চাঁদ আলোয় হাঁটছি— বাড়ির দিকে। অবাক করা এক বাড়ির পথে। যেন চাঁদ হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে—এ কোন মহিমার আত্মানুরঞ্জনে।
বাড়ির কিছুটা আগে মস্ত বড় খেঁজুর গাছটাকে দেখলাম—গতকাল রাতের ঝড়ে ভেঙে আটকে আছে জামগাছটার উপর। এই খেঁজুর গাছটা আমার শৈশবের স্মৃতিময় মমতার ছায়ায় বহুবর্ণের এক পেখম। পুকুরের পূর্বকোণা ধরে ছিল এই গাছ। এই গাছটার গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে আমি কত কত দিন বড়শি লুপাইতে লুপাইতে বাইল্লা মাছ ধরেছি। একটা সিলভারের লোটা থাকতো সাথে আর বৃষ্টির দিনে সাথে নিতাম দাদুর মাথাল। এখন অবশ্য পুকুরটা নাই ভরাট হয়ে গেছে। তবে গাছটাতো ছিল — গাছটাও আজ উচ্চতার যে সম্পর্ক, সেই জড়ানোতে নাই হয়ে গেল। গাছ গাছেদের ভার বহন করে। একটা বিষয় স্পষ্ট,— একদিন গাছের ডালের কাছেই মিলে যায় অন্য একটা গাছের ডালের অধিগ্রহণ।
ব্যক্তি এককের বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতার ক্রোনোট্রোপে বাস্তব জগত আর মিথ মিলেমিশে গেলে তার যে মানসিক অবস্থা গড়ে ওঠে তাকে আলোচকরা বলেছেন ‘নুমিনাস’, যে অবস্থায় ব্যক্তি এককের অন্তরজগতে নিদারুণ তোলপাড় ঘটতে থাকে, সে তখন বাইরের জগতের প্রতি উৎসাহহীন, তার মনে হয় সে বাইরের জগতের দ্বারা অবদমিত, হতোদ্যম অবস্থায় সে নিজের ভেতরে আরও বেশি করে ঢুকে যেতে থাকে, তখন সে বিপজ্জনক আত্মক্ষয়ের স্বাদ পেতে আরম্ভ করে। মাঝে মাঝে আমার এমনটা হয়। কল্পনা ও আবেগের ধরনকে পর্যবেক্ষণ করি। আর কখনো চিত্রকল্পকে বিধৃত করতে করতে ভাবি, এ আমার কল্পনার অংশ।
২.
একটু সকাল, পাতার পর পাতা পড়ে যেতে থাকলে মনে হইতো— আহা! শরতের শিউলি নেই। কল্পনার জগৎ বড়ই বিচিত্র। এক লোককাহিনী মতে, পারিজাতিকা নামের নাগরাজকন্যা সূর্যের প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করলে তার ভস্ম থেকে এই শিউলি ফুল জন্ম নেয়। তাই সূর্য ওঠার আগেই এর ঝরে পড়াকে ব্যর্থ প্রেমের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এখন আমার মতে, এই ঝরে পড়া শিউলি ফুলগুলো হইলো পাখির একটা ঝাঁক। যদি ‘পাখিরা বৈকুণ্ঠে যায়’ তবে তা আমি ভাবতেই পারি। নারদ মুনি একবার এক ছোট্ট পাখিকে সাধুসঙ্গের প্রভাবে বৈকুণ্ঠে যেতে দেখেছিলেন, যেখানে সাধুসঙ্গের ফলে আত্মার মুক্তি ঘটে। বাতাসের একটা সুর থাকে, সেই সুরে না কিংবা হ থাকতে পারে। সেই না – হ-এর ভেতরে যখন পাখিরা নেমে আসতো আমাদের বাড়িতে, তখন তাদের ভেতর অনেক পাখির নাম আমি জানতাম না। কিন্তু নিজের দেখার ভেতরে আমি দেখেছি, পাখিরা নিজের আলোককেই চিনে নিতো। রান্নাঘরের পিছনে কুডরা গাছের পাতায় টুনটুনি পাখির বাসা বাঁধা দেখতাম। তিনটা পাতা একত্র করা কী দারুণ কারুকাজ। দর্জি যেভাবে এক শূন্য সময়কে সেলাই করে, সেরকম। আমি তখনো জানতাম না—টুনটুনি পাখিরা তাদের এই বাসা বুনতে মাকড়সার জাল ব্যবহার করে।
৩.
জলপাই গাছটার শ্যামল হয়ে আছে যেখানে, সেখানে একটা কালো রঙের টায়ার বাঁধা। টায়ারটা কে বেঁধে রেখেছে, মাকে জিজ্ঞাস করা হয় নাই। তবে আগে দেখতাম গাছে মোড়া ছনের ঝাড়ু আর ছেঁড়া স্যান্ডেল একলগে বেঁধে রাখা হইতো। টায়ারটা দেখে একটা ভ্রমণ টের পাওয়া গেল। যেন শৈশবের পাড়া ঘুরতে বেরিয়ে যাওয়া মিঠারোদের আদর পাওয়া সেই অলস দুপুর, রোদ ছায়া হয়ে গেলেই সেই ভ্রমণ আবার মেঘের গায়ে এলিয়ে পড়তো। তখন মনে হইতো মেঘগুলো আকাশের প্রত্যঙ্গ। মেঘেদের ঝরে যাওয়া মানে প্রত্যঙ্গ ভেঙে পড়া। এমন একদিনের কথা মনে আছে, মামাদের উচুঁ একটা টালের খেত ছিল। সেখানে একটা কাকতাড়ুয়া ছিল। মুলা চুরি করে খেয়ে আসার সময় তার সাথে কোলাকোলি করতাম। এখন অবশ্য যদি আবারো সেই কাকতাড়ুয়াটার সাথে কোলাকোলি করতাম, তবে তাকে বলতাম— আমারে একবার কবি বলে ডাকো তোমার এই পরিসরের ভেতর দাঁড় করিয়ে।


















































































































































