৯ আগস্ট ২০২৬
বিয়ুলি
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
রিমেল মুগ্ধ
প্রাবন্ধিক, সংগীতশিল্পী
165

রিমেল মুগ্ধ
প্রাবন্ধিক, সংগীতশিল্পী

165

বিয়ুলি

মানুষকে ব্র্যাকেটবন্দি করার এক অলস নাগরিক অভ্যাস আমাদের ভেতরে খুব গভীরভাবে গেঁথে থাকে। আমরা সম্পর্ককে কেটে-ছেঁটে স্পষ্ট, সুবিধাজনক ও নিরাপদ ফ্রেমে সাজাতে পছন্দ করি—বন্ধু, অবন্ধু, প্রতিবন্ধু। গ্রামাটাইজেশন হরদম। কিন্তু এই সমস্ত খোপ-কাটা বিভাজন যে বস্তুত এক সূক্ষ্ম মধ্যবিত্ত জালিয়াতি এবং এই কৃত্রিম ব্যাকরণ নিয়ে যে অহেতুক অহংকার করা যায় না, সেই বোধটি আমার ভেতরে প্রথম ফাটল ধরিয়েছিলেন তিনি।

যতদূর মনে পড়ে, তিনি যখন আমার জীবনে আসছেন, তখনো তিনি আমার ‘বন্ধু’ হয়ে ওঠেননি। অন্তত আমাদের ধরা-বাঁধা যে সংজ্ঞা, সেই অনুযায়ী তো নয়ই। উপস্থিতির অনায়াস ভঙ্গিতে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন—আমাদের এই শ্রেণিকরণের লোভ আসলে সম্পর্কের অসীম জটিলতা থেকে পালিয়ে বাঁচার এক সহজ, কিন্তু দেউলিয়া রাস্তা মাত্র। আমরা যে ক্যাটাগরিগুলো বানিয়ে মানসিকভাবে স্বস্তি পাই, তা মূলত আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের নিরাপত্তাহীনতারই এক একটি প্রতিচ্ছবি। তিনি এসে সেই ভীতিটাকেই আলতো করে ছুঁয়ে দিলেন, আর আমার বানানো সমস্ত কৃত্রিম সম্পর্কের দেয়াল এক পলকে বালির প্রাসাদের মতো ভেঙে পড়ল।

আমাদের এই আধুনিক ক্লান্তির যে নেক্সাস বা জটিল নেটওয়ার্ক, তার ভেতরে একটা অদ্ভুত আত্মশ্লাঘাময়ী দিক লুকিয়ে থাকে। আমরা আমাদের ক্লান্তি নিয়ে এক ধরণের অহংকার করি। আমরা ধরে নিই, আমাদের নাগরিক অভ্যাস অত্যন্ত জরুরি, ভীষণ ব্যস্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এক সরল ও রুটিনমেধা দিয়ে বাঁধা। অথচ মানুষের সাথে মানুষের বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে আমরা ভয়াবহ রকমের জটিল। এই জটিলতার আড়ালেই আমরা আমাদের আসল নিজেকে লুকিয়ে রাখি।

“আধুনিক নাগরিকের প্রেম ভীষণ ক্লান্ত।”

এই দাবিটা করার জন্য নিজেকে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও মানসিক তালিম দিতে হয়েছে, এ কথা যেমন সত্যি—তার চেয়েও বড় সত্যি হলো, এই তালিম নিতে গিয়ে নিজেকে ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে হয়েছে নানা অংশে। আধুনিকতা আমাদের শেখায় কীভাবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে শহরের নানা কোণে ছড়িয়ে রাখতে হয়—এক অংশ অফিসের টেবিলে, এক অংশ কফি শপের ধোঁয়ায়, আর এক অংশ মধ্যরাতের নিঃসঙ্গতায়।

অদ্ভুতভাবে পৃথিবীর সমস্ত অভিধান একটি শব্দ ভুলে গেছে, শব্দটি যে কী তা আমি নিজেও জানি না। কিন্তু সেই দিন থেকেই মানুষের বাক্যে অর্থের পরিবর্তে আবহাওয়া জন্মাতে শুরু করেছে এ সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল। এখন কেউ প্রেম উচ্চারণ করলে দূরে কোথাও নদীর জল ঘন হয়ে উঠে; কেউ মৃত্যুর কথা বললে শেওলা জন্মায় আয়নার গায়ে। ভাষাবিদেরা কি একে অর্থের দ্বিতীয় বিপর্যয় বলবেন কিনা সে নিয়ে আলাপ হতে পারে, কিন্তু নামকরণে ঘটনাগুলি কখনও নিবৃত্ত হয় না।

সংশয় আমাদের মধ্যে আছে। নানাবিধ শঙ্কাও আছে। সেখান থেকে আমার প্রশ্ন, বাস্তবতা কি ঈশ্বরের স্মৃতিশক্তির আরেক নাম? এর উত্তর আমি জানি না, যেমন জানি না আমি কেনো আমার সেই প্রাক-যুবতী বন্ধুকে ভালোবাসি, কেনো সে আমার প্রেমিকা। বিস্ময়েরও আয়ু থাকে। একসময় অসম্ভব ঘটনাগুলিও গৃহস্থালির আসবাব হয়ে যায়।

ও আমার জীবনে এলো বিয়ুলি হয়ে। এমন এক আলো, যা চোখে ধাঁধা লাগায় না, বরং দৃষ্টিকে শান্ত করে; যা অতীত আর ভবিষ্যতের সমস্ত টানাপোড়েনকে এক অদ্ভুত আরামদায়ক বর্তমানের মোড়কে জড়িয়ে নেয়

অসমীয়া ভাষায় ‘বিয়ুলি’ শব্দটার অর্থ গোধূলি—দিনের সেই শেষ ক্ষণ, যখন আলো তার চড়া তেজ হারিয়ে এক অদ্ভুত মোলায়েম মায়ায় রূপ নেয়। বিয়ুলি কোনো তীব্র মধ্যাহ্ন নয়, আবার গভীর অন্ধকার রাতও নয়; সে হলো দুই জগতের মাঝখানের সেই পরম সন্ধিক্ষণ, যেখানে বৈপরীত্যগুলো এসে একে অপরকে আলিঙ্গন করে।

আজকের এই যান্ত্রিক নগরে মানুষের সাথে মানুষের মেলামেশায় কোনো গোধূলি থাকে না—সবকিছুই হয় খুব স্পষ্ট, নয়তো একদম অন্ধকার। কিন্তু ও আমার জীবনে এলো বিয়ুলি হয়ে। এমন এক আলো, যা চোখে ধাঁধা লাগায় না, বরং দৃষ্টিকে শান্ত করে; যা অতীত আর ভবিষ্যতের সমস্ত টানাপোড়েনকে এক অদ্ভুত আরামদায়ক বর্তমানের মোড়কে জড়িয়ে নেয়। ওকে ‘বিয়ুলি’ ডাকার অর্থ কেবল এক অসমীয়া শব্দকে ধার করা নয়, বরং ওর ভেতরের সেই গোধূলিসুলভ নিস্তব্ধতাকে নিজের ভেতরে ধারণ করা।

প্রেম আমাদের শেখায়, মানুষের অবয়ব আসলে কোনো স্থায়ী বস্তু নয়, তা এক চলমান রূপান্তর। যখন আমি ওর পাশে বসি, শহরের অগণিত গাড়ির শব্দ, হর্ন, কপার ও স্টিলের কড়াকড়ি ধুলো হয়ে উড়ে যায়। আমার ভেতরের যে অংশগুলো এতদিন আধুনিকতার চাবুকে ক্ষতবংশী হয়েছিল, সেগুলো ওর শান্ত সান্নিধ্যে এসে আবার জুড়ে যেতে থাকে। পৃথিবীর উত্তেজনার মুখোমুখি হওয়া নয়, বরং এক ধরণের গভীর ও নির্জন আরাম। সেই আরাম, যা কেবল দিনের শেষে সূর্য যখন অস্ত যায়, তখন ক্লান্ত পৃথিবী অনুভব করে।

আমরা দুজনে কতদিন এই কংক্রিটের জঙ্গলে পাশাপাশি হেঁটেছি—কোনো কথা না বলে, কোনো নাম না দিয়ে। সেখানে না ছিল বন্ধুত্বের অতিরিক্ত দাবি, না ছিল প্রচলিত সম্পর্কের চেনা তাড়াহুড়ো। কেবল ছিল এক অস্বচ্ছ অথচ গভীর বোঝাপড়া। ভালোবাসার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো তার নামহীনতায়। যখন আপনি কাউকে কোনো তকমা দেবেন না, তখনই কেবল তাকে তার সমগ্রতা নিয়ে গ্রহণ করতে পারবেন।

যখন টাঙ্গাইল ছিলাম, আমার বাসার উত্তরদিকে একটা বটগাছ ছিলো। আমি মাঝে মাঝে পাতা ছিঁড়ে এনে জানালার পাশে রেখে দিতাম। ঘর ভরে উঠত ধূলি, চড়ুইয়ের ডাক, দূরবর্তী ট্রেনের শিস এবং এমন সব মানুষের গন্ধে, যাদের সঙ্গে আমার কখনও পরিচয় হয়নি। অনুভূতি কিছুটা এমন, বহু শতাব্দী ব্যবহৃত একটি পুঁথির ভেতরে অদৃশ্য চন্দনের গন্ধ থেকে যায়, অথচ পুঁথিটি কখনও সেই গন্ধ সম্পর্কে একটি বাক্যও লেখে না। কিছু স্মৃতি বাতাস পেলে অতিরিক্ত বাস্তব হয়ে ওঠে।

কারণ জেনেছি—বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গভীরতম ঘটনাগুলি কখনও ইতিহাসে নয়, ভাষার অনুচ্চারিত অংশে সংঘটিত হয়।

আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, দেখি সেই ক্লান্তির দীর্ঘ তালিম আর আমাকে গ্রাস করতে পারে না। জীবনের জটিলতাগুলো এখনো আছে, শহরের গতি এখনো একইভাবে নির্মম—কিন্তু আমার ভেতরে এক বিয়ুলির আলো স্থির হয়ে রয়ে গেছে। প্রেম মানুষকে কোনো ফ্রেমে বাঁধে না, বরং সমস্ত সামাজিক ও মানসিক ফ্রেম ভেঙে তাকে অসীম ও উন্মুক্ত করে দেয়। মানুষকে শ্রেণিবদ্ধ করার যে জালিয়াতি নিয়ে আমি একসময় গর্ব করতাম, আজ তা ভেবে নিজেরই হাসি পায়। আমার বিয়ুলি—দিন আর রাতের সীমান্তরেখায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই মায়াবী আলো—আমাকে শিখিয়েছেন, রূপান্তরের কোনো শেষ নেই। আর এই অসম্পূর্ণতা, এই ধরা-না-দেওয়ার প্রবণতাই হলো একজন আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় মুক্তি। বিয়ুলির শেষ আলোটুকু যেমন শেষপর্যন্ত তারার আকাশের দিকে পথ দেখিয়ে দেয়, আমাদের প্রেমও তেমনি সমস্ত কৃত্রিম দেয়াল ধূলিসাৎ করে দিয়ে আমাদের এক অনন্ত ও নামহীন স্বস্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

After-Article Banner 1
After-Article Banner 1 mob
After-Article Banner 2
After-Article Banner 2 mob

1 Comment. Leave new

মন্তব্য লিখুন

ধন্যবাদ। নাম ও মতামত লিখুন। পর্যালোচনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মন্তব্যটি প্রকাশিত হবে।

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত