পেয়ারা গাছটার দিকে তাকিয়ে আছি। সবুজ পাতায় যেন বসন্তের লগ্ন মেঘের খবর নিয়ে এসেছে। মেঘের চঞ্চল রূপ কি তখনো একটা কোকিলের মনে? কোকিলটা অনবরত ডেকে যাচ্ছে। এভাবে অনেক ডাক জমা হচ্ছে ভুবনে। কোকিল কোথা হতে ডাকছে, ঋতুরাজ বসন্তের শেষের দিকে। আমি জানি, এইতো কিছুদিনের ভেতর বাংলা সন তার শেষ গান গেয়ে বিদায় নেবে। ঋতুচক্রের পরিক্রমায় শুরু হবে আরেকটা গ্রীষ্মকাল। মনে পড়ে চৈত্র সংক্রান্তি পালনের একটা বিকেল। কত সালের দিকে হবে আমার মনে নাই। আমাদের গ্রামের নাম বোয়ালি। গ্রাম থেকে খানিক দূরে তুরাগ নদী। গ্রামে ঢুকতেই পড়বে একটা মস্তবড় বটগাছ। সেখানে সন্ধ্যা নেমে এলে, ততটা সন্ধ্যা বৃক্ষজন্মের পাঠ শিখে নিতে শত শত বাদুড়দের দেখেছি ঝুলে থাকতে। মানে, জীবনের যাত্রা কোন ‘এক’ গন্তব্যে। বটগাছটার নিচে ছোট একটা টং দোকান ছিল। আমার বাবার কাকাতো বড় ভাই, মানে জ্যাঠার দোকান ছিল। তাকে দেখতাম—কখনো মোহের অনুষঙ্গে নড়েচড়ে বসতে। যখন বাচ্চারা আসতো বেহাতি কিনতে, কী এক মায়াবী সকাল। সত্যি, আকাশ কী তা জানতো। দৃশ্যত সময়ের মাঝে একটা নৌকা থেমে থাকতো ঘাট থেকে কিছুটা দূরে, জলভাঙা ঢেউয়ে। অন্ধ পিতার পুত্র হারাধন আমাকে বলেছিল— একদিন এই ঢেউয়ে, ঠিকই আপনার বুক কেঁপে উঠবে।
২.
আজও সুন্দর সময়, সুন্দর সকাল-দুপুর এবং সন্ধ্যাগুলি পৃথিবীর সবুজ অক্ষরে স্মৃতি হয়ে জড়িয়ে ধরে। স্মৃতি হচ্ছে আবেগের আফিম, যা বাচ্চা বেড়ালের চোখে খেলা করে। আমার কল্পনার জীবন বড়ই রহস্যময়! আমাদের বাড়ির নিচের দিকে জলাশয়ে, সেখানে অনেকগুলো হিজলের গাছ ছিল। হয়তো গাছগুলো আমার ঠাকুরদাদা, ঠাকুমা বেঁচে থাকার কালেও ছিল। যদিও আমি আমার ঠাকুরদাদা, ঠাকুমাকে কখনোই দেখিনি। তবে এই না দেখার ভেতরেও তাদেরকে আমি কল্পনা করতে পারতাম, এই ভেবে যে— কল্পনাও একটা পাখি। খুউব বর্ষায় গাছগুলোর বুক বরাবর জল থাকতো। যতদূর জানি, হিজল (এপ্রিল-জুন) মাসে প্রচুর পরিমাণে ফোটে। যা রাত বাড়ার সাথে সাথে ফোটা শুরু করে এবং সকালের আলোয় তা ঝরে পড়ে। কতটা উত্তেজনা এতে আছে, আলোর কাছে ফুলের। জলের উপর হিজলফুল ঝরে পড়ার দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ। যা আমার কাছে লাগতো—মরে গিয়ে বাঁচার মতো অথবা বাঁচতে গিয়ে মরার মতো। মাঝে মাঝে মনে হয় ফাউস্টের মতো শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রি করে দেই। ফাউস্ট তো অলৌকিক ক্ষমতা অর্জনের জন্যে করেছিল। আমি না হয়—জীবনের বিষাদ থেকে আত্মাকে বেঁচে দেই। তাও যদি মৃত্যুর পরে শয়তান আমাকে বয়ে নিয়ে যায় চাঁদে।
৩.
চৈত্রের আকাশ কেমন ঘন হয়ে আছে। একটা লাল চা হাতে নিয়ে বসে আছি। চায়ের ভেতর সুর তুলছি। তবে সুরকারেরা জানে না— চায়ের ভেতরও যে সুর থাকে। এও জানে না— পৃথিবীর সব বিষণ্ণতার সুর কড়ই ফুলেই কেন থাকে! চায়ের দোকান থেকে কড়ই ফুলের দিকে তাকালাম। ফুল কুড়ানো মানুষ দেখলাম না। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চায়ের দোকানদার রহিম চাচাকে বললাম— চাচা, আমি কিন্তু সৎ না। আবার সৎ হবার জন্য নিঁখুত হওয়া জরুরিও না। চাচা, একটা হাসি দিয়ে বললেন— সৎ মানুষকে সারাবে কে? তাইতো…
বাতাস এসে লাগলো গায়ে। এই বাতাস পরিচিত, যা পেয়েছিলাম কামিনীগাছের পাশে এমন স্বর্গীয় রাতে।
৪.
এমনিতেই চৈত্রমাস হলো রুক্ষ মাস, এই সময় মানুষের বিশেষ কোনো কাজ থাকে না। আগেকার দিনে সাধারণ মানুষ বাড়ির উঠোনে বসে পাটের দড়ি পাকাত অথবা মুখে লোকগান গাইতো। রাঢ়দেশের মানুষ এই সময় পালা বোলান বা পরী বোলানের মহড়া করত গাজনের জন্য। কিন্তু পূর্ববঙ্গের চৈত্র মাসের নিয়ম কানুন ছিল কিছুটা আলাদা। সংক্রান্তির দিনে, ঋণে জর্জরিত চাষিদের বড়শিতে গেঁথে ঘোরানো হত চড়কের গাছে। এখন তো ‘গাজন সন্ন্যাসী’ বা ভক্তরা শিবের সন্তুষ্টির জন্য স্বেচ্ছায় পিঠে লোহার হুক বা বঁড়শি ফুটিয়ে উঁচু চড়ক গাছে ঝুলে ঘোরেন।
৫.
বোয়ালি গ্রাম থেকে শিকদারচালা গ্রাম পাঁচ/ছয় কিলোমিটারের পথ। হেঁটে রওনা দিলাম। দুপুরের ঠিক পরে। বিকেল নামবে নামবে ঠিক এমন একটা ভাব। বিকেলের দিকে শুরু হওয়া চড়কগাছ ঘুরানোর উৎসবের ইতি টানা হইলো সন্ধ্যার কিছু আগে। পাশে বসেছিল চেনা অচেনার এক প্রাচীন মেলা। অনেক মানুষের সমাগম ছিল আশেপাশের গ্রাম থেকে। চড়ক সংক্রান্তি যেন সাধারণ মানুষের মনে উৎসবের আনন্দ নিয়ে প্রকৃতিতে– জীবনে– আচরণে– প্রকাশে এক চৈত্র গানে পরিণত হয়েছিল। একে একে অনেকে দল বেঁধে চলে গেল। ফিরতি পথে আমি, আমার পিছন পিছন একটা কুকুর অনেকদূর পর্যন্ত হেঁটে আসলো। আমি ভাবলাম— হয়তো কুকুরটা অন্যমনে যাতনা সয়ে। টেকে এসে যখন দাঁড়ালাম তখন মনে হলো— চারিদিকে সব আনন্দ থমকে…









































































































































1 Comment. Leave new
পড়লাম। ভালো লাগলো।