যেইখানে বন
আদিম রাত্রির ঘ্রাণ
বুকে ল’য়ে অন্ধকারে গাহিতেছে গান–
তুমি সেইখানে।
নিঃসঙ্গ বুকের গানে
নিশীথের বাতাসের মতো
একদিন এসেছিলে,
দিয়েছিলে এক রাত্রি দিতে পারে যত।
এই যে কবিতা দিয়ে শুরু করলাম, এই কবিতা আমার লেখার কথা ছিল, কিন্তু আমার আগেই যেজন লিখে ফেলেছিলেন তাকে নিয়ে এই লেখা।
এই যে লিখছি, যাকে নিয়ে লিখছি তার নাম আনন্দ, মাল্যবান, তার নাম মিলু, তার নাম জীবনানন্দ, জীবনের আনন্দ, জীবনানন্দ দাশ। কিন্তু তার জীবনে কি আনন্দ ছিল? তিনি যথার্থ অর্থে কবি ছিলেন। তাই নিজে সুখী হতে পারেননি, পরিবারকেও কোনোভাবে সুখী রাখতে পারেননি। দোটানার মধ্যে থাকতে থাকতেই চলে গেলেন। তিনি নামেই আনন্দ। তাই তার নাম থেকে ‘আনন্দ’ শব্দটা বাদ রেখে কখনো তাকে আমি জীবনদাশ নামে ডাকি। এই যে লিখছি এইখানে আমি তাকে নিয়ে যা মন চায় লিখেছি।
জীবনদাশ আমার ওপর সবথেকে প্রভাব-বিস্তারকারী কবি। শৈশবে তার কবিতা পাশে রেখে আমি কবিতা লিখতাম গুনে গুনে একই মাত্রায়। তার কবিতা পড়ার পর তিনি কখনো ওই অর্থে ছড়া লেখেননি বলে আমিও কখনো ছড়া লিখব না বলে ঠিক করেছিলাম। আমার যেইসব কবিতা তিনি লিখে রেখেছিলেন সেইসব পড়ে পড়ে মনে হয়, ভালোই করেছেন তিনি আগেই লিখে রেখে, নাহলে কেমন করে জানত মানুষ আমার জন্মেরও অনেক অনেক বছর আগে আমারই রক্তের ভেতরকার এইসব কথা,
‘জীবন হয়েছে এক প্রার্থনার গানের মতন
তুমি আছ ব’লে প্রেম,—গানের ছন্দের মতো মন
আলো আর অন্ধকারে দুলে ওঠে তুমি আছ ব’লে!
হৃদয় গন্ধের মতো—হৃদয় ধূপের মতো জ্ব’লে
ধোঁয়ার চামর তুলে তোমারে যে করিছে ব্যজন!
ওগো প্রেম,—বাতাসের মতো যেই দিকে যাও চ’লে
আমারে উড়ায়ে লও আগুনের মতন তখন!
আমি শেষ হব শুধু, ওগো প্রেম, তুমি শেষ হলে!’
জীবনদাশকে নিয়ে আমার কোনো গবেষণা নেই। কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লোকজন যখন লাবণ্য দাশকে ছেঁড়াছিঁড়ি করে তখন আমার মনে হয় এইটা একতরফা জানা ও ভাবাবেগের ফসল। তথ্য নয়, আমার পর্যবেক্ষণ বলে, জীবনদাশের এতগুলি চাকরি হারানোর পেছনে তার নিজের দায়ও ছিল অনেকটা। তিনি ছিলেন ঘরকুনো আর গৃহকাতরটাইপ মানুষ। তাই আমার মনে হয় তিনি নিজেই চাকরি করতে চাইতেন না। ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হত যে চাকরি চলে যেত। শেষ ছ-বছর তার চাকরি খোঁজা, ধার-দেনা নিতান্তই বাধ্য হয়ে। বরিশাল থেকে বহুদূর বলতে তিনি দিল্লিই গিয়েছিলেন। কলকাতায় ছিল না বরিশালের নির্জনতা। এইসব হাহাকার তাকে অন্তর্মুখী আর স্বার্থপর করে তুলেছিল। এর মধ্যে লাবণ্য দাশকে নানাভাবে শিক্ষকতা, টিউশন, ধারদেনা করে সংসারের অনেকটা টানতে হয়েছে। এইসব টানতে গিয়ে তাকে কখনো ক্ষেত্রবিশেষে রূঢ় হতে হয়েছে, কখনো প্রতারক হতে হয়েছে, নিচে নামতে হয়েছে। ফলে জীবনদাশের কবিত্ব বা সাহিত্যকৃতি দেখার অবসর তার হয়নি। কারণ পৃথিবীর সবথেকে বড়ো সমরাঙ্গনের নাম অভাবের সংসার।
এইবার একটু উলটো কথা বলি, জীবনদাশ যদি লাবণ্যকে কোনো রাতের আঁধারে পঞ্চমীর চাঁদ ডুবে গেলে একবারে ছেড়ে চলে যেতেন, তাহলে তিনি হতেন ভগবান গৌতম বুদ্ধ। তা করেননি বলেই আজ তিনি অনেকের কাছে অপদার্থ।
জীবনদাশের কবিতা নিয়ে অজস্র লেখা আছে। আমি ওই অর্থে কোনো লেখাই পড়িনি। কবিতা বুঝতে হয় নিজের উপলব্ধি দিয়ে, অন্যের বিশ্লেষণ দিয়ে নয়। সবকিছু টেক্সট। এক একজনের এক এক রকম পাঠ, তাই দৃশ্যকল্প ভিন্ন। একদিন নিকিতা আমাকে বলেছিল, ‘জীবনানন্দের কবিতায় মানুষ নেই’। পরে আমার মনে হয়েছে নিকিতার কথা একার্থে ঠিকই আছে, নৈর্ব্যক্তিক অর্থে জীবনদাশের কবিতায় কোনো মানুষ নেই। প্রকৃতি, শূন্যতা, বিষাদ আর অবদমিত কাম আছে। বাঙলার যে রূপ আছে তার অর্ধেক কল্পনা। কল্পনার সৌন্দর্য জুড়ে দিয়ে দৃশ্যমানতাকে মহিমা দিয়েছেন। তিনি যে নিরপরাধ ঘুমের কথা বলেছিল তার আগে উষ্ণ লাল হরিণের মাংস ছিল, তারও আগে মোরগফুলের মতো লাল আগুন ছিল হিমের রাতে।
জীবনদাশ মনে করতেন যে সমাজ ও অর্থনীতির সমস্যায় বহু মানুষ চিরকাল দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে ঘুরছে, এই ভেবে তিনি যেইসব উপন্যাস লিখেছেন তার পরিকাঠামো সাধারণ উপন্যাস থেকে ভিন্ন, যেন মনে হবে তার উপন্যাসের শুরুও নেই, শেষও নেই। তার কতিপয় লেখক-বন্ধুও সেইসব উপন্যাস পড়ে বলতেন যে তিনি লেখার ব্যাকরণ মানছেন না, তাই এগুলি চলবে না। তাই হয়তো জীবনদাশ নিজেও এগুলিকে ঘষা-মাজা করে প্রকাশ করার চেষ্টা করেননি জীবদ্দশায়। কিন্তু তার নিজের কিন্তু বিশ্বাস ছিল যে মানুষের আসল সমস্যাকে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে এরকম উপন্যাসের প্রয়োজন আছে। ফলে তিনি কুড়ি বছরের বেশি সময় ধরে কয়েকডজন খাতা ভর্তি করে এত গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। তিনি এও জানতেন যে ইউরোপের অনেক লেখকও এই ধরনের উপন্যাস লিখেছেন। তবে তার সকল উপন্যাসই একান্তভাবে মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনযন্ত্রণা নিয়ে। তার প্রথম উপন্যাস ‘মাল্যবান’ দাম্পত্য জীবনের আখ্যান। এখানে প্রকৃতার্থেই তিনি আধুনিক হতে পেরেছেন। ব্যক্তি মানুষের অসহায়ত্ব, জীবন নিয়ে খেলা, আপস করার কৌশলকে দেখে তা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। তার চেষ্টার প্রতিনিধিত্ব করে উপন্যাসের প্রোটাগোনিস্ট মাল্যবান। আড়াইশো টাকা বেতন পাওয়া মাল্যবানের আর্থিক সামর্থ্য কম। অথচ সে স্ত্রী উৎপলা ও সন্তান মনুকে সুখে রাখতে চায়। কিন্তু উৎপলার চাহিদা বড়োলোকদের মতো আর মাল্যবান অক্ষম। উৎপলা দোতলার ভালো ঘরে থাকে। আর মাল্যবান থাকে নীচতলায় ইঁদুরের সঙ্গে। উৎপলার কাছে পার্টি, সিনেমা, পার্কে ঘুরে বেড়ানোই জীবনের নাম। দামি শাড়ি পরার মধ্যেই সে শান্তি পেতে চায়। মাল্যবান উৎপলার এ দাবি মেটাতে পারে না। একসময় উৎপলা মাল্যবানের সামনেই গ্রহণ করে সমরেশকে।
জীবন ও দাম্পত্যকে জীবনদাশ যেন এক উৎকটরূপে দেখেছেন। কখনো মনে হয়েছে হয়তো প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিজীবন এমনই আবার পরক্ষণেই এ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছেন। যে-সংকট নিজে অনুভব করেছেন সেটা এতটা খোলামেলা প্রকট হোক তা হয়তো চাননি তিনি। এখানে জীবনের গভীরতা আছে। আছে আধুনিক মানুষের অস্তিত্বের সংকট। উৎপলা চাইলেই মাল্যবানের চোখের আড়ালে সমরেশকে নিতে পারত। কিন্তু সে তা করেনি, সে যা করেছে, সামনেই করেছে। এ তার সততা নয়, এ নিষ্ঠুরতা। এবং ইচ্ছাকৃত। সে পৃথিবীর সবথেকে নিষ্ঠুর নারী হতে চেয়েছিল কি না আমি জানি না, মাল্যবানও জানত না। তবে সেই মুহূর্তটায় মাল্যবানের কেমন লাগছিল তা প্রকাশের ভাষা হয়তো পৃথিবীতে আজো তৈরি হয়নি।

এইবার জীবনদাশকে একটা চিঠি লিখি এই পর্যন্ত এসে। চিঠিতে তাকে মাল্যবান বলেই ডাকছি:
প্রিয় মাল্যবান,
চিঠি কেমন করে শুরু করতে হয় তা আমি জানি না। যদিও আমি এক জীবনে তেরো হাজারের কম চিঠি লিখিনি নিশ্চয়ই। পেয়েছিও ঢের বেশি। আমার নিজ হাতেই পুড়িয়েছি তেরো কেজি চিঠি। সেও অনেকবছর হয়ে গেল। তারপর মাঝখানে অনেকদিন এইভাবে চিঠি লিখিনি। তোমার কাছে যখন চিঠি লিখতে বসলাম তখন আমার মনে পড়ে গেল তোমাকে তো আমি সেই ছোটোবেলা থেকেই চিঠি লিখি মনে মনে। হাঁটতে হাঁটতে শূন্যতার ভেতর তোমার সঙ্গেই কথা বলেছি কতদিন!
‘এখানে পালঙ্কে শুয়ে কাটিবে অনেকদিন
জেগে থেকে ঘুমোবার সাধ ভালোবেসে।’
তোমার কবিতার এই পঙ্ক্তিটা আমাকে প্রথম তীব্রভাবে আবিষ্ট করে রেখেছিল। কারণ হয়তো এর আরো বছরখানেক আগে থেকেই আমার রাতে ঘুম যেতে না পারার অসুখ শুরু হয়ে গিয়েছিল। যা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি। এটা তোমার ‘অবসরের গান’ কবিতার। আমার কাছে এখনো এই কবিতাটাই বাঙলা সাহিত্যের সবথেকে সফল দীর্ঘ কবিতা। তখন আমি ইশকুলে পড়ি। ১৯৯৩ সাল, সপ্তমশ্রেণি। আমার কাছে আছে তোমার ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ নামে একটা বই, উজ্জ্বল সবুজ মলাট। ৪৫ টাকায় কিনেছিলাম আমাদের শহরতলির বইয়ের দোকান ছাত্রবন্ধু লাইব্রেরি থেকে।
একদিন তোমাকে বলেছিলাম, ‘ছুটে আসছে ট্রামলাইন। মিলু, তুই বামপাশে তাকা। আমি তোর বুকের ভেতর শালবন ঝিরিঝির। তুই কি জানিস, ধনেশের চঞ্চুতে কিসের অসুখ দিঘল হলুদ? তুই কাহাকে স্বাধীনতা দিয়া বাঁধিয়াছিলি বোকা? কে এসে কেড়ে নিল তোর সকল পাখি আর পাখিনীর খড়? মাধবীরাতের ক্যাম্পফায়ার জ্বলে ওঠে আরও পরে, কোথাও সঘনবনের অস্থিরতায়। পতিত দিনের রোদে ভরে গেছে হাওয়াচর পাখিদের চোখের প্রাচীর। দেওয়ালের ছায়ায় রক্তরহিত তপ্ত ভোরের উদ্ভাস, আমাদের মাছঘুম, অন্তর্গত হাহাকার নিঝুম।’ এইসব কথা আমার ‘পুরুষপাখি’ বইয়ে লেখা। পুরুষপাখি সেও আমি, তোমার কবিতা থেকে কাক হয়ে উড়ে এসে এইখানে ময়ূর হয়ে গেছি। আমার পালকে পালকে তেরোহাজার চোখ খুঁজে ফেরে কার মুখ আমি জানি না। হয়তো তোমার তাকে,
‘যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে
অথচ যার মুখ আমি কোনোদিন দেখিনি…’
তখন আমি হয়তো বছর বারো হবো। তখন আমি শৈশবরহিত একলা শ্রাবণ। তখন আমি ভিড়ের ভেতর ভয়ানক নৈঃসঙ্গ্য। তখন আমি হট্টগোলে ব্যাপ্ত নৈঃশব্দ্য। তখন আমি বিরান বনভূমিতে একা পাহাড়ের অভিমান। তখন আমি পাহাড়ের দেহে গোপন নির্ঝর। একদিন বইয়ের পাতায় তুমি এসে চলে যাওয়ার সময় বললে,
আবার আসিব ফিরে…
‘…কিশোরীর ঘুঙুর রহিবে লাল পায়
সারাদিন কেটে যাবে কলমির গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে;
দেখিবে ধবল বক:’
এইই প্রথম তোমাকে আমার পড়া। তখনো তোমাকে দেখিনি কিছুই। দেখিনি ভীরু ভীরু চোখের অন্ধকারে ডুবে আছে আলোর চরাচর। আমার মাথার ভেতর ঢুকে গেল শঙ্খচিল, কিশোরীর ঘুঙুর আর লাল পা। আমি তখনো জানতে পারিনি—এর থেকে আমার মুক্তি নেই।
তুমি একদিন এসে আমার কানে কানে বললে, কাকের চোখ পৃথিবীতে সবথেকে সুন্দর! আমি শুধালাম, কেমন করে? আর তুমি বললে, কাকচক্ষু জল। সেই থেকে আমি কাক হলাম। তোমার সুদর্শন যেন বা উড়িতেছি সন্ধ্যার বাতাসে। কখনো তোমার হাওয়ার রাতে:
‘সারা রাত বিস্তীর্ণ হাওয়া আমার মশারিতে খেলেছে;
মশারিটা ফুলে উঠেছে কখনো মৌসুমী সমুদ্রের পেটের মতো,
কখনো বিছানা ছিঁড়ে
নক্ষত্রের দিকে উড়ে যেতে চেয়েছে;
এক-একবার মনে হচ্ছিল আমার–আধো ঘুমের ভিতর হয়তো–
মাথার উপরে মশারি নেই আমার,
স্বাতী তারার কোল ঘেঁষে নীল হাওয়ার সমুদ্রে শাদা বকের মতো উড়ছে সে!’
স্মৃতি আর সন্ধ্যার আরক্ত অন্ধকার। মাল্যবান! তোমাকে মনে পড়ে। মনে আছে, তোমাকে অনেকদিন কোনো চিঠি লিখি না। আজ এই জ্বরাক্রান্ত শরীরে সহসা তোমাকেই মনে হল কেন তা বলা কঠিন। প্রকৃত অর্থে মনে হল তোমার মৃত্যু এবং হারিয়ে যাওয়ার কথা। যখন গিয়েছিল ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ, তখন বুঝি তোমার মরার সাধ জেগেছিল মনে?
সেদিন ভরা বিকেল ছিল। দিগন্তের সোনালি রং ছিল শাহরিক ধোঁয়ায় ম্লান। ১৮৩ নম্বর ল্যান্সডাউন স্ট্রিট, কলকাতার একতলা বাড়িটার সামনে বুড়ো নিমগাছ বাতাসে কাঁপছিল ধীর ধীর। কতদিন হল এই বাড়িতে? তুমি মনে করতে চাও না। স্বরাজ পত্রিকার চাকরি তোমাকে এইখানে তাড়িয়ে এনেছে, নাকি দেশভাগ, নাকি পরিবার, লাবণ্যগুপ্ত? শিরীষের ডালপালা নেই, আছে ধু ধু গড়ের মাঠ। ধানসিড়ি হারিয়ে গেছে কবে কালীগঙ্গায়!
শেষ কয়েকবছর তুমি চরম অর্থকষ্টে ছিলে। দেশ পত্রিকা তোমার ছয়টি কবিতা বাতিল করে ফেরত পাঠিয়েছিল। অতিতুচ্ছ কারণে একটার পর একটা চাকরি হারিয়েছ। লাবণ্যর অসুস্থতা, পরিবারের ভার তোমাকে অস্থির এবং ক্রমশ অসহায় করে তুলেছিল। নিদারুণ অর্থকষ্টে ভাড়াবাড়ির একটা ঘর সাবলেটও দিয়েছিলে গোপনে, একজন নর্তকীর কাছে। আচ্ছা, তুমি কি তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লিখোনি? হয়তো না। তখন তো তোমার লেখাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর সে নর্তকীতো বলতে গেলে তোমার লেখা-পড়ার পরিবেশ আর সকল নৈঃশব্দ্যই ভেঙে দিয়েছিল।
তোমার সেই বাসাবাড়িতে আর থাকতে মন করে না। মন করে না, মন করে না…। অরবিন্দকে বলেছিলে বেশ কয়েকবার কয়েকবার। সে নিশ্চয়ই অন্য একটা বাড়ি খুঁজে বের করবে। কিন্তু কখন যে করবে? নিমগাছের পাশ ঘেঁষে তুমি রাস্তায় ওঠে এলে। হাওয়ায় দুলছিল তখন নিমফুলের শাদাটে-বেগুনি ঘ্রাণ। জলার হাওয়ায় তোমার শরীর জুড়োবে? অলোক আসবে। তার সঙ্গে কথা, তার সঙ্গে প্রতিদিন একাকীত্ব। তুমি ফিরছিলে নিমগাছের ঘরে। ১৮৩ নম্বর ল্যান্সডাউন স্ট্রিট। ল্যান্সডাউন ফিরে গেছে ব্রিটেনের রাস্তায়। কলকাতার ল্যান্সডাউন এখন সারদা বসু।
প্রিয় মাল্যবান, তোমার বৃষ্টি নিয়ে তেমন কবিতা নেই। তোমার সমগ্র কবিতা খুঁজলে দুইতিনটা বৃষ্টির কবিতা পাওয়া যাবে। কেন এমন করেছিলে? আমার একবার মনে হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ বৃষ্টি নিয়ে এতো কবিতা গান লিখে ফেললো বলেই তুমি আর বর্ষার রূপ লিখতে যাওনি। তুমি আসলে বর্ষাকে উপলব্ধি করেছিলে সকল ঋতু এবং অস্ফুট শূন্যতার ভেতর দিয়ে। কেননা কোনো বাঙালির পক্ষে বর্ষাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আর তোমার কবিতায় হেমন্ত এল, এল শরৎ, এল শীত। এইসব ভালো লেগে গেল আমার। তোমার অন্ধকার চোখের ভেতর তখন ঘুমিয়ে পড়ছে ধীরে উত্তরের সকল বনাঞ্চল। সারারাত ঘাই হরিণী ডাকে, তুমি ক্যাম্পে শুয়ে আমারই মতোই বুকের ভেতর লিখে যাচ্ছো গুলির শব্দ। তুমি ‘ক্যাম্পে’ কবিতা লিখলে। আর সজনীকান্তসহ অনেকে বলল, ইহা অশ্লীল। আর মূর্খ কলেজ কর্তৃপক্ষ তোমার চাকরি কেড়ে নিল। কেমন করে বুঝবে ওরা গভীর বনের মধ্যে রক্তের ভেতর রক্তক্ষয়ী সেই সৌন্দর্যের কথকতা? ওরা তো কেউ তোমার মতো করে ঘাই হরিণীর ডাক শোনেনি কোনোদিন। অথচ আমার মনে হয়েছে সজনী আসলে তোমার ক্ষমতাকে ঈর্ষা করতো। দেখো, তোমার শম্ভুনাথের শেষ দিনগুলিতে সজনী খুব চেষ্টা করেছিল তোমাকে বাঁচানোর। কিন্তু পারেনি। ভূমেনও জানে এইসব। কারণ তখন ভূমেন শম্ভুনাথের ডাক্তার। সেও আশা করেছিল তুমি বাঁচবে। সজনী হয়তো গোপনে কেঁদেছিল তোমার জন্য।
স্মৃতি আর সন্ধ্যার আরক্ত অন্ধকার। মাল্যবান! তোমাকে মনে পড়ে। মনে আছে, তোমাকে অনেকদিন কোনো চিঠি লিখি না। আজ এই জ্বরাক্রান্ত শরীরে সহসা তোমাকেই মনে হল কেন তা বলা কঠিন। প্রকৃত অর্থে মনে হল তোমার মৃত্যু এবং হারিয়ে যাওয়ার কথা। যখন গিয়েছিল ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ, তখন বুঝি তোমার মরার সাধ জেগেছিল মনে?
তোমাকে আমি কখনো মিলু বলে ডাকি, কখনো জীবনদাশ, কখনো গোপনে মাল্যবান বলে ডাকি। মাল্যবান কেন বলি সে তুমি ভালোই জানো। তুমি আসলে তোমারই মাল্যবান। একলা একা ঘরে কবিতার কথা ভাবতে ভাবতে তুমি ঘুমিয়ে পড়লে কেউ এসে তোমার ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে নেয় না শয্যায়। যেমন বনলতা সেনকে আমার মনে হয় কল্পনা, তোমার কল্পনা। তোমার জানলা দিয়ে দেখা শাদামেঘের আকাশবাড়ি।
সেইদিন ধেয়ে আসছিল একটা লোকজনে ভর্তি ট্রাম। তুমি তারও অনেকদিন আগে লিখেছিলে বোধহয়, একখানা মোটর-কার এসে, গাড়লের মতো কেশে এই জাতীয় একটা কবিতা। অথবা লিখেছিলে,
‘একটা মোটরকার
খটকা নিয়ে আসে।
মোটরকার সব-সময়েই একটা অন্ধকার জিনিস,
যদিও দিনের রৌদ্র-আলোর পথে
রাতের সুদীপ্ত গ্যাসের ভিতর
আলোর সন্তানদের মধ্যে
তার নাম সবথেকে প্রথম।
একটা অন্ধকার জিনিস:
পরিষ্কার ভোরের বেলা
দেশের মটরশুঁটি-কড়াইয়ের সবুজ খেতে-মাঠে হাঁটতে হাঁটতে
হঠাৎ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছি
লাল সুরকির রাস্তার ভিতর দিয়ে
হিজলগাছ দুটোর নিচে দিয়ে
উনিশশো চৌত্রিশের মডেল একটা মোটরকার
ঝকমক করছে, ঝড় উড়িয়ে ছুটেছে।’
তেমনই একটা মোটরগাড়ি ট্রামের রূপ ধরে আসে, তুমি টের পাও না। ট্রাম যাবে বালিগঞ্জ। বালিগঞ্জে ট্রামের কী কাজ?
তুমি কখনো টিউশন করেছ একসঙ্গে বেশ কয়েকটা। তোমার অর্থকষ্ট যায়নি। আবার কখনো ইনস্যুরেন্স কোম্পানির দালালিও করেছ। টাকা ধার করেছ সম্ভব-অসম্ভব প্রায় সকল সূত্র যেমন ভাইবোন, ভাইয়ের বউ, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি, স্কটিশ ইউনিয়ন, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, সত্যপ্রসন্ন দত্ত, বিমলাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বাণী রায়, প্রতিভা বসু সহ আরো অনেকের কাছ থেকে। আবার শোধও করেছ তার অনেকটাই ভেঙে ভেঙে। তোমার মৃত্যুর কয়েকমাস আগে স্বরাজ পত্রিকার হুমায়ূন কবিরের কাছে বেশ কয়েকটি চিঠি লিখেছিলে পরপর। একটা চিঠিরও কোনো প্রত্যুত্তর পাওনি তুমি। তুমি তোমার প্রিয় হুমায়ূন কবিরকে চিঠিতে বলেছিলে,
আমি সেই মানুষ, যে প্রচুর প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রতিটি দ্রব্যকে সোনা বানিয়ে তুলতে চায় অথবা মহৎ কোনোকিছু যা শেষ বিচারে একটা কোনো জিনিশের মতন জিনিশ। কিন্তু, ভাগ্য এমনই যে, আজ তার পেটের-ভাত জুটছে না। কিন্তু, আশা করি, একটা দিন আসবে, যখন খাঁটি মূল্যের যথার্থ ও উপযুক্ত বিচার হবে, আমার ভয় হয়, সেই ভালো দিন দেখতে আমি বেঁচে থাকব না।
কিন্তু শেষপর্যন্ত হুমায়ুন কবির কিছুই করেনি। অথচ তার অনেক সুযোগ ছিল। অন্তত অল ইন্ডিয়া রেডিও-তে তোমার একটা চাকরি সে জুটিয়ে দিতে পারত। অবশ্য তুমি অর্থাভাবে, মানসিক দুশ্চিন্তায় অন্যমনস্ক হয়ে ট্রামের তলায় চাপা পড়ে মরে যাওয়ার অনেকদিন পর তোমাকে মরণোত্তর সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারটা পাইয়ে দিয়েছিল। যা মরার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবেই প্রকট হয় আমার চোখে। এইসব কথা আমাকে ভূমেন বলেছে।
তোমার আসলে সংসার করাই উচিত ছিল না। সে কথা তোমার নিশ্চয়ই মনে হয়েছে পরে। আমার যেমন মনে হয়। তোমাকে তো কেউ বুঝতে পারতো না। কৃষ্ণচূড়া গাছের গায়ে যে বিড়াল আঁচড় কাটে তার মধ্যে যে সৌন্দর্য তা তোমার সঙ্গে বসে কেউ দেখার ছিল না।
একদিন অনেকদিন আগে তোমার মা আমাকে বলেছিল,
‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে,
কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হবে?’
আমি মনে মনে বললাম, জানি না তো! বাতাস এসে বন্ধ করে দিল আমার বইয়ের জানালা। তারপর অনেকদিন গেছে, আমি অপেক্ষায় থেকেছি। কুসুমকুমারী তার মিলুর কথা আমাকে না বলেই একদিন হারিয়ে গেল, আমার বইয়ের পাতা থেকে। তারপরও মনে মনে প্রতীক্ষায় থেকেছি। তারপর একটি নিঃশব্দ ট্রামে চড়ে তুমি এসেছিলে। তোমার হাতে একটা শাদা হাওয়াই মিঠাই।
পুরোনো জং ধরা ট্রাংকে তোমার সাতান্নটি খাতা পাওয়া গেছে, জানো? কেন তুমি অইসব লুকিয়ে রেখেছিলে। না, হয়তো যত্ন করেই রেখেছিলে। ‘ময়ূক’-এর ভূমেন ওইসব ছাপিয়ে দিয়েছে, দিনলিপি নাম দিয়ে। তোমার ডায়েরি মানে তো আর দিনলিপি নয়, কী পড়েছ, না পড়েছ, কার কবিতা পড়ে কী মনে হয়েছে তাইই লিখে রেখেছ। ভূমেন করেছে কী জানো, তুমি যেইসব লেখা পড়ে সেই সম্পর্কে লিখেছ ওইসব লেখাও বেশিরভাগ ছাপিয়ে দিয়েছে তোমার দিনলিপির ভেতর। তাই অনেক মোটা হয়ে গেছে। অনেক দাম। অথচ কী অভাবের মধ্যেই না তুমি ছিলে কলকাতার শেষ কবছর।
মাল্যবান, অনেকে মনে করে, তুমি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলে। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। আমি কে, কোথা থেকে এলাম, কোথায় যাব? ইত্যাকার প্রশ্নের সমুখে মানুষ চিরদিনই ভয়ানক অসহায়। তুমি বলেছিলে,
আলো-অন্ধকারে যাই-মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে!
স্বপ্ন নয়-শান্তি নয়-ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়!
আমি তারে পারি না এড়াতে;
সে আমার হাত রাখে হাতে,
সব কাজ তুচ্ছ হয়, পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা-প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়!
…আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চলে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে;
সে কেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়?
কেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা, এ শূন্যতা কি কেবলই তোমার? না, এই শূন্যতা আমারও যে অস্তিত্বের যন্ত্রণাকে প্রতিনিয়ত উপলব্ধি এবং ধারণ করে। আর এই শূন্যতা থেকেই আমিও নিজেকে খুঁজে বেড়াই। আর যে নিজেকে খুঁজে বেড়ায় সে কখনো আত্মহত্যা করতে পারে না। যেমন, তুমি আর শূন্যতা মিলে আমাকে কবিতার দিকে তাড়িত করেছ। আমি সুন্দরের ভেতর, প্রিসলিনের ভেতর, লিথির ভেতর, সুধার ভেতর, বেদনা ও বাদলের ভেতর, ধূলিকণার ভেতর, চাঁপাবন ও অভিমানের ভেতর, রক্তের ভেতর, অনিন্দ্য ও মৃন্ময়ীর ভেতর, রতি ও রূপের ভেতর, লাবণ্য ও ক্লান্তির ভেতর, মদের ভেতর, ধূম্র ও মরীচিকার ভেতর কবিতাকে খুঁজেছি। পেয়েছি কি না জানি না। কেননা আমার এই সন্ধান আর শেষ হয় না। আমার সন্ধান ঝরে যায়, স্মৃতি, আমার সন্ধান আঁকে বিস্মৃতি।
অলোকের সঙ্গে কী কথা তোমার আজ? কবিতার কথা? সে তো তুমি নিজেই লিখে রেখেছ। অনেকদিন লেখো না তুমি। অলোকের কাছে কি টাকা ধার করবে? তোমার গায়ের রং গাঢ় শ্যামল। তোমার ভেতর ছিল রাইমাধব। অলোকের সঙ্গে কি দেখা হল? সুবোধের সঙ্গে কী কাজ। জয়া স্টোরের সামনে কি জেব্রাক্রসিং ছিল? কী ভাবছিলে তুমি? তোমার হাতে কি বাজারের ব্যাগ, আর বগলে ছাতা ছিল? ছিল না হয়। ছিল আসলে দুহাতে দুই থোকা ডাব। ডাবের রং কচি লেবুপাতার মতো। তোমার মাথার ভেতর কি ঘুরছিল তখন প্রাচীন শকতির মতো কবিতার কোনো চিত্রকল্প, নাকি অর্থের চিন্তা? হাতে টাকাকড়ি নেই। ট্রামের হুইসেল কানে বাজলো না তোমার। ট্রামের চাকা তোমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল পঁচিশ-তিরিশ হাত দূরে। আততায়ী ট্রাম যখন ব্রেক কষলো তখন প্রচণ্ড ধাক্কায় তোমার দেহ ঢুকে গেল ট্রামের ক্যাচারের ভেতর। পানের দোকানি চুনিলাল যখন লোকজন নিয়ে তোমাকে ট্রামের তলা থেকে টেনে বের করলো তখন তোমার বুকে রক্তের দাগ লেগে আছে, তোমার মাথা থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। ভেঙে গেল পাঁজরের হাড়। কণ্ঠার হাড়ও কি ভেঙেছিল তোমার? পানের পিকের মতো রাস্তার পিচে লেগে গেল তোমার রক্ত। কালো পিচের সঙ্গে তোমার রক্ত মিশে কেমন পোড়া সিঁদুরের মতো রং তাকিয়ে ছিল চেনা সূর্যের দিকে। তুমি তখন অচেতন। তারপর তোমার কবিতা বাতাসে ঘোরে, তুমি যেমন বলেছিলে,
‘কাচপোকা ঘুমিয়েছে—গঙ্গাফড়িং সেও ঘুমে,
আম নিম হিজলের ব্যাপ্তিতে পড়ে আছ তুমি।;
তারপর শম্ভুনাথ পণ্ডিতের ওষুধের গন্ধমাখা ঘরে তোমার শাদা শাদা কটা দিন কেটে যায়। নিজের বুকে গুলি করার পর ভিনসেন্টও পড়েছিল কয়েকদিন হাসপাতালে তোমারই মতো। আর তোমার ফুসফুসের ভেতর ঘুরে ঘুরে ঝেকে বসল নিউমোনিয়ার নখর। তারপর তুমি ফিরে গেলে তোমার অন্ধকারের কাছে। তোমার বনলতা সেন, প্রিয়তম অন্ধকার, থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার। তারপর কি তোমাকে মর্গে নিয়ে গেল? মর্গকে তুমি বলেছিলে লাশকাটা ঘর, আটবছর আগে একদিন,
‘শোনা গেল লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কালরাতে—ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হ’লো তার সাধ…’
শেষবার তোমার কার মুখ মনে পড়েছিল, অরুণিমা সান্যালের মুখ? তোমার মাথার মধ্যে ঘুরছিল নিশ্চয়ই সেইসব লাইন, তুমুল কৈশোরে আমার জানালাবিহীন ঘরের অন্ধকার দেয়ালে খড়িমাটির আঁচড়ে তোমার লেখা কবিতার যেইসব লাইন লিখে রেখেছিলাম,
‘হৃদয়ের অবিরল অন্ধকারের ভিতর সূর্যকে ডুবিয়ে ফেলে
আবার ঘুমোতে চেয়েছি আমি,
অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর
অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে
থাকতে চেয়েছি…’


































































































































































































































































1 Comment. Leave new
জীবনানন্দ দাশের উপন্যাস গুলো নিয়ে তেম।ন আলোচনা সমালোচনা তুলনামূলক আলোচনা খুবই কম হয়েছে। নির্ঝর তোমার মতো করে এ গদ্য টি আমার ভালো লেগেছে।