২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হিড়িম্বা: অরণ্যের হৃদয়ে এক উপেক্ষিতা
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য

হিড়িম্বা: অরণ্যের হৃদয়ে এক উপেক্ষিতা

মহাভারতের সুবিশাল ক্যানভাসে কত শত চরিত্রের আনাগোনা! কিন্তু বনের গহীনে প্রস্ফুটিত এক রক্তগোলাপের মতো যে চরিত্রটি আড়ালেই থেকে গেল, সে হিড়িম্বা। আমরা তাকে চিনি ‘রাক্ষসী’ হিসেবে, হিংস্রতা আর নৃশংসতার এক প্রতীক হিসেবে। অথচ পুরাণের আর্য বুনো রীতির বাইরে এসে তাকালে দেখা যায়, হিড়িম্বার অসূরীয় চেহারার অন্তরালে ধুকধুক করছিল এক চিরন্তন, প্রেমাতুর নারীহৃদয়। সেই হৃদয় সবুজ ব্যথা জানতো। নিজের হাহাকার সবুজের ভিতরে লিখে মায়ারূপে নেমে আসতো কখনো কখনো দীর্ঘদেহে রাত্রিদূরে। কেবল রাত্রিই জানে আর্তনাদে পৃথিবী নড়িয়া উঠে— মানুষ ঘুমায়।

​হিড়িম্বা ছিল শাল-মহুয়ার গহীন অরণ্যের অধিশ্বরী। আর্য সভ্যতার ছোঁয়া তখনো স্পর্শ করেনি তাদের স্বাধীন আদিম অস্তিত্বকে। পাণ্ডবরা যখন জতুগৃহের অগ্নিকুণ্ড থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে নিঃস্ব, ক্লান্ত অবস্থায় শালবনে আশ্রয় নিলেন, তখন হিড়িম্বা তাদের দেখেছিল ভক্ষ্য হিসেবে নয়, দেখেছিল এক অলৌকিক ভালোবাসার রূপে। ভীমের বিশাল বক্ষঃস্থল আর অদম্য তেজ দেখে রাক্ষসকন্যা তার হিংস্র আদিমতা ভুলে সমর্পিত হলো প্রেমের কাছে। প্রেম মানুষকে বদলায়—হিড়িম্বাও বদলে গেল। নিজের ভাই হিড়িম্ব যখন পাণ্ডবদের আক্রমণ করতে এলো, তখন নিজ ভাই অপেক্ষা প্রেমাস্পদ ভীমের জীবন রক্ষাকেই শ্রেষ্ঠ মনে করেছিল সে।

​কিন্তু প্রেমের জন্য যার এই আত্মত্যাগ, তার ভাগ্যে কী মিলল?

​ভীম তাকে গ্রহণ করেছিলেন শর্তসাপেক্ষে। পাণ্ডবদের জ্যেষ্ঠদের অনুমতিতে বিবাহ হলেও, শর্ত ছিল কেবল দিনের বেলা ভীম তার সাথে থাকবেন এবং সন্তান জন্ম হওয়ামাত্রই ভীমকে ফিরে যেতে হবে তার নিজের জগতে—যেখানে আর্য রাজধর্ম আর রাজনীতির জটিল খেলা। হিড়িম্বা সেই কঠিন শর্ত মেনে নিয়েছিল হাসিমুখে। কারণ, রাক্ষসী হয়েও সে বুঝেছিল, প্রেম মানে তো শুধু অধিকার নয়, প্রেম মানে বিসর্জনও।

​জন্ম হলো ঘটৎকচ—এক পরাক্রমশালী বীর, যে মায়ের অরণ্যশক্তি আর বাবার আর্য শৌর্য নিয়ে বেড়ে উঠল। সন্তানকে মানুষ করার সমস্ত দায়ভার হিড়িম্বা একাই কাঁধে তুলে নিল। ভীম চলে গেলেন রাজপ্রাসাদের চাকচিক্যে, মহাকাব্যের মূলধারায়। আর হিড়িম্বা রয়ে গেল তার নীরব, চিরহরিৎ অরণ্যে—এক একক মাতৃকাসত্তা হয়ে।

​কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যখন পাণ্ডবদের রক্ষা করতে গিয়ে ঘটৎকচ জীবন দিল, তখন মহাকাব্যের পাতা হয়তো ভীমের শোক বা কৃষ্ণের কূটনীতির প্রশংসায় মেতেছিল। কিন্তু কেউ কি ভেবেছিল সেই অরণ্যচারিণী মায়ের কথা? যে নারী নিজের ভাই হারালো, স্বামীকে বিসর্জন দিল, আর সবশেষে নিজের একমাত্র সন্তানকে বিলিয়ে দিল পাণ্ডবদের বিজয়ের বলিকাঠে—তার প্রাপ্তি কী ছিল?

​হিড়িম্বা মহাকাব্যের কোনো রাজপ্রাসাদে স্থান পায়নি, জাঁকজমকপূর্ণ কোনো দেবীস্থানে তার পুজো হয়নি। তবুও, অরণ্যের বাতাসে আজও যেন ভেসে বেড়ায় এক চিরন্তন প্রেমিকা আর নিঃসঙ্গ মায়ের দীর্ঘশ্বাস। হিড়িম্বা প্রমাণ করে গেছে, রাক্ষসী উপাধির পেছনে লুকিয়ে থাকা হৃদয়ের টান কোনো আর্য রাজকন্যার ভালোবাসার চেয়ে কম খাঁটি ছিল না। আজো উত্তর-ভারতের হিমাচল প্রদেশের মানালিতে একটি প্রাচীন গুহা মন্দির আছে, যা ধুঙ্গারি মন্দির নামে পরিচিত। সেখানে যুগ যুগ ধরে হিড়িম্বা দেবী হিসাবে পূজিত হয়ে আসছে। ধুঙ্গিরি ভ্যান বিহার নামে একটি দেবদারু বন দ্বারা বেষ্টিত।

অরণ্য কী জাদুকরী— জানার ভেতরেও কোনো অজানা থেকে যায় তাহলে। সেই অজানায় হিড়িম্বা— তবে কী তার চোখের ভেতর থেকে আকাশ উঠে এসেছিল। উঠে এসেছিল কী পূর্ণ চাঁদের মায়া। যেই মায়ার মাঝে দীর্ঘ এক বছর ভ্রমণ করেছিল ভীম। নিদ্রা ভেঙে গেলে দেখি আমাদের অসুরদের গ্রামে কোন অরণ্য নেই।

After-Article Banner 1
After-Article Banner 1 mob
After-Article Banner 2
After-Article Banner 2 mob

1 Comment. Leave new

মন্তব্য লিখুন

ধন্যবাদ। নাম ও মতামত লিখুন। পর্যালোচনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মন্তব্যটি প্রকাশিত হবে।

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত