২৭ এপ্রিল ২০২৬
যে স্মৃতি—বিস্মৃতিপরায়ণ
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য

যে স্মৃতি—বিস্মৃতিপরায়ণ

সালটা ১৯৯০। তখনকার কথা যেন শীতের নিরুপদ্রব শান্ত কোন নদীর ক্রমাগত ভাটির দিকে যাত্রা। আমরা থাকতাম রানীবাজার তিনতলা একটা বাসায়। ভৈরবের ব্যবসায়িক এলাকা ছিল এই রানীবাজার। এখনো আছে, হয়তো আরও বিস্তৃত হয়েছে আগের তুলনায়। এইসব লিখতে বসে ভাবলাম— কেন আমার ঠিকঠাক কখনো মনে পড়ে না। কোনোদিন যদি মনে পড়ে— পৃথিবীর দিকে উদ্ভ্রান্তের মতো তাকিয়ে থাকবো। কেন জানি মনে হইতো আমার— বাসার সামনে যে সাবান তৈরির কারখানাটা ছিল, সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন। উপরের দিকে টিনের চালের অনেকটা অংশ খোলা থাকতো। সন্ধ্যার সময় কাঁচামাল বিশাল লোহার পাত্রে দিয়ে চর্বিগুলোকে গলতে দেওয়া হইতো। রাতভর পাকানো চলতে থাকতো। আমার মনে আছে এখনো, চর্বি গোল করে আমরা ছোট ছোট বলের আকৃতি করে খেলতাম। সেখানে কস্টিক সোডা নামে একধরণের সোডা ব্যবহার করা হইতো। আমরা শুধু গন্ধ বুঝতাম। খুব একটা দূর থেকে নয়, কাছাকাছি গেলে; গন্ধ আরও তীব্র হলে আমাদের মন কিছুটা হলেও ভালো হয়ে যেত। আমরা মানে আমার সমবয়সী বন্ধুদের কথা বলা। কেবল তখন বুঝতাম না সুগন্ধি শুধুমাত্র গন্ধ ঢেকে রাখতে পারে। আমাদের ছোট গলির রাস্তা ও গন্ধরাজ তেল তৈরির কারখানা নিয়ে একটি সন্ধ্যা, কীভাবে গন্ধের কাছে অতিরঞ্জিত হয়ে উঠতে পারে!

২.
যতদূর মনে পড়ছে— মাঝে মাঝে বিকেলে ছাদে উঠতাম। ছাদ থেকে নদীকে খুব কাছের মনে হতো। ছাদ থেকে নদী মেঘনা দেখতাম। নদী যেন আশ্চর্য নীরব এক সমাবেশ। আমি নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকতাম। তখন তো নদীর নন্দন এত বুঝতাম না। অনেককেই বলতে শুনেছি— সমুদ্রের কাছে গেলে নাকি নিজেকে বিশাল লাগে। আবার কেউ কেউ বলেছে এমন— সমুদ্রের কাছে গেলে সমুদ্রকে ছোট লাগে। কিন্তু মেঘনা নদীকে আমি দেখেছি—যুগপৎ বিস্ময় নিয়ে। অনেকটা হ্যালোজেন লাইটে ঝলসে ওঠা বৃষ্টির মতো। তবে বৃষ্টির দিনে ছাদ থেকে নদী দেখতে গিয়ে মনে হতো— কী অপূর্ব যেন সেই দ্যুতি। দ্যুতির বাগানে দীর্ঘ হয়ে স্মৃতিতে ফিরে ফিরে আসুক মেঘনার ঘাট—বহু পুরনো বাড়ি। যেখানে মেঘনার সেই ব্রিজ আর রেলগাড়ি স্বপ্ন-সমান্তরালে গুটিয়ে যায়।

প্রায়শই এখন এক একান্ত সময় আসে। কখন আসে জানতে পারি না। তবে এর একটা রেশ টের পাই। মানে যেটুকু নিজের। সেখানে একটা নির্জনতা বসিয়ে নিয়েছি সময়টুকুর মধ্যে।

৩.
রানীবাজারে সেখানে নিশ্চয়ই নয়নতারা ফুল ফুটতো কারো বারান্দায়। এরপর যেন রোদ-হাওয়া, কিছুটা কাঙ্খিত নিবিড়তা হু হু বিষাদে ভেসে গেছে কারো বাসা বদল হওয়া বাসি হৃদয়ে। নব্বই দশকের সেই নাটাই-ঘুড়ি এখনো অনুভবযোগ্য হবে কী? এই সময়ে…

একটা গাছের কথা মনে আছে। নাম জানা নেই। তবে গাছটার নান্দনিকতা লক্ষ করার মতো। বাজারের একটা দোকানের পিছনে বিশাল বড় আকৃতির ছিল গাছটা। কেবল জিততে থাকার মতো উপরে বেড়ে ওঠা যেন। একদিন ঝড়ে গাছটি উপড়ে ফেলা দেখে দুঃখ হয়েছিল। সেই লম্বা গাছটির হয়ে ওঠা হয়ত স্বপ্ন ছিল অনেক তরঙ্গময় হাওয়ায়। জীবনের সব অধ্যায় হয়তো পড়া যায় না। আমিও তাই কখনো জানতে চাইনি জীবনের ভবিষ্যৎ। তারপরও একটি উদ্ভিদ বড় হয় আরেকটি উদ্ভিদ নিয়ে। আমিও বেড়ে উঠছি যেন আমান স্মৃতি নিয়ে। আমাদের পেছনে পড়ে থাকে বিস্তৃত অতীত এক ভূমি।

1 Comment. Leave new

  • এনামুল
    28 April 2026 3:50 pm

    ভৈরব আমারো স্মৃতির শহর, তয় লেখার মতন কোনো স্মৃতি নেই এখানে। নরসিংদী আমার স্মৃতির সবকটা জায়গা জুড়ে আছে। সময় করে হয়তো লিখব ঐসব কথা

    Reply

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত