১৪ মার্চ ২০২৬
লুইস দে লিওন ছিলেন গুয়াতেমালার একজন বিখ্যাত আদিবাসী লেখক, কবি ও শিক্ষক। লুইস দে লিওনের গল্প 'বানর'। আহসানুল করিমের অনুবাদে।
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
আহসানুল করিম
কবি ও অনুবাদক
82

আহসানুল করিম
কবি ও অনুবাদক

82

লুইস দে লিওনের গল্প

বানর

লুইস দে লিওন ছিলেন গুয়াতেমালার একজন বিখ্যাত আদিবাসী লেখক, কবি ও শিক্ষক। তিনি ১৯৪০ সালে গুয়াতেমালার সান হুয়ান দেল ওবিস্পোতে জন্মগ্রহণ করেন। স্প্যানিশ ভাষায় গুয়াতেমালার প্রথম আদিবাসী লেখক হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা হয়। যিনি ১৯৬০ ও ১৯৭০-র দশকে গুয়াতেমালার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৮০-র দশকে সামরিক বাহিনী কর্তৃক অপহৃত ও নিখোঁজ হন।

তাঁর লেখালেখি গুয়াতেমালার শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের জীবন এবং সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। তাঁর উপন্যাস এল তিয়েম্পো প্রিন্সিপিয়া এন শিবালবা (পাতালে সময়ের সূচনা) ১৯৭২ সালে লেখা হলেও ১৯৮৫ সালে মরণোত্তর প্রকাশিত হয় এবং এটি মধ্য আমেরিকার সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ছোটগল্প সংকলন লোস সোপিলোতেস (শকুনেরা, ১৯৬৬), সু সেগুন্দা মুয়ের্তে (তার দ্বিতীয় মৃত্যু, ১৯৭০), লা পুয়ের্তা দেল সিয়েলো ই ওত্রাস পুয়ের্তাস (স্বর্গের সিংহদ্বার ও অন্যাব্য দরজা, ১৯৯৫), এবং কবিতার দুটি সংকলন।
গুয়াতেমালার সামরিক বাহিনীর হাতে নিখোঁজ হওয়া ত্রিশ হাজারেরও বেশি মানুষের একজন ছিলেন এই লেখক।

• রোজালিন্ড হার্ভি’র ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায়ন: আহসানুল করিম

Luis de León’s entry in “Diario Militar” (a secret military record).
Luis de León’s entry in ‘Diario Militar’ (a secret military record). Image source: Wikipedia

আগে ভাবতাম, লাতিন আমেরিকার স্বৈরশাসকদের নিয়ে যেসব কার্টুন আঁকা হয় সেগুলোতে সবসময় তাদেরকে বানরের মতো দেখানোটা একটু বাড়াবাড়ি। অতঃপর একদিন…

রেললাইনের ওপর হঠাৎ ফৌজি পোশাকে শত শত সৈন্য দেখা দিল। চৌরাস্তা আটকে দাঁড়ালো কতগুলো সাঁজোয়া যান আর আকাশে ভেসে রইল সেই ‘পাখি’গুলোর এক জোড়া।
রবিবার ছিল সেদিন।

মাঠে ফুটবল খেলা চলছিল, মহল্লার পানশালাগুলোতে মাতালরা বসে ছিল আর কোথাও কোন পার্টিতে মিষ্টি সুরে মারিম্বা বাজছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই মনে হ’তে লাগল সোমবার চলে এসেছে। যারা পারল ছুটে পাহাড়ে পালালো। আর যারা পারল না, তারা নিজেদের কুঁড়েঘরে দরজা বন্ধ করে ঢুকে বসে রইল। ধক, ধক, ধক… ঢাকের শব্দে বাজতে লাগল তাদের হৃদস্পন্দন। এটাই তো স্বাভাবিক। কেননা নানা জায়গা থেকে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল সেখানকার গ্রামগুলো সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

এবার বুঝি আমাদের পালা।

কিন্তু কিছুই ঘটল না। ভালো খারাপ কোনোটাই না।

এটা ঠিক যে মাঝেমধ্যে কাপোক গাছের ডালে কিছু সংকেত দেখা যেত অথবা কেউ রেললাইনের ওপর ‘বার্তাবাহক কবুতর’ খুঁজে পেত (গ্রামের মানুষ গোপন বার্তাগুলোকে এই নামেই ডাকত)। কিন্তু এর বেশি কিছু না।

আতঙ্ক কেটে গেলে যারা গ্রামে থেকে গিয়েছিল, তারা বেরিয়ে এল। আর খবরটা শুনল: স্বৈরশাসক আসছে।

স্বৈরশাসক খানিকটা রসিক প্রকৃতির লোক। সবার মতো ট্রেনে করেই এসেছিল। মোটা থলথলে একেবারে শূকরের মত দেখতে। মাথায় টুপি, কাঁধে একটা ছোট তারা, বুকে অসংখ্য ফালতু পদক, কোমরে .৪৫ ক্যালিবার পিস্তল। হাঁটার ভঙ্গি দৃঢ়, পুরুষালি। সাথে ছিল প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সবচেয়ে উচ্চপদস্থ অফিসাররা আর তার পোষা ঘাতকেরা যাদের সবার চোখে ছিল কালো চশমা।

সকলের প্রশ্ন ছিল, কেন এসেছে?
গ্রামে তো কোন ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মতো কিছুই ছিল না। কারণ নতুন কিছুই গড়ে উঠছিল না।
কিন্তু…
“হয়তো নতুন পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে এসেছে।”
“নাহ। আগে তো পানি, তারপর পয়ঃনিষ্কাশন। এইসব কুয়ার চকোলেটের মতো বাদামি পানি আর খাওয়া যায় না। শীতের সময় তো আরও বাজে অবস্থা হয়।”
“নাকি আমাদের জন্য ঘর বানাবে?”
“নাহ, আগে মাটি কাটার কাজ হবে।”
“একটা ক্লিনিকও তো দরকার, তাই না?”
“আর রাস্তাও পাকা করা উচিত। যাতে ট্রাকগুলো আসতে পারে এখানে। সবকিছুর জন্য শুধু ট্রেনের ওপর নির্ভর করতে না হয়।”

প্রত্যেকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমান করছিল। কিন্তু বাস্তবে স্বৈরশাসক কাউকেই কিছু বললো না, আর কেউ সাহসও করল না তাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে।

তাহলে সে এখানে এলো কেন?
স্বৈরশাসক এসেছিল ডন হুয়ান বোনিতোকে খুঁজতে।

স্কুলে পৌঁছে আমি নিজেই প্রশ্নটার মুখোমুখি হলাম, “আমি কি ‘হুয়ান সুদর্শন’ নামে কোনো লোককে চিনি?” বললাম “গ্রামে যে সুন্দর পেঁপেগুলো হয়, সে কথা জানি, কিন্তু সুন্দর হোক বা কুৎসিত হোক, কোনো হুয়ান বোনিতোর নাম কখনো শুনিনি।” তবু নামটা আমাকে নাড়া দিল, তাই খোঁজ নিতে লাগলাম।

“ওহ, সে তো এক লোক বটে।”
“ঠিক আছে, কিন্তু তাকে ওই নামে ডাকে কেন?”
“তার মুখটা দেখলেই বুঝবে।”
“কোথায় থাকে সে? আমি গিয়ে দেখতে চাই।”
“স্কুলের পেছনে।”

খুঁজতে গেলাম তাকে। কিন্তু স্কুলের পেছনে ছিল শুধু একটা পরিত্যক্ত কুঁড়েঘর। মনেই হত না কেউ থাকত সেখানে।

একদিন, অবশেষে, কাউকে দেখলাম। তার মুখটাও দেখলাম।
সেই লোকই হবে। অন্য কেউ হতে পারে না।
“মাস্টারসাহেব”, বলে সে আমাকে সম্ভাষণ জানালো। আর কুঁড়েঘরে ঢুকে গেল।

প্রথম দেখায় আমিসহ আমাদের সবার মনে সে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
“তুমি কি ওর সঙ্গে দেখা করেছ?” লোকজন আমাকে জিজ্ঞেস করত।
“হ্যাঁ।”
“সুদর্শন, তাই না?”
“হ্যাঁ”, আমি হেসে বলতাম।
“ও কি দেখতে ঠিক ওর বানরটার মতো না?”
“হ্যাঁ।”

কিন্তু আসলে কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। কারণ বানরটা ছিল দেখতে বেশ মিষ্টি।
লোকে বলত, একটাকে ছাড়া আরেকটা টিকতে পারত না। বানরটাই ছিল ডন হুয়ানের আত্মা। আর ডন হুয়ান নিজেও তাই বলত। প্রাণীটাকে সঙ্গে নিয়েই সর্বত্র যেত। গলায় শিকল পরিয়ে টেনে নিয়ে যেত। যেন ওটা তার দাস।

কিন্তু না।
“উলটো ডন হুয়ানই আসলে দাস”, লোকে বলত। “কারণ ছোট বানরটা তার রূপ ধারণ করে, আর ডন হুয়ানকে বানরটার সেবা করতে হয়।”
“রূপ ধারণ করে? কখন? কোথায়?”
“রাতে। ক্যাথেড্রালের মধ্যে।”
“কোন ক্যাথেড্রাল?”
“ওখানে, ওই যে স্কুলের পেছনে।”

ওই পুরোনো কুঁড়েঘরটাই কি ক্যাথেড্রাল? শহরেরটা কিংবা আন্টিগুয়ার প্লাসা দে আরমাসেরটা হলে এক কথা ছিল। ওগুলো তো ক্যাথেড্রাল। অন্তত কোনো গির্জা হলেও মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু… ওই কুঁড়েঘরটা? তবু নামটা ছিল ক্যাথেড্রালই, কোনো সন্দেহ নেই।

ডন হুয়ান আর তার বানর ছিল চোখে পড়ার মতো। খেলা দেখানোর সময় ডন হুয়ান বানরটাকে নিজের পাশে বসাত আর শক্ত করে বেঁধে রাখত যাতে ওটা নড়াচড়া করতে না পারে আর প্রাণীটার আত্মা যেন সহজেই তার নিজের মাঝে প্রবেশ করতে পারে। তার কিছু ‘খদ্দের’ আসত শুধু তার আর তার বানরের খেলার এই দৃশ্য দেখার জন্যই।

যদিও সে বলত, “আমার খদ্দের নেই, কারণ আমি কোনো নগদ টাকা নেই না। ওরা যা দেয়, তা হাদিয়া।”

কথাটা অবশ্য সত্যি ছিল। কখনোই নগদ টাকা নিত না সে। কিন্তু মুরগি, টার্কি, কয়েক পাউন্ড শিম, ভুট্টা, চাল, লবণ, সিগারেট, মদ, দেশলাই, মোমবাতি, ফুল, রুটি—এসব নিত। পারলে ছোট শূকর, অথবা আস্ত বাছুরও।

যেহেতু তারা মোটে দুইজন, এই দক্ষিণাগুলোর কিছু তারা নিজেদের খাওয়ার জন্য রাখত, আর কিছু বিক্রি করত অল্প কিছু টাকা জোগাড় করার জন্য। যাতে অন্যসব দরকারি জিনিস কেনা যায়।

একদিন সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “মাস্টারসাহেব, বিয়ার খাবেন?”
সময়টা ছিল দুপুর, আর গরম ছিল অসহ্য। তার ওপর আবার শনিবার।
“অবশ্যই, ডন হুয়ান।”
সে আমার জন্য এক বোতল বিয়ার অর্ডার করল, নিজের জন্য আরেকটা, আর ছোট বানরটার জন্যও একটা।
“ডন হুয়ান, ওটাকেও বিয়ার খেতে দিচ্ছেন?”
“হ্যাঁ। আমি যদি খাই, ওকেও খেতে হবে।”

ছোট বানরটা সত্যিই পান করছিল। যদিও আসলে ওটা বেশি টানতে পারত না। কারণ খুব তাড়াতাড়ি মাতাল হয়ে যেত। আর ডন হুয়ান হেসে গড়াগড়ি খেত, নিজের সঙ্গীর কর্মকাণ্ড দেখে।

বানরটা ঘুমিয়ে পড়লে, ডন হুয়ান তাকে কোলে তুলে নিত। একেবারে শিশুর মতো। তারপর মোড় ঘুরে ক্যাথেড্রালের দিকে হেঁটে চলে যেত। পরদিনের খোঁয়ারির প্রভাব সে তার সঙ্গীর ওপর পড়তে দিত না। সব সময়ই তার কাছে নেশা কাটানোর ওষুধ থাকত। মদ হোক বা বিয়ার কিংবা ডিমের ঝোল। তারপর দুজনেই আবার ঘুমিয়ে পড়ত। কখনো কখনো তারা ঘুমিয়ে পড়ত পাশের শহর আর গ্রামের মাঝামাঝি কোথাও পথের মাঝে মাটিতেই।

স্বৈরশাসক খানিকটা রসিক প্রকৃতির লোক। সবার মতো ট্রেনে করেই এসেছিল। মোটা থলথলে একেবারে শূকরের মত দেখতে। মাথায় টুপি, কাঁধে একটা ছোট তারা, বুকে অসংখ্য ফালতু পদক, কোমরে .৪৫ ক্যালিবার পিস্তল

একসঙ্গে তারা পতিতালয়েও যেত।
দেখতে সত্যিই মজা লাগত। ছোট বানরটা মেয়েদের একজনের কোলে বসে নিজের পানীয় পান করত।
“ডন হুয়ান আর তার বানরের জয় হোক”, যখনই তাদের ঢুকতে দেখত মেয়েরা বলে উঠত। তারপর শুরু হতো কথার ফুলঝুরি।
“ওহ মা, কী লোমশ ছোট জন্তু! দেখতে একেবারে সেই লোমশ প্রাণীটার মতো যেটা ভিলমা নিজের দুই পায়ের মাঝখানে রাখে।”
“কি বলছিস রে সোনা? লোমের দিক দিয়ে ও আমারটার ধারেকাছেও নেই।”
আর—হাহাহাহা। হাসির হুল্লোড় চলত।

আর ডন হুয়ান একের পর এক পানীয় টেনে যেত। জুকবক্সে বাজত গান। চলত মেয়েদের সঙ্গে নাচ।
“কে ওর সঙ্গে নাচতে চাস?” বানরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলত সে।
“আমি নাচব যদি তুমি টাকা দাও।”
“ঠিক আছে, তাহলে বানরটাকে মেয়েটার সঙ্গে নাচতে দে”, সে টাকা দিয়ে বলত।

কিন্তু বানরটা নাচতে জানত না। তাই মেয়েটা ওটাকে কোলে তুলে নিত আর নাচের জায়গাটা জুড়ে আধা চক্কর ঘুরে আসত শরীর দোলাতে দোলাতে।
আর হাহাহাহা। হাসি।
“এই, ওকে তোর ঘরে নিচ্ছিস না কেন?”
“কিন্তু ডন হুয়ান, ও তো মানুষ না।”
“টাকা আমি দেব।”
“আমাকে বিয়ে করলেও আমি পারব না।”
“হাহাহাহা”, ডন হুয়ান হেসে বলত, “আমার জন্য আরেকটা পানীয় নিয়ে আয়।”

এই লোকটাকেই স্বৈরশাসক খুঁজছিল।
ডন হুয়ান যখন নিজের ঘরের দরজায় স্বৈরশাসককে দেখল তার বুক ধক করে উঠল।
দুই-তিনটা নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী করার কারণে ডন হুয়ানের খ্যাতি গ্রাম, পৌরসভা আর অঞ্চল ছাড়িয়ে পাহাড় টপকে শেষমেশ প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।

স্বৈরশাসক তাকে ডেকে পাঠিয়েছিল, কিন্তু যেমন লোকই হোক ডন হুয়ানের একটা মর্যাদাবোধ ছিল। তাই সে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। এখন স্বৈরশাসককে দেখে সে ভাবল লোকটা তাকে গুলি করে মারতে এসেছে। কিন্তু তারপর বুঝল ঘটনা তা নয়। সে কেন এসেছে, তা কেউ জানত না। যদিও ডন হুয়ান তার দু-একটা কথার মাধ্যমে আমাকে ইঙ্গিত দিয়েছিল যে সে এসেছে কোনো সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের খবর জানতে বা এরকম কিছু। কিন্তু কে জানে।

যাই হোক, সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল সে কেন এসেছে তা নয়, বরং কীভাবে এত অহংকারী মানুষটা ডন হুয়ানের টেবিলের সামনে অপমানিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তা দেখা। কীভাবে ডন হুয়ান বানরের বুলি আওড়াচ্ছিল।

যে মানুষটির হাতে ছিল আতংক ছড়ানোর জন্য একদল মনোবিজ্ঞানী, কীভাবে সেই মানুষ ভেজাল পড়া পানি পান করছে। পানির পাত্রটা ডন হুয়ান বেদির ওপর রাখত। যে কেউ পরামর্শ নিতে এলে তাকে সেখান থেকে পান করতে দিত।

পুরো বিকেলটা সেভাবেই কাটাল স্বৈরশাসক। তারপর যেভাবে হঠাৎ এসেছিল সেভাবেই চলে গেল।

এই ফাঁকে, স্বৈরশাসকের এই সফরের পরেও কিন্তু ডন হুয়ানের মনে কোনো অহংকার জন্মাল না। যে মানুষই তার ঘরে পা রাখুক না কেন, সে একই রকম আচরণ করতে থাকল। আসলে স্বৈরশাসক যদি এসেই থাকে, তাহলে সেটাই প্রমাণ যে স্বৈরশাসক আসলে ডন হুয়ানের কথা অনুযায়ীই কাজ করছিল।

“তিনি কী দক্ষিণা রেখে গেলেন, ডন হুয়ানিতো?” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম।
“তেমন কিছু না। বাদ দিন, চলুন, মদ খাই।”

এক মাস।
দুই মাস।

মনে হচ্ছিল, স্বৈরশাসক প্রথমে যাচাই করতে চাইছে ডন হুয়ান সত্যিই কি ততটাই দক্ষ যতটা সে শুনেছে নাকি সবই কেবল লোকের মুখের কথা।

একদিন গ্রামে কালো চশমা পরা লোকজনসহ একটি জিপ গ্রামে এলো। তারা ডন হুয়ানকে খুঁজে বের করল এবং তাকে বলল স্বৈরশাসক (তারা যাকে “মি. প্রেসিডেন্ট” বলত) তার সেবার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন আর তার জন্য কিছু উপহার পাঠিয়েছেন।

“ওটা কী, ডন হুয়ান?”
“এই যে দেখুন।”
“হুইস্কি!”

সেদিকে তাকিয়ে ডন হুয়ান যে কীভাবে ঠোঁট চাটছিল তা আপনাদের দেখা দরকার ছিল।

কিন্তু হুইস্কিটা তার জন্য একটু বেশি হয়ে গেল। বিদেশি মদের একটি পুরো কার্টন দেখে সে প্রায় উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। তবু সে একটুখানি চেখে দেখল। যেহেতু এর স্বাদ ছিল ওষুধের মতো, চেনা দেশি মদের মতো নয়, সে ঠিক করল বিক্রি করে দেবে। অঢেল দামের বোতলগুলো সে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে শুরু করল। যদি একটি হুইস্কির বোতলের দাম চল্লিশ কুয়েতজাল হতো, সে সেটি বিক্রি করত বিশ, পনেরো, দশ অথবা পাঁচ কুয়েতজালের বিনিময়ে। পাশের শহরে। যাই হোক, যেহেতু তখন ১২৫ মিলিলিটার ভেনাদো বা ইন্ডিতা রামের দাম ছিল পঞ্চাশ সেন্টাভো, এক বোতল হুইস্কি থেকেই সে এক, দুই, এমনকি তিন বেলা অনায়াসে চালাতে পারত। বিশেষ করে এখন যেহেতু সে খুব দ্রুত মাতাল হয়ে পড়ত। ঠিক তার সঙ্গীর মতো। একবার মাতাল হয়ে গেলে, সে হুইস্কির সাথে এমনকি সাধারণ দেশি মদও বিনিময় করত।

এই চলতে লাগল…

একদিন সকালে লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?”
“ডন হুয়ানের ছোট বানরটা মারা গেছে।”
তারা দুজনেই মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরেছিল। তারপর রাতে বানরটার লিভার ফেইল করল।

স্বৈরশাসক বানরের মৃত্যুর খবর পেল তার সামরিক দূতের কাছ থেকে। দূত তাকে একটি টেলিগ্রামে খবরটা জানিয়েছিল। স্বৈরশাসক পাল্টা আরেকটি টেলিগ্রাম পাঠাল। এতে দূতকে নির্দেশ দেওয়া হলো ডন হুয়ানকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করতে বলতে।

প্রিয় সঙ্গীর জন্য যথাযথ দাফনের কথা ভেবে ডন হুয়ান এমন আনন্দ অনুভব করল যেন সে নিজেই মরে স্বর্গে পৌঁছে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে মদ খাওয়া বন্ধ করল আর ছোট প্রাণীটার দেহটাকে কুঁড়েঘরের মাঝখানে টেবিলের ওপর শুইয়ে দিল। ওটার গা সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিল। চারদিকে চারটি মোমবাতি জ্বালাল। মাথার কাছে রাখল খ্রিস্টের একটি মূর্তি। পুরো জায়গাটা ফুলে ঢেকে দিল। একদল সঙ্গীতশিল্পী ভাড়া করল। কতগুলো বেহালাবাদক, যারা মশার আওয়াজের মতো বাজনা বাজায়। তাদের বলা হলো সারা রাত দেহটির পাশে বাজাতে। গ্রামবাসীদের সবাইকে আমন্ত্রণ জানাল।

বলা বাহুল্য তারা এই শবযাত্রায় যেতে অস্বীকার করল। বলল, “ও তো মানুষ না।”

তবু কিছু লোক হয়েছিল। কেউ কৌতূহল থেকে, কেউ রুটি, কফি আর রামের জন্য, আর কেউ এসেছিল কারণ ডন হুয়ান ছিল ডন হুয়ান।

“আপনার ক্ষতির জন্য আমরা দুঃখিত, ডন হুয়ানিতো।”
“আমাদের সমবেদনা গ্রহণ করুন, ডন হুয়ানিতো।”

পাশের শহরের পানশালার মেয়েরা যখন এসে পৌঁছাল, ডন হুয়ানের জমে থাকা কান্না আর ধরে রাখা গেল না। তার কান্না ছড়িয়ে পড়ল।

প্রিয় সঙ্গীর জন্য যথাযথ দাফনের কথা ভেবে ডন হুয়ান এমন আনন্দ অনুভব করল যেন সে নিজেই মরে স্বর্গে পৌঁছে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে মদ খাওয়া বন্ধ করল আর ছোট প্রাণীটার দেহটাকে কুঁড়েঘরের মাঝখানে টেবিলের ওপর শুইয়ে দিল। ওটার গা সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিল

সারা রাত চলল লটারি, তাস খেলা, মিষ্টি খাবার, ঠাট্টা, আড্ডা। ভোরের দিকে দুজন লোকের মধ্যে মারামারি বেধে গেল। তারা মাতাল অবস্থায় সারা রাত জাগার পণ বাদ দিয়ে ম্যাচেটি দিয়ে একে অপরকে আক্রমণ করল। একটি তরুণী ফুটবল মাঠে ধর্ষিত হলো। ভোর তিনটায় পাহাড়ি এলাকার মতো কুমারি মেরির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা সঙ্গীত গাওয়া হলো। একটি কণ্ঠ শোনা গেল:
“ঈশ্বর তোমায় রক্ষা করুন, মারিয়া।”

সকালে কালো চশমা পরা লোকজনসহ একটি জিপ এলো। সঙ্গে ছিল সাদা সিল্কে মোড়া একটি ছোট কফিন। একটি শিশুর কফিন।
ওটা দেখে আমি কয়েকদিন আগে ট্রেন স্টেশনে একটি ছোট ছেলের মৃত্যুর অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ার কথা ভাবলাম।
ছেলেটিকে খবরের কাগজে মুড়ে কবর দেওয়া হয়েছিল।

“আমাকে নগদ টাকাও পাঠিয়েছে”, ডন হুয়ান আমাকে বলল।
“বাহ চমৎকার। এতে তো তোমার সব খরচ উঠে যাবে।”

সুযোগ দেখে ডন হুয়ান আমাকে একদল শিশুকে পাঠাতে বলল। “দেহটা বহন করার জন্য, মাস্টারসাহেব।”
মনে মনে প্রমাদ গুণলাম এই জন্যে যে সে আবার বাচ্চাদের স্কুল ছুটি না দিতে বলে। বললাম, সমস্যা হল তারা কেবল সকালেই স্কুলে আসে, আর যেহেতু দাফন হবে সন্ধ্যায়, তাই… কি আর করা।

সে ভেবে নিল যে আমি রাজি নই, জোর করল না।

দাফনে উপস্থিত ছিল স্বৈরশাসক, পতিতারা, গ্রামের কয়েকজন মানুষ, আর ডন হুয়ান। ডন হুয়ান আর আমি প্রতিবেশী হলেও আমি কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকলাম। তবু দেখতে বের হয়েছিলাম। প্রথমে মেয়েরা এল বানরটাকে কাঁধে করে। তারপর পাঁচ-ছয়জন গ্রামবাসী এল প্রার্থনাসঙ্গীত গাইতে গাইতে। আর তাদের পেছনে স্বৈরশাসকের লোকজন আর ডন হুয়ান।

স্বাভাবিকভাবেই, অনেক মানুষ রাগে ফুঁসছিল। মেনে নিতে পারছিল না যে একটা পশুকে এভাবে বহন করা হবে আর কবরস্থানে দাফন করা হবে। সবচেয়ে বেশি নাক সিঁটকেছিল ডন হাচিন্তো। ডন হাচিন্তো ছিলেন বেশ সাহসী এক বৃদ্ধ। চশমা পরা, অস্থিমজ্জায় ক্যাথলিক, কিন্তু অত্যন্ত সম্মানিত। ছিলেন স্থানীয় নাগরিক কর্তৃপক্ষ। পৌরমেয়রের প্রতীকী লাঠি হাতে এদিক-ওদিক হাঁটতেন। গ্রামের মধ্যে তিনি ছিলেন সহকারি মেয়র।

“দুঃখিত, কিন্তু আপনি এটা করতে পারেন না, ডন হুয়ানিতো। সে… সে শান্তিতে থাকুক… কিন্তু সে তো মানুষ নয়। তাই কবরস্থানে তার দাফনের কোন অনুমতি আপনার নেই।” দৃঢ় কোমল কণ্ঠে বললেন তিনি।

তারা বন্ধু ছিল না, আবার শত্রুও নয়। ডন হুয়ান প্রায় তার কথা মেনে নিয়েছিল। সবাইকে ফিরে যেতে বলতে গিয়েছিল।

“আপনি কে?”
“আমি সহকারি মেয়র।”
“তাই নাকি? তা হলে চিন্তা করবেন না। আমাদের কাছে অনুমতি আছে।”
“সেক্ষেত্রে আমি অনুমতিপত্র দেখতে চাই।”
“এই নিন”, স্বৈরশাসকের এক সহকারি বলল। জ্যাকেট সরিয়ে কোমর থেকে একটি .৪৫ বের করে ডন হাচিন্তোর বুকে ঠেকাল।
“এখন দেখি, কার আদেশ বড়? আপনার ওই ফালতু লাঠিটার নাকি নাকি এটার?”

ডন হাচিন্তো হতভম্ব হয়ে গেলেন।
“এই আদেশের পর আর আমার কী বলার থাকে”, বলে ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি।

কফিনটি এগিয়ে চলল।
আর কবরস্থানে দাফন করা হলো, হালকা প্রার্থনা, স্তবগান আর ফুলের ভারী বৃষ্টির মাঝে। জিপে করে আনা হয়েছিল যে ফুলগুলো।

ডন হুয়ান শবদেহের ওপর একটি ক্রুশ রাখল। সুগন্ধি দেবদারু কাঠের তৈরি একটি সুন্দর ক্রুশ। এটিও স্বৈরশাসকের দান। কাঠে লেখা ছিল: “এখানে শায়িত আছে, যে জীবিত ছিল একসময়”, এইটুকুই। কোনো নাম নয়, কারণ তার নাম ছিল না। তারপর তারিখ। ডন হুয়ান কাঁদল। কিছু পতিতা কাঁদল। স্বৈরশাসকের লোকেরা কাঁদল না।

আমি ভেবেছিলাম এখানেই সব শেষ। কিন্তু ঠিক সেই রাতেই শুরু হলো নোভেনা
নয় দিন ধরে খুব আস্তে হলেও শুনতে পেলাম ক্যাথেড্রালে মেরির জয় আর পিতার নামে জপ, প্রার্থনা আর স্তবগান।
সেইসাথে মৃতদের জন্য প্রার্থনার সব রকমের অর্থহীন বাক্য। নিশ্চয়ই রুটি, কফি আর গরম চকলেটও ছিল। স্বৈরশাসকই খরচ দিচ্ছিল।

ডন হুয়ান আমার প্রতিবেশী ছিল। খানিকটা বন্ধুও বলা চলে। আমি জাগরিতে অংশ নিয়েছিলাম কিছুটা কৌতূহল থেকে আর কিছুটা মজা করার জন্য। কিন্তু দাফনে যাইনি বলে নোভেনায় যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল আরও কম। ওটা আমার সীমার বাইরে ছিল। জানি কথাটা হয়ত একটু বাড়াবাড়ি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আমি তো বিজ্ঞানের শিক্ষক।

তবু সে আমাকে ভুলে যায়নি। রাতের খাবারের সময়, নোভেনা শেষ হলে কেউ স্কুলে এসে বলল, “ডন হুয়ান এটা আপনাকে দিতে বলেছে।”
ডন হুয়ান দুটি সুস্বাদু তামালে আর এক গ্লাসভর্তি রাম পাঠিয়েছে।

আমি একা থাকতাম। খাওয়া-দাওয়ার কোন ঠিকঠিকানা ছিল না। তাই তামালে আর পানীয় গ্রাম্য ভাষায় বলতে গেলে পেয়ে যারপরনাই খুশি হলাম। আমি যেতে চাইনি, কিন্তু সারা রাত শুনতে পাচ্ছিলাম মশার মতো সেই সঙ্গীত আর জাগরি অনুষ্ঠানের রাতের সব হৈচৈ।

এই নয় দিনে ডন হুয়ান ছিল একা, নিজের নাম ভুলে যাওয়া এক মদ্যপের মত। কিন্তু নোভেনা শেষ হতেই সবকিছু তছনছ হয়ে গেল। সকাল, দুপুর, রাত সে সব জায়গায় ছুটে বেড়াত। তার একটা পুরনো ফিলিপ্স রেডিও ছিল, ভাঙ্গাচোরা অবস্থা, তবু চলত। সেটাতে কোন খবরই শুনলো না। তাই তার কাছে কোনো খবরই ছিল না প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভ্যুত্থানের, যে অভ্যুত্থানে তার কাছে আসা সেই স্বৈরশাসক উৎখাত হয়েছিল।

একদিন সত্যিই চমকে গেলাম যখন দেখলাম গ্রামে এসে হাজির হয়েছে একই সামরিক দল, যাদেরকে সেই উৎখাত হওয়া স্বৈরশাসক একসময় ব্যবহার করত। তারা এসে স্কুলের ঠিক সামনে অবস্থান নিল।

দুই-তিন সপ্তাহ আগেই আমরা শিক্ষকরা দীর্ঘদিন পর প্রথমবার ধর্মঘট করেছিলাম। খুব একটা সংগঠিত ছিলাম না আমরা। আগেই আমাদের মনোবল একেবারে ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিল। আমি নেতাদের একজন ছিলাম না, কিন্তু যেহেতু ধর্মঘটে ছিলাম, ভেবেছিলাম সেদিন ওরা আমাকে ধরতে এসেছে। আমার অনেক সহকর্মী ইতোমধ্যেই নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু না। আমাকে ধরতে দুইজন পুলিশই যথেষ্ট ছিল, বা দেড়জন। এত বড় বাহিনী নয়। শান্ত হলাম।
করিডোরে বের হলাম। দেখলাম একজন লোক একটি জিপ থেকে নামছে। তার কোলে একটি ছোট বানর,
আর সে সোজা ডন হুয়ানের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। ডন হুয়ান বোনিতোর বাড়ি।

“ইনি নতুন প্রেসিডেন্ট,” ডন হুয়ান আমাকে বলেছিল। “সে আমাকে নতুন এক সঙ্গী এনে দিয়েছে, এই
দেখো।”

কিছুদিন পর ডন হুয়ান মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু তার আগেই সব খদ্দের হারিয়েছিল।

“আমি আবার শুরু করব, মাস্টারসাহেব।”
আমি তার সফলতা কামনা করলাম।

“দেখুন, প্রেসিডেন্ট আমার ওপর কতটা ভরসা রাখে। সে বলেছে আগের প্রেসিডেন্টকে যেমন সাহায্য করেছি, তেমনভাবে এখন তাকে সাহায্য করতে হবে, যেন কোনো ‘অঘটন’ না ঘটে।”

আমি ভাবলাম বোধহয় ভুল শুনেছি বা আমার কান নষ্ট কিংবা কানে হয়ত ময়লা জমে আছে। কিন্তু না। কান একদম পরিষ্কারই ছিল।
ভাবতে থাকলাম। আগে তো ভেবেছিলাম কার্টুন আঁকিয়েরা সবকিছু বাড়িয়ে দেখায়।

  1. মারিম্বা হলো কাঠের তৈরি এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র, যা কাঠের উপর হাতুড়ির মতো কাঠি দিয়ে আঘাত করে বাজানো হয়। লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার সংগীতে বহুল ব্যবহৃত

  2. বিশাল আকৃতির উষ্ণমণ্ডলীয় গাছ, যার বীজের চারপাশে তুলোর মতো নরম আঁশ (কাপোক) জন্মায়। লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় এই গাছকে পবিত্র ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।

  3. একটানা ৯ দিন ধরে একই উদ্দেশ্যে করা প্রার্থনা

  4. তামালে হলো পাতায় মোড়া, ভাপে রান্না করা পুর দেওয়া ভুট্টার খাবার। লাতিন আমেরিকার ঘরোয়া সংস্কৃতির অংশ

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত