২৩ এপ্রিল ২০২৬
আমির খসরু: গুরুপ্রেমে আত্মলীন
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
সৈয়দ তারিক
কবি, ভাবুক
75

সৈয়দ তারিক
কবি, ভাবুক

75

ভাবের দেশ

আমির খসরু: গুরুপ্রেমে আত্মলীন

হজরত আমির খসরু (Amir Khusrau, ১২৫৩–১৩২৫) দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তিনি একজন অসামান্য কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, সুফি চিন্তক এবং ভাষা-স্রষ্টা। তিনি শুধু একজন কবিই ছিলেন না, বরং ভারতীয় ও পারসিক সংস্কৃতির মিলনের এক মহান স্থপতি। তাঁকে প্রায়ই বলা হয় ‘তুতিয়ে-হিন্দ’—অর্থাৎ ভারতের তোতা পাখি, কারণ তাঁর কণ্ঠে ও লেখায় ভারতীয় সমাজ, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা এবং মানুষের জীবন যেন কথা বলত। মুরশিদ নিজামউদ্দিন আউলিয়ার প্রতি তাঁর অনন্য প্রেম ও তার প্রকাশ ভক্তিবাদী ভাবধারায় একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে বিরাজমান রয়েছে।

আমির খসরুর পিতা আমির সাইফউদ্দিন মাহমুদ ছিলেন মধ্য এশিয়ার লাচিন গোত্রের একজন তুর্কি। মঙ্গোল আক্রমণের কারণে তিনি বলখ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। দিল্লির সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ তাঁকে উচ্চ সামরিক পদে নিয়োগ দেন।

​১২৫৩ সালে উত্তরপ্রদেশের পাতিয়ালিতে খসরুর জন্ম। তাঁর মা ছিলেন ভারতীয় এক অভিজাত ব্যক্তির কন্যা। এই তুর্কি-ভারতীয় মিশ্র পরিবারেই খসরুর মধ্যে প্রথম থেকেই দুই ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়।

​খসরুর বয়স যখন মাত্র আট বছর, তখন তাঁর পিতা এক যুদ্ধে শহিদ হন। এরপর তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব নেন মাতামহ ইমাদুল মুলক, যিনি ছিলেন দিল্লির রাজদরবারের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি।

​আমির খসরুর জীবন সুলতানি আমলের এমন এক সময়ে অতিবাহিত হয়েছে যখন দিল্লির সিংহাসনে দ্রুত পরিবর্তন আসছিল। তিনি গিয়াসউদ্দিন বলবন থেকে শুরু করে গিয়াসউদ্দিন তুঘলক পর্যন্ত সাতজন (মতান্তরে এগারোজন) সুলতানের শাসনকাল প্রত্যক্ষ করেছেন। ​তিনি রাজদরবারের ‘মুসহাফ-দার’ তথা পবিত্র গ্রন্থের রক্ষক এবং প্রধান সভাকবি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

​একবার মঙ্গোলদের সাথে যুদ্ধে তিনি বন্দি হন। সেই সময়কার অমানবিক অত্যাচার এবং তাঁর পলায়ন কাহিনী তিনি তাঁর কবিতায় অত্যন্ত করুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর দর্শনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।

আমির খসরুর জীবন কেবল রাজদরবারের কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। তখন ছিল তেরো শতকের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ এবং আধ্যাত্মিক বিপ্লবের এক সন্ধিক্ষণ। ​খসরুর জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি দিল্লির প্রখ্যাত সুফি সাধক হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মুরিদ হন।

​তাঁদের সম্পর্ক ছিল গভীর আধ্যাত্মিক ভালোবাসার। নিজামউদ্দিন আউলিয়া তাঁকে ‘তুর্কুল্লাহ’ (আল্লাহর তুর্কি) বলে ডাকতেন। তিনি বলতেন, “সবাই স্রষ্টার কাছে নিজের পুণ্য নিয়ে যায়, আর আমি নিয়ে যাব খসরুর এই আর্তি।” দিনের বেলা রাজদরবারে থাকলেও তাঁর রাতগুলো কাটত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার খানকাতে। সেখানে তিনি আধ্যাত্মিক সংগীত এবং ধ্যানে নিমগ্ন থাকতেন।

​খসরু যে সময়ে বাস করতেন, তখন দরবারের ভাষা ছিল ফারসি। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষা ছিল স্থানীয় উপভাষা (ব্রজভাষা ও খড়িবোলি)।

​খসরু বুঝতে পেরেছিলেন যে আধ্যাত্মিক বাণী মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে তাদের ভাষাতেই কথা বলতে হবে। তিনি ফারসি শব্দের সাথে স্থানীয় শব্দ মিশিয়ে এক নতুন শৈলী তৈরি করেন, যাকে তিনি ‘হিন্দি’ বা ‘হিন্দভি’ বলতেন। এটিই আধুনিক উর্দু ও হিন্দি ভাষার আদি রূপ।

​১৩২৫ সালে নিজামউদ্দিন আউলিয়া ইন্তেকাল করেন। সেই সময় খসরু দিল্লিতে ছিলেন না। ফিরে এসে পীরের মৃত্যুসংবাদ শুনে তিনি সমস্ত রাজকীয় পোশাক ত্যাগ করেন এবং কালো পোশাক পরে পীরের কবরের পাশে বসে পড়েন। এর মাত্র ছয় মাস পর তিনিও ইন্তেকাল করেন। তাঁকে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজার কমপ্লেক্সেই সমাহিত করা হয়।

Khizr Comes to the Ascetic's Cell, Folio from a Khamsa (Quintet) of Amir Khusrau Dihlavi, ca. 1450.
Khizr Comes to the Ascetic’s Cell, Folio from a Khamsa (Quintet) of Amir Khusrau Dihlavi, ca. 1450. Source: Alamy

আমির ​খসরুর দর্শন ছিল প্রেম ও মানবতার। তিনি চিশতিয়া তরিকার একজন একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন। তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল ইশকে হাকিকি তথা স্রষ্টার প্রতি প্রেম। তিনি মনে করতেন, স্রষ্টাকে পাওয়ার সহজ পথ হলো সৃষ্টির সেবা এবং মুরশিদ তথা পীর বা গুরুর প্রতি আনুগত্য ও প্রেম।

সুফি সাধনায় গুরুর প্রতি নিজেকে বিলীন করে দেওয়াকে ‘ফানা ফিশ শেখ’ বলা হয়। খসরুর জীবনে তাঁর পীর হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া ছিলেন সেই পরম সত্তার প্রতিচ্ছবি। তিনি বলতেন, “আমি হয়ে গেছি তুমি, আর তুমি হয়ে গেছ আমি; আমি দেহ আর তুমি প্রাণ।” পীর ​নিজামউদ্দিন আউলিয়ার প্রতি তাঁর ভক্তি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তিনি যখন রাজদরবারে উচ্চপদে আসীন, তখনও তিনি পীরের জুতো পরিষ্কার করতে দ্বিধা করতেন না।

পীরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে তিনি শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়েন। তিনি লেখেন, “প্রিয়া (পীর) আজ অন্তিম শয্যায় শায়িত, তাঁর মুখে চুলের ছায়া। হে খসরু, এখন নিজের ঘরে (পরলোকে) ফিরে চলো, কারণ সারা পৃথিবীতে অন্ধকার নেমে এসেছে।” তার ছয় মাস পরেই তিনি ইন্তেকাল করেন।

চিশতিয়া সুফিদের কাছে সংগীত ছিল ধ্যানের একটি মাধ্যম। খসরু এই ধারাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তিনি আধ্যাত্মিক বাণীতে সুরারোপ করে ‘কাওয়ালি’র প্রবর্তন করেন। এটি ছিল মূলত স্রষ্টার প্রশংসা এবং পীরের প্রতি ভক্তি প্রকাশের একটি মাধ্যম। সংগীতের মাধ্যমে যখন সাধক পরমাত্মার সাথে একীভূত হন, তাকে সুফি পরিভাষায় ‘ওয়াজদ’ বলা হয়। খসরু তাঁর পীরের মজলিসে এমন সংগীত পরিবেশন করতেন যা শ্রোতাদের ভাবসমাধিতে নিয়ে যেত।

তিনি ভারতীয় ও পারস্য সংগীতের মিশ্রণে নতুন এক ধারার জন্ম দেন। সেতার ও তবলা আবিষ্কারের কৃতিত্ব তাকে দেওয়া হয়। তিনি খেয়াল, তানা এবং তারানার মতো সংগীতের ধারা প্রবর্তন করেন। এছাড়াও ইমান, জিলফ এবং সাজগিরির মতো নতুন রাগ তৈরি করেন।

​তাঁর কাছে ধর্ম ছিল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এক পরম সত্য। খসরুর সাধনার একটি বড় অংশ ছিল ‘সোলহ-ই-কুল’ বা সবার সাথে শান্তি ও সম্প্রীতি। তিনি মনে করতেন, স্রষ্টার সৃষ্টির সেবা করাই হলো আসল ইবাদত। হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মিলন ঘটিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে আধ্যাত্মিকতার কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বা ধর্মীয় সীমানা নেই।

তিনি ভারতীয় যোগীদের সাধনা পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং সুফি ধ্যান বা ‘মুরাকাবা’র সাথে এর মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর দর্শনে যোগ এবং সুফিবাদের এক ধরনের সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়।

​​খসরু ফারসি এবং হিন্দভি (যা পরবর্তীতে উর্দু ও হিন্দির ভিত্তি গড়ে দেয়) উভয় ভাষাতেই দক্ষ ছিলেন। তাঁর রচনায় আধ্যাত্মিকতা ও দেশপ্রেমের অনন্য মিলন দেখা যায়। তাঁর রচিত ​বিখ্যাত গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে ‘খামসা-ই-খসরু’, ‘তুঘলকনামা’, ‘নুহ সিপহর’ এবং ‘তারিখ-ই-আলাই’।

​তিনি গজল, মসনবি এবং রুবাইয়াতে পারদর্শী ছিলেন। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সহজবোধ্য ভাষা এবং গভীর আবেগ। ‘নুহ সিপহর’ গ্রন্থে তিনি ভারতের প্রকৃতি, ভাষা ও সংস্কৃতির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

আমির খসরুর রচনাশৈলী ছিল একাধারে রাজকীয় আভিজাত্যপূর্ণ এবং লোকজ সহজলতায় ভরপুর। তিনি ফারসি সাহিত্যের ক্ল্যাসিকাল ধারাকে যেমন সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি ভারতীয় লোকজ উপাদানের সংমিশ্রণে এক নতুন ‘ইন্দো-পার্সিয়ান’ বা ‘সবক-ই-হিন্দি’ শৈলীর জন্ম দিয়েছেন।

খসরু ফারসি কবিতায় ভারতীয় অলঙ্কার, উপমা এবং রূপকের ব্যবহার শুরু করেন। তাঁর বর্ণনায় পারস্যের বুলবুলির চেয়ে ভারতের তোতাপাখি বা ময়ূরের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়। তাঁর শৈলীর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো একই কবিতায় ফারসি এবং তৎকালীন লোকজ ভাষা ‘হিন্দভি’র মিশ্রণ। একে ‘রেখতা’র প্রাথমিক রূপ বলা হয়।

খসরু যেহেতু নিজে একজন শ্রেষ্ঠ সংগীতজ্ঞ ছিলেন, তাঁর প্রতিটি কবিতার ছন্দে একটি অন্তর্নিহিত সুরের ঝঙ্কার পাওয়া যায়। তাঁর গজলগুলো গায়কীর উপযোগী করে লেখা। তিনি অত্যন্ত কুশলতা ও বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ধাঁধা বা ‘পহেলি’ লিখতেন, যা তৎকালীন লোকসাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

​তাঁর রচনার সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে স্রষ্টা এবং তাঁর মুরশিদ নিজামউদ্দিন আউলিয়ার প্রতি অগাধ প্রেম। বিরহ, মিলন এবং পরমাত্মার সাথে আত্মার একীভূত হওয়া—এই সুফি তত্ত্বগুলোই তাঁর গজলের মূল উপজীব্য। তাঁর কাছে প্রেমই হলো মহাবিশ্বের চালিকাশক্তি।

​খসরু ছিলেন দিল্লির সুলতানদের সভাকবি। তিনি তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসকে কাব্যাকারে ধরে রেখেছেন।

‘তুঘলকনামা’ হলো গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের বিজয়গাথা; ‘​খজাইনুল ফুতুহ’ হলো আলাউদ্দিন খিলজির দাক্ষিণাত্য বিজয়ের বিবরণ, যা গদ্যে লেখা; ‘কিরানুস সাদাইন’ হলো দুই সুলতানের মিলন এবং দিল্লির মাহাত্ম্য নিয়ে লেখা কাব্য।

​খসরু নিজেকে গর্বিতভাবে ‘হিন্দুস্তানি তুর্ক’ পরিচয় দিতেন। তাঁর ‘নুহ সিপহর’ (নয় আকাশ) কাব্যে তিনি ভারতকে ‘পৃথিবীর স্বর্গ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞান, দাবা খেলা, সংগীত, ময়ূর এবং ফল — বিশেষ করে আম — নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে ভারত অনেক ক্ষেত্রে পারস্য বা গ্রিসের চেয়েও উন্নত।

হজরত আমির খসরুর জীবন কেবল জ্ঞান বা সাধনায় নয়, বরং উপস্থিত বুদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক রসবোধে ভরপুর ছিল। তাঁর জীবন থেকে প্রচলিত কিছু বিখ্যাত ও শিক্ষণীয় অ্যানেকডোট বা উপাখ্যান আমরা পাঠ করতে পারি।

আমির খসরু ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি মধ্যযুগে বসে আধুনিক ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ৭০০ বছরেরও বেশি আগে, কিন্তু তাঁর গান, তাঁর ভাষা এবং তাঁর আধ্যাত্মিক দর্শন আজও এই উপমহাদেশের বাতাসে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়

​একবার আমির খসরু খুব তৃষ্ণার্ত অবস্থায় একটি কুয়োর ধারে যান। সেখানে চারজন নারী পানি তুলছিলেন। খসরু তাদের কাছে পানি চাইলে তারা জানতে পারলেন যে তিনিই বিখ্যাত কবি খসরু। তারা সরাসরি পানি না দিয়ে শর্ত দিলেন যে, তাদের দেওয়া চারটি ভিন্ন বিষয় নিয়ে খসরুকে তৎক্ষণাৎ একটি কবিতা শোনাতে হবে। বিষয়গুলো ছিল: খির (পায়েস), চরকা, ঢোল এবং কুকুর। ​তৃষ্ণার্ত খসরু কালক্ষেপণ না করে একটি মাত্র পংক্তিতে চারটিকে মিলিয়ে বললেন:

​“খির পাকায়ি যতন সে, চরখা দিয়া জলায়;
আয়া কুত্তা খা গায়া, তু বেইঠি ঢোল বাজায়।”

(অর্থাৎ: অনেক যত্ন করে পায়েস রান্না করলে, কিন্তু চরকা জ্বালিয়ে দিলে; কুকুর এসে সব খেয়ে গেল, আর তুমি এখন বসে বসে ঢোল বাজাও!) তাঁর এই তাৎক্ষণিক বুদ্ধিতে মুগ্ধ হয়ে তারা তাঁকে সমাদরে পানি পান করান।

একবার ​এক দরিদ্র ব্যক্তি হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার কাছে সাহায্যের জন্য এসে দেখেন যে তাঁর কাছে দেওয়ার মতো কিছুই নেই। আউলিয়া তখন দয়া করে তাঁর নিজের একজোড়া পুরনো কাঠের খড়ম লোকটিকে দিয়ে দেন। লোকটি কিছুটা হতাশ হয়ে সেগুলো নিয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন। ​পথে আমির খসরুর সাথে তাঁর দেখা হয়। খসরু তখন রাজদরবার থেকে প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে ফিরছিলেন। তিনি লোকটির কাছে পীরের পাদুকা দেখে চিনে ফেলেন এবং বুঝতে পারেন এটি তাঁর পীরের স্মৃতি। খসরু সেই দরিদ্র ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই জুতো জোড়া তুমি কত দামে বিক্রি করবে?” লোকটি অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজী হলো। খসরু তাঁর রাজকীয় উপঢৌকন হিসেবে পাওয়া সমস্ত সোনা, রূপা এবং ঘোড়া সেই পাদুকার বিনিময়ে দিয়ে দিলেন। এরপর পাদুকা জোড়া মাথায় নিয়ে নাচে নাচে পীরের কাছে ফিরে এলেন। নিজামউদ্দিন আউলিয়া হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “খসরু, কত দামে আনলে এগুলো?” খসরু উত্তর দিলেন, “হুজুর, আমার সমস্ত সম্পদ দিয়ে দিয়েছি। যদি সে আরও চাইত, তবে আমি আমার প্রাণ দিয়ে দিতাম।”

​খসরুর যখন জন্ম হয়, তখন এক দরবেশ তাঁর পিতাকে বলেছিলেন, “তোমার এই ছেলে এমন একজনের পেছনে হাঁটবে যিনি বিশ্বের মহান নেতা হবেন।” পরবর্তী জীবনে খসরু সুলতানদের দরবারে থাকলেও তাঁর সমস্ত আনুগত্য ছিল আধ্যাত্মিক জগতের সুলতান নিজামউদ্দিন আউলিয়ার প্রতি। এটি একটি বড় অ্যানেকডোট যে, খসরু ১১ জন সুলতানের আমল দেখেছিলেন এবং ৭ জনের দরবারে সরাসরি কাজ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর হৃদয় সবসময় দিল্লির ‘চিশতিয়া’ খানকাহর ধুলোয় পড়ে থাকত।

​খসরু নিজেকে কেন ‘ভারতের তোতাপাখি’ বা ‘তুত-ই-হিন্দ’ বলতেন, তা নিয়ে একটি সুন্দর গল্প আছে। তিনি বলতেন, “তুমি যদি আমার কাছ থেকে সত্যি কিছু শুনতে চাও, তবে আমাকে হিন্দভি (ভারতীয় ভাষা) ভাষায় জিজ্ঞেস করো, যাতে আমি সুমধুর কথা বলতে পারি।” তিনি ফারসি ভাষার চেয়েও সাধারণ মানুষের ভাষাকে প্রাধান্য দিতেন কারণ তা হৃদয়ের কাছাকাছি ছিল। তাঁর এই বিনয় এবং ভাষার প্রতি মমত্ববোধই তাঁকে এই অমর উপাধি এনে দিয়েছে।

​বলা হয়, নিজামউদ্দিন আউলিয়া এবং খসরু ছিলেন এক প্রাণ দুই দেহ। আউলিয়া প্রায়ই বলতেন, “যদি শরিয়তে অনুমতি থাকত, তবে আমি চাইতাম খসরু আর আমাকে যেন একই কবরে দাফন করা হয়।” নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে খসরু তাঁর নিজের সমস্ত সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে ফকিরের বেশ ধারণ করেন এবং মাত্র ছয় মাসের মাথায় একই শোকে মৃত্যুবরণ করেন। নিজামউদ্দিনের মাজার কমপ্লেক্সেই তিনি সমাহিত হন।

আমির খসরু ছিলেন তেরো শতকের ভারতের এক মহত্তম সাংস্কৃতিক সমন্বয়ক। তাঁর প্রভাব ও উত্তরাধিকার আজও দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পকলা ও জীবনধারায় প্রবহমান। ​ইতিহাসবিদগণ আমির খসরুকে ‘একটি প্রতিষ্ঠানের সমতুল্য একজন মানুষ’ হিসেবে গণ্য করেন।

​খসরু এমন এক সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন যখন ভারতে তুর্কি-পারস্য সংস্কৃতি ও স্থানীয় ভারতীয় সংস্কৃতির মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব ছিল। তিনি এই দুইয়ের মিলন ঘটিয়ে একটি নতুন ‘ইন্দো-মুসলিম’ সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপন করেন।

​রাজদরবারে থাকলেও তিনি সাধারণ মানুষের ভাষাকে (হিন্দভি) মর্যাদা দিয়েছেন। ফলে তিনি কেবল অভিজাত শ্রেণির নন, বরং গণমানুষের কবি হিসেবে মূল্যায়িত হন।

​ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতে খসরুর প্রভাব অনস্বীকার্য। বলা হয়, তাঁর অনুপস্থিতিতে বর্তমান উত্তর ভারতীয় সংগীত কল্পনা করা অসম্ভব। তিনি পারস্যের ‘মাকাম’ পদ্ধতির সাথে ভারতীয় ‘রাগ’ পদ্ধতির সমন্বয় ঘটান।

​তাঁর উদ্ভাবিত কাওয়ালি আজও আধ্যাত্মিক সংগীতের এক প্রধান মাধ্যম। কাওয়াল অর্থাৎ কাওয়ালি গায়কদের একটি বড় অংশ আজও খসরুর প্রবর্তিত ‘কাওয়াল বাচ্চো কা ঘরানা’র উত্তরসূরি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয়। সেতার ও তবলার উদ্ভাবক বা সংস্কারক হিসেবে তাঁর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

​উর্দু ও হিন্দি ভাষার আদি রূপ গঠনে খসরুর অবদান সবচেয়ে বেশি। তিনি ফারসি ও স্থানীয় ভাষার শব্দ মিশিয়ে যে নতুন কাব্যশৈলী তৈরি করেছিলেন, তা থেকেই কালক্রমে উর্দু সাহিত্যের জন্ম হয়। এই কারণে তাঁকে উর্দুর ‘আদি পিতা’ বলা হয়। তিনি তাঁর রচনার মাধ্যমে হাজার হাজার নতুন শব্দ ও উপমা উপহার দিয়েছেন যা আজও আধুনিক হিন্দি ও উর্দুতে ব্যবহৃত হয়।

​খসরুর সাহিত্য পরবর্তী কয়েকশ বছরের কবিদের প্রভাবিত করেছে। ​তাঁর উদ্ভাবিত ‘সবক-ই-হিন্দি’ নামের বিশেষ ফারসি কাব্যশৈলী পারস্যের কবিদেরও মুগ্ধ করেছিল। ভারতের মির্জা গালিব থেকে শুরু করে আল্লামা ইকবাল পর্যন্ত প্রায় সকল বড় কবিই খসরুর কাছে কোনো না কোনোভাবে ঋণী।

​তাঁর ধাঁধা বা ‘পহেলি’গুলো আজও ভারতের গ্রামের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কোনো কবির রচনা সাতশ বছর ধরে লোকমুখে টিকে থাকা সাহিত্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত।

​সুফি ঐতিহ্যে খসরু এক পরম শ্রদ্ধেয় নাম।

নিজামউদ্দিন আউলিয়ার প্রিয় শিষ্য হিসেবে তিনি চিশতিয়া সুফি ধারার দর্শনকে সংগীত ও কবিতার মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। প্রতি বছর দিল্লির নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগাহে খসরুর মৃত্যুবার্ষিকী বা ‘উরস’ পালিত হয়। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগীতজ্ঞ ও ভক্তরা এসে তাঁর কালাম পরিবেশন করেন।

​আমির খসরু ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি মধ্যযুগে বসে আধুনিক ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ৭০০ বছরেরও বেশি আগে, কিন্তু তাঁর গান, তাঁর ভাষা এবং তাঁর আধ্যাত্মিক দর্শন আজও এই উপমহাদেশের বাতাসে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়।

Bhaber Desh-Special Sufi Series by Poet Syed Tarik-Meghchil

আ মি র  খ স রু র  গী তি ক বি তা

আজ রাঙ হ্যায় রি

মাটির প্রদীপ ওগো, শোনো অনুরোধ,
আজ রাতে প্রাণনাথ আসবেন নিকটে আমার
জেগে থেকো তুমি আর জ্ব’লো সারারাত।

রঙ ঝলমলাচ্ছে আজ, মা গো,
রঙ ঝলমলাচ্ছে
আমার খাজার ঘরে
রঙ ঝলমলাচ্ছে আজ, মা গো,
রঙ ঝলমলাচ্ছে।

আমার খাজার ঘরে রঙ ঝলমলাচ্ছে,
প্রাণনাথ এসেছে আমার ঘরে আজ।

রঙ ঝলমলাচ্ছে আজ, মা গো,
রঙ ঝলমলাচ্ছে।

রাসুলের পাক বর্ণ এই রঙ,
মাওলা আলির হাতে তৈরি এই রঙ,
এই রঙে ওড়না রাঙবে যার
ভাগ্যবান সেই জন।

রঙ ঝলমলাচ্ছে আজ, মা গো,
রঙ ঝলমলাচ্ছে।

আমার প্রিয়র ঘরে
ওগো সখি, আমার প্রিয়র ঘরে
রঙ ঝলমলাচ্ছে আজ, মা গো,
রঙ ঝলমলাচ্ছে।

পেয়েছি আমার পীর
নিজাম উদ্দিন আউলিয়াকে,
পেয়েছি আমার পীর
সাবির আলাউদ্দিন আউলিয়াকে,
নিজাম উদ্দিন আউলিয়া,
আলাউদ্দিন সাবির।

যখনই তাকাই, দেখি,
আমার সাথেই রয়েছে সে;
মা গো, রঙ ঝলমলাচ্ছে আজ,
রঙ ঝলমলাচ্ছে।

অনেক ঘুরেছি আমি কাছে-দূরে শুধু খুঁজে খুঁজে,
আহা, অনেক ঘুরেছি আমি কাছে-দূরে শুধু খুঁজে খুঁজে;
তোমার রঙেই আমি ধরা খেয়ে গেছি, ওগো নিজাম উদ্দিন,
তোমার রঙেই আমি পুরোপুরি হয়েছি আটক।

আর যতকিছু সব ভুলে গেছি, মা গো,
এমনই রঙ যে এটা, আগে দেখি নাই;
মাহবুবে এলাহি, ওগো, খোদার প্রেমিক,
এমনই রঙ যে এটা, আগে দেখি নাই।

খসরু, বাসর রাত জেগে কাটিয়েছি
প্রিয়তম স্বামীর সাথেই,
আমার শরীর আর আত্মা প্রিয়র
এক রঙে হয়েছে রঙিন;
এমনই রঙ যে এটা, আগে দেখি নাই,
মাহবুবে এলাহি ওগো, খোদার প্রেমিক,
এমনই রঙ যে এটা, আগে দেখি নাই।

গোকুল দেখেছি আমি, মথুরা দেখেছি
পূর্ব দেখেছি আমি, পশ্চিম দেখেছি
উত্তর দেখেছি আমি, দক্ষিণ দেখেছি
কোথাও দেখিনি আমি এই রঙ, যে-রঙ তোমার,
এমনই রঙ যে এটা, আগে দেখি নাই;
মাহবুবে এলাহি, ওগো, খোদার প্রেমিক,
এমনই রঙ যে এটা, আগে দেখি নাই।

ঘুরেছি জগৎজুড়ে, খোদার কসম,
তোমার মতন রূপ দেখিনি কোথাও,
দেখেছি অনেক মুখ অপরূপ, দারুণ সুন্দর,
পাইনি একটাকেও তোমার সঙ্গে তুলনার।

জগৎ জগৎ জগৎ জগৎ
জগৎ করেছে উজ্জ্বল
খাজা নিজাম উদ্দিন
পুরো জগৎ করেছে উজ্জ্বল
আলাউদ্দিন সাবির
পুরো জগৎ করেছে উজ্জ্বল।

বৃষ্টিধারা
বৃষ্টিধারায় মেঘেরা ঝরায় মাধুরিমা
ঝরায় মাধুরিমা
মেঘেরা ঝরায় মাধুরিমা…

খাজেগানদের দরবারে
মেঘেরা আজকে দেখ করুণাধারায় কেমন পড়ছে ঝরে,
মেঘেরা ঝরায় মাধুরিমা…

বৃষ্টিধারায় মেঘেরা ঝরায় মাধুরিমা
খাজা ফরিদ উদ্দিন গঞ্জেশকর
কুতুব উদ্দিন কাকি
খাজা মঈন উদ্দিন চিশতি
খাজা নিজাম উদ্দিন
খাজা নাসির উদ্দিন চেরাগি।

আজ নাসির উদ্দিন চেরাগির বিখ্যাত মাশুক
আমার প্রেমিক হয়েছে
নিজাম উদ্দিন আউলিয়া জগৎকে উজ্জ্বল করেছে
পুরো জগৎকে উজ্জ্বল করেছে
সারা জাহানকে উজ্জ্বল করেছে।

তোমার চেহারা মেলে এরকম আর কেউ নাই
তোমার মুখের ছবি নিয়ে যাই সকল জায়গায়
এমনই রঙ যে এটা, আগে দেখি নাই;
মাহবুবে এলাহি, ওগো, খোদার প্রেমিক,
এমনই রঙ যে এটা, আগে দেখি নাই।

নিজাম উদ্দিন আউলিয়া জগৎকে উজ্জ্বল করেছে
সারা জাহানকে উজ্জ্বল করেছে
যেটাই সে চায় সেটা পূর্ণ হয়ে যায়
মা গো, রঙ ঝলমলাচ্ছে।

 

নমি দানামচে মঞ্জিল

আজব এক জায়গায়
ছিলাম কাল রাতে।
প্রেমে আধেক-খুন-হওয়া
লোকেরা ছিল আমার চারপাশে; মনোবেদনায় তারা
ঘুরে বেড়াচ্ছিল ইতস্তত।

পরীর মতন
এক রূপবতী ছিল,
শালপ্রাংশু ছিলো সে,
গোলাপের মতো ছিল মুখ।
তার প্রেমিকদের হৃদয় নিয়ে সে নিষ্ঠুরভাবে খেলছিল
ধ্বংসের লীলা।

সেই জান্নাতি জলসায়
আল্লাহ নিজেই
কর্তা ছিলেন সমস্ত অনুষ্ঠানের;
ওহ খসরু,
সেই মাহফিলে
নবিজিও প্রদীপের মতন
আলো ছড়াচ্ছিলেন।

 

চোখের দৃষ্টিতে

আমার চেহারা-পরিচয় সবকিছু নিয়ে নিয়েছ তুমি:
শুধু একবার তাকিয়ে: চোখের দৃষ্টিতে।

প্রেমের শরাব খাইয়ে মাতাল করেছ তুমি:
শুধু একবার তাকিয়ে: চোখের দৃষ্টিতে।

সবুজ বালা-পরা সুন্দর আমার কব্জিটা
মুঠোয় নিয়েছ তুমি:
শুধু একবার তাকিয়ে: চোখের দৃষ্টিতে।

আমার প্রাণ দিয়ে দিলাম তোমাকে,
ওগো আমার পোশাক-রাঙানো-জন,

তোমার রঙে রাঙিয়ে নিয়েছ আমাকে:
শুধু একবার তাকিয়ে: চোখের দৃষ্টিতে।

আমার সমস্ত জীবন তোমাকে দিয়ে দিলাম,
ওগো নিজাম,

আমাকে তোমার বিয়ের কনে বানিয়ে ফেলেছ:
শুধু একবার তাকিয়ে: চোখের দৃষ্টিতে।

 

কয়েকটি কবিতাংশ

১.
খেলছি আমি প্রেমের খেলা
প্রিয়র সাথে,
জিতলে আমি: আমার তিনি
হারলে যাব তার হাতে।

২.
তোমার প্রেম চৈতন্যের ওপাড়ের খবর নিয়ে আসে,
ধার্মিকদের আনত করে মদের গেলাসে।

৩.
এসেছ মাতাল হয়ে ফিরে
মেহমান হয়েছিলে কার?
জানি তুমি চিনির স্ফটিক,
আখক্ষেতে ছিলে তুমি কার?

৪.
যে জন তোমার প্রেমে হয়েছে মাতাল
শরাবের নাই তার কোনো দরকার।

৫.
দাও এগিয়ে ওষ্ঠ-অধর
হৃদয়খানি দেব আমি;
কাবাব তোমার, মদও তোমার
সকল মালিক একাই তুমি।

৬.
খসরু, দেখছ, প্রেমের নদীটা
আজব ধারায় বয়,
যে-ই ঝাঁপ দেয় সে-ই ডুবে যায়:
ডুবলে সে পার হয়।

৭.
যদি তারে দেখতে না পাই,
তার কথা ভেবে যেতে পারি:
ওতেই আমার সুখ হোক।

ভিখিরির কুঁড়েঘরখানি
আলোকিত করে দিতে হলে
মোমের চাইতে সেরা জ্যোৎস্নার আলোক।

৮.
প্রেমে ভবঘুরে হলো হৃদয় আমার,
এমনই থাকুক চিরকাল।

প্রেমে পড়ে দুর্দশায় পড়েছে জীবন,
হোক না কঠিন দশা আরও আরও তার।

৯.
লোকে ভাবে, তারা বেঁচে রয়েছে কেননা
আত্মা আছে তাদের ভিতরে;
কিন্তু আমি রয়েছি তো বেঁচে
কেননা আমার মাঝে ভালোবাসা আছে;
এবং শহিদ আমি প্রিয়র পীড়নে
(প্রেমিকজনার কাছে প্রিয়তর আর কিছু নাই
সেই বেদনার চেয়ে যা প্রিয় যা জাগায়)।

১০.
আমি হয়ে গেছি তুমি আর তুমি হয়েছ আমি,
শরীর আমি, আত্মা তুমি,
পরে আর কেউ বলতে পারবে না:
তুমি একজন আর আমি আরেকজন।

 

তারানা

আমি যার মাওলা
আলি তার মাওলা
আমি যার মাওলা রে…

দারা দিলে দারা
দিলে দারে দানি
হুম তুম তানা
নানা নানা নানা রে

ইয়ালালি ইয়ালালি ইয়ালা
ইয়ালাইয়ালা রে
আমি যার মাওলা…

 

বাখুবি হামচো মা তাবিন্দা বাশি

তুমি পূর্ণিমার চাঁদের মতোই উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় হয়ে থেকো;
হৃদয়রাজ্যে তুমি চিরকাল অমর হয়ে থেকো।
তোমার চোখের একটি ইশারায় তুমি আমার মতন বেচারিকে করেছ খুন,
কেমন জাঁকজমক তোমার! খোদা তোমাকে দীর্ঘজীবী করুন।
মিনতি করি, তুমি অত নিষ্ঠুর হয়ো না, কারণ তুমি নিজেই তো লজ্জা পাবে
হাশরের ময়দানে তোমার প্রেমিকদের সামনে।
দুই জগতের সকল বন্ধন হতে আমি মুক্ত হয়ে যাব,
যদি তুমি ক্ষণকালের জন্য সাথী হও আমার।
তোমার লীলালাস্যে নিশ্চয়ই তুমি বরবাদ করেছ
খসরুর মতো সহস্র প্রেমিকের হৃদয়।

 

আয় চেহরা-ই জেবা-ই তু

তোমার সুন্দর মুখ দেখে ঈর্ষা লাগে আজরের মূর্তিগুলোর,
যতই প্রশংসা করি তার চেয়ে উপরেই থেকে যাও তুমি।
পৃথিবীর পথে পথে যত আমি বেড়িয়েছি ঘুরে,
অনেক নারীর প্রেম চেখে চেখে দেখেছি তো আমি,
রূপের তারকা আমি দেখেছি অনেক;
তবু জানি, তুলনাবিহীন তুমি অনন্য সুন্দর।
আমি হয়ে গেছি তুমি, তুমিও হয়েছ আমি,
হয়েছি শরীর আমি, হয়েছ আত্মা তুমি, তাই
এরপর যেন কেউ বলতে না পারে আর—
তুমি-আমি আলাদা দুজন।
খসরু ভিখারি এক, আজনবি, ঘুরতে ঘুরতে আজ এসে গেছে শহরে তোমার;
খোদার দোহাই লাগে, দয়া করো এই ভিখারিকে,
তোমার দরজা থেকে ফিরিয়ে দিও না যেন তাকে।

 

খবর এসেছে

আজ রাতে আমি সংবাদ পেয়েছি যে আমার প্রিয়তম আসবে; আমার মস্তক সেই পথের ধুলোয় উৎসর্গ হোক যে পথে তুমি অশ্বারোহী হয়ে আসবে। ​মরুভূমির সমস্ত হরিণ তাদের জীবন হাতের তালুতে নিয়ে অপেক্ষা করছে—এই আশায় যে, কোনো একদিন তুমি তাদের শিকার করতে আসবে। ​প্রেমের যে আকর্ষণ ও টান রয়েছে, তা তোমাকে এভাবে ছেড়ে দেবে না; যদি তুমি আমার জানাজায় নাও আসো, তবে আমার কবরে তোমাকে আসতেই হবে। ​আমার প্রাণ এখন ওষ্ঠাগত, দয়া করে দ্রুত এসো যেন আমি বেঁচে থাকতে পারি; আমার মরার পর তুমি এলে আর কী লাভ হবে?

 

জান জাতান বুর্দি

​তুমি আমার দেহ থেকে প্রাণ কেড়ে নিয়েছ, অথচ এখনো তুমি আমার প্রাণের ভেতরেই বিরাজ করছ। তুমি আমাকে অনেক যন্ত্রণা দিয়েছ, আবার তুমিই আমার একমাত্র ওষুধ হয়ে আছ। ​তুমি প্রকাশ্যে আমার বুক চিরে বিদীর্ণ করেছ, অথচ এখনো তুমি আমার বুকের গহীনে অতি সংগোপনে লুকিয়ে আছ।​ কান্না করতে করতে আমি লবণের মতো গলে নিঃশেষ হয়ে গেছি, অথচ তুমি এখনো তোমার হাসিতে চিনির মতো মিষ্টতা ছড়িয়ে যাচ্ছ।

 

আবর মি বারাদ-ও মান

মেঘেরা কাঁদছে আর আমি আজ বন্ধুর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হলাম,
হৃদয়সখার থেকে কীভাবে সরাবো মন এরকম দিনে!
মেঘেরা কাঁদছে আর আমি ও আমার সখা পরস্পরে বিদায় জানাই,
আমি কাঁদি, মেঘ কাঁদে, সখা কাঁদে আলাদা আলাদা…

 

চ্যশমে মাস্তে আজাবে

প্রচণ্ড বেদনায় ভেঙে খানখান হয়ে গেছি আমি,
ভাবাচ্ছন্ন তোমার দুটি চোখ আমাকে হতবুদ্ধি করে দিয়েছে,
জীবন আমার গেছে বরবাদ হয়ে,
তোমার পূজায় উৎসর্গিত ও অতিবাহিত সে।

আজব তোমার উল্লাসভরা চোখ,
আজব লম্বা চুল।
আজব মদের-উপাসক তুমি,
আজব দুষ্ট প্রেমিক।

যখনই খোলে সে তলোয়ার,
সেজদায় আমি নত করি ঘাড়,
অনায়াসে যেন খুন হয়ে যেতে পারি।

আজব তার সে করুণা,
আজব আমার নিবেদন।

মৃত্যুকালের ছটফটানির ভিতর
দুচোখ আমার চেয়ে থাকে শুধু
তোমার মুখের দিকে।

আজব তোমার মেহেরবানি গো,
আজব তোমার দেখভাল-উপদেশ।

আজব ফষ্টিনষ্টি তোমার
আজব প্রেমের ছলনা।

আজব হেলানো-টুপি-পরা ওগো
আজব পীড়নকারী।

সত্যকথাটি দিও না গো বলে তুমি,
খসরু, দুনিয়া কুফরিতে ভরপুর।

আজব উৎস গোপন ভেদের,
আজব গুপ্তজ্ঞানী।

 

প্রেমের কাফের

প্রেমের কাফের আমি, রীতিনীতি দরকার নাই।
আমার প্রতিটা শিরা টানটান, সুরযোগ্য তারের মতন।
বামুনের পৈতার দরকার নাই তো আমার।
আমার শয্যার পাশ থেকে ভাগো তুমি, মূর্খ ডাক্তার।
প্রেমের আরোগ্য শুধু প্রেমিকের মুখদর্শনে:
আর কোনো ওষুধের দরকার নাই তার কিছু।
আমাদের নৌকায় মাঝি যদি না থাকে তো নাইবা থাকুক।
আমাদের মাঝে আছে প্রিয়তম, সাগরে করি না কোনো ভয়।
লোকে বলাবলি করে: খসরু পূজারি মূর্তির;
সত্য কথাই এটা, অপরের অনুমতি খোঁজে না সে মোটে,
দুনিয়ার কিছু তার প্রয়োজন নাই।

 

গুরুপ্রেমের আরও একগুচ্ছ কবিতা

১.
তোমার হৃদয়ের আয়নাটাকে পরিষ্কার করো, যাতে সেখানে প্রিয়তমের মুখচ্ছবি দেখা যায়। যদি ধুলো জমে থাকে, তবে সবচেয়ে সুন্দর রূপটিও ঝাপসা মনে হবে। ভালোবাসা হলো সেই কাপড় যা দিয়ে তুমি তোমার অন্তরের ময়লা মুছে ফেলতে পারো। যখন তোমার অন্তর স্বচ্ছ হবে, তখন তুমি দেখবে যাকে তুমি আসমানে বা জমিনে খুঁজে বেড়াচ্ছিলে, সে আসলে তোমার নিজের ভেতরেই বসে আছে।

২.
আজ বসন্ত এসেছে, চারদিকে ফুল ফুটেছে। আমি আমার পীরের চরণে এই ফুলগুলো নিবেদন করতে চাই। হে সখী, চলো আমরা আজ হলুদ পোশাক পরে উৎসবে মেতে উঠি। বসন্ত কেবল প্রকৃতির পরিবর্তন নয়, এটি হলো আত্মায় নতুন প্রাণের সঞ্চার। আমার পীর নিজামউদ্দিন আউলিয়ার হাসিতে আজ হাজারো বসন্ত যেন একসাথে ধরা দিয়েছে।

৩.
হে পথিক, যদি তুমি আমার প্রিয়তমের দেশে যাও, তবে তাকে আমার এই আকুলতাটুকু জানিয়ে দিও। তাকে বলো যে, তার বিচ্ছেদে এক মুহূর্তও আমার কাছে এক বছরের সমান মনে হয়। আমি তো তাঁর পথের ধুলো হয়ে পড়ে থাকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ভাগ্যের চাকা আমাকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। আমার আর কোনো অভিযোগ নেই, কেবল মৃত্যুর আগে যেন একবার তাঁর মুখখানি দেখে নিতে পারি।

৪.
তোমার এই মিষ্টি হাসি দেখে আমি আমার ঘর-সংসার সব ভুলে গেছি। তুমি যখন হাসো, তখন মনে হয় যেন জান্নাতের সব ফুল একসাথে ফুটে উঠল। আমি কেবল তোমার ওই হাসির কাঙাল; দুনিয়ার ধন-সম্পদ দিয়ে আমার কী হবে? তুমি আমার দিকে তাকালে আমার অন্ধকার জীবনে পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়।

৫.
প্রেমের রাজ্যে যে পা রেখেছে, তাকে আর তলোয়ার বা ঢাল নিয়ে যুদ্ধে যেতে হয় না। প্রেমিকের চোখের একটি অশ্রুবিন্দুই হাজারো বিপদ কাটিয়ে দিতে পারে। লোকে মনে করে প্রেম মানে দুর্বলতা, কিন্তু আমি বলি প্রেমই হলো সবচেয়ে বড় শক্তি যা পাহাড়কেও সরিয়ে দিতে পারে। যে নিজের আমিত্বকে কুরবানি দিয়েছে, সে-ই কেবল অমরত্বের স্বাদ পেয়েছে।

৬.
আমি যখন নিজের আমিত্বকে তোমার হাতে সঁপে দিলাম, তখন দেখলাম আমার আর কোনো আলাদা রঙ নেই। তুমিই এখন আমার সব পরিচয়। লোকে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “তোমার ধর্ম কী?” আমি বলি, “আমার প্রিয়তমের সন্তুষ্টিই আমার ধর্ম।” এখন মন্দির আর মসজিদের মাঝে আমি কোনো তফাত দেখি না; কারণ আমি যেখানেই তাকাই, কেবল তোমার নূরের প্রতিফলন দেখতে পাই। আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল আমিত্ব দিয়ে, কিন্তু শেষ হলো তোমাতে গিয়ে।

৭.
সবাই বলে প্রদীপ জ্বালাও যাতে অন্ধকার দূর হয়, কিন্তু আমি বলি প্রেমের আগুন জ্বালাও যাতে হৃদয়ের অন্ধকার দূর হয়। বাইরের আলো তো কেবল চোখকে তৃপ্তি দেয়, কিন্তু ভেতরের আলো আত্মাকে জাগ্রত করে। যে ব্যক্তি কেবল বাইরের আলো নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সে আসলে অন্ধকারের মধ্যেই বাস করে। আসল আলো তো সেটাই, যা মানুষকে নিজের ভেতরের পরম সত্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

​৮.
আজ আমার আঙিনায় বসন্তের হাওয়া বইছে। চারদিকে হলুদ সরষে ফুলের সমারোহ, যেন প্রকৃতি নিজেই আমার পীরের জন্য গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে। সখী, আজ দুঃখের সব কালো পোশাক ফেলে দাও, আজ আমরা আনন্দের রঙে নিজেদের রাঙাব। আমার প্রিয়তম আজ আমার ঘরে এসেছেন, তাই বসন্ত আজ কেবল বনে নয়, আমার মনের ভেতরেও ডালপালা মেলেছে। এই বসন্ত আর কখনো শেষ হবে না, কারণ এর উৎস হলো অমর প্রেম।

৯.
আমার এই ভাঙা হৃদয়ে তুমি ছাড়া আর কারো জায়গা নেই। আমি এক আজন্ম তৃষ্ণা নিয়ে তোমার দুয়ারে বসে আছি। লোকে কত কিছু চায়—কেউ রাজ্য, কেউ ঐশ্বর্য; কিন্তু আমি কেবল তোমার একটু দয়া চাই। যদি তুমি আমাকে ফিরিয়ে দাও, তবে আমার যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকবে না। আমার জীবন তো একটি নিশ্বাসের মতো, যা কেবল তোমার ইশারার অপেক্ষায় ঝুলে আছে।

১০.
আমার হৃদয় প্রেমের জালে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছে যে এখান থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বন্দিদশার মধ্যেই আমি আসল মুক্তি খুঁজে পেয়েছি। বাইরে থেকে যা যাতনা বলে মনে হয়, আধ্যাত্মিক মানুষের কাছে তা-ই পরম সুখ। যে ব্যক্তি আগুনের শিখার চারদিকে ঘোরে না, সে আগুনের উত্তাপ বুঝতে পারে না। আমি সেই পতঙ্গ হতে চাই যে প্রিয়তমের আলোকশিখায় নিজেকে পুড়িয়ে অমর হয়ে যায়।

১১.
প্রেমের পথে যারা নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছে, তারা আসলে কখনো মরে না। তারা আকাশের নক্ষত্রের মতো মহাকাশে অমর হয়ে জ্বলজ্বল করে। যারা কেবল নশ্বর দেহের প্রেমে মগ্ন, তারা সময়ের সাথে হারিয়ে যায়; কিন্তু যারা আত্মার প্রেমে মগ্ন, তারা অবিনশ্বর। খসরু বলে, যদি তুমি সেই পরম সত্যের স্বাদ পেতে চাও, তবে আগে তোমার আমিত্বকে মাটির নিচে চাপা দাও। কারণ যেখানে অহংকার থাকে, সেখানে স্রষ্টার স্থান হয় না; আর যেখানে স্রষ্টা থাকেন, সেখানে অহংকারের কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না।

১২.
তুমিই সেই মন্দির, তুমিই সেই উপাসক; আবার তুমিই সেই প্রদীপ যা মন্দিরের অন্ধকার দূর করে। তুমিই সেই সীমাহীন সমুদ্র যার কোনো কূল নেই, আবার তুমিই সেই নৌকা যা ডুবন্ত মানুষকে তীরে নিয়ে যায়। আমি তোমাকে খুঁজতে গিয়ে দেখলাম যে আমি নিজেই হারিয়ে গেছি। এখন আমি যেখানেই তাকাই—সেটা ফুলের পাপড়ি হোক কিংবা পাথরের বুক—সবখানেই কেবল তোমারই ছায়া দেখতে পাই। আমার ক্ষুদ্র ‘আমি’ এখন তোমারই নূরে মিশে গেছে।

১৩.
তোমার এই সুন্দর মুখচ্ছবি যেন সূর্যের চাইতেও উজ্জ্বল। তোমার প্রেমের অগ্নিতে আমার হৃদয় মোমের মতো গলে যাচ্ছে। লোকে বলে আমি কেন তোমার প্রেমে এত পাগল? তারা যদি একবার তোমার ওই চোখের ইশারা দেখতে পেত, তবে তারা নিজেরাই নিজেদের অস্তিত্ব ভুলে যেত। আমি আমার হাত থেকে তসবি ফেলে দিয়েছি এবং কপালে প্রেমের তিলক এঁকেছি; কারণ যখন আমি তোমাকে পেয়েছি, তখন প্রথাগত ইবাদতের আর কী প্রয়োজন?

১৪.
আমার এই দীন অবস্থার প্রতি উদাসীন থেকো না এবং আমাকে অবহেলা করো না। তোমার বিচ্ছেদে আমার চোখের পাতাদুটো নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। আমি যখন তোমার বিরহের কথা ভাবি, তখন আমার ধৈর্য হারিয়ে যায়; হে প্রিয়তম, তুমি কেন এসে আমাকে তোমার হৃদয়ের সাথে জড়িয়ে ধরো না? এই বিচ্ছেদের রাতগুলো পাহাড়ের মতো দীর্ঘ এবং কঠিন, আর প্রিয়তমের সাথে মিলন যেন সুগন্ধি ফুলের মতো ক্ষণস্থায়ী। যদি আমি তাকে দেখতে না পাই, তবে এই জীবন আমি কীভাবে কাটাব?

১৫.
প্রিয়তম আজ শয্যায় শায়িত, তাঁর মুখের ওপর পড়ে আছে তাঁর অবিন্যস্ত চুল। হে খসরু, এবার তুমি তোমার নিজের বাড়িতে ফিরে চলো, কারণ সারা পৃথিবীতে এখন অন্ধকার নেমে এসেছে। দিন শেষ হয়েছে, এখন তোমারও যাত্রা করার সময়।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত