৯ আগস্ট ২০২৬
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
জহির হাসান
কবি, গদ্যকার
135

জহির হাসান
কবি, গদ্যকার

135

তাবুলা রাসার দিকে যাত্রা

‘….কবিতা আমরা জানি কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ বস্তু নয়। কবিতা, পাঠক এবং কবির মধ্যে একক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী পদ্ধতি। এই পদ্ধতি-কেন্দ্রিক চরিত্রের জন্য কবিতায় ব্যাকরণ, শৈলী এবং নশ্বরতা তৈরি হয়েছে। অপরদিকে, প্রতিক্রিয়ার জন্মদাত্রী বলে কবিতায় প্রাণ আরোপিত হয়। কবিতায় আমরা প্রায়শ শ্বসিত বস্তু বা ‘অরগানিক’ অস্তিত্বের চিহ্ন দেখে থাকি। এই দুই কেন্দ্র অর্থাৎ বস্তু ও প্রাণ, ব্যাকরণ ও বিদ্রোহ, শৈলী ও প্রথামুক্তিকে জুড়ে রয়েছে এক সেতু যার নাম নশ্বরতা। কবিতার মৃত্যু হয়। লুপ্ত হয় তার ভাষা, সংকেত, উপদেশ ও কলাকৈবল্য…।’’

—উৎপলকুমার বসু

১.
আজ বাংলাদেশে যখন দেখি কিছু কবি উৎপলের কবিতার একটা ক্ষুদ্র অ্যাবস্ট্র্যাক্ট ফর্মরে অনুকরণ ও অনুসরণ রপ্তপূর্বক চর্চা অব্যাহত রাখছেন, কবিতায় উৎপলের আর-সব অনুসন্ধানের প্রতি তারা আগ্রহী নন, তখন ঐসব আধুনিক কবিদের আত্মার অসুখ নিয়া আমার আর চিন্তা থাকে না। তারা যে আধুনিকতার ব্যক্তিবাদী আত্মবিনাশী অস্তি ও নাস্তির পোড়নের জন্য খড়ি খুঁজতেছিল তার কিছু অংশের উৎপলই আড়ৎদার তা বোঝা যায়। কবিতার ভিতর শব্দবন্ধের অস্পষ্টতার মধ্য দিয়া সংকেতময়তার আভাস সৃষ্টি কিংবা অবচেতনের দেয়াল কাটিয়া জানালা স্থাপনের চেষ্টা। উৎপলের কবিতার ম্যাজিকের এক অংশে এই মালের প্রদাহ আছে যা বাংলাদেশর আধুনিক কবিদের মনে বিশাল এক অভিঘাত সৃষ্টি করিয়াছে। কবিতায় সেই অ্যাবস্ট্রাক্ট বৈচিত্র্যহীন জড় ঝিলিকের যারপরনাই উপস্থাপনা তাদেরকে অনুকরণকারী শ্রমিক হিসাবে তুলিয়া ধরে মাত্র। কবি হিসাবে তাদের নিজের জীবনদৃষ্টি ও প্রকাশ নাই করিয়া রাখে। ইহাদের কবিতা পড়িলে উৎপলের মুখ ভাসিয়া উঠে অন্যের ভাষাবাড়িতে উৎপলের সাথে জ্যাবত খাইতে হয়।

উৎপল কবিতায় ফরাসি আধুনিক কবিদের কাছে ঋণী। উৎপল আধুনিক শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত কবি। সেল্ফের পরিপূর্ণতার তিনি নিছেন, টোকাইছেন ও আত্মীকরণ করছেন নির্বিবাদে। তৈয়ার করছেন নিজের এক সংগ্রহশালা, যা সমাজের ও বিশ্বের উপস্থপনার বিকল্প। তিনি একদিকে যেন বুদ্ধিকেন্দ্রীক অপর দিকে সংবেদনশীলের বাড়া। তিনি প্রথমত ফর্মবাদী এক কবি সেই অর্থে বুদ্ধিবাদীও। তাঁর কবিতা বুদ্ধি ও সংবেদনের মিশাল এক সামাজিক চালচিত্রের উপস্থাপনায় মহাজাগতিক আয়োজন বটে। কিন্তু এই ফর্মের বাইরে যাওয়ার যে নিরাকারের সাধনা সেই ভাষিকযাত্রা উৎপলে আছে।

ইতিহাসের দিকে তাকাইলে দেখি সেই কবিই সজোরে আমাদের ভিতর টিকিয়া আছেন যার কবিতার শৈলী যত রূপময়। সেই আলাপ পাড়িতে গেলে আরও কিছু বিষয় উৎপলের সাথে বোঝাপড়ার প্রয়োজন হয়।

২.

‘বস্তুত উনি বাঙালি, বা আরো বেশি, ফ্রম মাইমান সিনহা, পূর্বপুরুষ ছিলেন পাহাড়ে বাঙাল, ভাগচাষী, বেগুনচাষি, সম্প্রতি উনিই যুক্তাক্ষর-বর্জিত সেই বিখ্যাত বইটি লিখেছেন, ওঁর স্ত্রীর পৌনঃপুনিক মন্তব্য হক্কলের লাইগ্যা ভাইবা ভাইবা উনীরে বইখান লিখছেন, বই তো নয় যেন কাটা বেগুন, কুলি বেগুন, মাকড়া বেগুন, নুকড়ি বেগুন, মুক্তকেশী, আউশা, গোষ্ঠ (ওরফে মার্বেল) এ হলো গিয়ে দাদা-ভাইয়ের দেয়ালা, গলায় ঝুলছে আমলা-রাজনীতি ও সরকারি-তেজপাতার মালা, তা-ও লোকে বিশ্বাস করে না, বলে কণ্ঠী কোথায়, পার্টি কার্ড দেখা, পার্টিশানের আগে না পরে।’
(নাইটস্কুল কবিতাংশ)

তিনটি অস্থি অবিভেদ্য নতজানু ভাবে একটি গহ্বরের দিকে যেতে বলে (আমরা যাই না) সুচারু এদিকে এসো, আমি দেখি কটাবনে জড়িয়ে পড়া সুচারু দেবীর শাড়ির আঁচল, আঃ ছাড়ুন, দেখি তাঁরই গভীর মেরু-কোমরের খাঁচ এবং কৃশপিঠের নিচে ফুলে ওঠা মেশিনের মতো নিতম্ব, ধক ধক শব্দে নড়ে ওঠে বেসামাল চর্বি ও বারুদের অপপ্রচার।
(শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকা: ১)

এইটা উদ্ধৃতাংশ কবিতাবলি প্রচার করার সাহস উৎপলকুমার বসুরই আছে। উৎপলই গদ্য-পদ্যের সীমানা রাখেন নাই। যেন কবিতার শর্ত কবিতা নিজেই তছনছ করার ভিতর দিয়া কবিতা হওয়ার শর্ত তৈয়ার করতেছে। সীমা লঙ্ঘনের এই কাণ্ড কবিতা নতুন সীমানা তৈয়ারের কারণে ভাষার সীমানাও বাড়ছে। এইসব কবিতারে একসময় নিরীক্ষাধর্মী কবিতা কইয়ে ঘরে না জায়গা দিয়া কবিতার ভাগাড়ে আশ্রয় দেওয়া হইত। এখন বুঝা যায় ভাষার সীমানা বিচারে এইসব কবিতা প্রচলিত মহাপয়ারের সীমানারেও টপকায়ে যাইতেছে। কেউ কেউ কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাসের অংশরে কবিতা কয়ে চালাইতে পারেন বটে তা কবিতা না। কেন? উৎপলের এইসব কবিতার শরীরে গদ্য প্রবাহের স্রোত ঘূর্ণি বটে তবে তার প্রাণ কবিতারই। এলোকেশি সুন্দরীর প্রাণ এক নারীরই ভাব তা পুরুষের সাজে হাজির হইলেও।

কবিতার ভাষার ভারকেন্দ্র নাড়ায়ে সরায়ে দিছেন উৎপল। কলকাতার মান ভাষায় লিখা কবিতা এতদিন যেই পথে হাঁটছে উৎপল সেই পথ ঘুরায়ে দিছেন। উনি লিখছেন কথ্যে, মুখের ভাষায়, সাধুতে চলিতের ভেজালে, তথাকথিত লোকজ শব্দের লগে সাধুদিগের শব্দের বিয়া ও হাঙ্গা বসায়ে ছাড়ছেন

কমলকুমারের উপন্যাসের ভাষা কাব্যিক তা কাব্য নয় কারণ তার প্রাণ গদ্য। গদ্য কাব্যভঙ্গিরে নেয় কবিতা হওয়ার ন লাগি বরং গদ্যের সীমানা বাড়ার লাগি এই বুঝ-ভাষা নিয়া যারা কারবার করেন তারা বোঝেন, টের পান পদে পদে। উৎপল এমন এক কবি যে বাংলা কবিতার ভাষার সীমানা নানা ভাঙচুরের ভিতর দিয়া সাহসের সাথে আগাইছেন। এরকম সাহসী কবির কারণে বাংলা কবিতার ভাষার সীমানা বাড়ানোর কাজে বিশ্বকর্মার ভূমিকায় অবতীর্ণ হইছিলেন। যেইখানে ব্যাকরণ ও বিদ্রোহ এক অপরের কারণ হই দাঁড়াই থাকে। শৈলী ও প্রথামুক্তি এক অপরের কারণ।

উৎপলের ক্ষেত্রেই বলা যায় উৎপল একা কোনো পথ নয়। অনেক পথের মোহনা যেন। ফলে অনেক সুর ও স্বরের রাখাল। সে পালে অনেক স্বরের প্রেমের সে পড়ে তার লিখায় আসে হাসি ঠাট্টার সাথে করুণ রসের নানা মাত্রা। নতুন চিন্তায় নতুন স্পেস তৈয়ার করা সাদা পাতার অবস্থান নেয়া।

৩.
কবিতার ভাষার ভারকেন্দ্র নাড়ায়ে সরায়ে দিছেন উৎপল। কলকাতার মান ভাষায় লিখা কবিতা এতদিন যেই পথে হাঁটছে উৎপল সেই পথ ঘুরায়ে দিছেন। উনি লিখছেন কথ্যে, মুখের ভাষায়, সাধুতে চলিতের ভেজালে, তথাকথিত লোকজ শব্দের লগে সাধুদিগের শব্দের বিয়া ও হাঙ্গা বসায়ে ছাড়ছেন। ভাষা কাতর এমন কবি জীবনানন্দের পর আর দেখা যায় না। মানভাষার ভিতর যত পদে ভাঙন ধরানোর দরকার তার বাকি রাখেন নাই। কবি এলিয়টের এ বিষয়ে স্মর্তব্য বক্তব্য আছে, ”কবিতার প্রতিটি বিপ্লব সংগতভাবে কখনো প্রচারমাফিক সাধারণ কথ্য ভাষাতে প্রত্যাবর্তন।’’ সংস্কৃতঘেষা ভারবাহী ভাষারতে জীবনানন্দ মুখ ফিরায়ে নিয়েছেন খুব নীরবে থিতু হইছিলেন বাংলাভাষার সরল প্রাণের ভিতর। উৎপল বাংলা কবিতায় ভাষার একমুখীনতারে বহুমুখীন সম্ভবনার বীজ।

লোকজন ভিড়ের ভিতর যেভাবে কথা কয়। স্বপ্নের ভিতর কথা বলে। ছোটবেলায় গ্রামে বাজারে রাস্তায় সাধারণ লোকেরা যেই ভাবে কথা বলে। মহুরি, দারোয়ান, মিঠাইঅলা, রাতের পাহারাদার, রেলস্ট্রেশনে লোকজন যেই যেই ভঙ্গিতে কথা বলে, অফিসে, সমাজে, ক্ষেত্র বিশেষে। তার কানের কাছে বাজতে থাকে নিরিবিলি স্মৃতি বহরমপুর দিনহাটা কুচবিহারের রাস্তাঘাট হাটবাজারের মানুষের লোকজ গরিমারে ধরার মধ্যে নিজের নানা একান্তরে প্রচার। ক্রন্দনের হাতেরতে বাচাইছেন কিছু হাসি-তামাশার মুহূর্তরে কবিতায় তুলি ধরছেন। আড়ি পাতিয়া শোনা জনপদের কথনভঙ্গিমা, নাট্যমুহূর্ত এক পরিব্রাজকের উপলব্ধি সেইসব সরাসরি কবিতার মধ্যে বসায়ে মানভাষার আভিজাত্যরে নষ্ট করার সাহস উৎপলই দেখাইছেন।

৪.
উৎপলকুমাররের কিছু কবিতা ও ডেরেক ওয়ালকোটের কবিতার মিল পাই। ডেরেক ওয়ালকোটের কবিতায় সমুদ্র একটা বিরাট ইস্যু। কারণ তার ঘরবাড়ি নদীবর্তী। তার শৈশব সাগর সাথী। এ জীবন সাগরের একটা ঘটনা। আমাদের পুরা ইতিহাস সাগরের ভিতরই আছে। সাগর আমার সকল ইতিহাস সংগ্রাহক হিসাবে রাখিয়া দিয়াছে। কোনো বস্তুর ধস নাই, লয় নাই। আজ যা আমরা হারাইতেছি তা কাল সময়ের কাছে ফেরত পাই অন্য ফরমে। কারণ সময় হইতেছে ইতিহাস। সমুদ্র এক প্রবাহ যা সময়ের পৃষ্ঠা। সমুদ্রের ভিতর তাই কিছু জমা থাকে। রাজনৈতিকভাবে হেজিমোনির কারণে জয়ীর হাতে তৈয়ার হওয়া ইতিহাসে বিজিতের ব্যর্থতার ইতিহাসও সমুদ্রের কাছে রয়।

“Where are your monuments, your battles, martyrs?/ Where is your tribal memory? Sirs,/ in that grey vault. The sea. The sea/has locked them up. The sea is History.”
(The sea is History, Derek Walcott)

উৎপলের নশ্বরতার দিকে চলিয়া যাওয়া, মূলের হদিসহীনতা, পুরী সিরিজ, আবার পুরী সিরিজ বা লোচনদাস কারিগরের কিছু কবিতাতে এই কবিতায় সমুদ্রবর্তী কবিতাবলি যেইখানে সমুদ্রের তীর রূপ আর অরূপের মিলন ভূমি, কে কার নাই রূপে কাজ করে। সমুদ্রের ভিতর সবকিছু ছিল একদিন। আমরা যা কিছু দেখতেছি তা জলের ভিতর থাকি উঠি আসা। ‘এ-সব সমুদ্রতীর বারবার ব্যবহৃত হয়ে গেছে, লক্ষ্য করো।/ লোহার মসৃণ খাঁচা বালি লেগে অহেতু কর্কশ হয়ে উঠেছে এখন, লক্ষ্য করো।’ কিংবা ‘অখিল শুশ্রূষা এই লাবণি লাবণ্যরাশি এই জল, এই প্রতিকার,/ পৌত্তলিকতা ছাড়া আমি আর জানি নে কিছুই’ কিংবা ‘জল থেকে উঠে আসে জলপোড়া পুরুষের দেহ, প্রকৃত শরীর/ জলের ভিতর থাকে, ওখানেই থেকে যেতে চায়’ ইত্যাদি।

৫.
তাত্ত্বিকতার বাইরে চলিয়া যাওয়া কবিতারা দলছুট। কবিতার শুরু হয় সাদা থাকি শেষ হয় সাদা পৃষ্ঠার হৃদয়ে অবস্থান নেওয়ার তাগিদ থাকি। কবিতায় উৎপল রোমান্টিক একটা মন বজায় রাখেন— বার বার নদী-সমুদ্র, পাহাড়, বন-জঙ্গল, ভিন্ন কোনো জেলা, মাঠের দিকে উৎপল রওনা হন সাদা পৃষ্ঠার লাগুড় পাবার জন্য। যেইখানে শুরুর সেই তাবুলা রাসাররে ফের খুঁজি পাওন যায়। তাবুলা রাসার* প্রতি টান মূলত তার সদা ভ্রাম্যমাণ মনের নীড়!

*প্রাচীন গ্রিসের স্টোয়িক স্কুলের দার্শনিকগণ মনে করতেন মানবমন প্রথমে একটা সাদা পাতা রূপে হাজির রয়, কিন্তু বহির্জগত জ্ঞান রূপে তার মনে সাদা পাতায় অবস্থান নেয়। এই সাদা পাতা আত্মা স্বরূপ। যেইখানে সংসার উৎপাদন হইলে সাদা পাতা আর সাদা রয় না। সাধকমাত্রই নিষ্কাম কর্ম উৎপাদনের মারফত এই সাদাপাতা রক্ষা করিয়া থাকেন। এই পাতাই সাধকের মূলধন।

After-Article Banner 1
After-Article Banner 1 mob
After-Article Banner 2
After-Article Banner 2 mob

মন্তব্য লিখুন

ধন্যবাদ। নাম ও মতামত লিখুন। পর্যালোচনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মন্তব্যটি প্রকাশিত হবে।

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত