননি, তিনি কন্টেন্ট বানাননি, তিনি একটা ক্ষতকে, একটা খোলা, পচা, রক্তাক্ত, পুঁজভরা ক্ষতকে ক্যামেরা দিয়ে সেলাই করার চেষ্টা করেছেন, এবং প্রতিবারই সুতোটা ছিঁড়ে গেছে, রক্ত আরো বেশি করে গড়িয়েছে, আর আমরা সেই রক্ত দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি, বলেছি– উফ, কি নোংরা।

ঋত্বিকের জন্ম ১৯২৫, ঢাকায়, ৪ নভেম্বর। এই জন্মের ভেতরে যে কাঁটাটা লুকিয়ে আছে, যে কাঁটাটা আমাদের গলায়, আমাদের জিভে, আমাদের ইতিহাসে বিঁধে আছে আজও, সেটা হলো – একজন মানুষ, যার শৈশব কেটেছে পদ্মার পাড়ে, রাজশাহীতে, বালিয়াডাঙ্গায়, যার কানে লেগে আছে পূর্ববাংলার ভাটিয়ালি, বাউলের একতারা, পল্লীগীতি, কীর্তন, যাত্রা, যার নাকে লেগে আছে বর্ষার কাদামাটির গন্ধ, আমনের ক্ষেতের গন্ধ, তাকে একদিন, ১৯৪৭ সালে, হঠাৎ করে এক রাতের মধ্যে বলা হলো– তোমার বাড়ি ওটা নয়, তোমার বাড়ি ওপারে, তোমাকে চলে যেতে হবে, তুমি এখন থেকে রিফিউজি। এই যে ‘ওপার’ শব্দটা, এই ছোট্ট, দুই অক্ষরের শব্দটা, এই শব্দটা ঋত্বিকের সমস্ত সিনেমার মূল মন্ত্র, তার সমস্ত সিনেমার আদি পাপ, তার সমস্ত সিনেমার মূল সুর, তার সমস্ত সিনেমার বীজমন্ত্র। ওপার কোথায়? ওপার কি কলকাতা? ওপার কি স্বপ্ন? ওপার কি সেই বাংলাদেশ যা তিনি আর ফিরে পাননি? ওপার কি মৃত্যু? ওপার কি কল্পনা? ঋত্বিক কখনো এর উত্তর দেননি, দিতে চাননি, দিতে পারেননি। তিনি শুধু তার ক্যামেরাকে, তার ক্লান্ত, মাতাল, রক্তাক্ত, ধোঁয়াটে ক্যামেরাকে ওপারের দিকে তাক করিয়ে রেখেছেন আজীবন, আমৃত্যু, ৫০ বছর। আর এই তাকিয়ে থাকার নামই হলো তাঁর রাজনীতি, তাঁর নন্দনতত্ত্ব, তাঁর প্রেম, তাঁর দর্শন, তাঁর সিনেমা।

ঋত্বিক ঘটক
ঋত্বিক ঘটক

আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো আমরা কোনো মহাকাব্য পাইনি। আমাদের মহাকাব্য চুরি হয়ে গেছে, আমাদের মহাকাব্য ইংরেজরা নিয়ে গেছে, পাকিস্তানিরা পুড়িয়ে দিয়েছে, আমাদের বাবারা বিক্রি করে দিয়েছে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ভুলিয়ে দিয়েছে, আর আমরা যেটুকু পেয়েছি সেটা হলো কিছু বিচ্ছিন্ন শ্লোক, কিছু ছেঁড়া পাতা। ঋত্বিক ঘটক সেই চুরি যাওয়া মহাকাব্যটাকে, সেই হারিয়ে যাওয়া মহাভারতটাকে, সেই হারিয়ে যাওয়া মঙ্গলকাব্যটাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন সিনেমায়, একেবারে নিজের মতো করে, নিজের রক্ত দিয়ে। তিনি যখন অযান্ত্রিক বানান ১৯৫৮ সালে, তখন একটা গাড়িকে, একটা পুরনো, ভাঙা, শব্দ করা ট্যাক্সিকে মানুষ বানিয়ে দেন। বিমল আর তার জগদ্দল গাড়ি। বিমলের আর কেউ নেই, শুধু এই গাড়িটা আছে। এটা কি নিছক গল্প? সায়েন্স ফিকশন? অবাস্তব গল্প? না। এটা হলো উদ্বাস্তু মানুষের গল্প, একা মানুষের গল্প, পরিত্যক্ত মানুষের গল্প। যে মানুষটার আর কিছু নেই, যার ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যার পরিচয় কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যার ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তার একটা ভাঙা যন্ত্র ছাড়া, একটা ভাঙা স্মৃতি ছাড়া, একটা ভাঙা গাড়ি ছাড়া আর কিছু নেই, সে সেই যন্ত্রকেই, সেই স্মৃতিকেই, সেই গাড়িটাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়, তার সাথে কথা বলে, তার সাথে প্রেম করে। এই যে ফেটিশ, এই যে বস্তুর প্রতি ভালোবাসা, এই যে জড়ের প্রতি প্রেম, এটা কলকাতার ফুটপাতে, শিয়ালদা স্টেশনে, বিজয়গড় কলোনিতে, আজাদগড় কলোনিতে পড়ে থাকা পূর্ববাংলার মানুষের ইতিহাস, যারা একটা ট্রাঙ্ক, একটা হারমোনিয়াম, একটা ছবি আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিল। ঋত্বিক এই ইতিহাসকে কোনো ডকুমেন্টারির মতো করে, কোনো বক্তৃতার মতো করে, কোনো এনজিও রিপোর্টের মতো করে বলেননি। তিনি একে মিথ বানিয়েছেন, একে পুরাণ বানিয়েছেন, একে ট্র্যাজেডি বানিয়েছেন।

আপনি যদি ঋত্বিকের সিনেমার শব্দ শোনেন, চোখ বন্ধ করে শুধু শোনেন, কানে হেডফোন লাগিয়ে শোনেন, তাহলে বুঝবেন তিনি কত বড় মাপের সুরকার ছিলেন, কত বড় মাপের শব্দশিল্পী ছিলেন, কত বড় মাপের কম্পোজার ছিলেন, কত বড় মাপের সাউন্ড ডিজাইনার ছিলেন, যখন সাউন্ড ডিজাইন শব্দটাই ছিল না। সত্যজিৎ রায় ছবি দেখাতেন চোখ দিয়ে, তার ফ্রেম ছিল ছবির মতো সুন্দর, পরিপাটি, ইউরোপীয়, রেনেসাঁর মতো। আর ঋত্বিক ছবি শোনাতেন কান দিয়ে, বুক দিয়ে, পেট দিয়ে। তার ছবিতে রবীন্দ্রনাথের গান বেজে ওঠে, কিন্তু সে রবীন্দ্রনাথ আমাদের চেনা রবীন্দ্রনাথ নন, আমাদের শান্তিনিকেতনের, আমাদের অনুষ্ঠানের, আমাদের ফেসবুক কভারের রবীন্দ্রনাথ নন। সে রবীন্দ্রনাথকে মনে হয় যেন কোনো শ্মশানে কেউ হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইছে, কোনো উদ্বাস্তু কলোনির ভাঙা ঘরে, টিনের চালে বৃষ্টি পড়ছে আর কেউ কাঁদতে কাঁদতে, মদ খেতে খেতে গাইছে। তার ছবিতে ধ্বনি আছে, আর্তনাদ আছে, ট্রেনের হুইসেল আছে, শাঁখের শব্দ আছে, বেদের মন্ত্র আছে, আজানের সুর আছে, বাউলের গান আছে, ভাটিয়ালি আছে, মার্ক্সের শ্লোগান আছে, কান্না আছে। তিনি সাউন্ডকে ব্যবহার করেছেন একটা অস্ত্রের মতো, একটা ছুরির মতো, একটা হাতুড়ির মতো, একটা ঢোলের মতো। ‘কোমল গান্ধার’ ছবিতে যখন দুই দল থিয়েটারকর্মী, যারা আসলে দুই বাংলার প্রতীক, দুই আদর্শের প্রতীক, পদ্মার দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে, মাঝখানে কাঁটাতার নেই কিন্তু নদী আছে, একটা অদৃশ্য কাঁটাতার আছে, তারা ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ গায়, একসাথে গায়, তখন আপনি বুঝতে পারেন, এটা একটা কান্না, এটা একটা হাহাকার, যা দুই বাংলাকে এক করতে চাইছে, যা বলতে চাইছে আমরা এক ছিলাম, আমরা একই আকাশের নিচে ছিলাম। কিন্তু নদীটা মাঝখানে বয়ে যাচ্ছে, নদীটা কাউকে পার হতে দিচ্ছে না, নদীটাই এখন সীমান্ত, নদীটাই এখন বিএসএফ, নদীটাই এখন পাসপোর্ট। এই না পারতে পারার যন্ত্রণাই হলো ঋত্বিক, এই যন্ত্রণাই হলো আমাদের ইতিহাস, আমাদের বর্তমান।

মেঘে ঢাকা তারা, সুবর্ণরেখা ও অযান্ত্রিক
মেঘে ঢাকা তারা, সুবর্ণরেখা ও অযান্ত্রিক

এই নদী, এই পারাপার, এই না-পারতে-পারার বেদনা থেকেই ঋত্বিকের নারীরা জন্ম নেয়। নীতা, সীতা, সুজাতা, পার্বতী, বাসন্তী, কণিকা, অনসূয়া। এরা কেউ নায়িকা নন, এরা কেউ প্রেমিকা নন, এরা কেউ আইটেম সং-এর নারী নন, এরা কেউ ভোগের বস্তু নন, এরা হলো দেবী, যাদেরকে আমরা বলি দিয়েছি, যাদেরকে আমরা প্রতিদিন বলি দিচ্ছি, রাস্তায়, বাসে, অফিসে, সংসারে। লক্ষ করে দেখবেন, ঋত্বিকের প্রত্যেকটি প্রধান নারী চরিত্র শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়, পাগল হয়ে যায়, মরে যায়, হারিয়ে যায়, বেশ্যা হয়ে যায়, আত্মহত্যা করে। কেন? কেন তিনি বারবার এই একই গল্প বলেন? কেন তিনি বারবার একজন নারীকে ধ্বংস হতে দেখান? কারণ ঋত্বিক বিশ্বাস করতেন, গভীরভাবে, রক্তের ভেতর থেকে বিশ্বাস করতেন, এই সমাজ, এই উদ্বাস্তু, লোভী, আত্মকেন্দ্রিক, ভণ্ড, ব্রাহ্মণ্যবাদী, পিতৃতান্ত্রিক মধ্যবিত্ত সমাজ একজন দেবীকে ধারণ করতে পারে না, একজন সত্যিকারের মানুষকেও ধারণ করতে পারে না, একজন সৎ মানুষকেও ধারণ করতে পারে না। নীতাকে তার পরিবার চুষে খায়, তার রক্ত খায়। তার দাদা, তার বাবা, তার প্রেমিক, তার ছোট ভাই – সবাই তার রক্ত খেয়ে বাঁচে, তার টিউশনির টাকায় বাঁচে, তার ত্যাগের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, বলে – তুই তো এখন অচল। এটা কি শুধু একটা পরিবারের গল্প? একটা মেয়ের গল্প? না, এটা হলো একটা দেশের গল্প, একটা সভ্যতার গল্প, যে দেশ তার মেয়েদের, তার নদীদের, তার মাটিকে, তার ভাষাকে, তার জঙ্গলকে বিক্রি করে দিয়ে উন্নয়নের কথা বলে, প্রগতির কথা বলে, স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলে, ডিজিটাল ইন্ডিয়ার কথা বলে। ঋত্বিক এই বিক্রি হয়ে যাওয়াটাকে, এই দালালিটাকে, এই বেশ্যাবৃত্তিটাকে কখনো ক্ষমা করেননি। তাই তার সিনেমায় কোনো ক্ষমা নেই, কোনো আপস নেই, কোনো মিষ্টি শেষ নেই, কোনো হ্যাপি এন্ডিং নেই। আছে শুধু একটা জ্বলন্ত চোখ, একটা লাল চোখ, যে চোখ আপনার দিকে, আপনার বুকের দিকে, আপনার ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে আছে এবং জিজ্ঞেস করছে– তুমি কী করেছ? তুমি তোমার বোনের জন্য, তোমার নদীর জন্য, তোমার ভাষার জন্য কী করেছ? উত্তর আছে আপনার কাছে?

অনেকে বলেন, ঋত্বিক ঘটক মদ্যপ ছিলেন, বিশৃঙ্খল ছিলেন, উগ্র ছিলেন, বদমেজাজি ছিলেন, অহংকারী ছিলেন, তাই তিনি ব্যর্থ, তাই তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে টিকতে পারেননি, তাই তার ছবি চলেনি, তাই তিনি সত্যজিৎ রায়ের মতো হতে পারেননি। এই কথাটা শুনলে আমার হাসি পায়, খুব করুণ, খুব তেতো, খুব রক্তাক্ত, খুব অসহায় একটা হাসি। একজন মানুষ, যিনি সারাজীবন একটা দেশভাগের যন্ত্রণা, একটা মহাদেশ ভাগের যন্ত্রণা, একটা সভ্যতা ভাগের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ঘুরেছেন, যিনি দেখেছেন তার স্বপ্নের কমিউনিস্ট পার্টি, যার জন্য তিনি জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলেন, যার জন্য তিনি আইপিটিএ-তে নাটক করেছেন, গান গেয়েছেন, সেই পার্টি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে, ব্যক্তিগত স্বার্থে, ক্ষমতার লোভে, মস্কো-পিকিং দ্বন্দ্বে, যিনি দেখেছেন তার প্রিয় বন্ধু, তার সহকর্মীরা, তার প্রিয় ছাত্ররা তাকে ছেড়ে বাণিজ্যিক সিনেমার দিকে, নিরাপদ জীবনের দিকে, সরকারি চাকরির দিকে চলে যাচ্ছে, যিনি দেখেছেন তার ছবি কোনো প্রযোজক নিতে চায় না, কোনো হল মালিক চালাতে চায় না, কোনো দর্শক দেখতে চায় না, কোনো পুরস্কার কমিটি তাকে ডাকে না, তিনি মদ খাবেন না তো কে খাবে? কে খাবে? আপনি খাবেন? তার মদ্যপান ছিল তার প্রতিবাদ, তার মদ্যপান ছিল তার কান্না, তার মদ্যপান ছিল তার একমাত্র বন্ধু, তার একমাত্র প্রেমিকা। তার বিশৃঙ্খলা ছিল তার শৃঙ্খলা, তার পাগলামি ছিল তার সুস্থতা, তার ব্যর্থতা ছিল তার সাফল্য। তিনি নিজেকে গুছিয়ে রাখতে চাননি, কারণ যে পৃথিবীতে তিনি বাস করতেন, সেই পৃথিবীটাই ছিল অগোছালো, নোংরা, মিথ্যাবাদী, ভণ্ড, সাজানো, মেকআপ করা। গোছানো মানুষেরা সেই পৃথিবীতে টিকে যায়, ভালো থাকে, ফ্ল্যাট কেনে, গাড়ি কেনে, ফেস্টিভ্যালে যায়, কিন্তু সত্যিকারের শিল্পীরা পারে না, তাদের গলা কেটে যায়, তাদের লিভার পচে যায়।

সত্যজিৎ রায় ছবি দেখাতেন চোখ দিয়ে, তার ফ্রেম ছিল ছবির মতো সুন্দর, পরিপাটি, ইউরোপীয়, রেনেসাঁর মতো। আর ঋত্বিক ছবি শোনাতেন কান দিয়ে, বুক দিয়ে, পেট দিয়ে। তার ছবিতে রবীন্দ্রনাথের গান বেজে ওঠে, কিন্তু সে রবীন্দ্রনাথ আমাদের চেনা রবীন্দ্রনাথ নন, আমাদের শান্তিনিকেতনের, আমাদের অনুষ্ঠানের, আমাদের ফেসবুক কভারের রবীন্দ্রনাথ নন। সে রবীন্দ্রনাথকে মনে হয় যেন কোনো শ্মশানে কেউ হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইছে

তার সুবর্ণরেখা‘র কথা ভাবুন। তার সিনেমার ফর্ম নিয়ে ভাবুন, তার নির্মাণ নিয়ে ভাবুন, তার ভাষা নিয়ে ভাবুন। ঘুমাতে পারবেন না আপনি। তিনি কি কখনো একটা সরলরৈখিক গল্প বলেছেন? একটা শুরু, মধ্য, শেষ, ক্লাইম্যাক্স, রেজোলিউশন? বলেননি। তার গল্প সবসময় ভাঙা, ছেঁড়া, এলোমেলো, খাপছাড়া, অসম্পূর্ণ। ফ্ল্যাশব্যাক, ফ্ল্যাশ ফরোয়ার্ড, স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন, লোকসংগীত, মন্ত্র, যাত্রা, মেলোড্রামা, ব্রেখট, আইজেনস্টাইন, সবকিছু একসাথে, একই ফ্রেমে, একই শটে। অনেকে এটাকে দুর্বলতা বলেন, বলেন তিনি স্ক্রিপ্ট লিখতে জানতেন না, তিনি টেকনিক জানতেন না, তিনি হলিউডের গ্রামার মানতেন না, তিনি continuity জানতেন না। আমি বলি, এটাই তার শক্তি, এটাই তার বিপ্লব, এটাই তার ম্যানিফেস্টো। কারণ দেশভাগের পর আমাদের জীবনটাই তো আর সরল রৈখিক নেই, আমাদের জীবনটা ভেঙে গেছে, টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, আমাদের স্মৃতি ভেঙে গেছে, আমাদের পরিবার ভেঙে গেছে। সেই ভাঙা জীবনকে কি আপনি একটা পরিপাটি, সুন্দর, তিন অঙ্কের, সিড ফিল্ডের ফর্মুলা মেনে গল্প দিয়ে বলতে পারবেন? পারবেন না। আপনাকে ভাঙা ফর্মই ব্যবহার করতে হবে, আপনাকে কোলাজ করতে হবে, আপনাকে bricolage করতে হবে। ঋত্বিক সেটাই করেছেন। তিনি বাংলা সিনেমায় প্রথম মন্তাজকে, প্রথম কোলাজকে, প্রথম ডিস্ট্যান্সিয়েশনকে, প্রথম epic theatre কে নিয়ে এসেছেন আইজেনস্টাইনের মতো করে, ব্রেখটের মতো করে, কিন্তু আইজেনস্টাইন বা ব্রেখটের মতো করে নয়, একেবারে বাঙালি কায়দায়, যাত্রা-পালার কায়দায়, কবিগানের কায়দায়, গম্ভীরার কায়দায়। তার সিনেমা তাই যাত্রার মতো, যেখানে একই সাথে কান্না আছে, গান আছে, ভাষণ আছে, দর্শকের সাথে সরাসরি কথা বলা আছে, গালাগালি আছে।

আপনি অযান্ত্রিক থেকে যুক্তি তক্কো আর গপ্পো পর্যন্ত যদি পরপর দেখেন, একটানা দেখেন, না ঘুমিয়ে দেখেন, তাহলে দেখবেন একটা মানুষ কিভাবে ধীরে ধীরে নিজেকে খুন করছে, নিজেকে নিঃশেষ করছে, নিজেকে পুড়িয়ে ফেলছে, নিজেকে ছাই বানাচ্ছে। প্রথম দিকের ছবিতে তবু একটা আশা আছে, একটা সংগঠনের স্বপ্ন আছে, আইপিটিএ-র স্বপ্ন আছে, কমিউনিস্ট পার্টির স্বপ্ন আছে, মানুষের উপর বিশ্বাস আছে, ভবিষ্যতের উপর বিশ্বাস আছে। নাগরিক ছবিতে, যা তার প্রথম ছবি কিন্তু মুক্তি পেয়েছে অনেক পরে, ১৯৭৭ সালে, তার মৃত্যুর পর, সেখানে একদল বেকার যুবক চাকরি খুঁজছে, তারা স্বপ্ন দেখছে সমাজ বদলাবে, তারা প্রেম করছে, তারা হাসছে। কিন্তু শেষের দিকে, সুবর্ণরেখা, তিতাস, যুক্তি তক্কো আর গপ্পোতে এসে সেই স্বপ্নটা মরে গেছে, পচে গেছে, গলে গেছে। সেখানে শুধু হাহাকার, শুধু শূন্যতা, শুধু মদ, শুধু মৃত্যু। যুক্তি তক্কো আর গপ্পোতে ঋত্বিক নিজেই অভিনয় করেছেন, নীলকণ্ঠ বাগচী নামে, একজন মাতাল, উদ্বাস্তু, ক্লান্ত, পরাজিত বুদ্ধিজীবী, যে হাঁটতে হাঁটতে, মদ খেতে খেতে, বমি করতে করতে বাংলার গ্রাম, বাংলার মাঠ, বাংলার ধ্বংসস্তূপ, বাংলার কারখানা দিয়ে যাচ্ছে আর বলছে– ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো, ভাবাটা প্র্যাকটিস করো। এই লোকটা কে? এই লোকটা ঋত্বিক নিজে, এই লোকটা আমরা, এই লোকটা আজকের বাংলাদেশের প্রত্যেকটা তরুণ, প্রত্যেকটা ছাত্র যে ভাবতে চায় কিন্তু ভাবতে দেওয়া হয় না, যাকে বলা হয়– বেশি ভেবো না, চাকরি করো। তিনি জানতেন তিনি মারা যাচ্ছেন, তিনি জানতেন তার লিভার পচে গেছে, তিনি জানতেন তার সময় শেষ, তার টাকা নেই, তার বন্ধু নেই। তাই তিনি নিজের মৃত্যুটাকেও, নিজের শবযাত্রাটাকেও সিনেমা বানিয়ে দিয়ে গেলেন, নিজের শবের উপর ক্যামেরা রেখে গেলেন। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি, এর চেয়ে বড় সিনেমা, এর চেয়ে বড় সত্য আর কী হতে পারে?

মেঘে ঢাকা তারা
মেঘে ঢাকা তারা

তার শেষ জীবনের ছবিগুলো দেখুন– তিতাস একটি নদীর নাম। অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস, যে উপন্যাস লেখা হয়েছে পূর্ববাংলার জেলেদের, মালোদের জীবন নিয়ে, যে উপন্যাস আমাদের সবচেয়ে বড় মহাকাব্যগুলোর একটা, যে উপন্যাস আমাদের ‘মবি ডিক’। এই ছবিটা তিনি বানিয়েছিলেন বাংলাদেশে এসে, ১৯৭৩ সালে, স্বাধীনতার পর, যখন বাংলাদেশ সবে স্বাধীন হয়েছে, যখন তার বুক ভরা আশা যে তিনি তার দেশে, তার ঢাকায়, তার পদ্মার পাড়ে, তার তিতাসের পাড়ে ফিরে গেছেন, যখন তিনি ভেবেছিলেন এবার বোধহয় তার উদ্বাস্তু জীবন শেষ হলো। অনেকে বলেন, ছবিটা অসম্পূর্ণ, ছবিটা খাপছাড়া, ছবিটার টেকনিক্যাল কোয়ালিটি খারাপ, ডাবিং খারাপ, প্রিন্ট খারাপ। আমি বলি, ছবিটা তো এমনই হওয়ার কথা ছিল, এর চেয়ে ভালো হওয়া সম্ভবই ছিল না, উচিতও ছিল না, হলে মিথ্যা হতো। একটা নদী যখন মরে যায়, তখন কি তার মৃত্যুটা খুব গোছানো হয়, খুব সুন্দর হয়, খুব সিনেমাটিক হয়, খুব কালার কারেক্টেড হয়? তিতাস মরে যাচ্ছে। তার বুকে চর পড়ছে। জেলেরা মাছ পাচ্ছে না। তাদের প্রেম, তাদের গান, তাদের সবকিছু শুকিয়ে যাচ্ছে, তাদের সমাজ, তাদের মালো সমাজ, তাদের মৎস্যজীবী সমাজ ভেঙে যাচ্ছে, বাজার অর্থনীতি, মহাজন, জমিদার এসে তাদের খেয়ে ফেলছে। এই শুকিয়ে যাওয়াটা, এই মরে যাওয়াটা কি খুব সুন্দর করে, খুব সাজিয়ে-গুছিয়ে, 4K রেজোলিউশনে, ড্রোন শটে দেখানো যায়? যায় না। ঋত্বিক তাই ক্যামেরাকে কাঁপিয়ে দিয়েছেন, তিনি শব্দকে ভেঙে দিয়েছেন, তিনি গল্পকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছেন, তিনি অভিনেতাদের দিয়ে অতিরিক্ত অভিনয় করিয়েছেন, মেলোড্রামা করিয়েছেন। কারণ দেশভাগের পর আমাদের গল্প আর আস্ত নেই, আমাদের নদী আর আস্ত নেই। আমাদের গল্প এখন টুকরো টুকরো, আমাদের নদী এখন মরা খাল, দখল হয়ে যাওয়া খাল, বালু ভরাট হয়ে যাওয়া নদী। এই টুকরো গল্পগুলোকে, এই মরা নদীটাকে জোড়া লাগানোর বৃথা, করুণ, মহৎ, পাগলামি, ব্যর্থ চেষ্টাই হলো ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা, ঋত্বিক ঘটকের জীবন, ঋত্বিক ঘটকের রাজনীতি।

আপনি যদি আজকের বাংলাদেশে বসে, এই ২০২৬ সালে বসে, এই ঢাকার ধুলো, জ্যাম, আর হতাশার মধ্যে বসে, এই বাংলাদেশে বসে যেখানে প্রতিদিন নদী ভরাট হচ্ছে, যেখানে প্রতিদিন একটা করে তিতাস মরছে, ঋত্বিককে বুঝতে চান, তাহলে আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে হবে নিজেকে, খুব সৎভাবে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে। আপনি কি উদ্বাস্তু? আপনি হয়তো বলবেন, না, আমার তো বাড়ি আছে, ঘর আছে, জমি আছে, ফ্ল্যাট আছে, আমার তো পাসপোর্ট আছে, আমার তো এনআইডি আছে, আমার তো ভোটার আইডি আছে। কিন্তু আমি বলব, আমরা সবাই উদ্বাস্তু, প্রত্যেকেই, আজকের এই দুনিয়ায় প্রত্যেকেই উদ্বাস্তু। আমরা আমাদের ভাষা থেকে উদ্বাস্তু, আমরা আমাদের গান থেকে উদ্বাস্তু, আমরা আমাদের নদী থেকে উদ্বাস্তু, আমরা আমাদের মিথ থেকে উদ্বাস্তু, আমরা আমাদের ইতিহাস থেকে উদ্বাস্তু, আমরা আমাদের শৈশব থেকে উদ্বাস্তু। ঢাকার এই যে কংক্রিটের জঙ্গল, এই যে ধুলো, এই যে জ্যাম, এই যে শব্দদূষণ, এই যে বায়ুদূষণ, এই জঙ্গলে কি আপনি তিতাসকে খুঁজে পাবেন? পাবেন না। কারণ তিতাস এখন বুড়িগঙ্গার মতো কালো, মৃত, দুর্গন্ধময়, দখল হয়ে গেছে, মরে গেছে। শীতলক্ষ্যাও মরে যাচ্ছে, পদ্মাও মরছে। ঋত্বিক এই মৃত্যুটাকে, এই দখল হয়ে যাওয়াটাকে, এই খুনটাকে পঞ্চাশ বছর আগে দেখতে পেয়েছিলেন, যখন আমরা উন্নয়নের নামে, ডেভেলপমেন্টের নামে, স্মার্ট সিটির নামে নদী ভরাট করার কথা ভাবিওনি, যখন আমরা ভেবেছি নদী থাকবে চিরকাল, মাছ থাকবে চিরকাল। তাই তিনি চিৎকার করেছিলেন, পাগলের মতো চিৎকার করেছিলেন, মাতালের মতো চিৎকার করেছিলেন। তার চিৎকারকে আমরা পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিয়েছি, আমরা বলেছি লোকটা মদ খেয়ে আবোল-তাবোল বকছে, লোকটা কমিউনিস্ট, লোকটা হিন্দু, লোকটা উদ্বাস্তু।

তিতাস একটি নদীর নাম, নাগরিক, যুক্তি তক্কো আর গপ্পো
তিতাস একটি নদীর নাম, নাগরিক, যুক্তি তক্কো আর গপ্পো

নিঃসঙ্গতা, দায়, প্রেম আর লজ্জা। এই চারটা শব্দকে পাশাপাশি রেখে একটা চতুর্ভুজ বানান, একটা ঘর বানান। ঋত্বিক ঘটক ছিলেন বাংলা সিনেমার সবচেয়ে নিঃসঙ্গ, সবচেয়ে দায়বদ্ধ, সবচেয়ে প্রেমিক এবং সবচেয়ে লজ্জিত মানুষ। সত্যজিৎ রায়ের পাশে ছিল গোটা পশ্চিমা দুনিয়া, তার পাশে ছিল কান ফেস্টিভ্যাল, অস্কার, ফ্রান্সের সরকার, তার পাশে ছিল এলিট, তার পাশে ছিল টাকা। মৃণাল সেনের পাশে ছিল ইউরোপের বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা, বার্লিন ফেস্টিভ্যাল, মস্কো, ভেনিস। আর ঋত্বিকের পাশে কে ছিল? কেউ না, কেউ ছিল না, কেউ থাকে না। তার পাশে ছিল শুধু কিছু তরুণ, যারা তার মতোই পাগল, তার মতোই স্বপ্ন দেখত, তার মতোই মদ খেত, যারা তার কাছ থেকে আগুনটা নিতে এসেছিল, সেই আগুনে পুড়তে এসেছিল, সেই আগুনে হাত সেঁকতে এসেছিল। তিনি পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়াতেন, প্রায় নির্বাসনে, প্রায় একা, প্রায় ভুলে যাওয়া অবস্থায়। তার ছাত্ররা – জন আব্রাহাম, মণি কাউল, কুমার শাহানি, আদুর গোপালকৃষ্ণন, সাঈদ আখতার মির্জা, মণি কাউল – তারা পরে ভারতীয় সিনেমার চেহারা বদলে দিয়েছিল, তারা ভারতীয় নিউ ওয়েভ তৈরি করেছিল, তারা প্যারালাল সিনেমা তৈরি করেছিল, তারা জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল। কিন্তু ঋত্বিক নিজে? তিনি থেকে গেলেন একা, অন্ধকারে, মদ আর দারিদ্র্যের মধ্যে, অবহেলার মধ্যে, অপমানের মধ্যে। কারণ তিনি আপস করতে জানতেন না, তিনি দালালি করতে জানতেন না, তিনি প্রযোজকের পা চাটতে জানতেন না, তিনি সরকারের কাছে হাত পাততে জানতেন না।

এই একাকীত্ব, এই দায়, এই প্রেম, এই লজ্জা থেকেই তার সিনেমায় মিথের জন্ম, পুরাণের জন্ম, মহাকাব্যের জন্ম, লোককথার জন্ম। তিনি বারবার ফিরে গেছেন মহাভারত, রামায়ণ, পুরাণ, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী, বাউল গান, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়ার কাছে। কেন? কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই দেশভাগ, এই উদ্বাস্তু সমস্যা, এই ভাঙন, এই দাঙ্গা, এই সাম্প্রদায়িকতা, এই হিন্দু-মুসলমান – এটা নতুন কিছু নয়, এটা আমাদের রক্তে আছে, আমাদের ডিএনএ-তে আছে, আমাদের জন্মে আছে। এটা আমাদের মহাকাব্যেই লেখা আছে। সীতা বনবাস, রামের বনবাস, পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাস, রাধার বিরহ, চণ্ডীমঙ্গলের ফুল্লরা, মনসামঙ্গলের বেহুলা – এগুলো তো সবই উদ্বাস্তু হওয়ার গল্প, বিচ্ছেদের গল্প, হারানোর গল্প, ভাসতে থাকার গল্প। ঋত্বিক সেই পুরনো গল্পগুলোকে নতুন করে বলতে চেয়েছিলেন, একেবারে আজকের ভাষায়, আজকের যন্ত্রণায়, আজকের মাইকে, আজকের স্লোগানে। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, আমরা সবাই সীতা, আমরা সবাই রাম, যাদেরকে তাদের নিজের ঘর থেকে, নিজের অযোধ্যা থেকে, নিজের বৃন্দাবন থেকে, নিজের ঢাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, এবং আমরা আর ফিরতে পারছি না, আমাদের অযোধ্যা এখন অন্য কারো দখলে, আমাদের ঢাকা এখন অন্য কারো দখলে।

তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন কিভাবে ভাঙা গলায়, ছেঁড়া সুরে, মাতাল হয়ে, নিঃসঙ্গ হয়ে, দরিদ্র হয়ে, পরাজিত হয়ে গান গাইতে হয়, কিভাবে ছেঁড়া ফিল্ম, পোড়া ফিল্ম, নষ্ট ফিল্ম, হারিয়ে যাওয়া ফিল্ম জোড়া লাগিয়ে সিনেমা বানাতে হয়, কিভাবে দেশভাগের পরও, সবকিছু হারানোর পরও, সবাই ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও দেশকে, মানুষকে, নদীকে, বোনকে ভালোবাসতে হয়, আঁকড়ে ধরে থাকতে হয়, বাঁচিয়ে রাখতে হয়

আজ যখন আমরা ওটিটিতে সিনেমা দেখি, যখন আমরা কন্টেন্ট বানাই, যখন আমরা ভিউ আর লাইকের হিসাব করি, যখন আমরা ফর্মুলা মেনে গল্প লিখি, যখন আমরা বলি– দর্শক কী চায়, তখন ঋত্বিককে দেখলে মনে হয় তিনি অন্য কোনো গ্রহের মানুষ, অন্য কোনো সময়ের মানুষ, অন্য কোনো সভ্যতার মানুষ। তিনি কখনো কন্টেন্ট বানাননি, তিনি কখনো দর্শকের মনোরঞ্জন করতে চাননি, তিনি কখনো দর্শককে খুশি করতে চাননি, তিনি কখনো দর্শককে কাস্টমার ভাবেননি। তিনি চেয়েছিলেন দর্শকের বিবেককে আঘাত করতে, তার ঘুম ভাঙিয়ে দিতে, তাকে রক্তাক্ত করতে, তাকে মানুষ বানাতে। তিনি বলতেন, সিনেমা হলো একটা গ্রেনেড, যা দর্শকের মাথায়, তার বুকে ফাটবে, তাকে জাগিয়ে দেবে, তাকে নাড়িয়ে দেবে। আমাদের আজকের সিনেমা, আমাদের আজকের নাটক, আমাদের আজকের কন্টেন্ট, আমাদের আজকের ইউটিউব ভিডিও হলো ঘুমের ওষুধ, যা দর্শককে ঘুম পাড়িয়ে দেয়, তাকে ভুলিয়ে রাখে যে সে উদ্বাস্তু, তাকে ভুলিয়ে রাখে যে তার নদী মরে যাচ্ছে। এই পার্থক্যটা, এই আকাশ-পাতাল পার্থক্যটা, এই শ্রেণিগত পার্থক্যটা বুঝতে পারলেই আপনি বুঝতে পারবেন ঋত্বিক কেন প্রাসঙ্গিক, কেন তিনি আরো বেশি, আরো তীব্রভাবে, আরো রক্তাক্তভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন দিন দিন, এই বাংলাদেশে, এই পশ্চিমবঙ্গে, এই পৃথিবীতে যেখানে সবাই উদ্বাস্তু, যেখানে সবাই রিফিউজি, যেখানে সবাই নিজের ঘর থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে।

শেষ করার আগে একটা দৃশ্যের কথা বলি, যে দৃশ্যটা আমি কখনো ভুলতে পারি না, আপনি ভুলতে পারবেন না, কোনো মানুষ ভুলতে পারবে না যদি তার বুকে হৃদয় থাকে, যদি তার বুকে এখনো একটু মানুষ থাকে। মেঘে ঢাকা তারার শেষ দৃশ্য। নীতা পাগল হয়ে গেছে, সে স্যানাটোরিয়ামে, তার যক্ষ্মা হয়েছে, তার শরীর ভেঙে গেছে, তার মন ভেঙে গেছে, তার স্বপ্ন ভেঙে গেছে। তার ভাই শঙ্কর, যে গায়ক হতে চেয়েছিল, যে বোনের টাকায়, বোনের রক্তে, বোনের জীবনের বিনিময়ে গান শিখেছে, বড় শিল্পী হয়েছে, সে তাকে দেখতে গেছে, অনেক দেরিতে, অনেক দেরিতে। নীতা চিৎকার করে বলছে, দাদা, আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম, দাদা, আমাকে একটু বাঁচতে দাও, আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম, দাদা, আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম। এই দৃশ্যটা দেখার পর, শোনার পর, অনুভব করার পর, বুকের ভেতর নেওয়ার পর আপনি কি আর কখনো ‘ভালো আছি’ বলতে পারবেন বুক ফুলিয়ে, নির্লজ্জের মতো, ভণ্ডের মতো? পারবেন না। কারণ নীতার ভেতরে আপনি আপনার বোনকে দেখবেন, আপনার প্রেমিকাকে দেখবেন, আপনার মাকে দেখবেন, আপনার দেশকে দেখবেন, আপনার নদীকে দেখবেন, আপনার ভাষাকে দেখবেন, আপনার ভবিষ্যৎকে দেখবেন। ঋত্বিক ঘটক আপনাকে এই দেখাটা দেখতে বাধ্য করেন, এই কান্নাটা শুনতে বাধ্য করেন, এই দায়টা নিতে বাধ্য করেন, এই লজ্জাটা পেতে বাধ্য করেন। এটাই তার শাস্তি, এটাই তার উপহার, এটাই তার অভিশাপ, এটাই তার ভালোবাসা, এটাই তার সিনেমা।

আমরা হেরে গেছি। আমরা আমাদের নদীগুলোকে বাঁচাতে পারিনি, আমরা আমাদের নীতাদের বাঁচাতে পারিনি, আমরা আমাদের তিতাসকে বাঁচাতে পারিনি, আমরা আমাদের সীতাদের বাঁচাতে পারিনি, আমরা আমাদের ঋত্বিককে বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু এই হেরে যাওয়ার ভেতরেও, এই পরাজয়ের ভেতরেও, এই ধ্বংসস্তূপের ভেতরেও, এই মৃত নদীর বুকের ভেতরেও একটা আলো আছে, একটা আগুন আছে, একটা বীজ আছে, একটা গান আছে। সেই আলোটা হলো ঋত্বিকের ক্যামেরা, সেই আগুনটা হলো তার চোখ, সেই বীজটা হলো তার গান, সেই গানটা হলো তার স্বপ্ন। সেই ক্যামেরা এখনো জ্বলছে, কোনো এক পুরনো প্রজেক্টরের ভেতর, কোনো এক ফিল্ম আর্কাইভের অন্ধকারে, কোনো এক তরুণ নির্মাতার স্বপ্নে, কোনো এক উদ্বাস্তু কলোনির ভাঙা ঘরে, কোনো এক মফস্বল শহরের সিনেমা হলে, এবং বলছে– ভয় পেও না, এখনো সব শেষ হয়ে যায়নি। এখনো একটা গান বাকি আছে, এখনো একটা নদী বাকি আছে, এখনো একটা মানুষ বাকি আছে। সেই গানটা হলো মানুষের গান, সেই গানটা হলো ফিরে আসার গান, সেই নদীটা হলো সেই নদী যা আমাদেরকে ওপারে নিয়ে যাবে, সেই মানুষটা হলো সেই মানুষ যে এখনো ভালোবাসতে জানে, যে এখনো প্রতিবাদ করতে জানে। যদিও আমরা জানি, আমরা সবাই জানি, ফেরা আর কখনো সম্ভব নয়, ওপার বলে কিছু নেই, নদীটা মরে গেছে, গানটা ভুলে গেছি। তবুও, তবুও গানটা গাইতে হবে, তবুও নদীটার নাম ধরে ডাকতে হবে, তবুও নীতার নাম ধরে ডাকতে হবে। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার, এই না-ফেরার দেশে ফেরার গান গাওয়ার, এই মৃত নদীতে স্নান করার, এই পাগল বোনটাকে বুকে জড়িয়ে ধরার নামই হলো ঋত্বিক ঘটক। তিনি অসম্ভবের পরিচালক, তিনি পরাজয়ের মহাকবি, তিনি আমাদের সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে পর, সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে দূরের। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন কিভাবে ভাঙা গলায়, ছেঁড়া সুরে, মাতাল হয়ে, নিঃসঙ্গ হয়ে, দরিদ্র হয়ে, পরাজিত হয়ে গান গাইতে হয়, কিভাবে ছেঁড়া ফিল্ম, পোড়া ফিল্ম, নষ্ট ফিল্ম, হারিয়ে যাওয়া ফিল্ম জোড়া লাগিয়ে সিনেমা বানাতে হয়, কিভাবে দেশভাগের পরও, সবকিছু হারানোর পরও, সবাই ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও দেশকে, মানুষকে, নদীকে, বোনকে ভালোবাসতে হয়, আঁকড়ে ধরে থাকতে হয়, বাঁচিয়ে রাখতে হয়। তার সিনেমা দেখুন, তার সিনেমা শুনুন, তার সিনেমার ভেতর নিজেকে খুঁজুন, নিজের দেশকে খুঁজুন, নিজের মাকে খুঁজুন, নিজের নদীকে খুঁজুন। দেখবেন, আপনি আর আগের মানুষটা নেই। আপনি একটু বেশি মানুষ হয়ে গেছেন, একটু বেশি উদ্বাস্তু, একটু বেশি নিঃসঙ্গ, এবং একটু বেশি সত্য, একটু বেশি জীবিত, একটু বেশি ঋত্বিক, সবশেষে একটু বেশিই বাংলাদেশ।

সময়ের সন্তানেরা
সময়ের সন্তানেরা-২
After-Article Banner 2
After-Article Banner 2 mob

মন্তব্য লিখুন

ধন্যবাদ। নাম ও মতামত লিখুন। পর্যালোচনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মন্তব্যটি প্রকাশিত হবে।

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত